বিদ‘আতের তিনটি মৌলিক নীতিমালা রয়েছে। সেগুলো হলো:

১. এমন ‘আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট সাওয়াবের আশা করা যা শরী‘আত সিদ্ধ নয়। কেননা শরী‘আতের স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম হলো: এমন আমল দ্বারা আল্লাহর নিকট সাওয়াবের আশা করতে হবে যা কুরআনে আল্লাহ নিজে কিংবা সহীহ হাদীসে তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম অনুমোদন করেছেন। তাহলেই কাজটি ইবাদাত বলে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম যে আমল অনুমোদন করেন নি সে আমলের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদাত করা হবে বিদ‘আত।

২. দীনের অনুমোদিত ব্যবস্থা ও পদ্ধতির বাইরে অন্য ব্যবস্থার অনুসরণ ও স্বীকৃতি প্রদান। ইসলামে একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, শরী‘আতের বেঁধে দেওয়া পদ্ধতি ও বিধানের মধ্যে থাকা ওয়াজিব। যে ব্যক্তি ইসলামী শরী‘আত ব্যতীত অন্য বিধান ও পদ্ধতি অনুসরণ করল ও তার প্রতি আনুগত্যের স্বীকৃতি প্রদান করল সে বিদ‘আতে লিপ্ত হল।

৩. যে সকল কর্মকাণ্ড সরাসরি বিদ‘আত না হলেও বিদ‘আতের দিকে পরিচালিত করে এবং পরিশেষে মানুষকে বিদ‘আতে লিপ্ত করে, সেগুলোর হুকুম বিদ‘আতেরই অনুরূপ।

জেনে রাখা ভালো যে, ‘সুন্নাত’-এর অর্থ বুঝতে ভুল হলে বিদ‘আত চিহ্নিত করতেও ভুল হবে। এদিকে ইঙ্গিত করে ইমাম ইবন তাইমিয়া রহ. বলেন, ‘‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুন্নাতকে বিদ‘আত থেকে পৃথক করা। কেননা সুন্নাত হচ্ছে ঐ বিষয়, শরী‘আত প্রণেতা যার নির্দেশ প্রদান করেছেন। আর বিদ‘আত হচ্ছে ঐ বিষয় যা শরী‘আত প্রণেতা দীনের অন্তর্ভুক্ত বলে অনুমোদন করেন নি। এ বিষয়ে মানুষ মৌলিক ও অমৌলিক অনেক ক্ষেত্রে প্রচুর বিভ্রান্তির বেড়াজালে নিমজ্জিত হয়েছে। কেননা প্রত্যেক দলই ধারণা করে যে, তাদের অনুসৃত পন্থাই হলো সুন্নাত এবং তাদের বিরোধীদের পথ হলো বিদ‘আত।’’[1]বিদ‘আতের উল্লিখিত তিনটি প্রধান মৌলিক নীতিমালার আলোকে বিদ‘আতকে চিহ্নিত করার জন্য আরো বেশ কিছু সাধারণ নীতিমালা শরী‘আত বিশেষজ্ঞ আলিমগণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যার দ্বারা একজন সাধারণ মানুষ সহজেই কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসের ভিত্তিতে বিদ‘আতের পরিচয় লাভ করতে পারে ও সমাজে প্রচলিত বিদ‘আতসমূহকে চিহ্নিত করতে পারে। কেননা প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব হলো শরী‘আতের দৃষ্টিতে যা বিদ‘আত তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জেনে নেওয়া ও তা থেকে পুরোপুরি বেঁচে থাকা। নিচে উদাহরণ স্বরূপ কিছু দৃষ্টান্তসহ আমরা অতীব গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় নীতিমালা উল্লেখ করছি।

>
[1] আল-ইস্তিকামাহ, আয়াত: ১/১৩

অত্যধিক দুর্বল, মিথ্যা ও জাল হাদীসের ভিত্তিতে যে সকল ইবাদাত করা হয়, তা শরী‘আতে বিদ‘আত বলে বিবেচিত।

এটি বিদ‘আত চিহ্নিত করার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। কেননা ইবাদাত হচ্ছে পুরোপুরি অহী নির্ভর। শরী‘আতের কোনো বিধান কিংবা কোনো ইবাদাত শরী‘আতের গ্রহণযোগ্য সহীহ দলীল ছাড়া সাব্যস্ত হয় না। জাল বা মিথ্যা হাদীস মূলতঃ হাদীস নয়। অতএব, এ ধরনের হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হওয়া কোনো বিধান বা ইবাদাত শরী‘আতের অংশ হওয়া সম্ভব নয় বিধায় সে অনুযায়ী আমল বিদ‘আত হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে থাকে। অত্যধিক দুর্বল হাদীসের ব্যাপারে জমহুর মুহাদ্দিসগণের মত হল এর দ্বারাও শরী‘আতের কোনো বিধান সাব্যস্ত হবে না।

