بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৭৩ সূরাঃ আল-মুযযাম্মিল | Al-Muzzammil | سورة المزمل - আয়াত সংখ্যাঃ ২০ - মাক্কী
৭৩:১ یٰۤاَیُّہَا الۡمُزَّمِّلُ ۙ﴿۱﴾

হে চাদর আবৃত! আল-বায়ান

ওহে চাদরে আবৃত (ব্যক্তি)! তাইসিরুল

হে বস্ত্রাবৃত! মুজিবুর রহমান

১. হে বস্ত্ৰাবৃত!

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) হে বস্ত্রাবৃত! [1]

[1] যখন এই আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয় তখন নবী (সাঃ) চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে ছিলেন। আল্লাহ তাঁর এই অবস্থার চিত্র তুলে ধরে সম্বোধন করলেন। অর্থাৎ, এখন চাদর ছেড়ে দাও এবং রাতে সামান্য কিয়াম কর (জাগরণ কর); অর্থাৎ, তাহাজ্জুদের নামায পড়। বলা হয় যে, এই নির্দেশের ভিত্তিতে তাহাজ্জুদের নামায তাঁর উপর ওয়াজেব ছিল। (ইবনে কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৭৩:২ قُمِ الَّیۡلَ اِلَّا قَلِیۡلًا ۙ﴿۲﴾

রাতে সালাতে দাঁড়াও কিছু অংশ ছাড়া। আল-বায়ান

রাতে নামাযে দাঁড়াও তবে (রাতের) কিছু অংশ বাদে, তাইসিরুল

রাত জাগরণ কর কিছু অংশ ব্যতীত। মুজিবুর রহমান

২. রাতে সালাতে দাঁড়ান(১), কিছু অংশ ছাড়া,

(১) এখানে বিশেষভঙ্গিতে সম্বোধন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তাহাজ্জুদের আদেশ করা হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, আলোচ্য আয়াতসমূহ ইসলামের শুরুতে এবং কুরআন অবতরণের প্রাথমিক যুগে অবতীর্ণ হয়েছে। তখন পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয ছিল না। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মে'রাজের রাত্ৰিতে ফরয হয়েছিল। এই আয়াতে তাহাজ্জুদের সালাত কেবল ফরযই করা হয়নি; বরং তাতে রাত্রির কমপক্ষে এক চতুর্থাংশ মশগুল থাকাও ফরয করা হয়েছে। আয়াতের মূল আদেশ হচ্ছে কিছু অংশ বাদে সমস্ত রাত্ৰি সালাতে মশগুল থাকা। এই আদেশ পালনার্থে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম অধিকাংশ রাত্রি তাহাজ্জুদের সালাতে ব্যয় করতেন। ফলে তাদের পদদ্বয় ফুলে যায় এবং আদেশটি বেশ কষ্টসাধ্য প্রতীয়মান হয়। পূর্ণ এক বছর পর এই সূরার শেষাংশ (فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْهُ) অবতীর্ণ হলে দীর্ঘক্ষণ সালাতে দন্ডায়মান থাকার বাধ্যবাধকতা রহিত করে দেয়া হয় এবং বিষয়টি ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়ে ব্যক্ত করা হয় যে, যতক্ষণ সালাত আদায় করা সহজ মনে হয়, ততক্ষণ সালাত আদায় করাই তাহাজ্জুদের জন্যে যথেষ্ট। [ইমাম মুসলিম এই বিষয়বস্তু আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণনা করেন, হাদীস নং: ৭৪৬]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) রাত্রি জাগরণ কর, কিছু অংশ ব্যতীত।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৭৩:৩ نِّصۡفَہٗۤ اَوِ انۡقُصۡ مِنۡہُ قَلِیۡلًا ۙ﴿۳﴾

রাতের অর্ধেক কিংবা তার চেয়ে কিছুটা কম। আল-বায়ান

রাতের অর্ধেক (সময় দাঁড়াও) কিংবা তার থেকে কিছুটা কম কর, তাইসিরুল

অর্ধ রাত কিংবা তদপেক্ষা কিছু কম। মুজিবুর রহমান

৩. আধা-রাত বা তার চেয়েও কিছু কম।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩) অর্ধরাত্রি কিংবা তার চাইতে অল্প।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৭৩:৪ اَوۡ زِدۡ عَلَیۡہِ وَ رَتِّلِ الۡقُرۡاٰنَ تَرۡتِیۡلًا ؕ﴿۴﴾

অথবা তার চেয়ে একটু বাড়াও। আর স্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে কুরআন আবৃত্তি কর। আল-বায়ান

অথবা তার চেয়ে বাড়াও, আর ধীরে ধীরে সুস্পষ্টভাবে কুরআন পাঠ কর। তাইসিরুল

অথবা তদপেক্ষা বেশী। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে। মুজিবুর রহমান

৪. অথবা তার চেয়েও একটু বাড়ান। আর কুরআন তিলাওয়াত করুন ধীরে ধীরে সুস্পষ্টভাবে(১);

(১) এখানে বলা হয়েছে যে, তারতীল সহকারে পড়তে হবে। ترتيل বলে উদ্দেশ্য হলো ধীরে ধীরে সঠিকভাবে বাক্য উচ্চারণ করা। অর্থাৎ কুরআনের শব্দগুলো ধীরে ধীরে মুখে উচ্চারণ করার সাথে সাথে তা উপলব্ধি করার জন্য গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনাও করতে হবে। [ইবন কাসীর] আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুরআন পাঠের নিয়ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, শব্দগুলোকে টেনে টেনে পড়তেন। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পড়ে বললেন যে, তিনি আল্লাহ, রাহমান এবং রাহীম শব্দকে মদ্দ করে বা টেনে পড়তেন।” [বুখারী: ৫০৪৬]

উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে একই প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক একটি আয়াত আলাদা আলাদা করে পড়তেন এবং প্রতিটি আয়াত পড়ে থামতেন। তিনি ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন' বলে থামতেন। তারপর ‘আর-রাহমানির রাহীম’ বলে থামতেন। তারপর ‘মালিকি ইয়াওমিদীন’ বলে থামতেন। [মুসনাদে আহমাদ: ৬/৩০২, আবু দাউদ: ১৪৬৬, তিরমিযী: ২৯২৭]

হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু বৰ্ণনা করেন, একদিন রাতে আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সালাত পড়তে দাঁড়ালাম। আমি দেখলাম, তিনি এমনভাবে কুরআন তেলাওয়াত করছেন যে, যেখানে তাসবীহের বিষয় আসছে সেখানে তিনি তাসবীহ পড়ছেন, যেখানে দো’আর বিষয় আসছে সেখানে দোআ, করছেন এবং যেখানে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার বিষয় আসছে সেখানে তিনি আশ্রয় প্রার্থনা করছেন। [মুসলিম: ৭৭২]

আবু যার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বৰ্ণনা করেন, একবার রাতের সালাতে কুরআন তেলাওয়াত করতে করতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এ আয়াতটির কাছে পৌছলেন “আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন, তবে তারা আপনারই বান্দা। আর যদি আপনি তাদের ক্ষমা করে দেন, তাহলে আপনি পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞ” তখন তিনি বার বার এ আয়াতটিই পড়তে থাকলেন এবং এভাবে ভোর হয়ে গেল। [মুসনাদে আহমাদ: ৫/১৪৯]

সাহাবী ও তাবেয়ীগণেরও এই অভ্যাস ছিল। তাছাড়া, যথাসম্ভব সুললিত স্বরে তিলাওয়াত করাও তারতীলের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে নবী সশব্দে সুললিত স্বরে তেলাওয়াত করেন, তার কেরাআতের মত অন্য কারও কেরাআত আল্লাহ তা'আলা শুনেন না। [বুখারী: ৫০২৩, ৫০২৪] তবে পরিস্কার ও বিশুদ্ধ উচ্চারণসহ শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ চিন্তা করে তদ্বারা প্রভাবান্বিত হওয়াই আসল তারতীল। অনুরূপভাবে সুন্দর করে পড়াও এর অংশ। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে কুরআনকে সুন্দর স্বরে পড়ে না সে আমার দলভুক্ত নয়।” [বুখারী: ৭৫২৭]

অন্য হাদীসে এসেছে, “তোমরা কুরআনকে তোমাদের সুর দিয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত কর” [ইবনে মাজহঃ ১৩৪২] আবু মুসা আল-আশা’আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সুমিষ্ট স্বরে কুরআন পাঠ করতেন বিধায় রাসূল তার প্রশংসা করে বলেছিলেন, “তোমাকে দাউদ পরিবারের সুর দেয়া হয়েছে”। [বুখারী: ৫০৪৮, মুসলিম: ৭৯৩] তাছাড়া হাদীসে আরও এসেছে, “কিয়ামতের দিন কুরআনের অধিকারীকে বলা হবে, তুমি পড় এবং আরোহন করতে থাক। সেখানেই তোমার স্থান হবে যেখানে তোমার কুরআন পড়ার আয়াতটি শেষ হবে।” [আবু দাউদ: ১৪৬৪, তিরমিযী: ২৯১৪]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) অথবা তার চাইতে বেশী।[1] আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে। [2]

[1] এটা قَلِيْلاَ এর পরিবর্ত স্বরূপ (বদল)। অর্থাৎ, এই কিয়াম যদি অর্ধরাত থেকে কিছু কম (এক-তৃতীয়াংশ) হয় অথবা কিছু বেশী (দুই-তৃতীয়াংশ) হয়, তাতে কোন দোষ নেই।

[2] সুতরাং বহু হাদীসে এসেছে যে, নবী (সাঃ) কুরআন পড়তেন ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে এবং তিনি তাঁর উম্মতকেও ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে থেমে থেমে কুরআন পড়া শিক্ষা দিতেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৭৩:৫ اِنَّا سَنُلۡقِیۡ عَلَیۡکَ قَوۡلًا ثَقِیۡلًا ﴿۵﴾

নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি এক অতিভারী বাণী নাযিল করছি। আল-বায়ান

আমি তোমার উপর গুরুভার কালাম নাযিল করব (বিশ্বের বুকে যার প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্বভার অতি বড় কঠিন কাজ)। তাইসিরুল

আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। মুজিবুর রহমান

৫. নিশ্চয় আমরা আপনার প্রতি নাযিল করছি গুরুভার বাণী।(১)

(১) এখানে ভারী বা গুরুতর বাণী বলে পবিত্র কুরআন বোঝানো হয়েছে। গুরুভার বাণী বলার কারণ হলো, তার নির্দেশ অনুসারে কাজ করা অনেক বেশী কঠিন ও গুরুতর কাজ। তাছাড়া এ জন্যও একে গুরুভার ও কঠিন বাণী বলা হয়েছে যে, তার অবতরণের ভার বহন করা অত্যান্ত কঠিন কাজ ছিল। যায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু বৰ্ণনা করেছেন যে, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অহী নাযিল হওয়ার সময় তিনি আমার উরুর ওপর তাঁর উরু, ঠেকিয়ে বসেছিলেন। আমার উরুর ওপর তখন এমন চাপ পড়ছিলো যে, মনে হচ্ছিলো তা এখনই ভেঙে যাবে। [বুখারী: ৭৭৫, ৫০৪৩]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বৰ্ণনা করেন, আমি প্ৰচণ্ড শীতের দিনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অহী নাযিল হতে দেখেছি। সে সময়ও তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরতে থাকতো। [বুখারী: ২] অন্য বর্ণনায় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, উটনীর ওপর সওয়ার থাকা অবস্থায় যখনই তার ওপর অহী নাযিল হতো উটনী তখন তার বুক মাটিতে ঠেকিয়ে দিতো। অহী নাযিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারতো না। [মুসনাদে আহমাদ: ৬/১১৮, মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৫০৫] [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫) আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করব গুরুভার বাণী। [1]

[1] রাতের কিয়াম (নামায) যেহেতু মানুষের জন্য সাধারণতঃ ভারী হয়ে থাকে, তাই ‘জুমলা মু’তারিযা’ (পূর্বের বিষয়ের সাথে সম্পর্কহীন বাক্য) স্বরূপ বললেন যে, আমি এর থেকেও বেশী ভারী কথা তোমার উপর অবতীর্ণ করব। অর্থাৎ, কুরআন। যার বিধি-বিধানের উপর আমল করা, তার নির্ধারিত সীমা রক্ষা করা এবং তার দাওয়াত ও প্রচার অতি কঠিন ও ভারী কাজ। কেউ কেউ ভারী বলতে সেই ভার বুঝিয়েছেন, যা অহী অবতরণের সময় তাঁর উপর আপতিত হত। যার ভারে প্রচন্ড শীতের দিনেও তিনি ঘর্মসিক্ত হতেন। (ইবনে কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৭৩:৬ اِنَّ نَاشِئَۃَ الَّیۡلِ ہِیَ اَشَدُّ وَطۡاً وَّ اَقۡوَمُ قِیۡلًا ؕ﴿۶﴾

নিশ্চয় রাত-জাগরণ আত্মসংযমের জন্য অধিকতর প্রবল এবং স্পষ্ট বলার জন্য অধিকতর উপযোগী। আল-বায়ান

বাস্তবিকই রাতে বিছানা ছেড়ে উঠা আত্মসংযমের জন্য বেশি কার্যকর এবং (কুরআন) স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই রাতে জাগরণ ইবাদাতের জন্য গভীর মনোনিবেশ, হৃদয়ঙ্গম এবং স্পষ্ট উচ্চারণে অনুকূল। মুজিবুর রহমান

৬. নিশ্চয় রাতের বেলার উঠা(১) প্রবৃত্তি দলনে প্রবলতর(২) এবং বাকস্ফুরাণে অধিক উপযোগী।(৩)

(১) نَاشِئَة শব্দের ব্যাখ্যায় কয়েকটি মত আছে। একটি মত হলো, এর মানে রাতের বেলা শয্যা ত্যাগকারী ব্যক্তি। দ্বিতীয় মতটি হলো এর অর্থ রাত্রিকালীন সময়। [ইবন কাসীর]


(২) আয়াতে وطأً শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ এতো ব্যাপক যে, একটি মাত্ৰ বাক্যে তা বুঝানো সম্ভব নয়। এর একটি অর্থ হলো, রাতের বেলা ইবাদাত-বন্দেগীর জন্য শয্যা ত্যাগ করে ওঠা এবং দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা যেহেতু মানুষের স্বভাব-বিরুদ্ধ কাজ, মানুষের মন ও প্রবৃত্তি এ সময় আরাম কামনা করে, তাই এটি এমন একটি কাজ ও চেষ্টা-সাধনা যা প্রবৃত্তির জন্য অত্যন্ত কঠিন। দ্বিতীয় অর্থ হলো, রাত্ৰিবেলার সালাত দিনের সালাত অপেক্ষা অধিক স্থায়ী ও ফলপ্রসু। কেননা, দিনের বেলা মানুষের চিন্তা-চেতনা বিভিন্ন বিষয়ে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু রাত্ৰিবেলা তা থেকে মুক্ত হয়। আরেকটি অর্থ হলো, ইবাদতকারী ব্যক্তিকে সক্রিয় রাখার পন্থা, কেননা রাত্ৰিবেলা বিভিন্ন চিন্তা-চেতনা ও কাজ থেকে মুক্ত হওয়ায় সে সময়ে ইবাদতে নিবিষ্ট হওয়া যায়। [কুরতুবী]


(৩) أقوم শব্দের অর্থ অধিক সঠিক। আর قِيلًا শব্দের অর্থ কথা। তাই এর আভিধানিক অর্থ হলো, “কথাকে আরো বেশী যথার্থ ও সঠিক বানায়।” অর্থাৎ রাত্ৰিবেলায় কুরআন তেলাওয়াত অধিক শুদ্ধতা ও স্থিরতা সহকারে হতে পারে। এর মূল বক্তব্য হলো, সে সময় মানুষ আরো বেশী প্রশান্তি, তৃপ্তি ও মনোযোগ সহকারে বুঝে কুরআন মাজীদ পড়তে পারে। কারণ, তখন বিভিন্ন প্রকার ধ্বনি ও হট্টগোল দ্বারা অন্তর ও মস্তিস্ক ব্যাকুল হয় না। [দেখুন: ফাতহুল কাদীর] ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা এর ব্যাখ্যা করেছেন “গভীর চিন্তা-ভাবনা ও মনোনিবেশসহ কুরআন পাঠের জন্য এটা একটা অপেক্ষাকৃত উপযুক্ত সময়।” [আবু দাউদ: ১৩০৪]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) নিশ্চয়ই রাত্রিজাগরণ প্রবৃত্তি দলনে অধিক সহায়ক [1] এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অধিক অনুকূল। [2]

[1] এর দ্বিতীয় অর্থ হল, রাতের নির্জন পরিবেশে নামাযী তাহাজ্জুদের নামাযে যে কুরআন পাঠ করে তার অর্থসমূহ অনুধাবন করার ব্যাপারে (মুখ বা) কানের সাথে অন্তরের বড়ই মিল থাকে।

[2] এর দ্বিতীয় অর্থ হল, দিনের তুলনায় রাতে কুরআন পাঠ বেশী পরিষ্কার হয় এবং মনোনিবেশ করার ব্যাপারে বড়ই প্রভাবশালী হয়। কারণ, তখন অন্য সকল শব্দ নিশ্চুপ-নীরব হয়। পরিবেশ থাকে নিঝুম-নিস্তব্ধ। এই সময় নামাযী যা কিছু পড়ে, তা শব্দের গোলযোগ ও পৃথিবীর হট্টগোল থেকে সুরক্ষিত থাকে এবং তার মাঝে নামাযী তৃপ্তি লাভ করে ও তার প্রতিক্রিয়া অনুভব করে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৭৩:৭ اِنَّ لَکَ فِی النَّہَارِ سَبۡحًا طَوِیۡلًا ؕ﴿۷﴾

নিশ্চয় তোমার জন্য দিনের বেলায় রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। আল-বায়ান

দিনের বেলায় তোমার জন্য আছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। তাইসিরুল

দিনে তোমার জন্য রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। মুজিবুর রহমান

৭. নিশ্চয় দিনের বেলায় আপনার জন্য রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা।(১)

(১) سَبْحًا শব্দের অর্থ প্রবাহিত হওয়া ও ঘোরাফেরা করা। এ কারণেই সাঁতার কাটাকে سباحة বলা হয়। এখানে এর অর্থ দিনমানের কর্মব্যস্ততা ও জীবিকার জন্য ঘোরাঘুরির কারণে অন্তরের ব্যস্ততা। দিনের কর্মব্যস্ততার কারণে একাগ্রচিত্তে ইবাদতে মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। [দেখুন: করতুবী; সা’দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭) দিবাভাগে তোমার জন্য রয়েছে দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। [1]

[1] سَبْحٌ এর অর্থ হল الجَرِيُ والدَّوَرانُ (চলা ও ঘোরা-ফেরা করা)। অর্থাৎ, দিনের বেলায় বহু কর্মব্যস্ততা থাকে। এটা প্রথমোক্ত কথারই তাকীদ। অর্থাৎ, রাতের নামায এবং তেলাঅত বেশী উপকারী ও প্রভাবশালী।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৭৩:৮ وَ اذۡکُرِ اسۡمَ رَبِّکَ وَ تَبَتَّلۡ اِلَیۡہِ تَبۡتِیۡلًا ؕ﴿۸﴾

আর তুমি তোমার রবের নাম স্মরণ কর এবং একাগ্রচিত্তে তাঁর প্রতি নিমগ্ন হও। আল-বায়ান

কাজেই তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একাগ্রচিত্তে তাঁর প্রতি মগ্ন হও। তাইসিরুল

সুতরাং তুমি তোমার রবের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্ঠভাবে তাতে মগ্ন হও। মুজিবুর রহমান

৮. আর আপনি আপনার রবের নাম স্মরণ করুন এবং তার প্রতি মগ্ন হোন একনিষ্ঠভাবে।(১)

(১) অর্থাৎ আপনি সমগ্র সৃষ্টি থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টিবিধানে ও ইবাদতে মগ্ন হোন। এর সাধারণ অর্থে ইবাদতে শির্ক না করাও দাখিল এবং নিজের সমস্ত কর্মকাণ্ডে তথা উঠাবসায়, চলাফেরায় দৃষ্টি ও ভরসা আল্লাহর প্রতি নিবদ্ধ রাখা এবং অপরকে লাভ-লোকসান ও বিপদাপদ থেকে উদ্ধারকারী মনে না করাও দাখিল। দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছুকে পরিত্যাগ করে আল্লাহর কাছে যা আছে তৎপ্রতি মনোনিবেশ করাও এর অর্থের অন্তর্গত। কিন্তু এই تَبْتِيل তথা দুনিয়ার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ সেই رهبانية তথা বৈরাগ্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কুরআনে যার নিন্দা করা হয়েছে এবং হাদীসে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কেননা, শরীয়াতের পরিভাষায় رهبانية বা বৈরাগ্য এর অর্থ দুনিয়ার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা এবং ভোগ সামগ্ৰী ও হালাল বস্তুসমুহকে ইবাদতের নিয়তে পরিত্যাগ করা।

পক্ষান্তরে এখানে যে সম্পর্কচ্ছেদের আদেশ করা হয়েছে, তা এই যে, বিশ্বাসগতভাবে অথবা কাৰ্যগতভাবে আল্লাহর সম্পর্কের উপর কোন সৃষ্টির সম্পর্ককে প্রবল হতে না দেয়া। এ ধরণের সম্পর্কচ্ছেদ বিবাহ, আত্মীয়তার সম্পর্ক ইত্যাদি যাবতীয় সাংসারিক কাজ-কারবারের পরিপন্থী নয়; বরং এগুলোর সাথে জড়িত থেকেও এটা সম্ভবপর। রাসূলগণের সুন্নত; বিশেষতঃ রাসূলকুল শিরোমণি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমগ্র জীবন ও আচারাদি এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। আয়াতে تَبْتِيل শব্দ দ্বারা যে অর্থ ব্যক্ত করা হয়েছে, মূলত তা হলো সকল ইবাদত একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য করা এবং এর মাধ্যমে একমাত্র তাঁরই মুখাপেক্ষী হওয়া। [দেখুন: কুরতুবী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮) সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর[1] এবং একনিষ্ঠভাবে তাতে মগ্ন হও। [2]

[1] অর্থাৎ, তা অব্যাহতভাবে পালন কর। দিন হোক বা রাত, সব সময় আল্লাহর তাসবীহ, তাহমীদ এবং তাকবীর ও তাহলীল পড়তে থাক।

[2] تَبَتُّلٌ এর অর্থ পৃথক ও আলাদা হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, আল্লাহর ইবাদত এবং তাঁর কাছে দু’আ ও মুনাজাতের জন্য সব কিছু থেকে পৃথক হয়ে একাগ্রচিত্তে তাঁর প্রতি মনোযোগী হওয়া। তবে এটা বৈরাগ্য থেকে ভিন্ন জিনিস। বৈরাগ্য তো সংসার ত্যাগের নাম, যা ইসলামে অপছন্দনীয় জিনিস। পক্ষান্তরে تَبَتُّلٌ এর অর্থ হল, পার্থিব কার্যাদি সম্পাদনের সাথে সাথে একাগ্রচিত্তে নম্র ও বিনয়ী হয়ে আল্লাহর ইবাদতের প্রতিও মনোযোগী হওয়া। আর এটা প্রশংসনীয় জিনিস।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৭৩:৯ رَبُّ الۡمَشۡرِقِ وَ الۡمَغۡرِبِ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ فَاتَّخِذۡہُ وَکِیۡلًا ﴿۹﴾

তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। সুতরাং তাঁকেই তুমি কার্য সম্পাদনকারীরূপে গ্রহণ কর। আল-বায়ান

(তিনি) পূর্ব ও পশ্চিমের সর্বময় কর্তা, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, অতএব তাঁকেই তুমি তোমার কার্য সম্পদানকারী বানিয়ে লও। তাইসিরুল

তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রাব্ব, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই; অতএব তাঁকেই কর্ম-বিধায়ক রূপে গ্রহণ কর। মুজিবুর রহমান

৯. তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই; অতএব তাকেই আপনি গ্ৰহণ করুন কর্মবিধায়করূপে।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯) তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের অধিকর্তা, তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই। অতএব তাঁকেই গ্রহণ কর উকীল (কর্মবিধায়ক)রূপে।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৭৩:১০ وَ اصۡبِرۡ عَلٰی مَا یَقُوۡلُوۡنَ وَ اہۡجُرۡہُمۡ ہَجۡرًا جَمِیۡلًا ﴿۱۰﴾

আর তারা যা বলে, তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং সুন্দরভাবে তাদেরকে পরিহার করে চল। আল-বায়ান

তারা যা বলে সে ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ কর আর ভদ্রতার সঙ্গে তাদেরকে পরিহার ক’রে চল। তাইসিরুল

লোকে যা বলে, তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং সৌজন্য সহকারে উহাদেরকে পরিহার করে চল। মুজিবুর রহমান

১০. আর লোকে যা বলে, তাতে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং সৌজন্যের সাথে তাদেরকে পরিহার করে চলুন।(১)

(১) এর শাব্দিক অর্থ কোন কিছুকে ত্যাগ করা বা পরিহার করা। অর্থাৎ মিথ্যারোপকারী কাফেররা আপনাকে যেসব পীড়াদায়ক কথাবার্তা বলে, আপনি সেসবের প্রতিশোধ নিবেন না ঠিক, কিন্তু তাদের সাথে সম্পর্কও রাখবেন না। বরং সৌজন্যের সাথে তাদের পরিহার করে চলুন। কোন কোন তফসীরবিদ বলেনঃ পরবর্তীতে অবতীর্ণ জিহাদের আদেশ সম্বলিত আয়াত দ্বারা এই আয়াতের নির্দেশ রহিত হয়ে গেছে। [কুরতুবী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০) লোকে যা বলে, তাতে তুমি ধৈর্যধারণ কর এবং সৌজন্য সহকারে তাদেরকে পরিহার করে চল।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ 1 to 10 of 20 পাতা নাম্বারঃ 1 2 Next »