আল্লাহ সম্যক দ্রষ্টা (সব কিছুই দেখেন) বিষয়ক আয়াতসমূহ ৩৫ টি
আল-বাকারা
২:৯৬ وَ لَتَجِدَنَّہُمۡ اَحۡرَصَ النَّاسِ عَلٰی حَیٰوۃٍ ۚۛ وَ مِنَ الَّذِیۡنَ اَشۡرَکُوۡا ۚۛ یَوَدُّ اَحَدُہُمۡ لَوۡ یُعَمَّرُ اَلۡفَ سَنَۃٍ ۚ وَ مَا ہُوَ بِمُزَحۡزِحِہٖ مِنَ الۡعَذَابِ اَنۡ یُّعَمَّرَ ؕ وَ اللّٰہُ بَصِیۡرٌۢ بِمَا یَعۡمَلُوۡنَ ﴿۹۶﴾

আর তুমি তাদেরকে পাবে জীবনের প্রতি সর্বাধিক লোভী মানুষরূপে। এমনকি তাদের থেকেও যারা শিরক করেছে। তাদের একজন কামনা করে, যদি হাজার বছর তাকে জীবন দেয়া হত! অথচ দীর্ঘজীবী হলেই তা তাকে আযাব থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারবে না। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

অবশ্যই তুমি তাদেরকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে সকল মানুষ এমনকি মুশরিক অপেক্ষাও অধিক লোভী দেখতে পাবে, তাদের প্রত্যেকেই আকাঙ্ক্ষা করে যদি হাজার বছর আয়ু দেয়া হত, কিন্তু দীর্ঘায়ু তাদেরকে শাস্তি হতে রেহাই দিতে পারবে না, তারা যা করে, আল্লাহ তার দ্রষ্টা। তাইসিরুল

এবং নিশ্চয়ই তুমি তাদেরকে অন্যান্য লোক এবং অংশীবাদীদের অপেক্ষাও অধিকতর আয়ু-আকাংক্ষী পাবে; তাদের মধ্যে প্রত্যেকে কামনা করে যেন তাকে হাজার বছর আয়ু দেয়া হয়, এবং ঐরূপ আয়ু প্রাপ্তিও তাদেরকে শাস্তি হতে মুক্ত করতে পারবেনা এবং তারা যা করছে আল্লাহ তার পরিদর্শক। মুজিবুর রহমান

And you will surely find them the most greedy of people for life - [even] more than those who associate others with Allah. One of them wishes that he could be granted life a thousand years, but it would not remove him in the least from the [coming] punishment that he should be granted life. And Allah is Seeing of what they do. Sahih International

৯৬. আর আপনি অবশ্যই তাদেরকে জীবনের প্রতি অন্যসব লোকের চেয়ে বেশী লোভী দেখতে পাবেন, এমনকি মুশরিকদের চাইতেও। তাদের প্রত্যেকে আশা করে যদি হাজার বছর আয়ু দেয়া হত; অথচ দীর্ঘায়ু তাকে শাস্তি হতে নিষ্কৃতি দিতে পারবে না। তারা যা করে আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

৯৬। তুমি নিশ্চয় তাদেরকে জীবনের প্রতি সমস্ত মানুষ এমন কি অংশীবাদী অপেক্ষা অধিকতর লোভী দেখতে পাবে। [1] তাদের প্রত্যেকে কামনা করে যে, সে যেন হাজার বছর আয়ু প্রাপ্ত হয়; কিন্তু দীর্ঘায়ু তাকে শাস্তি হতে দূরে রাখতে পারবে না। আর তারা যা করে, আল্লাহ তার সম্যক পরিদর্শক।

[1] মৃত্যু কামনা তো দূরের কথা; পার্থিব জীবনের প্রতি এদের লোভ ও আকর্ষণ তো সকল মানুষ এমনকি মুশরিকদের চেয়েও বেশী। কিন্তু সুদীর্ঘ জীবন তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচাতে পারবে না। এই আয়াতগুলো থেকে জানা গেল যে, ইয়াহুদীরা তাদের এই দাবীতে মিথ্যাবাদী ছিল যে, তারাই আল্লাহর প্রিয়, জান্নাতের অধিকারী কেবল তারাই, অন্যরা হবে জাহান্নামী। কারণ, প্রকৃতপক্ষে যদি তাই হত অথবা কমসে কম তাদের দাবীর সত্যতার উপর তারা যদি পূর্ণ আস্থাবান হত, তাহলে তারা অবশ্যই 'মুবাহালা' করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যেত। যাতে তাদের সত্যবাদিতা এবং মুসলিমদের মিথ্যাবাদিতা প্রকাশ পেয়ে যেত। মুবাহালা'র পূর্বে ইয়াহুদীদের অমান্য করা ও মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করে যে, তারা মৌখিকভাবে নিজেদের সম্পর্কে আনন্দদায়ক কথা বলে নিলেও তাদের অন্তর প্রকৃতত্বের ব্যাপারে অবহিত ছিল। তারা জানত যে, আল্লাহর নিকটে যাওয়ার পর তাদের পরিণাম তা-ই হবে, যা আল্লাহ অবাধ্যজনদের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১১০ وَ اَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتُوا الزَّکٰوۃَ ؕ وَ مَا تُقَدِّمُوۡا لِاَنۡفُسِکُمۡ مِّنۡ خَیۡرٍ تَجِدُوۡہُ عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ﴿۱۱۰﴾

আর তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত দাও এবং যে নেক আমল তোমরা নিজদের জন্য আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর নিকট পাবে। তোমরা যা করছ নিশ্চয় আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

এবং তোমরা নামায কায়িম কর এবং যাকাত দাও এবং যা কিছু সৎ কার্যাবলী তোমরা স্বীয় আত্মার জন্যে আগে পাঠাবে, তোমরা তা আল্লাহর নিকট পাবে, তোমরা যা কিছু করছো নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’ দেখছেন। তাইসিরুল

আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠিত কর ও যাকাত প্রদান কর; এবং তোমরা স্ব স্ব জীবনের জন্য যে সৎকাজ অগ্রে প্রেরণ করেছ তা আল্লাহর নিকট প্রাপ্ত হবে; তোমরা যা করছো নিশ্চয়ই আল্লাহ তার পরিদর্শক। মুজিবুর রহমান

And establish prayer and give zakah, and whatever good you put forward for yourselves - you will find it with Allah. Indeed, Allah of what you do, is Seeing. Sahih International

১১০. আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর ও যাকাত দাও এবং তোমরা উত্তম কাজের যা কিছু নিজেদের জন্য পেশ করবে আল্লাহর কাছে তা পাবে। নিশ্চয় তোমরা যা করছ আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

১১০। আর তোমরা নামায কায়েম (যথাযথভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত) কর ও যাকাত প্রদান কর। আর উত্তম কাজের মধ্যে নিজেদের জন্য যা কিছু পূর্বে প্রেরণ করবে, আল্লাহর নিকট তা প্রাপ্ত হবে। তোমরা যা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। [1]

[1] ইয়াহুদীদের যেহেতু ইসলাম ও নবী করীম (সাঃ)-এর প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ ছিল, তাই তারা মুসলিমদেরকে ইসলাম থেকে দূরে রাখার জঘন্য প্রচেষ্টা চালাতো। সুতরাং এখানে মুসলিমদেরকে বলা হচ্ছে যে, তোমরা ধৈর্য ও উপেক্ষার পথ অবলম্বন কর এবং ইসলামের বিধি-বিধান ও ফরয কাজগুলো পালন কর, যার নির্দেশ তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২৩৩ وَ الۡوَالِدٰتُ یُرۡضِعۡنَ اَوۡلَادَہُنَّ حَوۡلَیۡنِ کَامِلَیۡنِ لِمَنۡ اَرَادَ اَنۡ یُّتِمَّ الرَّضَاعَۃَ ؕ وَ عَلَی الۡمَوۡلُوۡدِ لَہٗ رِزۡقُہُنَّ وَ کِسۡوَتُہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ لَا تُکَلَّفُ نَفۡسٌ اِلَّا وُسۡعَہَا ۚ لَا تُضَآرَّ وَالِدَۃٌۢ بِوَلَدِہَا وَ لَا مَوۡلُوۡدٌ لَّہٗ بِوَلَدِہٖ ٭ وَ عَلَی الۡوَارِثِ مِثۡلُ ذٰلِکَ ۚ فَاِنۡ اَرَادَا فِصَالًا عَنۡ تَرَاضٍ مِّنۡہُمَا وَ تَشَاوُرٍ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا ؕ وَ اِنۡ اَرَدۡتُّمۡ اَنۡ تَسۡتَرۡضِعُوۡۤا اَوۡلَادَکُمۡ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ اِذَا سَلَّمۡتُمۡ مَّاۤ اٰتَیۡتُمۡ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ﴿۲۳۳﴾

আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে, (এটা) তার জন্য যে দুধ পান করাবার সময় পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মাদেরকে খাবার ও পোশাক প্রদান করা। সাধ্যের অতিরিক্ত কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় না। কষ্ট দেয়া যাবে না কোন মাকে তার সন্তানের জন্য, কিংবা কোন বাবাকে তার সন্তানের জন্য। আর ওয়ারিশের উপর রয়েছে অনুরূপ দায়িত্ব। অতঃপর তারা যদি পরস্পর সম্মতি ও পরামর্শের মাধ্যমে দুধ ছাড়াতে চায়, তাহলে তাদের কোন পাপ হবে না। আর যদি তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে অন্য কারো থেকে দুধ পান করাতে চাও, তাহলেও তোমাদের উপর কোন পাপ নেই, যদি তোমরা বিধি মোতাবেক তাদেরকে যা দেবার তা দিয়ে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

যে ব্যক্তি দুধপান কাল পূর্ণ করাতে ইচ্ছুক তার জন্য মায়েরা নিজেদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’ বৎসরকাল স্তন্য দান করবে। জনকের উপর দায়িত্ব হল ভালভাবে তাদের অন্নবস্ত্রের ব্যবস্থা করা। কাউকেও সাধ্যের অতিরিক্ত হুকুম দেয়া হয় না, যেন মাকে তার সন্তানের জন্য এবং সন্তানের জন্মদাতাকে সন্তানের জন্য কষ্ট দেয়া না হয় এবং ওয়ারিশের প্রতিও একই রকম নির্দেশ, তৎপর যদি উভয়ের সম্মতি ও যুক্তিক্রমে দুধ ছাড়াতে ইচ্ছে করে, তবে তাদের প্রতি কোন গুনাহ নেই এবং যদি তোমরা স্বীয় সন্তানদেরকে কোন ধাত্রী দ্বারা দুধ পান করাতে ইচ্ছে কর, তবে তোমাদের প্রতি কোন গুনাহ নেই, যদি তোমরা যা দিতে চাচ্ছিলে তা যথারীতি আদায় করে দাও। আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রেখ, তোমরা যা কিছুই কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। তাইসিরুল

এবং যদি কেহ স্তন্য পানের কাল পূর্ণ করতে ইচ্ছা করে তার জন্য জননীগণ পূর্ণ দুই বছর স্বীয় সন্তানদেরকে স্তন্য দান করবে; আর সন্তানের জনকগণ বিহিতভাবে প্রসূতিদের খোরাক ও তাদের পোশাক দিতে বাধ্য; কেহকেও তার সাধ্যের অতীত কষ্ট দেয়া যাবেনা, নিজ সন্তানের কারণে জননীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা চলবেনা, এবং পিতার জন্যও একই বিধান, কিন্তু যদি তারা পরস্পর পরামর্শ ও সম্মতি অনুসারে স্তন্য ত্যাগ করাতে ইচ্ছা করে তাতে উভয়ের কোন দোষ নেই; আর তোমরা যদি নিজ সন্তানদেরকে স্তন্য পানের জন্য সমর্পণ করে বিহিতভাবে কিছু প্রদান কর তাহলেও তোমাদের কোন দোষ নেই; এবং আল্লাহকে ভয় কর ও জেনে রেখ যে, তোমরা যা করছ আল্লাহ তা প্রত্যক্ষকারী। মুজিবুর রহমান

Mothers may breastfeed their children two complete years for whoever wishes to complete the nursing [period]. Upon the father is the mothers' provision and their clothing according to what is acceptable. No person is charged with more than his capacity. No mother should be harmed through her child, and no father through his child. And upon the [father's] heir is [a duty] like that [of the father]. And if they both desire weaning through mutual consent from both of them and consultation, there is no blame upon either of them. And if you wish to have your children nursed by a substitute, there is no blame upon you as long as you give payment according to what is acceptable. And fear Allah and know that Allah is Seeing of what you do. Sahih International

২৩৩. আর জননীগণ তাদের সস্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর স্তন্য পান করাবে(১) এটা সে ব্যক্তির জন্য, যে স্তন্যপান কাল পূর্ণ করতে চায়। পিতার কর্তব্য যথাবিধি তাদের (মাতাদের) ভরণ-পোষণ করা(২)। কাউকেও তার সাধ্যাতীত কাজের ভার দেয়া হয় না। কোন মাতাকে তার সন্তানের জন্য(৩) এবং যার সন্তান (পিতা) তাকেও তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। আর উত্তরাধিকারীরও অনুরূপ কর্তব্য। কিন্তু যদি তারা পরস্পরে সম্মতি ও পরামর্শক্রমে স্তন্যপান বন্ধ রাখতে চায়, তবে তাদের কারো কোন অপরাধ নেই। আর যদি তোমরা (কোন ধাত্রী দ্বারা) তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্য পান করাতে চাও, তাহলে যদি তোমরা প্রচলিত বিধি মোতাবেক বিনিময় দিয়ে দাও তবে তোমাদের কোন পাপ নেই। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং জেনে রাখ, তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ তা প্রত্যক্ষকারী।

(১) এ আয়াতে স্তন্যদান সম্পর্কিত নির্দেশাবলী বর্ণিত হয়েছে। এর পূর্ববতী ও পরবর্তী আয়াতে তালাক সংক্রান্ত আদেশাবলীর আলোচনা হয়েছে। এরই মধ্যে শিশুকে স্তন্যদানসংক্রান্ত আলোচনা এজন্য করা হয়েছে যে, সাধারণতঃ তালাকের পরে শিশুর লালন-পালন ও স্তন্যদান নিয়ে বিবাদের সৃষ্টি হয়। কাজেই এ আয়াতে এমন ন্যায় সঙ্গত নিয়ম বাতলে দেয়া হয়েছে যা স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সহজ ও যুক্তিসঙ্গত। বিয়ে বহাল থাকাকালে স্তন্যদান ও দুধ ছাড়ানোর বিষয় উপস্থিত হোক অথবা তালাক দেয়ার পর, উভয় অবস্থাতেই এমন এক ব্যবস্থা বাতলে দেয়া হয়েছে, যাতে কোন ঝগড়া-বিবাদ বা কোন পক্ষের উপরই অন্যায় ও যুলুম হওয়ার পথ না থাকে।

আয়াতের প্রথম বাক্যে এরশাদ হয়েছেঃ “মাতাগণ নিজেদের বাচ্চাদেরকে পূর্ণ দু’বছর স্তন্যদান করাবে”। এখানে এটা স্থির হয়েছে যে, স্তন্যদানের পূর্ণ সময় দু’বছর। যদি কোন যুক্তিসঙ্গত কারণে বন্ধ করার প্রয়োজন না হয়, তবে তা বাচ্চার অধিকার। এতে একথাও বোঝা যাচ্ছে যে, এ দু’বছরের পর শিশুকে আর মাতৃস্তনের দুধ পান করানো চলবে না।


(২) এ আয়াতের দ্বারা এ কথাও বোঝা যাচ্ছে যে, শিশুকে স্তন্যদান করা মাতার দায়িত্ব, আর মাতার ভরণ-পোষণ ও জীবনধারণের অন্যান্য যাবতীয় খরচ বহন করা পিতার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব ততক্ষণ পর্যন্ত বলবৎ থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত শিশুর মাতা স্বামীর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ বা তালাক পরবর্তী ইদ্দতের মধ্যে থাকে। তালাক ও ইদ্দত অতিক্রান্ত হয়ে গেলে স্ত্রী হিসেবে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় সত্য, কিন্তু শিশুকে স্তন্যদানের পরিবর্তে মাতাকে পারিশ্রমিক দিতে হবে। [কুরতুবী]


(৩) এতে বোঝা যায় যে, মা যদি কোন অসুবিধার কারণে শিশুকে স্তন্যদান করতে অস্বীকার করে, তবে শিশুর পিতা তাকে এ ব্যাপারে বাধ্য করতে পারবে না। অবশ্য শিশু যদি অন্য কোন স্ত্রীলোকের বা কোন জীবের দুধ পান না করে, তবে মাতাকে বাধ্য করা চলে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৩৩) জননীগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’ বছর দুধ পান করাবে; যদি কেউ দুধ পান করার সময় পূর্ণ করতে চায়।[1] পিতার কর্তব্য যথাবিধি তাদের ভরণ-পোষণ করা।[2] কাউকে তার সাধ্যাতীত কার্যভার দেওয়া হয় না। কোন মাতাকে তার সন্তানের জন্য এবং কোন পিতাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না।[3] আর (পিতা মারা গেলে) উত্তরাধিকারীর বিধানও অনুরূপ।[4] পক্ষান্তরে যদি পিতা-মাতা পরস্পর সম্মতি ও পরামর্শক্রমে দু’ বছরের মধ্যেই (শিশুর) দুধপান ছাড়াতে চায়, তবে তাদের কোন দোষ হবে না। আর যদি তোমরা তোমাদের সন্তানদের কোন ধাত্রীর দুধ পান করাতে চাও, তাতেও তোমাদের কোন দোষ হবে না; যদি তোমরা তাদের নির্ধারিত প্রদেয় বিধিমত অর্পণ কর।[5] আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, তোমরা যা কর আল্লাহ তার দ্রষ্টা।

[1] এই আয়াতে দুধপানের মাসআলা বর্ণিত হয়েছে। এখানে প্রথম যে কথাটি বলা হয়েছে তা হল, যে ব্যক্তি দুধপানের নির্ধারিত সময় পুরা করতে চায়, সে পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে। এই শব্দগুলো থেকে এ কথাও ফুটে উঠে যে, দু’বছরের কমও দুধ পান করাতে পারে। আর দ্বিতীয় যে কথাটি জানা যায় তা হল, দুধপানের সর্বাধিক সময়সীমা হল, দু’বছর। মহানবী (সাঃ) বলেন, ‘‘সেই দুধপানই হারাম সাব্যস্ত করে, যা বুক থেকে বের হয়ে (খাদ্যের মত) নাড়িভুঁড়ি বিদীর্ণ করে এবং যা দুধ ছাড়ানোর সময়ের পূর্বে হয়।’’ (তিরমিযী ১১৫২নং, দুধপান অধ্যায়, পরিচ্ছেদঃ শিশু অবস্থায় দু’ বছরের ভিতরে ছাড়া দুধপান বিবাহ হারাম সাব্যস্ত করে না) কাজেই দুধপানের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোন শিশু যদি কোন মহিলার ঐভাবে দুধ পান করে নেয়, যেভাবে পান করলে দুধপান সাব্যস্ত হয়, তাহলে তাদের মধ্যে দুধপানের সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যাবে এবং দুধ ভাই-বোনদের মধ্যে আপোসের বিবাহ ঐরূপ হারাম হয়ে যাবে, যেরূপ রক্তের সম্পর্কের ভাই-বোনদের সাথে হারাম। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘দুধপানেও তা হারাম হয়, যা রক্তের সম্পর্কের কারণে হারাম হয়।’’ (বুখারী ২৬৪৫নং)

[2] مَوْلُودٌ لَه বলতে পিতাকে বুঝানো হয়েছে। তালাক হয়ে যাওয়ার পর দুধের শিশু ও তার মায়ের দেখা-শোনার ব্যাপারটা আমাদের সমাজে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এর কারণ হল, শরীয়ত থেকে বিমুখতা। আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী স্বামী যদি তার সাধ্যমত তালাকপ্রাপ্তা মহিলার খাওয়া-পরার দায়িত্ব গ্রহণ করে যেভাবে এই আয়াতে বলা হচ্ছে, তাহলে অতি সহজেই সেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

[3] মাতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা বা কষ্ট দেওয়া যেমন, মা শিশুকে নিজের কাছে রাখতে চায়, কিন্তু মায়ের মমতার কোন পরোয়া না করে শিশুকে জোর করে তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া অথবা তার কোন ব্যয়ভার বহন না করে তাকে দুধ পান করাতে বাধ্য করা। আর পিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা বা কষ্ট দেওয়া যেমন, মায়ের দুধ পান করাতে অস্বীকার করা কিংবা তার (শিশুর পিতার) কাছ থেকে তার সাধ্যের বাইরে খরচ কামনা করা।

[4] (শিশুর) পিতার মৃত্যু হয়ে গেলে তার উত্তরাধিকারীরা এই দায়িত্ব গ্রহণ করে মায়ের অধিকার সঠিকভাবে আদায় করবে, যাতে না মায়ের কোন কষ্ট হয়, আর না শিশুর লালন-পালনে কোন ব্যাঘাত ঘটে।

[5] শিশুর মা ব্যতীত অন্য মহিলা দিয়েও দুধ পান করানোর অনুমতি আছে। তবে শর্ত হল, প্রচলিত নিয়মানুযায়ী এই মহিলারও পারিশ্রমিক আদায় করে দিতে হবে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২৩৭ وَ اِنۡ طَلَّقۡتُمُوۡہُنَّ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ تَمَسُّوۡہُنَّ وَ قَدۡ فَرَضۡتُمۡ لَہُنَّ فَرِیۡضَۃً فَنِصۡفُ مَا فَرَضۡتُمۡ اِلَّاۤ اَنۡ یَّعۡفُوۡنَ اَوۡ یَعۡفُوَا الَّذِیۡ بِیَدِہٖ عُقۡدَۃُ النِّکَاحِ ؕ وَ اَنۡ تَعۡفُوۡۤا اَقۡرَبُ لِلتَّقۡوٰی ؕ وَ لَا تَنۡسَوُا الۡفَضۡلَ بَیۡنَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ﴿۲۳۷﴾

আর যদি তোমরা তাদেরকে তালাক দাও, তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে এবং তাদের জন্য কিছু মোহর নির্ধারণ করে থাক, তাহলে যা নির্ধারণ করেছ, তার অর্ধেক (দিয়ে দাও)। তবে স্ত্রীরা যদি মাফ করে দেয়, কিংবা যার হাতে বিবাহের বন্ধন সে যদি মাফ করে দেয়। আর তোমাদের মাফ করে দেয়া তাকওয়ার অধিক নিকটতর। আর তোমরা পরস্পরের মধ্যে অনুগ্রহ ভুলে যেয়ো না। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

যদি তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দাও, অথচ তাদের মহর ধার্য করা হয়, সে অবস্থায় ধার্যকৃত মহরের অর্ধেক, কিন্তু যদি স্ত্রীরা দাবী মাফ করে দেয় কিংবা যার হাতে বিয়ের বন্ধন আছে সে মাফ করে দেয়, বস্তুতঃ ক্ষমা করাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী এবং তোমরা পারস্পরিক সহায়তা হতে বিমুখ হয়ো না, যা কিছু তোমরা করছ আল্লাহ নিশ্চয়ই তার সম্যক দ্রষ্টা। তাইসিরুল

আর তোমরা যদি তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বেই তালাক প্রদান কর এবং তাদের মোহর নির্ধারণ করে থাক তাহলে যা নির্ধারণ করেছিলে তার অর্ধেক দিয়ে দাও; কিন্তু যদি তারা ক্ষমা করে কিংবা যার হাতে বিবাহ বন্ধন সে ক্ষমা করে তাহলে তা স্বতন্ত্র কথা; অথবা তোমরা পুরুষরা যদি ক্ষমা কর তাহলে এটা পরহেজগারীর অতি নিকটবর্তী; এবং পরস্পরের উপকারকে যেন ভুলে যেওনা; তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ তা প্রত্যক্ষকারী। মুজিবুর রহমান

And if you divorce them before you have touched them and you have already specified for them an obligation, then [give] half of what you specified - unless they forego the right or the one in whose hand is the marriage contract foregoes it. And to forego it is nearer to righteousness. And do not forget graciousness between you. Indeed Allah, of whatever you do, is Seeing. Sahih International

২৩৭. আর তোমরা যদি তাদেরকে স্পর্শ করার আগে তালাক দাও, অথচ তাদের জন্য মাহর ধার্য করে থাক, তাহলে যা তোমরা ধার্য করেছ তার অর্ধেক(১), তবে যা স্ত্রীগণ অথবা যার হাতে বিয়ের বন্ধন রয়েছে সে মাফ করে দেয়(২) এবং মাফ করে দেয়াই তাকওয়ার নিকটতর। আর তোমরা নিজেদের মধ্যে অনুগ্রহের কথা ভুলে যেও না। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ তা সবিশেষ প্রত্যক্ষকারী।

(১) মাহর ও স্ত্রীর সাথে নির্জনবাস ও সহবাসের প্রেক্ষিতে তালাকের চারটি অবস্থা নির্ধারিত হয়েছে। তন্মধ্যে ২৩৬ ও ২৩৭ নং আয়াতে দু'টি অবস্থার হুকুম বর্ণিত হয়েছে। তার একটি হচ্ছে, যদি মাহর ধার্য করা না হয়। দ্বিতীয়টি, মাহর ধার্য করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্ত্রীর সাথে নির্জনবাস বা সহবাস হয়নি। তৃতীয়তঃ মাহর ধার্য হয়েছে এবং সহবাসও হয়েছে। এক্ষেত্রে ধার্যকৃত মোহর সম্পূর্ণই পরিশোধ করতে হবে। কুরআনুল কারীমের অন্য জায়গায় এ বিষয়টি বর্ণিত রয়েছে। চতুর্থতঃ মাহর ধার্য করা হয়নি, অথচ সহবাসের পর তালাক দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে স্ত্রীর পরিবারে প্রচলিত মাহর পরিশোধ করতে হবে। এর বর্ণনাও অন্য এক আয়াতে এসেছে। ২৩৬ ও ২৩৭ নং আয়াতদ্বয়ে প্রথম দুই অবস্থার আলোচনা রয়েছে। তন্মধ্যে ২৩৬ নং আয়াতে প্রথম অবস্থার নির্দেশ হচ্ছে, মাহর কিছুই ওয়াজিব নয়।

তবে নিজের পক্ষ থেকে স্ত্রীকে কিছু দিয়ে দেয়া স্বামীর কর্তব্য। অন্ততপক্ষে তাকে এক জোড়া কাপড় দিয়ে দেবে। কুরআনুল কারীম প্রকৃতপক্ষে এর কোন পরিমাণ নির্ধারণ করেনি। অবশ্য এ কথা বলেছে যে, ধনী ব্যক্তিদের পক্ষে তাদের মর্যাদা অনুযায়ী দেয়া উচিত, যাতে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হয় যে, সামর্থ্যবান লোক এহেন ব্যাপারে কার্পণ্য করে না। হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু এমনি এক ব্যাপারে দশ হাজারের উপঢৌকন দিয়েছিলেন। আর কাজী শোরাইহ পাঁচশ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) দিয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থায় হুকুম হচ্ছে এই যে, যদি স্ত্রীর মাহর বিয়ের সময় ধার্য করা হয়ে থাকে এবং তাকে সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হয়, তবে ধার্যকৃত মাহরের অর্ধেক দিতে হবে। আর যদি স্ত্রী তা ক্ষমা করে দেয় কিংবা স্বামী পুরো মাহরই দিয়ে দেয়, তবে তা হচ্ছে তাদের ঐচ্ছিক ব্যাপার।


(২) “যার হাতে বিয়ের বন্ধন রয়েছে”-এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় আলেমগণ দুটি মতে বিভক্ত- (১) একদল আলেম বলেনঃ এখানে “যার হাতে বিয়ের বন্ধন রয়েছে” বলতে স্ত্রীর অভিভাবককে বোঝানো হয়েছে। তাদের মতের সমর্থনে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এ তাফসীর বর্ণনা করা হয়ে থাকে। এ মত একদিকে শক্তিশালী, অপরদিকে দূর্বল, শক্তিশালী হলো এদিক থেকে যে, ক্ষমা করাটা মূলতঃ স্ত্রীর অভিভাবকের পক্ষেই মানানসই। অপরদিকে দূর্বল হলো এ দিক থেকে যে, সত্যিকারভাবে বিয়ের বন্ধন স্বামীর হাতেই। স্ত্রীর অভিভাবকের এখানে কোন হাত নেই। (২) আরেক দল আলেম বলেনঃ এখানে “যার হাতে বিয়ের বন্ধন” বলতে স্বামীকে বোঝানো হয়েছে। তাদের মতের সমর্থনেও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ সনদে বর্ণনা রয়েছে। তাছাড়া ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমসহ অন্যান্য সাহাবী ও তাবেয়ীনদের থেকে বর্ণনা এসেছে। [দারাকুতনী: ৩/২৭৯]

এ মতও একদিক থেকে শক্তিশালী, অপরদিক থেকে দূর্বল। শক্তিশালী হলো এদিক থেকে যে, মূলতঃ যার হাতে বিয়ের বন্ধন, সে হলো স্বামী। আর দূর্বল হলো এদিক থেকে যে, যদি স্বামী উদ্দেশ্য হয় তবে ক্ষমা কিভাবে করা হবে? মাহর দেয়া তো তার উপর ওয়াজিব। সে কিভাবে ক্ষমা করতে পারে? তবে ইবন জারীর রাহিমাহুল্লাহ এ মতের সমর্থন করেছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে- ক) স্বামীর হাতেই মূলতঃ বিয়ের বন্ধন। স্ত্রীর অভিভাবকের হাতে নেই। খ) স্বামীর পক্ষ থেকে ক্ষমার অর্থ হলো এই যে, তারা পূর্বকালে পূর্ণ মাহর আদায় করেই বিয়ে করত, তারপর বিয়ে ভঙ্গ হলে স্বামী বাকী অর্ধেক মাহর ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমার দৃষ্টান্ত দেখাতো।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৩৭) যদি স্পর্শ করার পূর্বে স্ত্রীদের তালাক দাও, অথচ মোহর পূর্বেই ধার্য করে থাক, তাহলে নির্দিষ্ট মোহরের অর্ধেক আদায় করতে হবে।[1] কিন্তু যদি স্ত্রী অথবা যার হাতে বিবাহ-বন্ধন[2] সে যদি মাফ করে দেয়, (তাহলে স্বতন্ত্র কথা।) অবশ্য তোমাদের মাফ করে দেওয়াই আত্মসংযমের নিকটতর। তোমরা নিজেদের মধ্যে সহানুভূতি (ও মর্যাদার) কথা বিস্মৃত হয়ো না। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।

[1] এখানে আর এক নিয়মের কথা বলা হচ্ছে, সহবাসের পূর্বে তালাক দিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মোহর নির্ধারিত ছিল। এমতাবস্থায় স্বামীর জন্য জরুরী হল অর্ধেক মোহর আদায় করা। কিন্তু স্ত্রী যদি তার মোহরের অধিকার মাফ করে দেয়, তাহলে স্বামীকে কিছুই দিতে হবে না।

[2] এ থেকে স্বামীকে বুঝানো হয়েছে। কারণ, বিবাহের বন্ধন (অটুট রাখা না রাখার এখতিয়ার) তার হাতেই। সে অর্ধেক মোহর মাফ করে দেয়। অর্থাৎ, আদায়কৃত মোহর থেকে অর্ধেক মোহর ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে নিজের এ অধিকার (অর্ধেক মোহর) মাফ করে দিয়ে সম্পূর্ণ মোহর স্ত্রীকে দিয়ে দেয়। এরপর পারস্পরিক সহানুভূতি ও অনুগ্রহের কথা বিস্মৃত না হওয়ার তাকীদ করে মোহরের অধিকারেও এই সহানুভূতি ও অনুগ্রহ প্রদর্শনের উপর অনুপ্রাণিত করা হয়েছে।

দ্রষ্টব্যঃ কেউ কেউ {بِيَدِهِ عُقْدَةُ النِّكَاحِ} (যার হাতে বিবাহ-বন্ধন) থেকে মহিলার অভিভাবককে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, মহিলা নিজে মাফ করে দিক অথবা তার অভিভাবক মাফ করে দিক। কিন্তু এ অর্থ সঠিক নয়। কারণ, প্রথমতঃ অভিভাবকের হাতে বিবাহের বন্ধন নেই। দ্বিতীয়তঃ মোহর মহিলার নিজসব অধিকার ও তার ব্যক্তিগত সম্পদ, তাই এটা মাফ করার অধিকার অভিভাবকের নেই। সুতরাং পূর্বের অর্থই সঠিক। (ফাতহুল ক্বাদীর)

জরুরী বিশ্লেষণঃ তালাকপ্রাপ্তা মহিলারা চার ধরনের। (ক) যার মোহর নির্ধারিত, স্বামী তার সাথে সহবাসও করেছে, তাকে তার মোহরের সম্পূর্ণ অধিকার দেওয়া হবে। যেমন, ২২৯নং আয়াতে এর বর্ণনা রয়েছে। (খ) মোহরও নির্ধারিত নেই এবং তার সাথে সহবাসও করা হয়নি, তাকে কেবল কিছু খরচপত্র দেওয়া হবে। (গ) মোহর নির্ধারিত, কিন্তু সহবাস হয়নি, তাকে অর্ধেক মোহর দেওয়া জরুরী। (উভয়ের ব্যাখ্যা ২৩৬-২৩৭ নং আয়াতে বিদ্যমান।) (ঘ) মোহর নির্ধারিত নেই, কিন্তু সহবাস করা হয়েছে, তার জন্য রয়েছে মোহরে মিসল। অর্থাৎ, এই মহিলার সমাজে যে পরিমাণ মোহরের প্রচলন আছে অথবা তার মত মহিলাদের সাধারণতঃ যে পরিমাণ মোহর দেওয়া হয়, তাকেও সে পরিমাণ মোহর দিতে হবে। (নাইনুল আওত্বার ও আ’উনুল মা’বুদ)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২৬৫ وَ مَثَلُ الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمُ ابۡتِغَآءَ مَرۡضَاتِ اللّٰہِ وَ تَثۡبِیۡتًا مِّنۡ اَنۡفُسِہِمۡ کَمَثَلِ جَنَّۃٍۭ بِرَبۡوَۃٍ اَصَابَہَا وَابِلٌ فَاٰتَتۡ اُکُلَہَا ضِعۡفَیۡنِ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ یُصِبۡہَا وَابِلٌ فَطَلٌّ ؕ وَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ﴿۲۶۵﴾

আর যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও নিজদেরকে সুদৃঢ় রাখার লক্ষ্যে সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা উঁচু ভূমিতে অবস্থিত বাগানের মত, যাতে পড়েছে প্রবল বৃষ্টি। ফলে তা দ্বিগুণ ফল-ফলাদি উৎপন্ন করেছে। আর যদি তাতে প্রবল বৃষ্টি নাও পড়ে, তবে হালকা বৃষ্টি (যথেষ্ট)। আর আল্লাহ তোমরা যা আমল কর, সে ব্যাপারে সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি সাধন ও নিজেদের মনে (ঈমানের) দৃঢ়তা সৃষ্টির উদ্দেশে নিজেদের ধন ব্যয় করে থাকে তাদের তুলনা সেই বাগানের ন্যায় যা উচ্চভূমিতে অবস্থিত, তাতে মুষলধারে বৃষ্টিপাতের ফলে দ্বিগুণ ফল ধরে, যদি তাতে বৃষ্টিপাত নাও হয়, তবে শিশির বিন্দুই যথেষ্ট, তোমরা যা কিছুই কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। তাইসিরুল

এবং যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি সাধন ও স্বীয় জীবনের প্রতিষ্ঠার জন্য ধন সম্পদ ব্যয় করে তাদের উপমা - যেমন উর্বর ভূভাগে অবস্থিত একটি উদ্যান, তাতে প্রবল বৃষ্টিধারা পতিত হয়, ফলে সেই উদ্যান দ্বিগুণ খাদ্যশস্য দান করে; কিন্তু যদি তাতে বৃষ্টিপাত না হয় তাহলে শিশিরই যথেষ্ট এবং তোমরা যা করছ আল্লাহ তা প্রত্যক্ষকারী। মুজিবুর রহমান

And the example of those who spend their wealth seeking means to the approval of Allah and assuring [reward for] themselves is like a garden on high ground which is hit by a downpour - so it yields its fruits in double. And [even] if it is not hit by a downpour, then a drizzle [is sufficient]. And Allah, of what you do, is Seeing. Sahih International

২৬৫. আর যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ও নিজেদের আত্মা বলিষ্ঠ করার করার জন্য ধন-সম্পদ ব্যয় করে তাদের উপমা কোন উচ্চ ভূমিতে অবস্থিত একটি উদ্যান, যেখানে মুষলধারে বৃষ্টি হয়, ফলে সেথায় ফলমূল জন্মে দ্বিগুন। আর যদি মুষলধারে বৃষ্টি নাও হয় তবে লঘু বৃষ্টিই যথেষ্ট। আর তোমরা যা কর আল্লাহ তা যথার্থ প্রত্যক্ষকারী(১)।

(১) এ আয়াতে গ্রহণযোগ্য দান-সদকার একটি উদাহরণ বর্ণিত হয়েছে। যারা স্বীয় ধন-সম্পদকে মনের দৃঢ়তা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়্যতে ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ কোন টিলায় অবস্থিত বাগানের মত। প্রবল বৃষ্টিপাত না হলেও হালকা বারিবর্ষণই যার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে খুবই পরিজ্ঞাত। এ উদাহরণের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, খাঁটি নিয়্যত ও উপরোক্ত শর্তাবলীর প্রতি লক্ষ্য রেখে আল্লাহর পথে ব্যয় করার ফযীলত অনেক। সৎনিয়্যত ও আন্তরিকতার সাথে অল্প ব্যয় করলেও তা যথেষ্ট এবং আখেরাতের সাফল্যের কারণ।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৬৫) পক্ষান্তরে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং নিজের হৃদয়কে শক্তিশালী করার জন্য তাদের ধন দান করে, তাদের উপমা কোন উঁচু ভূমিতে অবস্থিত একটি বাগান, [1] যাতে মুষলধারে বৃষ্টি হয়, ফলে তার ফল-মূল দ্বিগুণ জন্মে। যদি মুষলধারে বৃষ্টি নাও হয়, তবে হাল্কা বৃষ্টিই যথেষ্ট। বস্তুতঃ তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।

[1] এটা সেই ঈমানদারদের দৃষ্টান্ত, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দান করে থাকে। তাদের দানকৃত সম্পদ সেই বাগানের মত, যা কোন উঁচু জায়গায় অবস্থিত, তাতে প্রবল বৃষ্টি হলে দ্বিগুণ ফসল দেয়। আর প্রবল বৃষ্টি না হলেও হাল্কা বর্ষণ এবং শিশিরও তার জন্য যথেষ্ট হয়। অনুরূপ তাদের সাদাকা-খয়রাত যতই কম হোক না কেন আল্লাহর নিকট তা কয়েক গুণ প্রতিদান ও নেকীর কারণ হবে। ‘জান্নাত’ বা বাগান এমন ভূমিকে বলা হয়, যাতে এত সংখ্যায় বৃক্ষাদি থাকে যে তা পুরো ভূমিকে ঢেকে নেয়। অথবা ‘জান্নাত’ এমন বাগান যার চতুর্দিক এমনভাবে ঘেরা-বেড়া থাকে যে, তার ফলে বাগান দৃষ্টিগোচর হয় না। جَنَّة জান্নাত শব্দটি جنّ ধাতু থেকে গঠিত, (যার অর্থ ঢাকা বা অদৃশ্য হওয়া)। এ জন্যই জ্বিন এমন সৃষ্টির নাম যা দেখা যায় না। পেটের শিশুকেও ‘জানীন’ বলা হয় কারণ তাও দেখা যায় না। পাগলামিকে ‘জুনুন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়, কারণ তার বুদ্ধির উপর পর্দা পড়ে যায়। আর জান্নাতকেও এই জন্যই জান্নাত বলা হয় যে তা রয়েছে দৃষ্টির অগোচরে। رَبوَة উঁচু ভূমিকে বলে। আর وَابِل অর্থ প্রবল বৃষ্টি।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৪ زُیِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّہَوٰتِ مِنَ النِّسَآءِ وَ الۡبَنِیۡنَ وَ الۡقَنَاطِیۡرِ الۡمُقَنۡطَرَۃِ مِنَ الذَّہَبِ وَ الۡفِضَّۃِ وَ الۡخَیۡلِ الۡمُسَوَّمَۃِ وَ الۡاَنۡعَامِ وَ الۡحَرۡثِ ؕ ذٰلِکَ مَتَاعُ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَ اللّٰہُ عِنۡدَہٗ حُسۡنُ الۡمَاٰبِ ﴿۱۴﴾

মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালবাসা- নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চি‎‎হ্নত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী। আর আল্লাহ, তাঁর নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল। আল-বায়ান

মানুষের কাছে সুশোভিত করা হয়েছে নারী, সন্তান, স্ত্তপীকৃত স্বর্ণ ও রৌপ্যভান্ডার, চিহ্নযুক্ত অশ্বরাজি, গৃহপালিত পশু এবং শস্যক্ষেত্র, এসব পার্থিব জীবনের সম্পদ, আর আল্লাহ -তাঁরই নিকট রয়েছে উত্তম আশ্রয়স্থল। তাইসিরুল

মানবমন্ডলীকে রমণী, সন্তান-সন্ততি, পুঞ্জীকৃত স্বর্ণ ও রৌপ্যভান্ডার, সুশিক্ষিত অশ্ব ও পালিত পশু এবং শস্য ক্ষেত্রের আকর্ষণীয় বস্ত্ত দ্বারা সুশোভিত করা হয়েছে, এটা পার্থিব জীবনের সম্পদ এবং আল্লাহর নিকট রয়েছে শ্রেষ্ঠতম অবস্থান। মুজিবুর রহমান

Beautified for people is the love of that which they desire - of women and sons, heaped-up sums of gold and silver, fine branded horses, and cattle and tilled land. That is the enjoyment of worldly life, but Allah has with Him the best return. Sahih International

১৪. নারী, সন্তান, সোনারূপার স্তুপ, বাছাই করা ঘোড়া, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট সুশোভিত করা হয়েছে। এসব দুনিয়ার জীবনের ভোগ্য বস্তু।(১) আর আল্লাহ্, তাঁরই নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।

(১) আয়াতের সারমর্ম এই যে, আল্লাহ তা'আলা মানুষের মনে এসব বস্তুর প্রতি স্বভাবগতভাবেই আকর্ষণ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা নেয়া হয়ে থাকে যে, কে এগুলোর আকর্ষণে মত্ত হয়ে আখেরাতকে ভুলে যায় এবং কে এসবের আসল স্বরূপ ও ধ্বংসশীল হওয়ার বিষয় অবগত হয়ে শুধু যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু অর্জনে সচেষ্ট হয় ও আখেরাতের কল্যাণ আহরণের লক্ষ্যে তার সুচারু ব্যবহার করে। আল্লাহ্ তা'আলা যেসব বস্তুকে মানুষের দৃষ্টিতে সুশোভিত করে দিয়েছেন, শরীয়ত অনুযায়ী সেগুলো পরিমিত উপার্জন করলে এবং যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু সঞ্চয় করলে দুনিয়া ও আখেরাতের কামিয়াবী হাসিল হবে।

পক্ষান্তরে অবৈধ পন্থায় সেগুলো ব্যবহার করলে অথবা বৈধ পন্থায় হলেও এগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত নিমজ্জিত হয়ে আখেরাত বিস্মৃত হয়ে গেলে ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়বে। [সা’দী] অর্থাৎ এসব হচ্ছে পার্থিব জীবনে ব্যবহার করার জন্য; মন বসাবার জন্য নয়। আর আল্লাহর কাছে রয়েছে উত্তম ঠিকানা। সেখানে চিরকাল থাকতে হবে এবং যার নেয়ামত ধ্বংস হবে না, হ্রাসও পাবে না। আখেরাতে আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনের জন্য যে নেয়ামত রেখেছেন, তার তুলনা দুনিয়ার জীবনের সামগ্ৰীসমূহের কোন কিছু দিয়েই দেয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “দুনিয়া অভিশপ্ত এবং যা কিছু এতে আছে তা অভিশপ্ত। তবে যা আল্লাহর যিকর বা স্মরণে করা হয় ও তার সাথে সম্পৃক্ত হয় এবং দ্বীনী জ্ঞানে আলেম ও দ্বীনী জ্ঞান অর্জনকারী। [তিরমিযী: ২৩২২; ইবন মাজাহ: ৪১১২]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪) নারী, সন্তান-সন্ততি, জমাকৃত সোনা-রূপার ভান্ডার, পছন্দসই (চিহ্নিত) ঘোড়া, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামার প্রভৃতি কমনীয় জিনিসকে মানুষের নিকট শোভনীয় করা হয়েছে।[1] এ সব ইহজীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহর নিকটেই উত্তম আশ্রয়স্থল রয়েছে।

[1] ‘কমনীয় জিনিস’ বলতে এখানে এমন সব জিনিসকে বুঝানো হয়েছে, প্রাকৃতিকভাবে মানুষ যার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং যা পছন্দ করে। এই জন্যই তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং তা ভালবাসা অপছন্দনীয় নয়। তবে শর্ত হল তা মধ্যম পন্থায় এবং শরীয়তের গন্ডির ভিতর হতে হবে। আকর্ষণীয় এই সুশোভন আল্লাহর পক্ষ হতে মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। তিনি বলেন, ‘‘আমি পৃথিবীস্থ সব কিছুকে পৃথিবীর জন্য শোভা করেছি মানুষকে পরীক্ষার জন্য---।’’ (সূরা কাহ্ফ ৭ আয়াত) আলোচ্য আয়াতে কমনীয় জিনিসের মধ্যে সর্বপ্রথম মহিলার কথা উল্লেখ হয়েছে। কারণ, সাবালক হওয়ার পর প্রত্যেক মানুষের সব থেকে বেশী প্রয়োজন বোধ হয় একজন সঙ্গিনীর। তাছাড়া রমণী পুরুষের কাছে সর্বাধিক বেশী রমণীয় ও কমনীয়। স্বয়ং নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘‘মহিলা এবং সুগন্ধি আমার নিকট অতি প্রিয় জিনিস।’’ (মুসনাদে আহমাদ) অনুরূপ তিনি বলেছেন, ‘‘নারী হল দুনিয়ার সব চেয়ে উৎকৃষ্টমানের সামগ্রী।’’ সুতরাং যদি নারীর প্রতি ভালবাসা শরীয়তের সীমা অতিক্রম না করে, তাহলে তা হল উত্তম জীবন সঙ্গিনী এবং আখেরাতের সম্বলও। পক্ষান্তরে (এত প্রয়োজনীয় বলেই) এই নারীই হল দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা বড় ফিৎনা। রসূল (সাঃ) বলেন, ‘‘আমার পর যেসব ফিৎনা সংঘটিত হবে তার মধ্যে পুরুষদের জন্য সব থেকে বড় ক্ষতিকর ফিৎনা হবে নারী।’’ (বুখারী ৫০৯৬নং) পুত্র-সন্তানদের ব্যাপারটাও অনুরূপ। এ থেকে যদি উদ্দেশ্য মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি এবং বংশ বহাল ও বৃদ্ধি করা হয়, তবে তা প্রশংসনীয়; অন্যথা তা হবে নিন্দনীয়। রসূল (সাঃ) বলেন, ‘‘এমন নারীকে বিবাহ কর যে বেশী স্বামী-ভক্তা হবে এবং বেশী বেশী সন্তান প্রসব করবে। কারণ কিয়ামতের দিন আমার উম্মত বেশী হওয়ার জন্য আমি গর্ববোধ করব।’’ এই আয়াতে বৈরাগ্যবাদ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ বা পরিবার-পরিকল্পনার আন্দোলন খন্ডন করা হয়েছে। কেননা, আয়াতে ‘বানীন’ শব্দ বহুবচন। ধন-সম্পদ থেকেও উদ্দেশ্য যদি জীবন ধারণ করা, আত্মীয়দের সাহায্য করা, সাদাকা-খয়রাত করা এবং তা কল্যাণকর পথে ব্যয় করা ও পরের কাছে চাওয়া থেকে বাঁচা হয়, তাহলে তাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন এবং এই লক্ষ্যে তার (মালের) প্রতি ভালবাসাও হবে প্রশংসনীয়, অন্যথা তা হবে নিন্দনীয়। ঘোড়া থেকে উদ্দেশ্য হবে জিহাদের প্রস্তুতি। অন্যান্য পশু দ্বারা যদি লক্ষ্য হয় চাষাবাদ করা, বোঝা বহনের কাজ নেওয়া এবং জমি থেকে ফসলাদি উৎপন্ন করা, তাহলে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় কেবল দুনিয়া অর্জন এবং তা নিয়ে যদি গর্ব ও অহঙ্কার করে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন হয়ে সুখ-সবাচ্ছন্দ্যের জীবন নিয়েই মেতে থাকা হয়, তাহলে লাভদায়ক এই জিনিসগুলোই সর্বনাশের হেতু হবে। قَنَاطِيْرُ হল قِنْطَارٌ এর বহুবচন। অর্থ হল, ধন-ভান্ডার। অর্থাৎ, সোনা-রূপা এবং মাল-ধনের আধিক্য। المُسَوَّمَةِ এমন ঘোড়া যাকে চারণভূমিতে চরে খাওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে অথবা এমন ঘোড়া যাকে জেহাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে কিংবা এমন ঘোড়া যাকে অন্য থেকে পার্থক্য করার জন্য কোন কিছু দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর-ইবনে কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৫ قُلۡ اَؤُنَبِّئُکُمۡ بِخَیۡرٍ مِّنۡ ذٰلِکُمۡ ؕ لِلَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا عِنۡدَ رَبِّہِمۡ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا وَ اَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ وَّ رِضۡوَانٌ مِّنَ اللّٰہِ ؕ وَ اللّٰہُ بَصِیۡرٌۢ بِالۡعِبَادِ ﴿ۚ۱۵﴾

বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়েও উত্তম বস্তুর সংবাদ দেব? যারা তাকওয়া অর্জন করে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর পবিত্র স্ত্রীগণ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি’। আর আল্লাহ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

বল, আমি কি তোমাদেরকে এ সব হতেও অতি উত্তম কোন কিছুর সংবাদ দেব? যারা মুত্তাকী তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট এমন বাগান রয়েছে, যার নিম্নে নদী প্রবাহিত, তারা তাতে চিরকাল থাকবে আর রয়েছে পবিত্র সঙ্গী এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি, বস্তুতঃ আল্লাহ বান্দাগণের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। তাইসিরুল

তুমি বলঃ আমি কি তোমাদেরকে এটা অপেক্ষাও উত্তম বিষয়ের সংবাদ দিব? যারা ধর্মভীরু তাদের জন্য তাদের রবের নিকট জান্নাত রয়েছে যার তলদেশে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিতা, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে এবং সেখানে শুদ্ধা সহধর্মিনীগণ ও আল্লাহর প্রসন্নতা রয়েছে এবং আল্লাহ বান্দাদের প্রতি লক্ষ্যকারী। মুজিবুর রহমান

Say, "Shall I inform you of [something] better than that? For those who fear Allah will be gardens in the presence of their Lord beneath which rivers flow, wherein they abide eternally, and purified spouses and approval from Allah. And Allah is Seeing of [His] servants - Sahih International

১৫. বলুন, আমি কি তোমাদেরকে এসব বস্তু থেকে উৎকৃষ্টতর কোন কিছুর সংবাদ দেব? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর পবিত্র স্ত্রীগণ এবং আল্লাহর নিকট থেকে সন্তুষ্টি(১)। আর আল্লাহ্‌ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।

(১) আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাতবাসীদেরকে বলবেন, হে জান্নাতবাসী! তখন তারা বলবে, আমরা হাজির, তখন তিনি বলবেনঃ তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছ? তারা বলবে, আমরা কেন সন্তুষ্ট হব না অথচ আপনি আমাদেরকে এমন কিছু দান করেছেন যা আর কোন সৃষ্টিকে দান করেননি। তখন তিনি বলবেনঃ আমি তোমাদেরকে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিছু দান করব। তারা বলবে, হে রব! এর চেয়ে উত্তম আর কি হতে পারে? তিনি বলবেন; আমি তোমাদের উপর আমার সন্তুষ্টি অবতরণ করাব, এর পর আমি আর কখনও তোমাদের উপর ক্রোধাম্বিত হব না।” [বুখারী: ৬৫৪৯, মুসলিম: ২৮২৯]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৫) বল, আমি কি তোমাদেরকে এ সব বস্তু হতে উৎকৃষ্ট কোন কিছুর সংবাদ দেব? যারা সাবধান (পরহেযগার) হয়ে চলে তাদের জন্য রয়েছে উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে,[1] তাদের জন্য পবিত্রা সঙ্গিনীগণ [2] এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে। বস্তুতঃ আল্লাহ তার দাসদের সম্বন্ধে সম্যক অবহিত।

[1] এই আয়াতে ঈমানদারদেরকে হুঁশিয়ার করা হচ্ছে যে, উল্লিখিত পার্থিব জিনিসেই তোমরা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলো না, বরং এর চেয়ে উত্তম হল সেই জীবন ও সেই নিয়ামত, যা রয়েছে প্রতিপালকের কাছে এবং যার অধিকারী হবে কেবল আল্লাহভীরু লোকেরা। অতএব তোমরা আল্লাহভীরুতা অবলম্বন করো। এই আল্লাহভীরুতার গুণ তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়ে গেলে, নিশ্চিতভাবে তোমরা দ্বীন ও দুনিয়ার সমূহ কল্যাণ দ্বারা নিজেদের ঝুলি ভরে নিবে।

[2] পবিত্রা সঙ্গিনীগণঃ অর্থাৎ, তারা পার্থিব নোংরামী, হায়েয-নিফাস এবং অন্যান্য অপবিত্রতা থেকে পবিত্রা এবং নির্মলচরিত্রা হবে। এর পরের দু’টি আয়াতে আল্লাহভীরু লোকদের গুণাবলীর কথা উল্লেখ হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৯ اِنَّ الدِّیۡنَ عِنۡدَ اللّٰہِ الۡاِسۡلَامُ ۟ وَ مَا اخۡتَلَفَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ اِلَّا مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَہُمُ الۡعِلۡمُ بَغۡیًۢا بَیۡنَہُمۡ ؕ وَ مَنۡ یَّکۡفُرۡ بِاٰیٰتِ اللّٰہِ فَاِنَّ اللّٰہَ سَرِیۡعُ الۡحِسَابِ ﴿۱۹﴾

নিশ্চয় আল্লাহর নিকট দীন হচ্ছে ইসলাম। আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে, তাদের নিকট জ্ঞান আসার পরই তারা মতানৈক্য করেছে, পরস্পর বিদ্বেষবশত। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর আয়াতসমূহের সাথে কুফরী করে, নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে দ্রুত। আল-বায়ান

নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হল ইসলাম। বস্তুতঃ যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তারা জ্ঞান লাভের পর একে অন্যের উপর প্রাধান্য লাভের জন্য মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করবে, (সে জেনে নিক) নিশ্চয়ই আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অতিশয় তৎপর। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র ধর্ম। এবং যাদেরকে গ্রন্থ প্রদত্ত হয়েছে তাদের জ্ঞান আসার পরও তারা মতবিরোধে লিপ্ত রয়েছে শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষ বশতঃ; এবং যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করে নিশ্চয়ই আল্লাহ সত্ত্বর হিসাব গ্রহণকারী। মুজিবুর রহমান

Indeed, the religion in the sight of Allah is Islam. And those who were given the Scripture did not differ except after knowledge had come to them - out of jealous animosity between themselves. And whoever disbelieves in the verses of Allah, then indeed, Allah is swift in [taking] account. Sahih International

১৯. নিশ্চয় ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন।(১) আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তারা কেবলমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ তাদের নিকট জ্ঞান আসার মতানৈক্য ঘটিয়েছিল। আর কেউ আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহে কুফরী করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্‌ দ্রুত হিসাব গ্রহনকারী।

(১) সুদ্দী বলেন, আল্লাহর নিকট মনোনীত দ্বীন হচ্ছে ইসলাম। এটা পূর্ববর্তী আয়াতে বর্ণিত আল্লাহ, তার ফেরেশতা এবং জ্ঞানীদের সাক্ষ্যের বিষয়। অর্থাৎ তারা এ সাক্ষ্যও দিচ্ছেন যে, আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হচ্ছে ইসলাম। [তাবারী] কাতাদা বলেন, ইসলাম হচ্ছে, আল্লাহ ব্যতীত হক্ক কোন মা’বুদ নেই এ সাক্ষ্য দেয়া, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছ থেকে যা নিয়ে এসেছেন তার সত্যতার স্বীকৃতি প্রদান। আর এটাই হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীন যা তিনি প্রবর্তন করেছেন, রাসূলদেরকে যা নিয়ে প্রেরণ করেছেন, তাঁর বন্ধুদেরকে যার দিশা দিয়েছেন। এটা ব্যতীত তিনি আর কিছু গ্রহণ করবেন না। এটা অনুপাতে না হলে তিনি কাউকে পুরস্কৃত করবেন না। [তাবারী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯) নিশ্চয় ইসলাম আল্লাহর নিকট (একমাত্র মনোনীত) ধর্ম।[1] যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তারা পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ তাদের নিকট জ্ঞান আসার পরও তাদের মধ্যে মতানৈক্য ঘটিয়েছিল![2] আর যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে[3] অস্বীকার করে (সে জেনে রাখুক যে), নিশ্চয় আল্লাহ সত্বর হিসাব গ্রহণকারী।

[1] ইসলাম সেই মনোনীত দ্বীন, যার প্রতি সকল নবীগণ সব সব যুগে আহবান করেছেন এবং যার শিক্ষা দিয়েছেন। আর এখন এই ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপ হল সেটাই, যা শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) বিশ্ববাসীর সামনে পেশ করেছেন। যাতে আছে যে, তাওহীদ, রিসালাত এবং আখেরাতের উপর ঐভাবেই ঈমান আনতে হবে ও বিশ্বাস করতে হবে, যেভাবে নবী করীম (সাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন। এখন কেবল আল্লাহকে এক মনে করে নিলেই অথবা কিছু সৎকর্ম করে নিলেই যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হবে এবং আখেরাতে মুক্তি পাওয়া যাবে তা নয়; বরং ঈমান, ইসলামের দাবী হল, আল্লাহকে এক মনে করে কেবল তাঁরই ইবাদত করা। মুহাম্মাদ (সাঃ) সহ সকল নবীদের উপর ঈমান আনা। নবী করীম (সাঃ)-এর পর আর কোন নবী আসবেন না, এ কথাও স্বীকার করে নেওয়া। আর এই ঈমানের সাথে সাথে সেই আকীদা ও আমলগুলো পালন করতে হবে, যেগুলো কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এখন আল্লাহর নিকট দ্বীনে-ইসলাম ব্যতীত আর কোন দ্বীন গৃহীত হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম অন্বেষণ করবে, তার পক্ষ হতে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না। আর সে হবে পরলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত।’’ (সূরা আলে ইমরান ৮৫ আয়াত) নবী করীম (সাঃ)-এর নবুঅত ও রিসালাত সমগ্র মানবতার জন্য। [قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا] ‘‘বলে দাও, হে মানবমন্ডলী! তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহর প্রেরিত রসূল।’’ (সূরা আ’রাফ ১৫৮ আয়াত) [تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا] ‘‘পরম বরকতময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন, যাতে সে সমগ্র বিশ্বের জন্য সতর্ককারী হয়।’’ (সূরা ফুরকান ১ আয়াত) হাদীসে রসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘‘সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ আছে! ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের যে কেউ আমার উপর ঈমান না এনেই মারা যাবে, সে জাহান্নামী হবে।’’ (সহীহ মুসলিম) তিনি আরো বলেন, ‘‘আমি সাদা-কালো সকলের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।’’ (অর্থাৎ, সকল মানুষের জন্য নবী হয়ে প্রেরিত হয়েছি।) আর এই কারণেই তিনি সেই সময়ের সমস্ত বাদশাহদের প্রতি পত্র প্রেরণ করে তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। (বুখারী, মুসলিম, ইবনে কাসীর)