উদাহরণ: রজব মাসের প্রথম জুমু‘আর রাতে অথবা ২৭শে রজব যে বিশেষ শবে মি‘রাজের সালাত আদায় করা হয় তা বিদ‘আত হিসেবে গণ্য। অনুরূপভাবে নিসফে শা‘বান বা শবে বরাতে যে ১০০ রাকাত সালাত বিশেষ পদ্ধতিতে আদায় করা হয় যাকে সালাতুর রাগায়েব বলেও অভিহিত করা হয়, তাও বিদ‘আত হিসেবে গণ্য। কেননা এর ফযীলত সম্পর্কিত হাদীসটি জাল।[1]

>
[1] তানযীহুশ শারী‘আহ আল-মরফু‘আহ ২/৮৯-৯৪, আল-ইবদা‘ পৃ. ৫৮।

যে সকল ইবাদাত শুধুমাত্র মনগড়া মতামত ও খেয়াল-খুশীর ওপর ভিত্তি করে প্রণীত হয় সে সকল ইবাদাত বিদ‘আত হিসেবে গণ্য। যেমন, কোনো এক ‘আলিম বা আবেদ ব্যক্তির কথা কিংবা কোনো দেশের প্রথা অথবা স্বপ্ন কিংবা কাহিনী যদি হয় কোনো ‘আমল বা ইবাদাতের দলীল তাহলে তা হবে বিদ‘আত।

দীনের প্রকৃত নীতি হলো: আল-কুরআন ও সুন্নাহ’র মাধ্যমেই শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের কাছে জ্ঞান আসে। সুতরাং শরী‘আতের হালাল-হারাম এবং ইবাদাত ও ‘আমল নির্ধারিত হবে এ দু’টি দলীলের ভিত্তিতে। এ দু’টি দলীল ছাড়া অন্য পন্থায় স্থিরীকৃত ‘আমল ও ইবাদাত তাই বিদ‘আত বলে গণ্য হবে। এ জন্যই বিদ‘আতপন্থীগণ তাদের বিদ‘আতগুলোর ক্ষেত্রে শরঈ‘ দলীলের অপব্যাখ্যা করে সংশয় সৃষ্টি করে। এ প্রসঙ্গে ইমাম শাতেবী রহ. বলেন, “সুন্নাতী তরীকার মধ্যে আছে এবং সুন্নাতের অনুসারী বলে দাবীদার যে সকল ব্যক্তি সুন্নাতের বাইরে অবস্থান করছে, তারা নিজ নিজ মাসআলাগুলোতে সুন্নাহ্ দ্বারা দলীল পেশের ভান করেন।’’[1]

উদাহরণ:

১। কাশফ, অন্তর্দৃষ্টি তথা মুরাকাবা-মুশাহাদা, স্বপ্ন ও কারামাতের ওপর ভিত্তি করে শরী‘আতের হালাল হারাম নির্ধারণ করা কিংবা কোনো বিশেষ ‘আমল বা ইবাদাতের প্রচলন করা।[2]

২। শুধুমাত্র ‘আল্লাহ’ কিংবা হু-হু’ অথবা ‘ইল্লাল্লাহ’ এর যিকির উপরোক্ত নীতির আলোকে ইবাদাত বলে গণ্য হবে না। কেননা কুরআন কিংবা হাদীসের কোথাও এরকম যিকির অনুমোদিত হয় নি।[3]৩। মৃত অথবা অনুপস্থিত সৎব্যক্তিবর্গকে আহ্বান করা, তাদের কাছে প্রার্থনা করা ও সাহায্য চাওয়া, অনুরূপভাবে ফিরিশতা ও নবী-রসূলগণের কাছে দো‘আ করাও এ নীতির আলোকে বিদ‘আত বলে সাব্যস্ত হবে। শেষোক্ত এ বিদ‘আতটি মূলতঃ শেষ পর্যন্ত বড় শির্কে পরিণত হয়।

[1] আল-ই‘তেসাম ১/২২০

[2] আল-ই‘তিসাম ১/২১২, ২/১৮১

[3] মাজমু‘ আল-ফাতাওয়া ১০/৩৬৯

কোনো বাধা-বিপত্তির কারণে নয় বরং এমনিতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম যে সকল ‘আমল ও ইবাদাত থেকে বিরত থেকেছিলেন, পরবর্তীতে তার উম্মাতের কেউ যদি সে ‘আমল করে, তবে তা শরী‘আতে বিদ‘আত হিসেবে গণ্য হবে।

কেননা তা যদি শরী‘আতসম্মত হত তাহলে তা করার প্রয়োজন বিদ্যমান ছিল। অথচ কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম সে ‘আমল বা ইবাদাত ত্যাগ করেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ‘আমলটি শরী‘আতসম্মত নয়। অতএব, সে ‘আমল করা যেহেতু আর কারো জন্য জায়েয নেই, তাই তা করা হবে বিদ‘আত।

উদাহরণ:

১। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও জুমা‘ ছাড়া অন্যান্য সালাতের জন্য ‘আযান দেওয়া। উপরোক্ত নীতির আলোকে বিদ‘আত বলে গণ্য হবে।

২। সালাত শুরু করার সময় মুখে নিয়তের বাক্য পড়া। যেহেতু রাসূলুল্লঅহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম ও সাহাবীগণ এরূপ করা থেকে বিরত থেকেছিলেন এবং নিয়ত করেছিলেন শুধু অন্তর দিয়ে, তাই নিয়তের সময় মুখে বাক্য পড়া বিদ‘আত বলে গণ্য হবে।

৩। বিপদাপদ ও ঝড়-তুফান আসলে ঘরে আযান দেওয়াও উপরোক্ত নীতির আলোকে বিদ‘আত বলে গণ্য হবে। কেননা বিপদাপদে কী পাঠ করা উচিৎ বা কী ‘আমল করা উচিৎ তা হাদীসে সুন্দরভাবে বর্ণিত আছে।

৪। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লামের জন্মোৎসব পালনের জন্য কিংবা আল্লাহর কাছে সাওয়াব ও বরকত লাভের প্রত্যাশায় অথবা যে কোনো কাজে আল্লাহর সাহায্য লাভের উদ্দেশে মিলাদ পড়া উপরোক্ত নীতির আলোকে বিদ‘আত বলে গণ্য হবে।

সালাফে সালেহীন তথা সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈন যদি কোনো বাধা না থাকা সত্ত্বেও কোনো ইবাদাতের কাজ করা কিংবা বর্ণনা করা অথবা লিপিবদ্ধ করা থেকে বিরত থেকে থাকেন, তাহলে এমন পরিস্থিতিতে তাদের বিরত থাকার কারণে প্রমাণিত হয় যে, কাজটি তাদের দৃষ্টিতে শরী‘আতসিদ্ধ নয়। কারণ, তা যদি শরী‘আতসিদ্ধ হত তাহলে তাদের জন্য তা করার প্রয়োজন বিদ্যমান ছিল। তা সত্ত্বেও যেহেতু তারা কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই উক্ত ‘আমল ত্যাগ করেছেন, তাই পরবর্তী যুগে কেউ এসে সে ‘আমাল বা ইবাদাত প্রচলিত করলে তা হবে বিদ‘আত।

হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, ‘‘যে সকল ইবাদাত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লামের সাহাবীগণ করেন নি তোমরা সে সকল ইবাদাত কর না।’’[1]

মালিক ইবন আনাস রহ. বলেন, ‘‘এই উম্মাতের প্রথম প্রজন্ম যে ‘আমল দ্বারা সংশোধিত হয়েছিল একমাত্র সে ‘আমল দ্বারাই উম্মাতের শেষ প্রজন্ম সংশোধিত হতে পারে।’’[2]

ইমাম ইবন তাইমিয়া রহ. কিছু বিদ‘আতের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বলেন, ‘‘এ কথা জানা যে, যদি এ কাজটি শরী‘আতসম্মত ও মুস্তাহাব হত যদ্দ্বারা আল্লাহ সাওয়াব দিয়ে থাকেন, তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অবহিত থাকতেন এবং অবশ্যই তাঁর সাহাবীদেরকে তা জানাতেন, আর তাঁর সাহাবীরাও সে বিষয়ে অন্যদের চেয়েও বেশি অবহিত থাকতেন এবং পরবর্তী লোকদের চেয়েও এ ‘আমলে বেশি আগ্রহী হতেন। কিন্তু যখন তারা এ প্রকার ‘আমলের দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করলেন না তাতে বোঝা গেল যে, তা নব উদ্ভাবিত এমন বিদ‘আত যাকে তারা ইবাদাত, নৈকট্য ও আনুগত্য হিসেবে বিবেচনা করতেন না। অতএব, এখন যারা একে ইবাদাত, নৈকট্য, সাওয়াবের কাজ ও আনুগত্য হিসাবে প্রদর্শন করছে তারা সাহাবীদের পথ ভিন্ন অন্য পথ অনুসরণ করছেন এবং দীনের মধ্যে এমন কিছুর প্রচলন করছেন যার অনুমতি আল্লাহ প্রদান করেন নি।’’[3]

