আল্লাহর একত্ব (তাওহীদ) বিষয়ক আয়াতসমূহ ৫০ টি
আল-বাকারা
২:১৬৩ وَ اِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ الرَّحۡمٰنُ الرَّحِیۡمُ ﴿۱۶۳﴾

আর তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি অতি দয়াময়, পরম দয়ালু। আল-বায়ান

তোমাদের উপাস্য হচ্ছেন এক আল্লাহ, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন উপাস্য নেই। তিনি পরম করুনাময়, অতি দয়ালু। তাইসিরুল

এবং তোমাদের ইলাহ একমাত্র আল্লাহ; সেই সর্বদাতা করুণাময় ব্যতীত অন্য কেহ উপাস্য নেই। মুজিবুর রহমান

১৬৩. আর তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ, দয়াময়, অতি দয়ালু তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই।(১)

(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল্লাহর ইসমে আযাম' এ দুটি আয়াতের মধ্যে রয়েছে।” তারপর তিনি এ আয়াত ও সূরা আলে ইমরানের প্রথম আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন। [তিরমিযী: ৩৪৭৮, আবু দাউদ: ১৪৯৬, ইবনে মাজাহ: ৩৮৫৫]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৬৩) আর তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য (আল্লাহ)। তিনি ব্যতীত আর কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই, [1] তিনি চরম করুণাময়, পরম দয়ালু।

[1] এই আয়াতে আবারও তাওহীদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। তাওহীদের এই দাওয়াত মক্কার মুশরিকদের জন্য বোধগম্য ছিল না। তারা বলল, {أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ} সে কি এতগুলো উপাস্যের পরিবর্তে একটি মাত্র উপাস্য সাব্যস্ত করেছে। নিশ্চয় এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। (সূরা স্বা-দঃ ৫ আয়াত) এই জন্যই পরের আয়াতে এই তাওহীদের প্রমাণাদি পেশ করা হচ্ছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২৫৫ اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَۚ اَلۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ۬ۚ لَا تَاۡخُذُہٗ سِنَۃٌ وَّ لَا نَوۡمٌ ؕ لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یَشۡفَعُ عِنۡدَہٗۤ اِلَّا بِاِذۡنِہٖ ؕ یَعۡلَمُ مَا بَیۡنَ اَیۡدِیۡہِمۡ وَ مَا خَلۡفَہُمۡ ۚ وَ لَا یُحِیۡطُوۡنَ بِشَیۡءٍ مِّنۡ عِلۡمِہٖۤ اِلَّا بِمَا شَآءَ ۚ وَسِعَ کُرۡسِیُّہُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ ۚ وَ لَا یَـُٔوۡدُہٗ حِفۡظُہُمَا ۚ وَ ہُوَ الۡعَلِیُّ الۡعَظِیۡمُ ﴿۲۵۵﴾

আল্লাহ! তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি স্বাধীন ও নিত্য নতুন ধারক, সব কিছুর ধারক। তন্দ্রা ও নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করেনা। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু রয়েছে সবই তাঁর। কে আছে এমন, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করতে পারে? সম্মুখের অথবা পশ্চাতের সবই তিনি অবগত আছেন। একমাত্র তিনি যতটুকু ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত, তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারেনা। তাঁর আসন আসমান ও যমীন ব্যাপী হয়ে আছে এবং এতদুভয়ের সংরক্ষণে তাঁকে বিব্রত হতে হয়না। তিনিই সর্বোচ্চ, মহীয়ান। (আয়াতুল কুরসী) আল-বায়ান

আল্লাহ, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বদা রক্ষণাবেক্ষণকারী। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে, তাঁরই। কে সেই ব্যক্তি যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর নিকট সুপারিশ করে? তিনি লোকদের সমুদয় প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অবস্থা জানেন। পক্ষান্তরে মানুষ তাঁর জ্ঞানের কোনকিছুই আয়ত্ত করতে সক্ষম নয়, তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছে করেন সেটুকু ছাড়া। তাঁর কুরসী আকাশ ও পৃথিবী পরিবেষ্টন করে আছে এবং এ দু’য়ের রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না, তিনি উচ্চ মর্যাদাশীল, মহান। তাইসিরুল

আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। তাঁর জন্যই আসমানসমূহে যা রয়েছে তা এবং যমীনে যা আছে তা। কে সে, যে তাঁর নিকট সুপারিশ করবে তাঁর অনুমতি ছাড়া? তিনি জানেন যা আছে তাদের সামনে এবং যা আছে তাদের পেছনে। আর তারা তাঁর জ্ঞানের সামান্য পরিমাণও আয়ত্ব করতে পারে না, তবে তিনি যা চান তা ছাড়া। তাঁর কুরসী আসমানসমূহ ও যমীন পরিব্যাপ্ত করে আছে এবং এ দু’টোর সংরক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ, মহান। (আয়াতুল কুরসী) মুজিবুর রহমান

২৫৫. আল্লাহ(১), তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই(২) তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক(৩)। তাকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্ৰাও নয়(৪)। আসমানসমূহে যা রয়েছে ও যমীনে যা রয়েছে সবই তার(৫) কে সে, যে তার অনুমতি ব্যতীত তার কাছে সুপারিশ করবে(৬)? তাদের সামনে ও পিছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন।(৭) আর যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তার জ্ঞানের কোন কিছুকেই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না(৮)। তার কুরসী আসমানসমূহ ও যমীনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে(৯); আর এ দু’টোর রক্ষণাবেক্ষণ তার জন্য বোঝা হয় না(১০)। আর তিনি সুউচ্চ সুমহান(১১)।

(১) এ আয়াতটিকে আয়াতুল কুরসী বলা হয়। এটি মর্যাদার দিক থেকে কুরআনের সর্ববৃহৎ আয়াত। হাদীসে এ আয়াতের অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই ইবনে কাবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কুরআনের মধ্যে কোন আয়াতটি সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ? উবাই ইবনে কাব আরয করলেন, তা হচ্ছে আয়াতুল কুরসী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা সমর্থন করে বললেন, হে আবুল মুনযির! জ্ঞান তোমার জন্য সহজ হোক’। [মুসলিমঃ ৮১০]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ যে লোক প্রত্যেক ফরয সালাতের পর আয়াতুল-কুরসী নিয়মিত পাঠ করে, তার জন্য জান্নাতে প্রবেশের পথে একমাত্র মৃত্যু ছাড়া অন্য কোন অন্তরায় থাকে না। [নাসায়ী, দিন-রাতের আমলঃ ১০০] অর্থাৎ মৃত্যুর সাথে সাথেই সে জান্নাতের ফলাফল এবং আরাম আয়েশ উপভোগ করতে শুরু করবে। অনেকেই এ সূরার আয়াতুল কুরসীতে “ইসমে আযম” আছে বলে মত দিয়েছেন।

আয়াতুল কুরসীর বিশেষ তাৎপর্যঃ এ আয়াতে মহান রব আল্লাহ জাল্লা-শানুহুর একক অস্তিত্ব, তাওহীদ ও গুণাবলীর বর্ণনা এক অত্যাশ্চর্য ও অনুপম ভঙ্গিতে দেয়া হয়েছে, যাতে আল্লাহর অস্তিত্ববান হওয়া, জীবিত হওয়া, শ্রবণকারী হওয়া, দর্শক হওয়া, বাকশক্তিসম্পন্ন হওয়া, তার সত্তার অপরিহার্যতা, তার অসীম-অনন্ত কাল পর্যন্ত থাকা, সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা ও উদ্ভাবক হওয়া, যাবতীয় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া, সমগ্র বিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়া, এমন শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের অধিকারী হওয়া যাতে তার অনুমতি ছাড়া তার সামনে কেউ কোন কথা বলতে না পারে, এমন পরিপূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী হওয়া যাতে সমগ্র বিশ্ব ও তার যাবতীয় বস্তুনিচয়কে সৃষ্টি করা এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাদের শৃংখলা বজায় রাখতে গিয়ে তাকে কোন ক্লান্তি বা পরিশ্রান্তির সম্মুখীন হতে হয় না এবং এমন ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী হওয়া যাতে কোন প্রকাশ্য কিংবা গোপন বস্তু কিংবা কোন অণু-পরমাণুর বিন্দু-বিসর্গও যাতে বাদ পড়তে না পারে। এই হচ্ছে আয়াতটির মোটামুটি ও সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু। আল্লামা ইবনে কাসীর বলেনঃ এ আয়াতটিতে দশটি বাক্য রয়েছে। প্রতিটি বাক্যের সাথেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা রয়েছে।


(২) প্রথম বাক্য (اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ) এতে আল্লাহ শব্দটি অস্তিত্ববাচক নাম। (لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ) সে সত্তারই বর্ণনা, যে সত্তা ইবাদাতের যোগ্য। মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কোন সত্তা-ই ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য নয়। তিনিই একমাত্র হক মা’বুদ। আর সবই বাতিল উপাস্য।


(৩) দ্বিতীয় বাক্য (الْحَيُّ الْقَيُّومُ) আরবী ভাষায় حَيٌّ অর্থ হচ্ছে জীবিত। আল্লাহর নামের মধ্য থেকে এ নামটি ব্যবহার করে বলে দিয়েছে যে, তিনি সর্বদা জীবিত; মৃত্যু তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। قَيُّوم শব্দ কেয়াম থেকে উৎপন্ন, এটা ব্যুৎপত্তিগত আধিক্যের অর্থে ব্যবহৃত। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, তিনি নিজে বিদ্যমান থেকে অন্যকেও বিদ্যমান রাখেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন। কাইয়ূম আল্লাহর এমন এক বিশেষ গুণবাচক নাম যাতে কোন সৃষ্টি অংশীদার হতে পারে না। তার সত্তা স্থায়ীত্বের জন্য কারো মুখাপেক্ষী নয়। কেননা, যে নিজের স্থায়ীত্ব ও অস্তিত্বের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী, সে অন্যের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ কি করে করবে? সে জন্যই কোন মানুষকে কাইয়ূম বলা জায়েয নয়। যারা আবদুল কাইয়ূম নামকে বিকৃত করে শুধু কাইয়ুম বলে, তারা গোনাহগার হবে। অনুরূপভাবে, আল্লাহর এমন আরও কিছু নাম আছে, যেগুলো কোন বান্দাহর বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে না। যেমন, রাহমান, মান্নান, দাইয়্যান, ওয়াহহাব এ জাতীয় নামের ব্যাপারেও উপরোক্ত হুকুম প্রযোজ্য। আল্লাহর নামের মধ্যে (الْحَيُّ الْقَيُّومُ) অনেকের মতে ইসমে-আযম।


(৪) তৃতীয় বাক্য لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ আরবীতে سِنَةٌ শব্দের সীন-এর كسرة দ্বারা উচ্চারণ করলে এর অর্থ হয় তন্দ্রা বা নিদ্রার প্রাথমিক প্রভাব, نوم পূর্ণ নিদ্রাকে বলা হয়। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তা'আলা তন্দ্রা ও নিদ্রা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। পূর্ববর্তী বাক্যে ‘কাইয়ূম’ শব্দে মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, আসমান ও যমীনের যাবতীয় বস্তুর নিয়ন্ত্রণকারী হচ্ছেন আল্লাহ্‌ তা’আলা। সমস্ত সৃষ্টিরাজি তাঁর আশ্রয়েই বিদ্যমান। এতে করে হয়ত ধারণা হতে পারে যে, যে সত্তা এত বড় কার্য পরিচালনা করেছেন, তার কোন সময় ক্লান্তি আসতে পারে এবং কিছু সময় বিশ্রাম ও নিদ্রার জন্য থাকা দরকার। দ্বিতীয় বাক্য দ্বারা সীমিত জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে জানানো হয়েছে যে, আল্লাহকে নিজের বা অন্য কোন সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করবে না, নিজের মত মনে করবে না। তিনি সমকক্ষতা ও সকল তুলনার উর্ধ্বে। তার পরিপূর্ণ ক্ষমতার পক্ষে এসব কাজ করা কঠিন নয়। আবার তার ক্লান্তিরও কোন কারণ নেই। আর তার সত্তা যাবতীয় ক্লান্তি, তন্দ্রা ও নিদ্রার প্রভাব থেকে মুক্ত ও পবিত্র।


(৫) চতুর্থ বাক্য (لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ) বাক্যের প্রারম্ভে ব্যবহৃত “লাম” অক্ষর মালিকানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আকাশ এবং যমীনে যা কিছু রয়েছে সে সবই আল্লাহর মালিকানাধীন। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইচ্ছাশক্তির মালিক। যেভাবে ইচ্ছা তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।


(৬) পঞ্চম বাক্য (مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ) অর্থ হচ্ছে, এমন কে আছে যে, তার সামনে কারো সুপারিশ করতে পারে, তার অনুমতি ব্যতীত? এতে বুঝা যায় যে, যখন আল্লাহ্ তা'আলা যাবতীয় সৃষ্ট বস্তুর মালিক এবং কোন বস্তু তার চাইতে বড় নয়, তাই কেউ তার কোন কাজ সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকারী নয়। তিনি যা কিছু করেন, তাতে কারো আপত্তি করার অধিকার নেই। তবে এমন হতে পারত যে, কেউ কারো জন্য সুপারিশ করে, তাই এ বিষয়টিও স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে যে, এ ক্ষমতাও কারো নেই। তবে আল্লাহর কিছু খাস বান্দা আছেন, যারা তার অনুমতি সাপেক্ষে তা করতে পারবেন, অন্যথায় নয়। হাদীসে এরশাদ হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম আমি সুপারিশ করব। [মুসলিমঃ ১৯৩] একে ‘মাকামে-মাহমুদ’ বলা হয়, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য খাস। অন্য কারো জন্য নয়।


(৭) ষষ্ঠ বাক্য (يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা অগ্র-পশ্চাত যাবতীয় অবস্থা ও ঘটনা সম্পর্কে অবগত। অগ্র-পশ্চাত বলতে এ অর্থও হতে পারে যে, তাদের জন্মের পূর্বের ও জন্মের পরের যাবতীয় অবস্থা ও ঘটনাবলী আল্লাহর জানা রয়েছে। আর এ অর্থও হতে পারে যে, অগ্র বলতে সে অবস্থা বোঝানো হয়েছে যা মানুষের জন্য প্রকাশ্য, আর পশ্চাত বলতে বোঝানো হয়েছে যা অপ্রকাশ্য। তাতে অর্থ হবে এই যে, কোন কোন বিষয় মানুষের জ্ঞানের আওতায় রয়েছে কিন্তু কোন কোন বিষয়ে তাদের জ্ঞান নেই। কিছু তাদের সামনে প্রকাশ্য আর কিছু গোপন। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে সবই প্রকাশ্য। তার জ্ঞান সে সমস্ত বিষয়ের উপরই পরিব্যপ্ত। সুতরাং এ দুটিতে কোন বিরোধ নেই। আয়াতের ব্যাপকতায় উভয়দিকই বোঝানো হয়।


