সূরা সংক্রান্ত আলোচনাঃ
আয়াত সংখ্যাঃ ১৬৫ ৷
নামকরণঃ এ সূরারই ১৩৬, ১৩৯ ও ১৪২ নং আয়াতসমূহে উল্লেখিত “আল-আন’আম” শব্দ থেকে এ সূরার নামকরণ করা হয়েছে। আল-আন’আম শব্দের অর্থঃ গবাদি পশু।
সূরা নাযিলের প্রেক্ষাপটঃ এ সূরা মক্কী সূরা বলেই প্রসিদ্ধ। কুরআনের ধারাবাহিকতা অনুসারে এটাই প্রথম মক্কী সূরা। এ সূরার মৌলিক আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাত। মুফাসসিরগণের মধ্যে মুজাহিদ, কালবী, কাতাদাহ প্রমূখও প্রায় এ কথাই বলেন। আবু ইসহাক ইসফিরায়িনী বলেন, এ সূরাটিতে তাওহীদের সমস্ত মূলনীতি ও পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। [কুরতুবী, আত-তাফসীরুল মুনীর]
সূরার ফযিলতঃ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ সূরা আল-আন’আমের একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, কয়েকখানি আয়াত বাদে গোটা সূরাটিই একযোগে মক্কায় নাযিল হয়েছে। জাবের, ইবন আব্বাস, আনাস ও ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সূরা আল-আন’আম নাযিল হচ্ছিল, তখন এত ফিরিশতা তার সাথে অবতরণ করেছিলেন যে, তাতে আকাশের প্রান্তদেশ ছেয়ে যায়। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/২৭০; ২৪৩১] উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সূরা আল-আন’আম কুরআনের উৎকৃষ্ট অংশের অন্তর্গত। [সুনান দারমী ২/৫৪৫; ৩৪০১]
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও যমীন এবং সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো। তারপর কাফিররা তাদের রবের সমতুল্য স্থির করে। আল-বায়ান
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন আর সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো, এতদসত্ত্বেও যারা কুফরী করেছে তারা (অন্যকে) তাদের প্রতিপালকের সমকক্ষ দাঁড় করিয়েছে। তাইসিরুল
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্য যিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন আলো ও অন্ধকার; এ সত্ত্বেও যারা কাফির হয়েছে তারা অপর কিছুকে তাদের রবের সমকক্ষ নিরূপণ করেছে। মুজিবুর রহমান
[All] praise is [due] to Allah, who created the heavens and the earth and made the darkness and the light. Then those who disbelieve equate [others] with their Lord. Sahih International
১. সকল প্রশংসা আল্লাহরই(১) যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, আর সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো।(২) এরপরও কাফেরগণ তাদের রব-এর সমকক্ষ দাঁড় করায়।(৩)
(১) এ সূরাটিকে (الْحَمْدُ لِلَّهِ) বাক্য দ্বারা আরম্ভ করা হয়েছে। এতে খবর দেয়া হয়েছে যে, সর্ববিধ প্রশংসা আল্লাহর জন্য। এ খবরের উদ্দেশ্য মানুষকে প্রশংসা শিক্ষা দেয়া। যেন বলা হচ্ছে, হে মানুষ! তোমরা তার জন্যই যাবতীয় হামদ ও শোকর নির্দিষ্ট কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আরও সৃষ্টি করেছেন আসমান ও যমীন। তাঁর সাথে কাউকেও সামান্যতম অংশীদারও করবে না। এ বিশেষ পদ্ধতি শিক্ষাদানের মধ্যে এদিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, পরিপূর্ণ হামদ বা প্রশংসা একমাত্র তাঁরই, যার কোন শরীক নেই। তাকে ব্যতীত আর যে সমস্ত উপাস্যের ইবাদাত করা হয়, তারা এ হামদ প্রাপ্য নয়। [তাবারী] সুতরাং কেউ প্রশংসা করুক বা না করুক, তিনি স্বীয় ওজুদ বা সত্তার পরাকাষ্ঠার দিক দিয়ে নিজেই প্রশংসনীয়। এ বাক্যের পর আসমান ও যমীন এবং অন্ধকার ও আলো সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করে তার প্রশংসনীয় হওয়ার প্রমাণও ব্যক্ত করা হয়েছে যে, যে সত্তা এহেন মহান শক্তি-সামর্থ্য ও বিজ্ঞবান, তিনিই হামদ বা প্রশংসার যোগ্য হতে পারেন। কাতাদা বলেন, এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ তা'আলা আসমানকে যমীনের পূর্বে, অন্ধকারকে আলোর পূর্বে এবং জান্নাতকে জাহান্নামের পূর্বে সৃষ্টি করেছেন। [তাবারী]
(২) এ আয়াতে سماوات শব্দটিকে বহুবচনে এবং أرض শব্দটিকে একবচনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও অন্য এক আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসমানের ন্যায় যমীনও সাতটি। [যেমন, সূরা আত-তালাক ১২] এমনিভাবে ظلمات শব্দটিকে বহুবচনে এবং نور শব্দটিকে একবচনে উল্লেখ করার মাঝে ইঙ্গিত রয়েছে যে, نور বলে বিশুদ্ধ সরল পথ ব্যক্ত করা হয়েছে এবং তা মাত্র একটিই। আর ظلمات বলে ভ্রান্ত পথ ব্যক্ত করা হয়েছে, যা অসংখ্য। তাছাড়া نور বা আলো ظلمات বা অন্ধকার থেকে উত্তম। [বাহরে মুহীত, ইবন কাসীর]
(৩) আলোচ্য আয়াতের উদ্দেশ্য একত্ববাদের স্বরূপ ও সুস্পষ্ট প্রমাণ বর্ণনা করে জগতের ঐসব জাতিকে হুশিয়ার করা যারা মূলতঃ একত্ববাদে বিশ্বাসী নয় কিংবা বিশ্বাসী হওয়া সত্বেও একত্ববাদের তাৎপর্যকে পরিত্যাগ করে বসেছে। অগ্নি উপাসকদের মতে জগতের স্রষ্টা দু’জন - ইয়াযদান ও আহরামান। তারা ইয়াযদানকে মঙ্গলের স্রষ্টা এবং আহরামানকে অমঙ্গলের স্রষ্টা বলে বিশ্বাস করে। এ দুটিকেই তারা অন্ধকার ও আলো বলে ব্যক্ত করে। এমনিভাবে নাসারারা একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়ার সাথে সাথে ঈসা আলাইহিস সালাম ও তার মাতা মারইয়াম আলাইহাস সালাম-কে আল্লাহ তা'আলার অংশীদার সাব্যস্ত করেছে। এরপর একত্ববাদের বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা ‘একে তিন’ এবং ‘তিনে এক’ এর অযৌক্তিক মতবাদের আশ্রয় নিয়েছে। আরবের মুশরিকরা প্রতিটি পাহাড়ের প্রতিটি বড় পাথরকেও তাদের উপাস্য বানিয়েছে। [আল-মানার]
মোটকথা, যে মানবকে আল্লাহ তা'আলা আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা করেছিলেন, তারা যখন পথভ্রষ্ট হল, তখন চন্দ্র, সূর্য, তারকারাজি, আকাশ, পানি, বৃক্ষলতা এমনকি পোকা-মাকড়কেও সিজদার যোগ্য উপাস্য, রুযীদাতা ও বিপদ বিদূরণকারী সাব্যস্ত করে নিল। কুরআনুল কারীমের আলোচ্য আয়াত আল্লাহ তা'আলাকে যমীন ও আসমানের স্রষ্টা এবং অন্ধকার ও আলোর উদ্ভাবক বলে উপরোক্ত সব ভ্রান্ত বিশ্বাসের মূলোৎপাটন করেছে। কেননা, অন্ধকার ও আলো, আসমান ও যমীন এবং এতে উৎপন্ন যাবতীয় বস্তু আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্ট। অতএব, এগুলোকে কেমন করে আল্লাহ্ তা'আলার অংশীদার করা যায়? যিনি সৃষ্টি করেন তিনি কি যারা সৃষ্টি করতে পারে না তাদের মত? সুতরাং কিভাবে ইবাদাতে ও সম্মানে তাঁর সমকক্ষ কাউকে দাড় করানো যায়? [ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১) প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আর সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার ও আলো।[1] এতদসত্ত্বেও অবিশ্বাসীগণ তাদের প্রতিপালকের সমকক্ষ স্থির করে। [2]
[1] ظُلُمَات বলতে রাতের অন্ধকার এবং نُور বলতে দিনের আলো বুঝানো হয়েছে। অথবা কুফরীর অন্ধকার এবং ঈমানের জ্যোতি বুঝানো হয়েছে। ‘নূর’ (জ্যোতি) একবচন এবং ‘যুলুমাত’ (অন্ধকার) বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, অন্ধকারের কারণ অনেক এবং তার প্রকারাদিও বিভিন্ন। পক্ষান্তরে ‘নূর’ (জ্যোতি)র উল্লেখ জিন্স (জাত) স্বরূপ করা হয়েছে, যা তার সমস্ত প্রকারকে নিজের মধ্যে শামিল করে নেয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) আবার এটাও হতে পারে যে, হিদায়াত এবং ঈমানের রাস্তা যেহেতু একটাই, চার অথবা পাঁচ কিংবা ভিন্ন ভিন্ন নয়, তাই ‘নূর’কে একবচন শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে।
[2] অর্থাৎ, তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন কাদা মাটি থেকে তারপর নির্ধারণ করেছেন একটি কাল, আর তাঁর কাছে আছে একটি নির্দিষ্ট কাল, তারপর তোমরা সন্দেহ কর। আল-বায়ান
যিনি মাটি থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর (তোমাদের জীবনের জন্য) একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারিত করেছেন, এছাড়া আরেকটি নির্ধারিত মেয়াদ আছে (যে সম্পর্কিত জ্ঞান আছে) তাঁর কাছে, কিন্তু তোমরা সন্দেহই করে চলেছ। তাইসিরুল
অথচ তিনি তোমাদের মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের জীবনের জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করেছেন, এছাড়া আরও একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ তাঁর নিকট নির্ধারিত রয়েছে, কিন্তু এরপরেও তোমরা সন্দেহ করে থাক। মুজিবুর রহমান
It is He who created you from clay and then decreed a term and a specified time [known] to Him; then [still] you are in dispute. Sahih International
২. তিনিই তোমাদেরকে কাদামাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন(১), তারপর একটা সময় নির্দিষ্ট করেছেন এবং আর একটি নির্ধারিত সময় আছে যা তিনিই জানেন, এরপরও তোমরা সন্দেহ কর(২)।
(১) প্রথম আয়াতে বৃহৎ জগত অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বের বৃহত্তম বস্তুগুলোকে আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্ট ও মুখাপেক্ষী বলে মানুষকে নির্ভুল একত্ববাদের শিক্ষা দেয়া হয়েছে। অতঃপর দ্বিতীয় আয়াতে মানুষকে বলা হয়েছে যে, তোমার অস্তিত্ব স্বয়ং একটি ক্ষুদ্র জগৎবিশেষ। যদি এরই সূচনা, পরিণতি ও বাসস্থানের প্রতি লক্ষ্য করা হয়, তবে একত্ববাদ একটা বাস্তব সত্য হয়ে সামনে ফুটে উঠবে। আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃজন করেছেন।” আল্লাহ্ তা'আলা আদম আলাইহিস সালাম-কে একটি বিশেষ পরিমাণ মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। [ইবন কাসীর] সমগ্র পৃথিবীর অংশ এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ কারণেই আদম-সন্তানরা বর্ণ, আকার, চরিত্র ও অভ্যাসে বিভিন্ন।
