بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
সূরাঃ ১০৫/ আল-ফীল | Al-Fil | سورة الفيل আয়াতঃ ৫ মাক্কী
১০৫:১ اَلَمۡ تَرَ کَیۡفَ فَعَلَ رَبُّکَ بِاَصۡحٰبِ الۡفِیۡلِ ؕ﴿۱﴾

তুমি কি দেখনি তোমার রব হাতীওয়ালাদের সাথে কী করেছিলেন? আল-বায়ান

তুমি কি দেখনি (কা‘বা ঘর ধ্বংসের জন্য আগত) হাতীওয়ালাদের সঙ্গে তোমার প্রতিপালক কীরূপ ব্যবহার করেছিলেন? তাইসিরুল

তুমি কি দেখনি যে, তোমার রাব্ব হস্তি অধিপতিদের কিরূপ (পরিণতি) করেছিলেন? মুজিবুর রহমান

১. আপনি কি দেখেন নি(১) আপনার রব হাতির অধিপতিদের প্রতি কী করেছিলেন?

(১) এখানে أَلَمْ تَرَ “আপনি কি দেখেননি” বলা হয়েছে। বাহ্যত এর দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে, অথচ এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্মের কিছুদিন পূর্বেকার ঘটনা। কোন কোন মুফাসসির এর সমাধানে বলেন, এখানে শুধু কুরাইশদেরকেই নয় বরং সমগ্র আরববাসীকেই সম্বোধন করা হয়েছে। তারা এই সমগ্র ঘটনা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিল। কুরআন মজিদের বহু স্থানে ‘আলাম তারা’ বা আপনি কি দেখেননি? শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নয় বরং সাধারণ লোকদেরকে সম্বোধন করাই উদ্দেশ্য। [কুরতুবী]

অপর কোন কোন তাফসীরবিদ বলেন, যে ঘটনা এরূপ নিশ্চিত যে, তা ব্যাপকভাবে প্রত্যক্ষ করা হয়, সে ঘটনার জ্ঞানকেও দেখা বলে ব্যক্ত করা হয়; যেন এটা চাক্ষুষ ঘটনা। তাছাড়া, এক পর্যায়ে দেখাও প্রমাণিত আছে; যেমন কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, আয়েশা ও আসমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা দুজন হস্তীচালককে অন্ধ, বিকলাঙ্গ ও ভিক্ষুকররূপে দেখেছিলেন। বাইহাকী: দালায়েলুন নাবুওয়াহ, ১/৫২] [আত-তাহরীর ওয়াততানওয়ীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

১। তুমি কি দেখনি যে, তোমার প্রতিপালক হাতি-ওয়ালাদের সাথে কিরূপ (আচরণ) করেছিলেন? [1]

[1] যারা ইয়ামান দেশ হতে কা’বাগৃহকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এসেছিল। ألَم تَرَ এর অর্থ হল ألَم تَعلَم অর্থাৎ, তুমি কি জান না? এখানে জিজ্ঞাসা সাব্যস্তের জন্য ব্যবহার হয়েছে। অর্থ হল, তুমি জান অথবা ঐসব লোকেরা জানে, যারা তোমার যুগের। এরূপ এ জন্যই বলা হয়েছে যে, এই ঘটনা ঘটার পর খুব বেশী দিন অতিবাহিত হয়নি। শুদ্ধ প্রমাণ অনুযায়ী এই ঘটনা সেই বছর ঘটেছিল, যে বছরে মহানবী (সাঃ)-এর জন্ম হয়। আর আরবদের মাঝে এই ঘটনা বড় প্রসিদ্ধ ছিল।

সংক্ষিপ্ত আকারে আবরাহার হস্তী বাহিনীর ঘটনা নিম্নরূপঃ-

হাবশার বাদশাহর তরফ থেকে ইয়ামান দেশে আবরাহা গভর্নর ছিল। সে ‘সানআ’তে একটি খুব বড় গির্জা নির্মাণ করাল। আর চেষ্টা করল, যাতে লোকেরা কা’বাগৃহ ত্যাগ করে ইবাদত ও হজ্জ-উমরাহর জন্য এখানে আসে। এ কাজ মক্কাবাসী তথা অন্যান্য আরব গোত্রের জন্য অপছন্দনীয় ছিল। অতএব তাদের মধ্যে একজন আবরাহার নির্মাণকৃত উপাসনালয়ে পায়খানা করে নোংরা করে দিল। আবরাহার নিকট খবর পৌঁছল যে, গির্জাকে কেউ নোংরা ও অপবিত্র করে দিয়েছে। যার প্রতিক্রিয়ায় সে কা’বা ঘরকে ধ্বংস করার দৃঢ়সংকল্প করে নিল। সে বহু সংখ্যক সৈন্যসহ মক্কার উপর হামলা করার উদ্দেশ্যে রওনা হল। কিছু হাতীও তাদের সাথে ছিল। মক্কার নিকট পৌঁছে সৈন্যরা (মক্কার সর্দার) নবী (সাঃ)-এর দাদার উটগুলি দখল করে নিল। এ ব্যাপারে আব্দুল মুত্তালিব আবরাহাকে বললেন, আমার উটসমূহকে ফিরিয়ে দিন; যা আপনার সৈন্যরা ধরে রেখেছে। (আবরাহা বলল, এখন আমরা তোমাদের কা’বা ধ্বংস করতে এসেছি, আর তুমি কেবল উট ছেড়ে দেওয়ার দাবী কর? তিনি বললেন, উটগুলি আমার। তাই আমি সেগুলির হিফাযত চাই।) বাকী থাকল কা’বা ঘরের ব্যাপার যাকে আপনি ধ্বংস করতে এসেছেন, তো সেটা হল আপনার ব্যাপার আল্লাহর সাথে। কা’বা হল আল্লাহর ঘর। তিনিই হলেন তার হিফাযতকারী। আপনি জানেন আর বায়তুল্লাহর মালিক আল্লাহ জানেন। অতঃপর যখন এই সৈন্যদল (মিনার কাছে) ‘মুহাসসার’ উপত্যকার নিকট পৌঁছল, তখন আল্লাহ তাআলা একটি পাখীর দলকে প্রেরণ করলেন যাদের ঠোঁটে এবং পায়ে পোড়া মাটির কাঁকর ছিল যা ছোলা অথবা মসুরীর দানা সমপরিমাণ ছিল। পাখীরা উপর থেকে সেই কাঁকর বর্ষণ করতে লাগল। যে সৈন্যকে এই কাঁকর লাগল সে গলে গেল, তার শরীর হতে গোশত খসে পড়ল এবং পরিশেষে সে মারা গেল। ‘সানআ’ পৌঁছতে পৌঁছতে খোদ আবরাহারও একই পরিণাম হল। এইভাবে আল্লাহ তাআলা নিজ ঘরের হিফাযত করলেন। (আয়সারুত তাফাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০৫:২ اَلَمۡ یَجۡعَلۡ کَیۡدَہُمۡ فِیۡ تَضۡلِیۡلٍ ۙ﴿۲﴾

তিনি কি তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেননি? আল-বায়ান

তিনি কি তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেননি? তাইসিরুল

তিনি কি তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেননি? মুজিবুর রহমান

২. তিনি কি তাদের কৌশল ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে দেননি?

-

তাফসীরে জাকারিয়া

২। তিনি কি তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেন নি? [1]

[1] অর্থাৎ, সেই ব্যক্তি, যে কা’বাগৃহকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এসেছিল তাকে তাতে অসফল করলেন। এখানে জিজ্ঞাসা সাব্যস্তের জন্য।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০৫:৩ وَّ اَرۡسَلَ عَلَیۡہِمۡ طَیۡرًا اَبَابِیۡلَ ۙ﴿۳﴾

আর তিনি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করেছিলেন। আল-বায়ান

তিনি তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী। তাইসিরুল

তাদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পক্ষীকূল প্রেরণ করেছিলেন – মুজিবুর রহমান

৩. আর(১) তাদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠান(২)

(১) যদি আয়াতটিকে পূর্বের আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট ধরা হয়, তখন এ আয়াতটির অর্থ হয়, “তিনি কি তাদের উপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠান নি?” পক্ষান্তরে যদি আয়াতটিকে প্রথম আয়াতটির সাথে সম্পৃক্ত করা হয়, তখন এর অর্থ হবে, “আপনি কি দেখেন নি, তিনি তাদের উপর ঝাকে ঝাঁকে পাখি পাঠিয়েছিলেন?” [আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর]


(২) أبابيل শব্দের অনুবাদ করা হয়েছে, ঝাঁকে ঝাঁকে, যা একটার পর একটা আসে। কারও কারও মতে, শব্দটি বহুবচন। অৰ্থ পাখির ঝাঁক-কোন বিশেষ প্রাণীর নাম নয়। [তাবারী] বলা হয়ে থাকে যে, এ জাতীয় পাখি পূর্বে কখনও দেখা যায়নি। [কুরতুবী]

তাফসীরে জাকারিয়া

৩। তাদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী প্রেরণ করেছিলেন।[1]

[1] أبَابِيل (আবাবীল) পাখীর নাম নয়; বরং এর অর্থ হল, ঝাঁকে ঝাঁকে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০৫:৪ تَرۡمِیۡہِمۡ بِحِجَارَۃٍ مِّنۡ سِجِّیۡلٍ ۪ۙ﴿۴﴾

তারা তাদের ওপর নিক্ষেপ করে পোড়ামাটির কঙ্কর। আল-বায়ান

যারা তাদের উপর পাথরের কাঁকর নিক্ষেপ করেছিল। তাইসিরুল

যারা তাদের উপর প্রস্তর কংকর নিক্ষেপ করেছিল। মুজিবুর রহমান

৪. যারা তাদের উপর শক্ত পোড়ামাটির কঙ্কর নিক্ষেপ করে।(১)

(১) উপরে سجيل এর অর্থ করা হয়েছে, পোড়া মাটির কঙ্কর। [মুয়াস্‌সার] কারও কারও মতে, ভেজা মাটি আগুনে পুড়ে শক্ত হয়ে যে, কংকর তৈরি হয়, সে কংকরকে سجيل বলা হয়ে থাকে। [জালালাইন] আবার কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ অতি শক্ত পাথরের কঙ্কর। [আদওয়াউল বায়ান]

তাফসীরে জাকারিয়া

৪। যারা তাদের উপর পোড়া মাটির পাথর নিক্ষেপ করেছিল। [1]

[1] سِجِّيل বলা হয় মাটিকে আগুনে পুড়িয়ে তৈরী করা কাঁকরকে। এই ছোট ছোট কাঁকর বা পাথরের টুকরাগুলো (আল্লাহর কুদরতে) ধ্বংসকারিতায় কামান ও বন্দুকের গুলি অপেক্ষা বেশী কাজ করেছিল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০৫:৫ فَجَعَلَہُمۡ کَعَصۡفٍ مَّاۡکُوۡلٍ ﴿۵﴾

অতঃপর তিনি তাদেরকে করলেন ভক্ষিত শস্যপাতার ন্যায়। আল-বায়ান

অতঃপর তিনি তাদেরকে করে দিলেন ভক্ষিত তৃণ-ভুষির মত। তাইসিরুল

অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত তৃণ সদৃশ করে দেন। মুজিবুর রহমান

৫. অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত তৃণ-সদৃশ করেন।(১)

(১) عصف এর অর্থ শুষ্ক তৃণ-লতা, শুকনো খড়কুটো।। কঙ্কর নিক্ষিপ্ত হওয়ার ফলে আবরাহার সেনাবাহিনীর অবস্থা শুষ্ক তৃণ ভক্ষিত হওয়ার পর যা হয়, তদ্রুপই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। [তাবারী, ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

৫। অতঃপর তিনি তাদেরকে করেছিলেন চিবানো ঘাসের মত।[1]

[1] অর্থাৎ, তাদের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো এমন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, যেমন হয় পশু কর্তৃক চিবানো ঘাস।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান