সালাফী দাওয়াত পদ্ধতি

ফিরকাহ নাজিয়াহ সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজে বাধা প্রদান করে। এই দল বিদআতী সকল নীতি এবং সর্বনাশী দলসমূহকে প্রতিহত করে---যে দলসমূহ উম্মতকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে ও দ্বীনে বিদআত রচনা করে রসূল (সা.) এবং তার সাহাবার সুন্নাহ (ও নীতি) থেকে দুরে সরে আছে। বিদআতকে প্রতিহত করার জন্য এবং সহীহ আকীদা ও আমলের। দিকে মানুষকে আহবান করার পদ্ধতি হল নিম্নরূপঃ এই দাওয়াতের সর্বাগ্রে রয়েছে মৌলিক বিষয়, সহীহ ইলম। মহান আল্লাহ বলেছেন,

قُلْ هَٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي ۖ وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ

“তুমি বল, এটাই আমার পথ। আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করি সজ্ঞানে আমি এবং আমার অনুসারিগণও। আল্লাহ পবিত্র। আর আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (ইউসুফঃ ১০৮)

অতঃপর ইলমকে পরিবর্তন, সংস্কার ও সংশোধনের কাজে ব্যবহার।

প্রথম ধাপ হলঃ তাসফিয়াহ

এর অর্থ হল দ্বীনকে প্রত্যেক সেই বিকৃতি, অপব্যাখ্যা ও উৎক্ষিপ্ত কর্দম থেকে পরিষ্কার করা, যা তার সৌন্দর্যকে মান করে দিয়েছে এবং তার ভাবমূর্তিকে নষ্ট করে দিচ্ছে। সালাফী উলামাগণ সহীহ দ্বীন পালন ও বহন করেন এবং দ্বীনে অনুপ্রবিষ্ট ভেজালকে চিহ্নিত ও সাফাই করেন। মহানবী (সা.) বলেছেন,

يحمل هذا العلم من كل خلف عدوله ينفون عنه تحريف الغالين وانتحال المبطلين

“এই ইলমকে প্রত্যেক শতাব্দীর নির্ভরযোগ্য (বিশ্বস্ত) লোকে বহন করবে। তারা তা হতে অতিরঞ্জনকারীদের বিকৃতি, বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচার ও মুখদের অপব্যাখ্যা দূরীভূত করবে।” (বাইহাক্বী ২১৪৩৯, মিশকাত ২৪৮নং)

এর উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারেঃ অতিরঞ্জনকারীদের বিকৃতিঃ যেমন সর্বেশ্বরবাদী সূফীদের বিকৃতি, শিয়া ও রাফেযীদের বিকৃতি; যারা আহলে বায়তের ভালোবাসায় অতিরঞ্জন করে দ্বীনে বহু বিকৃতি সাধন করেছে এবং তারাই ইসলামের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ও কঠিন ফিতনাবাজ। খাওয়রিজের বিকৃতি, যারা কুরআন মানতে অতিরঞ্জন করে হাদীস অস্বীকার করেছে এবং সাহাবাদেরকে কাফের বলেছে। অনুরূপ মুতাযিলা, জাহমিয়্যাহ, কাদারিয়্যাহ, জাবারিয়্যাহ, মুরজিআহ প্রভৃতি ফির্কা ও তাদের অনুগামীদের অতিরঞ্জন ও বিকৃতি প্রসিদ্ধ।

বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচারঃ যেমন ইসলামের দার্শনিকরা, যারা ইসলামের উপর আক্কেলের ঘোড়া ছুটিয়েছে এবং দ্বীনকে যুক্তিভিত্তিক করতে গিয়ে ধ্বংস করতে প্রয়াসী হয়েছে। বর্তমানেও বহু বিজ্ঞানী ও যুক্তিবাদী পাওয়া যায়, যারা দ্বীনের মর্যাদা মলিন করতে কার্পণ্য করে না।

মূর্খদের অপব্যাখ্যাঃ যাদের জ্ঞান ও বিবেকগ্রাহ্য নয় ধারণা করে তারা দ্বীনের অপব্যাখ্যা করে অথবা তাদের মযহাব ও খেয়ালখুশির প্রতিকূল বলে তারা কুরআন ও সহীহ হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা করে।

আলহামদু লিল্লাহ, সালাফী উলামাগণ সে সবের খন্ডন করেছেন এবং সঠিক দ্বীনের মাহাত্ম্য ও মর্যাদাকে অক্ষুন্ন রেখেছেন।

দাওয়াতের দ্বিতীয় ধাপ হলঃ তাজদীদ

মুমিনের হৃদয়ে ঈমান পুরনো হয়ে যায়, তাকে নবায়ন করতে হয়। মনে কালিমা ও জং পড়ে, তা দূরীভূত করতে হয়, ঝালিয়ে নিতে হয়। দ্বীনের মধ্যে কুসংস্কারের জঞ্জাল ও আবর্জনা পড়ে, তা পরিষ্কার করতে হয়, সুন্নাহ মৃত হয়ে যায়, তা পুনর্জীবিত করতে হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

إن الله يبعث لهذه الأمة على رأس كل مائة سنة من يجدد لها دينها

“নিশ্চয় আল্লাহ এই উম্মতের জন্য প্রত্যেক শতাব্দীর মাথায় এমন ব্যক্তি প্রেরণ করবেন, যে তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে নবায়ন করবে।” (আবু দাউদ ৪২ ৯৩, হাকেম ৮৫৯২নং)

তৃতীয় ধাপ হলঃ ইসলাহ

ইসলাহ মানে সংশোধন করা, মেরামত করা, নষ্ট বা খারাপ হয়ে। যাওয়াকে ঠিক বা ভালো করা, অচলকে সচল করা ইত্যাদি।

বর্তমানে ইসলাম বিশ্বের বহু জায়গায় স্বমহিমায় বলিষ্ঠ আছে। কিন্তু প্রত্যেক পূর্ণতার লয় আছে, ক্ষয় আছে। এক সময় সারা বিশ্বে ইসলাম আসবে। আবার এক সময় ধীরে ধীরে ইসলাম শুরুর মতো দুর্বল ও প্রবাসীর মতো অসহায় হয়ে যাবে। কিন্তু সেই সময়েও সালাফী ইসলাহ কায়েম থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

إن الإسلام بدا غريبا وسيعود غريبا كما بدا فطوبى للغرباء

“নিশ্চয় ইসলাম (প্রবাসীর মত অসহায়) অল্প সংখ্যক মানুষ নিয়ে শুরুতে আগমন করেছে এবং অনুরূপ অল্প সংখ্যক মানুষ নিয়েই ভবিষ্যতে প্রত্যাগমন করবে; যেমন শুরুতে আগমন করেছিল। সুতরাং শুভসংবাদ ঐ (প্রবাসীর মতো অসহায়) অল্প সংখ্যক লোকেদের জন্য।” বলা হল, (প্রবাসীর মত অসহায়) অল্প সংখ্যক লোক কারা? তিনি বললেন,

الذين يصلحون إذا فسد الناس

“যারা মানুষ অসৎ হয়ে গেলে তাদের ‘ইসলাহ’ (সংশোধন) করে।” (আহমাদ ১৬৬৯০, ত্বাবারানীর কাবীর ৭৫৫৪, আওসাত ৩০৫৬ নং)

অন্য এক বর্ণনায় আছে, তারা হল সংখ্যাগরিষ্ঠ খারাপ লোকেদের মাঝে অল্প সংখ্যক ভালো লোক, যাদের অনুগত লোকের চাইতে অবাধ্য লোকই বেশি থাকবে।” (আহমাদ ৬৬৫০, সহীহ তারগীব ও ১৮৮নং)

চতুর্থ ধাপঃ তারবিয়্যাহ

তরবিয়ত ও ট্রেনিং দেওয়া, অনুশীলন করানো, অভ্যাসী বানানো, রপ্ত করানো, কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর ভিত্তিতে সাহাবায়ে কিরামের তরবিয়তের মতো মানুষকে তরবিয়ত দেওয়ার কাজ সালাফী মুরাব্বীরা করে থাকেন। পিতামাতা যেমন সন্তান লালন-পালন করে থাকে, ঠিক সেইভাবে সালাফী রাব্বানী উলামাগণ সহীহ তরবিয়ত দানের মাধ্যমে মানুষ তৈরি করেন। তরবিয়ত চলে নিজ ঘরে, পরিবারে, তরবিয়ত চলে মসজিদে ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে। সংখ্যায় কম হলেও মানিকের খানিক ভালোর মতো মানুষ তৈরি হয়। আর মানুষের মাঝে পরিবর্তন না এলে বা আনয়ন করতে না পারলে। সার্বিক পর্যায়ে ইসলামী পরিবেশ ও শাসন কল্পনা করাও বৃথা হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ

“নিশ্চয় আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।” (রা’দঃ ১১)

ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِّعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَىٰ قَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ ۙ وَأَنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

“এ এজন্য যে, আল্লাহ কোন সম্প্রদায়কে যে সম্পদ দান করেন, তিনি তা (ধ্বংস দিয়ে) পরিবর্তন করেন না; যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আর নিশ্চিত আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। ” (আনফালঃ ৫৩)

সালাফী তরবিয়ত ছাড়া মানুষের মাঝে সঠিক পরিবর্তন আসবে না। আর যেমনটি ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'যে জিনিস প্রাথমিক পর্যায়ের উম্মাহর ইসলাহ করেছে, সে জিনিস ছাড়া এই শেষ পর্যায়ের উম্মাহর ইসলাহ করতে পারে না।' (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ ১/২৪১ প্রমুখ)