[2] ‘মতানৈক্য’ বলতে তাদের পারস্পরিক এমন মতবিরোধ যা একই ধর্মের অনুসারীরা আপোসে বাধিয়ে রেখেছিল। যেমন, ইয়াহুদীদের পারস্পরিক মতবিরোধ এবং আপোসের বিচ্ছিন্নতা ও দলাদলি। অনুরূপ খ্রিষ্টানদের পারস্পরিক বিরোধিতা ও আপোসের বিচ্ছিন্নতা। তাছাড়া আহলে কিতাবদের পারস্পরিক মতবিরোধকেও বুঝানো হয়েছে। যে বিরোধ ও মতানৈক্যের কারণে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা একে অপরকে বলত, ‘‘কোন কিছুর উপর তোমাদের ভিত্তি নেই।’’ মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং ঈসা (আঃ)-এর নবুঅতকে নিয়ে যে বিরোধ, তাও এর অন্তর্ভুক্ত। আর এই সকল মতবিরোধ কোন দলীলের ভিত্তিতে ছিল না। কেবল হিংসা-বিদ্বেষ এবং শত্রুতার কারণে ছিল। অর্থাৎ, তারা সত্যকে জেনে ও চিনেছিল; কিন্তু তা সত্ত্বেও কেবল দুনিয়ার খেয়ালী স্বার্থের পিছনে পড়ে ভ্রান্তমূলক কথার উপরে কায়েম থাকত এবং সেটাকেই দ্বীন বুঝানোর চেষ্টা করত। যাতে তাদের নাকও যেন উঁচু থাকে এবং জনগণের মাঝে তাদের বিশ্বস্ততাও যেন প্রতিষ্ঠিত থাকে। পরিতাপের বিষয় যে, ইদানীং মুসলিম উলামাদের এক বিরাট সংখ্যক দল ঠিক এই ধরনেরই জঘন্য উদ্দেশ্য সাধনের তাকীদে তাদের মতনই ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করে চলেছে। আল্লাহ তাদেরকে ও আমাদেরকে হিদায়াত করুন। আমীন।

[3] এখানে ‘নিদর্শন’ বলতে সেই সব নিদর্শন, যা প্রমাণ করে যে, ইসলাম আল্লাহরই মনোনীত দ্বীন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:২০ فَاِنۡ حَآجُّوۡکَ فَقُلۡ اَسۡلَمۡتُ وَجۡہِیَ لِلّٰہِ وَ مَنِ اتَّبَعَنِ ؕ وَ قُلۡ لِّلَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ وَ الۡاُمِّیّٖنَ ءَاَسۡلَمۡتُمۡ ؕ فَاِنۡ اَسۡلَمُوۡا فَقَدِ اہۡتَدَوۡا ۚ وَ اِنۡ تَوَلَّوۡا فَاِنَّمَا عَلَیۡکَ الۡبَلٰغُ ؕ وَ اللّٰہُ بَصِیۡرٌۢ بِالۡعِبَادِ ﴿۲۰﴾

যদি তারা তোমার সাথে বিতর্ক করে, তবে তুমি বল, ‘আমি আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করলাম এবং আমার অনুসারীরাও’। আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং নিরক্ষরদেরকে বল, ‘তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করেছ’? তখন যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তারা অবশ্যই হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর যদি ফিরে যায়, তাহলে তোমার দায়িত্ব শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া। আর আল্লাহ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

অতঃপর যদি (আহলে কিতাব) তোমার সাথে তর্ক করে তবে বলে দাও, ‘আমি আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছি আর আমার অনুসারীগণও আত্মসমর্পণ করেছে এবং আহলে কিতাব ও উম্মীগণকে বল, ‘তোমরা কি আত্মসমর্পণ করেছ’? অতঃপর যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে নিশ্চয়ই তারা পথ পাবে আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তোমার দায়িত্ব শুধু প্রচার করা। আল্লাহ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। তাইসিরুল

অতঃপর যদি তারা তোমার সাথে কলহ করে তাহলে তুমি বলঃ আমি ও আমার অনুসারীগণ আল্লাহর উদ্দেশ্যে আত্মসমর্পণ করেছি এবং যাদেরকে গ্রন্থ প্রদত্ত হয়েছে ও যারা নিরক্ষর তাদেরকে বলঃ তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ? অতঃপর যদি তারা ‌আত্মসমর্পণ করে তাহলে নিশ্চয়ই তারা সুপথ পেয়ে যাবে, আর যদি ফিরে যায় তাহলে তোমার উপর দায়িত্ব হচ্ছে প্রচার করা মাত্র এবং আল্লাহ বান্দাদের প্রতি লক্ষ্যকারী। মুজিবুর রহমান

So if they argue with you, say, "I have submitted myself to Allah [in Islam], and [so have] those who follow me." And say to those who were given the Scripture and [to] the unlearned, "Have you submitted yourselves?" And if they submit [in Islam], they are rightly guided; but if they turn away - then upon you is only the [duty of] notification. And Allah is Seeing of [His] servants. Sahih International

২০. সুতরাং যদি তারা আপনার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে আপনি বলুন, আমি আল্লাহ্‌র নিকট আত্মসমর্পণ করছি এবং আমার অনুসারিগণও। আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে বলেন, তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ? যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে নিশ্চয় তারা হেদায়াত পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে তবে আপনার কর্তব্য শুধু প্রচার করা। আর আল্লাহ্‌ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।(১)

(১) আয়াতে বর্ণিত أَسْلَمْتُمْ শব্দটির মূল অর্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে ‘আত্মসমর্পণ করা’ অনুবাদ করা হয়েছে। এর আরেক অনুবাদ এভাবেও করা যায় যে, যদি তারা আপনার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে আপনি বলুন, আমি ইসলামকে কবুল করেছি এবং আমার অনুসারিগণও। এর মাধ্যমে অপরাপর ধর্মের অনুসারীরা মুসলিমদের ব্যাপারে হতাশ হয়ে যাবে যে, তাদেরকে আবার বিভ্রান্ত করার সুযোগ নেই। [সা’দী] আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে অর্থাৎ ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে ও নিরক্ষর অর্থাৎ মক্কার কুরাইশ ও তাদের অনুসারীদেরকে বলুন, ‘তোমরাও কি ইসলামকে গ্রহণ করে নিয়েছ? যদি তারা তোমরা যেভাবে ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছ সেভাবে ইসলামকে কবুল করে তবে নিশ্চয় তারা হেদায়াত পাবে এবং তারা তোমাদের ভাই-বন্ধুতে পরিণত হবে। আর যদি তারা ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তাদের পূর্ববর্তী ধর্ম নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, তবে আপনার কর্তব্য শুধু প্রচার করা। প্রচারের সওয়াব আপনি অবশ্যই পাবেন। তাদের উপরও আল্লাহর পক্ষ থেকে যাতে করে তাদের শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হয়। [সা'দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২০) অতঃপর যদি তারা তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে তুমি বল, ‘আমি ও আমার অনুসারিগণ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি।’ আর যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে[1] বল, ‘তোমরা কি আত্মসমর্পণ করেছ?’ সুতরাং যদি তারা আত্মসমর্পণ করে, তাহলে নিশ্চয় তারা সুপথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে তোমার কর্তব্য কেবল প্রচার করা। বস্তুতঃ আল্লাহ তার দাসদের সম্বন্ধে সম্যক অবহিত।

 [1] ‘নিরক্ষর’ বলতে আরবের মুশরিকদের বুঝানো হয়েছে। তারা আহলে কিতাবদের তুলনায় সাধারণভাবে নিরক্ষর ছিল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৫৬ یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَ قَالُوۡا لِاِخۡوَانِہِمۡ اِذَا ضَرَبُوۡا فِی الۡاَرۡضِ اَوۡ کَانُوۡا غُزًّی لَّوۡ کَانُوۡا عِنۡدَنَا مَا مَاتُوۡا وَ مَا قُتِلُوۡا ۚ لِیَجۡعَلَ اللّٰہُ ذٰلِکَ حَسۡرَۃً فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ ؕ وَ اللّٰہُ یُحۡیٖ وَ یُمِیۡتُ ؕ وَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ﴿۱۵۶﴾

হে মুমিনগণ, তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা কুফরী করেছে এবং তাদের ভাইদেরকে বলেছে- যখন তারা যমীনে সফরে বের হয়েছিল অথবা তারা ছিল যোদ্ধা (অতঃপর নিহত হয়েছিল)-‘যদি তারা আমাদের কাছে থাকত, তবে তারা মারা যেত না এবং তাদেরকে হত্যা করা হত না’। যাতে আল্লাহ তা তাদের অন্তরে আক্ষেপে পরিণত করেন এবং আল্লাহ জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

হে মু’মিনগণ! তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা কুফরী করে এবং তাদের ভাই-বন্ধুগণ যখন বিদেশে সফর করে কিংবা কোথাও যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাদের সম্বন্ধে বলে, ‘তারা আমাদের কাছে থাকলে মরত না, নিহতও হত না’। ফলে আল্লাহ এটিকে তাদের মনের অনুতাপে পরিণত করে দেন, বস্তুতঃ আল্লাহ্ই জীবিত করেন ও মৃত্যুদান করেন আর তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। তাইসিরুল

হে মু’মিনগণ! যারা অবিশ্বাস করেছে তোমরা তাদের মত হয়োনা; এবং যখন তাদের ভ্রাতৃগণ পৃথিবীতে কোন অভিযানে বের হয় অথবা যুদ্ধে নিহত হয় তখন তারা বলেঃ যদি ওরা আমাদের নিকট থাকতো তাহলে মৃত্যুমুখে পতিত হতনা অথবা নিহত হতনা; আল্লাহ এরূপে তাদের অন্তরে দুঃখ ও অনুতাপ সঞ্চার করেন, আল্লাহই জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন এবং তোমরা যা করছ তৎপ্রতি আল্লাহ লক্ষ্যকারী। মুজিবুর রহমান

O you who have believed, do not be like those who disbelieved and said about their brothers when they traveled through the land or went out to fight, "If they had been with us, they would not have died or have been killed," so Allah makes that [misconception] a regret within their hearts. And it is Allah who gives life and causes death, and Allah is Seeing of what you do. Sahih International

১৫৬. হে মুমিনগণ! তোমরা তাদের মত হয়ে না যারা কুফরী করে এবং তাদের ভাইয়েরা যখন দেশে দেশে সফর করে(১) বা যুদ্ধে লিপ্ত হয় তখন তাদের সম্পর্কে বলে, তারা যদি আমাদের কাছে থাকত তবে তারা মরতো না এবং নিহত হত না। ফলে আল্লাহ এটাকেই তাদের মনে দুঃখ ও চিন্তা সৃষ্টির কারণে পরিণত করেন; প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান, আর তোমরা যা কর আল্লাহ সেসবের সম্যক দ্রষ্টা।

(১) সুদ্দী বলেন, এখানে দেশে দেশে সফর করা বলে, ব্যবসা করা উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [ইবন আবী হাতেম] অর্থাৎ মুনাফিকদের যখন কোন লোক মারা যেত, তখন তারা বলত: যদি আমাদের কথা শুনতো এবং যুদ্ধে বের না হতো তবে তারা মারা যেতো না। বস্তুত মুনাফিকরা যুদ্ধের আগেই তাদের ভাইদেরকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিত। অন্য আয়াতে এসেছে, “যারা ঘরে বসে রইল এবং তাদের ভাইদেরকে বলল যে, তারা তাদের কথামত চললে নিহত হত না” [সূরা আলে ইমরান: ১৬৮] আরও এসেছে, “যারা পিছনে রয়ে গেল তারা আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে বসে থাকতেই আনন্দ বোধ করল এবং তাদের ধনসম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করা অপছন্দ করল এবং তারা বলল, গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না [সূরা আত-তাওবাহ ৮১] আরও এসেছে, “আল্লাহ অবশ্যই জানেন তোমাদের মধ্যে কারা বাধাদানকারী এবং কারা তাদের ভাইদেরকে বলে, আমাদের দিকে চলে এসো। তারা অল্পই যুদ্ধে যোগদান করে।” [সূরা আল-আহযাব: ১৮] আরও এসেছে, “তোমাদের মধ্যে এমন লোক আছে, যে গড়িমসি করবেই। তোমাদের কোন মুসীবত হলে সে বলবে, তাদের সংগে না থাকায় আল্লাহ আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।” [সূরা আন-নিসা: ৭২]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৫৬) হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা তাদের মত হয়ে যেয়ো না, যারা অবিশ্বাস করে এবং যখন তাদের ভ্রাতাগণ পৃথিবীতে বিচরণ করে অথবা যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখন তারা তাদের সম্পর্কে বলে, ‘তারা যদি আমাদের কাছে থাকত, তাহলে তারা মরত না এবং নিহত হত না।’[1] তা এ জন্য যে, যাতে আল্লাহ এটাকে তাদের মনস্তাপে পরিণত করেন।[2] বস্তুতঃ আল্লাহই জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।

[1] ঈমানদারদেরকে সেই বিভ্রান্তিকর আকীদা থেকে বিরত রাখা হচ্ছে, যা কাফের ও মুনাফিকরা পোষণ করত। কারণ, এই বিশ্বাসই হল ভীরুতার মূল কারণ। পক্ষান্তরে যখন এই বিশ্বাস জান্মাবে যে, জীবন ও মরণ আল্লাহর হাতে এবং মৃত্যুর একটি নির্দিষ্ট সময় আছে, তখন মানুষের মধ্যে সাহসিকতা এবং আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করার উৎসাহ সৃষ্টি হবে।

[2] যদি তারা যুদ্ধের ময়দানে না গিয়ে বাড়িতেই বসে থাকত, তাহলে মৃত্যুর কবলে পড়া থেকে বেঁচে যেত --এ রকম ভ্রান্ত আকীদা আন্তরিক অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, মৃত্যু তো সুদৃঢ় দুর্গের ভিতরেও আসে। মহান আল্লাহ বলেন, [أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكْكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ] ‘‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই, যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের ভিতরে অবস্থান কর তবুও।’’ (সূরা নিসা ৭৮ আয়াত) কাজেই এই অনুতাপ থেকে মুসলিমরাই রক্ষা পেতে পারে। কারণ, তাদের আকীদা সঠিক ও শুদ্ধ।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:৫৮ اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُکُمۡ اَنۡ تُؤَدُّوا الۡاَمٰنٰتِ اِلٰۤی اَہۡلِہَا ۙ وَ اِذَا حَکَمۡتُمۡ بَیۡنَ النَّاسِ اَنۡ تَحۡکُمُوۡا بِالۡعَدۡلِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ نِعِمَّا یَعِظُکُمۡ بِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ سَمِیۡعًۢا بَصِیۡرًا ﴿۵۸﴾

নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে তখন ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে কতইনা সুন্দর উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। আল-বায়ান

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, হকদারদের হক তাদের কাছে পৌঁছে দিতে। তোমরা যখন মানুষের মাঝে বিচার করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে কত উত্তম উপদেশই না দিচ্ছেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করছেন, গচ্ছিত বিষয় ওর অধিকারীকে অর্পণ কর; এবং যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার মীমাংসা কর তখন ন্যায় বিচার কর; অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম উপদেশ দান করছেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, পরিদর্শক। মুজিবুর রহমান

Indeed, Allah commands you to render trusts to whom they are due and when you judge between people to judge with justice. Excellent is that which Allah instructs you. Indeed, Allah is ever Hearing and Seeing. Sahih International

৫৮. নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত(১) তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে।(২) তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে(৩)। আল্লাহ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন তা কত উৎকৃষ্ট(৪)! নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা।(৫)

(১) আলোচ্য আয়াতগুলোর মধ্যে প্রথম আয়াতটি নাযিল হওয়ার একটি বিশেষ ঘটনা রয়েছে। তা হল এই যে, ইসলাম-পূর্বকালেও কা'বা ঘরের সেবা করাকে এক বিশেয মর্যাদার কাজ মনে করা হত। কাবার কোন বিশেষ খেদমতের জন্য যারা নির্বাচিত হত, তারা গোটা সমাজ তথা জাতির মাঝে সম্মানিত ও বিশিষ্ট বলে পরিগণিত হত। সে জন্যই বায়তুল্লাহর বিশেষ খেদমত বিভিন্ন লোকের মাঝে ভাগ করে দেয়। হত। জাহেলিয়াত আমল থেকেই হজের মওসুমে হাজীদেরকে যমযম কূপের পানি পান করানোর সেবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতৃব্য আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর উপর ন্যস্ত ছিল। একে বলা হত ‘সিকায়া’।

অনুরূপই কাবা ঘরের চাবি নিজের কাছে রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে তা খুলে দেয়া ও বন্ধ করার ভার ছিল উসমান ইবন তালহার উপর। এ ব্যাপারে স্বয়ং উসমান ইবন তালহার ভাষ্য হল এই যে, জাহেলিয়াত আমলে আমরা সোমবার ও বৃহস্পতিবার দিন বায়তুল্লাহর দরজা খুলে দিতাম এবং মানুষ তাতে প্রবেশ লাভের সৌভাগ্য অর্জন করত। হিজরতের পূর্বে একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় সাহাবীসহ বায়তুল্লাহর উদ্দেশ্যে গেলে উসমান (যিনি তখনো পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি) তাকে ভিতরে প্রবেশ করতে বাধা দিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত ধৈর্য ও গাম্ভীর্য সহকারে উসমানের কটুক্তিসমূহ সহ্য করে নিলেন।

অতঃপর বললেন, হে উসমান হয়ত তুমি এক সময় বায়তুল্লাহর এই চাবি আমার হাতেই দেখতে পাবে। তখন যাকে ইচ্ছা এই চাবি অর্পণ করার অধিকার আমারই থাকবে। উসমান ইবন তালহা বলল, তাই যদি হয়, তবে সেদিন কুরাইশরা অপমানিত অপদস্থ হয়ে পড়বে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, তা নয়। তখন কুরাইশরা আযাদ হবে, তারা হবে যথার্থ সম্মানে সম্মানিত। এ কথা বলতে বলতে তিনি বায়তুল্লাহর ভিতরে প্রবেশ করলেন।

(উসমান বললেন) তারপর আমি যখন আমার মনের ভিতর অনুসন্ধান করলাম, তখন আমার যেন নিশ্চিত বিশ্বাস হয়ে গেল যে, তিনি যা কিছু বললেন, তা অবশ্যই ঘটবে। সে মুহুর্তেই আমি মুসলিম হয়ে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে নিলাম। কিন্তু আমি আমার সম্প্রদায়ের মতিগতি পরিবর্তিত দেখতে পেলাম। তারা আমাকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করতে লাগল। কাজেই আমি আর আমার (মুসলিম হওয়ার) সংকল্প বাস্তবায়িত করতে পারলাম না। অতঃপর মক্কা বিজিত হয়ে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে বায়তুল্লাহর চাবি চাইলেন। আমি তা পেশ করে দিলাম। তখন তিনি পুনরায় আমার হাতেই সে চাবি ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ এই নাও, এখন থেকে এ চাবি কেয়ামত পর্যন্ত তোমার বংশধরদের হাতেই থাকবে। অন্য যে কেউ তোমাদের হাত থেকে ফিরিয়ে নিতে চাইবে, সে হবে যালেম, অত্যাচারী। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তোমাদের হাত থেকে এ চাবি ফিরিয়ে নেবার কোন অধিকার কারোরই থাকবে না। [দেখুন- তাবারানী ১১/১২০]

আয়াতের সারমর্ম হচ্ছে এই যে, যার দায়িত্বে কোন আমানত থাকবে, সে আমানত প্রাপককে পৌছে দেয়া তার একান্ত কর্তব্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমানত প্রত্যপণের ব্যাপারে বিশেষ তাকীদ প্রদান করেছেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এমন খুব কম হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন ভাষণ দিয়েছেন অথচ তাতে একথা বলেননি – ‘যার মধ্যে আমানতদারী নেই তার মধ্যে ঈমান নেই। আর যার মধ্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষার নিয়মানুবর্তিতা নেই, তার দ্বীন নেই’। [মুসনাদে আহমাদ ৩/১৩৫] তাছাড়া আমানতদারী না থাকা মুনাফেকীর একটি আলামত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন মুনাফেকীর লক্ষণসমূহ বর্ণনা প্রসঙ্গে একটি লক্ষণ এটাও বলেছিলেন যে, যখন তার কাছে কোন আমানত রাখা হয় তখন সে তাতে খেয়ানত করে। [বুখারী ৩৩; মুসলিম: ৫৯]


(২) এখানে লক্ষণীয় যে, কুরআনুল কারীম আমানতের বিষয়টিকে أَمَانَات বহুবচনে উল্লেখ করেছে। এতে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে যে, কারো নিকট অপর কারো কোন বস্তু বা সম্পদ গচ্ছিত রাখাটাই শুধুমাত্র আমানত নয়, যাকে সাধারণতঃ আমানত বলে অভিহিত করা হয় এবং মনে করা হয়; বরং আমানতের আরো কিছু প্রকারভেদ রয়েছে। আয়াতের শানে-নুযূল প্রসঙ্গে উপরে যে ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, তাও কোন বস্তুগত আমানত ছিল না। কারণ, বায়তুল্লাহর চাবি বিশেষ কোন বস্তু নয়, বরং তা ছিল বায়তুল্লাহর খেদমতের একটা পদের নিদর্শন। এতে প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্রীয় যত পদ ও পদমর্যাদা রয়েছে, সেসবই আল্লাহ তা'আলার আমানত।

যাদের হাতে নিয়োগ-বরখাস্তের অধিকার রয়েছে সে সমস্ত কর্মকর্তা ও অফিসারবৃন্দ হলেন সে পদের আমানতদার। কাজেই তাদের পক্ষে কোন পদ এমন কাউকে অর্পণ করা জায়েয নয়, যে লোক তার যোগ্য নয়, বরং প্রতিটি পদের জন্য নিজের ক্ষমতা ও সাধ্যানুযায়ী যোগ্য ব্যক্তির অনুসন্ধান করা কর্তব্য। যোগ্যতা ও পরিপূর্ণ শর্ত মোতাবেক কোন লোক পাওয়া না গেলে উপস্থিত লোকদের মধ্যে যোগ্যতা ও আমানতদারী তথা সততার দিক দিয়ে যে সবচেয়ে অগ্রবর্তী হবে, তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমানতের গুরুত্ব লক্ষ্য করে এক বর্ণনায় এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর পথে জিহাদ সমস্ত গোনাহের কাফফারা হলেও আমানতের কাফফারা হয় না। জিহাদে শহীদ ব্যক্তিকে সেদিন হাজির করে বলা হবে, আমানত আদায় কর, সে বলবে, কোথেকে তা আদায় করব? দুনিয়া তো শেষ হয়ে গেছে।

তখন তাকে হাবীয়া জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হবে। সে সেখানে গেলে আমানতকে যেদিন ত্যাগ করেছিল সেদিনের রূপে দেখতে পাবে। সে তখন তা ধরে কাধে নিয়ে আসতে চাইবে, যখনি সেখান থেকে সে বের হতে যাবে, তখন আমানত পালিয়ে যাবে, আর এভাবে সে আমানতের পিছনে সবসময় ছুটতে থাকবে। তারপর আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু উপরোক্ত আয়াত পাঠ করলেন। [আল-মাতালিবুল আলীয়া, হিলইয়াতুল আউলিয়া, মাকারিমুল আখলাক] এ আমানতের পরিচয় সম্পর্কে আবুল আলীয়া বলেন, যা নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং যা নিষেধ করা হয়েছে তা সবই আমানত। [আত-তাফসীরুস সহীহ]


(৩) এ আয়াতে ইসলামের কয়েকটি মৌলিক নীতির আলোচনাও এসে গেছে। প্রথমতঃ প্রকৃত হুকুম ও নির্দেশ দানের মালিক আল্লাহ তা'আলা। পৃথিবীর শাসকবর্গ তার আজ্ঞাবহ। এতে প্রতীয়মান হয় যে, শাসনক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের মালিকও একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই। দ্বিতীয়তঃ সরকারী পদসমূহ অধিবাসীদের অধিকার নয়, যা জনসংখ্যার হারে বন্টন করা যেতে পারে; বরং এগুলো হল আল্লাহ প্রদত্ত আমানত, যা শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের পক্ষে যোগ্য ও যথার্থ লোককেই দেয়া যেতে পারে। তৃতীয়তঃ পৃথিবীতে মানুষের যে শাসন, তা শুধুমাত্র একজন প্রতিনিধি ও আমানতদার হিসেবেই হতে পারে।

তারা দেশের আইন প্রণয়নে সে সমস্ত নীতিমালার অনুসরণে বাধ্য থাকবে যা একক ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে বাতলে দেয়া হয়েছে। চতুর্থতঃ তাদের নিকট যখন কোন মোকদ্দমা আসবে, তখন বংশ, গোত্র, বর্ণ, ভাষা এমনকি দ্বীন ও মতবাদের পার্থক্য না করে সঠিক ও ন্যায়সংগত মীমাংসা করে দেয়া শাসন কর্তৃপক্ষের উপর ফরয। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, শাসনকর্তৃপক্ষের উপর ওয়াজিব হলো, আল্লাহর আইন অনুসারে বিচার করা, আমানত আদায় করা। যদি তারা সেটা করে তবে জনগনের উপর কর্তব্য হবে তার কথা শোনা, আনুগত্য করা, তার আহবানে সাড়া দেয়া। [তাবারী]


(৪) এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তোমাদিগকে যে উপদেশ দিয়েছেন, তা খুবই উত্তম। কারণ, আল্লাহ্ তা'আলা সবার ফরিয়াদই শোনেন এবং যে লোক বলার কিংবা ফরিয়াদ করার সামর্থ্য রাখে না, তিনি তার অবস্থাও উত্তমভাবে দেখেন। অতএব তার রচিত নীতিমালাই সর্বদা সকল রাষ্ট্রের জন্য সর্বযুগে উপযোগী হতে পারে। পক্ষান্তরে মানব রচিত নীতিমালা শুধুমাত্র নিজেদের পরিবেশেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেগুলোরও পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়ে।


(৫) এ আয়াতের তাফসীর ইমাম আবু দাউদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি তার কানের উপর রাখলেন এবং পরবর্তী আঙ্গুলটি রাখলেন তার চোখের উপর। অর্থাৎ আল্লাহর চোখ ও কান রয়েছে। [আবু দাউদ: ৪৭২৮]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫৮) নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ করবে।[1] আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার-কার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে।[2] আল্লাহ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন, তা কত উৎকৃষ্ট![3] নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

[1] অধিকাংশ মুফাসসিরীনদের নিকট এই আয়াত উসমান বিন ত্বালহা (রাঃ)-এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। তিনি বংশগতভাবেই কা’বা শরীফের তত্ত্বাবধায়ক এবং তার চাবি-রক্ষক ছিলেন। তিনি হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর রসূল (সাঃ) কা’বা শরীফে উপস্থিত হয়ে তওয়াফ ইত্যাদি সেরে নিয়ে উসমান বিন ত্বালহা (রাঃ)-কে ডেকে পাঠালেন। অতঃপর তাঁর হাতে কা’বা শরীফের চাবি হস্তান্তর করে বললেন, এগুলো তোমার চাবি। আজকের দিন হল, অঙ্গীকার পূরণ ও পুণ্যের দিন। (ইবনে কাসীর) কোন বিশেষ কারণে আয়াত অবতীর্ণ হলেও তার নির্দেশ সাধারণ এবং এতে সাধারণ ব্যক্তিবর্গ ও শাসকশ্রেণী উভয়কেই সম্বোধন করা হয়েছে। উভয়কে তাকীদ করা হয়েছে যে, আমানতসমূহ তাদের প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও। এতে প্রথমতঃ এমন আমানতও শামিল যা কারো কাছে হিফাযতের জন্য রাখা হয়। এতে খিয়ানত না করে চাওয়ার সময় হিফাযতের সাথে যেন তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। দ্বিতীয়তঃ পদ ও দায়িত্ব যোগ্য লোকদেরকেই যেন দেওয়া হয়। কেবল রাজনৈতিক ভিত্তিতে অথবা বংশ, দেশ ও জাতিগত ভিত্তিতে কিংবা আত্মীয়তা ও কোটা ভিত্তিক নিয়মে পদ ও দায়িত্ব দেওয়া এই আয়াতের পরিপন্থী।

[2] এতে বিশেষ করে শাসকদেরকে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখার এবং সুবিচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একটি হাদীসে এসেছে যে, ‘‘বিচারক যতক্ষণ পর্যন্ত যুলুম করে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তার সাথে থাকেন। অতঃপর সে যখন যুলুম শুরু করে দেয়, তখন আল্লাহ তাকে তার নিজের উপর ছেড়ে দেন।’’ (ইবনে মাজা)

[3] অর্থাৎ, আমানতসমূহ তাদের প্রাপকদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার বজায় রাখার উপদেশ।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:১৩৪ مَنۡ کَانَ یُرِیۡدُ ثَوَابَ الدُّنۡیَا فَعِنۡدَ اللّٰہِ ثَوَابُ الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃِ ؕ وَ کَانَ اللّٰہُ سَمِیۡعًۢا بَصِیۡرًا ﴿۱۳۴﴾

যে দুনিয়ার প্রতিদান চায় তবে আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের প্রতিদান রয়েছে। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। আল-বায়ান

যে ব্যক্তি পার্থিব পুরস্কার কামনা করে সে জেনে রাখুক যে আল্লাহর নিকট ইহলৌকিক ও পারলৌকিক পুরস্কার আছে। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। তাইসিরুল

যে ইহলোকের প্রতিদান আকাংখা করে, আল্লাহর নিকট ইহলোক ও পরলোকের প্রতিদান রয়েছে; এবং আল্লাহ শ্রবণকারী, পরিদর্শক। মুজিবুর রহমান

Whoever desires the reward of this world - then with Allah is the reward of this world and the Hereafter. And ever is Allah Hearing and Seeing. Sahih International

১৩৪. কেউ দুনিয়ার পুরস্কার চাইলে তবে (সে যেন জেনে নেয় যে) দুনিয়া ও আখেরাতের পুরস্কার আল্লাহর কাছেই রয়েছে।(১) আর আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা।

(১) এ আয়াতদৃষ্টে মনে হতে পারে যে, দুনিয়ার পুরস্কার চাইলেই তাকে তা দেয়া হবে। মূলত: অন্য আয়াতে সেটাকে শর্তযুক্ত করে বলা হয়েছে যে, “যে দুনিয়া চায়, তাকে আমি দুনিয়াতে যা ইচ্ছা করি যতটুকু ইচ্ছা করি প্রদান করি।” [সূরা আল-ইসরা: ১৮] সুতরাং দুনিয়া চাইলেই পাবে, তা কিন্তু নয়। যাকে যতটুকু দেয়ার ইচ্ছা আল্লাহর হবে, ততটুকুই সে পাবে। এর বাইরে নয়।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৩৪) যে কেউ ইহকালের পুরস্কার কামনা করে (সে জেনে রাখুক যে), আল্লাহর কাছে ইহকাল ও পরকালের পুরস্কার রয়েছে।[1] আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

[1] যেমন, কেউ যদি জিহাদ কেবল গনীমতের মাল লাভের জন্য করে তবে তা কতই না মূর্খতার কথা। যেহেতু মহান আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতের সওয়াব দেওয়ার উপর ক্ষমতাবান। অতএব তাঁর কাছে কেবল একটি জিনিসই কেন চাওয়া হয়? দুটোই কেন চাওয়া হয় না?

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আনফাল
৮:৩৯ وَ قَاتِلُوۡہُمۡ حَتّٰی لَا تَکُوۡنَ فِتۡنَۃٌ وَّ یَکُوۡنَ الدِّیۡنُ کُلُّہٗ لِلّٰہِ ۚ فَاِنِ انۡتَہَوۡا فَاِنَّ اللّٰہَ بِمَا یَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ﴿۳۹﴾

আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর যতক্ষণ না ফিতনার অবসান হয় এবং দীন পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। তবে যদি তারা বিরত হয় তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ তারা যা করে সে বিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাও যে পর্যন্ত না ফিতনা (কুফর ও শিরক) খতম হয়ে যায় আর দ্বীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। অতঃপর তারা যদি বিরত হয় তাহলে তারা (ন্যায় বা অন্যায়) যা করে আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। তাইসিরুল

তোমরা সদা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকবে যতক্ষণ না ফিতনার অবসান হয় এবং দীন সম্পূর্ণ রূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। আর তারা যদি ফিতনা ও বিপর্যয় সৃষ্টি হতে বিরত থাকে তাহলে তারা কি করেছে তা আল্লাহই দেখবেন। মুজিবুর রহমান

And fight them until there is no fitnah and [until] the religion, all of it, is for Allah. And if they cease - then indeed, Allah is Seeing of what they do. Sahih International

৩৯. আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেৎনা দূর হয় এবং দ্বীন পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়(১) তারপর যদি তারা বিরত হয় তবে তারা যা করে আল্লাহ তো তার সম্যক দ্রষ্টা।

(১) এ আয়াতে বর্ণিত ফেৎনা ও দ্বীন শব্দ দুটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যবহার অনুযায়ী আয়াতে শব্দ দুটির একাধিক অর্থ করা হয়ে থাকেঃ

এক. ফেৎনা অর্থ কুফর ও শির্ক আর দ্বীন অর্থ ইসলাম। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও এই বিশ্লেষণই বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এই তাফসীর অনুযায়ী আয়াতের অর্থ হবে, মুসলিমদেরকে কাফেরদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করে যেতে হবে যতক্ষণ না শির্ক ও কুফর নিঃশেষিত হয়ে যায়। [তাবারী; ইবন কাসীর] এক্ষেত্রে এ নির্দেশের উদ্দেশ্য হবে কিয়ামত পর্যন্ত শর্ত সাপেক্ষে জিহাদ চালিয়ে যাওয়া যতক্ষণ না দুনিয়া থেকে শির্ক ও কুফর নিঃশেষিত না হবে বা শির্কের প্রভাব কমে না যাবে।

দুই. যা আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা প্রমূখ সাহাবায়ে কেরামের উদ্ধৃতিতে বর্ণিত হয়েছে, তা হচ্ছে, ফেৎনা হচ্ছে দুঃখ-দুর্দশা ও বিপদাপদের ধারা, পক্ষান্তরে দ্বীন’ শব্দের অর্থ প্রভাব ও বিজয়। মক্কার কাফেররা সদাসর্বদা মুসলিমদের উপর এ ফেৎনা অব্যাহত রেখেছিল যতক্ষণ পর্যন্ত তারা মক্কায় অবস্থান করছিলেন। প্রতি মুহুর্তে তাদের অবরোধে আবদ্ধ থেকে নানা রকম কষ্ট সহ্য করে গেছেন। তারপর যখন তারা মদীনায় হিজরত করেন, তারপরও গোটা মদীনা আক্রমণের মাধ্যমে তাদের হিংসা-রোষই প্রকাশ পেতে থাকে। এ ক্ষেত্রে আয়াতের ব্যাখ্যা হবে যে, মুসলিমগণকে কাফেরদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করতে থাকা কর্তব্য, যতক্ষণ না তারা অন্যায়-অত্যাচার-উৎপীড়ন থেকে মুক্তি লাভ করতে সমর্থ হন, মুসলিম আপন দ্বীন পালন করতে কোন প্রকার সমস্যার সম্মুখীন হয় [ইবন কাসীর]

তিন. আয়াতের তৃতীয় আরেকটি অর্থ হচ্ছে, এখানে জিহাদ করার আসল উদ্দেশ্য ব্যক্ত করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যের নেতিবাচক দিক হচ্ছে ফেৎনা না থাকা আর ইতিবাচক দিক হচ্ছে দ্বীন সম্পূর্ণরূপে কেবল আল্লাহর জন্য হবে। কেবলমাত্র এ সর্বাত্মক উদ্দেশ্যের জন্য লড়াই করাই মুসলিমদের জন্য জায়েয বরং ফরয। তা ব্যতীত অপর কোন উদ্দেশ্যে লড়াই করা মোটেই জায়েয নহে। তাতে অংশগ্রহণও ঈমানদার লোকদের শোভা পায় না। এ মতের সমর্থন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদীসে পাই, তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলঃ হে আল্লাহর রাসূল আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কি? আমাদের কেউ কেউ ক্রোধের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধ করে, আবার কেউ নিজস্ব অহমিকা (চাই তা গোত্রীয় বা জাতিগত যাই হোক তা) ঠিক রাখার জন্য যুদ্ধ করে। তখন রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্নকারীর প্রতি মাথা উঠিয়ে বললেনঃ যে আল্লাহর কালেমা (তাওহীদ/দ্বীন/কুরআন) কে বুলন্দ করার জন্য যুদ্ধ করে সে মহান আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করল। [বুখারীঃ ১২৩]

কোন কোন মুফাসসির এখানে উপরোক্ত তিনটি অর্থই গ্রহণ করেছেন। [মুয়াস্‌সার]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩৯) তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাক; যতক্ষণ না ফিতনা (শিরক) দূর হয়[1] এবং আল্লাহর ধর্ম সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।[2] অতঃপর তারা যদি বিরত হয়, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের কার্যাবলীর সম্যক দ্রষ্টা।[3]

[1] ‘ফিতনা’ শিরককে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, ঐ সময় পর্যন্ত জিহাদ চালু রাখো, যতক্ষণ শিরক নিঃশেষ না হয়ে যায়।

[2] অর্থাৎ, আল্লাহর একত্ববাদের পতাকা সারা পৃথিবী ব্যাপী উড্ডীন হয়।

[3] অর্থাৎ, তাদের বাহ্যিক ইসলাম গ্রহণই তোমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তাদের গোপন ব্যাপার আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। তিনি প্রকাশ্য-গোপন সবই জানেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আনফাল
৮:৭২ اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ ہَاجَرُوۡا وَ جٰہَدُوۡا بِاَمۡوَالِہِمۡ وَ اَنۡفُسِہِمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَ الَّذِیۡنَ اٰوَوۡا وَّ نَصَرُوۡۤا اُولٰٓئِکَ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ؕ وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ لَمۡ یُہَاجِرُوۡا مَا لَکُمۡ مِّنۡ وَّلَایَتِہِمۡ مِّنۡ شَیۡءٍ حَتّٰی یُہَاجِرُوۡا ۚ وَ اِنِ اسۡتَنۡصَرُوۡکُمۡ فِی الدِّیۡنِ فَعَلَیۡکُمُ النَّصۡرُ اِلَّا عَلٰی قَوۡمٍۭ بَیۡنَکُمۡ وَ بَیۡنَہُمۡ مِّیۡثَاقٌ ؕ وَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ﴿۷۲﴾

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং নিজদের মাল ও জান দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে আর যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সহায়তা করেছে, তারা একে অপরের বন্ধু। আর যারা ঈমান এনেছে, কিন্তু হিজরত করেনি, তাদেরকে সাহায্যের কোন দায়িত্ব তোমাদের নেই, যতক্ষণ না তারা হিজরত করে। আর যদি তারা দীনের ব্যাপারে তোমাদের নিকট কোন সহযোগিতা চায়, তাহলে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। তবে এমন কওমের বিরুদ্ধে নয়, যাদের সাথে তোমাদের একে অপরের চুক্তি রয়েছে এবং তোমরা যে আমল কর, তার ব্যাপারে আল্লাহ পূর্ণ দৃষ্টিমান। আল-বায়ান

যারা ঈমান এনেছে, হিজরাত করেছে, নিজেদের মাল দিয়ে জান দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে আর যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, সাহায্য করেছে, এরা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর যারা ঈমান এনেছে কিন্তু হিজরাত করেনি তারা হিজরাত না করা পর্যন্ত তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করার কোন দায়-দায়িত্ব তোমার উপর নেই, তবে তারা যদি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাহায্য চায় তাহলে তাদেরকে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য, তবে তাদের বিরুদ্ধে নয় যাদের সঙ্গে তোমাদের মৈত্রী চুক্তি রয়েছে। তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখেন। তাইসিরুল

যারা ঈমান এনেছে, দীনের জন্য হিজরাত করেছে, নিজেদের জানমাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দান ও সাহায্য করেছে, তারা পরস্পরের বন্ধু। আর যারা ঈমান এনেছে কিন্তু হিজরাত করেনি, তারা হিজরাত না করা পর্যন্ত তাদের অভিভাবকত্বের কোন দায়িত্ব তোমাদের নেই, কিন্তু তারা যদি দীনের ব্যাপারে তোমাদের নিকট সাহায্য প্রার্থী হয় তাহলে তাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য, তবে তোমাদের এবং যে জাতির মধ্যে চুক্তি রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে নয়, তোমরা যা করছ আল্লাহ তা খুব ভাল রূপেই লক্ষ্য করেন। মুজিবুর রহমান

Indeed, those who have believed and emigrated and fought with their wealth and lives in the cause of Allah and those who gave shelter and aided - they are allies of one another. But those who believed and did not emigrate - for you there is no guardianship of them until they emigrate. And if they seek help of you for the religion, then you must help, except against a people between yourselves and whom is a treaty. And Allah is Seeing of what you do. Sahih International

৭২. নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, আর যারা আশ্রয় দান করেছে এবং সাহায্য করেছে(১), তারা পরস্পর পরস্পরের অভিভাবক। আর যারা ঈমান এনেছে কিন্তু হিজরত করেনি, হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব তোমাদের নেই(২); আর যদি তারা দ্বীন সম্বন্ধে তোমাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে তখন তাদেরকে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য(৩), তবে যে সম্প্রদায় ও তোমাদের মধ্যে চুক্তি রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে নয়।(৪) আর তোমরা যা করছ আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।

(১) এ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদের শ্রেণী বিন্যাস করেছেন। তাদের একশ্রেণী হচ্ছে, মুহাজির। যারা তাদের ঘর ও সম্পদ ছেড়ে বের হয়ে এসেছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্যার্থে, তাঁর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করতে। আর এ পথে তাদের যাবতীয় জান ও মাল ব্যয় করেছে। মুমিনদের অপর শ্রেণী হচ্ছে, আনসার। যারা তখনকার মদীনাবাসী মুসলিম, তাদের মুহাজির ভাইদেরকে আশ্রয় দিয়েছে তাদের ঘরে, তাদের প্রতি সমব্যথী হয়ে সম্পদ বণ্টন করে দিয়েছে, আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের জন্য যুদ্ধ করেছে। এ দু’শ্রেণী একে অপরের বেশী হকদার। আর এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাদের দু’জন ছিল ভাই। একে অপরের ওয়ারিশ হতো। শেষ পর্যন্ত যখন মীরাসের আয়াত নাযিল হয়, তখন এ বিধানটি রহিত হয়ে যায়। [ইবন কাসীর]

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুহাজির ও আনসারগণ একে অপরের ‘ওলী’। [মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৬৩] এখানে কুরআনুল কারীম ‘ওলী’ ও ‘বেলায়াত’ শব্দ ব্যবহার করেছে, যার প্রকৃত অর্থ হল বন্ধুত্ব ও গভীর সম্পর্ক। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, হাসান, কাতাদাহ ও মুজাহিদ রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমূখ তাফসীর শাস্ত্রের ইমামগণের মতে এখানে ‘বেলায়াত’ অর্থ উত্তরাধিকার এবং ‘ওলী’ অর্থ উত্তরাধিকারী। এ তাফসীর অনুসারে আয়াতের মর্ম এই যে, মুসলিম মুহাজির ও আনসার পারস্পরিকভাবে একে অপরের ওয়ারিস হবেন। তাদের উত্তরাধিকারের সম্পর্ক না থাকবে অমুসলিমদের সাথে, আর না থাকবে সে সমস্ত মুসলিমদের সাথে যারা হিজরত করেনি। পরবর্তীতে এ বিধান রহিত হয়ে যায়। আর কেউ কেউ এখানে এর আভিধানিক অর্থ বন্ধুত্ব ও সাহায্য সহায়তা নিয়েছেন। সে হিসেবে এ বিধান রহিত করার প্রয়োজন পড়ে না। [কুরতুবী]


(২) অর্থাৎ এরা মুসলিমদের তৃতীয় গোষ্ঠী। [ইবন কাসীর] যারা ঈমান আনার পরে হিজরত করেনি। তাদের মীরাসের অধিকারী তোমরা নও। তারা এ আয়াত অনুসারে আমল করত, সুতরাং আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণেও ঈমান ও হিজরতে সাথী হওয়ার পরও ‘যবিল আরহাম’ রক্ত সম্পৰ্কীয় গোষ্ঠী ওয়ারিস হত না। তারপর যখন তাদের মীরাসের আয়াত (সূরা আল-আনফালের ৭৫ এবং আল-আহযাবের ৬) নাযিল হয় তখন এটা রহিত হয়ে যায় এবং যবিল আরহাম বা রক্তসম্পৰ্কীয় আত্মীয়দের জন্য মীরাস নির্ধারিত হয়ে যায়। [আত-তাফসীরুস সহীহ]


(৩) অর্থাৎ তাদের সাথে উত্তরাধিকারের সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে ঠিকই কিন্তু যে কোন অবস্থায় তারাও মুসলিম। যদি তারা নিজেদের দ্বীনের হেফাজতের জন্য মুসলিমদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে, তবে তাদের সাহায্য করা মুসলিমদের উপর অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। [তাবারী] কিন্তু তাই বলে ন্যায় ও ইনসাফের অনুবর্তিতার নীতিকে বিসর্জন দেয়া যাবে না। তারা যদি এমন কোন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তোমাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে, যাদের সাথে তোমাদের যুদ্ধ নয় চুক্তি সম্পাদিত হয়ে গেছে, তবে সে ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে সেসব মুসলিমের সাহায্য করা জায়েয নয়। [ইবন কাসীর]


(৪) হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে এমনি ঘটনা ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কার কাফেরদের সাথে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করেন এবং চুক্তির শর্তে এ বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকে যে, এখন মক্কা থেকে যে ব্যক্তি মদীনায় চলে যাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ফিরিয়ে দেবেন। ঠিক এই সন্ধি চুক্তিকালেই আবু জান্দাল রাদিয়াল্লাহু আনহু-যাকে কাফেররা মক্কায় বন্দী করে রেখেছিল এবং খেদমতে গিয়ে হাজির হলেন এবং নিজের উৎপীড়নের কাহিনী প্রকাশ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করলেন। যে নবী সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হয়ে আগমন করেছিলেন, একজন নিপীড়িত মুসলিমের ফরিয়াদ শুনে তিনি কি পরিমাণ মর্মাহত হয়েছিলেন, তার অনুমান করাও যে কারও জন্য সম্ভব নয়, কিন্তু এহেন মর্মপীড়া সত্ত্বেও উল্লেখিত আয়াতের হুকুম অনুসারে তিনি তার সাহায্যের ব্যাপারে অপারগতা জানিয়ে ফিরিয়ে দেন। [দেখুন, বুখারী: ২৭০০; মুসনাদে আহমাদ ৪/৩২৩]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭২) নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, (দ্বীনের জন্য স্বদেশত্যাগ) হিজরত করেছে, জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে[1] এবং যারা (মুমিনদেরকে) আশ্রয় দান করেছে ও সাহায্য করেছে[2] তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু।[3] আর যারা ঈমান এনেছে; কিন্তু হিজরত করেনি, তারা হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের অভিভাবকত্বের কোন দায়িত্ব তোমাদের নেই।[4] দ্বীন সম্বন্ধে যদি তারা তোমাদের সাহায্য প্রার্থনা করে, তাহলে তাদেরকে সাহায্য করা তোমাদের জন্য আবশ্যক;[5] কিন্তু যে সম্প্রদায় ও তোমাদের মধ্যে চুক্তি রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে নয়। [6] তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।

[1] এই সাহাবাদেরকে ‘মুহাজিরীন’ বলা হয়; যাঁরা ফযীলতের দিক দিয়ে সাহাবাদের মধ্যে প্রথম নম্বরে আছেন।

[2] এঁদেরকে ‘আনসার’ (সাহায্যকারী) বলা হয়; এঁরা সাবাহাবাদের মধ্যে দ্বিতীয় নম্বরে আছেন।

[3] অর্থাঁৎ, একে অপরের পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী। কেউ কেউ বলেন, একে অপরের ওয়ারেস বা উত্তরাধিকারী। যেমন হিজরতের পর রসূল (সাঃ) একজন মুহাজির ও একজন আনসারীর মাঝে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক কায়েম করে দিয়েছিলেন। এমনকি তাঁরা একে অপরে উত্তরাধিকারীও হতেন। (অবশ্য পরবর্তীতে উত্তরাধিকারের বিধান রহিত হয়ে যায়)।

[4] এই সাহাবাগণ তৃতীয় পর্যায়ের ছিলেন; যাঁরা মুহাজিরীন ও আনসার ছিলেন না। এঁরা মুসলমান হওয়ার পর নিজেদের এলাকা ও গোত্রের বাসিন্দা ছিলেন। এই জন্য বলা হল যে, তাদের অভিভাবকত্বের কোন দায়িত্ব তোমাদের উপর নেই; অর্থাৎ, এরা তোমাদের পৃষ্ঠপোষক কিম্বা উত্তরাধিকারী হওয়ার উপযুক্ত নয়।

[5] অর্থাৎ, মুশরিকদের বিরুদ্ধে যদি তাদের জন্য তোমাদের সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তাহলে তাদেরকে সাহায্য করা জরুরী।

[6] হ্যাঁ! যদি তারা এমন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্যকামী হয়, যাদের ও তোমাদের মাঝে সন্ধি ও যুদ্ধ-বিরতির চুক্তি থাকে, তাহলে সেই মুসলিমদের পৃষ্ঠপোষকতার তুলনায় চুক্তি পালন করা অধিক জরুরী।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১১ হূদ
১১:১১২ فَاسۡتَقِمۡ کَمَاۤ اُمِرۡتَ وَ مَنۡ تَابَ مَعَکَ وَ لَا تَطۡغَوۡا ؕ اِنَّہٗ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ﴿۱۱۲﴾

সুতরাং যেভাবে তুমি নির্দেশিত হয়েছ সেভাবে তুমি ও তোমার সাথী যারা তাওবা করেছে, সকলে অবিচল থাক। আর সীমালঙ্ঘন করো না। তোমরা যা করছ নিশ্চয় তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

কাজেই তুমি ও তোমার সাথে যারা (আল্লাহর দিকে) তাওবা করেছে সুদৃঢ় হয়ে থাক আল্লাহ যেভাবে তোমাকে আদেশ দিয়েছেন, আর সীমালঙ্ঘন করো না। তোমরা যা কিছু কর তিনি তা ভালভাবেই দেখেন। তাইসিরুল

অতএব তুমি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছ, দৃঢ় থাক এবং সেই লোকেরাও যারা কুফরী হতে তাওবাহ করে তোমার সাথে রয়েছে, আর (ধর্মের) গন্ডি হতে একটুও বের হয়োনা; নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের কার্যকলাপ সম্যকভাবে প্রত্যক্ষ করেন। মুজিবুর রহমান

So remain on a right course as you have been commanded, [you] and those who have turned back with you [to Allah], and do not transgress. Indeed, He is Seeing of what you do. Sahih International

১১২. কাজেই আপনি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছেন তাতে অবিচল থাকুন এবং আপনার সাথে যারা তাওবা করেছে তারাও(১); এবং তোমরা সীমালংঘন করো না(২)। তোমরা যা কর নিশ্চয় তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা।

(১) ইস্তেকামত শব্দের অভিধানিক অর্থ হচ্ছে, ডান বা বাম কোনদিক একটু পরিমাণ না ঝুঁকে একদম সোজাভাবে থাকা। [কুরতুবী] মূলতঃ এটা সহজ কাজ নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সকল মুসলিমকে তাদের সর্বকার্যে সর্বাবস্থায় ইস্তেকামত অবলম্বন করার জন্য এ আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ‘ইস্তেকামত’ শব্দটি ছোট হলেও এর অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। কেননা, সর্বাবস্থায় দ্বীনের পথে সঠিকভাবে চলার অর্থ হচ্ছে- আকায়েদ, ইবাদত, লেন-দেন, আচার-ব্যবহার, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ উপার্জন ও ব্যয় তথা নীতি-নৈতিকতার যাবতীয় ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থেকে তারই নির্দেশিত সোজা পথে চলা।

তন্মধ্যে কোন ক্ষেত্রে, কোন কার্যে এবং পরিস্থিতিতে গড়িমসি করা, বাড়াবাড়ি করা অথবা ডানে বামে ঝুঁকে পড়া ইস্তেকামতের পরিপন্থী। দুনিয়ায় যত গোমরাহী ও পাপাচার দেখা যায়, তা সবই ইস্তেকামত হতে সরে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়। আকায়েদ অর্থাৎ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ইস্তেকামত না থাকলে, মানুষ বিদাআত হতে শুরু করে কুফর ও শেরেকী পর্যন্ত পৌছে যায়। আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ, তার পবিত্র সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সুষ্ঠ ও সঠিক মূলনীতি শিক্ষা দিয়েছেন, তার মধ্যে বিন্দুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি বা পরিবর্ধন পরিবর্জনকারী পথভ্রষ্টরূপে আখ্যায়িত হবে, তা তার নিয়ত যতই ভাল হোক না কেন।

অনুরূপভাবে নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালামগণের প্রতি শ্রদ্ধার যে সীমারেখা নির্ধারিত হয়েছে, সে ব্যাপারে ক্রটি করা স্পষ্ট ধৃষ্টতা ও পথভ্রষ্টতা। তেমনি কোন রাসূলকে আল্লাহর গুণাবলী ও ক্ষমতার মালিক বানিয়ে দেয়াও চরম পথভ্রষ্টতা। ইয়াহুদী ও নাসারারা এহেন বাড়াবাড়ির কারণেই বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হয়েছে। ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্য কুরআনে করীম নির্দেশিত এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পথের মধ্যে কোনরূপ কমতি বা গাফলতি মানুষকে যেমন ইস্তেকামতের আদর্শ হতে বিচ্যুত করে, অনুরূপভাবে তার মধ্যে নিজের পক্ষ হতে কোন বাড়াবাড়ি বা পরিবর্ধনও মানুষকে বিদ'আতে লিপ্ত করে। এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে বিদ'আত ও নিত্য নতুন সৃষ্ট পথ ও মত হতে অত্যন্ত জোরালোভাবে নিষেধ করেছেন এবং বিদ'আতকে চরম গোমরাহী বলে অভিহিত করেছেন। [দেখুন, আবু দাউদ: ৪৬০৭]

অতএব, প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে, যখন কোন কার্য সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ইবাদত হিসাবে করতে চায়, তখন কাজ করার আগে পূর্ণ তাহকীক করে জানতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম উক্ত কার্য ঐভাবে করেছেন কি না? যদি না করে থাকেন, তবে উক্ত কাজে নিজের শক্তি ও সময়ের অপচয় করা কক্ষনো ঠিক হবে না। কারণ, আকায়েদ, ইবাদাত, মুআমালাত তথা লেন-দেন, আখলাক বা স্বভাব-চরিত্র ও আচার-ব্যবহার তথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে কুরআন করীম নির্দেশিত মূলনীতিগুলিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাস্তবে রূপায়িত করে একটা সুষ্ঠ সঠিক মধ্যপন্থার পত্তন করেছেন। বন্ধুত্ব, শক্রতা, ক্রোধ, ধৈর্য, মিতব্যয় ও দানশীলতা, জীবিকা উপার্জন, আল্লাহর উপর নির্ভরতা, আবশ্যকীয় উপায়-উপকরণ সংগ্রহ করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহের প্রতি তাকিয়ে থাকা ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে মুসলিমদেরকে এক নজীরবিহীন মধ্যপন্থা দেখিয়ে দিয়েছেন। তা পুরোপুরি অবলম্বন করেই মানুষ সত্যিকার মানুষ হতে পারে। তা থেকে বিচ্যুত হলেই সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।

সারকথা, জীবনের সর্বক্ষেত্রে দ্বীনের অনুশাসন মেনে চলাই ইস্তেকামতের তাফসীর। সুফিয়ান ইবনে আবদুল্লাহ আস-সাকাকী রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমীপে আরজ করলেন, ইয়া রসুলাল্লাহ! ইসলাম সম্পর্কে আপনি আমাকে এমন একটি ব্যাপক শিক্ষা দান করুন যেন আপনার পরে আমার কারো কাছে কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন না হয়। তিনি বললেনঃ “আল্লাহর প্রতি ঈমান আন, তারপর ইস্তেকামত অবলম্বন কর”। [মুসলিমঃ ৩৮] উসমান ইবন হাদের আল-আযদী বলেন, আমি ইবন আব্বাসের কাছে প্রবেশ করে তার কাছে অসীয়ত চাইলে তিনি বললেন, ‘তুমি তাকওয়া অবলম্বন কর এবং ইস্তেকামত গ্রহণ কর। অনুসরণ কর এবং বিদ'আত থেকে দূরে থাক।” [সুনান দারমী: ১৪১] [বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, ইবন তাইমিয়্যা: আল-ইস্তিকামাহ ১/৩-৩২]

মূলত: ইস্তেকামতই সবচেয়ে দুস্কর কার্য। এজন্যই সালফে-সালেহীন বলতেন যে, কারামতের চেয়ে ইস্তেকামতের মর্যাদা উর্ধ্বে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি সৰ্বকার্যে ইস্তেকামত অবলম্বন করে, যদি জীবনভর তার দ্বারা কোন অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত না হয়, তথাপি তার মর্যাদা সবার উর্ধ্বে। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন “পূর্ণ কুরআনের মধ্যে এ আয়াতের চেয়ে কঠিন ও কষ্টকর কোন হুকুম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাযিল হয় নি।” তাই ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মতে রাসূলের বাণী “সূরা হুদ আমাকে বৃদ্ধ করেছে।” এ সূরার ইস্তেকামতের নির্দেশই ছিল তার বার্ধক্যের কারণ। [কুরতুবী]


(২) ইস্তেকামতের আদেশ দানের পর আল্লাহ বলেনঃ সীমালঙ্ঘন করো না। এখানে সোজা পথে দৃঢ় থাকার আদেশ দান করেই শুধু ক্ষান্ত করা হয় নি। বরং তার নেতিবাচক দিকটিও স্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে যে, আকায়েদ, ইবাদত, লেনদেন ও নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করো না। কেননা, এটাই পার্থিব ও ধর্মীয় সর্বক্ষেত্রে বিপর্যয় ও ফাসাদের মূল কারণ। সুতরাং তোমাদের কেউ যেন আনুগত্যের সময় শরীআত নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন না করে।

যেমন কেউ সাওম পালন করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে সেটাকে সবসময়ের জন্য করে নিল। আবার কেউ রাতে সালাতে দাঁড়াতে গিয়ে ঘুম বন্ধ করে দিল। যে বস্তু হালাল করা হয়েছে কেউ তা পরিত্যাগ করে দিল। [ফাতহুল কাদীর] যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, অথচ আমি সাওম পালন করি, সাওম পালন থেকে বিরতও হই, রাতে সালাতের জন্য দাঁড়াই, সালাত থেকে বিরত হয়ে ঘুমও যাই। আর বিয়ে-শাদীও করি। অতঃপর যে আমার সুন্নাত থেকে বিমুখ হবে সে আমার দলভুক্ত নয়। [বুখারী ৫০৬৩; মুসলিম: ১৪০১]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১১২) অতএব তুমি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছ, সেইভাবে সুদৃঢ় থাক এবং সেই লোকেরাও যারা (কুফরী হতে) তওবা করে তোমার সাথে রয়েছে; আর সীমালংঘন করো না।[1] নিশ্চয় তিনি তোমাদের কার্যকলাপ সম্যকভাবে প্রত্যক্ষ করেন।

[1] এই আয়াতে প্রথমত নবী (সাঃ) ও মু’মিনগণকে অটল থাকার কথা বলা হচ্ছে, যা শত্রুর মুকাবিলা করার জন্য একটি বড় অস্ত্র। দ্বিতীয়ত طغيان (সীমালঙ্ঘন) করতে নিষেধ করা হয়েছে, যা মুমিনের চারিত্রিক শক্তি এবং উচ্চমানের মধ্যমপন্থী চরিত্র গঠনের জন্য একান্ত জরুরী। এমনকি উক্ত সীমালঙ্ঘন, শত্রুর সাথে ব্যবহার করার সময়েও বৈধ নয়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৭ আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল)
১৭:১ سُبۡحٰنَ الَّذِیۡۤ اَسۡرٰی بِعَبۡدِہٖ لَیۡلًا مِّنَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ اِلَی الۡمَسۡجِدِ الۡاَقۡصَا الَّذِیۡ بٰرَکۡنَا حَوۡلَہٗ لِنُرِیَہٗ مِنۡ اٰیٰتِنَا ؕ اِنَّہٗ ہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ ﴿۱﴾

পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মাসজিদুল হারাম থেকে আল মাসজিদুল আকসা* পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। আল-বায়ান

পবিত্র ও মহীয়ান তিনি যিনি তাঁর বান্দাহকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি কল্যাণময় করেছি। তাকে আমার নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। তাইসিরুল

পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মাসজিদুল হারাম হতে মাসজিদুল আকসায়, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বারাকাতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। মুজিবুর রহমান

Exalted is He who took His Servant by night from al-Masjid al-Haram to al-Masjid al-Aqsa, whose surroundings We have blessed, to show him of Our signs. Indeed, He is the Hearing, the Seeing. Sahih International

* ফিলিস্তীনে অবস্থিত বাইতুল মাকদিস, যা মুসলমানদের প্রথম কিবলা ছিল।

১. পবিত্ৰ মহিমাময় তিনি(১), যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় ত্ৰমণ করালেন (২) আল-মসজিদুল হারাম (৩) থেকে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত (৪) যার আশপাশে আমরা দিয়েছি বরকত, যেন আমরা তাকে আমাদের নিদর্শন দেখাতে পারি (৫); তিনিই সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা (৬)

(১) سبحان শব্দটি মূলধাতু। এর অর্থ, যাবতীয় ত্রুটি ও দোষ থেকে পবিত্র ও মুক্ত। আয়াতে এর ব্যবহারিক অর্থ হচ্ছে, আমি তাঁকে পবিত্র ও মুক্ত ঘোষণা করছি। [ফাতহুল কাদীর]


(২) মূলে أسرى শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার আভিধানিক অর্থ রাত্রে নিয়ে যাওয়া। এরপর ليلاً শব্দটি স্পষ্টতঃ এ অর্থ ফুটিয়ে তুলেছে। ليلاً শব্দটি نكره ব্যবহার করে এদিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সমগ্র ঘটনায় সম্পূর্ণ রাত্রি নয়; বরং রাত্রির একটা অংশ ব্যয়িত হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] আয়াতে উল্লেখিত মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত সফরকে “ইসরা” বলা হয় এবং সেখান থেকে আসমান পর্যন্ত যে সফর হয়েছে, তার নাম মে'রাজ। ইসরা অকাট্য আয়াত দ্বারা প্ৰমাণিত হয়েছে। আর মে'রাজ সূরা নাজমে উল্লেখিত রয়েছে এবং অনেক মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সম্মান ও গৌরবের স্তরে بعبده শব্দটি একটি বিশেষ ভালবাসার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। কেননা, আল্লাহ্ তাআলা স্বয়ং কাউকে ‘আমার বান্দা’ বললে এর চাইতে বড় সম্মান মানুষের জন্যে আর হতে পারে না। [ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-উবুদিয়্যাহঃ ৪৭]


(৩) আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলামঃ বিশ্বের সর্বপ্রথম মসজিদ কোনটি? তিনি বললেনঃ মসজিদে-হারাম। অতঃপর আমি আরয করলামঃ এরপর কোনটি? তিনি বললেনঃ মসজিদে আকসা। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এতদুভয়ের নির্মাণের মধ্যে কতদিনের ব্যবধান রয়েছে? তিনি বললেনঃ চল্লিশ বছর। তিনি আরও বললেনঃ এ তো হচ্ছে মসজিদদ্বয়ের নির্মাণক্রম। কিন্তু আল্লাহ্ তাআলা আমাদের জন্য সমগ্ৰ ভূ-পৃষ্ঠকেই মসজিদ করে দিয়েছেন। যেখানে নামাযের সময় হয়, সেখানেই সালাত পড়ে নাও। [মুসলিমঃ ৫২০]


(৪) ইসরা ও মে'রাজের সমগ্র সফর যে শুধু আত্মিক ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের সফরের মত দৈহিক ও আত্মিক ছিল, একথা কুরআনের বক্তব্য ও অনেক মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্ৰমাণিত। আলোচ্য আয়াতের প্রথম سبحان শব্দের মধ্যে এদিকেই ইঙ্গিত রয়েছে। কেননা, এ শব্দটি আশ্চর্যজনক ও বিরাট বিষয়ের জন্যে ব্যবহৃত হয়। [ইবন কাসীর; মাজুমা ফাতাওয়া: ১৬/১২৫] মে'রাজ যদি শুধু আত্মিক অর্থাৎ স্বপ্নজগতে সংঘটিত হত, তবে তাতে আশ্চর্যের বিষয় কি আছে? স্বপ্নে তো প্রত্যেক মুসলিম, বরং প্রত্যেক মানুষ দেখতে পারে যে, সে আকাশে উঠেছে, অবিশ্বাস্য বহু কাজ করেছে। عبد শব্দ দ্বারা এদিকেই দ্বিতীয় ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ, শুধু আত্মাকে দাস বলে না; বরং আত্মা ও দেহ উভয়ের সমষ্টিকেই দাস বলা হয়। [ইবন কাসীর]

তারপর “এক রাতে নিজের বান্দাকে নিয়ে যান” এ শব্দাবলীও দৈহিক সফরের কথাই সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে। স্বপ্নযোগে সফরের জন্য নিয়ে যাওয়া শব্দাবলী কোনক্রমেই উপযোগী হতে পারে না। তাছাড়া আয়াতে দেখানোর কথা বলা হয়েছে সেটাও শরীর ছাড়া সম্ভব হয় না। অনুরূপভাবে বুরাকে উঠাও প্রমাণ করে যে, ইসরা ও মি'রাজ দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে সংঘটিত হয়েছিল। [দেখুন, ইবন কাসীর]।

এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মে'রাজের ঘটনা উন্মে হানী রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে বর্ণনা করলেন, তখন তিনি পরামর্শ দিলেন যে, আপনি কারও কাছে একথা প্ৰকাশ করবেন না; প্রকাশ করলে কাফেররা আপনার প্রতি আরও বেশী মিথ্যারোপ করবে। ব্যাপারটি যদি নিছক স্বপ্নই হত, তবে মিথ্যারোপ করার কি কারণ ছিল? তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘটনা প্রকাশ করলেন, তখন কাফেররা মিথ্যারোপ করল এবং ঠাট্টা বিদ্রুপ করল। এমনকি, অনেকের ঈমান টলায়মান হয়েছিল। ব্যাপারটি স্বপ্নের হলে এতসব তুলাকালাম কান্ড ঘটার সম্ভাবনা ছিল কি? সুতরাং আমাদের জন্য একথা মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই যে, এটি নিছক একটি রূহানী তথা আধ্যাতিক অভিজ্ঞতা ছিল না। বরং এটি ছিল পুরোদস্তুর একটি দৈহিক সফর এবং চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ। আল্লাহ নিজেই তাঁর নবীকে এ সফর ও পর্যবেক্ষণ করান।

তাফসীর কুরতুবীতে আছে, ইসরার হাদীসসমূহ সব মুতাওয়াতির। নাক্কাশ এ সম্পর্কে বিশ জন সাহাবীর রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন এবং কাযী ইয়াদ শেফা গ্রন্থে আরও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ইমাম ইবনে কাসীর তার তাফসীর গ্রন্থে এসব রেওয়ায়েত পূর্ণরূপে যাচাই-বাছাই করে বর্ণনা করেছেন এবং পঁচিশ জন সাহাবীর নাম উল্লেখ করেছেন, যাদের কাছ থেকে এসব রেওয়ায়েত বৰ্ণিত রয়েছে। যেমন, ওমর ইবনে খাত্তাব, আলী, ইবনে মাসউদ, আবু যর গিফারী, মালেক ইবনে ছ’ছা, আবু হুরায়রা, আবু সায়ীদ আল-খুদরী, ইবনে আব্বাস, শাদ্দাদ ইবনে আউস, উবাই ইবনে ক’ব, আবদুর রহমান ইবনে কুর্ত, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান, বুরাইদাহ, আবু আইউব আল-আনসারী, আবু উমামাহ, সামুরা ইবনে জুনদুব, সোহাইব রুমী, উম্মে হানী, আয়েশা, আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুম। এরপর ইবনে-কাসীর বলেন, ইসরা সম্পর্কে সব মুসলমানের ঐকমত্য রয়েছে। শুধু দ্বীনদ্রোহী যিন্দীকরা একে মানেনি।

মে'রাজের তারিখ সম্পর্কে বিভিন্ন রেওয়ায়েত বর্ণিত রয়েছে। মুসা ইবনে ওকবার রেওয়ায়েত এই যে, ঘটনাটি হিজরতের ছয়মাস পূর্বে খাদীজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার মৃত্যুর পর সংঘটিত হয়। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ওফাত সালাত ফরয হওয়ার পূর্বেই হয়েছিল। ইমাম যুহরী বলেনঃ খাদীজার ওফাত নবুওয়াত প্ৰাপ্তির সাত বছর পরে হয়েছিল। কোন কোন রেওয়ায়েত রয়েছে, মে'রাজের ঘটনা নবুওয়ত প্ৰাপ্তির পাঁচ বছর পরে ঘটেছে। ইবনে ইসহাক বলেনঃ মে'রাজের ঘটনা তখন ঘটেছিল, যখন ইসলাম আরবের সাধারণ গোত্ৰসমূহে বিস্তৃতি লাভ করেছিল। এসব রেওয়ায়েতের সারমর্ম এই যে, মে'রাজের ঘটনাটি হিজরতের কয়েক বছর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেনঃ ইসরা ও মে'রাজের ঘটনা রবিউসসানী মাসের ২৭তম রাত্রিতে হিজরতের এক বছর পূর্বে ঘটেছে। আবার কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, নবুওয়ত প্ৰাপ্তির আঠার মাস পর এ ঘটনা ঘটেছে। কারও কারও মতে হিজরতের এক বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল। মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন রেওয়ায়েত উল্লেখ করার পরে কোন সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করেননি। [বিস্তারিত দেখুন, আশশাইখ সফিউর রহমান আল-মুবারকপূৱী: আর-রাহীকুল মাখতূম]


(৫) মে'রাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনাঃ ইমাম ইবনে কাসীর তার তাফসীর গ্রন্থে আলোচ্য আয়াতের তাফসীর এবং সংশ্লিষ্ট হাদীসসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করার পর বলেনঃ সত্য কথা এই যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসরা সফর জাগ্রত অবস্থায় করেন; স্বপ্নে নয়। মক্কা মোকাররমা থেকে বাইতুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত এ সফর বোরাকযোগে করেন। তারপরের সংক্ষিপ্ত ঘটনা হলো, বায়তুল-মোকাদ্দাসের দ্বারে উপনীত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোরাকটি অদূরে বেঁধে দেন এবং বায়তুল মোকাদ্দাসের মসজিদে প্রবেশ করেন এবং কেবলার দিকে মুখ করে দুরাকাআত সালাত আদায় করেন। অতঃপর সিঁড়ি আনা হয়, যাতে নীচ থেকে উপরে যাওয়ার জন্য ধাপ বানানো ছিল। তিনি সিঁড়ির সাহায্যে প্রথমে প্রথম আসমানে, তারপর অবশিষ্ট আসমানসমূহে গমন করেন।

এ সিঁড়িটি কি এবং কিরূপ ছিল, তার প্রকৃতস্বরূপ আল্লাহ্ তাআলাই জানেন। প্রত্যেক আসমানে সেখানকার ফেরেশতারা তাকে অভ্যর্থনা জানায় এবং প্রত্যেক আসমানে সে সমস্ত নবী-রাসূলদের সাথে সাক্ষাত হয়, যাদের অবস্থান কোন নির্দিষ্ট আসমানে রয়েছে। যেমন, ষষ্ঠ আসমানে মূসা আলাইহিস সালাম এবং সপ্তম আসমানে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাৎ হয়। তারপর তিনি পয়গম্বরগণের স্থানসমূহও অতিক্রম করে এবং এক ময়দানে পৌছেন, যেখানে তাকদীর লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তিনি ‘সিদরাতুল-মুনতাহা’ দেখেন, যেখানে আল্লাহ্ তাআলার নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি এবং বিভিন্ন রঙ এর প্ৰজাপতি ইতস্ততঃ ছোটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিল। এখানে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলকে তাঁর স্বরূপে দেখেন। তাঁর ছয়শত পাখা ছিল। তিনি বায়তুল-মামুরও দেখেন।

বায়তুল-মামুরের নিকটেই কা'বার প্রতিষ্ঠাতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম প্রাচীরের সাথে হেলান দিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন। এই বায়তুল মামুরে দৈনিক সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে। কেয়ামত পর্যন্ত তাদের পুর্নবার প্রবেশ করার পালা আসবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করেন। সে সময় তার উম্মতের জন্য প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সালাত ফরয হওয়ার নির্দেশ হয়। তারপর তা হ্রাস করে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেয়া হয়। এ দ্বারা ইবাদতের মধ্যে সালাতের বিশেষ গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। এরপর তিনি বায়তুল-মোকাদ্দাসে ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন আসমানে যেসব পয়গম্বরের সাথে সাক্ষাত হয়েছিল তারাও তাকে বিদায় সম্বর্ধনা জানাবার জন্য বায়তুল-মোকাদ্দাস পর্যন্ত আগমন করেন। তখন নামাযের সময় হয়ে যায় এবং তিনি পয়গম্বরগণের সাথে সালাত আদায় করেন।

সেটা সেদিনকার ফজরের সালাতও হতে পারে। ইবনে-কাসীর বলেনঃ নামাযে পয়গম্বরগণের ইমাম হওয়ার এ ঘটনাটি কারও মতে আসমানে যাওয়ার পূর্বে সংঘটিত হয়। কিন্তু বাহ্যতঃ এ ঘটনাটি প্রত্যাবর্তনের পর ঘটে। কেননা, আসমানে নবী-রাসূলগণের সাথে সাক্ষাতের ঘটনায় একথাও বর্ণিত রয়েছে যে, জিবরীল সব পয়গম্বরগণের সাথে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন। ইমামতির ঘটনা প্ৰথমে হয়ে থাকলে এখানে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোন প্রয়োজন ছিল না। এছাড়া সফরের আসল উদ্দেশ্য ছিল উর্ধ্ব জগতে গমন করা। কাজেই একাজটি প্রথমে সেরে নেয়াই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। আসল কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর সব পয়গম্বর বিদায় দানের জন্যে তার সাথে বায়তুল-মোকাদ্দাস পর্যন্ত আসেন এবং জিবরীলের ইঙ্গিতে তাকে সবাই ইমাম বানিয়ে কার্যতঃ তার নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেয়া হয়। এরপর তিনি বায়তুল মোকাদ্দেস থেকে বিদায় নেন এবং বোরাক সওয়ার হয়ে অন্ধকার থাকতেই মক্কা মোকার্‌রমা পৌঁছে যান।


৬. জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, মিরাজের ব্যাপারে কুরাইশরা যখন আমাকে মিথ্যা প্ৰতিপন্ন করতে চেষ্টা করল তখন আমি কাবার হিজর অংশে দাঁড়ালাম। আর আল্লাহ বাইতুল মাকদিসকে আমার সামনে উদ্ভাসিত করলেন। ফলে আমি তার দিকে তাকিয়ে তার চিহ্ন ও নিদর্শনগুলো তাদেরকে বলে দিতে থাকলাম। [বুখারীঃ ৩৮৮৬]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) পবিত্র ও মহিমময় তিনি[1] যিনি তাঁর বান্দাকে রাতারাতি[2] ভ্রমণ করিয়েছেন (মক্কার) মাসজিদুল হারাম হতে (ফিলিস্তীনের) মাসজিদুল আকসায়,[3] যার পরিবেশকে আমি করেছি বরকতময়,[4] যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাই; [5] নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা ।

[1] سُبْحَانَ হল, سَبَّحَ يُسْبِّحُ এর মাসদার (ক্রিয়া বিশেষ্য)। অর্থ হল, أُنَزِّهُ اللهَ تَنْزِيْهًا অর্থাৎ, আমি প্রত্যেক দোষ-ত্রুটি থেকে আল্লাহর পবিত্র ও মুক্ত হওয়ার কথা ঘোষণা করছি। সাধারণতঃ এর ব্যবহার তখনই করা হয়, যখন অতীব গুরুতত্ত্বপূর্ণ কোন ঘটনার উল্লেখ হয়। উদ্দেশ্য এই হয় যে, বাহ্যিক উপায়-উপকরণের দিক দিয়ে মানুষের কাছে এ ঘটনা যতই অসম্ভব হোক না কেন, আল্লাহর নিকট তা কোন কঠিন ব্যাপার নয়। কেননা, তিনি উপকরণসমূহের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তো كُنْ শব্দ দিয়ে নিমিষে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। উপায়-উপকরণের প্রয়োজন তো মানুষের। মহান আল্লাহ এই সব প্রতিবন্ধকতা ও দুর্বলতা থেকে পাক ও পবিত্র।

[2] إِسْراءٌ শব্দের অর্থ হল, রাতে নিয়ে যাওয়া। পরে لَيْلًا উল্লেখ করে রাতের স্বল্পতার কথা পরিষ্কার করা হয়েছে। আর এরই জন্য لَيْلًا ‘নাকেরাহ’ (অনির্দিষ্ট) এসেছে। অর্থাৎ, রাতের এক অংশে অথবা সামান্য অংশে। অর্থাৎ, চল্লিশ রাতের এই সুদীর্ঘ সফর করতে সম্পূর্ণ রাত লাগেনি; বরং রাতের এক সামান্য অংশে তা সুসম্পন্ন হয়।

[3]أَقْصَى  দূরত্বকে বলা হয়। ‘আল-বাইতুল মুকাদ্দাস’ বা ‘বাইতুল মাকদিস’ ফিলিস্তীন বা প্যালেষ্টাইনের কদস অথবা জেরুজালেম বা (পুরাতন নাম) ঈলীয়া শহরে অবস্থিত। মক্কা থেকে ক্বুদ্‌স চল্লিশ দিনের সফর। এই দিক দিয়ে মসজিদে হারামের তুলনায় বায়তুল মাকদিসকে ‘মাসজিদুল আকসা’ (দূরতম মসজিদ) বলা হয়েছে।

[4] এই অঞ্চল প্রাকৃতিক নদ-নদী, ফল-ফসলের প্রাচুর্য এবং নবীদের বাসস্থান ও কবরস্থান হওয়ার কারণে পৃথক বৈশিষ্ট্যের দাবী রাখে। আর এই কারণে একে বরকতময় আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

[5] এটাই হল এই সফরের উদ্দেশ্য। যাতে আমি আমার এই বান্দাকে বিস্ময়কর এবং বড় বড় কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। তার মধ্যে এই সফরও হল একটি নিদর্শন ও মু’জিযা। সুদীর্ঘ এই সফর রাতের সামান্য অংশে সুসম্পন্ন হয়ে যায়। এই রাতেই নবী (সাঃ)-এর মি’রাজ হয় অর্থাৎ, তাঁকে আসমানসমূহে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন আসমানে নবীদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সপ্তাকাশের উপরে আরশের নীচে ‘সিদরাতুল মুন্তাহা’য় মহান আল্লাহ অহীর মাধ্যমে নামায এবং অন্যান্য কিছু শরীয়তের বিধি-বিধান তাঁকে দান করেন। এ ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা বহু সহীহ হাদীসে রয়েছে এবং সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীন থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত উম্মতের অধিকাংশ উলামা ও ফুকহা এই মত পোষণ করে আসছেন যে, এই মি’রাজ মহানবী (সাঃ)-এর সশরীরে এবং জাগ্রত অবস্থায় হয়েছে। এটা স্বপ্নযোগে অথবা আত্মিক সফর ও পরিদর্শন ছিল না, বরং তা ছিল দেহাত্মার সফর ও চাক্ষুষ দর্শন। (তা না হলে এ ঘটনাকে অস্বীকারকারীরা অস্বীকার করবে কেন?) বলা বাহুল্য, এ ঘটনা মহান আল্লাহ (অলৌকিকভাবে) তাঁর পূর্ণ কুদরত দ্বারা ঘটিয়েছেন। এই মি’রাজের দু’টি অংশ। প্রথম অংশকে ‘ইসরা’ বলা হয়; যার উল্লেখ এখানে করা হয়েছে। আর তা হল, মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত সফর করার নাম। এখানে পৌঁছে নবী (সাঃ) সমস্ত নবীদের ইমামতি করেন। বায়তুল মাকদিস থেকে তাঁকে আবার আসমানসমূহে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এটা হল এই সফরের দ্বিতীয় অংশ। যাকে ‘মিরাজ’ বলা হয়েছে। এর কিঞ্চিৎ আলোচনা সূরা নাজমে করা হয়েছে এবং বাকী বিস্তারিত আলোচনা হাদীসসমূহে বর্ণিত রয়েছে। সাধারণভাবে সম্পূর্ণ এই সফরকে ‘মি’রাজ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। ‘মি’রাজ’ সিড়ি বা সোপানকে বলা হয়। আর এটা রসূল (সাঃ)-এর পবিত্র মুখ-নিঃসৃত শব্দ عُرِجَ بِي إِلَى السَّمَاءِ (আমাকে আসমানে নিয়ে যাওয়া হয় বা আরোহণ করানো হয়) হতে গৃহীত। কেননা, এই দ্বিতীয় অংশটা প্রথম অংশের চেয়েও বেশী গুরুতত্ত্বপূর্ণ ও মাহাত্ম্যপূর্ণ ব্যাপার। আর এই কারণেই ‘মিরাজ’ শব্দটাই বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। মি’রাজের সময়কাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সকলে একমত যে, তা হিজরতের পূর্বে সংঘটিত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এক বছর পূর্বে। আবার কেউ বলেছেন, কয়েক বছর পূর্বে এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। অনুরূপ মাস ও তার তারীখের ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, রবিউল আওয়াল মাসের ১৭ অথবা ২৭ তারীখে হয়েছে। কেউ বলেছেন, রজব মাসের ২৭ তারীখ এবং কেউ অন্য মাস ও অন্য তারীখের কথাও উল্লেখ করেছেন। (ফাতহুল কাদীর) (মহানবী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবা (রাঃ)গণের নিকট তারীখের কোন গুরুতত্ত্ব অথবা এ দিনকে স্মরণ ও পালন করার প্রয়োজনীয়তা ছিল না বলেই, তা সংরক্ষিত হয়নি। -সম্পাদক)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৭ আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল)
১৭:৩০ اِنَّ رَبَّکَ یَبۡسُطُ الرِّزۡقَ لِمَنۡ یَّشَآءُ وَ یَقۡدِرُ ؕ اِنَّہٗ کَانَ بِعِبَادِہٖ خَبِیۡرًۢا بَصِیۡرًا ﴿۳۰﴾

নিশ্চয় তোমার রব যাকে ইচ্ছা তার জন্য রিয্ক প্রশস্ত করে দেন এবং সীমিত করে দেন। তিনি অবশ্যই তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত, পূর্ণ দ্রষ্টা। আল-বায়ান

তোমার প্রতিপালক যার জন্য ইচ্ছে রিযক্ প্রশস্ত করেন, যার জন্য ইচ্ছে সীমিত করেন, তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে ওয়াকিফহাল, প্রত্যক্ষদর্শী। তাইসিরুল

তোমার রাব্ব যার জন্য ইচ্ছা তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন; তিনি তাঁর দাসদেরকে ভালভাবে জানেন ও দেখেন। মুজিবুর রহমান

Indeed, your Lord extends provision for whom He wills and restricts [it]. Indeed He is ever, concerning His servants, Acquainted and Seeing. Sahih International

৩০. নিশ্চয় তোমার রব যার জন্য ইচ্ছে তার রিযক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছে তা সীমিত করেন; নিশ্চয় তিনি তার বান্দাদের সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত, সর্বদ্ৰষ্টা।(১)

১. সুতরাং কাউকে রিযক বেশী ও কম দেয়ার মধ্যে তাঁর বিরাট হেকমত রয়েছে। তিনি জানেন কাকে বেশী দিলে সে আরো বেশী পেতে চাইবে বা গর্বে সীমালঙ্ঘন করবে: অথবা কুফরীর কারণ হবে। আবার কাকে বেশী না দিলে তার জন্য তা কুফরীর কারণ হবে। আর কাকে কম দিলেও সে ধৈর্যশীল প্রমাণিত হবে। আর কাকে সম্পদ কুফরীর পর্যায়ে পৌছিয়ে দেবে। সুতরাং যিনি সবকিছুর খবর রাখেন তিনি প্রত্যেককে তার জন্য যা উপযোগী সে অনুসারে রিযক দান করেন। [দেখুন, ইবন কাসীর]

অথবা, আয়াতের আল্লাহর নাম দু’টোর উদ্দেশ্য, তিনি জানেন যা তারা গোপন রাখে এবং যা প্রকাশ করে। তার কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। তিনি বান্দাদের অবস্থা সম্পর্কে অধিক অবহিত, তাদের রিযক বণ্টনের ব্যাপারে সর্বদ্ৰষ্টা। এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, তিনিই বান্দাদের রিযিকের ব্যবস্থা করেন। তাই পরবর্তী আয়াতে মানুষের রিযিকের আলোচনা করা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩০) তোমার প্রতিপালক যার জন্য ইচ্ছা তার জীবনোপকরণ বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন; [1] নিশ্চয় তিনি তাঁর দাসদেরকে ভালভাবে জানেন ও দেখেন।

[1] এতে ঈমানদারদের জন্য রয়েছে সান্তনা। তাঁদের কাছে রুযী ও বিলাস-উপকরণের প্রাচুর্য না থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর নিকট তাঁদের সম্মান নেই, বরং রুযীতে প্রশস্ততা ও সংকীর্ণতার সম্পর্ক তো আল্লাহর হিকমত ও কৌশলের সাথে; যার খবর কেবল তিনিই জানেন। তিনি তাঁর শত্রুদেরকে কারূন বানিয়ে দেন এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে এতটাই দেন যে, কোন রকমে তাদের চলে যায়। এ সবই তাঁর ইচ্ছার ব্যাপার। অধিক সম্পদ-সম্পত্তির মালিক (ধনী) তাঁর প্রিয় নয় এবং জীবন ধারণের মত সামান্য উপকরণের মালিক (গরীব) তাঁর অপ্রিয় নয়।

 (অনুরূপ এর বিপরীত হওয়াও জরুরী নয়। -সম্পাদক)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৭ আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল)
১৭:৯৬ قُلۡ کَفٰی بِاللّٰہِ شَہِیۡدًۢا بَیۡنِیۡ وَ بَیۡنَکُمۡ ؕ اِنَّہٗ کَانَ بِعِبَادِہٖ خَبِیۡرًۢا بَصِیۡرًا ﴿۹۶﴾

বল, ‘আল্লাহই যথেষ্ট আমার ও তোমাদের মধ্যে স্বাক্ষী হিসেবে; নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞাত, পূর্ণ দ্রষ্টা’। আল-বায়ান

বল, ‘আমার ও তোমাদের মাঝে আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট, তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিফহাল, আর তিনি সর্বদ্রষ্টা।’ তাইসিরুল

বলঃ আমার ও তোমাদের মধ্যে স্বাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট; তিনি তাঁর দাসদেরকে সবিশেষ জানেন ও দেখেন। মুজিবুর রহমান

Say, "Sufficient is Allah as Witness between me and you. Indeed he is ever, concerning His servants, Acquainted and Seeing." Sahih International

৯৬. বলুন, আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট(১); নিশ্চয় তিনি তার বান্দাদের সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত, পূর্ণদ্রষ্টা।

(১) আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “বনী ইসরাঈলের এক লোক বনী ইসরাঈলের অপর এক লোকের নিকট এক হাজার দীনার কার্জ চাইল। কৰ্জদাতা বললঃ কয়েকজন সাক্ষী আনুন, আমি তাদেরকে সাক্ষী রাখব। কার্জগ্রহীতা বললঃ সাক্ষীর জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তখন কর্জাদাতা বলল, তবে একজন যামিন উপস্থিত করুন। কর্জাগ্ৰহীতা বললঃ যামিন হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। তখন কৰ্জদাতা বললঃ আপনি ঠিকই বলেছেন। তারপর সে নির্ধারিত সময়ে পরিশোধের শর্তে তাকে এক হাজার দীনার কর্জ দিয়ে দিল। তারপর কর্জাগ্ৰহীতা সমূদ্র যাত্রা করল এবং তার ব্যবসায়িক প্রয়োজন সমাধা করল।

তারপর সে বাহন খুঁজতে লাগল, যাতে নির্ধারিত সময়ে সে কর্জাদাতার নিকট এসে পৌঁছতে পারে। কিন্তু কোন রূপ বাহন সে পেল না। অগত্যা সে এক টুকরা কাঠ নিয়ে তা ছিদ্র করে কর্জদাতার নামে একখানা চিঠি ও এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা তার মধ্যে পুরে ছিদ্রটি বন্ধ করে দিল। তারপর ঐ কাঠখন্ডটা নিয়ে সমুদ্র তীরে গিয়ে বললঃ হে আল্লাহ্! তুমি তো জান, আমি অমুকের কাছে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা কৰ্জ চাইলে সে আমার কাছে যামিন চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, যামিন হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট, এতে সে রাযী হয়েছিল। সে আমার কাছে সাক্ষী চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, স্বাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। এতে সে রাযী হয়ে যায়। আমি তার প্রাপ্য তার কাছে পৌছে দেয়ার উদ্দেশ্যে বাহনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম কিন্তু পেলাম না।

আমি ঐ এক হাজার স্বর্ণমুদ্ৰা আপনার নিকট আমানত রাখছি। এই বলে সে কাঠখন্ডটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করল। তৎক্ষণাৎ তা সমুদ্রের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে গেল। তারপর লোকটি ফিরে গেল এবং নিজের শহরে যাবার জন্য বাহন খুঁজতে লাগল। ওদিকে কৰ্জদাতা নির্ধারিত দিনে এ আশায় সমুদ্রতীরে গেল যে, হয়ত বা দেনাদার তার পাওনা নিয়ে এসে পড়েছে। ঘটনাক্রমে ঐ কাঠখন্ডটি তার নজরে পড়ল। যার ভিতরে স্বর্ণমুদ্রা ছিল। সে তা পরিবারের জ্বালানির জন্য বাড়ি নিয়ে গেল। যখন কাঠের টুকরাটি চিরল তখন ঐ স্বর্ণমুদ্রা ও চিঠি সে পেয়ে গেল। কিছুকাল পর দেনাদার লোকটি এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে পাওনাদারের নিকট এসে হাজির হলো এবং বললঃ আল্লাহর কসম! আমি আপনার মাল যথা সময়ে পৌছে দেয়ার উদ্দেশ্যে বাহনের খোঁজে সর্বদা চেষ্টিত ছিলাম।

কিন্তু যে জাহাজটিতে করে আমি এখন এসেছি এটির আগে আর কোন জাহাজই পেলাম না। কৰ্জদাতা বললঃ আপনি কি আমার কাছে কিছু পাঠিয়েছিলেন? দেনাদার বললঃ আমি তো আপনাকে বললামই যে, এর আগে আর কোন জাহাজই আমি পাইনি। কর্জাদাতা বললঃ আপনি কাঠের টুকরোর ভিতরে করে যা পাঠিয়েছিলেন তা আল্লাহ আপনার হয়ে আমাকে আদায় করে দিয়েছেন। তখন সে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে প্রশান্ত চিত্তে ফিরে চলে আসল। [বুখারীঃ ২২৯১]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯৬) বল, ‘আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট,[1] নিশ্চয় তিনি তাঁর দাসদেরকে সবিশেষ জানেন ও দেখেন।’

[1] অর্থাৎ, দাওয়াত ও তবলীগের যে কাজ আমার দায়িত্বে ছিল, তা আমি পালন করেছি। এ ব্যাপারে আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হওয়ার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। কারণ, প্রত্যেক জিনিসের ফায়সালা তিনিই করবেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২২ আল-হজ্জ
২২:৬১ ذٰلِکَ بِاَنَّ اللّٰہَ یُوۡلِجُ الَّیۡلَ فِی النَّہَارِ وَ یُوۡلِجُ النَّہَارَ فِی الَّیۡلِ وَ اَنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌۢ بَصِیۡرٌ ﴿۶۱﴾

এটা এজন্য যে, নিশ্চয় আল্লাহ রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান। আর নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা। আল-বায়ান

এটা এজন্য যে, আল্লাহ রাতকে ঢুকিয়ে দেন দিনে, আর দিনকে ঢুকিয়ে দেন রাতে (দুঃখ বেদনার অন্ধকার দূর করে আনন্দের আলো এনে দেন আর আনন্দিত জনকে দুঃখের অাঁধারে ডুবিয়ে দেন)। আর আল্লাহ তো সব কিছু শোনেন, সব কিছু দেখেন। তাইসিরুল

ওটা এ জন্য যে, আল্লাহ রাতকে প্রবিষ্ট করেন দিনের মধ্যে এবং দিনকে প্রবিষ্ট করেন রাতের মধ্যে এবং আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা। মুজিবুর রহমান

That is because Allah causes the night to enter the day and causes the day to enter the night and because Allah is Hearing and Seeing. Sahih International

৬১. এটা এ জন্যে যে, নিশ্চয় আল্লাহ রাতকে প্রবেশ করান দিনের মধ্যে এবং দিনকে প্ৰবেশ করান রাতের মধ্যে(১)। আর নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা(২);

(১) অর্থাৎ তিনিই সমগ্ৰ বিশ্ব ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক এবং দিন রাত্রির আবর্তন তাঁরই কর্তৃত্বাধীন। তিনি রাতের এক অংশে দিনের প্রবেশ ঘটান, আবার দিনের একাংশে রাত প্রবেশ করান। তাই কখনও দিন বড় হয়, আবার কখনও রাত বড় হয়। [ইবন কাসীর] এই বাহ্যিক অর্থের সাথে সাথে এ বাক্যের মধ্যে এদিকেও একটি সূক্ষ্ম ইংগিত রয়েছে যে, রাতের অন্ধকার থেকে যে আল্লাহ দিনের আলো বের করে আনেন এবং উজ্জ্বল দিনের উপর যিনি রাতের অন্ধকার জড়িয়ে দেন তারই এমন ক্ষমতা আছে যার ফলে আজ যাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রয়েছে তাদের দ্রুত দুনিয়াবাসী দেখতে পাবে এবং কুফর ও জাহেলিয়াতের অন্ধকার তার হুকুমে সরে যাবে এবং এ সংগে সেদিনের উদয় হবে যেদিন সত্য, সততা ও জ্ঞানের আলোকে সারা দুনিয়া আলোকিত হয়ে উঠবে। মুমিনরা বিজয় লাভ করবে। [দেখুন, আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর]


(২) এ আয়াতে মহান আল্লাহর দুটি মহান গুণ বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্ৰষ্টা। অৰ্থাৎ তিনি অন্ধ ও বধির আল্লাহ নন বরং এমন আল্লাহ যিনি দেখতে ও শুনতে পান। বান্দাদের যাবতীয় অবস্থা, কার্যক্রম ও উঠাবসা তাঁর কাছে গোপন নেই। [ইবন কাসীর] সুতরাং কে তার কাছে সাহায্য চাচ্ছে এবং কার সাহায্য করা দরকার এটা তিনি সম্যক অবগত। আর তিনি তাকে সেভাবে সময়মত ঠিকই সাহায্য-সহযোগিতা করবেন।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬১) এটা এ জন্য যে, আল্লাহ রাত্রিকে প্রবিষ্ট করেন দিবসের মধ্যে এবং দিবসকে প্রবিষ্ট করেন রাত্রির মধ্যে। [1] আর নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

[1] অর্থাৎ, যে আল্লাহ এ প্রকার প্রবিষ্ট করার কাজ করতে সক্ষম, সে আল্লাহ অত্যাচারীদের নিকট হতে তাঁর অত্যাচারিত বান্দাদের প্রতিশোধ নিতে সক্ষম।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২২ আল-হজ্জ
২২:৭৫ اَللّٰہُ یَصۡطَفِیۡ مِنَ الۡمَلٰٓئِکَۃِ رُسُلًا وَّ مِنَ النَّاسِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌۢ بَصِیۡرٌ ﴿ۚ۷۵﴾

আল্লাহ ফেরেশতা ও মানুষের মধ্য থেকে রাসূল মনোনীত করেন। অবশ্যই আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা। আল-বায়ান

আল্লাহ ফেরেশতাগণের মধ্য হতে বাণীবাহক মনোনীত করেন আর মানুষদের মধ্য হতেও, আল্লাহ সব কিছু শোনেন, সব কিছু দেখেন। তাইসিরুল

আল্লাহ মালাইকাদের মধ্য হতে মনোনীত করেন বাণীবাহক এবং মানুষের মধ্য হতেও; আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা। মুজিবুর রহমান

Allah chooses from the angels messengers and from the people. Indeed, Allah is Hearing and Seeing. Sahih International

৭৫. আল্লাহ ফিরিশতাদের মধ্য থেকে মনোনীত করেন রাসূল এবং মানুষের মধ্য থেকেও(১); নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।(২)।

(১) পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তাঁর নিজের পূর্ণতা ও মূর্তিদের দুর্বলতা বর্ণনা করলেন, আর এও বর্ণনা করলেন যে তিনিই একমাত্র মা’বুদ, এ আয়াতে তাঁর রাসূলদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তারা সমস্ত সৃষ্টি থেকে আলাদা প্রকৃতির। তাদের রয়েছে ভিন্ন বিশেষত্ব। [সা’দী]


(২) অর্থাৎ যিনি রাসূলদেরকে পছন্দ করে নিয়েছেন তিনি এমন নন যে, তাদের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে বেখবর। বরং তিনি সবকিছু দেখেন ও শোনেন। প্রত্যেক ব্যক্তির প্রকাশ্য ও গোপন অবস্থা একমাত্র তিনিই জানেন। তিনি জানেন কোথায় তাঁর রিসালাত রাখতে হবে আর কে এর জন্য অধিক উপযুক্ত। তিনি রাসূলদের পাঠান, ফলে তাদের কেউ কেউ এতে সাড়া দেয়, আর কেউ দেয় না। কিন্তু রাসূলদের দায়িত্ব এখানেই শেষ। তারপরই তারা আল্লাহর দরবারে ফিরে যাবে। সেখানেই তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতিফল পাবে। [সা'দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭৫) আল্লাহ ফিরিশতাদের মধ্য হতে মনোনীত করেন বাণীবাহক (দূত) এবং মানুষের মধ্য হতেও।[1] নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। [2]

[1] رَسُول رُسُل এর বহুবচন। এর অর্থঃ প্রেরিত দূত, বাণী বাহক। মহান আল্লাহ ফিরিশতা দ্বারাও বাণী বহনের কাজ নিয়েছেন। যেমন জিবরীল (আঃ)-কে অহী (প্রত্যাদেশ) পৌঁছানোর জন্য নির্বাচিত করেছেন; তাঁর কাজ নবীদের নিকট অহী পৌঁছানো অথবা আযাব নিয়ে কোন জাতির নিকট যাওয়া। আর মানুষের মধ্যেও কিছুকে বাণী-বাহক দূত রূপে নির্বাচিত করেছেন এবং তাঁদেরকে মানুষের পথ দেখানোর কাজে নিয়োগ করেছেন। এঁরা সকলেই ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও দাস, তবে নির্বাচিত ও মনোনীত। কিন্তু কেন? আল্লাহর ইচ্ছায় শরীক করার জন্য; যেমন কোন কোন মানুষ তাঁদেরকে আল্লাহর শরীক মনে করে থাকে? কখনই না, বরং শুধুমাত্র আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর জন্য তাঁরা মনোনীত হন।

[2] তিনি বান্দাদের সকল কথা শ্রবণ করেন ও তাদের সকল কাজ প্রত্যক্ষ করেন। অর্থাৎ, তিনি অবগত যে, রিসালাতের যোগ্য কে? যেমন অন্য জায়গায় বলেছেন {اللهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ} অর্থাৎ, রসূলের পদ বা দায়িত্ব আল্লাহ কার উপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভাল জানেন। (সূরা আনআম ১২৪ আয়াত)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ২০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৩৫ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 পরের পাতা »