কেউ কৃষ্ণবর্ণ, কেউ শ্বেতবর্ণ, কেউ লালবর্ণ, কেউ কঠোর, কেউ নম্র, কেউ পবিত্র-স্বভাব বিশিষ্ট এবং কেউ অপবিত্র স্বভাবের হয়ে থাকে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা আদমকে এমন এক মুষ্টি মাটি থেকে তৈরী করেছেন যে মুষ্টি সমস্ত মাটি থেকে নেয়া হয়েছে। তাই আদম সন্তান মাটির মতই হয়েছে। তাদের মধ্যে লাল, সাদা, কালো, আবার এর মাঝামাঝি রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ নম্র, কেউ চিন্তাগ্রস্ত, কেউ মন্দ, কেউ ভাল, কেউ এর মাঝামাঝি পর্যায়ের রয়েছে। [আবুদাউদ: ৪৬৯৩]
(২) পূর্বে আদমসন্তানদের সৃষ্টির সূচনা বর্ণনা করা হয়েছে। এখন এর পরিণতির দুটি মঞ্জিল উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মানবের ব্যক্তিগত পরিণতি, যাকে মৃত্যু বলা হয়। অপরটি সমগ্র মানবগোষ্ঠীর ও তার উপকারে নিয়োজিত সৃষ্টিজগত- সবার সামষ্টিক পরিণতি, যাকে কেয়ামত বলা হয়। প্রথমটির ব্যাপারে বলেছেন, (ثُمَّ قَضَىٰ أَجَلًا) অর্থাৎ মানব সৃষ্টির পর আল্লাহ্ তা'আলা তার স্থায়িত্ব ও আয়ুস্কালের জন্য একটি মেয়াদ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ মেয়াদের শেষ প্রান্তে পৌছার নাম মৃত্যু। এ মেয়াদ মানবের জানা না থাকলেও এর প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষ অবগত। কেননা, সে সর্বদা, সর্বত্র আশ-পাশের আদম-সন্তানদেরকে মারা যেতে দেখে। এরপর সমগ্র বিশ্বের পরিণতি অর্থাৎ কেয়ামতের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “আরো একটি মেয়াদ নির্দিষ্ট আছে, যা একমাত্র তার কাছেই” অর্থাৎ আল্লাহই জানেন, এ মেয়াদের পূর্ণ জ্ঞান ফিরিশতাদের নেই এবং মানুষেরও নেই।
সারকথা এই যে, প্রথম আয়াতে বৃহৎ জগত অর্থাৎ গোটা বিশ্বের অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তা আল্লাহ্ তাআলা কর্তৃক সৃষ্ট ও নির্মিত। দ্বিতীয় আয়াতে এমনিভাবে ক্ষুদ্র জগৎ অর্থাৎ মানুষ যে আল্লাহর সৃষ্টজীব, তা বর্ণিত হয়েছে। এরপর মানুষকে শৈথিল থেকে জাগ্রত করার জন্য বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক মানুষের একটি বিশেষ আয়ুষ্কাল রয়েছে, যার পর তার মৃত্যু অবধারিত। প্রতিটি মানুষ এ বিষয়টি সর্বক্ষণ নিজের আশ-পাশে প্রত্যক্ষ করে। এটা যেহেতু সত্য, সেহেতু এরপরও আরেকটি সময় তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। যার ঘোষণা আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন। সুতরাং এ ব্যাপারে সন্দেহ থাকতে পারে না। [ইবন কাসীর, সা’দী, আল-মুনীর, ফাতহুল কাদীর, আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] এ কারণে আয়াতের শেষভাগে কিয়ামতের উপযুক্ততা প্রকাশার্থে বলা হয়েছে (ثُمَّ أَنْتُمْ تَمْتَرُونَ) অর্থাৎ এহেন সুস্পষ্ট যুক্তি-প্রমাণ সত্বেও তোমরা কেয়ামত সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ কর! এটা অনুচিত।
তাফসীরে জাকারিয়া(২) তিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন,[1] অতঃপর একটি কাল নির্দিষ্ট করেছেন[2] এবং আর একটি নির্ধারিত সময়সীমা আছে যা তিনিই জ্ঞাত,[3] তারপরেও তোমরা সন্দেহ কর।[4]
[1] অর্থাৎ, তোমাদের পিতা আদম (আঃ)-কে যিনি তোমাদের মূল এবং যাঁর থেকেই তোমাদের আবির্ভাব ঘটেছে। এর আর একটি অর্থ এও হতে পারে যে, তোমরা যে খাদ্য খাও তা সবই মাটি থেকেই জন্মায় এবং সেই খাদ্য থেকেই বীর্য তৈরী হয়; যা মায়ের গর্ভাশয়ে গিয়ে মানুষ সৃষ্টির কারণ হয়। এই হিসাবে তোমাদেরও সৃষ্টি মাটি থেকেই।
[2] অর্থাৎ, মৃত্যুর।
[3] অর্থাৎ, কিয়াতের সময়। এর জ্ঞান কেবল আল্লাহই রাখেন। অর্থাৎ, প্রথম ‘আজাল’ (নির্দিষ্টকাল) বলতে জন্ম থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের বয়সকে বুঝানো হয়েছে। আর দ্বিতীয় ‘আজাল মুসাম্মা’ (নির্ধারিত সময়সীমা) বলতে মানুষের মৃত্যু থেকে নিয়ে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত দুনিয়ার সম্পূর্ণ বয়সকে বুঝানো হয়েছে। যার পর সে সম্পূর্ণ রূপে বিনাশ হয়ে যাবে এবং দ্বিতীয় আর এক দুনিয়া অর্থাৎ, আখেরাতের জীবন শুরু হয়ে যাবে।
[4] অর্থাৎ, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে। যেমন, কাফের ও মুশরিকরা বলত যে, ‘যখন আমরা মরে মাটিতে মিশে যাব, তখন কিভাবে আমাদেরকে পুনরায় জীবিত করা সম্ভব হবে?’ মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে সত্তা তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছে, সেই সত্তাই তোমাদেরকে দ্বিতীয়বার জীবিত করবে।’ (সূরা ইয়াসীন ৭৮-৭৯)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর আসমানসমূহ ও যমীনে তিনিই আল্লাহ, তিনি জানেন তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য এবং জানেন যা তোমরা অর্জন কর। আল-বায়ান
আসমানসমূহ আর যমীনে তিনিই আল্লাহ, তোমাদের গোপন বিষয়াদি আর তোমাদের প্রকাশ্য বিষয়াদি সম্পর্কে তিনি জানেন, আর তিনি জানেন যা তোমরা উপার্জন কর। তাইসিরুল
আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে ঐ এক আল্লাহই রয়েছেন, তোমাদের অপ্রকাশ্য ও প্রকাশ্য সব অবস্থাই তিনি জানেন, আর তোমরা যা কিছু কর তাও তিনি পূর্ণরূপে অবগত আছেন। মুজিবুর রহমান
And He is Allah, [the only deity] in the heavens and the earth. He knows your secret and what you make public, and He knows that which you earn. Sahih International
৩. আর আসমানসমূহ ও যমীনে তিনিই আল্লাহ(১), তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু তিনি জানেন এবং তোমরা যা অর্জন কর তাও তিনি জানেন।(২)
(১) এ আয়াতের অনুবাদে কোন প্রকার ভুল বুঝার অবকাশ নেই। মহান আল্লাহ তার আরশের উপরই রয়েছেন। আসমান ও যমীনের সর্বত্রই তার দৃষ্টি, জ্ঞান ও ক্ষমতা রয়েছে। তিনি সর্বত্রই মা’বুদ। আয়াতের এক অর্থ এটাই। কোন কোন মুফাসসির অর্থ করেছেন, তিনিই আল্লাহ যিনি আসমান ও যমীনের যত গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন। আবার কোন কোন মুফাসসির বলেছেন, এখানে আসমান বলে ঊর্ধ্বজগত বোঝানো হয়েছে। সেটা আরশও হতে পারে। সুতরাং আয়াতের অনুবাদ হবে, তিনিই আল্লাহ যিনি আসমানে তথা আরশের উপর রয়েছেন, সেখানে থাকলেও যমীনের যত গোপন ও প্রকাশ্য বিষয়াদি রয়েছে সব কিছু জানেন। [তাবারী, বাগভী, কুরতুবী, ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর]
(২) এ আয়াতে প্রথম দু’আয়াতে বর্ণিত বিষয়বস্তুর ফলাফল বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, আল্লাহ তা'আলাই এমন এক সত্তা, যিনি আসমান ও যমীনে ইবাদাত ও আনুগত্যের যোগ্য এবং তিনিই তোমাদের প্রতিটি প্রকাশ্য ও গোপন অবস্থা এবং প্রতিটি উক্তি ও কর্ম সম্পর্কে পুরোপুরি পরিজ্ঞাত। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আর কারও ইবাদাত করো না। তিনি যেহেতু তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবই জানেন সুতরাং তার নাফরমানী করা থেকে সতর্কতা অবলম্বন করো এবং এমন কাজ করবে, যা তোমাদেরকে তাঁর নৈকট্য প্রদান করবে, তাঁর রহমতের অধিকারী করবে। এমন কোন কাজ করো না, যাতে তার নৈকট্য থেকে দূরে সরে যাও। [সা'দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(৩) আকাশ ও পৃথিবীর তিনিই আল্লাহ। তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু তিনি জানেন এবং তোমরা যা কর, তাও তিনি অবগত আছেন।[1]
[1] আহলে সুন্নাহ অর্থাৎ, সালাফদের আকীদা হলো, মহান আল্লাহ তো আরশে সমাসীন; যেভাবে তাঁর সত্তার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু তাঁর জ্ঞান সর্বত্র বিরাজমান। অর্থাৎ, কোন জিনিসই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। অবশ্য কোন কোন ভ্রান্ত দল আল্লাহর আরশে সমাসীন হওয়াকে মানে না। তারা বলে যে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান এবং তারা এই আয়াতের ভিত্তিতেই তাদের (ভ্রান্ত) আকীদা সাব্যস্ত করে। অথচ তাদের আকীদা যেমন ভুল, অনুরূপ তাদের দলীলও সঠিক নয়। কেননা, আয়াতের অর্থ হলো, যে সত্তাকে আসমান ও যমীনে ‘আল্লাহ’ বলে ডাকা হয়, আসমানে ও যমীনে যার রাজত্ব বিস্তৃত এবং আসমান ও যমীনে যাকে সত্য উপাস্য মনে করা হয়, সেই আল্লাহই তোমাদের গোপনীয় ও প্রকাশ্য সমস্ত আমলাদির খবর রাখেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) এর আরো ব্যাখা করা হয়েছে, উলামাগণ তা তফসীরের কিতাবগুলোতে দেখতে পারেন। যেমন, তাফসীরে ত্বাবারী, ইবনে কাসীর ইত্যাদি।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর তাদের কাছে তাদের রবের আয়াতসমূহের কোন আয়াত আসলেই তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আল-বায়ান
তাদের রব্বের নিদর্শনাবলী হতে এমন কোন নিদর্শন তাদের কাছে আসে না যা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় না। তাইসিরুল
আর তাদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তাদের নিকট তাদের রবের নিদর্শনসমূহ হতে যে কোন নিদর্শনই আসুক না কেন, তা হতেই তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। মুজিবুর রহমান
And no sign comes to them from the signs of their Lord except that they turn away therefrom. Sahih International
৪. আর তাদের রব-এর আয়াতসমূহের এমন কোন আয়াত তাদের কাছে উপস্থিত হয় না যা থেকে তারা মুখ না ফেরায়।(১)
(১) এ আয়াতে অমনোযোগী মানুষের হঠকারিতা ও সত্যবিরোধী জেদের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, তাদের কাছে আল্লাহর নিদর্শনাবলী থাকার পাশাপাশি নবী-রাসূলগণ তাদের কাছে আল্লাহ্ তা'আলার একত্ববাদের সুস্পষ্ট যুক্তি-প্রমাণ ও নিদর্শন নিয়ে এসেছেন এবং তা তাদের কাছে স্পষ্টও হয়েছে। তা সত্ত্বেও অবিশ্বাসীরা এ কর্মপন্থা অবলম্বন করে রেখেছে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের হেদায়াতের জন্য যে কোন নিদর্শন প্রেরণ করা হলে, তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়- এ সম্পর্কে মোটেই চিন্তা-ভাবনা করে না। [মুয়াসসার]
তাফসীরে জাকারিয়া(৪) তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলীর মধ্যে এমন কোন নিদর্শন তাদের নিকট উপস্থিত হয় না, যা থেকে তারা মুখ ফেরায় না।
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানঅতঃপর অবশ্যই তারা সত্যকে অস্বীকার করেছে, যখন তা তাদের কাছে এসেছে। সুতরাং অচিরেই তাদের কাছে সে বিষয়ের সংবাদ আসবে যা নিয়ে তারা উপহাস করত। আল-বায়ান
(এখন) যে সত্য তাদের কাছে এসেছে তারা তা অস্বীকার করেছে। শীঘ্রই তাদের কাছে সে খবর আসবে যে সম্পর্কে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। তাইসিরুল
সুতরাং তাদের নিকট যখন সত্য বাণী এসেছে, ওটাও তারা মিথ্যা জেনেছে। অতএব অতি সত্ত্বরই তাদের নিকট সেই বিষয়ের সংবাদ এসে পৌঁছবে, যে ব্যাপারে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত। মুজিবুর রহমান
For they had denied the truth when it came to them, but there is going to reach them the news of what they used to ridicule. Sahih International
৫. সুতরাং সত্য যখন তাদের কাছে এসেছে তারা তো তাতে মিথ্যারোপ করেছে।(১) অতএব যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত তার যথার্থ সংবাদ অচিরেই তাদের কাছে পৌছবে।(২)
(১) এ আয়াতে বলা হচ্ছে যে, সত্য যখন তাদের সামনে প্রতিভাত হল, তখন তারা সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। এখানে সত্য’র অর্থ কুরআন হতে পারে এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও হতে পারে। [তাবারী, কুরতুবী, ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর] কেননা, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আজীবন আরব গোত্রসমূহের মধ্যেই অবস্থান করেন। তার শৈশব থেকে যৌবন এবং যৌবন থেকে বার্ধক্য তাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা এ কথা পুরোপুরিই জানত যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন মানুষের কাছে এক অক্ষরও শিক্ষা লাভ করেননি। এমনকি তিনি নিজ হাতে নিজের নামও লিখতে পারতেন না। সারা আরবে তিনি উম্মি বা নিরক্ষর উপাধিতে খ্যাত ছিলেন। চল্লিশ বছর পূর্ণ হয়ে যেতেই অকস্মাৎ তার মুখ দিয়ে নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পন্ন বাণীসমূহের এমন স্রোতধারা প্রবাহিত হতে লাগল, যা জগতের যাবতীয় জ্ঞানী-গুণীদেরকেও বিস্ময়াভিভূত করে দেয়।
তিনি আল্লাহর কালাম কুরআনের মোকাবেলা করার জন্য আরবের স্বনামখ্যাত, প্রাঞ্জলভাষী কবি-সাহিত্যিক ও অলঙ্কারবিদদেরকে চ্যালেঞ্জ করেন। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য স্বীয় জান-মাল, মান-সন্ত্রম, সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজন বিসর্জন দিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকত। কিন্তু এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কুরআনের একটি আয়াতের অনুরূপ বাক্য রচনা করার সামর্থ্য তাদের কারো হল না। এভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং কুরআনের অস্তিত্ব ছিল সত্যের এক বিরাট নিদর্শন। এছাড়া মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে হাজারো মু'জিযা ও খোলাখুলি নিদর্শন প্রকাশ পায়, যে কোন সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ যা অস্বীকার করতে পারত না। কিন্তু কাফেররা এসব নিদর্শনকে সুস্পষ্ট মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিল।
(২) আয়াতের শেষে কাফেরদের অস্বীকৃতি ও মিথ্যারোপের অশুভ পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যে, আজ তো এসব অপরিণামদর্শী লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মু'জিযা, তার আনীত হেদায়াত, কেয়ামত ও আখেরাত সবকিছু নিয়েই হাস্যোপহাস করছে, কিন্তু সে সময় দূরে নয়, যখন এগুলোর স্বরূপ তাদের দৃষ্টিতে প্রতিভাত হবে আর যদি তা না করা হয় তবে যা নিয়ে তারা ঠাট্টাবিদ্রুপ করছে তা দলীল-প্রমাণসহ তাদের সামনে উপস্থিত হবে। এত সাবধানবাণীর পরও কাফেররা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসে নি। তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে ফিরে আসেনি। শেষপর্যন্ত আল্লাহ্ তা'আলা তার এ ওয়াদা সত্য করে দেখিয়েছেন। বদরের দিন তিনি তাদের উপর তরবারীর মাধ্যমে সে ফয়সালা করে দেন। [তাবারী]
তাছাড়া তাদের বিচারের আরেক ব্যবস্থা রয়েছেই। তা কেয়ামতদিবসে প্রতিষ্ঠিত হবে। সেখানে প্রত্যেককে তার ঈমান ও আমলের হিসাব দিতে হবে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ কর্মের পুরস্কার ও শাস্তি পাবে। তখন এগুলোকে বিশ্বাস ও অস্বীকার করলেও কোন উপকার বা ক্ষতি হবে না। কেননা, সেটা কর্মজগত নয়-প্রতিদান দিবস। আল্লাহ্ তা'আলা এখনো চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ দিয়েছেন। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আল্লাহর নিদর্শনাবলীতে বিশ্বাস স্থাপন করলেই দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ সাধিত হবে। যদি তা না করে, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা মিথ্যারোপকারীদের বলবেন, “এটাই সে আগুন যাকে তোমরা মিথ্যা মনে করতে [সূরা আত-তূর: ১৪]
কিয়ামতের দিন কাফেরদের সামনে কিভাবে এ সত্যকে উপস্থাপন করা হবে তার বর্ণনায় আল্লাহ আরও বলেন, “আর তারা দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর শপথ করে বলে, যার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাকে পুনর্জীবিত করবেন না। কেন নয়? তিনি তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেনই। কিন্তু বেশীর ভাগ মানুষই এটা জানে না-- তিনি পুনরুথিত করবেন যে বিষয়ে তাদের মতানৈক্য ছিল তা তাদেরকে স্পষ্টভাবে দেখানোর জন্য এবং যাতে কাফিররা জানতে পারে যে, তারাই ছিল মিথ্যাবাদী। [সূরা আন-নাহ্ল: ৩৮, ৩৯] [সা’দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(৫) সত্য যখনই তাদের কাছে এসেছে, তারা তা মিথ্যাজ্ঞান করেছে। যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তার (পরিণাম) সংবাদ তারা অবহিত হবে। [1]
[1] অর্থাৎ, এই বিমুখতা এবং মিথ্যা ভাবার শাস্তি তারা পাবে। তখন তাদের মধ্যে এই অনুভূতির সৃষ্টি হবে যে, হায়! এই সত্য কিতাবকে মিথ্যাজ্ঞান এবং তার সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ যদি না করতাম!
তাফসীরে আহসানুল বায়ানতারা কি দেখে না, আমি তাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি? যাদেরকে যমীনে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেভাবে তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করিনি। আর তাদের উপর বৃষ্টি পাঠিয়েছিলাম মুষলধারে এবং সৃষ্টি করেছিলাম নদীসমূহ যা তাদের নীচে প্রবাহিত হত। অতঃপর তাদের পাপের কারণে তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং তাদের পরে অন্য প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছি। আল-বায়ান
তারা কি লক্ষ্য করে না তাদের পূর্বে আমি কত জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিয়েছি, তাদেরকে দুনিয়ায় (এমনভাবে) প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যে শক্তি-প্রতিষ্ঠা তোমাদেরকে দেয়া হয়নি, তাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিলাম, তৈরি করেছিলাম নদী যা তাদের নিম্নদেশ দিয়ে প্রবাহিত হত, অতঃপর তাদের পাপের কারণে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছি আর তাদের পরে নতুন জনগোষ্ঠীর উত্থান ঘটালাম। তাইসিরুল
তারা কি ভেবে দেখেনি যে, আমি তাদের পূর্বে বহু দল ও সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি, যাদেরকে দুনিয়ায় এমন শক্তি সামর্থ্য ও প্রতিপত্তি দিয়েছিলাম যা তোমাদেরকে দিইনি, আর আমি তাদের প্রতি আকাশ হতে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করেছি এবং তাদের নিম্নভূমি হতে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত করেছি, কিন্তু আমার নি‘আমাতের শোকর না করার পাপের কারণে আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছি, এবং তাদের পর অন্য নতুন নতুন জাতি ও সম্প্রদায়সমূহ সৃষ্টি করেছি। মুজিবুর রহমান
Have they not seen how many generations We destroyed before them which We had established upon the earth as We have not established you? And We sent [rain from] the sky upon them in showers and made rivers flow beneath them; then We destroyed them for their sins and brought forth after them a generation of others. Sahih International
৬. তারা কি দেখে না(১) যে, আমরা তাদের আগে বহু প্রজন্মকে(২) বিনাশ করেছি; তাদেরকে যমীনে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেমনটি তোমাদেরকেও করিনি এবং তাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। আর তাদের পাদদেশে নদী প্রবাহিত করেছিলাম; তারপর তাদের পাপের জন্য তাদেরকে বিনাশ করেছি(৩) এবং তাদের পর অন্য প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছি।(৪)
(১) আলোচ্য প্রথম আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রত্যক্ষ সম্বোধিত মক্কাবাসীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা কি পূর্ববর্তী জাতিসমূহের অবস্থা দেখেনি? দেখলে তা থেকে তারা শিক্ষা ও উপদেশ অর্জন করতে পারত। এখানে ‘দেখা’র অর্থ তাদের অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা। কেননা, সে জাতিগুলো তখন তাদের সামনে ছিল না। [আল-মানার]
(২) এ আয়াতে কাফেরদেরকে পূর্ববতী জাতিসমূহের ধ্বংস ও বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “আমরা তাদের পূর্বে অনেক ‘করণ’ (প্রজন্ম)কে ধ্বংস করে দিয়েছি।” [সা’দী] قرن শব্দের অর্থ সমসাময়িক লোকসমাজ এবং সুদীর্ঘ কাল। দশ বছর থেকে একশ’ বছর পর্যন্ত সময়কাল অর্থেও এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। [বাগভী, কুরতুবী] কিন্তু قرن শব্দের অর্থ যে এক শতাব্দী, কোন কোন ঘটনা ও হাদীস থেকে এর সমর্থন পাওয়া যায়। এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে বুছরকে বলেছিলেনঃ ‘সে এক করণ পর্যন্ত জীবিত থাকবে। পরে দেখা গেল যে, তিনি পূর্ণ একশ’ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন’। [মুসনাদে আহমাদ ৪/১৮৯]
(৩) পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে যারা আল্লাহর বিধান ও নবীগণের শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত কিংবা বিরোধিতা করত, তাদের প্রতি কঠোর শাস্তিবাণী উচ্চারিত হয়েছিল। আলোচ্য আয়াতসমূহে এসব অবিশ্বাসীর দৃষ্টি পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও প্রাচীনকালের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর প্রতি আকৃষ্ট করে তাদেরকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছে। [তাবারী, ইবন কাসীর] এ আয়াতে অতীত জাতিসমূহ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা পৃথিবীতে তাদেরকে এমন বিস্তৃতি, শক্তি ও জীবন ধারণের সাজ-সরঞ্জাম দান করেছিলেন, যা পরবর্তী লোকদের ভাগ্যে জুটেনি।
কিন্তু তারাই যখন নবীগণের প্রতি মিথ্যারোপ করল এবং আল্লাহর নিদর্শনের বিরুদ্ধাচরণ করল, তখন প্রভূত জাকজমক, প্রতাপ-প্রতিপত্তি ও অর্থসম্পদ তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে পারল না। তারা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আজ মক্কাবাসীদেরকে সম্বোধন করা হচ্ছে। আদ ও সামূদ গোত্রের মত শক্তিবল তাদের নেই এবং সিরিয়া ও ইয়েমেনবাসীদের অনুরূপ স্বাচ্ছন্দ্যশীলও তারা নয়। এসব অতীত জাতিসমূহের ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং নিজেদের ক্রিয়াকর্মের পর্যালোচনা করে দেখা তাদের উচিত। বিরুদ্ধাচরণ করলে তাদের পরিণতি কি হবে, তাও ভেবে দেখা দরকার। [ইবন কাসীর, আইসারুত তাফসীর, মুয়াসসার]
(৪) আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলার শক্তি-সামর্থ্য শুধু প্রবল প্রতাপান্বিত, অসাধারণ জাকজমক ও সাম্রাজ্যের অধিপতি এবং জনবহুল ও মহাপরাক্রান্ত জাতিসমূহকে চোখের পলকে ধ্বংস করেই ক্ষান্ত হয়ে যায় নি, বরং তাদেরকে ধ্বংস করার সাথে সাথে তাদের স্থলে অন্য জাতি সৃষ্টি করে সেখানে বসিয়ে দিয়েছে। সুতরাং মক্কাবাসীদের উচিত ভয় করা। [কুরতুবী, ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৬) তারা কি দেখে না যে, তাদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠীকে আমি বিনাশ করেছি, যাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, যা তোমাদেরও করিনি এবং তাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম, আর তাদের পাদদেশে নদীমালা প্রবাহিত করেছিলাম। অতঃপর তাদের পাপের জন্য তাদেরকে বিনাশ করেছি[1] এবং তাদের পরে নূতন মানবগোষ্ঠী সৃষ্টি করেছি। [2]
[1] অর্থাৎ, তোমাদের পূর্বেকার অনেক জাতিকে যখন তাদের পাপের কারণে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, অথচ তাদের শক্তি-সামর্থ্য তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী ছিল এবং সুখ-সমৃদ্ধি এবং জীবিকার উপায়-উপকরণাদির দিক দিয়েও তারা তোমাদের তুলনায় অনেক শ্রেষ্ঠ ছিল, তখন তোমাদেরকে ধ্বংস করা আমার জন্য কি কোন জটিল ব্যাপার? এ থেকে এ কথাও জানা গেল যে, কোন জাতির পার্থিব সম্পদের প্রাচুর্য এবং দুনিয়ার সুখ-সমৃদ্ধির আতিশয্য (জাগতিক প্রগতি) দেখে এটা যেন মনে করে না নেওয়া হয় যে, তারা বড়ই সফল। এটা তো অবকাশ দেওয়ার বহু প্রকারের এমন এক প্রকার, যা পরীক্ষা স্বরূপ আল্লাহ বিভিন্ন জাতিকে দিয়ে থাকেন। অতঃপর যখন অবকাশের সময়-কাল শেষ হয়ে যায়, তখন যাবতীয় পার্থিব সফলতা এবং সুখ-সমৃদ্ধি তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচাতে কোন কাজে আসে না।
[2] যাতে তাদেরকেও পূর্বের জাতিসমূহের ন্যায় পরীক্ষা করেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যদি আমি কাগজে লিখিত কিতাব তোমার উপর নাযিল করতাম অতঃপর তারা তা হাত দিয়ে স্পর্শ করত তবুও যারা কুফরী করেছে তারা বলত, ‘এ তো প্রকাশ্য যাদু ছাড়া কিছু না।’ আল-বায়ান
আমি যদি তোমার উপর কাগজে লেখা কিতাব নাযিল করতাম আর তা তারা তাদের হাতে স্পর্শ করত, তাহলে অবিশ্বাসীরা অবশ্যই বলত এটা স্পষ্ট যাদু ছাড়া আর কিছু না। তাইসিরুল
যদি আমি তোমার প্রতি কাগজে লিখিত কোন কিতাব অবতীর্ণ করতাম, অতঃপর তারা তা নিজেদের হাত দ্বারা স্পর্শও করত; তবুও কাফির ও অবিশ্বাসী লোকেরা বলতঃ এটা প্রকাশ্য যাদু ছাড়া আর কিছুই নয়। মুজিবুর রহমান
And even if We had sent down to you, [O Muhammad], a written scripture on a page and they touched it with their hands, the disbelievers would say, "This is not but obvious magic." Sahih International
৭. আমরা যদি আপনার প্রতি কাগজে লিখিত কিতাবও নাযিল করতাম, অতঃপর তারা যদি সেটা হাত দিয়ে স্পর্শও করত তবুও কাফেররা বলত, এটা স্পষ্ট জাদু ছাড়া আর কিছু নয়।(১)
(১) এ আয়াতে যেভাবে বলা হয়েছে যে, কাফেরদের কাছে যদি কাগজে লিখা কিতাবও নাযিল করা হয় তবুও তারা ঈমান আনবে না। তেমনিভাবে অন্য আয়াতেও বলা হয়েছে, কিন্তু তোমার আকাশ আরোহণে আমরা কখনো ঈমান আনব না যতক্ষন তুমি আমাদের প্রতি এক কিতাব নাযিল না করবে যা আমরা পাঠ করব। [সূরা আল-ইসরা: ৯৩]
এমনকি যদি সত্যি সত্যিই তাদেরকে এ কিতাব দেয়া হতো আর তারা সেটাকে হাত দ্বারা স্পর্শও করত, তারপরও তারা ঈমান আনবার ছিল না। বরং তারা সেটাকে জাদু বলত। আল্লাহ বলেন, যদি আমরা তাদের জন্য আকাশের দরজা খুলে দেই তারপর তারা তাতে আরোহন করতে থাকে, তবুও তারা বলবে, আমাদের দৃষ্টি সম্মোহিত করা হয়েছে; না, বরং আমরা এক যাদুগ্রস্ত সম্প্রদায়। [সূরা আল-হিজরঃ ১৫]
তাফসীরে জাকারিয়া(৭) যদি তোমার প্রতি কাগজে লিখিত কিতাবও (গ্রন্থ) অবতরণ করতাম এবং তারা যদি তা হাত দিয়ে স্পর্শও করত, তবু অবিশ্বাসীগণ বলত, ‘এ স্পষ্ট যাদু ছাড়া আর কিছুই নয়।’ [1]
[1] এতে তাদের অবাধ্যতা, অস্বীকার ও হঠকারিতার কথা তুলে ধরা হয়েছে যে, আল্লাহর পক্ষ হতে সুস্পষ্ট লিখিত বিষয় এসে যাওয়া সত্ত্বেও তারা তা মানতে প্রস্তুত হবে না এবং সেটাকে একটি যাদুর কিতাব গণ্য করবে। যেমন, কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, {وَلَوْ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَابًا مِنَ السَّمَاءِ فَظَلُّوا فِيهِ يَعْرُجُونَ، لَقَالُوا إِنَّمَا سُكِّرَتْ أَبْصَارُنَا بَلْ نَحْنُ قَوْمٌ مَسْحُورُونَ} ‘‘যদি আমি ওদের সামনে আকাশের কোন দরজাও খুলে দিই আর তাতে ওরা দিনভর আরোহণও করতে থাকে, তবুও ওরা এ কথাই বলবে যে, আমাদের দৃষ্টির বিভ্রাট ঘটানো হয়েছে, না বরং আমরা যাদুগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।’’ (সূরা হিজর ১৪-১৫) {وَإِنْ يَرَوْا كِسْفًا مِنَ السَّمَاءِ سَاقِطًا يَقُولُوا سَحَابٌ مَرْكُومٌ} ‘‘তারা যদি আকাশের কোন খন্ডকে পতিত হতে দেখে, তবে বলে, এটা তো পুঞ্জীভূত মেঘ।’’ (সূরা ত্বূর ৪৪) অর্থাৎ, আল্লাহর আযাবের এমন কোন একটা অপব্যাখ্যা করে নেবে, যাতে আল্লাহর ইচ্ছার কথা তাদেরকে স্বীকার করতে না হয়! অথচ সারা বিশ্বজাহানে যা কিছু হয়, সবই তাঁর ইচ্ছাতেই হয়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর তারা বলে, ‘কেন তার উপর কোন ফেরেশ্তা নাযিল করা হয়নি?’ যদি আমি ফেরেশ্তা নাযিল করতাম তাহলে বিষয়টি ফয়সালা হয়ে যেত, তারপর তাদের সুযোগ দেয়া হত না। আল-বায়ান
আর তারা বলে, আমাদের কাছে ফেরেশতা পাঠানো হয় না কেন? আমি যদি ফেরেশতা পাঠাতাম তাহলে (যাবতীয় ব্যাপারে) চূড়ান্ত ফায়সালাই তো হয়ে যেত, অতঃপর তাদেরকে আর অবকাশ দেয়া হত না। তাইসিরুল
আর তারা বলে থাকে, তাদের কাছে কোন মালাক/ফেরেশতা কেন পাঠানো হয়না? আমি যদি প্রকৃতই কোন মালাক/ফেরেশতা অবতীর্ণ করতাম তাহলে যাবতীয় বিষয়েরই চূড়ান্ত সমাধান হয়ে যেত, অতঃপর তাদেরকে কিছুমাত্রই অবকাশ দেয়া হতনা। মুজিবুর রহমান
And they say, "Why was there not sent down to him an angel?" But if We had sent down an angel, the matter would have been decided; then they would not be reprieved. Sahih International
৮. আর তারা বলে, তার কাছে কোন ফিরিশতা কেন নাযিল হয় না(১)? আর যদি আমরা ফেরেশতা নাযিল করতাম, তাহলে বিষয়টির চুড়ান্ত ফয়সালাই তো হয়ে যেত, তারপর তাদেরকে কোন অবকাশ দেয়া হত না।(২)
(১) এখানে এটা ভাবার অবকাশ নেই যে, কাফেররা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর ফিরিশতা নাযিল হয় না এমনটি অস্বীকার করত। তারা স্পষ্টই জানত যে, রাসূলের কাছে ফিরিশতাই ওহী নিয়ে আসে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাদের কাছে তা জানাতেন। এখানে তাদের উদ্দেশ্য ছিল যে, রাসূলের সাথে কেন অপর একজন ফিরিশতা সতর্ককারী হিসেবে সার্বক্ষনিক থাকে না। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “আরও তারা বলে, এ কেমন রাসূল যে খাওয়া-দাওয়া করে এবং হাটে-বাজারে চলাফেরা করে; তার কাছে কোন ফিরিশতা কেন নাযিল করা হল না, যে তার সংগে থাকত সতর্ককারীরূপে?” [সূরা আল-ফুরকান: ৭] [আদওয়াউল বায়ান]
(২) অর্থাৎ যদি ফিরিশতা নাযিল করা হতো তবে তারা তাদের অবাধ্যতা ও কুফর দেখে তাদেরকে কোনরূপ সুযোগ না দিয়ে ধ্বংস করে দিতেন। অন্য আয়াতেও আল্লাহ বলেন, “আমরা ফিরিশতাদেরকে যথার্থ কারণ ছাড়া প্রেরণ করি না; ফিরিশতারা উপস্থিত হলে তখন তারা আর অবকাশ পাবে না।” [সূরা আল-হিজর: ৮] আরও বলেন, যেদিন তারা ফিরিশতাদেরকে দেখতে পাবে সেদিন অপরাধীদের জন্য সুসংবাদ থাকবে না এবং তারা বলবে, রক্ষা কর, রক্ষা কর। [সূরা আল-ফুরকান: ২২] আদওয়াউল বায়ান]
তাফসীরে জাকারিয়া(৮) তারা বলে, ‘তার নিকট কোন ফিরিশতা অবতীর্ণ করা হয় না কেন?’ আমি যদি কোন ফিরিশতা অবতীর্ণ করতাম, তাহলে তাদের কর্মের চূড়ান্ত মীমাংসা তো হয়েই যেত। অতঃপর তাদেরকে কোন অবকাশ দেওয়া হত না। [1]
[1] মহান আল্লাহ মানুষের হিদায়াতের জন্য নবী ও রসূল প্রেরণ করেছেন, তাঁরা সবাই ছিলেন মানুষেরই মধ্য থেকে। প্রত্যেক জাতিতে তাদেরই মধ্য হতে একজনকে অহী এবং রিসালাত দানে ধন্য করতেন। কারণ, এ ছাড়া কোন রসূলই (দ্বীনের) তবলীগ এবং দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না। যেমন, যদি ফিরিশতাকে আল্লাহ রসূল বানিয়ে প্রেরণ করতেন, তাহলে প্রথমতঃ তাঁরা মানুষের ভাষায় কথোপকথন করতে পারতেন না এবং দ্বিতীয়তঃ তাঁরা মানবিক স্বভাব-প্রকৃতি থেকে মুক্ত হওয়ার কারণে মানুষের বিভিন্ন অবস্থার বিভিন্ন ভাব ও আচরণকে বুঝতেও পারতেন না। এই অবস্থায় হিদায়াত ও পথপ্রদর্শনের দায়িত্ব কিভাবে তাঁরা আদায় করতে পারতেন? তাই মানুষের প্রতি আল্লাহর এটা বড়ই অনুগ্রহ যে, তিনি মানুষকেই নবী ও রসূল বানিয়েছেন। আর এটাকে কুরআনেও মহান আল্লাহ অনুগ্রহ স্বরূপ উল্লেখ করেছেন। {لَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ} ‘‘আল্লাহ মু’মিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মাঝে তাদেরই মধ্য হতে একজন রসূল পাঠিয়েছেন।’’ (সূরা আলে ইমরান ১৬৪) কিন্তু নবীদের মানুষ হওয়া কাফেরদের বিস্ময় ও বিচলিত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা মনে করত যে, রসূল মানুষের মধ্য থেকে নয়, বরং ফিরিশতাদের মধ্য হতে হওয়া উচিত। অর্থাৎ, তাদের মতে, মানুষ রসূল হওয়ার উপযুক্ত নয়। যেমন, বর্তমানের বিদআতীরাও এটা মনে করে। تَشَابَهَتْ قُلُوْبُهُمْ কাফের ও মুশরিকরা রসূলদের মানুষ হওয়ার কথা তো অস্বীকার করতে পারত না। কারণ, তারা তাঁদের বংশ পরিচয়ের ব্যাপারে প্রতিটি জিনিস সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবগত ছিল, ফলে তারা রিসালাতকে অস্বীকার করত। পক্ষান্তরে বর্তমানের বিদআতীরা রিসালাতের কথা তো অস্বীকার করে না, কিন্তু মানুষ হওয়াকে রসূল হওয়ার পরিপন্থী মনে করে রসূলদের মানুষ হওয়ার কথা অস্বীকার করে। যাই হোক মহান আল্লাহ এই আয়াতে বলছেন, যদি আমি কাফেরদের দাবী অনুযায়ী কোন ফিরিশতাকে রসূল বানিয়ে প্রেরণ করতাম অথবা এই রসূলের সত্যায়নের জন্য কোন ফিরিশতা অবতীর্ণ করতাম (যেমন, এখানে এই কথাটাই বলা হয়েছে) অতঃপর তারা যদি তার উপর ঈমান না আনত, তবে কোন অবকাশ না দিয়েই তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হত।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যদি রাসূলকে ফেরেশতা বানাতাম তবে তাকে পুরুষ মানুষই বানাতাম। ফলে তারা যে সন্দেহ করে, সে সন্দেহেই তাদেরকে রেখে দিতাম। আল-বায়ান
আর আমি যদি তাকে ফেরেশতা করতাম তবে তাকে মানুষের আকৃতি বিশিষ্টই করতাম, আর তাদেরকে অবশ্যই গোলকধাঁধায় ফেলে দিতাম যেমন ধাঁধাঁয় তারা এখন পড়েছে। তাইসিরুল
আর যদি কোন মালাককেও/ফেরেশতাকেও রাসূল করে পাঠাতাম তাহলে তাকে মানুষ রূপেই পাঠাতাম; এতেও তারা ঐ সন্দেহই করত, যে সন্দেহ ও প্রশ্ন এখন তারা করছে। মুজিবুর রহমান
And if We had made him an angel, We would have made him [appear as] a man, and We would have covered them with that in which they cover themselves. Sahih International
৯. আর যদি তাকে ফিরিশতা করতাম তবে তাকে পুরুষ মানুষের আকৃতিতেই পাঠাতাম, আর তাদেরকে সেরূপ বিভ্রমে ফেলতাম যেরূপ বিভ্রমে তারা এখন রয়েছে।(১)
(১) অর্থাৎ এ গাফেলরা এসব দাবী-দাওয়া করে মৃত্যু ও ধ্বংসকেই ডেকে আনছে। কেননা, মানুষদের থেকে রাসূল পাঠানো আল্লাহর এক বিরাট রহমত। যাতে একে অপরকে বুঝতে পারে, হেদায়াত নেয়া উম্মতের জন্য সহজ হয়। প্রশ্ন করা ও উত্তর নেয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকে। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(৯) যদি তাকে ফিরিশতা করতাম, তবে তাকে মানুষের আকৃতিতেই প্রেরণ করতাম। আর তাদেরকে সেরূপ বিভ্রমেই ফেলতাম, যেরূপ বিভ্রমে তারা এখন রয়েছে। [1]
[1] অর্থাৎ, যদি আমি ফিরিশতাকেই রসূল বানিয়ে প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতাম, তাহলে এ কথা পরিষ্কার যে, সে তো ফিরিশতার আকৃতিতে আসতে পারত না, কারণ এতে (ফিরিশতার আকৃতি-প্রকৃতিতে এলে) মানুষ তাকে ভয় পেত এবং তার নিকট হওয়ার পরিবর্তে তার থেকে আরো দূর হওয়ার চেষ্টা করত। তাই তাকে মানুষের রূপেই পাঠানো অপরিহার্য হত। কিন্তু তখনও তোমাদের নেতারা এই আপত্তি এবং সন্দেহ উত্থাপন করত যে, এও তো মানুষ। যেমন, এখন তারা রসূলের মানুষ হওয়ার ব্যাপারে উত্থাপন করছে। তাহলে ফিরিশতাকে পাঠিয়ে লাভ কি?
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর অবশ্যই তোমার পূর্বে রাসূলগণকে নিয়ে উপহাস করা হয়েছিল। ফলে যারা তাদের সাথে উপহাস করেছিল, তাদেরকে তাদের উপহাস বেষ্টন করে নিয়েছে। আল-বায়ান
তোমার পূর্বেও রসূলদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়েছে, অতঃপর যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত তাই তাদেরকে পরিবেষ্টন করে ফেলল। তাইসিরুল
তোমার পূর্বে যে সব নাবী রাসূল এসেছিল, তাদের সাথেও ঠাট্টা বিদ্রুপ করা হয়েছে, ফলতঃ এই সব ব্যঙ্গ বিদ্রুপের পরিণাম ফল বিদ্রুপকারীদেরকেই পরিবেষ্টন করে ফেলেছিল। মুজিবুর রহমান
And already were messengers ridiculed before you, but those who mocked them were enveloped by that which they used to ridicule. Sahih International
১০. আর আপনার আগে অনেক রাসূলকে নিয়েই তো ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়েছে। ফলে রাসূলদের সাথে বিদ্রুপকারীদেরকে তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করছিল তা-ই পরিবেষ্টন করেছে।(১)
(১) এ আয়াতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাস্তুনার জন্য বলা হয়েছেঃ স্বজাতির পক্ষ থেকে আপনি যে উপহাস, ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও যাতনা ভোগ করছেন, তা শুধু আপনারই বৈশিষ্ট্য নয়, আপনার পূর্বেও সব নবীকে এমনি হৃদয়বিদারক ও প্রাণঘাতি ঘটনাবলীর সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু তারা সাহস হারাননি। পরিণামে বিদ্রুপকারী জাতিকে সে আযাবই পাকড়াও করেছে, যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত। মোটকথা এই যে, আল্লাহর বিধানাবলী প্রচার করাই আপনার কাজ। এ দায়িত্ব পালন করে আপনি দায়মুক্ত হয়ে যান।
কেউ তা গ্রহণ করল কি না তা দেখাশোনা করা আপনার দায়িত্ব নয়। তাই এতে মশগুল হয়ে আপনি অন্তরকে ব্যথিত করবেন না। আপনার পূর্বেও নবী-রাসূলগণের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়েছে। যেমন নূহ আলাইহিস সালামকে তারা বলেছিল, নবী হওয়ার পরে সুতার হয়ে গেলে। হুদ আলাইহিস সালামকে বলেছিল, আমরা তো এটাই বলি, আমাদের উপাস্যদের মধ্যে কেউ তোমাকে অশুভ দ্বারা আবিষ্ট করেছে। [সূরা হুদ: ৫৪]
সালেহ আলাইহিস সালামকে বলেছিল, হে সালিহ! তুমি আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছে, তা নিয়ে এস, যদি তুমি রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাক। [সূরা আল-আরাফ: ৭৭] লূত আলাইহিস সালাম সম্পর্কে তারা বলেছিল, 'লুত-পরিবারকে তোমরা জনপদ থেকে বহিস্কার কর, এরা তো এমন লোক যারা পবিত্র সাজতে চায়। [সূরা আন-নামল: ৫৬] অনুরূপভাবে শু'আইব আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেছিল হে শু'আইব! তুমি যা বল তার অনেক কথা আমরা বুঝি না এবং আমরা তো আমাদের মধ্যে তোমাকে দুর্বলই দেখছি।
তোমার স্বজনবর্গ না থাকলে আমরা তোমাকে পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলতাম, আর আমাদের উপর তুমি শক্তিশালী নও। [সূরা হুদ: ৯১] তাছাড়া তারা নবীর সালাত নিয়েও ঠাট্টা করে বলত, হে শু'আইব! তোমার সালাত কি তোমাকে নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা যার ইবাদাত করত আমাদেরকে তা বর্জন করতে হবে অথবা আমরা আমাদের ধন-সম্পদ সম্পর্কে যা করি তাও? তুমি তো অবশ্যই সহিষ্ণু, বুদ্ধিমান। [সূরা হুদ: ৮৭] [আদওয়াউল বায়ান]
তাফসীরে জাকারিয়া(১০) তোমার পূর্বেও অনেক রসূলকেই ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়েছে, পরিণামে তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিল, তা তাদেরকে পরিবেষ্টন করেছে।
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানবল, ‘তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর তারপর দেখ, অস্বীকারকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছে।’ আল-বায়ান
বল, দুনিয়ায় পরিভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের পরিণাম কী দাঁড়িয়েছিল। তাইসিরুল
তুমি বলঃ তোমরা ভূ-পৃষ্ঠ পরিভ্রমণ কর, অতঃপর সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের পরিণাম কি হয়েছে তা গভীর অভিনিবেশ সহকারে লক্ষ্য কর। মুজিবুর রহমান
Say, "Travel through the land; then observe how was the end of the deniers." Sahih International
১১. বলুন, তোমরা যমীনে পরিভ্রমণ কর, তারপর দেখ, যারা মিথ্যারোপ করেছে তাদের পরিণাম কি হয়েছিল!(১)
(১) কাতাদা বলেন, অর্থাৎ তিনি তাদেরকে পাকড়াও করে ধ্বংস করেছেন তারপর তাদেরকে জাহান্নামের দিকে পৌছে দিয়েছেন। [তাবারী]
তাফসীরে জাকারিয়া(১১) বল, ‘তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ যারা সত্যকে মিথ্যা বলেছে, তাদের পরিণাম কি হয়েছিল!’
