بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
২৩ সূরাঃ আল-মুমিনুন | Al-Mu'minun | سورة المؤمنون - আয়াত সংখ্যাঃ ১১৮ - মাক্কী
২৩:১ قَدۡ اَفۡلَحَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ ۙ﴿۱﴾

অবশ্যই মুমিনগণ সফল হয়েছে, আল-বায়ান

মু’মিনরা সফলকাম হয়ে গেছে। তাইসিরুল

অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মু’মিনগণ- মুজিবুর রহমান

১. অবশ্যই সফলকাম হয়েছে(১) মুমিনগণ,

(১) فلاح শব্দটি কুরআন ও হাদীসে বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ সাফল্য, [সা’দী] أفلح শব্দটির অর্থ, উদ্দেশ্য হাসিল হওয়া, অপছন্দ বিষয়াদি থেকে মুক্তি পাওয়া, কারও কারও নিকট; সর্বদা কল্যাণে থাকা [ফাতহুল কাদীর] আয়াতের অর্থ মুমিনরা অবশ্যই সফলতা অর্জন করেছে অথবা মুমিনরা সফলতা অর্জন করেছে এবং সফলতার উপরই আছে। [ফাতহুল কাদীর] তারা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করেছে। [আদওয়াউল বায়ান] ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত, আয়াতের অর্থ হচ্ছে, যারা তাওহীদের সত্যতায় বিশ্বাসী হয়েছে এবং জান্নাতে প্রবেশ করেছে তারা সৌভাগ্যবান হয়েছে। [বাগভী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) অবশ্যই বিশ্বাসীগণ সফলকাম হয়েছে। [1]

[1] فَلاح শব্দের আভিধানিক অর্থ হল চিরা, বিদীর্ণ করা, কাটা। চাষীকে فَلاَّح বলা হয়, যেহেতু সেও মাটি চিরে ওর মধ্যে বীজ বপন করে থাকে। مُفلِح (সফলকাম)ও সে হয়, যে অনেক কষ্ট ও সংকটের বুক চিরে নিজ লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। অথবা তার জন্য সাফল্যের পথ খুলে যায়; তার জন্য সে পথ বন্ধ হয় না। শরীয়তের দৃষ্টিতে সফলকাম সেই ব্যক্তি, যে ধূলির ধরায় বাস করে নিজ প্রভুকে সন্তুষ্ট করে নেয় এবং তার বিনিময়ে আখেরাতে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার অধিকারী বিবেচিত হয়। আর সেই সাথে যদি পার্থিব সুখ-শান্তি লাভ হয়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। তবে সত্যিকার সফলতা পরকালের সফলতা; যদিও দুনিয়ার মানুষ এর বিপরীত দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ও সুখ-সম্পদকে আসল সফলতা মনে করে। আয়াতে সেই সব মু’মিনদেরকে সফলতার সুসংবাদ শোনানো হয়েছে, যাঁদের মধ্যে উক্ত গুণাবলী বিদ্যমান আছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৩:২ الَّذِیۡنَ ہُمۡ فِیۡ صَلَاتِہِمۡ خٰشِعُوۡنَ ۙ﴿۲﴾

যারা নিজদের সালাতে বিনয়াবনত। আল-বায়ান

যারা নিজেদের নামাযে বিনয় নম্রতা অবলম্বন করে। তাইসিরুল

যারা নিজেদের সালাতে বিনয়, নম্র – মুজিবুর রহমান

২. যারা তাদের সালাতে ভীতি-অবনত(১),

(১) এ হচ্ছে সফলতা লাভে আগ্রহী মুমিনের প্রথম গুণ। “খুশূ” এর আসল মানে হচ্ছে, স্থিরতা, অন্তরে স্থিরতা থাকা; অর্থাৎ ঝুঁকে পড়া, দমিত বা বশীভূত হওয়া, বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করা। [আদওয়াউল বায়ান] ইবন আব্বাস বলেন, এর অর্থ, ভীত ও শান্ত থাকা। [ইবন কাসীর] মুজাহিদ বলেনঃ দৃষ্টি অবনত রাখা। শব্দ নিচু রাখা। [বাগভী] “খুশৃ এবং খুদূ” দুটি পরিভাষা। অর্থ কাছাকাছি। তবে খুদূ কেবল শরীরের উপর প্রকাশ পায়। আর খুশূ মন, শরীর, চোখ ও শব্দের মধ্যে প্রকাশ পায়। আল্লাহ বলেন, “আর রহমানের জন্য যাবতীয় শব্দ বিনীত হয়ে গেছে।” [সূরা ত্বা-হা: ১০৮] আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, খুশূ’ হচ্ছে, ডানে বা বাঁয়ে না তাকানো। [বাগভী] অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন, খুশূ’ হচ্ছে মনের বিনয়। [ইবন কাসীর] সায়ীদ ইবন জুবাইর বলেন, খুশূ হচ্ছে, তার ডানে ও বামে কে আছে সেটা না জানা। আতা বলেনঃ দেহের কোন অংশ নিয়ে খেলা না করা। [বাগভী]

উপরের বর্ণনাগুলো পর্যালোচনা করলে আমরা বুঝতে পারি যে, খুশূ’র সম্পর্ক মনের সাথে এবং দেহের বাহ্যিক অবস্থার সাথেও ৷ মনের খুশূ’ হচ্ছে, মানুষ কারোর ভীতি, শ্রেষ্ঠত্ব, প্ৰতাপ ও পরাক্রমের দরুন সন্ত্রস্ত ও আড়ষ্ট থাকবে। আর দেহের খুশূ' হচ্ছে, যখন সে তার সামনে যাবে তখন মাথা নত হয়ে যাবে, অংগ-প্রত্যংগ ঢিলে হয়ে যাবে, দৃষ্টি নত হবে, কণ্ঠস্বর নিম্নগামী হবে এবং কোন জবরদস্ত প্রতাপশালী ব্যক্তির সামনে উপস্থিত হলে মানুষের মধ্যে যে স্বাভাবিক ভীতির সঞ্চার হয় তার যাবতীয় চিহ্ন তার মধ্যে ফুটে উঠবে। সালাতে খুশূ বলতে মন ও শরীরের এ অবস্থাটি বুঝায় এবং এটাই সালাতের আসল প্ৰাণ।

যদিও খুশূর সম্পর্ক মূলত মনের সাথে এবং মনের খুশূ আপনা আপনি দেহে সঞ্চারিত হয়, তবুও শরীআতে সালাতের এমন কিছু নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে যা একদিকে মনের খুশূ (আন্তরিক বিনয়-নিম্রতা) সৃষ্টিতে সাহায্য করে এবং অন্যদিকে খুশূর হ্রাস-বৃদ্ধির অবস্থায় সালাতের কর্মকাণ্ডকে কমপক্ষে বাহ্যিক দিক দিয়ে একটি বিশেষ মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত রাখে। এই নিয়মগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, সালাত আদায়কারী যেন ডানে বামে না ফিরে এবং মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে না তাকায়, সালাতের মধ্যে বিভিন্ন দিকে ঝুঁকে পড়া নিষিদ্ধ। বারবার কাপড় গুটিানো অথবা ঝাড়া কিংবা কাপড় নিয়ে খেলা করা জায়েয নয়। সিজদায় যাওয়ার সময় বসার জায়গা বা সিজদা করার জায়গা পরিষ্কার করার চেষ্টা করতেও নিষেধ করা হয়েছে। তাড়াহুড়া করে টপাটপ সালাত আদায় করে নেয়াও ভীষণ অপছন্দনীয়। নির্দেশ হচ্ছে, সালাতের প্রত্যেকটি কাজ পুরোপুরি রুকূ, সিজদা, দাঁড়ানো বা বসা যতক্ষণ পুরোপুরি শেষ না হয় ততক্ষণ অন্য কাজ শুরু করা যাবে না। সালাত আদায় করা অবস্থায় যদি কোন জিনিস কষ্ট দিতে থাকে তাহলে এক হাত দিয়ে তা দূর করে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু বারবার হাত নাড়া অথবা বিনা প্রয়োজনে উভয় হাত একসাথে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।

এ বাহ্যিক আদবের সাথে সাথে সালাতের মধ্যে জেনে বুঝে সালাতের সাথে অসংশ্লিষ্ট ও অবান্তর কথা চিন্তা করা থেকে দূরে থাকার বিশয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনিচ্ছাকৃত চিন্তা-ভাবনা মনের মধ্যে আসা ও আসতে থাকা মানুষ মাত্রেরই একটি স্বভাবগত দুর্বলতা। কিন্তু মানুষের পুর্ণপ্রচেষ্টা থাকতে হবে সালাতের সময় তার মন যেন আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট থাকে এবং মুখে যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য চিন্তাভাবনা এসে যায় তাহলে যখনই মানুষের মধ্যে এর অনুভূতি সজাগ হবে তখনই তার মনোযোগ সেদিক থেকে সরিয়ে নিয়ে পুনরায় সালাতের সাথে সংযুক্ত করতে হবে। সুতরাং পূর্ণাঙ্গ খুশূ হচ্ছে, অন্তরে বাড়তি চিন্তা-ভাবনা ইচছাকৃতভাবে উপস্থিত না করা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও স্থিরতা থাকা; অনর্থক নড়াচড়া না করা। বিশেষতঃ এমন নড়াচড়া, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতে নিষিদ্ধ করেছেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সালাতের সময় আল্লাহ তা'আলা বান্দার প্রতি সৰ্বক্ষণ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেন যতক্ষণ না সে অন্য কোন দিকে দৃষ্টি না দেয়। তারপর যখন সে অন্য কোন দিকে মনোনিবেশ করে, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তার দিকে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন। [ইবনে মাজাহঃ ১০২৩]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-নম্র। [1]

[1] خُشُوع অর্থ আন্তরিক ও বাহ্যিক (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে) একাগ্রতা ও নিবিষ্টতা। অন্তরের একাগ্রতা হল, নামাযের অবস্থায় ইচ্ছাকৃত খেয়াল, কল্পনাবিহার ও যাবতীয় চিন্তা (সুচিন্তা, কুচিন্তা ও দুশ্চিন্তা) হতে হৃদয়কে মুক্ত রাখা এবং আল্লাহর মহত্ত্ব ও মহিমা তাতে চিত্রিত করার চেষ্ট করা। আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের একাগ্রতা হল এদিক ওদিক না তাকানো, মুদ্রাদোষজনিত কোন ফালতু নড়া-চড়া না করা, চুল-কাপড় ঠিক-ঠাক না করা। বরং এমন ভয়-ভীতি, কাকুতি-মিনতি ও বিনয়ের এমন ভাব প্রকাশ পাওয়া উচিত, যেমন কোন রাজা-বাদশা বা মহান কোন ব্যক্তিত্বের নিকট গিয়ে প্রকাশ হয়ে থাকে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৩:৩ وَ الَّذِیۡنَ ہُمۡ عَنِ اللَّغۡوِ مُعۡرِضُوۡنَ ﴿ۙ۳﴾

আর যারা অনর্থক কথাকর্ম থেকে বিমুখ। আল-বায়ান

যারা অসার কথাবার্তা এড়িয়ে চলে। তাইসিরুল

যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে – মুজিবুর রহমান

৩. আর যারা আসার কর্মকাণ্ড থেকে থাকে বিমুখ।(১)

(১) পূর্ণ মুমিনের এটি দ্বিতীয় গুণঃ অনর্থক বিষয়াদি থেকে বিরত থাকা। لغو এর অর্থ অসার ও অনর্থক কথা বা কাজ। এর মানে এমন প্রত্যেকটি কথা ও কাজ যা অপ্রয়োজনীয়, অর্থহীন ও যাতে কোন ফল লাভও হয় না। শির্কও এর অন্তর্ভুক্ত, গোনাহের কাজও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হতে পারে [ইবন কাসীর] অনরূপভাবে গান-বাজনাও এর আওতায় পড়ে [কুরতুবী]