(৮) সপ্তম বাক্য (وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ) অর্থাৎ মানুষ ও সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের কোন একটি অংশবিশেষকেও পরিবেষ্টিত করতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যাকে যে পরিমাণ জ্ঞান দান করেন শুধু ততটুকুই সে পেতে পারে। এতে বলা হয়েছে যে, সমগ্র সৃষ্টির অণু-পরমাণুর ব্যাপক জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের আওতাভুক্ত, এটা তার বৈশিষ্ট্য। মানুষ অথবা অন্য কোন সৃষ্টি এতে অংশীদার নয়।


(৯) অষ্টম বাক্য (وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ) অর্থাৎ তার কুরসী এত বড় যার মধ্যে সাত আকাশ ও যমীন পরিবেষ্টিত রয়েছে। হাদীসের বর্ণনা দ্বারা এতটুকু বোঝা যায় যে, আরশ ও কুরসী এত বড় যে, তা সমগ্র আকাশ ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে রেখেছে। ইবনে কাসীর আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, কুরসী কি এবং কেমন? তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যার হাতে আমার প্রাণ তার কছম, কুরসীর সাথে সাত আসমানের তুলনা একটি বিরাট ময়দানে ফেলে দেয়া একটি আংটির মত। আর কুরসীর উপর আরশের শ্রেষ্ঠত্ব যেমন আংটির বিপরীতে বিরাট ময়দানের শ্রেষ্ঠত্ব। [ইবন হিব্বান: ৩৬১ বায়হাকী: ৪০৫]


(১০) নবম বাক্য (وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষে এ দুটি বৃহৎ সৃষ্টি, আসমান ও যমীনের হেফাজত করা কোন কঠিন কাজ বলে মনে হয় না। কারণ, এই অসাধারণ ও একক পরিপূর্ণ সত্তার পক্ষে এ কাজটি একান্তই সহজ ও অনায়াসসাধ্য।


(১১) দশম বাক্য (وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ) অর্থাৎ তিনি অতি উচ্চ ও অতি মহান। পূর্বের নয়টি বাক্যে আল্লাহর সত্তা ও গুণের পূর্ণতা বর্ণনা করা হয়েছে। তা দেখার এবং বোঝার পর প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলতে বাধ্য হবে যে, সকল শান-শওকত, বড়ত্ব ও মহত্ব এবং শক্তির একমাত্র মালিক আল্লাহ তা'আলা। এ দশটি বাক্যে আল্লাহর যাত ও সিফাতের পূর্ণ বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৫৫) আল্লাহ ; তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সব কিছুর ধারক। [1] তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্ত তাঁরই। কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে, তা তিনি অবগত আছেন। যা তিনি ইচ্ছা করেন, তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর কুরসী [2] আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী পরিব্যাপ্ত। আর সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি সুউচ্চ, মহামহিম।

[1] এটিকে আয়াতুল কুরসী বলা হয়। এর অনেক ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন, এই আয়াত হল কুরআনের অতীব মহান আয়াত। এটা পড়লে রাতে শয়তান থেকে হিফাযতে থাকা যায়। প্রত্যেক ফরয নামাযের পর পড়লে বেহেশত যাওয়ার পথে মরণ ছাড়া অন্য কিছু বাধা থাকে না। (ইবনে কাসীর) এটি মহান আল্লাহর গৌরবময় গুণাবলী, তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা এবং তাঁর পরাক্রমশালীতা ও মহানুভবতা সম্বলিত সংক্ষিপ্ত শব্দে বহুল অর্থ বিশিষ্ট অতীব মহান আয়াত।

[2] ‘কুরসী’র অর্থ কেউ বলেছেন, মহান আল্লাহর পা রাখার স্থান। কেউ বলেছেন, জ্ঞান। কেউ বলেছেন, শক্তি ও মাহাত্ম্য। কেউ বলেছেন, রাজত্ব এবং কেউ বলেছেন, আরশ। তবে মহান আল্লাহর গুণাবলীর ব্যাপারে মুহাদ্দেসীন ও সালফে-সালেহীনদের নীতি হল, তাঁর গুণগুলি যেভাবে কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলির কোন অপব্যাখ্যা ও ধরন-গঠন নির্ণয় না করে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। কাজেই এটাই বিশ্বাস করতে হবে যে, এটা সত্যিকারের কুরসী যা আরশ থেকে পৃথক বস্তু (এবং সঠিক মতে তা আল্লাহর পা রাখার জায়গা)। তার ধরন ও আকৃতি কেমন এবং তাতে মহান আল্লাহ কিভাবে আসীন হন, তা আমরা বর্ণনা করতে পারব না। কেননা, তার অর্থ আমাদের জানা; কিন্তু তার প্রকৃতত্ব আমাদের কাছে অজানা।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:২ اللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ۙ الۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ؕ﴿۲﴾

আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরপ্রতিষ্ঠিত ধারক। আল-বায়ান

আল্লাহ, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব সকলের রক্ষণাবেক্ষণকারী। তাইসিরুল

আল্লাহ ছাড়া কোনই ইলাহ (উপাস্য) নেই, তিনি চিরঞ্জীব ও নিত্য বিরাজমান। মুজিবুর রহমান

২. আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন প্রকৃত ইলাহ নেই(১), তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক।(২)

(১) এ আয়াতে তাওহীদের ইতিহাসভিত্তিক প্রমাণ পেশ করা হয়েছে। যেমন, মনে করুন, কোন একটি বিষয়ে বিভিন্ন দেশের অধিবাসী ও বিভিন্ন সময়ে জন্মগ্রহণকারী সব মানুষ একমত। পূর্বাপর এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে শত শত, এমন কি হাজার হাজার বছরের ব্যবধান। একজনের উক্তি অন্য জনের কাছে পৌছারও কোন উপায় নেই। তা সত্বেও যিনিই আসেন তিনিই যদি পূর্ববর্তীদের মত একই কথা বলেন, একই কর্ম ও একই বিশ্বাসের অনুসারী হন, তবে এমন বিষয়ের সত্যতা স্বীকার করে নিতে মানব-স্বভাব বাধ্য। উদাহরনতঃ আল্লাহ্ তা'আলার তাওহীদের পরিচয় সম্পর্কিত তথ্যাদিসহ সর্বপ্রথম আদম আলাইহিস সালাম দুনিয়াতে পদার্পণ করেন। তার ওফাতের পর তার বংশধরদের মধ্যে আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কিত এই তথ্যের চর্চা প্রচলিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পর এবং আদম সন্তানদের প্রাথমিক কালের আচার-অভ্যাস, সভ্যতাসংস্কৃতি প্রভৃতি সর্ববিষয়ে ব্যাপক পরিবর্তন সূচীত হওয়ার পর নুহ আলাইহিস সালাম আগমন করেন।

তিনিও মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কিত ঐসব বিষয়ের দিকে দাওয়াত দিতে থাকেন, যেসব বিষয়ের দিকে আদম 'আলাইহিস্ সালাম দাওয়াত দিতেন। অতঃপর সুদীর্ঘকাল অতীতের গর্ভে বিলীন হওয়ার পর ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক ও ইয়াকুব আলাইহিমুস সালাম ইরাক ও সিরিয়ায় জন্মগ্রহন করেন। তারাও হুবহু একই দাওয়াত নিয়ে কর্মক্ষেত্রে অবতরন করেন। এরপর মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালাম এবং তাদের বংশের রাসূলগণ আগমন করেন। তারা সবাই সে একই কালেমায়ে তাওহীদের বাণী প্রচার করেন এবং এ কালেমার প্রতি মানুষজনকে দাওয়াত দিতে থাকেন। এরপরও দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়ে গেলে ঈসা আলাইহিস সালাম সেই একই আহবান নিয়ে আগমন করেন। সবার শেষে খাতামুল-আম্বিয়া মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে দুনিয়াতে আবির্ভূত হন।

মোটকথা, আদম থেকে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত যত নবী ও রাসূল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাষায় এবং বিভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং সবাই একই বাণী উচ্চারণ করেন। তাদের অধিকাংশেরই পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ পর্যন্ত হয়নি। তাদের আবির্ভাবকালে গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশনার আমলও ছিল না যে, এক রাসূল অন্য রাসূলের গ্রন্থাদি ও রচনাবলী পাঠ করে তার দাওয়াতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করবেন; বরং তাদের একজন অন্যজন থেকে বহুদিন পরে জন্মগ্রহণ করেছেন। জাগতিক উপকরণাদির মাধ্যমে পূর্ববর্তী রাসূলগণের কোন অবস্থা তাদের জানা থাকারও কথা নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী লাভ করেই তারা পূর্বসুরীদের যাবতীয় অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকেই তাদেরকে এ দাওয়াত প্রচার করার জন্য নিযুক্ত করা হয়।

এখন যে ব্যক্তি ইসলাম ও তাওহীদের দাওয়াতের প্রতি মনে মনে কোনরূপ বৈরীভাব পোষণ করে না, সে যদি খোলা মনে সরলভাবে চিন্তা করে, তবে এত বিপুল সংখ্যক নবী-রাসূল বিভিন্ন সময় এক বিষয়ে একমত হওয়াই বিষয়টির সত্যতা নিরূপণের জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু রাসূলগণের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, তাদের সততা ও সাধুতার উচ্চতম মাপকাঠির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে কারো পক্ষে এরূপ বিশ্বাস করা ছাড়া গত্যন্তর নেই যে, তাদের বাণী ষোল আনাই সত্য এবং তাদের দাওয়াতে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেরই মঙ্গল নিহিত। [তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন]


(২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দু'টি আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার ইসমে আযম রয়েছে, এক, (وَإِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ) দুই, সূরা আলে ইমরানের প্রথম দু' আয়াত’। [তিরমিযীঃ ৩৪৭৮]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব ও সব কিছুর ধারক। [1]

[1] حَيٌّ এবং قَيُّومٌ মহান আল্লাহর বিশেষ গুণ। ‘হায়্যুন’এর অর্থ তিনি চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু ও ধ্বংস নেই। ‘ক্বায়্যুম’এর অর্থ, তিনি নিখিল বিশ্বের ধারক, সংরক্ষণকারী এবং পর্যবেক্ষক। বিশ্বের সব কিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। খ্রিষ্টানরা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ অথবা তাঁর পুত্র কিংবা তিনের এক মনে করত। সুতরাং তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, ঈসা (আঃ)ও যখন আল্লাহর সৃষ্টি, তিনি মায়ের পেট থেকে জন্ম নিয়েছেন এবং তাঁর জন্মকালও পৃথিবী সৃষ্টির বহুকাল পর। তাহলে তিনি আল্লাহ অথবা তাঁর পুত্র কিভাবে হতে পারেন? যদি তোমাদের বিশ্বাস সঠিক হত, তাহলে সে সৃষ্টি হয়ে তাকে ইলাহী গুণের অধিকারী এবং অনাদি হওয়া উচিত ছিল। অনুরূপ তাঁর উপর মৃত্যু আসাও উচিত নয়, কিন্তু এমন এক সময় আসবে যখন মৃত্যু তাঁকে গ্রাস করবে। আর খ্রিষ্টানদের ধারণা অনুযায়ী তিনি তো মারাই গেছেন। বহু হাদীসে এসেছে যে, আল্লাহর ইসমে আ’যম (মহান নাম) তিনটি আয়াতে এসেছে। কেউ যদি এই নামের অসীলায় দু’আ করে, তাহলে তা প্রত্যাখ্যাত হয় না। এক তো এই সূরা আলে-ইমরানে। দ্বিতীয় আয়াতুল কুরসীতে [اللهُ لا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ] এবং তৃতীয় সূরা ত্বাহাতে [وَعَنَتِ الْوُجُوهُ لِلْحَيِّ الْقَيُّومِ] (ইবনে কাসীর-তাফসীর আয়াতুল কুরসী)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:৬ ہُوَ الَّذِیۡ یُصَوِّرُکُمۡ فِی الۡاَرۡحَامِ کَیۡفَ یَشَآءُ ؕ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۶﴾

তিনিই মাতৃগর্ভে তোমাদেরকে আকৃতি দান করেন যেভাবে তিনি চান। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই; তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

তিনিই তোমাদেরকে মায়ের পেটে যেভাবে ইচ্ছে আকৃতি দেন, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তিনি মহাশক্তিমান ও প্রজ্ঞাশীল। তাইসিরুল

তিনিই স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী জরায়ুর মধ্যে তোমাদের আকৃতি গঠন করেছেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোনই উপাস্য নেই, তিনি পরাক্রান্তশালী, বিজ্ঞানময় । মুজিবুর রহমান

৬. তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছে তোমাদের আকৃতি গঠন করেন।(১) তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই; (তিনি) প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

(১) কাতাদা বলেন, আল্লাহর শপথ, আমাদের রব তার বান্দাদেরকে মায়ের গর্ভে যেভাবে ইচ্ছা গঠন করতে পারেন। ছেলে বা মেয়ে, কালো বা গৌরবর্ণ, পূর্ণসৃষ্টি অথবা অপূর্ণসৃষ্টি। [আত-তাফসীরুস সহীহ]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই। [1] তিনি প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

[1] সুশ্রী অথবা কুশ্রী, ছেলে অথবা মেয়ে, সৌভাগ্যবান অথবা দুর্ভাগ্যবান এবং পূর্ণাঙ্গ অথবা বিকলাঙ্গ ইত্যাদি বিচিত্রময়তা মায়ের গর্ভে যখন এককভাবে আল্লাহই সৃষ্টি করেন, তখন ঈসা (আঃ) ইলাহ কিভাবে হতে পারেন? তিনি নিজেও তো সৃষ্টির নানা পর্যায় অতিক্রম করে দুনিয়াতে এসেছেন। মহান আল্লাহ তাঁরও সৃষ্টি সম্পাদন করেছেন তাঁর মায়ের গর্ভে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৮ شَہِدَ اللّٰہُ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ۙ وَ الۡمَلٰٓئِکَۃُ وَ اُولُوا الۡعِلۡمِ قَآئِمًۢا بِالۡقِسۡطِ ؕ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿ؕ۱۸﴾

আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই, আর ফেরেশতা ও জ্ঞানীগণও। তিনি ন্যায় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া সত্যিকার কোন ইলাহ নেই এবং ফেরেশতাগণ ও ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানীগণও (সাক্ষ্য দিচ্ছে যে,) তিনি ছাড়া সত্যিকার কোন ইলাহ নেই, তিনি মহাপরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী। তাইসিরুল