তিনি আরো বলেন, ‘‘আর যে ধরনের ইবাদাত পালন থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম বিরত থেকেছেন অথচ তা যদি শরী‘আতসম্মত হত তাহলে তিনি নিজে তা অবশ্যই পালন করতেন অথবা অনুমতি প্রদান করতেন এবং তাঁর পরে খলিফাগণ ও সাহাবীগণ তা পালন করতেন। অতএব, এ কথা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করা ওয়াজিব যে এ কাজটি বিদ‘আত ও ভ্রষ্টতা।’’[4]

এর দ্বারা বুঝা গেল যে, যে সকল ইবাদাত পালন করা থেকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম নিজে এবং তাঁর পরে উম্মাতের প্রথম প্রজন্মের আলিমগণ বিরত থেকেছিলেন নিঃসন্দেহে সেগুলো বিদ‘আত ও ভ্রষ্টতা। পরবর্তী যুগে কিংবা আমাদের যুগে এসে এগুলোকে ইবাদাত হিসেবে গণ্য করার কোনো শরঈ‘ ভিত্তি নেই।

উদাহরণ:

১। ইসলামের বিশেষ বিশেষ দিবসসমূহ ও ঐতিহাসিক উপলক্ষগুলোকে ঈদ উৎসবের মত উদযাপন করা। কেননা ইসলামী শরী‘আতই ঈদ উৎসব নির্ধারণ ও অনুমোদন করে। শরী‘আতের বাইরে অন্য কোনো উপলক্ষকে ঈদ উৎসবে পরিণত করার ইখতিয়ার কোনো ব্যক্তি বা দলের নেই। এ ধরনের উপলক্ষের মধ্যে একটি রয়েছে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লামের জন্ম উৎসব উদযাপন। সাহাবীগণ ও পূর্ববর্তী ‘আলিমগণ হতে এটি পালন করাতো দূরের কথা বরং অনুমোদন দানের কোনো বর্ণনাও পাওয়া যায় না। ইমাম ইবন তাইমিয়া রহ. বলেন, “এ কাজটি পূর্ববর্তী সালাফগণ করেন নি অথচ এ কাজ জায়িয থাকলে সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে তা পালন করার কার্যকারণ বিদ্যমান ছিল এবং পালন করতে বিশেষ কোনো বাধাও ছিল না। যদি এটা শুধু কল্যাণের কাজই হতো তাহলে আমাদের চেয়ে তারাই এ কাজটি বেশি করতেন। কেননা তারা আমাদের চেয়েও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লামকে বেশি সম্মান ও মহব্বত করতেন এবং কল্যাণের কাজে তারা ছিলেন বেশি আগ্রহী।’’[5]

২। ইতোপূর্বে বর্ণিত সালাত আর রাগায়েব বা শবে মি‘রাজের সালাত উল্লিখিত চতুর্থ নীতির আলোকেও বিদ‘আত সাব্যস্ত হয়ে থাকে।ইমাম ইযযুদ্বীন ইবনু আব্দুস সালাম রহ. এ প্রকার সালাত এর বৈধতা অস্বীকার করে বলেন, ‘‘এ প্রকার সালাত যে বিদ‘আত তার একটি প্রমাণ হলো দীনের প্রথম সারির ‘উলামা ও মুসলিমদের ইমাম তথা সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন ও শরী‘আহ বিষয়ে গ্রন্থ প্রণয়নকারী বড় বড় ‘আলিমগণ মানুষকে ফরয ও সুন্নাত বিষয়ে জ্ঞান দানের প্রবল আগ্রহ পোষণ করা সত্ত্বেও তাদের কারো কাছ থেকে এ সালাত সম্পর্কে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় নি এবং কেউ তাঁর নিজ গ্রন্থে এ সম্পর্কে কিছু লিপিবদ্ধও করেন নি ও কোনো বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো আলোকপাতও করেন নি। বাস্তবে এটা অসম্ভব যে, এ সালাত আদায় শরী‘আতে সুন্নাত হিসেবে বিবেচিত হবে অথচ দীনের প্রথম সারির ‘আলিমগণ ও মুমিনদের যারা আদর্শ, বিষয়টি তাদের সকলের কাছে থেকে যাবে সম্পূর্ণ অজানা’’।[6]

>
[1] সহীহ বুখারী

[2] ইকতিযা আস-সিরাত আল মুস্তাকীম ২/৭১৮

[3] ইকতিয়া আস সীরাত আল-মুস্তাকীম ২/৭৯৮

[4] মাযমু‘ আল-ফাতাওয়া: ২৬/১৭২

[5] ইকতিযা আস-সিরাত আল মুস্তাকিম: ২/৬১৫

[6] আত-তারগীব ‘আন সালাতির রাগাইব আল-মাওদু‘আ, পৃ. ৫-৯

যে সকল ইবাদাত শরী‘আতের মূলনীতিসমূহ এবং মাকাসিদ তথা উদ্দেশ্য ও লক্ষের বিপরীত সে সবই হবে বিদ‘আত।

উদাহরণ:

১. দুই ঈদের সালাতের জন্য আযান দেওয়া। কেননা নফল সালাতের জন্য আযান দেওয়া শরী‘আত সম্মত নয়। আযান শুধু ফরয সালাতের সাথেই খাস।

২. জানাযার সালাতের জন্য আযান দেওয়া। কেননা জানাযার সালাতে আযানের কোনো বর্ণনা নেই, তদুপরি এতে সবার অংশগ্রহণ করার বাধ্যবাধকতাও নেই।

৩. ফরয সালাতের আযানের আগে মাইকে দুরূদ পাঠ। কেননা আযানের উদ্দেশ্য লোকদেরকে জামা‘আতে সালাত আদায়ের প্রতি আহ্বান করা, মাইকে দরূদ পাঠের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রথা ও মু‘আমালাত বিষয়ক কোনো কাজের মাধ্যমে যদি শরী‘আতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়াই আল্লাহর কাছে সাওয়াব লাভের আশা করা হয় তাহলে তা হবে বিদ‘আত।

উদাহরণ: পশমী কাপড়, চট, ছেঁড়া ও তালি এবং ময়লাযুক্ত কাপড় কিংবা নির্দিষ্ট রঙের পোশাক পরিধান করাকে ইবাদাত ও আল্লাহর প্রিয় পাত্র হওয়ার পন্থা মনে করা। একইভাবে সার্বক্ষণিক চুপ থাকাকে কিংবা রুটি ও গোশত ভক্ষণ ও পানি পান থেকে বিরত থাকাকে অথবা ছায়াযুক্ত স্থান ত্যাগ করে সূর্যের আলোয় দাঁড়িয়ে কাজ করাকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পন্থা হিসাবে নির্ধারণ করা।

উল্লিখিত কাজসমূহ কেউ যদি এমনিতেই করে তবে তা নাজায়েয নয়, কিন্তু এ সকল ‘আদাত কিংবা মু‘আমালাতের কাজগুলোকে যদি কেউ ইবাদাতের রূপ প্রদান করে কিংবা সাওয়াব লাভের উপায় মনে করে তবে তখনই তা হবে বিদ‘আত। কেননা এগুলো ইবাদাত ও সওয়াব লাভের পন্থা হওয়ার কোনো দলীল শরী‘আতে নেই।

আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম যে সকল কাজ নিষেধ করে দিয়েছেন সেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সাওয়াব লাভের আশা করা হলে সেগুলো হবে বিদ‘আত।

উদাহরণ:

১। গান-বাদ্য ও কাওয়ালী বলা ও শোনা অথবা নাচের মাধ্যমে যিকির করে আল্লাহর কাছে সাওয়াবের আশা করা।

২। কাফির, মুশরিক ও বিজাতীয়দের অনুকরণের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সাওয়াব লাভের আশা করা।

যে সকল ইবাদাত শরী‘আতে নির্ধারিত সময়, স্থান ও পদ্ধতির সাথে প্রণয়ন করা হয়েছে সেগুলোকে সে নির্ধারিত সময়, স্থান ও পদ্ধতি থেকে পরিবর্তন করা বিদ‘আত বলে গণ্য হবে।

উদাহরণ:

১। নির্ধারিত সময় পরিবর্তনের উদাহরণ: যেমন, জিলহাজ্জ মাসের এক তারিখে কুরবানী করা। কেননা কুরবানীর শরঈ সময় হলো ১০ যিলহজ ও তৎপরবর্তী আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলো।

২। নির্ধারিত স্থান পরিবর্তনের উদাহরণ: যেমন, মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ই‘তিকাফ করা। কেননা শরী‘আত কর্তৃক ই‘তিকাফের নির্ধারিত স্থান হচ্ছে মসজিদ।

৩। নির্ধারিত শ্রেণি পরিবর্তনের উদাহরণ: যেমন, গৃহ পালিত পশুর পরিবর্তে ঘোড়া দিয়ে কুরবানী করা।

৪। নির্ধারিত সংখ্যা পরিবর্তনের উদাহরণ: যেমন, পাঁচ ওয়াক্তের অতিরিক্ত ৬ষ্ঠ আরো এক ওয়াক্ত সালাত প্রচলন করা। কিংবা চার রাকাত সালাতকে দুই রাকাত কিংবা দুই রাকাতের সালাতকে চার রাকাতে পরিণত করা।

৫। নির্ধারিত পদ্ধতি পরিবর্তনের উদাহরণ: অযু করার শরঈ‘ পদ্ধতির বিপরীতে যেমন দু‘পা ধোয়ার মাধ্যমে অযু শুরু করা এবং তারপর দু‘হাত ধৌত করা এবং মাথা মাসেহ করে মুখমণ্ডল ধৌত করা। অনুরূপভাবে সালাতের মধ্যে আগে সাজদাহ ও পরে রুকু করা।

‘আম তথা ব্যাপক অর্থবোধক দলিল দ্বারা শরী‘আতে যে সকল ইবাদাতকে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে সেগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট সময় কিংবা নির্দিষ্ট স্থান অথবা অন্য কিছুর সাথে এমনভাবে সীমাবদ্ধ করা বিদ‘আত বলে গণ্য হবে যদ্দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত ইবাদাতের এ সীমাবদ্ধ করণ প্রক্রিয়া শরী‘আতসম্মত, অথচ পূর্বোক্ত ‘আম দলীলের মধ্যে এ সীমাবদ্ধ করণের ওপর কোনো প্রমাণ ও দিক নির্দেশনা পাওয়া যায় না।

এ নীতির মোদ্দাকথা হচ্ছে কোনো উন্মুক্ত ইবাদাতকে শরী‘আতের সহীহ দলীল ছাড়া কোনো স্থান, কাল বা সংখ্যা দ্বারা সীমাবদ্ধ করা বিদ‘আত হিসেবে বিবেচিত।

উদাহরণ:

১। যে দিনগুলোতে শরী‘আত রোযা বা সাওম রাখার বিষয়টি সাধারণভাবে উন্মুক্ত রেখেছে যেমন মঙ্গল বার, বুধবার কিংবা মাসের ৭, ৮ ও ৯ ইত্যাদি তারিখসমূহ, সে দিনগুলোর কোনো এক বা একাধিক দিন বা বারকে বিশেষ ফযীলত আছে বলে সাওম পালনের জন্য যদি কেউ খাস ও সীমাবদ্ধ করে অথচ খাস করার কোনো দলীল শরী‘আতে নেই। যেমন, ফাতিহা-ই-ইয়াযদাহমের দিন সাওম পালন করা, তাহলে শরী‘আতের দৃষ্টিতে তা হবে বিদ‘আত, কেননা দলীল ছাড়া শরী‘আতের কোনো হুকুমকে খাস ও সীমাবদ্ধ করা জায়েয নেই।

২। ফযীলাতপূর্ণ দিনগুলোতে শরী‘আত যে সকল ইবাদাতকে উন্মুক্ত রেখেছে সেগুলোকে কোনো সংখ্যা, পদ্ধতি বা বিশেষ ইবাদাতের সাথে খাস করা বিদ‘আত হিসাবে গণ্য হবে। যেমন, প্রতি শুক্রবার নির্দিষ্ট করে চল্লিশ রাক‘আত নফল সালাত পড়া, প্রতি বৃহস্পতিবার নির্দিষ্ট পরিমাণ সদকা করা, অনুরূপভাবে কোনো নির্দিষ্ট রাতকে নির্দিষ্ট সালাত ও কুরআন খতম বা অন্য কোনো ইবাদাতের জন্য খাস করা।

দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১০ পর্যন্ত, সর্বমোট ১৬ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 পরের পাতা »