মোটকথা: যেসব কথায় বা কাজে কোন লাভ হয় না, যেগুলোর পরিণাম কল্যাণকর নয়, যেগুলোর আসলে কোন প্রয়োজন নেই, যেগুলোর উদ্দেশ্যও ভালো নয় সেগুলোর সবই ‘বাজে’ কাজের অন্তর্ভুক্ত। যাতে কোন দ্বীনী উপকার নেই বরং ক্ষতি বিদ্যমান। এ থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। রাসূলুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “মানুষ যখন অনর্থক বিষয়াদি ত্যাগ করে, তখন তার ইসলাম সৌন্দর্য মণ্ডিত হতে পারে। [তিরমিযীঃ ২৩১৭, ২৩১৮, ইবনে মাজাহঃ ৩৯৭৬]

এ কারণেই আয়াতে একে কামেল মুমিনদের বিশেষ গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। আয়াতের পূর্ণ বক্তব্য হচ্ছে এই যে, তারা বাজে কথায় কান দেয় না এবং বাজে কাজের দিকে দৃষ্টি ফেরায় না। সে ব্যাপারে কোন প্রকার কৌতুহল প্রকাশ করে না। যেখানে এ ধরনের কথাবার্তা হতে থাকে অথবা এ ধরনের কাজ চলতে থাকে। সেখানে যাওয়া থেকে দূরে থাকে। তাতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত হয় আর যদি কোথাও তার সাথে মুখোমুখি হয়ে যায় তাহলে তাকে উপেক্ষা করে, এড়িয়ে চলে যায় অথবা অন্ততপক্ষে তা থেকে সম্পর্কহীন হয়ে যায় ৷ একথাটিকেই অন্য জায়গায় এভাবে বলা হয়েছেঃ “যখন এমন কোন জায়গা দিয়ে তারা চলে যেখানে বাজে কথা হতে থাকে অথবা বাজে কাজের মহড়া চলে তখন তারা ভদ্রভাবে সে জায়গা অতিক্রম করে চলে যায়।” [সূরা আল ফুরকানঃ ৭২]

এ ছাড়াও মুমিন হয় একজন শান্ত-সমাহিত ভারসাম্যপূর্ণ প্রকৃতির অধিকারী এবং পবিত্র-পরিচ্ছন্ন স্বভাব ও সুস্থ রুচিসম্পন্ন মানুষ। বেহুদাপনা তার মেজাজের সাথে কোন রকমেই খাপ খায় না। সে ফলদায়ক কথা বলতে পারে, কিন্তু আজেবাজে গল্প-গুজব তার স্বভাব বিরুদ্ধ। সে ব্যাঙ্গ, কৌতুক ও হালকা পরিহাস পর্যন্ত করতে পারে। কিন্তু উচ্ছল ঠাট্টা-তামাসায় মেতে উঠতে পারে না, বাজে ঠাট্টা-মস্করা ও ভাড়ামি বরদাশত করতে পারে না এবং আনন্দ-ফুর্তি ও ভাড়ামির কথাবার্তাকে নিজের পেশায় পরিণত করতে পারে না।

তার জন্য তো এমন ধরনের সমাজ হয় একটি স্থায়ী নির্যাতন কক্ষ বিশেষ, যেখানে কারো কান কখনো গালি-গালাজ, পরনিন্দা, পরিচর্চা, অপবাদ, মিথ্যা কথা, কুরুচিপুর্ণ গান-বাজনা ও অশ্লীল কথাবার্তা থেকে নিরাপদ থাকে না। আল্লাহ তাকে যে জান্নাতের আশা দিয়ে থাকেন তার একটি অন্যতম নিয়ামত তিনি এটাই বৰ্ণনা করেছেন যে, “সেখানে তুমি কোন বাজে কথা শুনবে না।” [সূরা মারইয়ামঃ ৬২, সূরা আল-ওয়াকি'আহঃ ২৫, সূরা আন-নাবাঃ ৩৫, অনুরূপ সূরা আত-তূরের ২৩ নং আয়াত]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩) যারা অসার ক্রিয়া-কলাপ হতে বিরত থাকে। [1]

[1] لَغو (অসার ক্রিয়া-কলাপ) সেই প্রত্যেক কাজ ও কথা, যাতে কোন উপকার নেই অথবা যাতে দ্বীন বা দুনিয়ার কোন প্রকার ক্ষতি আছে। সে সব থেকে বিরত থাকার অর্থঃ সে সবের প্রতি ভ্রূক্ষেপ পর্যন্তও না করা; সে সব বাস্তবে রূপ দেওয়া তো দূরের কথা।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৩:৪ وَ الَّذِیۡنَ ہُمۡ لِلزَّکٰوۃِ فٰعِلُوۡنَ ۙ﴿۴﴾

আর যারা যাকাতের ক্ষেত্রে সক্রিয়। আল-বায়ান

যারা যাকাত দানে সক্রিয়। তাইসিরুল

যারা যাকাত প্রদানে সক্রিয় – মুজিবুর রহমান

৪. এবং যারা যাকাতে সক্রিয়(১),

(১) পূর্ণ মুমিনের এটি তৃতীয় গুণঃ তারা যাকাতে সদা তৎপর। এটি যাকাত দেয়ার অর্থই প্রকাশ করে। [কুরতুবী] এখানে যাকাত দ্বারা আর্থিক যাকাতও হতে পারে আবার আতিক পবিত্রতাও উদ্দেশ্য হতে পারে। [ইবন কাসীর] এ বিষয়বস্তুটি কুরআন মজীদের অন্যান্য স্থানেও বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন সূরা আল-আলায় বলা হয়েছেঃ “সফলকাম হয়েছে সে ব্যক্তি যে পবিত্রতা অবলম্বন করেছে এবং নিজের রবের নাম স্মরণ করে সালাত আদায় করেছে।” সূরা আশ-শামসে বলা হয়েছেঃ “সফলকাম হলো সে ব্যক্তি যে আত্মশুদ্ধি করেছে এবং ব্যর্থ হলো সে ব্যক্তি যে তাকে দলিত করেছে।”

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) যারা যাকাত দানে সক্রিয় । [1]

[1] زَكاة এর অর্থ কারো কারো নিকটে ফরয যাকাত (যার বিস্তারিত বর্ণনা অর্থাৎ, তার নিসাব, হকদার প্রভৃতির বিশদ বিবরণ মদীনায় দেওয়া হয়েছে। পরন্তু) তার আদেশ মক্কাতেই দেওয়া হয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ এমন কাজকর্ম ও আচরণ অবলম্বন করা, যাতে আত্মার পবিত্রতা ও চরিত্রের সংশোধন সাধন হয়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৩:৫ وَ الَّذِیۡنَ ہُمۡ لِفُرُوۡجِہِمۡ حٰفِظُوۡنَ ۙ﴿۵﴾

আর যারা তাদের নিজদের লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী। আল-বায়ান

যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংরক্ষণ করে। তাইসিরুল

যারা নিজেদের যৌনাংগকে সংযত রাখে – মুজিবুর রহমান

৫. আর যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে রাখে সংরক্ষিত(১),

(১) পূর্ণ মুমিনের এটি চতুর্থ গুণঃ তা হচ্ছে, যৌনাঙ্গকে হেফাযত করা। তারা নিজের দেহের লজ্জাস্থানগুলো ঢেকে রাখে। অর্থাৎ উলংগ হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং অন্যের সামনে লজ্জাস্থান খোলে না। আর তারা নিজেদের লজ্জাস্থানের সততা ও পবিত্ৰতা সংরক্ষণ করে। অৰ্থাৎ যৌন স্বাধীনতা দান করে না এবং কামশক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে লাগামহীন হয় না। অর্থাৎ যারা স্ত্রী ও যুদ্ধলব্ধ দাসীদের ছাড়া সব পর নারী থেকে যৌনাঙ্গকে হেফাযতে রাখে এবং এই দুই শ্রেণীর সাথে শরীআতের বিধি মোতাবেক কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থকরা ছাড়া অন্য কারও সাথে কোন অবৈধ পন্থায় কামবাসনা পূর্ণ করতে প্ৰবৃত্ত হয় না।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫) যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৩:৬ اِلَّا عَلٰۤی اَزۡوَاجِہِمۡ اَوۡ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُہُمۡ فَاِنَّہُمۡ غَیۡرُ مَلُوۡمِیۡنَ ۚ﴿۶﴾

তবে তাদের স্ত্রী ও তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে তারা ছাড়া, নিশ্চয় এতে তারা নিন্দিত হবে না। আল-বায়ান

নিজেদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসী ব্যতীত, কারণ এ ক্ষেত্রে তারা নিন্দা থেকে মুক্ত। তাইসিরুল

নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত, এতে তারা নিন্দনীয় হবেনা। মুজিবুর রহমান

৬. নিজেদের স্ত্রী বা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ছাড়া, এতে তারা হবে না নিন্দিত(১),

(১) দুনিয়াতে পূর্বেও একথা মনে করা হতো এবং আজো বহু লোক এ বিভ্রান্তিতে ভুগছে যে, কামশক্তি মূলত একটি খারাপ জিনিস এবং বৈধ পথে হলেও তার চাহিদা পূরণ করা সৎ ও আল্লাহর প্রতি অনুগত লোকদের জন্য সংগত নয়। তাই একটি প্রাসংগিক বাক্য বাড়িয়ে দিয়ে এ সত্যটি সুস্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে যে, বৈধ স্থানে নিজের প্রবৃত্তির কামনা পূর্ণ করা কোন নিন্দনীয় ব্যাপার নয়। তবে কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য এ বৈধ পথ এড়িয়ে অন্য পথে চলা অবশ্যই গোনাহর কাজ ও স্পষ্ট সীমালঙ্ঘন।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত; এতে তারা নিন্দনীয় হবে না।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৩:৭ فَمَنِ ابۡتَغٰی وَرَآءَ ذٰلِکَ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡعٰدُوۡنَ ۚ﴿۷﴾

অতঃপর যারা এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করে তারাই সীমালঙ্ঘনকারী। আল-বায়ান

এদের অতিরিক্ত যারা কামনা করে তারাই সীমালঙ্ঘনকারী। তাইসিরুল

সুতরাং কেহ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা হবে সীমালংঘনকারী, মুজিবুর রহমান

৭. অতঃপর কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে, তারাই হবে সীমালংঘনকারী(১),

(১) অর্থাৎ বিবাহিত স্ত্রী অথবা যুদ্ধলব্ধ দাসীর সাথে শরীআতের বিধি মোতাবেক কামবাসনা করা ছাড়া কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থকরার আর কোন পথ হালাল নয়। স্ত্রী অথবা দাসীর সাথে হায়েয-নেফাস অবস্থায় কিংবা অস্বাভাবিক পন্থায় সহবাস করা অথবা কোন পুরুষ অথবা বালক অথবা জীব-জন্তুর সাথে কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করা-এগুলো সব নিষিদ্ধ ও হারাম। অধিক সংখ্যক আলেমের মতে হস্তমৈথুনও এর অন্তর্ভুক্ত। [দেখুন, ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭) সুতরাং কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা হবে সীমালংঘনকারী। [1]

[1] এখান থেকে বোঝা যায় যে, ইসলামে ‘মুত্আর’ (কিছু টাকা-কড়ি দিয়ে কোন মহিলাকে সাময়িকভাবে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করার, অনুরূপ হস্তমৈথুন করার) কোন অনুমতি নেই। যৌন বাসনা পূর্ণ করার রাস্তা মাত্র দুটি; স্ত্রী-সঙ্গম অথবা ক্রীতদাসীর সাথে মিলন। বরং বর্তমানে এ বাসনা পূরণের জন্য কেবল স্ত্রীই রয়ে গেছে। কারণ, অধিকারভুক্ত যুদ্ধবন্দিনী বা ক্রীতদাসীর অস্তিত্ব বর্তমানে বিলুপ্ত। কিন্তু যদি কখনও এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়, যখন ক্রীতদাসী বিদ্যমান থাকবে, তখন তাদের সাথে স্ত্রীর মতই মিলন বৈধ হবে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৩:৮ وَ الَّذِیۡنَ ہُمۡ لِاَمٰنٰتِہِمۡ وَ عَہۡدِہِمۡ رٰعُوۡنَ ۙ﴿۸﴾

আর যারা নিজদের আমানতসমূহ ও অঙ্গীকারে যত্নবান। আল-বায়ান

আর যারা নিজেদের আমানাত ও ওয়াদা পূর্ণ করে। তাইসিরুল

এবং যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে – মুজিবুর রহমান

৮. আর যারা রক্ষা করে নিজেদের আমানত(১) ও প্রতিশ্রুতি(২),

(১) পূর্ণ মুমিনের পঞ্চম গুণ হচ্ছে, আমানত প্রত্যাৰ্পণ করাঃ আমানত শব্দের আভিধানিক অর্থে এমন প্রত্যেকটি বিষয় শামিল, যার দায়িত্ব কোন ব্যক্তি বহন করে এবং সে বিষয়ে কোন ব্যক্তির উপর আস্থা স্থাপন করা হয়। দ্বীনী বা দুনিয়াবী, কথা বা কাজ যাই হোক। [দেখুন, কুরতুবী] এর অসংখ্য প্রকার আছে বিধায় এ শব্দটিকে বহুবচনে ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে যাবতীয় প্রকার এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। হুকুকুল্লাহ তথা আল্লাহর হক সম্পর্কিত হোক কিংবা হুকুকুল-এবাদ তথা বান্দার হক সম্পর্কিত হোক। [ফাতহুল কাদীর]

আল্লাহর হক সম্পর্কিত আমানত হচ্ছে শরীআত আরোপিত সকল ফরয ও ওয়াজিব পালন করা এবং যাবতীয় হারাম ও মাকরূহ বিষয়াদি থেকে আত্মরক্ষা করা বান্দার হক সম্পর্কিত আমানতের মধ্যে আর্থিক আমানতও যে অন্তর্ভুক্ত তা সুবিদিত; অর্থাৎ কেউ কারও কাছে টাকা-পয়সা গচ্ছিত রাখলে তা তার আমানত প্ৰত্যাৰ্পণ করা পর্যন্ত এর হেফাযত করা তার দায়িত্ব। এছাড়া কেউ কোন গোপন কথা কারও কাছে বললে তাও তাঁর আমানত। শরীআতসম্মত অনুমতি ব্যতিরেকে কারও গোপন তথ্য ফাঁস করা আমানতে খেয়ানতের অন্তর্ভুক্ত। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে কখনো আমানতের খেয়ানত করেন এবং কখনো নিজের চুক্তি ও অংগীকার ভংগ করে না। রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম প্রায়ই তাঁর ভাষণে বলতেনঃ যার মধ্যে আমানতদারীর গুণ নেই তার মধ্যে ঈমান নেই এবং যার মধ্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার গুণ নেই তার মধ্যে দ্বীনদারী নেই। [মুসনাদে আহমাদঃ ৩/১৩৫]

তাছাড়া অন্য হাদীসে রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেছেন, চারটি অভ্যাস যার মধ্যে পাওয়া যায় সে নিখাদ মুনাফিক এবং যার মধ্যে এর কোন একটি পাওয়া যাবে সে তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে তা মুনাফেকীর একটি অভ্যাস হিসেবেই থাকে। সে চারটি অভ্যাস হচ্ছে কোন আমানত তাকে সোপর্দ করলে করা হলে সে তার খেয়ানত করে, কখনো কথা বললে মিথ্যা কথা বলে, প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে এবং যখনই কারো সাথে ঝগড়া করে তখনই (নৈতিকতা ও সততার) সীমালংঘন করে। [বুখারী ৩৪, মুসলিম ৫৮]


(২) পূর্ণ মুমিনের ষষ্ঠ গুণ হচ্ছে, অঙ্গীকার পূর্ণ করা। আমানত সাধারণত যার উপর মানুষ কাউকে নিরাপদ মনে করে। আর অঙ্গীকার বলতে বুঝায় আল্লাহর পক্ষ থেকে বা বান্দার পক্ষ থেকে যে সমস্ত অঙ্গীকার বা চুক্তি হয়। আমানত ও অঙ্গীকার একসাথে বলার কারণে দ্বীন-দুনিয়ার যা কিছু কারও উপর দায়িত্ব দেয়া হয় সবই এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮) এবং যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। [1]

[1] ‘আমানত রক্ষা করা’ বলতে অর্পিত কর্তব্য পালন করা, গুপ্ত কথা ও মালের আমানতের হিফাযত করা। আর ‘প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা’ বলতে আল্লাহর সঙ্গে কৃত ও মানুষের সঙ্গে কৃত ওয়াদা, অঙ্গীকার ও চুক্তি পূরণ সবই শামিল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৩:৯ وَ الَّذِیۡنَ ہُمۡ عَلٰی صَلَوٰتِہِمۡ یُحَافِظُوۡنَ ۘ﴿۹﴾

আর যারা নিজদের সালাতসমূহ হিফাযত করে। আল-বায়ান

আর যারা নিজেদের নামাযের ব্যাপারে যত্নবান। তাইসিরুল

আর যারা নিজেদের সালাতে যত্নবান – মুজিবুর রহমান

৯. আর যারা নিজেদের সালাতে থাকে যত্নবান(১)

(১) পূর্ণ মুমিনের সপ্তম গুণ হচ্ছে, সালাতে যত্নবান হওয়া। উপরের খুশূর আলোচনায় সালাত শব্দ এক বচনে বলা হয়েছিল আর এখানে বহুবচনে “সালাতসমূহ” বলা হয়েছে। উভয়ের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এই যে, সেখানে লক্ষ্য ছিল মূল সালাত আর এখানে পৃথক পৃথকভাবে প্রতিটি ওয়াক্তের সালাত সম্পর্কে বক্তব্য দেয়া হয়েছে। “সালাতগুলোর সংরক্ষণ” এর অর্থ হচ্ছেঃ সে সালাতের সময়, সালাতের নিয়ম-কানুন, আরকান ও আহকাম, প্রথম ওয়াক্ত, রুকু সিজদা, মোটকথা সালাতের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি জিনিসের প্রতি পুরোপুরি নজর রাখে। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর]

এ গুণগুলোর শুরু হয়েছিল সালাত দিয়ে আর শেষও হয়েছে সালাত দিয়ে। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, সালাত শ্রেষ্ঠ ও উৎকৃষ্ট ইবাদাত। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা দৃঢ়তা অবলম্বন কর, তবে তোমরা কখনও পুরোপুরি দৃঢ়পদ থাকতে পারবে না। জেনে রাখা যে, তোমাদের সর্বোত্তম আমল হচ্ছে সালাত। আর মুমিনই কেবল ওযুর ব্যাপারে যত্নবান হয়।” [ইবন মাজহ: ২৭৭]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯) আর যারা নিজেদের নামাযে যত্নবান থাকে। [1]

[1] পরিশেষে আবার নামাযে যত্নবান হওয়া সফলতার জন্য জরুরী বলা হয়েছে। যাতে নামাযের গুরুত্ব ও মর্যাদা স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় যে, আজকাল মুসলিমদের নিকট অন্যান্য নেক আমলের মত নামাযেরও কোন গুরুত্ব নেই। সুতরাং ইন্না লিল্লাহি অইন্না ইলাইহি রা-জিঊন!

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৩:১০ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡوٰرِثُوۡنَ ﴿ۙ۱۰﴾

তারাই হবে ওয়ারিস। আল-বায়ান

তারাই হল উত্তরাধিকারী। তাইসিরুল

তারাই হবে উত্তরাধিকারী। মুজিবুর রহমান

১০. তারাই হবে অধিকারী—

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০) তারাই হবে উত্তরাধিকারী।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ 1 to 10 of 118 পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 4 5 6 · · · 11 12 Next »