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানবল, ‘আসমানসমূহ ও যমীনে যা আছে তা কার’? বল, ‘আল্লাহর জন্য’; তিনি তাঁর নিজের উপর রহমত লিখে নিয়েছেন। তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে একত্র করবেন কিয়ামতের দিনে, এতে কোন সন্দেহ নেই। যারা নিজদের ক্ষতি করেছে তারা ঈমান আনবে না। আল-বায়ান
বল, আসমানে আর যমীনে যা আছে তা কার? বল, আল্লাহরই। দয়া করা তিনি তাঁর জন্য কর্তব্য স্থির করে নিয়েছেন, তিনি কিয়ামাত দিবসে তোমাদের সবাইকে একত্রিত করবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। যারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে তারা ঈমান আনবে না। তাইসিরুল
তুমি জিজ্ঞেস করঃ আকাশমন্ডলী ও ধরাধামে অবস্থিত যা কিছু রয়েছে তার মালিক কে? তুমি বলঃ তা সবই আল্লাহর মালিকানায়, অনুগ্রহ করা তিনি তাঁর নীতি বলে গ্রহণ করেছেন, তিনি তোমাদের সকলকে কিয়ামাত দিবসে অবশ্যই সমবেত করবেন যে দিন সম্পর্কে কোন সন্দেহই নেই; যারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি ও ধবংসের মুখে ফেলেছে তারাই বিশ্বাস করেনা। মুজিবুর রহমান
Say, "To whom belongs whatever is in the heavens and earth?" Say, "To Allah." He has decreed upon Himself mercy. He will surely assemble you for the Day of Resurrection, about which there is no doubt. Those who will lose themselves [that Day] do not believe. Sahih International
১২. বলুন, আসমানসমূহ ও যমীনে যা আছে তা কার? বলুন, আল্লাহরই,(১) তিনি তার নিজের উপর দয়া করা লিখে নিয়েছেন।(২) কিয়ামতের দিন তিনি তোমাদেরকে অবশ্যই একত্র করবেন(৩), এতে কোন সন্দেহ নেই। যারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে তারা ঈমান আনবে না।(৪)
(১) এ আয়াতে কাফেরদেরকে প্রশ্ন করা হয়েছেঃ নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ে যা আছে, তার মালিক কে? অতঃপর আল্লাহ নিজেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাচনিক উত্তর দিয়েছেনঃ সবার মালিক আল্লাহ। কাফেরদের উত্তরের অপেক্ষা করার পরিবর্তে নিজেই উত্তর দেয়ার কারণ এই যে, এ উত্তর কাফেরদের কাছেও স্বীকৃত। তারা যদিও শির্ক ও পৌত্তলিকতায় লিপ্ত ছিল, তথাপি ভূমণ্ডল, নভোমণ্ডল ও সবকিছুর মালিক আল্লাহ তা'আলাকেই মানতো অর্থাৎ তারা তাওহীদুর রবুবিয়াতের এ অংশে বিশ্বাসী ছিল। আর তারা যেহেতু তাওহীদের এ অংশে বিশ্বাস করছে, তাদের উচিত হবে তাওহীদের বাকী অংশ তাওহীদুল উলুহিয়ার স্বীকৃতি দেয়া এবং একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করা। [সা’দী; আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর]
(২) সহীহ মুসলিমে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ যখন আল্লাহ তা'আলা যাবতীয় বস্তু সৃষ্টি করেন, তখন একটি ওয়াদাপত্র লিপিবদ্ধ করেন। এটি আল্লাহ্ তা'আলার কাছেই রয়েছে। এতে লিখিত আছেঃ আমার অনুগ্রহ আমার ক্রোধের উপর প্রবল থাকবে। [বুখারী: ৭৪০৪; মুসলিম: ২৭৫১]
(৩) এ বাক্যে إلى শব্দটি فى অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাতে মর্ম দাঁড়িয়েছে এই যে, আল্লাহ তা'আলা পূর্বের ও পরের সব মানুষকে কেয়ামতের দিন সমবেত করবেন কিংবা এখানে কবরে একত্রিত করা বুঝানো হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, কেয়ামত পর্যন্ত সব মানুষকে কবরে একত্রিত করতে থাকবেন এবং কেয়ামতের দিন সবাইকে জীবিত করবেন আর তোমাদেরকে তোমাদের কর্মকাণ্ডের শাস্তি প্রদান করবেন। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
(৪) এতে ইঙ্গিত আছে যে, আয়াতের শুরুতে বর্ণিত আল্লাহ্ তা'আলার ব্যাপক অনুগ্রহ থেকে যদি কাফের ও মুশরিকরা বঞ্চিত হয়, তবে স্বীয় কৃতকর্মের কারণেই হবে। কারণ, তারা অনুগ্রহ লাভের উপায় অর্থাৎ ঈমান অবলম্বন করেনি। আল্লাহ্ তাআলা আখেরাত ও কিয়ামতের বাস্তবতার উপর অনেক দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন, যাতে তা বাস্তব সত্যরূপে মানুষের কাছে প্রতিভাত হয়। কিন্তু তারা অস্বীকার ছাড়া কিছুই করেনি। তারা পুনরুত্থানকে অস্বীকার করেছে, ফলে তারা আল্লাহ্র অবাধ্যতায় নিপতিত হয়েছে এবং কুফরী করার মত দুঃসাহস দেখিয়েছে। এতে করে তারা তাদের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়টিই বরবাদ করেছে। [সা'দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(১২) বল, ‘আকাশ ও ভূমন্ডলে যা আছে তা কার?’ বল, ‘তা আল্লাহরই।’ দয়া করা তিনি নিজ কর্তব্য বলে স্থির করেছেন।[1] কিয়ামতের দিন তিনি তোমাদেরকে অবশ্যই সমবেত করবেন, এতে কোনই সন্দেহ নেই। যারা নিজেই নিজেদের ক্ষতি করেছে তারা বিশ্বাস করবে না।
[1] যেমন হাদীসে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘‘যখন মহান আল্লাহ সৃষ্টদের সৃষ্টি করলেন, তখন আরশে লিখে দিলেন, إِنَّ رَحْمَتِيْ تَغْلِبُ غَضَبِيْ ‘‘আমার দয়া আমার ক্রোধের উপরে বিজয়ী।’’ (বুখারীঃ তাওহীদ অধ্যায়, মুসলিমঃ তাওবা অধ্যায়) তবে এ দয়া ও রহমত কিয়ামতের দিন কেবল ঈমানদারদের জন্য হবে। আর কাফেরদের প্রতি প্রতিপালক চরম ক্রোধান্বিত হবেন। অর্থাৎ, দুনিয়াতে তো তাঁর রহমত অবশ্যই ব্যাপক; যার দ্বারা মু’মিন ও কাফের, সৎ ও অসৎ এবং বাধ্যজন ও অবাধ্যজন সকলেই উপকৃত হচ্ছে। মহান আল্লাহ কোন ব্যক্তিরই রুযী অবাধ্যতার কারণে বন্ধ করেন না। তবে তাঁর রহমতের এই ব্যাপকতা দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ। প্রতিফল ও প্রতিদানের স্থান আখেরাতে আল্লাহর সুবিচারক হওয়ার গুণের পূর্ণ বিকাশ ঘটবে, যার ফলে সেখানে ঈমানদাররা তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় লাভ করবে এবং কাফের ও ফাসেকরা জাহান্নামের চিরন্তন শাস্তির যোগ্য বিবেচিত হবে। এই জন্য কুরআনে বলা হয়েছে, {وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُمْ بِآياتِنَا يُؤْمِنُونَ} ‘‘আমার দয়া প্রতিটি জিনিসের উপর পরিব্যাপ্ত। সুতরাং তা তাদের জন্য লিখে দেব যারা ভয় রাখে, যাকাত দেয় এবং যারা আমার আয়াতসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে।’’ (সূরা আ’রাফ ১৫৬)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানযা কিছু রাতে ও দিনে স্থিত হয় তা তাঁরই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। আল-বায়ান
রাতে (অন্ধকারে) আর দিনে (আলোয়) যা বাস করে তা তাঁরই, তিনি হলেন সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। তাইসিরুল
রাতের অন্ধকারে এবং দিনের আলোয় যা কিছু বসবাস করে ও বর্তমান রয়েছে তা সব কিছুই আল্লাহর। তিনি সব কিছুই শোনেন ও জানেন। মুজিবুর রহমান
And to Him belongs that which reposes by night and by day, and He is the Hearing, the Knowing. Sahih International
১৩. আর রাত ও দিনে যা কিছু স্থিত হয়, তা তারই(১) এবং তিনি সবকিছু শুনেন, সবকিছু জানেন।
(১) এখানে سُكُون অর্থ اِسْتَقَرَّ অবস্থান করা; অর্থাৎ পৃথিবীর দিবা-রাত্রিতে যা কিছু অবস্থিত আছে, তা সবই আল্লাহর। [তাবারী] অথবা এর অর্থ سُكُون وحَرْكَت এর সমষ্টি। অর্থাৎ مَا سَكَنَ ومَا تَحَرَّكَ (স্থাবর ও অস্থাবর) আয়াতে শুধু سُكُون উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা, এর বিপরীত حَرْكَت আপনা-আপনিই বুঝা যায়। অথবা سَكَنَ অর্থ যাবতীয় সৃষ্টি। অর্থাৎ যাবতীয় সৃষ্টির মালিকানা আল্লাহরই। [কুরতুবী]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৩) রাত ও দিনে যা কিছু থাকে তা তাঁরই এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ানবল, ‘আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্যকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করব, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা? তিনি আহার দেন, তাঁকে আহার দেয়া হয় না।’ বল, ‘নিশ্চয় আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে যেন আমি তাদের প্রথম হই’। আর তুমি কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না’। আল-বায়ান
বল, আমি কি আসমান যমীনের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে অভিভাবক বানিয়ে নেব, অথচ তিনিই খাওয়ান, তাঁকে খাওয়ানো হয় না, বল আমাকে আদেশ করা হয়েছে আমি যেন আত্মসমর্পণকারীদের প্রথম হই, আর তুমি কিছুতেই মুশরিকদের মধ্যে শামিল হবে না। তাইসিরুল
বলঃ আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কেহকেও আমার অভিভাবক রূপে গ্রহণ করব, যিনি হলেন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা? তিনি রিয্ক দান করেন, কিন্তু কারও রিয্ক গ্রহণ করেননা। তুমি বলঃ আমাকে এই আদেশই করা হয়েছে যে, আমি সকলের আগেই ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর সামনে মাথা নত করে দিব। আর তুমি মুশরিকদের মধ্যে শামিল হয়োনা। মুজিবুর রহমান
Say, "Is it other than Allah I should take as a protector, Creator of the heavens and the earth, while it is He who feeds and is not fed?" Say, [O Muhammad], "Indeed, I have been commanded to be the first [among you] who submit [to Allah] and [was commanded], 'Do not ever be of the polytheists.' " Sahih International
১৪. বলুন, ‘আমি কি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করব?(১) তিনিই খাবার দান করেন কিন্তু তাকে খাবার দেয়া হয় না(২)। বলুন, নিশ্চয় আমি আদেশ পেয়েছি যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে যেন আমি প্রথম ব্যক্তি হই(৩), আর (আমাকে আরও আদেশ করা হয়েছে) ‘আপনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।
(১) সুদ্দী বলেন, এখানে ওলীরূপে গ্রহণ করার অর্থ, যাকে অভিভাবক মানা হয় এবং যার রবুবিয়াত এর স্বীকৃতি দেয়া হয়। [আত-তাফসীরুস সহীহ]
(২) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা সমস্ত সৃষ্টিকুলের রিযিকের ব্যবস্থা করেন। তিনি পূর্ণ অমুখাপেক্ষী। তাঁর কোন রিযিকের প্রয়োজন পড়ে না। অন্য আয়াতেও আল্লাহ তা'আলা সেটা বলেছেন, আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে। আমি তাদের কাছ থেকে জীবিকা চাই না এবং এটাও চাই না যে, তারা আমাকে খাওয়াবে, নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই তো রিযকদাতা, প্রবল শক্তিধর, পরাক্রমশালী। [সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬-৫৮] [আদওয়াউল বায়ান]
(৩) অর্থাৎ যে উম্মতের মধ্যে আমি প্রেরিত হয়েছি সে উম্মতের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারে প্রথম ব্যক্তি হই। এর অর্থ এ নয় যে, সমস্ত জাতির মধ্যে তিনিই প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী হবেন। কারণ, কুরআনের বহু আয়াতে এটা এসেছে যে, তার পূর্বেও নবীগণ ইসলামের উপর ছিলেন এবং অনেক উম্মতও ইসলামের উপর গত হয়েছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন, “স্মরণ করুন, যখন তার রব তাকে বলেছিলেন, আত্মসমর্পণ করুন, তিনি বলেছিলেন, আমি সৃষ্টিকুলের রব-এর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।” [সূরা আল-বাকারাহ: ১৩১]। আর ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন, “আপনি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করুন।” [সূরা ইউসুফঃ ১০১] [আদওয়াউল বায়ান]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৪) বল, ‘আমি কি আকাশ ও ভূমন্ডলের স্রষ্টা ব্যতীত অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করব?[1] তিনিই জীবিকা দান করেন, কিন্তু তাঁকে কেউ জীবিকা দান করে না’ এবং বল, ‘আমি আদিষ্ট হয়েছি, যেন আত্মসমর্পণকারিগণের মধ্যে আমিই প্রথম ব্যক্তি হই, (আমাকে আরও আদেশ করা হয়েছে যে,) তুমি অবশ্যই অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।’
[1] ولي অর্থ অভিভাবক, বন্ধু। এখানে উদ্দেশ্যঃ মাবূদ, উপাস্য। নচেৎ কোন সৃষ্টির সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা তো বৈধ।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানবল, ‘যদি আমি আমার রবের অবাধ্য হই তবে নিশ্চয় আমি ভয় করি মহা দিবসের আযাবকে। আল-বায়ান
বল, যদি আমি আমার রবের অবাধ্য হই, তবে আমি বড় (ভয়াবহ) দিনের শাস্তির ভয় করি। তাইসিরুল
তুমি বলঃ আমি আমার রবের অবাধ্য হলে, আমি মহাবিচারের দিনের শাস্তির ভয় করছি। মুজিবুর রহমান
Say, "Indeed I fear, if I should disobey my Lord, the punishment of a tremendous Day." Sahih International
১৫. বলুন, আমি যদি আমার রব-এর অবাধ্যতা করি, তবে নিশ্চয় আমি ভয় করি মহাদিনের শাস্তির।(১)
(১) আয়াতে নির্দেশ অমান্য করার শাস্তি এক বিশেষ ভঙ্গিতে বর্ণনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আদেশ দেয়া হয়েছে যে, আপনি বলে দিন, মনে কর, যদি আমিও স্বীয় প্রতিপালকের নির্দেশ অমান্য করু, তবে আমারো কিয়ামতের শাস্তির ভয় রয়েছে। আল্লাহর নির্দেশের বিরোধিতা করলে যখন নবীগণের যিনি নেতা, তাকেও ক্ষমা করা যায় না, তখন অন্যদের কথা তো বলাই বাহুল্য। যদি কেউ আল্লাহর অবাধ্য হয় আর সে অবাধ্যতা হয় শির্ক বা কুফরীর মাধ্যমে তাহলে তার রক্ষা নেই। সে স্থায়ীভাবে আল্লাহর ক্রোধে ও জাহান্নামে অবস্থান করবে। [সা'দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৫) বল, ‘আমি যদি আমার প্রতিপালকের অবাধ্যতা করি, তবে আমি ভয় করি যে, মহা দিনের শাস্তি আমার উপর আপতিত হবে। [1]
[1] অর্থাৎ, আমিও যদি প্রতিপালকের অবাধ্যতা করে তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে উপাস্য বানিয়ে নিই, তাহলে আমিও আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচতে পারব না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানসেদিন যার থেকে আযাব সরিয়ে নেয়া হবে তাকেই তিনি অনুগ্রহ করবেন, আর এটাই প্রকাশ্য সফলতা। আল-বায়ান
সে দিন যাকে (শাস্তি থেকে) রক্ষা করা হবে তাকে তো বড় অনুগ্রহ করা হবে। আর এটাই হবে সুস্পষ্ট সাফল্য। তাইসিরুল
সেদিন যার উপর হতে শাস্তি প্রত্যাহার করা হবে তার প্রতি আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহ করবেন, আর এটাই হচ্ছে প্রকাশ্য মহাসাফল্য। মুজিবুর রহমান
He from whom it is averted that Day - [Allah] has granted him mercy. And that is the clear attainment. Sahih International
১৬. সেদিন যার থেকে তা সরিয়ে নেয়া হবে, তার প্রতি তো তিনি দয়া করলেন(১) এবং এটাই স্পষ্ট সফলতা।(২)
(১) বলা হয়েছে, হাশর দিবসের শাস্তি অত্যন্ত লোমহর্ষক ও কঠোর হবে। কাতাদা বলেন, এখানে যা সরানোর কথা বলা হচ্ছে, তা হচ্ছে শাস্তি। কারো উপর থেকে এ শাস্তি সরে গেলে মনে করতে হবে যে, তার প্রতি আল্লাহর অশেষ করুণা হয়েছে। [তাফসীর আবদির রাযযাক]
(২) অর্থাৎ এটিই বৃহৎ ও প্রকাশ্য সফলতা। [কুরতুবী] এখানে সফলতার অর্থ জান্নাতে প্রবেশ। কারণ, শাস্তি থেকে মুক্তি ও জান্নাতে প্রবেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তাফসীরে জাকারিয়া(১৬) সে দিন যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করা হবে তার প্রতি তিনি তো দয়া করবেন এবং ঐটিই হল স্পষ্ট সফলতা।’ [1]
[1] যেমন অন্যত্র বলেছেন, {فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ} ‘‘সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে সফল হবে।’’ (সূরা আল-ইমরান ১৮৫) কারণ, সফলতা হলো অকল্যাণ থেকে বেঁচে যাওয়া এবং কল্যাণ অর্জন করার নাম। আর জান্নাত অপেক্ষা কল্যাণকর জিনিস আর কি হতে পারে?
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর যদি আল্লাহ তোমাকে কোন দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূরকারী কেউ নেই। আর যদি কোন কল্যাণ দ্বারা স্পর্শ করেন তবে তিনিই তো সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান
আল্লাহ তোমার কোন ক্ষতি করতে চাইলে তিনি ছাড়া কেউ তা সরাতে পারবে না। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তবে তো সব কিছুই করার তাঁর ক্ষমতা রয়েছে। তাইসিরুল
আল্লাহ যদি কারও ক্ষতি সাধন করেন তাহলে তিনি ছাড়া সেই ক্ষতি দূর করার আর কেহ নেই, আর যদি তিনি কারও কল্যাণ করেন, (তাহলে আল্লাহ সেটাও করতে পারেন, কেননা) তিনি সমস্ত কিছুর উপর ক্ষমতাবান। মুজিবুর রহমান
And if Allah should touch you with adversity, there is no remover of it except Him. And if He touches you with good - then He is over all things competent. Sahih International
১৭. আর যদি আল্লাহ্ আপনাকে কোন দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা মোচনকারী আর কেউ নেই। আর যদি তিনি আপনাকে কোন কল্যাণ দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি তো সব কিছুর উপর ক্ষমতাবানত।(১)
(১) এ আয়াতে ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি লাভক্ষতির মালিক প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ তা'আলা। সত্যিকারভাবে কোন ব্যক্তি কারো সামান্য উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না। আল্লাহ যদি কারও লাভ করতে চান তবে তা বন্ধ করার ক্ষমতা কারও নেই। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আর আল্লাহ যদি আপনার মংগল চান তবে তার অনুগ্রহ প্রতিহত করার কেউ নেই। তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে তার কাছে সেটা পৌছান।” [সূরা ইউনুস: ১০৭]
এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইমাম বাগভী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, ‘একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটে সওয়ার হয়ে আমাকে পিছনে বসিয়ে নিলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেনঃ হে বৎস! আমি আরয করলামঃ আদেশ করুন, আমি হাযির আছি। তিনি বললেনঃ তুমি আল্লাহর বিধি-বিধানকে হেফাযত করবে, আল্লাহ তোমাকে হেফাযত করবেন। তুমি আল্লাহর বিধি-বিধানকে হেফাযত করো তাহলে আল্লাহকে সাহায্যের সাথে তোমার সামনে পাবে। তুমি শান্তি ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ রাখলে, বিপদের সময় তিনি তোমাকে স্মরণ রাখবেন। কোন কিছু চাইতে হলে তুমি আল্লাহর কাছেই চাও এবং সাহায্য চাইতে হলে আল্লাহর কাছেই চাও।
জগতে যা কিছু হবে, ভাগ্যের লেখনী তা লিখে ফেলেছে। সমগ্র সৃষ্টজীব সম্মিলিতভাবে তোমার কোন উপকার করতে চাইলে যা তোমার তাকদিরে লিখা নেই তারা কখনো তা করতে পারবে না। পক্ষান্তরে যদি তারা সবাই মিলে তোমার এমন কোন ক্ষতি করতে চায়, যা তোমার ভাগ্যে নেই, তবে কখনোই তারা তা করতে সক্ষম হবে না। যদি তুমি বিশ্বাস সহকারে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে আমল করতে পার তবে অবশ্যই তা করো। সক্ষম না হলে ধৈর্য ধর। কেননা, তুমি যা অপছন্দ করো তার বিপক্ষে ধৈর্য ধারণ করায় অনেক মঙ্গল রয়েছে। মনে রাখবে, আল্লাহর সাহায্য ধৈর্যের সাথে জড়িত-কষ্টের সাথে সুখ এবং অভাবের সাথে স্বাচ্ছদ্য জড়িত। [মুসনাদে আহমাদ: ১/৩০৭]
পরিতাপের বিষয়, কুরআনুল কারীমের এ সুস্পষ্ট ঘোষণা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আজীবনের শিক্ষা সত্ত্বেও মুসলিমরা এ ব্যাপারে পথ ভ্রান্ত। তারা আল্লাহ্ তা'আলার সব ক্ষমতা সৃষ্টজীবের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছে। আজ এমন মুসলিমের সংখ্যা নগণ্য নয়, যারা বিপদের সময় আল্লাহ্ তা'আলাকে স্মরণ করে না এবং তারা তার কাছে দো'আ করার পরিবর্তে বিভিন্ন নামের দোহাই দেয় এবং তাদেরই সাহায্য কামনা করে। তারা আল্লাহ তা'আলার প্রতি লক্ষ্য করে না। কোন সৃষ্ট জীবকে অভাব পূরণের জন্য ডাকা এ কুরআনী নির্দেশের পরিপন্থী ও প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণার নামান্তর। আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিমদেরকে সরল পথে কায়েম রাখুন।
তাফসীরে জাকারিয়া(১৭) আর যদি আল্লাহ তোমাকে ক্লেশদান করেন, তাহলে তিনি ব্যতীত আর কেউ তার মোচনকারী নেই। আর যদি তিনি তোমার কল্যাণ করেন, তাহলে তিনিই তো সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। [1]
[1] অর্থাৎ, ইষ্টানিষ্টের মালিক এবং সারা জাহানে সর্বপ্রকারের কর্তৃত্বকারী কেবল আল্লাহই। তাঁর বিচার-ফায়সালাকে খন্ডাবার মত কেউ নেই। একটি হাদীসে এই বিষয়টাকে এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, اللَّهُمَّ لاَ مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ)) ‘‘হে আল্লাহ! তুমি যা দান কর, তা কেউ রোধ করতে পারে না। আর তুমি যা রোধ কর, তা কেউ দিতেও পারে না। আর ধনীদের ধন তোমার আযাব থেকে বাঁচতে কোন উপকারে আসবে না।’’ (বুখারীঃ ই’তিসাম অধ্যায়, মুসলিম, সালাত ও মাসাজিদ অধ্যায়) নবী করীম (সাঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের পর এই দু’আটি পাঠ করতেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানআর তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর ক্ষমতাবান; আর তিনি প্রজ্ঞাময়, সম্যক অবহিত। আল-বায়ান
তিনি তাঁর বান্দাদের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণকারী, তিনি হলেন প্রজ্ঞাময়, সর্ববিষয়ে ওয়াকিফহাল। তাইসিরুল
তিনিই তাঁর বান্দাদের উপর একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী, তিনিই মহাজ্ঞানী ও সর্ব বিষয়ে ওয়াকিফহাল। মুজিবুর রহমান
And He is the subjugator over His servants. And He is the Wise, the Acquainted [with all]. Sahih International
১৮. আর তিনিই আপন বান্দাদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী(১), আর তিনি প্রজ্ঞাময়, সম্যক অবহিত।
(১) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলাই সবার উপর পরাক্রান্ত ও শক্তিমান এবং সবাই তার ক্ষমতাধীন ও মুখাপেক্ষী। এ কারণেই দুনিয়ার জীবনে অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন মহোত্তম ব্যক্তিগণও সব কাজে সাফল্য অর্জন করতে পারে না এবং তার সব মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় না; তিনি নৈকট্যশীল রাসূলই হোন কিংবা রাজা বাদশাহ। আর তিনি যা আদেশ, নিষেধ, সাওয়াব, শাস্তি, সৃষ্টি বা নির্ধারণ যাই করেন তাই প্রজ্ঞাময়। তিনি গোপন যাবতীয় কিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত। এ সবকিছুই তার তাওহীদের প্রমাণ। [সা’দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৮) তিনি নিজের দাসদের উপর পরাক্রমশালী[1] এবং তিনি প্রজ্ঞাময়, (সর্ববিষয়ে) ওয়াকিফহাল।
[1] অর্থাৎ, সমস্ত মস্তক তাঁর সামনে অবনত। বড় বড় দুর্ধর্ষ তাঁর সামনে অক্ষম। তিনি সব কিছুর উপর বিজয়ী এবং সারা সৃষ্টি তাঁর অনুগত। তিনি তাঁর প্রতিটি কর্মে সুবিজ্ঞ সুকৌশলময় এবং প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে অবগত। অতএব তিনি ভালভাবেই জানেন যে, কে তাঁর অনুগ্রহ ও পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য এবং কে অযোগ্য।
তাফসীরে আহসানুল বায়ানবল, ‘সাক্ষ্য হিসেবে সবচেয়ে বড় বস্তু কী?’ বল, ‘আল্লাহ সাক্ষী আমার ও তোমাদের মধ্যে। আর এ কুরআন আমার কাছে ওহী করে পাঠানো হয়েছে যেন তোমাদেরকে ও যার কাছে এটা পৌঁছবে তাদেরকে এর মাধ্যমে আমি সতর্ক করি। তোমরাই কি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহর সাথে রয়েছে অন্যান্য উপাস্য? বল, ‘আমি সাক্ষ্য দেই না’। বল, ‘তিনি কেবল এক ইলাহ আর তোমরা যা শরীক কর আমি নিশ্চয়ই তা থেকে মুক্ত’। আল-বায়ান
বল, সাক্ষ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় কোনটি? বল, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী। আর এ কুরআন আমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে যাতে আমি তার সাহায্যে তোমাদেরকে আর যাদের কাছে তা পৌঁছবে তাদেরকে সতর্ক করি। তোমরা কি এমন সাক্ষ্য দিতে পার যে, আল্লাহর সঙ্গে অন্য ইলাহও আছে? বল, আমি এমন সাক্ষ্য দেই না, বল তিনি তো এক ইলাহ আর তোমরা যে তাঁর অংশীদার স্থাপন কর, তা থেকে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত। তাইসিরুল
তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করঃ কার সাক্ষ্য সবচেয়ে বেশি গণ্য? তুমি বলে দাওঃ আমার ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহই হচ্ছেন সাক্ষী, আর এই কুরআন আমার নিকট অহীর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে, যেন আমি তোমাদেরকে এবং যাদের নিকট এটি পৌঁছবে তাদের সকলকে এর দ্বারা সতর্ক করি। বাস্তবিকই তোমরা কি এই সাক্ষ্য দিতে পার যে, আল্লাহর সাথে অন্য কোন মা‘বূদ রয়েছে? তুমি বলঃ আমি এই সাক্ষ্য দিতে পারিনা। তুমি ঘোষণা করঃ তিনিই একমাত্র ইলাহ, আর তোমরা যে শিরকে লিপ্ত রয়েছ, আমার সাথে ওর কোনই সম্পর্ক নেই। মুজিবুর রহমান
Say, "What thing is greatest in testimony?" Say, "Allah is witness between me and you. And this Qur'an was revealed to me that I may warn you thereby and whomever it reaches. Do you [truly] testify that with Allah there are other deities?" Say, "I will not testify [with you]." Say, "Indeed, He is but one God, and indeed, I am free of what you associate [with Him]." Sahih International
১৯. বলুন, কোন জিনিস সবচেয়ে বড় সাক্ষী? বলুন, 'আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্যদাতা(১)। আর এ কুরআন আমার নিকট ওহী করা হয়েছে যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট পৌছবে তাদেরকে এ দ্বারা সতর্ক করতে পারি(২)। তোমরা কি এ সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহও আছে? বলুন, ‘আমি সে সাক্ষ্য দেই না। বলুন, তিনি তো একমাত্র প্রকৃত ইলাহ এবং তোমরা যা শরীক কর তা থেকে আমি অবশ্যই বিমুক্ত।
(১) অর্থাৎ কোন জিনিসের সাক্ষ্য সাক্ষী হিসেবে বড় বলে বিবেচিত? বলুন, আল্লাহ। তিনিই সবচেয়ে বড় সাক্ষী। তার সাক্ষ্যের মধ্যে কোন প্রকার ভুল-ত্রুটির সম্ভাবনা নেই। সুতরাং তিনিই আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্য যে, আমি রাসূল। [তাবারী, সা'দী]
(২) এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক সেই ব্যক্তির জন্যই ভীতিপ্রদর্শনকারী যার কাছে এ কুরআনের আহবান পৌছেছে, সে যে-ই হোক না কেন। সুতরাং যার কাছেই এ আহবান পৌছবে সে তাতে ঈমান আনতে বাধ্য। যদি তা না করে তবে সে হবে জাহান্নামী। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত যে সর্বকাল ও সর্বজনব্যাপী তার প্রমাণ কুরআনের অন্য আয়াতেও এসেছে, “বলুন, হে মানুষ! আমি তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর রাসূল।” [সূরা আল-আরাফ: ১৫৮]
আরও এসেছে, “আর আমরা তো আপনাকে কেবল সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।” [সূরা সাবা: ২৮] আরও এসেছে, “কত বরকতময় তিনি! যিনি তার বান্দার উপর ফুরকান নাযিল করেছেন, সৃষ্টিকুলের জন্য সতর্ককারী হতে।” [সূরা আল-ফুরকান: ১]। আর যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ঈমান আনবে না, তাদের শাস্তি যে জাহান্নাম এ কথাও কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, “অন্যান্য দলের যারা তাতে কুফর করে, আগুনই তাদের প্রতিশ্রুত স্থান।” [সূরা হুদ: ১৭] [আদওয়াউল বায়ান]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৯) বল, ‘সাক্ষী হিসাবে কোন্ জিনিস সর্বশ্রেষ্ঠ?’ তুমি বল, ‘আল্লাহ। (তিনিই) আমার ও তোমাদের মধ্যে (শ্রেষ্ঠ) সাক্ষী।[1] আর এই কুরআন আমার নিকট প্রেরিত হয়েছে, যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট এটি পৌঁছবে তাদেরকে এ দ্বারা আমি সতর্ক করি। [2] তোমরা কি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্য আছে?’ বল, ‘আমি সে সাক্ষ্য দিই না।’ বল, ‘তিনিই তো একক উপাস্য এবং তোমরা যে অংশী স্থাপন কর, তা হতে আমি নির্লিপ্ত।’
[1] অর্থাৎ, স্বয়ং আল্লাহই তাঁর একত্ব এবং প্রতিপালকত্বের সব চেয়ে বড় সাক্ষী। তাঁর থেকে বড় সাক্ষী আর কেউ নেই।
[2] রবী’ ইবনে আনাস (রঃ) বলেন, এখন যার কাছেই এই কুরআন পৌঁছে যাবে, সে যদি রসূল (সাঃ)-এর সত্য অনুসারী হয়, তবে তার কর্তব্য হল, সেও লোকদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান জানাবে, যেভাবে রসূল (সাঃ) আহবান জানিয়েছেন এবং ঐভাবে সতর্ক করবে, যেভাবে রসূল (সাঃ) সতর্ক করেছেন। (ইবনে কাসীর)
তাফসীরে আহসানুল বায়ানযাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি তারা তাকে চিনে যেরূপ চিনে তাদের ছেলে-সন্তানদেরকে। যারা নিজদের ক্ষতি করেছে তারা ঈমান আনবে না। আল-বায়ান
আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা তাকে (অর্থাৎ নাবীকে) তেমনি চিনে যেমন চিনে তাদের নিজেদের সন্তানদেরকে, যারা নিজেদের আত্মার ধ্বংস সাধন করেছে, তারা ঈমান আনতে পারবে না। তাইসিরুল
যাদেরকে আমি কিতাব দান করেছি, তারা রাসূলকে এমনভাবে জানে ও চিনে, যেরূপ তারা নিজেদের সন্তান-সন্ততিদেরকে জানে ও চিনে, কিন্তু যারা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছে তারা ঈমান আনবেনা। মুজিবুর রহমান
Those to whom We have given the Scripture recognize it as they recognize their [own] sons. Those who will lose themselves [in the Hereafter] do not believe. Sahih International
২০. আমরা যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা তাকে(১) সেরূপ চিনে যেরূপ চিনে তাদের সন্তানদেরকে। যারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে, তারাই ঈমান আনবে না।(২)
(১) এর অর্থ, যাদের উপর কিতাব নাযিল করেছি তারা ভালভাবেই জানে যে, ইলাহ মাত্র একজনই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্য নবী ও রাসূল। [তাবারী] অনুরূপভাবে তারা এটাও ভাল করে জানে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রিসালত, নবুওয়াত ও ওহীসহ যা নিয়ে এসেছেন তা সবই সত্য। [ইবন কাসীর]
(২) অর্থাৎ যারা তাদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ঈমান ও তাওহীদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, আল্লাহ তা'আলার নেয়ামত থেকে মাহরূম হয়েছে, তারা যে কি পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। [সা’দী]
তাফসীরে জাকারিয়া(২০) যাদেরকে আমি কিতাব (ঐশীগ্রন্থ) দিয়েছি, তারা তাকে সেইরূপ চেনে, যেরূপ তাদের সন্তানদেরকে চেনে। যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে তারা বিশ্বাস করবে না। [1]
[1] يَعْرِفُوْنَهُ তে সর্বনাম (তাকে)এর লক্ষ্যস্থল হল রসূল (সাঃ)। অর্থাৎ, কিতাবধারীরা রসূল (সাঃ)-কে ঐভাবেই চিনত, যেভাবে তারা তাদের ছেলেদেরকে চিনত। কারণ, রসূল (সাঃ)-এর নিদর্শনাবলী ও তাঁর পরিচয় তাদের কিতাবগুলোতে বর্ণনা করা হয়েছিল এবং এই নিদর্শনাবলীর কারণে তারা তাঁর অপেক্ষাতেও ছিল। তাই এখন তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে না, তারা বড়ই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। কেননা, তারা জানা সত্ত্বেও অস্বীকার করছে। فَإِنْ كُنْتَ لاََ تَدْرِيْ فَتِلْكَ مُصِيْبَة * وَإِنْ كُنْتَ تَدْرِيْ فَالْمُصِيْبَةُ أَعْظَمُ।
(যদি তোমার না জানা থাকে তবে এটা মুসীবত, কিন্তু যদি জানা থাকে তাহলে তো মুসীবত আরো বড়।)
তাফসীরে আহসানুল বায়ান