ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন- বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে মি’রাজ হয়েছিল সশরীরে। তিনি প্রথমে বুরাকে আরোহন করে মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মাকদিস পর্যন্ত ভ্রমণ করলেন। জিবরীল ফিরিস্তা সাথেই ছিলেন। মসজিদের দরজার হাতলের সাথে বুরাক বেঁধে সেখানে নেমে তিনি নাবীদের ইমাম হয়ে সলাত পড়লেন। কেউ কেউ বলেছেন- তিনি বেতেলহামে (জেরুজালেমে) যাত্রা বিরতি করেছিলেন এবং সেখানেই নাবীদের ইমামতি করেছেন। এটি মোটেও সঠিক নয়। মসজিদুল হারাম থেকে বাইতুল মাকদিস পর্যন্ত ভ্রমণকে ‘ইসরা’ অর্থাৎ রাতের ভ্রমণ বলা হয়। সে রাত্রেই বাইতুল মাকদিস হতে উর্ধ্বাকাশ পর্যন্ত মি’রাজের ঘটনা সংঘটিত হয়।

দুনিয়ার আকাশের নিকটবর্তী হলে জিবরীল ফিরিস্তা তাঁর জন্য আকাশের দরজা খোলার আবেদন করলে তা খুলে দেয়া হয়। প্রথম আকাশে তিনি মানব জাতির পিতা আদম (আঃ)কে দেখতে পেলেন। তাঁর সাথে সাক্ষাত করে তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং স্বাগত জানালেন। আদম (আঃ) মুহাম্মাদ (সাঃ) এর নবুওয়াতের স্বীকৃতি দিলেন। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে সেখানে আদমের সৌভাগ্যবান সন্তানদেরকে তাঁর ডান পাশে এবং হতভাগ্যদেরকে বাম পাশে দেখালেন।

অতঃপর তাঁকে দ্বিতীয় আকাশে উঠানো হল। সেখানে গিয়ে তিনি ঈসা এবং ইয়াহইয়া (আঃ) কে দেখতে পেলেন। তৃতীয় আকাশে ইউসূফ (আঃ) কে দেখতে পেলেন। এমনিভাবে চতুর্থ আকাশে গিয়ে ইদ্রী্ছ, পঞ্চম আকাশে হারুন এবং ষষ্ঠ আকাশে মূসা (আঃ) এর সাথে দেখা করলেন। মূসা (আঃ) কে সালাম দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে আসার সময় তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁকে ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন- এই ছেলেটিকে আমার অনেক পরে নাবী করে দুনিয়াতে প্রেরণ করা হয়েছে। কিন্তু আমার উম্মাতের চেয়ে অধিক সংখ্যক উম্মাত নিয়ে আমার পূর্বেই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। পরিশেষে তাঁকে সপ্তম আকাশে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে তিনি ইবরাহীম (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত করলেন। অতঃপর তাঁর সামনে সিদরাতুল মুনতাহা তথা সিমামেত্মর কূল বৃক্ষ এবং বাইতুল মা’মূর উন্মুক্ত করা হল। [1] অতঃপর তাঁকে মহা প্ররাক্রমশালী আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট উঠানো হল। তিনি তাঁর প্রভুর সান্নিধ্যে গেলেন। তখন মাত্র দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম। তখন আল্লাহ্ তাঁর দাসের প্রতি যা প্রত্যাদেশ করবার, তা প্রত্যাদেশ করলেন। অতঃপর তাঁর উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সলাত ফরয করা হল। ফেরত আসার সময় তাঁর সাথে মূসা (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত হল। মূসা (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন- আপনাকে কিসের আদেশ দেয়া হয়েছে? নাবী (সাঃ) বললেন- আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সলাত ফরয করা হয়েছে। মুসা (আঃ) বললেন- আপনার উম্মাত এত সলাত আদায় করতে পারবেনা। আপনি ফেরত যান এবং কমাতে বলেন। নাবী (সাঃ) জিবরীলের দিকে তাকালেন। মনে হচ্ছিল তিনি তাঁর কাছে পরামর্শ চাচ্ছেন। জিবরীল হ্যাঁ সূচক ইঙ্গিত দিলেন এবং বললেন- আপনি ইচ্ছা করলে যেতে পারেন। সুতরাং জিবরীল তাঁকে নিয়ে পুনরায় উপরে উঠলেন এবং মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ্ তা‘আলার সান্নিধ্যে গেলেন। সহীহ বুখারীতে এভাবেই উল্লেখ আছে।

কোন কোন বর্ণনায় আছে, আল্লাহ্ তাঁর উপর থেকে দশ ওয়াক্ত কমিয়ে দিলেন। চল্লিশ করা হল। তিনি নেমে এসে মূসার নিকট দিয়ে অতিক্রম করলেন এবং তাঁকে খবর দিলেন। তিনি বললেন- আপনি আবার আপনার রবের কাছে যান এবং কমাতে বলুন। এভাবে মুসা (আঃ) এবং আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে যাওয়া-আসা করতে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত করা হল। মুসা (আঃ) আবারও যেতে বললেন এবং কমানোর আবেদন করার পরামর্শ দিলেন। নাবী (সাঃ) এবার বললেন- আমি পুনরায় আমার রবের কাছে যেতে লজ্জাবোধ করছি। আমি এই পাঁচ ওয়াক্ত সলাত নিয়ে সন্তুষ্ট আছি এবং তা মেনে নিচ্ছি। এই বলে যখন তিনি চলতে লাগলেন তখন একজন ঘোষক ঘোষণা দিলেনঃ আমার ফরয ঠিক রাখলাম। কিন্তু বান্দাদের উপর থেকে সংখ্যা কমিয়ে দিলাম।

[1]. বায়তুল মা’মূর সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এতে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা ইবাদতের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেন। এক বার যারা সেখান থেকে বের হয়ে আসেন কিয়ামতের পূর্বে তারা আর তাতে প্রবেশের সুযোগ পাবেন না।
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১ পর্যন্ত, সর্বমোট ১ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে