রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বীরত্ব ও ধৈর্য

আল্লাহর দ্বীনের কালেমাকে বুলন্দ ও এ দ্বীন ইসলামকে সাহায্য করার নিমিত্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিপূর্ণ ভূমিকা ও অংশ রয়েছে।আর আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে যে নিয়ামত দিয়েছিলেন তা তিনি সঠিকভাবে ব্যয় করেছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«ما ضرب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - بيده شيئًا قط إلا أن يجاهد في سبيل الله ولا ضرب خادمًا ولا امرأة»

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদের ময়দান ব্যতীত তাঁর হাত দিয়ে কাউকে মারেননি এমনকি তার স্ত্রী ও খাদেমকেও না।[1]

তিনি একাই কুরাইশ ও তাদের নেতাদের দাওয়াত দেয়া ও তাদের সাথে সত্যের আন্দোলনে মুখোমুখি হয়ে এ দ্বীন ইসলাম বিজয় লাভ করা অবধি টিকে থাকার পরও তিনি কখনো বলেননি যে, আমার সাহায্যে কেউ আসেনি অথবা সকল জাতির লোক আমার বিরোধী আমি একা। বরং তিনি আল্লাহর উপর ভরসা রেখে মহা বীরত্বের সাথে দাওয়াতী কাজ চালিয়ে গেছেন এবং লোকদেরকে উৎসাহ দান করেছেন এবং তাদেরকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠা থাকার জন্য আহ্বান করা সত্ত্বেও লোকেরা দূরে সরে যাওয়ার পরও তিনি স্থির থেকেছেন এসকল আদর্শই প্রমাণ করে তাঁর সাহসীকতা ও ধৈর্য।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েক বছর ধরে হেরা গুহায় ইবদাত করতেন সে সময় তাকে কেউ কষ্ট দেয়নি, আর কুরাইশরাও তার বিরুদ্ধে কোন প্রকার বিরোধিতা করেনি, অথবা কাফের গোষ্ঠীর কেউ তার বিরুদ্ধে একটি তীরও নিক্ষেপ করেনি, কিন্তু যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানব জাতিকে তাওহীদের দিকে প্রাকাশ্যে আহ্বান, এবং ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নিমিত্তেই হতে হবে এ আহ্বান জানালেন, তখনই কাফেররা আশ্চর্য হয়ে বলে উঠল:

﴿ أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ ٥ ﴾ [ص : ٥]

অর্থাৎ সে কি বহু মাবূদকে এক মাবূদে পরিণত করছে।[2]

তারা মূর্তিকে তাদের ও আল্লাহর মাঝে মাধ্যম মনে করত, যা আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বর্ণনা করেছেন:

﴿ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ ٣ ﴾ [الزمر: ٣]

অর্থাৎ আমরা তো তাদের ইবদাত এজন্যই করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করিয়ে দিবে।[3]

তারা কিন্তু তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহকে স্বীকার করত, যা আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন:

﴿ قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ قُلِ ٱللَّهُۖ وَإِنَّآ أَوۡ إِيَّاكُمۡ لَعَلَىٰ هُدًى أَوۡ فِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٖ ٢٤ ﴾ [سبا: ٢٤]

অর্থাৎ, বলুন: আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী হতে কে তোমাদেরকে রিযিক প্রদান করে? বলুন: আল্লাহ! হয় আমরা, না হয় তোমরা সৎপথে স্থিত অথবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পতিত।[4]

প্রিয় পাঠক! আপনি একটু চিন্তা করে দেখুন, বর্তমানে মুসলিম দেশগুলি শিরকে সয়লাব হয়ে গেছে। মৃতের নিকট প্রার্থনা করা, তাদেরকে অসীলা মনে করা, তাদের জন্য মান্নত করা, তাদেরকে ভয় করা ও তাদের নিকট আকাঙ্খা করা! এমনকি আল্লাহর সাথে শিরক করার কারণে এবং মৃতদেরকে জীবতদের স্থানে আসন দেয়ার কারণে আল্লাহ সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ إِنَّهُۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَىٰهُ ٱلنَّارُۖ ٖ ٧٢ ﴾ [المائ‍دة: ٧٢]

অর্থাৎ: নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম।[5]

এবার আমরা তাঁর ঘর থেকে বের হয়ে উত্তর দিকে এক পাহাড়ের দিকে ধাবিত হই, সে পাহাড়টি হল উহুদ পাহাড়। যেখানে মহা সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল। যেথায় প্রকাশ পায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বীরত্ব এবং প্রামাণিত হয় অসীম ধৈর্য, যে মহা যুদ্ধে তিনি ভীষণ আক্রান্ত ও যখম হন, এমনকি তার চেহারা মুবারক রক্তাক্ত হয়। সামনের দাঁত ভেঙ্গে যায় ও মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

সাহাল বিন সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহত হওয়া সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলছেন:

«أما والله إني لأعرف من كان يغسل جرح رسول الله - صلى الله عليه وسلم -، ومن كان يسكب الماء وبما دووي، قال: كانت فاطمة عليها السلام بنت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - تغسله وعلي بن أبي طالب يسكب الماء بالمجن، فلما رأت فاطمة أن الماء لا يزيد الدم إلا كثرة أخذت قطعًا من حصير وأحرقتها وألصقتها فاستمسك الدم وكسرت رباعيته وجرح وجهه وكسرت البيضة على رأسه»