আল্লাহ সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, নিশ্চয়ই তিনি ব্যতীত কেহ ইলাহ (উপাস্য) নেই এবং মালাইকা/ফেরেশতা, জ্ঞানবানগণ ও সুবিচারে আস্থা স্থাপনকারীগণও সাক্ষ্য দেয় যে, এই মহা পরাক্রান্ত বিজ্ঞানময় ব্যতীত আর কোনই উপাস্য নেই। মুজিবুর রহমান

১৮. আল্লাহ সাক্ষ্য দেন(১) যে, নিশ্চয় তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। আর ফেরেশতাগণ এবং জ্ঞানীগণও, আল্লাহ ন্যায়নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই, (তিনি) পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

(১) অর্থাৎ যে আল্লাহ বিশ্ব জাহানের সমস্ত তত্ত্ব, সত্য ও রহস্যের প্রত্যক্ষ জ্ঞান রাখেন, যিনি সমগ্র সৃষ্টিকে আবরণহীন অবস্থায় দেখছেন এবং যার দৃষ্টি থেকে পৃথিবী ও আকাশের কোন একটি বস্তুও গোপন নেই এটি তার সাক্ষ্য। আর তার চেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য আর কে দিতে পারে? কারণ পৃথিবীতে ইলাহের স্বত্ব দাবী করার অধিকার ও যোগ্যতা কারও নেই। তিনি নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি ব্যতীত আর কোন হক্ক ইলাহ নেই। তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করা যুলুম ও অন্যায়। আল্লাহ্ তা'আলার এ সাক্ষ্যের সাথে তিনি আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদেরকেও শরীক করেছেন। তারাও এ মহৎ সাক্ষ্য দিয়ে থাকে। তারপর আল্লাহ তা'আলা আলেম তথা দ্বীনের জ্ঞানে জ্ঞানীদেরকেও এ সাক্ষ্য প্রদানের জন্য গ্রহণ করে সম্মানিত করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি মূলত: আলেম তথা দ্বীনের জ্ঞানে জ্ঞানীদের সম্মান বহুগুণ বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। [ইবনুল কাইয়্যেম: মিফতাহু দারিস সা’আদাহ; তাফসীরে সা'দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৮) আল্লাহ সাক্ষ্য দেন এবং ফিরিশতাগণ ও জ্ঞানী ব্যক্তিগণও সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই।[1] তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই; তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।

[1] ‘শাহাদাত’ (সাক্ষ্য) এর অর্থ বর্ণনা ও অবহিত করা। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং বর্ণনা করেছেন, তার দ্বারা তিনি আমাদেরকে স্বীয় একত্ববাদের প্রতি পথপ্রদর্শন করেছেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) ফিরিশতাগণ এবং জ্ঞানিগণও তাঁর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেন। এতে জ্ঞানী ব্যক্তিদের বড়ই ফযীলত ও মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়। কেননা মহান আল্লাহ স্বীয় ফিরিশতাদের পাশাপাশি তাঁদেরকে উল্লেখ করেছেন। তবে জ্ঞানী বলতে তাঁরা, যাঁরা কিতাব ও সুন্নাহর জ্ঞানার্জন করে ধন্য হয়েছেন। (ফাতহুল ক্বাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:৬২ اِنَّ ہٰذَا لَہُوَ الۡقَصَصُ الۡحَقُّ ۚ وَ مَا مِنۡ اِلٰہٍ اِلَّا اللّٰہُ ؕ وَ اِنَّ اللّٰہَ لَہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۶۲﴾

নিশ্চয় এটি সত্য বিবরণ। আর আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই এবং নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই হলেন পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাপূর্ণ। আল-বায়ান

নিশ্চয়ই এটা প্রকৃত ঘটনা। আল্লাহ ছাড়া অন্য সত্য ইলাহ নেই। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই এটাই সত্য বিবরণ এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ (উপাস্য) নেই, নিশ্চয়ই সেই আল্লাহ বিজ্ঞানময়, মহাপরাক্রান্ত। মুজিবুর রহমান

৬২. নিশ্চয় এগুলো সত্য বিবরণ এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন হক ইলাহ নেই। আর নিশ্চয় আল্লাহ, তিনি তো পরম পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬২) নিশ্চয়ই এ হল সত্য কাহিনী। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই। আর নিশ্চয় আল্লাহ পরম প্রতাপশালী, প্রজ্ঞাময়।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:৮৭ اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ لَیَجۡمَعَنَّکُمۡ اِلٰی یَوۡمِ الۡقِیٰمَۃِ لَا رَیۡبَ فِیۡہِ ؕ وَ مَنۡ اَصۡدَقُ مِنَ اللّٰہِ حَدِیۡثًا ﴿۸۷﴾

আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্র করবেন কিয়ামতের দিনে। এতে কোন সন্দেহ নেই। আর কথায় আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী কে? আল-বায়ান

আল্লাহ, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তিনি ক্বিয়ামাত দিবসে সকলকে একত্র করবেনই, এতে কোনই সন্দেহ নেই, আল্লাহ অপেক্ষা আর কার কথা অধিক সত্য হতে পারে? তাইসিরুল

আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কেহ উপাস্য নেই; নিশ্চয়ই এতে সন্দেহ নেই যে, তিনি তোমাদেরকে একত্রিত করবেন; এবং বাক্যে আল্লাহ অপেক্ষা কে বেশি সত্যপরায়ন? মুজিবুর রহমান

৮৭. আল্লাহ, তিনি ছাড়া অন্য কোন প্রকৃত ইলাহ নেই; অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে কেয়ামতের দিন একত্র করবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই(১) আর আল্লাহ্‌র চেয়ে বেশী সত্যবাদী কে?(২)

(১) আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। তাকেই উপাস্য মনে কর এবং যে কাজই কর, তার ইবাদাতের নিয়তে কর। তিনি কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে একত্রিত করবেন। এতে কোন সন্দেহ নেই। ঐ দিন সবাইকে প্রতিদান দেবেন। কিয়ামতের ওয়াদা, প্রতিদান ও শাস্তির সওয়াব সব সত্য।


(২) কেননা এ সংবাদ আল্লাহর দেয়া। আল্লাহর চাইতে কার কথা সত্য হতে পারে? তিনি নিজে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি ব্যতীত আর কোন সত্য ইলাহ নেই। তিনি আরও ঘোষণা করছেন যে, তিনি সবাইকে কিয়ামতের দিন একত্রিত করবেন। সুতরাং এ তাওহীদ ও আখেরাতের ব্যাপারে কারও মনে কোন প্রকার সন্দেহ থাকা উচিত হবে না।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮৭) আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই। নিশ্চয়ই তিনি তোমাদেরকে শেষ বিচারের দিন একত্র করবেন --এতে কোন সন্দেহ নেই। আর কথায় আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী কে আছে?

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:১৭১ یٰۤاَہۡلَ الۡکِتٰبِ لَا تَغۡلُوۡا فِیۡ دِیۡنِکُمۡ وَ لَا تَقُوۡلُوۡا عَلَی اللّٰہِ اِلَّا الۡحَقَّ ؕ اِنَّمَا الۡمَسِیۡحُ عِیۡسَی ابۡنُ مَرۡیَمَ رَسُوۡلُ اللّٰہِ وَ کَلِمَتُہٗ ۚ اَلۡقٰہَاۤ اِلٰی مَرۡیَمَ وَ رُوۡحٌ مِّنۡہُ ۫ فَاٰمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَ رُسُلِہٖ ۚ۟ وَ لَا تَقُوۡلُوۡا ثَلٰثَۃٌ ؕ اِنۡتَہُوۡا خَیۡرًا لَّکُمۡ ؕ اِنَّمَا اللّٰہُ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ؕ سُبۡحٰنَہٗۤ اَنۡ یَّکُوۡنَ لَہٗ وَلَدٌ ۘ لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ وَ کَفٰی بِاللّٰہِ وَکِیۡلًا ﴿۱۷۱﴾

হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলো না। মারইয়ামের পুত্র মাসীহ ঈসা কেবলমাত্র আল্লাহর রাসূল ও তাঁর কালিমা, যা তিনি প্রেরণ করেছিলেন মারইয়ামের প্রতি এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন এবং বলো না, 'তিন'। তোমরা বিরত হও, তা তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহই কেবল এক ইলাহ, তিনি পবিত্র মহান এ থেকে যে, তাঁর কোন সন্তান হবে। আসমানসূহে যা রয়েছে এবং যা রয়েছে যমীনে, তা আল্লাহরই। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। আল-বায়ান

ওহে কিতাবধারীগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না, আর আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ছাড়া কিছু বলো না, ঈসা মাসীহ তো আল্লাহর রসূল আর তাঁর বানী যা তিনি মারইয়ামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন, আর তাঁর পক্ষ হতে নির্দেশ, কাজেই তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান আনো, আর বলো না ‘তিন’ (জন ইলাহ আছে), নিবৃত্ত হও, তা হবে তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আল্লাহ তো একক ইলাহ, তিনি পবিত্র এত্থেকে যে, তাঁর সন্তান হবে। আসমানসমূহে আর যমীনে যা আছে সব কিছু তাঁরই, আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। তাইসিরুল

হে আহলে কিতাব! তোমরা স্বীয় ধর্মে সীমা অতিক্রম করনা এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে সত্য ব্যতীত বলনা; নিশ্চয়ই মারইয়াম নন্দন ঈসা মাসীহ্ আল্লাহর রাসূল ও তাঁর বাণী - যা তিনি মারইয়ামের প্রতি সঞ্চারিত করেছিলেন এবং তাঁর আদিষ্ট আত্মা; অতএব আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর। আর ‘‘আল্লাহ তিন জনের একজন’’- এ কথা বলা পরিহার কর। তোমাদের কল্যাণ হবে; নিশ্চয়ই আল্লাহই একমাত্র ইলাহ; তিনি কোন সন্তান হওয়া হতে পুতঃ, মুক্ত। নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলে যা আছে তা তাঁরই এবং আল্লাহই কার্য সম্পাদনে যথেষ্ট। মুজিবুর রহমান

১৭১. হে কিতাবীরা স্বীয় দ্বীনের মধ্যে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না(১) এবং আল্লাহর উপর সত্য ব্যতীত কিছু বলো না। মারইয়াম-তনয় ঈসা মসীহ কেবল আল্লাহ্‌র রাসূল এবং তার বাণী(২), যা তিনি মারইয়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন ও তার পক্ষ থেকে রূহ। কাজেই তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলদের উপর ঈমান আন এবং বলো না, তিন(৩)! নিবৃত্ত হও, এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহই তো এক ইলাহ; তার সন্তান হবে---তিনি এটা থেকে পবিত্ৰ-মহান। আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও যমীনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই; আর কর্মবিধায়করূপে আল্লাহই যথেষ্ট।(৪)

(১) غُلُوّ শব্দের অর্থ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া। অর্থাৎ দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার অর্থ তার ন্যায়সঙ্গত সীমারেখা অতিক্রম করা। আহলে কিতাব অর্থাৎ ইয়াহুদী-নাসারা উভয় জাতিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, দ্বীনের ব্যাপারে কোনরূপ বাড়াবাড়ি করো না। কারণ এ বাড়াবাড়ি রোগে উভয় জাতিই আক্রান্ত হয়েছে। নাসারারা ঈসা 'আলাইহিস্ সালাম-কে ভক্তি-শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে। তাকে স্বয়ং আল্লাহ, আল্লাহর পুত্র অথবা তিনের এক আল্লাহ বানিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে ইয়াহুদীরা তাকে অমান্য ও প্রত্যাখ্যান করার দিক দিয়ে বাড়াবাড়ি পথ অবলম্বন করেছে। তারা ঈসা আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহর নবী হিসেবে স্বীকার করেনি। বরং তার মাতা মারইয়াম 'আলাইহাস সালাম-এর উপর মারাত্মক অপবাদ আরোপ করেছে এবং তার নিন্দাবাদ করেছে। দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবড়ি ও সীমালংঘনের কারণে ইয়াহুদী ও নাসারাদের গোমরাহী ও ধ্বংস হওয়ার শোচনীয় পরিণতি বারবার প্রত্যক্ষ হয়েছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রিয় উম্মতকে এ ব্যাপারে সংযত থাকার জন্য সতর্ক করেছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে এমন অতিরঞ্জিত করো না, যেমন নাসারারা ঈসা ইবন মারইয়াম আলাইহিমুস সালাম-এর ব্যাপারে করেছে। স্মরণ রাখবে যে, আমি আল্লাহর বান্দা। অতএব, আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল বলবে।” [বুখারীঃ ৩৪৪৫] অর্থাৎ আল্লাহর বান্দা ও মানুষ হিসেবে আমিও অন্য লোকদের সমপর্যায়ের। তবে আমার সবচেয়ে বড় মর্যাদা এই যে, আমি আল্লাহর রাসূল। এর চেয়ে অগ্রসর করে আমাকে আল্লাহ তা'আলার কোন বিশেষণে বিশেষিত করা বাড়াবাড়ি বৈ নয়। তোমরা ইয়াহুদী-নাসারাদের মতো বাড়াবাড়ি করো না। হাদীসে এসেছে যে, হজের সময় ‘রমীয়ে জামারাহ’ অর্থাৎ কংকর নিক্ষেপের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে কংকর আনতে আদেশ করলেন। তিনি মাঝারি আকারের পাথরকুচি নিয়ে এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত পছন্দ করলেন এবং বললেন, “এ ধরণের মাঝারী আকারের কংকর নিক্ষেপ করাই পছন্দনীয়। বাক্যটি তিনি দু’বার বললেন। তারপর বললেন, ‘তোমরা দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি থেকে দূরে থেকে। কারণেই ধ্বংস হয়েছে। [ইবন মাজাহ: ৩০২৯]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একটি কাজ করলেন যাতে রুখসত বা ছাড় ছিল। কিন্তু কিছু লোক সেটা করতে অপছন্দ করল। সেটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌছলে তিনি আল্লাহর হামদ ও প্রশংসার পর বললেন, কিছু লোকের এ কি অবস্থা হয়েছে যে, তারা আমি যা করছি তা করা থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়? আল্লাহর শপথ, আল্লাহর ব্যাপারে আমি তাদের থেকে সবচেয়ে বেশী জানি এবং তাদের থেকেও বেশী আল্লাহর ভয় করি। [বুখারী: ৭৩০১]


(২) এখানে ‘কালেমাতুহু’ শব্দে বাতলে দেয়া হয়েছে যে, ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কালেমা। মুফাসসিরগণ এর বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করেছেন

(১) ‘কালেমাতুল্লাহ’ অর্থ আল্লাহর সুসংবাদ। এর দ্বারা ঈসা আলাইহিস্ সালাম-এর ব্যক্তি-সত্তাকে বোঝানো হয়েছে। ইতোপূর্বে আল্লাহ তা'আলা ফিরিশতার মাধ্যমে মারইয়াম 'আলাইহাস সালামকে ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে যে সুসংবাদ দান করেছিলেন সেখানে ‘কালেমা’ শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, (إِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكِ بِكَلِمَةٍ) “যখন ফিরিশতারা বললো, হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন এক কালেমার” [সূরা আলে-ইমরানঃ ৪৫]

(২) কারো মতে এখানে ‘কালেমা’ অর্থ নিদর্শন। যেমন অন্য এক আয়াতে শব্দটি নিদর্শন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যথা: (وَصَدَّقَتْ بِكَلِمَاتِ رَبِّهَا) [সূরা আত-তাহরীম: ১২] তাই আল্লাহ্ তা'আলা কর্তৃক মারইয়ামের প্রতি কালেমা পাঠাবার অর্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তা'আলা মারইয়াম 'আলাইহাস সালামের গর্ভাধারকে কোন পুরুষের শুক্ৰকীটের সহায়তা ছাড়াই গর্ভধারণের হুকুম দিলেন। সে হিসেবে ঈসা আলাইহিস সালাম শুধু আল্লাহর কালেমা বা নির্দেশে চিরাচরিত প্রথার বিপরীতে পিতার মাধ্যম ছাড়াই জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

(৩) কাতাদা বলেন, কালেমা দ্বারা كُنْ বা ‘হও’ শব্দ বোঝানো হয়েছে। [তাবারী] ঈসা আলাইহিস সালামকে ‘কালেমাতুল্লাহ’ বলার কারণ হচ্ছে এই যে, ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের ব্যাপারটি জাগতিক কোন মাধ্যম বাদেই আল্লাহর কালেমা দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। এখানে তাকে 'আল্লাহর কালাম' বলে বিশেষভাবে উল্লেখ করে সম্মানিত করাই উদ্দেশ্য। নতুবা সবকিছুই আল্লাহর কালেমার মাধ্যমেই হয়। তার কালেমা ব্যতীত কিছুই হয় না। আল্লাহ ঈসা আলাইহিস সালামকে তার নিদর্শন ও আশ্চর্যতম সৃষ্টি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জিবরীল আলাইহিস সালামকে মারইয়ামের নিকট পাঠালেন। জিবরীল আলাইহিস সালাম তার জামার ফাঁকে ফুঁ দিলেন। এ পবিত্র ফেরেশতার পবিত্র ফুঁ মারইয়ামের গর্ভে প্রবেশ করলে আল্লাহ তা'আলা সে ফুঁকটিকে পবিত্র রুহ হিসেবে পরিণত করলেন। আর এ জন্যই তাঁকে সম্মানিত করে ‘রুহুল্লাহ’ বলা হয়ে থাকে। [তাফসীরে সা’দী]


(৩) কুরআন নাযিলের সমসাময়িক কালে খৃষ্টানরা যেসব উপদলে বিভক্ত ছিল, তন্মধ্যে ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে তাদের ধর্মবিশ্বাস তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এক দল মনে করতো-মসীহই আল্লাহ। স্বয়ং আল্লাহই মসীহরূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। দ্বিতীয় দল বলতো - মসীহ পুত্র। তৃতীয় দলের বিশ্বাস ছিল - তিন সদস্যের সমন্বয়ে আল্লাহর একক পরিবার। এ দলটি আবার দুটি উপদলে বিভক্ত ছিল। এক দলের মতে পিতা, পুত্র ও মারইয়াম এ তিনের সমন্বয়ে এক আল্লাহ। অন্য একদলের মতে মারইয়াম 'আলাইহিস সালাম-এর পরিবর্তে রূহুল কুদুস বা পবিত্র আত্মা জিবরীল আলাইহিস সালাম ছিলেন তিন আল্লাহর একজন।

মোটকথা, খৃষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালাম-কে তিনের এক আল্লাহ মনে করতো। তাদের ভ্রান্তি অপনোদনের জন্য কুরআনুল কারীমে প্রত্যেকটি উপদলকে ভিন্ন ভিন্নভাবে সম্বোধন করা হয়েছে এবং সম্মিলিতভাবেও সম্বোধন করা হয়েছে। তাদের সামনে স্পষ্ট ও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, সত্য একটিই। আর তা হলো ঈসা মসীহ আলাইহিস সালাম তার মাতা মারইয়াম আলাইহিস সালাম এর গর্ভে জন্মগ্রহণকারী একজন মানুষ ও আল্লাহ্ তা'আলার সত্য রাসূল। এর অতিরিক্ত তার সম্পর্কে যা কিছু বলা বা ধারণা করা হয়, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বাতিল। তার প্রতি ইয়াহুদীদের মত অবজ্ঞা বা ঈর্ষা পোষণ করা অথবা খৃষ্টানদের মত অতিভক্তি প্রদর্শন করা সমভাবে নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কুরআনুল কারীমের অসংখ্য আয়াতে একদিকে ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের পথভ্রষ্টতা দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, অপরদিকে আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উচ্চ মর্যাদা ও বিশেষ সম্মানের অধিকারী হওয়ার কথাও জোরালোভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। ফলে অবজ্ঞা ও অতিভক্তি দুটি পরস্পর বিরোধী ভ্রান্ত মতবাদের মধ্যবর্তী সত্য ও ন্যায়ের সঠিক পথ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।


(৪) অর্থাৎ আকাশ ও যমীনের উপর হতে নীচে পর্যন্ত যাকিছু আছে সবই আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি ও তার বান্দা। অতএব, তার কোন অংশীদার বা পুত্র-পরিজন হতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা একাই সর্বকার্য সম্পাদনকারী এবং সকলের কার্য সম্পাদনের জন্য তিনি একাই যথেষ্ট; অন্য কারো সাহায্য-সহযোগীতার প্রয়োজন নেই। তিনি একক, তার কোন অংশীদার বা পুত্র-পরিজন থাকতে পারে না। সারকথা, কোন সৃষ্ট ব্যক্তিরই স্রষ্টার অংশীদার হওয়ার যোগ্যতা নেই। আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তার জন্য এর অবকাশও নেই, প্রয়োজনও নেই। অতএব, একমাত্র বিবেকবর্জিত, ঈমান হতে বঞ্চিত ব্যক্তি ছাড়া আল্লাহ্ তা'আলার সৃষ্ট কোন জীবকে তার অংশীদার বা পুত্র বলা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৭১) হে গ্রন্থধারিগণ! তোমরা ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না[1] এবং আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ছাড়া (মিথ্যা) বলো না। মারয়্যাম-তনয় ঈসা মসীহ তো আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী; যা তিনি মারয়্যামের মাঝে প্রক্ষেপ করেছিলেন ও তাঁরই তরফ হতে সমাগত আত্মা।[2] সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস কর এবং বলো না যে, ‘(আল্লাহ) তিনজন।’[3] তোমরা নিবৃত্ত হও, তোমাদের মঙ্গল হবে। আল্লাহই তো একমাত্র উপাস্য, তাঁর সন্তান হবে --এ হতে তিনি পবিত্র। আকাশ ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে সব তাঁরই। আর কর্মবিধায়ক হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।

[1] غُلُوْ (অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি) শব্দের তাৎপর্য হল, কোন বস্তুকে তার নির্ধারিত সীমা থেকে বাড়িয়ে দেওয়া। যেমন খ্রিষ্টানরা ঈসা (আঃ) ও তাঁর মা মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)-কে ভক্তি-শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে করতে তাঁদেরকে রিসালাত ও বান্দার স্থান থেকে উপরে তুলে আল্লাহর আসনে বসিয়ে দিয়েছে এবং যথারীতি তাঁদের ইবাদত করছে। ঠিক এমনিভাবেই ঈসা (আঃ)-এর শিষ্য ও সহচরদের ব্যাপারেও তারা অতিরঞ্জিত করেছে, তাঁদেরকে নিষ্পাপ বলেছে এবং কোন জিনিসকে হারাম ও হালাল করার ব্যাপারে পূর্ণ এখতিয়ার প্রদান করেছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, {اتَّخَذُواْ أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللّه} অর্থাৎ, তারা আল্লাহকে ছেড়ে দিয়ে তাদের পন্ডিত-পুরোহিতগণকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। (সূরা তাওবাহ ৩১) আল্লাহর আসনে বসানোর সারকথা হচ্ছে, তাদের (পুরোহিতগণ কর্তৃক) হালালকৃত জিনিসকে হালাল এবং হারামকৃত জিনিসকে হারাম বলে মেনে নেওয়া। অথচ এ বিষয়ে পরিপূর্ণ অধিকার একমাত্র আল্লাহর। কিন্তু আহলে কিতাবরা এই অধিকারও তাদের পন্ডিত-পুরোহিতগণকে প্রদান করেছে। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবদেরকে ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন করতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপ মহানবী (সাঃ)ও খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় ব্যাপারে অতিরঞ্জন করা দেখে স্বীয় উম্মতকে এহেন ভয়াবহ মহামারীর কবল হতে রক্ষা করার জন্য পূর্ণ সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে এমন অতিরঞ্জন করবে না, যেমন খ্রিষ্টানরা ঈসা বিন মারয়্যামের ব্যাপারে করেছে। যেহেতু আমি আল্লাহর বান্দাই, সেহেতু তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল বল। (বুখারীঃ আম্বিয়া অধ্যায়, আহমাদ ১/২৩, ১/১৫৩) কিন্তু বড় পরিতাপ ও দুঃখের বিষয় এই যে, (সতর্কবাণী থাকতেও) উম্মতে মুহাম্মাদীর দাবীদারগণও এই মহামারীর কবল থেকে রেহাই পেল না; যাতে খ্রিষ্টানরা আক্রান্ত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ উম্মত তার নবীর ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন করে ক্ষান্ত হয়নি; বরং নেক বান্দাদেরকেও আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করেছে; যা আসলে খ্রিষ্টানদেরই আচরণ ছিল। অনুরূপভাবে উলামা ও ফুক্বাহাগণ, যাঁরা দ্বীনের ব্যাখ্যাতা ও ভাষ্যকার ছিলেন, তাঁদেরকে শরীয়ত রচনার অধিকার প্রদান করেছে। (فإنا لله وإنا إليه راجعون) মহানবী (সাঃ) সত্যই বলেছেন, ‘‘যেমন একটি জুতার অপর জুতার সাথে অবিকল মিল থাকে, অনুরূপ তোমরাও পূর্ববর্তী উম্মতের অবিকল অনুকরণ ও অনুসরণ করবে।’’ অর্থাৎ প্রত্যেক কাজে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে।

[2] كلمة الله (আল্লাহর বাণী বা শব্দ)এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, كن (হও) শব্দ। যার দ্বারা আল্লাহর নির্দেশে বিনা পিতায় ঈসা (আঃ) জন্মলাভ করেন। মহান আল্লাহ এ শব্দটি জিবরীল (আঃ)-এর মাধ্যমে মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)এর কাছে পৌঁঁছে দিয়েছিলেন। روح الله এর অর্থ হচ্ছে, সেই ‘ফুঁক’ যা আল্লাহর নির্দেশে জিবরীল (আঃ)মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)এর কামীসের গলার নিকট খোলা অংশে ফুঁকেছিলেন, যেটাকে মহান আল্লাহ তাঁর অসীম শক্তিতে পিতার বীর্যের বিকল্প উপাদানে পরিণত করেন। সুতরাং ঈসা (আঃ) হচ্ছেন আল্লাহর কালেমা (বাণী); যা ফিরিশতা দ্বারা মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)এর নিকট পৌঁছে দেন এবং তিনি তাঁর ‘রূহ’ বা ফুঁকও; যা জিবরীল (আঃ) মারফৎ মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)এর নিকট পৌঁছে দেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর)

[3] খ্রিষ্টানরা বিভিন্ন ফির্কায় বিভক্ত ছিল। কোন ফির্কা ঈসা (আঃ)-কে স্বয়ং আল্লাহ বলে বিশ্বাস করে, কোন ফির্কা তাঁকে আল্লাহর অংশীদার মনে করে, আবার কোন ফির্কা তাঁকে আল্লাহর পুত্র মনে করে। তারপর যারা আল্লাহতে বিশ্বাসী, তারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী। তাদের মতে পিতা, পুত্র ও মারয়্যাম তিনজনই ঈশ্বর। তারা ঈসা (আঃ)-কে তিনের এক ঈশ্বর মনে করে থাকে। সুতরাং মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘তোমরা ‘আল্লাহ তিনজন’ বলা হতে বিরত হও। কারণ আল্লাহ হচ্ছেন একক, অদ্বিতীয়, (যাঁর কোন শরীক নেই)।’’

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:৭৩ لَقَدۡ کَفَرَ الَّذِیۡنَ قَالُوۡۤا اِنَّ اللّٰہَ ثَالِثُ ثَلٰثَۃٍ ۘ وَ مَا مِنۡ اِلٰہٍ اِلَّاۤ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ؕ وَ اِنۡ لَّمۡ یَنۡتَہُوۡا عَمَّا یَقُوۡلُوۡنَ لَیَمَسَّنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ﴿۷۳﴾

অবশ্যই তারা কুফরী করেছে, যারা বলে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তিন জনের তৃতীয়জন’। যদিও এক ইলাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। আর যদি তারা যা বলছে, তা থেকে বিরত না হয়, তবে অবশ্যই তাদের মধ্য থেকে কাফিরদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব স্পর্শ করবে। আল-বায়ান

তারা অবশ্যই কুফরী করেছে যারা বলে আল্লাহ তিন জনের মধ্যে একজন, কারণ এক ইলাহ ছাড়া আর কোন সত্যিকার ইলাহ নেই। তারা যা বলছে তা থেকে তারা যদি নিবৃত্ত না হয়, তাহলে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব গ্রাস করবেই। তাইসিরুল

নিঃসন্দেহে তারাও কাফির যারা বলেঃ ‘আল্লাহ তিনের (অর্থাৎ তিন মা‘বূদের) এক’, অথচ ইবাদাত পাবার যোগ্য এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহই নেই; আর যদি তারা স্বীয় উক্তিসমূহ হতে নিবৃত্ত না হয় তাহলে তাদের মধ্যে যারা কুফরীতে অটল থাকবে তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পতিত হবে। মুজিবুর রহমান

৭৩. তারা অবশ্যই কুফরী করেছে- যারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে তৃতীয়(১), অথচ এক ইলাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আর তারা যা বলে তা থেকে বিরত না হলে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে, তাদের উপর অবশ্যই কষ্টদায়ক শাস্তি আপতিত হবে।

(১) অর্থাৎ ঈসা মসীহ আলাইহিস সালাম, রূহুল কুদ্‌স ও আল্লাহ, কিংবা মসীহ, মারইয়াম ও আল্লাহ -সবাই আল্লাহ। তাদের মধ্যে একজন অংশীদার হলেন আল্লাহ। এরপর তারা তিনজনই এক এবং একজনই তিন। এ হচ্ছে নাসারাদের সাধারণ বিশ্বাস। নাসারাদের মালেকিয়া, ইয়াকুবিয়্যা ও নাসতুরিয়্যা এ তিনটি দলই উপরোক্ত বিশ্বাস পোষণ করে। [ইবন কাসীর] এ যুক্তিবিরোধী ধর্মবিশ্বাসকে তারা জটিল ও দ্ব্যর্থবোধক ভাষায় ব্যক্ত করে। অতঃপর বিষয়টি যখন কারো বোধগম্য হয় না, তখন একে ‘বুদ্ধি বহির্ভূত সত্য বলে আখ্যা দিয়ে ক্ষান্ত হয়। সুদ্দি বলেন, এখানে তিনের এক ইলাহ বলা হয়েছে। তিনজন বলতে, ঈসা, তার মা মারইয়াম এবং আল্লাহকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, অন্য আয়াতে কোন কোন নাসারাদের দ্বারা ঈসা ও তার মাকে ইলাহ হিসেবে গণ্য করার কথা উল্লেখ করে তা খণ্ডন করা হয়েছে। [আল-মায়েদাহ: ১১৬] ইবন কাসীর বলেন, এ মতটি অধিক প্রাধান্যপ্রাপ্ত। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭৩) তারা নিশ্চয় অবিশ্বাসী (কাফের), যারা বলে, ‘আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন।’[1] অথচ এক উপাস্য ভিন্ন অন্য কোন উপাস্য নেই। তারা যা বলে তা হতে নিবৃত্ত না হলে তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছে, তাদের উপর অবশ্যই মর্মন্তুদ শাস্তি আপতিত হবে।

[1] এ হল খ্রিষ্টানদের দ্বিতীয় ফির্কা, যারা তিন ঈশ্বরের দাবীদার ছিল। যেটাকে তারা (One God in Three Person) বলে। আর এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে যদিও খোদ তাদের মধ্যেই মতবিরোধ বিদ্যমান, তবুও সঠিক কথা এই যে, তারা ঈসা (আঃ) ও তাঁর মা মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)-কেও আল্লাহর সাথে (সমকক্ষ ভেবে) মাবূদ বা উপাস্যরূপে গণ্য করতো; যেরূপ কুরআন সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। আল্লাহ কিয়ামতের দিন ঈসা (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করবেন, {أأنتَ قُلتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِن دُونِ اللّه} অর্থাৎ, তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার আম্মাকে মা’বূদ (উপাস্য) বানিয়ে নাও? (সূরা মাইদাহ ১১৬) এখান থেকে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, খ্রিষ্টানরা ঈসা (আঃ) ও তাঁর মাতা মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)-কে উপাস্য হিসাবে গণ্য করে। আর আল্লাহ তৃতীয় উপাস্য বা মা’বুদ। যাকে তারা ‘তিনের তৃতীয়’ বলে আখ্যায়ন করে। তাদের প্রথম বিশ্বাসের মতই আল্লাহ এ বিশ্বাসকেও কুফরী বলে মন্তব্য করেছেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:১৯ قُلۡ اَیُّ شَیۡءٍ اَکۡبَرُ شَہَادَۃً ؕ قُلِ اللّٰہُ ۟ۙ شَہِیۡدٌۢ بَیۡنِیۡ وَ بَیۡنَکُمۡ ۟ وَ اُوۡحِیَ اِلَیَّ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنُ لِاُنۡذِرَکُمۡ بِہٖ وَ مَنۡۢ بَلَغَ ؕ اَئِنَّکُمۡ لَتَشۡہَدُوۡنَ اَنَّ مَعَ اللّٰہِ اٰلِہَۃً اُخۡرٰی ؕ قُلۡ لَّاۤ اَشۡہَدُ ۚ قُلۡ اِنَّمَا ہُوَ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ وَّ اِنَّنِیۡ بَرِیۡٓءٌ مِّمَّا تُشۡرِکُوۡنَ ﴿ۘ۱۹﴾

বল, ‘সাক্ষ্য হিসেবে সবচেয়ে বড় বস্তু কী?’ বল, ‘আল্লাহ সাক্ষী আমার ও তোমাদের মধ্যে। আর এ কুরআন আমার কাছে ওহী করে পাঠানো হয়েছে যেন তোমাদেরকে ও যার কাছে এটা পৌঁছবে তাদেরকে এর মাধ্যমে আমি সতর্ক করি। তোমরাই কি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহর সাথে রয়েছে অন্যান্য উপাস্য? বল, ‘আমি সাক্ষ্য দেই না’। বল, ‘তিনি কেবল এক ইলাহ আর তোমরা যা শরীক কর আমি নিশ্চয়ই তা থেকে মুক্ত’। আল-বায়ান

বল, সাক্ষ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় কোনটি? বল, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী। আর এ কুরআন আমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে যাতে আমি তার সাহায্যে তোমাদেরকে আর যাদের কাছে তা পৌঁছবে তাদেরকে সতর্ক করি। তোমরা কি এমন সাক্ষ্য দিতে পার যে, আল্লাহর সঙ্গে অন্য ইলাহও আছে? বল, আমি এমন সাক্ষ্য দেই না, বল তিনি তো এক ইলাহ আর তোমরা যে তাঁর অংশীদার স্থাপন কর, তা থেকে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত। তাইসিরুল

তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করঃ কার সাক্ষ্য সবচেয়ে বেশি গণ্য? তুমি বলে দাওঃ আমার ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহই হচ্ছেন সাক্ষী, আর এই কুরআন আমার নিকট অহীর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে, যেন আমি তোমাদেরকে এবং যাদের নিকট এটি পৌঁছবে তাদের সকলকে এর দ্বারা সতর্ক করি। বাস্তবিকই তোমরা কি এই সাক্ষ্য দিতে পার যে, আল্লাহর সাথে অন্য কোন মা‘বূদ রয়েছে? তুমি বলঃ আমি এই সাক্ষ্য দিতে পারিনা। তুমি ঘোষণা করঃ তিনিই একমাত্র ইলাহ, আর তোমরা যে শিরকে লিপ্ত রয়েছ, আমার সাথে ওর কোনই সম্পর্ক নেই। মুজিবুর রহমান

১৯. বলুন, কোন জিনিস সবচেয়ে বড় সাক্ষী? বলুন, 'আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্যদাতা(১)। আর এ কুরআন আমার নিকট ওহী করা হয়েছে যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট পৌছবে তাদেরকে এ দ্বারা সতর্ক করতে পারি(২)। তোমরা কি এ সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহও আছে? বলুন, ‘আমি সে সাক্ষ্য দেই না। বলুন, তিনি তো একমাত্র প্রকৃত ইলাহ এবং তোমরা যা শরীক কর তা থেকে আমি অবশ্যই বিমুক্ত।

(১) অর্থাৎ কোন জিনিসের সাক্ষ্য সাক্ষী হিসেবে বড় বলে বিবেচিত? বলুন, আল্লাহ। তিনিই সবচেয়ে বড় সাক্ষী। তার সাক্ষ্যের মধ্যে কোন প্রকার ভুল-ত্রুটির সম্ভাবনা নেই। সুতরাং তিনিই আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্য যে, আমি রাসূল। [তাবারী, সা'দী]


(২) এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক সেই ব্যক্তির জন্যই ভীতিপ্রদর্শনকারী যার কাছে এ কুরআনের আহবান পৌছেছে, সে যে-ই হোক না কেন। সুতরাং যার কাছেই এ আহবান পৌছবে সে তাতে ঈমান আনতে বাধ্য। যদি তা না করে তবে সে হবে জাহান্নামী। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত যে সর্বকাল ও সর্বজনব্যাপী তার প্রমাণ কুরআনের অন্য আয়াতেও এসেছে, “বলুন, হে মানুষ! আমি তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর রাসূল।” [সূরা আল-আরাফ: ১৫৮]

আরও এসেছে, “আর আমরা তো আপনাকে কেবল সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।” [সূরা সাবা: ২৮] আরও এসেছে, “কত বরকতময় তিনি! যিনি তার বান্দার উপর ফুরকান নাযিল করেছেন, সৃষ্টিকুলের জন্য সতর্ককারী হতে।” [সূরা আল-ফুরকান: ১]। আর যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ঈমান আনবে না, তাদের শাস্তি যে জাহান্নাম এ কথাও কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, “অন্যান্য দলের যারা তাতে কুফর করে, আগুনই তাদের প্রতিশ্রুত স্থান।” [সূরা হুদ: ১৭] [আদওয়াউল বায়ান]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯) বল, ‘সাক্ষী হিসাবে কোন্ জিনিস সর্বশ্রেষ্ঠ?’ তুমি বল, ‘আল্লাহ। (তিনিই) আমার ও তোমাদের মধ্যে (শ্রেষ্ঠ) সাক্ষী।[1] আর এই কুরআন আমার নিকট প্রেরিত হয়েছে, যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট এটি পৌঁছবে তাদেরকে এ দ্বারা আমি সতর্ক করি। [2] তোমরা কি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্য আছে?’ বল, ‘আমি সে সাক্ষ্য দিই না।’ বল, ‘তিনিই তো একক উপাস্য এবং তোমরা যে অংশী স্থাপন কর, তা হতে আমি নির্লিপ্ত।’

[1] অর্থাৎ, স্বয়ং আল্লাহই তাঁর একত্ব এবং প্রতিপালকত্বের সব চেয়ে বড় সাক্ষী। তাঁর থেকে বড় সাক্ষী আর কেউ নেই।

[2] রবী’ ইবনে আনাস (রঃ) বলেন, এখন যার কাছেই এই কুরআন পৌঁছে যাবে, সে যদি রসূল (সাঃ)-এর সত্য অনুসারী হয়, তবে তার কর্তব্য হল, সেও লোকদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান জানাবে, যেভাবে রসূল (সাঃ) আহবান জানিয়েছেন এবং ঐভাবে সতর্ক করবে, যেভাবে রসূল (সাঃ) সতর্ক করেছেন। (ইবনে কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:১০২ ذٰلِکُمُ اللّٰہُ رَبُّکُمۡ ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ۚ خَالِقُ کُلِّ شَیۡءٍ فَاعۡبُدُوۡہُ ۚ وَ ہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ وَّکِیۡلٌ ﴿۱۰۲﴾

তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি প্রতিটি জিনিসের স্রষ্টা। সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদাত কর। আর তিনি প্রতিটি জিনিসের উপর তত্ত্বাবধায়ক। আল-বায়ান

এই হলেন তোমাদের প্রতিপালক, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, সব কিছুর স্রষ্টা; কাজেই তোমরা তাঁরই ‘ইবাদাত কর, তিনি সমস্ত বিষয়ের র্কমবিধায়ক। তাইসিরুল

তিনি আল্লাহ, তোমাদের পরওয়ারদিগার। তিনি ছাড়া অন্য কেহই মা‘বূদ নেই, প্রত্যেক বস্তুরই স্রষ্টা তিনি, অতএব তোমরা তাঁরই ইবাদাত কর, তিনিই সব জিনিসের উপর দায়িত্বশীল। মুজিবুর রহমান

১০২. তিনিই তো আল্লাহ, তোমাদের রব; তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা; কাজেই তোমরা তাঁর ইবাদত কর; তিনি সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০২) এই তো আল্লাহ তোমাদের প্রতিপালক! তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনিই সব কিছুরই স্রষ্টা। সুতরাং তোমরা তাঁর উপাসনা কর। তিনি সব কিছুরই তত্ত্বাবধায়ক।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:১০৬ اِتَّبِعۡ مَاۤ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ۚ وَ اَعۡرِضۡ عَنِ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ﴿۱۰۶﴾

তুমি অনুসরণ কর তার, তোমার প্রতি যা ওহী প্রেরণ করা হয়েছে তোমার রবের পক্ষ থেকে। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। আর মুশরিকদের থেকে তুমি বিমুখ থাক। আল-বায়ান

তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে যে ওয়াহী পাও তার অনুসরণ কর, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তুমি মুশরিকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। তাইসিরুল

তোমার প্রতি তোমার রবের পক্ষ থেকে যে অহী নাযিল হয়েছে, তুমি তারই অনুসরণ করে চল, তিনি ছাড়া অন্য কেহই মা‘বূদ নেই, আর অংশীবাদীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। মুজিবুর রহমান

১০৬. আপনার রব-এর কাছ থেকে আপনার প্রতি যা ওহী হয়েছে আপনি তারই অনুসরণ করুন, তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০৬) তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ হয়, তুমি তারই অনুসরণ কর, তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। আর অংশীবাদীদের থেকে বিমুখ থাক।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আ'রাফ
৭:১৫৮ قُلۡ یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰہِ اِلَیۡکُمۡ جَمِیۡعَۨا الَّذِیۡ لَہٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ یُحۡیٖ وَ یُمِیۡتُ ۪ فَاٰمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَ رَسُوۡلِہِ النَّبِیِّ الۡاُمِّیِّ الَّذِیۡ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَ کَلِمٰتِہٖ وَ اتَّبِعُوۡہُ لَعَلَّکُمۡ تَہۡتَدُوۡنَ ﴿۱۵۸﴾

বল, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল, যার রয়েছে আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আন ও তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর প্রতি, যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহের প্রতি ঈমান রাখে। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, আশা করা যায়, তোমরা হিদায়াত লাভ করবে। আল-বায়ান

বল, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রসূল, (সেই আল্লাহর) যিনি আকাশসমূহ আর পৃথিবীর রাজত্বের মালিক, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তিনিই জীবিত করেন আর মৃত্যু আনেন। কাজেই তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর প্রেরিত সেই উম্মী বার্তাবাহকের প্রতি যে নিজে আল্লাহর প্রতি ও তাঁর যাবতীয় বাণীর প্রতি বিশ্বাস করে, তোমরা তাঁর অনুসরণ কর যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পার। তাইসিরুল

বলঃ হে মানবমন্ডলী! আমি তোমাদের সকলের জন্য সেই আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি, যিনি আকাশ ও ভূ-মন্ডলের সার্বভৌম একচ্ছত্র মালিক, তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান। সুতরাং আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর সেই বার্তাবাহক নিরক্ষর নাবীর প্রতি ঈমান আন। যে আল্লাহ ও তাঁর কালামে বিশ্বাস স্থাপন করে, তোমরা তারই অনুসরণ কর। আশা করা যায়, তোমরা সরল সঠিক পথের সন্ধান পাবে। মুজিবুর রহমান

১৫৮. বলুন, হে মানুষ! নিশ্চয় আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল(১), যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী। তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই; তিনি জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান। কাজেই তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তার রাসূল উম্মী নবীর প্রতি যিনি আল্লাহ ও তার বাণীসমূহে ঈমান রাখেন। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।

(১) এ আয়াতে ইসলামের মূলনীতি সংক্রান্ত বিষয়গুলোর মধ্য থেকে রিসালাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত সমগ্র দুনিয়ার সমস্ত জিন ও মানবজাতি তথা কেয়ামত পর্যন্ত আগত তাদের বংশধরদের জন্য ব্যাপক। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাধারণভাবে ঘোষণা করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আপনি মানুষকে বলে দিনঃ “আমি তোমাদের সবার প্রতি নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি”।

আমার নবুওয়ত লাভ ও রিসালাতপ্রাপ্তি বিগত নবীগণের মত কোন বিশেষ জাতি কিংবা বিশেষ ভূখণ্ড অথবা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়; বরং সমগ্র বিশ্ব মানবের জন্য, বিশ্বের প্রতিটি অংশ, প্রতিটি দেশ ও রাষ্ট্র এবং বর্তমান ও ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য কেয়ামতকাল পর্যন্ত তা পরিব্যাপ্ত। অন্য আয়াতেও এসেছে, “আর আমরা তো আপনাকে কেবল সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।” [সূরা সাবা: ২৮] অনুরূপভাবে সূরা আলে ইমরান ২০; সূরা আল-আনআম: ৯০; সূরা হুদ: ১৭; সূরা ইউসুফ: ১০৪; সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭; সূরা আল-ফুরকান: ১; সূরা ছোয়াদ: ৮৭; সূরা আল-কালাম: ৫২; সূরা আত-তাকওয়ীর ২৭।

হাফেজ ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন যে, এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাতামুন্নাবিয়্যীন বা শেষ নবী হওয়ার বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব ও রিসালাত যখন কেয়ামত পর্যন্ত আগত সমস্ত বংশধরদের জন্য এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য ব্যাপক, তখন আর অন্য কোন নতুন রাসূলের প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থাকেই না। [ইবন কাসীর]  

হাদীসে এসেছে, আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মধ্যে কোন এক বিষয়ে মতবিরোধ হয়। তাতে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নারায হয়ে চলে যান। তা দেখে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুও তাকে মানাবার জন্য এগিয়ে যান। কিন্তু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছুতেই রাযী হলেন না। এমনকি নিজের ঘরে পৌছে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ফিরে যেতে বাধ্য হন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে গিয়ে হাযির হন। এদিকে কিছুক্ষণ পরেই উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের এহেন আচরণের জন্য লজ্জিত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে গিয়ে উপস্থিত হয়ে নিজের ঘটনা বিবৃত করেন।

আবুদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন লক্ষ্য করলেন যে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি ভৎসনা করা হচ্ছে, তখন নিবেদন করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল, দোষ আমারই বেশী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমার একজন সহচরকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকাটাও কি তোমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তোমরা কি জান না যে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে আমি যখন বললামঃ হে মানবমণ্ডলী, আমি তোমাদের সমস্ত লোকের জন্য আল্লাহ রাসূল। তখন তোমরা সবাই আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলে। শুধু এই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুই ছিলেন, যিনি সর্বপ্রথম আমাকে সত্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। [বুখারীঃ ৪৬৪০]

অন্য বর্ণনায় এসেছে, তাবুক যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের ভয় হচ্ছিল যে, শক্ররা না এ অবস্থায় আক্রমণ করে বসে। তাই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারদিকে সমবেত হয়ে গেলেন। রাসূল সালাত শেষ করে বললেনঃ আজকের রাতে আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে আর কোন নবী-রাসূলকে দেয়া হয়নি। তার একটি হল এই যে, আমার রিসালাত ও নবুওয়াতকে সমগ্র দুনিয়ার জাতিসমূহের জন্য ব্যাপক করা হয়েছে। আর আমার পূর্বে যত নবী-রাসূলই এসেছেন, তাদের দাওয়াত ও আবির্ভাব নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। দ্বিতীয়তঃ আমাকে আমার শক্রর মোকাবেলায় এমন প্রভাব দান করা হয়েছে যাতে তারা যদি আমার কাছ থেকে এক মাসের দূরত্বেও থাকে, তবুও তাদের উপর আমার প্রভাব ছেয়ে যাবে।

তৃতীয়তঃ কাফেরদের সাথে যুদ্ধে প্রাপ্ত মালে-গনীমত আমার জন্য হালাল করে দেয়া হয়েছে। অথচ পূর্ববতী উম্মতদের জন্য তা হালাল ছিল না। বরং এসব মালের ব্যবহার মহাপাপ বলে মনে করা হত। তাদের গনীমতের মাল ব্যয়ের একমাত্র স্থান ছিল এই যে, আকাশ থেকে বিদ্যুৎ এসে সে সমস্তকে জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দিয়ে যাবে। চতুর্থতঃ আমার জন্য সমগ্র ভূমণ্ডলকে মসজিদ করে দেয়া হয়েছে এবং পবিত্র করার উপকরণ বানিয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে আমাদের সালাত যমীনের যে কোন অংশে, যে কোন জায়গায় শুদ্ধ হয়, কোন বিশেষ মসজিদে সীমাবদ্ধ না হয়। পক্ষান্তরে পূর্ববতী উম্মতদের ইবাদাত শুধু তাদের উপাসনালয়েই হত, অন্য কোথাও নয়। নিজেদের ঘরে কিংবা মাঠে-ময়দানে তাদের সালাত বা ইবাদাত হত না।

তাছাড়া পানি ব্যবহারের যখন সামর্থ্য না থাকে, তা পানি না পাওয়ার জন্য হোক কিংবা কোন রোগ-শোকের কারণে, তখন মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করে নেয়াই পবিত্রতা ও অযুর পরিবর্তে যথেষ্ট হয়ে যায়। পূর্ববতী উম্মতদের জন্য এ সুবিধা ছিল না। অতঃপর বললেনঃ আর পঞ্চমটি এই যে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রত্যেক রাসূলকে একটি দোআ কবুল হওয়ার এমন নিশ্চয়তা দান করেছেন, যার কোন ব্যতিক্রম হতে পারে না। আর প্রত্যেক নবী-রাসূলই তাদের নিজ নিজ দো’আকে বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে নিয়েছেন এবং সে উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হয়েছে। আমাকে তাই বলা হল যে, আপনি কোন একটা দোআ করুন। আমি আমার দো’আকে আখেরাতের জন্য সংরক্ষিত করে রেখেছি। সে দো'আ তোমাদের জন্য এবং কেয়ামত পর্যন্ত لا اله الا الله ‘আল্লাহ ছাড়া কোন হক মা’বুদ নেই’ কালেমার সাক্ষ্য দানকারী যেসব লোকের জন্ম হবে, তাদের কাজে লাগবে। [মুসনাদে আহমাদঃ ২/২২২]

আবু মূসা আশ’আর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে উদ্ধৃত বর্ণনায় আরো উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে লোক আমার আবির্ভাব সম্পর্কে শুনবে, তা সে আমার উম্মতদের মধ্যে হোক কিংবা ইয়াহুদী নাসারা হোক, যদি সে আমার উপর ঈমান না আনে, তাহলে জাহান্নামে যাবে’। [মুসনাদে আহমাদঃ ২/৩৫০]

সারমর্ম এই যে, এ আয়াতের দ্বারা বর্তমান ও ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য, প্রত্যেক দেশ ও ভূখণ্ডের অধিবাসীদের জন্য এবং প্রত্যেকটি জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপকভাবে রাসূল হওয়া প্রমাণিত হয়েছে। সাথে সাথে একথাও সাব্যস্ত হয়ে গেছে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পর যে লোক তার প্রতি ঈমান আনবে না, সে লোক কোন সাবেক শরীআত ও কিতাবের কিংবা অন্য কোন ধর্ম ও মতের পরিপূর্ণ আনুগত্য একান্ত নিষ্ঠাপরায়ণভাবে করতে থাকা সত্বেও কস্মিনকালেও মুক্তি পাবে না।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৫৮) বল, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য সেই আল্লাহর (প্রেরিত) রসূল; যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের অধিকারী, তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান। সুতরাং আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রসূল নিরক্ষর নবীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর; যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীতে বিশ্বাস করে, এবং তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা পথ পাও।’ [1]

[1] এই আয়াতও মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাত সার্বজনীন রিসালাত প্রমাণিত হওয়ার জন্য স্পষ্ট। এতে মহান আল্লাহ নবী (সাঃ)-কে আদেশ করেছেন, যেন তিনি ঘোষণা করে দেন যে, ‘হে বিশ্বের মানুষ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি রসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি।’ এভাবে তিনি বিশ্বের সকল মানব জাতির জন্য ত্রাণকর্তা ও রসূল। এখন পরিত্রাণ ও সুপথ না খ্রিষ্টধর্মে আছে, আর না ইয়াহুদী বা অন্য কোন ধর্মে। পরিত্রাণ ও সুপথ যদি থাকে, তাহলে কেবল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা ও তাকে নিজ দ্বীন বলে স্বীকার করার মাঝে আছে। এই আয়াতে এবং এর পূর্বের আয়াতেও নবী (সাঃ)-কে নিরক্ষর বলা হয়েছে। এটি তাঁর একটি বিশেষ গুণ। যার অর্থ (তিনি লিখাপড়া জানতেন না, তাঁর অক্ষরজ্ঞান ছিল না) তিনি কোন গুরুর নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করেননি। কোন শিক্ষকের নিকট হতে কোন শিক্ষাও তিনি অর্জন করেননি। তা সত্ত্বেও তিনি এমন এক কুরআন পেশ করলেন যে, তার অলৌকিকতা ও সাহিত্য-অলংকারের সামনে পৃথিবীর সকল সাহিত্যিক ও পন্ডিত তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অক্ষম রয়ে গেল। আর তিনি যে শিক্ষা পেশ করলেন, যার সত্যতা ও যথার্থতা পৃথিবীর মানুষের কাছে স্বীকৃত। আর তা এ কথারই প্রমাণ যে, তিনি সত্যিই আল্লাহর রসূল। তাছাড়া একজন নিরক্ষর, না এ রকম গ্রন্থ পেশ করতে পারে, আর না এমন শিক্ষার বর্ণনা দিতে পারে, যা ন্যায় ও ইনসাফের এক সুন্দর নমুনা এবং বিশ্ব-মানবতার পরিত্রাণ ও সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। এ শিক্ষা গ্রহণ বিনা পৃথিবীর মানুষ সত্যিকার সুখ-শান্তি পেতে পারে না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আত-তাওবা
৯:৩১ اِتَّخَذُوۡۤا اَحۡبَارَہُمۡ وَ رُہۡبَانَہُمۡ اَرۡبَابًا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَ الۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ ۚ وَ مَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡۤا اِلٰـہًا وَّاحِدًا ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ سُبۡحٰنَہٗ عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ ﴿۳۱﴾

তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের* রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোন (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র। আল-বায়ান

আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা তাদের ‘আলিম আর দরবেশদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে; আর মারইয়াম-পুত্র মাসীহকেও। অথচ তাদেরকে এক ইলাহ ব্যতীত (অন্যের) ‘ইবাদাত করার আদেশ দেয়া হয়নি। তিনি ব্যতীত সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, পবিত্রতা আর মহিমা তাঁরই, (বহু ঊর্ধ্বে তিনি) তারা যাদেরকে (তাঁর) অংশীদার গণ্য করে তাত্থেকে। তাইসিরুল

তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের পন্ডিত ও ধর্ম যাজকদেরকে রাব্ব বানিয়ে নিয়েছে এবং মারইয়ামের পুত্র মসীহকেও। অথচ তাদের প্রতি শুধু এই আদেশ করা হয়েছে যে, তারা শুধুমাত্র এক মা‘বূদের ইবাদাত করবে যিনি ব্যতীত ইলাহ হওয়ার যোগ্য কেহই নয়। তিনি তাদের অংশী স্থির করা হতে পবিত্র। মুজিবুর রহমান

* এ স্থলে أحبار দ্বারা ইয়াহূদীদের ধর্মপন্ডিত আর رهبان দ্বারা নাসারাদের ধর্মপন্ডিতদেরকে বুঝানো হয়েছে।

৩১. তারা আল্লাহ্ ব্যতীত তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগিদের(১)কে তাদের রবরূপে গ্রহণ করেছে(২) এবং মারইয়াম-পুত্র মসীহকেও। অথচ এক ইলাহের ইবাদাত করার জন্যই তারা আদিষ্ট হয়েছিল। তিনি ব্যতীত অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তা থেকে তিনি কত না পবিত্ৰ।(৩)!

(১) أحبار শব্দটি حبر এর বহুবচন। ইয়াহুদীদের আলেমকে حبر বলা হয়। পক্ষান্তরে رهبان শব্দটি راهب এর বহুবচন। নাসারাদের আলেমকে راهب বলা হয়। তারা বেশীরভাগই সংসার বিরাগী হয়ে থাকে। [ফাতহুল কাদীর]


(২) এ আয়াতে বলা হয় যে, ইয়াহুদী-নাসারাগণ তাদের আলেম ও যাজক শ্রেণীকে আল্লাহর পরিবর্তে রব ও মাবুদ সাব্যস্ত করে রেখেছে। অনুরূপ ঈসা আলাইহিস সালামকেও মা’বুদ মনে করে। তাকে আল্লাহর পুত্ৰ মনে করায় তাকে মা’বুদ সাব্যস্ত করার দোষে যে দোষী করা হয়, তার কারণ হল, তারা পরিষ্কার ভাষায় ওদের মা’বুদ না বললেও পূর্ণ আনুগত্যের যে হক বান্দার প্রতি আল্লাহর রয়েছে, তাকে তারা যাজক শ্রেণীর জন্যে উৎসর্গ রাখে। অর্থাৎ তারা যাজক শ্রেণীর আনুগত্য করে চলে; যতই তা আল্লাহর নির্দেশের বিরোধী হোক না কেন? বলাবাহুল্য পাদ্রী ও পুরোহিতগণের আল্লাহ বিরোধী উক্তি ও আমলের আনুগত্য করা তাদেরকে মা’বুদ সাব্যস্ত করার নামান্তর, আর এটি হল প্রকাশ্য কুফরী ও শির্ক।

আদী ইবন হাতেম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি গলায় একটি সোনার ক্রুশ নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলাম। তখন তিনি বললেনঃ হে আদী, তোমার গলা থেকে এ মূর্তিটি সরিয়ে ফেল এবং তাকে সূরা আত-তাওবাহর এ আয়াতটি তেলাওয়াত করতে শুনলাম- “তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদেরকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে।” আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তো তাদের ইবাদত করি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তারা তোমাদের জন্য কোন কিছু হালাল করলে তোমরা সেটাকে হালাল মনে কর আর কোন কিছুকে হারাম করলে তোমরা সেটাকে হারাম হিসাবে গ্রহণ কর। [তিরমিযীঃ ৩০৯৫]

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, শরীআতের মাসায়েল সম্পর্কে অজ্ঞ জনসাধারণের পক্ষে ওলামায়ে কেরামের নির্দেশনার অনুসরণ বা ইজতিহাদী মাসায়েলের ক্ষেত্রে মুজতাহিদ ইমামগণের মতামতের অনুসরণর ততক্ষণই করতে পারবে যতক্ষণ না এর বিপরীতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল থেকে কোন কিছু প্রমাণিত হবে। যখনই কোন কিছু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মতের বিপক্ষে হয়েছে বলে প্রমাণিত হবে তখনি তা ত্যাগ করা ওয়াজিব। অন্যথায় ইয়াহুদী নাসারাদের মত হয়ে যাবে। কারণ ইয়াহুদী-নাসারাগণ আল্লাহর কিতাব এবং আল্লাহর রাসূলের আদেশ নিষেধকে সম্পূর্ণ উপক্ষো করে স্বার্থপর আলেম এবং অজ্ঞ পুরোহিতদের কথা ও কর্মকে নিজেদের ধর্ম বানিয়ে নিয়েছে। আয়াতে তারই নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]


(৩) অর্থাৎ অথচ তাদেরকে তো শুধু এ নির্দেশই দেয়া হচ্ছিল যে, তারা এক ইলাহেরই ইবাদত করবে, যিনি কোন কিছু হারাম করলেই কেবল তা হারাম হবে, আর যিনি হালাল করলেই তা হালাল হবে। অনুরূপভাবে যিনি শরীআত প্রবর্তন করলে সেটাই মানা হবে, তিনি হুকুম দিলে সেটা বাস্তবায়িত হবে। তিনি ব্যতীত আর কোন সত্য ইলাহ নেই। তারা যা তাঁর সাথে শরীক করছে তা থেকে তিনি কতই না পবিত্র। তাঁর সন্ততি নেই, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি ছাড়া কোন রব নেই। [ইবন কাসীর] কিন্তু তারা সে নির্দেশের বিপরীত কাজ করেছে। তার সাথে শরীক করেছে। মহান আল্লাহ তাদের সে সমস্ত অপবাদ ও শরীক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তার পূর্ণতার বিপরীত তার জন্য যে সমস্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ গুণ সাব্যস্ত করে তা গ্রহণযোগ্য নয়। [সা'দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩১) তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের পন্ডিত-পুরোহিতদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে[1] এবং মারয়্যামের পুত্র মসীহকেও। অথচ তাদেরকে শুধু এই আদেশ করা হয়েছিল যে, তারা শুধুমাত্র একক উপাস্যের উপাসনা করবে, তিনি ব্যতীত (সত্য) উপাস্য আর কেউই নেই, তিনি তাদের অংশী স্থির করা হতে পবিত্র।

[1] এর ব্যাখ্যা আদী বিন হাতেম (রাঃ)-এর বর্ণনাকৃত হাদীস হতে পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমি নবী (সাঃ)-এর মুখে এই আয়াত শুনে আরজ করলাম যে, ইয়াহুদী-নাসারারা তো নিজেদের আলেমদের কখনো ইবাদত করেনি, তাহলে এটা কেন বলা হয়েছে যে, তারা তাদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে? তিনি বললেন, এ কথা ঠিক যে, তারা তাদের ইবাদত করেনি। কিন্তু এটা তো সঠিক যে, তাদের আলেমরা যা হালাল করেছে তাকে তারা হালাল এবং যা হারাম করেছে তাকে তারা হারাম বলে মেনে নিয়েছে। আর এটাই হল তাদের ইবাদত করা। (সহীহ তিরমিযী আলবানী ২৪৭১নং) কেননা, হারাম-হালাল করার এখতিয়ার কেবলমাত্র আল্লাহর। এই এখতিয়ার ও অধিকারের কথাকে যদি কোন ব্যক্তি অন্যের আছে বলে বিশ্বাস করে নেয়, তাহলে এর মানে হবে, সে তাকে রব (প্রভু) মেনে নিয়েছে। এই আয়াতে সেই লোকদের জন্য বড় সতর্কতা রয়েছে, যারা নিজেদের ইমাম-বুযুর্গদেরকে হালাল-হারাম করার অধিকার দিয়ে রেখেছে এবং যাদের কাছে তাঁদের কথার তুলনায় কুরআন হাদীসের উক্তির কোন গুরুত্ব নেই।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আত-তাওবা
৯:১২৯ فَاِنۡ تَوَلَّوۡا فَقُلۡ حَسۡبِیَ اللّٰہُ ۫٭ۖ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ عَلَیۡہِ تَوَکَّلۡتُ وَ ہُوَ رَبُّ الۡعَرۡشِ الۡعَظِیۡمِ ﴿۱۲۹﴾

অতঃপর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে বল, ‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। আমি তাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করেছি। আর তিনিই মহাআরশের রব’। আল-বায়ান

এ সত্ত্বেও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে বলে দাও- আল্লাহ্ই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তাঁর উপরই আমি ভরসা করি, তিনি হলেন মহান আরশের মালিক। তাইসিরুল

অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তুমি বলে দাওঃ আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া অন্য কেহ মা‘বূদ নেই, আমি তাঁরই উপর নির্ভর করছি, আর তিনি হচ্ছেন অতি বড় আরশের মালিক। মুজিবুর রহমান

১২৯. অতঃপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে আপনি বলুন, 'আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই(১)। আমি তারই উপর নির্ভর করি এবং তিনি মহাআরশের(২) রব।

(১) অর্থাৎ আপনার যাবতীয় চেষ্টা-তদবীরের পরও যদি কিছু লোক ঈমান গ্রহণে বিরত থাকে, তবে ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। কারণ নবীগনের সমস্ত কাজ হল স্নেহ-মমতা ও হামদর্দির সাথে আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকা, তাদের পক্ষ থেকে অবজ্ঞা ও যাতনার সম্মুখীন হলে, তা আল্লাহর প্রতি সোপর্দ করা এবং তাঁরই উপর ভরসা রাখা।


(২) আরশ সম্পর্কে আলোচনা সূরা আল-আ’রাফের ৫৪ নং আয়াতে চলে গেছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১২৯) অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়,[1] তবে তুমি বলে দাও, ‘আমার জন্য তো আল্লাহই যথেষ্ট।[2] তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই। আমি তাঁরই উপর নির্ভর করেছি, আর তিনি হচ্ছেন অতি বড় আরশের মালিক।’ [3]

[1] অর্থাৎ, তোমার নিয়ে আসা শরীয়ত ও রহমতের দ্বীন থেকে।

[2] যিনি আমাকে কাফের ও অস্বীকারকারীদের চক্রান্ত থেকে বাঁচিয়ে নেবেন।

[3] প্রকাশ থাকে যে, এই আয়াত পড়লে আল্লাহ সকল দুশ্চিন্তা ও সমস্যার জন্য যথেষ্ট হন-- এ হাদীসটি জাল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১১ হূদ
১১:১৪ فَاِلَّمۡ یَسۡتَجِیۡبُوۡا لَکُمۡ فَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَاۤ اُنۡزِلَ بِعِلۡمِ اللّٰہِ وَ اَنۡ لَّاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ۚ فَہَلۡ اَنۡتُمۡ مُّسۡلِمُوۡنَ ﴿۱۴﴾

অতঃপর তারা যদি তোমাদের আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে জেনে রাখ, এটা আল্লাহর জ্ঞান অনুসারেই নাযিল করা হয়েছে এবং তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ্ নেই। অতঃপর তোমরা কি অনুগত হবে? আল-বায়ান

তারা যদি তোমাদের ডাকে সাড়া না দেয় তাহলে জেনে নাও যে, আল্লাহর জ্ঞান অনুসারেই তা অবতীর্ণ হয়েছে। আরো জেনে রাখ যে, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই। তাহলে এখন কি তোমরা আত্মসমর্পণ করবে? তাইসিরুল

অতঃপর যদি তারা তোমাদের ফরমায়েশ পূর্ণ করতে না পারে তাহলে তোমরা দৃঢ় বিশ্বাস রেখ যে, এই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আল্লাহরই জ্ঞান (ও ক্ষমতা) দ্বারা; আর এটাও যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তাহলে এখন তোমরা মুসলিম হবে কি? মুজিবুর রহমান

১৪. অতঃপর যদি তারা তোমাদের আহবানে সাড়া না দেয় তবে জেনে রাখ, এটা তো আল্লাহর জ্ঞান অনুসারেই নাযিল করা হয়েছে এবং তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। অতঃপর তোমরা কি আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) হবে?

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪) অতঃপর যদি তারা তোমাদের আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে তোমরা জেনে রাখ যে, এই কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে আল্লাহরই জ্ঞান দ্বারা। আর এও যে, তিনি ছাড়া আর কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তাহলে এখন তোমরা মুসলমান হবে কি? [1]

[1] অর্থাৎ, এই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে অক্ষম হওয়ার পরেও কি ‘কুরআন আল্লাহরই অবতীর্ণকৃত কিতাব’ এই কথা স্বীকার করার জন্য এবং মুসলমান হওয়ার জন্য প্রস্ত্তত হবে না?

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৩ আর-রাদ
১৩:৩০ کَذٰلِکَ اَرۡسَلۡنٰکَ فِیۡۤ اُمَّۃٍ قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِہَاۤ اُمَمٌ لِّتَتۡلُوَا۠ عَلَیۡہِمُ الَّذِیۡۤ اَوۡحَیۡنَاۤ اِلَیۡکَ وَ ہُمۡ یَکۡفُرُوۡنَ بِالرَّحۡمٰنِ ؕ قُلۡ ہُوَ رَبِّیۡ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ۚ عَلَیۡہِ تَوَکَّلۡتُ وَ اِلَیۡہِ مَتَابِ ﴿۳۰﴾

এমনিভাবে আমি তোমাকে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির নিকট, যার পূর্বে অনেক জাতি গত হয়েছে, যেন আমি তোমার প্রতি যে ওহী প্রেরণ করেছি, তা তাদের নিকট তিলাওয়াত কর। অথচ তারা রহমানকে অস্বীকার করে। বল, ‘তিনি আমার রব, তিনি ছাড়া আর কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তাঁরই উপর আমি তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই দিকে আমার প্রত্যাবর্তন’। আল-বায়ান

(পূর্বে যেমন পাঠিয়েছিলাম) এভাবেই আমি তোমাকে এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছি যার পূর্বে অনেক সম্প্রদায় গত হয়ে গেছে, যাতে তুমি তাদের কাছে তেলাওয়াত কর যা আমি তোমার প্রতি ওয়াহী করি, তবুও তারা দয়াময় আল্লাহকে অস্বীকার করে। বল, ‘তিনি আমার প্রতিপালক, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, আমি তাঁর উপরই নির্ভর করি আর তিনিই প্রত্যাবর্তনস্থল।’ তাইসিরুল

এভাবে আমি তোমাকে পাঠিয়েছি এক জাতির প্রতি, যার পূর্বে বহু জাতি গত হয়েছে, তাদের নিকট আবৃত্তি করার জন্য, যা আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি; তথাপি তারা দয়াময়কে অস্বীকার করে। তুমি বলঃ তিনিই আমার রাব্ব! তিনি ছাড়া অন্য কোন মা‘বূদ নেই, তাঁরই উপর আমি নির্ভর করি এবং আমার প্রত্যাবর্তন তাঁরই কাছে। মুজিবুর রহমান

৩০. এভাবে আমরা আপনাকে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির প্রতি যাদের আগে বহু জাতি গত হয়েছে, যাতে আমরা আপনার প্রতি যা ওহী করেছি, তা তাদের কাছে তিলাওয়াত করেন। তথাপি তারা রহমানকে অস্বীকার করে।(১) বলুন, তিনিই আমার রব; তিনি ছাড়া অন্য কোন হক্ক ইলাহ নেই। তারই উপর আমি নির্ভর করি এবং তারই কাছে আমার ফিরে যাওয়া।

(১) অর্থাৎ তাঁর বন্দেগী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আছে। তাঁর গুণাবলী, ক্ষমতা ও অধিকারে অন্যদেরকে তাঁর সাথে শরীক করছে। তাঁর দানের জন্য অন্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। তারা নতুন কিছু করছে না, তাদের পূর্বেও আমরা অনেক রাসুল প্রেরণ করেছি। তারা যেভাবে দয়াময় প্রভুকে ভুলে শাস্তির অধিকারী হয়েছে তেমনিভাবে আপনার জাতির কাফেররাও রহমান তথা দয়াময় প্রভুকে অস্বীকার করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে তাদের শাস্তি অনিবার্য। [এ সংক্রান্ত আরো আয়াত দেখুন, সূরা আন-নাহলঃ ৬৩, সূরা আল-আনআমঃ ৩৪]

আয়াতে বলা হয়েছে, যে তারা “রাহমান”কে অস্বীকার করছে। এখানে মূলতঃ তারা আল্লাহ তা'আলাকে “রাহমান” বা অত্যন্ত দয়ালু এ গুণে গুণান্বিত করতে অস্বীকার করছিল। এটা ছিল আল্লাহর নাম ও গুণের সাথে শির্ক করা। কুরআনের অন্যত্র স্পষ্টভাবে এসেছে যে, তারা এ নামটি অস্বীকার করত। যেমন, “যখনই তাদেরকে বলা হয়, সিজদাবনত হও রহমান এর প্রতি, তখন তারা বলে, রহমান আবার কে? তুমি কাউকেও সিজদা করতে বললেই কি আমরা তাকে সিজদা করব? এতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়।” [সূরা আল-ফুরকানঃ ৬০] হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়ও কাফেররা আল্লাহর এ গুণটি লিখা নিয়ে আপত্তি করেছিল এবং বলেছিলঃ আমরা রহমানকে চিনি না। [বুখারীঃ ২৭৩১-২৭৩২]

অথচ এ নামটি এমন এক নাম যে নাম একমাত্র তাঁর জন্যই ব্যবহার হতে পারে। আর কাউকে কোনভাবেই রহমান নাম বা গুণ হিসেবে ডাকা যাবে না। আর এজন্যই আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে বলছেন যে, তারা যদিও গোয়ার্তুমি করে এ নামটি অস্বীকার করছে আপনি তাদেরকে এ নামটি যে আমার তা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তুলে ধরুন এবং বলুনঃ তিনিই আমার রব; তিনি ছাড়া অন্য কোন হক্ক ইলাহ নেই। তারই উপর আমি নির্ভর করি এবং তারই কাছে আমার ফিরে যাওয়া। তোমাদের অস্বীকার তার এ নামকে তার জন্য সাব্যস্ত করতে কোন ভাবেই ব্যাহত করতে পারবে না।

অন্যত্র বলা হয়েছে, “বলুন, তোমরা আল্লাহ নামে ডাক বা রাহমান নামে ডাক, তোমরা যে নামেই ডাক সকল সুন্দর নামই তো তাঁর। তোমরা সালাতে স্বর উচ্চ করো না এবং খুব ক্ষীণও করো না; দুয়ের মধ্যপথ অবলম্বন করো। [সূরা আল-ইসরাঃ ১১০] আল্লাহ আরো বলেনঃ বলুন, তিনিই দয়াময়, আমরা তার প্রতি বিশ্বাস করি ও তারই উপর নির্ভর করি। [সূরা আল-মুলকঃ ২৯] আর এ নামটি সবচেয়ে বেশী মহিমান্বিত নাম হওয়াতে আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন যে, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম হচ্ছে 'আবদুল্লাহ ও আব্দুররাহমান।” [মুসলিমঃ ২১৩২]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩০) এইভাবে আমি তোমাকে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির প্রতি যার পূর্বে বহু জাতি গত হয়েছে;[1] যাতে আমি তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করেছি তাদের নিকট তা আবৃত্তি কর। তারা পরম দয়াময়কে অস্বীকার করে।[2] তুমি বল, ‘তিনিই আমার প্রতিপালক; তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই।[3] তাঁরই উপর আমি নির্ভর করি এবং আমার প্রত্যাবর্তন তাঁরই কাছে।’

[1] যেমন আমি তোমাকে আমার বার্তা পৌঁছানোর জন্য প্রেরণ করেছি, অনুরূপ তোমার পূর্ববর্তী উম্মতদের মাঝেও রসূল প্রেরণ করেছিলাম, তাদেরকেও তেমনই মিথ্যাজ্ঞান করা হয়েছিল যেমন তোমাকে করা হয়েছে এবং যেমন উক্ত সম্প্রদায়ের লোকেরা মিথ্যাজ্ঞান করার কারণে আযাবগ্রস্ত হয়েছিল, এদেরও সেই পরিণাম থেকে নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নয়।

[2] মক্কার মুশরিকরা ‘রাহমান’ শব্দে চরম চকিত হত। হুদাইবিয়া সন্ধির সময় যখন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ এর শব্দাবলী লেখা হয়েছিল, তখন তারা বলেছিল, ‘রাহমান রাহীম’ কি আমরা জানি না। (ইবনে কাসীর)

[3] অর্থাৎ, ‘রাহমান’ আমার সেই প্রতিপালক, যিনি ব্যতীত কোন মাবূদ নেই।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৪ ইবরাহীম
১৪:৫২ ہٰذَا بَلٰغٌ لِّلنَّاسِ وَ لِیُنۡذَرُوۡا بِہٖ وَ لِیَعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَا ہُوَ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ وَّ لِیَذَّکَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ ﴿۵۲﴾

এটা মানুষের জন্য পয়গাম। আর যা দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হয় এবং তারা জানতে পারে যে, তিনি কেবল এক ইলাহ, আর যাতে বুদ্ধিমানরা উপদেশ গ্রহণ করে। আল-বায়ান

এটা মানুষদের জন্য একটা বার্তা যার দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে আর যাতে তারা জানতে পারে যে, তিনি এক ইলাহ আর যাতে বুদ্ধিমান মানুষেরা উপদেশ লাভ করে। তাইসিরুল

ইহা মানুষের জন্য এক বার্তা যাতে এর দ্বারা তারা সতর্ক হয় এবং জানতে পারে যে, তিনি একমাত্র উপাস্য এবং যাতে বোধশক্তি সম্পন্নরা উপদেশ গ্রহণ করে। মুজিবুর রহমান

৫২. এটা মানুষের জন্য এক বার্তা, আর যাতে এটা দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হয় এবং তারা জানতে পারে যে, তিনিই কেবল এক সত্য ইলাহ আর যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫২) এটা[1] মানুষের জন্য এক বার্তা; যাতে এটা দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হয় এবং তারা জানতে পারে যে, তিনি একমাত্র উপাস্য এবং যাতে জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে।

[1] ‘এটা’ বলে কুরআনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। অথবা পূর্বোল্লিখিত বিবরণের দিকে ইশারা করা হয়েছে, যা ﴿وَلَا تَحْسَبَنَّ اللهَ غَافِلًا﴾ থেকে বর্ণনা করা হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৬ আন-নাহাল
১৬:২ یُنَزِّلُ الۡمَلٰٓئِکَۃَ بِالرُّوۡحِ مِنۡ اَمۡرِہٖ عَلٰی مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖۤ اَنۡ اَنۡذِرُوۡۤا اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّاۤ اَنَا فَاتَّقُوۡنِ ﴿۲﴾

তিনি ফেরেশতাদের আপন নির্দেশে ওহী* দিয়ে নাযিল করেন তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার প্রতি; যেন তোমরা সতর্ক কর যে, আমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। অতএব, তোমরা আমাকে ভয় কর। আল-বায়ান

তিনি তাঁর এ রূহকে (ওহী) যে বান্দাহর উপর চান স্বীয় নির্দেশক্রমে ফেরেশতাদের মাধ্যমে অবতীর্ণ করেন (এই মর্মে যে) তোমরা সতর্ক কর যে, আমি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, কাজেই আমাকে ভয় কর। তাইসিরুল

তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা নির্দেশ সম্বলিত ওহীসহ মালাক/ফেরেশতা প্রেরণ করেন, এই মর্মে সতর্ক করার জন্য, আমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই; সুতরাং আমাকে ভয় কর। মুজিবুর রহমান

* রূহ শব্দের অর্থ আত্মা, ওহীকে রূহ বলা হয় এ কারণে যে, ওহীর মাধ্যমেই মানুষের অন্তর জীবন লাভ করে।

২. তিনি তার বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছে(১) স্বীয় নির্দেশে রূহ(২)-ওহীসহ ফিরিশতা- পাঠান এ বলে যে, তোমরা সতর্ক কর, নিশ্চয় আমি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই(৩); কাজেই তোমরা আমার ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন কর।(৪)

(১) এখানে যার প্রতি ইচ্ছা বলে তাঁর নবী-রাসূলদের বুঝানো হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] [এ ব্যাপারে আরো দেখা যেতে পারে সূরা আল-হাজ্জঃ ৭৫, সূরা গাফেরঃ ১৫, ১৬]


(২) আয়াতে روح শব্দ বলে ইবনে আব্বাসের মতে ওহী বুঝানো হয়েছে। যা নবুওয়াতের রূহ। এ রূহ বা প্রাণসত্তায় উজ্জীবিত হয়েই নবী কাজ করেন ও কথা বলেন। স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক জীবনে প্রাণের যে মর্যাদা এ ওহী ও নবুওয়াতী প্রাণসত্তা নৈতিক জীবনে সেই একই মর্যাদার অধিকারী। ওহী দ্বারা মুমিনদের প্রাণ উজ্জীবিত হয়। এ ওহীর একটি হচ্ছে কুরআন। দ্বীনে কুরআনের মর্যাদা যেমন শরীরের সাথে রূহের সম্পর্ক। [ফাতহুল কাদীর] তাই কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ওহীর জন্য ‘রূহ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। [দেখুনঃ সূরা আস-শূরাঃ ৫২] কোন কোন তাফসীরবিদগণের মতে রূহ শব্দ দ্বারা এখানে হেদায়াত বোঝানো হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] অবশ্য দু' অর্থের মধ্যে বৈপরীত্য নেই।


(৩) এ আয়াতে ইতিহাসগত দলীল দ্বারা তাওহীদ প্রমাণিত হয়েছে যে, আদম 'আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত দুনিয়ার বিভিন্ন ভূখণ্ডে এবং বিভিন্ন সময়ে যে রাসূলই আগমন করেছেন তিনি জনসমক্ষে তাওহীদের বিশ্বাসই পেশ করেছেন। [দেখুন সূরা আল-আম্বিয়াঃ ২৫] অথচ বাহ্যিক উপায়াদীর মাধ্যমে এক জনের অবস্থা ও শিক্ষা অন্যজনের মোটেই জানা ছিল না। চিন্তা করুন, হাজার হাজার নবী-রাসূল, যারা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন দেশে এবং বিভিন্ন ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেছেন, তারা সবাই যখন একই বিষয়ের প্রবক্তা, তখন স্বভাবতঃই মানুষ একথা বুঝতে বাধ্য হয় যে, বিষয়টি ভ্রান্ত হতে পারে না। বিশ্বাস স্থাপনের জন্য এককভাবে এ যুক্তিটিই যথেষ্ট।


(৪) এই বাক্যের মাধ্যমে এ সত্যটি সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে যে, নবুওয়াতের রূহ যেখানেই যে ব্যক্তির ওপর অবতীর্ন হয়েছে সেখানেই তিনি এ একটিই দাওয়াত নিয়ে এসেছেন যে সার্বভৌম কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত এবং একমাত্র তাকেই ভয় করতে হবে, তিনি একাই এর হকদার। তিনি ছাড়া আর দ্বিতীয় এমন কোন সত্তা নেই যার অসন্তুষ্টির ভয়, যার শাস্তির আশংকা এবং যার নাফরমানির অশুভ পরিণামের ভয় করা যাবে। তিনি ছাড়া আর কারো ইবাদত করা যাবে না।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা[1] স্বীয় নির্দেশে অহী (প্রত্যাদেশ)[2] সহ ফিরিশতা অবতীর্ণ করেন, এই মর্মে সতর্ক করবার জন্য যে, আমি ছাড়া কোন (সত্য) উপাস্য নেই; সুতরাং তোমরা আমাকে ভয় কর।

[1] অর্থাৎ, নবী রসূলগণ, যাঁদের উপর অহী অবতীর্ণ হত। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,{اللهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ} নবুঅতের দায়িত্ব কাকে দেবেন তা আল্লাহ ভালভাবেই জানেন। (সূরা আনআম ১২৪) {يُلْقِي الرُّوحَ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَن يَشَاء مِنْ عِبَادِهِ لِيُنذِرَ يَوْمَ التَّلَاقِ}  তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা অহী করেন স্বীয় আদেশসহ, যাতে সে সতর্ক করতে পারে কিয়ামত দিন সর্ম্পকে। (সূরা মু’মিন ১৫)

[2] এখানে الروح বলতে অহী (প্রত্যাদেশ)। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে,{وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ}  অর্থাৎ, এভাবে আমি নিজ নির্দেশে তোমার প্রতি অহী (প্রত্যাদেশ) করেছি রূহ। তুমি তো জানতে না গ্রন্থ কি, ঈমান (বিশ্বাস) কি। (সূরা শূরা ৫২)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৬ আন-নাহাল
১৬:২২ اِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ فَالَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ قُلُوۡبُہُمۡ مُّنۡکِرَۃٌ وَّ ہُمۡ مُّسۡتَکۡبِرُوۡنَ ﴿۲۲﴾

তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। অতঃপর যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর অস্বীকারকারী এবং তারা অহঙ্কারী। আল-বায়ান

তোমাদের ইলাহ হলেন এক ইলাহ। কাজেই যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্য-অস্বীকারকারী আর তারা অহংকারী। তাইসিরুল

তোমাদের মা‘বূদ একই মা‘বূদ। সুতরাং যারা আখিরাতে বিশ্বাস করেনা তাদের অন্তর সত্যবিমুখ এবং তারা অহংকারী। মুজিবুর রহমান

২২. তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ, কাজেই যারা আখিরাতে ঈমান আনে না তাদের অন্তর অস্বীকারকারী(১) এবং তারা অহংকারী।(২)

(১) এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা জানাচ্ছেন যে, একমাত্র এক ও অমুখাপেক্ষী আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। আর এটাও জানাচ্ছেন যে, কাফেররা তা অস্বীকার করে। তাদের মধ্যে ওয়ায নসীহত ও স্মরণ কোন প্রতিক্রিয়া করতে পারে না। তারা হক গ্রহণের বদলে শুধু অহংকারই করে বেড়ায়, কোন সঠিক কিছু মেনে নেয়াকে তারা অনেক বড় করে দেখে। অস্বীকার তাদের প্রকৃতিতে পরিণত হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] তারা এ জন্য প্রায়ই শুধু আশ্চর্যবোধ করত। তারা বলতঃ “তিনি কি সমস্ত ইলাহকে এক ইলাহ বানিয়ে ফেলেছেন? এটা তো এক আশ্চর্য বস্তু।” [সূরা ছোয়াদঃ ৫] অন্য আয়াতে আল্লাহ তাদের অবস্থা বর্ণনা করে বলেনঃ “শুধু এক আল্লাহর কথা বলা হলে যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না তাদের অন্তর বিতৃষ্ণায় সংকুচিত হয় এবং আল্লাহর পরিবর্তে উপাস্যগুলোর উল্লেখ করা হলে তারা আনন্দে উল্লসিত হয় [সূরা আয-যুমারঃ ৪৫]


(২) তাদের অহংকারের কারণে আল্লাহ তাদেরকে কঠোর শাস্তি দিবেন। সূরা গাফেরের ৬০ নং আয়াতেও আল্লাহ তা উল্লেখ করেছেন। [ইবন কাসীর] হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যার অন্তরে সামান্যতম অহংকারও থাকবে সে জান্নাতে যাবে না। আর যার অন্তরে সামান্যতম ঈমানও থাকবে সে জাহান্নামে থাকবে না। একলোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কোন লোক যদি চায় যে তার কাপড় সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক? তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর তিনি সুন্দর পছন্দ করেন। অহংকার হচ্ছে হককে না মানা ও মানুষকে হেয় করে দেখা। [মুসলিম: ৯১]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২২) তোমাদের উপাস্য একক উপাস্য; সুতরাং যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সত্য বিমুখ এবং তারা অহংকারী। [1]

[1] অর্থাৎ, এক আল্লাহকে মেনে নেওয়া অস্বীকারকারী মুশরিকদের জন্য বড়ই কঠিন। তারা বলে, {أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ} অর্থাৎ, সে কি বহু উপাস্যের পরিবর্তে একটিমাত্র উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? এতো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার। (সূরা স্বা-দ ৫)  অন্যত্র আরো বলেন, {وَإِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَحْدَهُ اشْمَأَزَّتْ قُلُوبُ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ وَإِذَا ذُكِرَ الَّذِينَ مِن دُونِهِ إِذَا هُمْ يَسْتَبْشِرُونَ} অর্থাৎ, এক আল্লাহর কথা বলা হলে যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের অন্তর বিতৃষ্ণায় সংকুচিত হয় এবং আল্লাহর পরিবর্তে তাদের দেবতাদের কথা উল্লেখ করা হলে তারা আনন্দে উল্লসিত হয়। (সুরা যুমার ৪৫)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ২০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৫০ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 পরের পাতা »