আমি আল্লাহ তা‘আলার শপথ করে বলছি, আমি জানি: কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আঘাত প্রাপ্ত জায়গা ধৌত করেছে এবং তাতে কে পানি ঢালছিল এবং কোন জিনিস দ্বারা চিকিৎসা করা হয়েছিল। তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ধৌত করেছিল এবং আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু লোটা থেকে পানি ঢালছিলেন। আর ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন দেখলেন যে, পানি ঢালায় রক্ত প্রবাহিত হওয়া আরো বৃদ্ধি হচ্ছে তখন তিনি চাটাই পুড়িয়ে লাগিয়ে দিলেন, তখন রক্ত প্রবাহিত হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তাঁর সামনের দাঁত ভেঙ্গেছিল এবং তার মুখ মন্ডলে আঘাত লেগেছিল এবং লৌহ বর্ম ভেঙ্গে তাঁর মাথায় প্রবেশ করেছিল।[6]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুনাইন যুদ্ধের অবস্থা সম্পর্কে অব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: হুনায়নের যুদ্ধের দিন মুসলিম বাহিনী যখন হটে যাচ্ছিল, তখন তিনি তার সওয়ারীকে লাথি মেরে কাফেরদের দিকে দৌড়ানো শুরু করেন; কিন্তু আমি এই নিয়তে সওয়ারীর লাগাম ধরে বাধা দেই যেন সে দ্রুত না যেতে পারে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমতাবস্থায় বলছিলেন:

«أنا النبي لا كذب، أنا ابن عبدالمطلب»

আমি সত্য নবী, মিথ্যা নবী নই, আমি আব্দুল মুত্তালিবের উত্তরসূরী।[7]

বীর সেনানী অশ্বারোহী, বহু বহু প্রসিদ্ধ ঘটনা প্রবাহের নায়কআলী বিন আবু তালেব রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলেন: যখন একদল অন্য শত্রু দলের মুখামুখি হত ও যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করত, তখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশ্রয় গ্রহণ করতাম, তিনিই সর্বাগ্রে শত্রুর নিকটবর্তী হতেন।[8]

দাওয়াতী কাজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধৈর্যের কারণেই উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন হয় ও উত্তম আদর্শ রচিত হয় এমনকি যার ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা এ দ্বীন প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং মুসলিম বাহিনী সারা আরব উপদ্বীপ, শাম ও মা ওরাআন নাহার [সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আফগান সীমান্ত] পর্যন্তই ইসলামের ঘোড়া অবাধে বিচরণ করেছে, এমনকি পাকাও কাঁচা সকল ঘরেই ইসলাম প্রবেশ করেছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«لقد أخفت في الله وما يخاف أحد، ولقد أوذيت في الله وما يؤذى أحد، ولقد أتت علي ثلاثون من بين يوم وليل وما لي ولبلال طعام يأكله ذو كبد إلا شيء يواري إبط بلال»

আল্লাহর রাস্তায় আমাকে ভীত সন্ত্রস্থ করা হয়েছে কিন্তু এর প্রতিশোধ হিসেবে কাউকে ভীত সন্ত্রস্ত করা হয়নি। আল্লাহর রাস্তায় আমাকে অনেক কষ্ট দেয়া হয়েছে কিন্তু এর প্রতিশোধ হিসেবে কাউকে কষ্ট দেয়া হয়নি। আমার উপর ত্রিশ দিন ও রাত অতিবাহিত হয়ে গেছে কিন্তু আমার ও বেলালের জন্য এমন কোন খাদ্যও ছিল না যা কোন ব্যক্তি খেতে পারে, তবে শুধু বেলাল যা কিছু তার বগলের নিচে নিয়েছে।[9]

অথচ তাঁর নিকট অনেক সম্পদ এসেছে, অনেক গণিমতের মাল লাভ করেছেন তিনি। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর হাতে অনেক বিজয় দান করেছেন। এরপরও তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে কোন অর্থ-কড়ি রেখে যাননি। তবে তিনি যে উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা হল: এলেম বা জ্ঞান। বস্তুত এটাই হল মীরাসুন্ নবুওয়াহ বা নবুওয়্যাতের উত্তরাধিকার। কেউ যদি সে উত্তরাধিকার গ্রহণ করতে চায়, সে যেন তা গ্রহণ করে এবং আনন্দ চিত্তে তা গ্রহণ করে।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«ما ترك رسول الله - صلى الله عليه وسلم - دينارًا ولا درهمًا، ولا شاةً، ولا بعيرًا، ولا أوصى بشيء»

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন প্রকার দিনার-দিরহাম, কোন প্রকার ছাগল বা উট রেখে যাননি এবং কোন প্রকার অসীয়তও করে যাননি।[10]

[1] মুসলিম, হাদিস: ২৩২৮

[2] সূরা সাদ, আয়াত: ৫

[3] যুমার, আয়াত: ৩

[4] সূরা সাবা, আয়াত: ২৪

[5] সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৭২

[6] মুসলিম, হাদিস: ১৭৯০

[7] মুসলিম, হাদিস: ১৭৭৬; বুখারি, হাদিস: ২৮৭৪

[8] বাগাবী শরহে সুন্নাতে বর্ণনা করেছেন, এবং দেখুন: সহীহ মুসলিম ৩/১৪০১

[9] তিরমিযী, হাদিস: ২৪৭২; আহমাদ, হাদিস: ১৪০৫৫

[10] মুসলিম, হাদিস: ১৬৩৫
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১ পর্যন্ত, সর্বমোট ১ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে