সালাফী ও সালাফিয়াত পরিচিতি আবদুল হামীদ ফাইযী ১৯ টি
সালাফী ও সালাফিয়াত পরিচিতি আবদুল হামীদ ফাইযী ১৯ টি

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف المرسلين، نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين. أما بعد

জীবনে চলার পথে একটি জীবন-পদ্ধতি চাই। আর সেটা হওয়া চাই বিশুদ্ধ ইসলাম। আর সেটা হল সালাফিয়াত বা সালাফী জীবন-পদ্ধতি। এ পথ ও পদ্ধতিই হল সঠিক ও শুদ্ধ। এটাই হল মহান আল্লাহর সরল পথ। এটাই মহানবী ও তাঁর সাহাবাবর্গ (রাঃ)-এর পথ। এ পথের পথিকরাই হল ইহকালে সাহায্যপ্রাপ্ত এবং পরকালে মুক্তিপ্রাপ্ত। এটাই হল ৭৩ দলের মধ্যে একমাত্র পরিত্রাণ লাভকারী দল। এটাই হল। ইসলামের মূল স্রোতধারা। এই দলটির পরিচয় হয়তো সকলের জানা নাও থাকতে পারে। অথবা জানার মধ্যে কোন গোলমাল থাকতে পারে, তাই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

পাঠকের খিদমতে বক্ষমাণ পুস্তিকাটির মূল আরবী হল মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের প্রণয়ন। অনুবাদ আমার এবং এর শেষে সংযোজিত পরিশিষ্ট আমার। আশা করি পাঠক উপকৃত হবেন। এবং সালাফিয়াত সম্বন্ধে তার অনেক সন্দেহ ও বিরোধী মনোভাবের অবসান ঘটবে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সত্যিকারার্থে ‘সালাফী’ হওয়ার তওফীক দিন। আমীন।

বিনীত-

আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী আল-মাদানী

২১/২/৪১, ২০/১০/১৯


إن الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونعود بالله من شرور أنفسنا وسيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادی له، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمد عبده ورسوله

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا * يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا

أما بعد : فإن أصدق الحديث كتاب الله وخير الهدي هدي محمي، وشر الأمور محدثاتها، وكل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة، وكل ضلالة في النار

অতঃপর মহান আল্লাহর প্রশংসার সাথে শুরু করি এবং তার সকল কল্যাণের উপর তার স্তুতি বর্ণনা করি। যেহেতু এমন কোন কল্যাণ নেই, যা তার সাহায্য ছাড়া লাভ করা যায়। আর আমার এবং আপনাদের প্রতি তার পরিপূর্ণ অনগ্রহ ও নিয়ামতের অন্যতম বিষয়। এই যে, তিনি আমাদের জন্য এই বৰ্কতময় শহর মক্কা মুকার্‌রামায় এই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। যেখানে আল্লাহর গৃহসমূহের একটি গৃহে সমবেত হয়ে আমরা আল্লাহর যিকর করার সুযোগ লাভ করেছি। অতএব আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে তাদের দলভুক্ত করেন, যারা কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে এবং তার মধ্যে সর্বোত্তম কথার অনুসরণ করে। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা দুআ কবুলকারী।[১]

ব্রাদারানে ইসলাম!

মুহাম্মাদ (সা.) রসূল হয়ে প্রেরিত হওয়ার পূর্বে মানুষ অজ্ঞতা ও অন্ধতায় ছিল। ছিল শির্ক, যুলম ও ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত। অতঃপর আল্লাহ সৃষ্টির সর্দার মুহাম্মাদ (সঃ)-কে রসূলগণের আগমন বন্ধ থাকার পর বাঁকা মিল্লতকে সোজা করার লক্ষ্যে প্রেরণ করলেন।

যাতে তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া সত্য উপাস্য নেই) বলে এবং সফলতা লাভ করে। সুতরাং তার সাথে হক আগমন করল এবং বাতিল বিলীন হল। তার সাথে হিদায়াত আগমন করল, আগমন করল জীবন, আগমন করল ন্যায়পরায়ণতা। আল্লাহ তার মাধ্যমে শির্ককে নিশ্চিহ্ন করলেন। আল্লাহ (জাল্লা ফী উলাহ) তাকে সারা বিশ্ববাসীর জন্য করুণা স্বরূপ সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করলেন। প্রেরণ করলেন তার প্রতি বিশ্বাসীর জন্য সুসংবাদদাতারূপে এবং যে। তার অবাধ্য হয় ও তার আদর্শে বাধা সৃষ্টি করে তার জন্য সতর্ককারীরূপে। তিনি তার মাধ্যমে হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করলেন। আল্লাহ (জাল্লা ফী উলাহ) বলেছেন,

يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ۚ قَدْ جَاءَكُم مِّنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ * يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

“হে ঐশীগ্রন্থধারিগণ! আমার রসূল তোমাদের নিকট এসেছে, তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে, সে তার অনেক অংশ তোমাদের নিকট প্রকাশ করে এবং অনেক কিছু (প্রকাশ না করে) উপেক্ষা করে থাকে। অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর নিকট হতে জ্যোতি ও সুস্পষ্ট কিতাব এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায় এ (জ্যোতির্ময় কুরআন) দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং নিজ অনুমতিক্রমে (কুফরীর) অন্ধকার হতে বার করে (ঈমানের) আলোর দিকে নিয়ে যান এবং তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন।” (মায়িদাহঃ ১৫-১৬)।

মুফাসসিরগণের ইমাম, ইমাম হাফেয আবু জাফর বিন জারীর ত্বাবারী তার তফসীরে (৬/ ১৬১) উক্ত আয়াতের আলোচনায় বলেছেন, 'নূর মানে মুহাম্মাদ (সা.), যার মাধ্যমে আল্লাহ হক আলোকিত করেছেন, ইসলামকে বিজয়ী করেছেন, শির্ককে নিশ্চিহ্ন করেছেন। সুতরাং তিনি তার জন্য নূর (আলো), যে তার মাধ্যমে আলোকিত হতে চায়, যার দ্বারা হক স্পষ্ট করতে চায়।

ইমাম বুখারী ‘সহীহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, আত্বা’ বিন ইয়াসার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রাঃ)-এর সাক্ষাতে বললাম, 'তাওরাতে উল্লিখিত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গুণাবলী সম্পর্কে আমাকে বলুন। তিনি বললেন, হ্যাঁ। আল্লাহর কসম! তিনি কুরআনে বর্ণিত কিছু গুণে তাওরাতেও গুণান্বিত। (যেমন,) “হে নবী! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে” (আহযাবঃ ৪৫) এবং নিরক্ষর (আরব)দের জন্য নিরাপত্তারূপে। তুমি আমার দাস ও রসূল। আমি তোমার নাম রেখেছি ‘আল-মুতাওয়াক্কিল’ (আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল)। তিনি রূঢ় ও কঠোর নন। হাটে-বাজারে হৈ-হুল্লোড়কারীও নন। তিনি মন্দকে মন্দ দ্বারা প্রতিহত করেন না। বরং তিনি ক্ষমা ও মার্জনা করে দেন। আল্লাহ তাঁর কখনোই তিরোধান ঘটাবেন না, যতক্ষণ না তিনি তার দ্বারা বাকা (কাফের) মিল্লাতকে সোজা করেছেন তথা তারা “লা ইলাহা। ইল্লাল্লাহ’ বলেছে এবং তার দ্বারা বহু অন্ধ চক্ষু, বধির কর্ণ ও বদ্ধ হৃদয়কে উন্মুক্ত করেছেন। (বুখারী ২১২৫, ৪৮৩৮নং)

ইমাম তিরমিযী জামে’ ও ‘শামায়েল’ গ্রন্থে এবং ইমাম ইবনে মাজাহ সুনান গ্রন্থে সহীহ সুত্রে বর্ণনা করেছেন, আনাস (রাঃ) বলেছেন, যখন সেই দিন এল, যে দিনে রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় প্রবেশ করলেন, তখন তার সব কিছু আলোকিত হয়ে উঠল। অতঃপর যখন সেই দিন এসে উপস্থিত হল, যে দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন, তখন তার সব কিছু অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) এর (দাফনকার্য সেরে) আমাদের (ধুলাময়) হাত না ঝাড়তেই আমরা আমাদের হৃদয়কে ভিন্নরূপে পেলাম![২] এই অভিব্যক্তি, রসূলগণের সর্দার-কে হারিয়ে ফেলার অন্তর্জালা এবং তাঁদের সেই কঠিন সন্ধিক্ষণ সম্বন্ধে অভিব্যক্তি ও মনের ভাব প্রকাশ এমনই ছিল যে, তার চির বিদায় এবং অহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার দুঃখে নিজেদেরকে ভিন্ন মানুষ ভাবতে লাগলেন।[৩]

ইমাম বুখারী ‘সহীহ’ (৩৫৮ ৪নং)এ জাবের (রাঃ) কর্তৃক বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা.) জুমআর দিন একটি বৃক্ষের উপর অথবা খেজুর বৃক্ষের একটি কান্ডের উপর খুতবা দেওয়ার জন্য দাঁড়াতেন। এমতাবস্থায় একজন আনসারী মহিলা অথবা পুরুষ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনার জন্য কি একটি মিম্বর বানিয়ে দেব?’ নবী (সা.) বললেন, “তোমাদের ইচ্ছে হলে দিতে পারো।” অতঃপর তারা একটি কাঠের মিম্বর বানিয়ে দিলেন। যখন জুমআর দিন এল, নবী (সা.) মিম্বরে বসলেন, তখন কান্ডটি শিশুর মতো চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। নবী (সা.) মিম্বর থেকে নেমে এসে ওটাকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু কান্ডটি শিশুর মতো আরো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল।

বর্ণনাকারী বলেন, 'কান্ডটি এ জন্য কাঁদছিল, যেহেতু সে খুতবাকালে নিজে কাছে থেকে যিকর শুনতে পেত।

ইমাম হাসান বসরী (রাহিমাহুল্লাহ) যখন উক্ত হাদীস বর্ণনা করতেন, তখন কেঁদে ফেলতেন এবং বলতেন, 'ওহে মুসলিমগণ! রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাক্ষাতের আগ্রহে কাঠ গুনগুনিয়ে কেঁদে ওঠে! সুতরাং তোমরা এ কথার বেশি হকদার যে, তোমরা তাঁর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করবে।”[৪]

এই ভূমিকার পর এবার মূল বক্তব্যের দিকে যাই, যার শিরোনাম আপনারা শুনেছেন, সালাফিয়াত কী?

এই স্থানে যখন বিষয়টির সকল দিক নিয়ে আলোচনা করার জন্য সময় পর্যাপ্ত নয়, তখন এর কয়েকটি পয়েন্ট নির্বাচন করে আলোচনা শুরু করছি।

প্রথম পয়েন্টঃ “সালাফ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ

দ্বিতীয় পয়েন্টঃ পরিভাষায় ‘সালাফ’ কারা?

তৃতীয় পয়েন্টঃ সালাফে সালেহ’ এর কতিপয় প্রতিনাম।

চতুর্থ পয়েন্টঃ সালাফিয়াতের অনুসরণ করা ও তার সাথে সম্বন্ধ জোড়ার বিধান।

পঞ্চম পয়েন্টঃ সালাফ ও সালাফিয়াতের অনুসরণ করার মাহাত্ম্য

যষ্ঠ পয়েন্টঃ সালাফী মানহাজের (মতাদর্শের) চিহ্ন ও পথনির্দেশিকা

সপ্তম পয়েন্টঃ উপক্রমণিকা, আর তাতে থাকবে আলোচ্য বিষয়ের উপর আলোকপাত।

[১]. এই লেকচারটি মক্কা মুকারামা (শারাফাহাল্লাহ) এর আযীযিয়াহ সেকশনের জামে’ ফকীহ মসজিদে রোজ বৃহস্পতিবার ১০ম শাবান ১৪৩১ হিজরীতে পেশ করা হয়। যা সেখানকার ‘আস-সাবীল’ মসজিদে অনুষ্ঠিত সংস্কারক ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ) অধিবেশনের সক্রিয়তার একটি অংশ হিসাবে কার্যক্রমভুক্ত করা হয়।

[২]. তিরমিযী ৩৬ ১৮, শামায়েল ৩৭৫, ইবনে মাজাহ ১৬৩ ১, আহমাদ ১৩৩ ১২, ইবনে হিব্বান, ইহসান ৬৬৩৪নং, হামে ৩/৫৭, আল্লামা আলবানী সহীহ সুনানে ইবনে মাজাহ (১৩২২নং)এ এবং তার আরো অন্য গ্রন্থসমূহে হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[৩]. আল্লামা আলবানীর টীকা দ্রঃ সংক্ষিপ্ত শামায়েল মুহাম্মাদিয়াহ ১৯৭পৃঃ

[৪]. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা’ ৪/৫৭০, সংক্ষিপ্ত তারীখে দিমাশ্‌ক ১/ ১৮৪

সীন-লাম-ফা একটি ধাতু, যা আগে যাওয়া বা অগ্রণী হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে।[১] তাই এই সালাফ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলঃ যে আগে গেছে বা অগ্রণী হয়েছে। এটি ‘সালেফ’ শব্দের বহুবচন। আর তার বহুবচন হয় আসলাফ, সুলুফ ও সুল্লাফ।

আত্মীয় বা অন্য কিছুর আপনার প্রত্যেক পূর্ববর্তী ও অগ্রণীর জন্য উক্ত শব্দ ব্যবহার করা হয়। এ থেকেই মহান আল্লাহর বাণী,

فَجَعَلْنَاهُمْ سَلَفًا وَمَثَلًا لِّلْآخِرِينَ

“পরবর্তীদের জন্য আমি ওদেরকে অতীত নমুনা ও দৃষ্টান্ত করে রাখলাম।” (যুখরুফ : ৫৬)।

ইমাম বাগবী (রাহিমাহুল্লাহ) তার তফসীর গ্রন্থে (৭/২ ১৮তে) উক্ত আয়াতের তফসীরে বলেছেন, “সালাফ হল বিগত বাপ-দাদাগণ। সুতরাং আমি তাদেরকে পূর্ববর্তী বা অতীত করলাম, যাতে পরবর্তীগণ তাদের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করে। এই (গত হওয়ার) অর্থেই মহান আল্লাহর বাণী,

وَأَن تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا

“(হারাম করা হয়েছে) দুই ভগিনীকে একত্রে বিবাহ করা; কিন্তু যা গত হয়ে গেছে, তা (ধর্তব্য নয়)। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (নিসাঃ ২৩)

অর্থাৎ, তোমাদের যে কর্ম গত হয়ে গেছে, তা ধর্তব্য নয়। বলা বাহুল্য, ব্যতিক্রান্ত হল পাপটা, কর্মের বৈধতা নয়। বলা হয়, অমুকের সম্মানীয় সলফ আছে। অর্থাৎ, অগ্রবর্তী বাপদাদা আছে।[২]

অবশ্য হাফেয ইবনুল আষীর ও আল্লামা ইবনে মনযূর (সালাফের অর্থে) বয়স ও মর্যাদায় অগ্রবর্তী বা অগ্রণী হওয়ার ব্যাপারকে নির্দিষ্ট করেছেন।

ইবনে মনযূর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, অনুরূপ সলফ হল, বাপদাদা ও আত্মীয়দের মধ্য থেকে যারা বয়স ও মর্যাদায় আপনার উর্ধে, যারা আপনার অগ্রবর্তী হয়েছে (বা আপনার আগে গুজরে গেছে)। এই কারণে তাবেঈনদের পুরোভাগের প্রাথমিক দলকে ‘সলফে সালেহ’ বলে নামকরণ করা হয়েছে।[৩]

এই অর্থের প্রতি নির্দেশ করে বুখারী-মুসলিমের একটি হাদীস, যাতে একটি কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, একদা কন্যা ফাতেমাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) এলে নবী (সা.) তাকে দেখে স্বাগত জানালেন এবং বললেন, 'আমার কন্যার শুভাগমন হোক। অতঃপর তিনি তাকে নিজের ডান অথবা বাম পাশে বসালেন। তারপর তিনি তাকে কানে কানে গোপনে কিছু বললেন। ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) জোরেশোরে কাঁদতে আরম্ভ করল। সুতরাং তিনি তার অস্থিরতা দেখে পুনর্বার তাকে কানে কানে কিছু বললেন। ফলে (এবার) সে হাসতে লাগল। (আয়েশা বলেন,) অতঃপর আমি ফাতেমাকে বললাম, 'রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের মাঝে (তাদেরকে বাদ দিয়ে) তোমাকে গোপনে কিছু বলার জন্য বেছে নেওয়া সত্ত্বেও তুমি কাঁদছ?’ তারপর রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন উঠে গেলেন, তখন আমি তাকে বললাম, রাসূলুল্লাহ (সা.) তোমাকে কী বললেন? সে বলল, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর গোপন কথা প্রকাশ করব না।

অতঃপর রাসুলল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করলে আমি ফাতেমাকে বললাম, তোমার প্রতি আমার অধিকার রয়েছে। তাই আমি তোমাকে কসম দিয়ে বলছি যে, তুমি আমাকে বল, রাসূলুল্লাহ (সা.) তোমাকে কী বলেছিলেন? সে বলল, 'এখন বলতে কোন অসুবিধা নেই। আল্লাহর রসূল (সা.) প্রথমবারে কানাকানি করার সময় আমাকে সংবাদ দিয়েছিলেন যে, জিবরীল (আঃ) প্রত্যেক বছর একবার করে কুরআন শোনান। কিন্তু এখন তিনি দু’বার শুনালেন। সুতরাং আমি বুঝতে পারছি যে, আমার মৃত্যু সন্নিকটে। সুতরাং তুমি (হে ফাতেমা!) আল্লাহকে ভয় করো এবং ধৈর্য ধারণ করো। (فإن نعم السلف أنا لك) কেননা, আমি তোমার জন্য উত্তম অগ্রগামী।” সুতরাং আমি (এ কথা শুনে) কেঁদে ফেললাম, যা তুমি দেখলে। অতঃপর তিনি আমার অস্থিরতা দেখে দ্বিতীয়বার কানে কানে বললেন, “হে ফাতেমা! তুমি কি এটা পছন্দ কর না যে, মুমিনদের নারীদের তুমি সর্দার হবে অথবা এই উম্মতের নারীদের সর্দার হবে?” সুতরাং (এমন সুসংবাদ শুনে) আমি হাসলাম, যা তুমি দেখলে।” (বুখারী ৬২৮৫, শব্দাবলী মুসলিমের ৬৪৬৭নং)

হাফেয নাওয়াবী (রাহিমাহুল্লাহ) সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে (১৬/৭) নবী (সা.)-এর উক্তি (فإن نعم السلف أنا لك) এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, 'সালাফঃ অগ্রগামী। এর অর্থ হল আমি তোমার পূর্বে গমনকারী, তুমি পরে আমার কাছে আগমন করবে।”

এ হল সলফ’ এর আভিধানিক অর্থ।

[১]. মু'জামু মাক্কায়িসিল লুগাহ, ইবনে ফারেস ৩/৯৫

[২]. রাগেব আসফাহানী, মুফরাদাত ৪২০পৃঃ

[৩]. লিসানুল আরাব ৯/ ১৫৯, ইবনুল আমীরের বক্তব্য দেখুনঃ আন-নিহায়াহ

পূর্বে উক্ত হয়েছে, সলফের অর্থ হল, সেই ব্যক্তি, যে বয়স ও মর্যাদায় আপনার অগ্রগামী হয়েছে। এক্ষণে আমরা এই শব্দের পারিভাষিক অর্থ পেশ করব। মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেন,

وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

“আর যেসব মুহাজির ও আনসার (ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী এবং প্রথম, আর যেসব লোক সরল অন্তরে তাদের অনুগামী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট। তিনি তাদের জন্য এমন। উদ্যানসমূহ প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশে নদীমালা প্রবাহিত; যার মধ্যে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে, এ হল বিরাট সফলতা।” (তাওবাহঃ ১০০)।

সহীহায়নে)[১] ইবনে মাসউদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ يَجِيءُ أَقْوَامٌ تَسْبِقُ شَهَادَةُ أَحَدِهِمْ يَمِينَهُ، وَيَمِينُهُ شَهَادَتَهُ

“সর্বোত্তম যুগ হল আমার (সাহাবীদের) শতাব্দী। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেয়ীদের) শতাব্দী। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেতাবেয়ীনদের) শতাব্দী। অতঃপর এমন সম্প্রদায়ের আগমন ঘটবে, যাদের একজনের কসমের আগে সাক্ষি হবে, আবার সাক্ষির আগে কসম। হবে।” (শব্দাবলী বুখারীর)

সহীহ মুসলিম (২৫৩৬নং)এ আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করল, কোন লোকেরা সর্বশ্রেষ্ঠ? উত্তরে তিনি বললেন, “আমি যে শতাব্দীতে আছি (তার লোকেরা)। অতঃপর দ্বিতীয়, অতঃপর তৃতীয়।”

এ বিষয়ে একাধিক হাদীস রয়েছে। বলা বাহুল্য, সূরা তাওবার উল্লিখিত আয়াত এবং উপর্যুক্ত হাদীস সাহাবাগণের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর তারাই ছিলেন উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। আর এ কথায় কোন সন্দেহ ও সংশয় নেই যে, তারাই হলেন মর্যাদা, ইলম ও ঈমানে আমাদের অগ্রগামী ‘সলফ।

* কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

আর তা হল এই যে, ইবনে মাসউদ, আয়েশা ও অন্যান্যের হাদীসে যে সময়কালের নির্দিষ্টীকরণ এসেছে, তা কি সলফের পারিভাষিক অর্থ নির্ধারণে যথেষ্ট?

অন্য কথায়, প্রত্যেক সেই ব্যক্তি, যিনি উক্ত বকতময় সময়কালে জীবনধারণ করেছেন, তিনিই কি অনুসরণীয় সলফে সালেহ গণ্য হবেন?

* উত্তরঃ

মোটেই না। যেহেতু সময়ের অগ্রগামিতা সলফ নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়। সুতরাং এর সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আরোপ আবশ্যক।

আর তা হল এই যে, তার (আকীদাহ ও আমল) কিতাব, সুন্নাহ ও সাহাবাগণের বুঝ অনুযায়ী হবে।

বলা বাহুল্য, আমরা দেখতে পাই, সুন্নাহর ইমামগণ উক্ত পরিভাষায় শর্তারোপ করে বলেন, সলফে সালেহ। এর মাধ্যমে সলফে ত্বালেহ (মন্দ) মানুষ বের হয়ে যায়, যারা সমসাময়িককালে জীবনধারণ করেছে, কিন্তু সাহাবাগণের বুঝ, কর্মপদ্ধতি ও মতাদর্শের অনুসারী ছিল না।

কথায় আছে, বাস্তব উত্তম সাক্ষী। কাদারিয়্যাহ ফির্কা সাহাবাগণের একটি জামাআত থাকাকালে প্রকাশ লাভ করেছে। এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) এর হাদীস ও তার উক্ত ফির্কা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা সুপ্রসিদ্ধ। আর তা সহীহ মুসলিমের (ভূমিকার পর) প্রথম হাদীস।

তদনুরূপ বিদ্রোহী খাওয়ারিজ ফির্কা আলী ও অন্যান্য সাহাবাগণ (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহাচরণ করেছে। উক্ত ফির্কা আবির্ভূত হয়েছিল সাহাবাগণের সামনে। যাদের সাথে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) প্রসিদ্ধ মুনাযারা (তকালোচনা) করেছিলেন, যা হাকেম তার মুস্তাদরাক গ্রন্থে এবং অন্যান্যগণ[২] সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। খাওয়ারিজরা যে ভ্রষ্টতায় ছিল, তার প্রমাণ দিয়ে ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাদেরকে বলেছিলেন, “তোমরা লক্ষ্য কর, তোমাদের দলে তাঁদের। (অর্থাৎ সাহাবাদের) কোন একজনও নেই। আর সেটাই ছিল তাদের ভ্রষ্টতা বর্ণনার জন্য যথেষ্ট প্রমাণ।

বুঝা গেল, সময়ের অগ্রগামিতা কোন মানুষের ‘সলফে সালেহ’ হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থের ভূমিকায় (১/১৬)তে আলী বিন শাক্বীক (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন মুবারককে লোকেদের সামনে বলতে শুনেছি, আমর বিন সাবেতের হাদীস বর্জন কর। কারণ সে সলফকে গালি দিত।

আমি বলি, এখানে ‘সলফ’ বলতে উদ্দেশ্য কেবল সাহাবাগণ, অন্য কেউ নন।

পরিভাষায় সালাফিয়াহর অর্থ একাধিক উলামা বর্ণনা করেছেন। যেমন আহলুস সুন্নাহর ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহু ওয়া রায্বিয়া আনহু) তার প্রসিদ্ধ পুস্তিকা উসূলুস সুন্নাহ’তে বলেছেন, ‘আমাদের নিকট সুন্নাহর মৌলিক নীতি হল, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবাগণ যে বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, তা সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করা এবং তাদের অনুগমন করা।

আল্লামাহ সাফারীনী (রাহিমাহুল্লাহ) লাওয়ামিউল আনওয়ার’ (১/২০)এ বলেছেন, 'সলফদের মযহাব বলতে উদ্দেশ্য হল, যে আদর্শের উপর সাহাবায়ে কিরাম , নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসারী প্রধান প্রধান তাবেঈনগণ, তাদের অনুসারী তাবে তাবেঈনগণ, দ্বীনের সেই ইমামগণ, যাদের ইমাম হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষি দেওয়া হয়েছে, দ্বীনে তাদের বিশাল মর্যাদা বিদিত হয়েছে এবং তাঁদের বাণীকে সলফ থেকে খলকগণের বর্ণনা-সূত্রে মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছে।

তারা নয়, যাদেরকে বিদআতী আখ্যায়িত করা হয়েছে অথবা যারা অসন্তোষজনক খেতাব নিয়ে প্রসিদ্ধ হয়েছে। যেমন খাওয়ারিজ, রাওয়াফিয, ক্বাদারিয়্যাহ, মুরজিআহ, জাবারিয়্যাহ, জাহমিয়্যাহ, মুতাযিলাহ, কারামিয়্যাহ প্রভৃতি।

আমাদের (উস্তায) শায়খ আল্লামা মুহাম্মাদ আমান (রাহিমাহুল্লাহু ওয়া গাফারা লাহ) তার বিশাল গ্রন্থ ‘আস-স্বিফাতুল ইলাহিয়্যাহ ফী স্বাওইল কিতাবি অস্-সুন্নাহ’ (৫৭পৃঃ)তে বলেছেন, 'যখন সালাফ শব্দ বলা হয়, তখন পরিভাষায় আমাদের উদ্দেশ্য হয়, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবাগণ, যারা তার যুগে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর নিকট থেকে এই দ্বীনকে তার মুখ্য ও গৌণ সকল বিষয়ে তরতাজা রূপে সরাসরি গ্রহণ করেছেন। যেমন এই পরিভাষায় প্রবিষ্ট হবেন তাবেঈনগণ, যারা দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই তাদের ইলমের উত্তরসূরি হয়েছেন। যারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাক্ষ্য ও প্রশংসার অন্তর্ভুক্ত, যাতে তিনি তাদেরকে শ্রেষ্ঠ মানব’ বলে অভিহিত করেছেন। (এরপর লেখক উপযুক্ত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।) যেমন পরিভাষায় শামিল তাবে তাবেঈনগণও।

‘সালাফ’ একটি পারিভাষাগত শব্দ। আর এই পরিভাষা তখন প্রকাশ ও প্রসিদ্ধি লাভ করল, যখন দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহে কালামিয়্যাহ ফির্কাগুলির মাঝে মতভেদ ও কলহ প্রকাশ ও চলমান হল এবং সকলেই সালাফের প্রতি সম্পর্ক জোড়ার প্রচেষ্টা চালাতে লাগল। (সবাই নিজেকে সালাফী বলে দাবী করতে লাগল।) প্রচার করতে লাগল যে, যে মতাদর্শে সে বিশ্বাসী আছে, সেটাই হল সেই মতাদর্শ, যার উপর সাহাবাগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

সুতরাং এই পরিস্থিতিতে এমন কিছু মৌলনীতি, মূলসূত্র বা নিয়মকায়েদা প্রকাশ পাওয়া প্রয়োজন, যার চিহ্ন হবে সুস্পষ্ট এবং সালাফী অভিমুখে সুদৃঢ়। যাতে যে সকল ব্যক্তি তাদের অনুগমন করতে চায় এবং তাদের পদ্ধতি অনুসারে পথ চলতে চায়, তাদের নিকট বিষয়টি তালগোল পেকে না যায়।

অন্যস্থলে তিনি বলেছেন, বিগত আলোচনায় স্পষ্ট হল যে, সালাফিয়াহর ব্যবহারিক অর্থ একটি পরিভাষায় পরিণত হয়েছে, যা সেই তরীকাকে বলা হয়, যা ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের অগ্রণী দল (সাহাবা)দের এবং তাঁদের, যারা ইলম অর্জনে, তার বোঝার ক্ষেত্রে, তার প্রতি দাওয়াতী প্রকৃতির ক্ষেত্রে তাদের অনুগমন করেন। সুতরাং তার অর্থ কোন নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুগের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটা বোঝা আবশ্যক যে, তা হল মানব-জীবন চলা-অবধি চলমান অর্থ। আর এটাও বোঝা আবশ্যক যে, ফিকাহ নাজিয়াহ’ (পরকালে পরিত্রাণ লাভকারী দল) কেবল হাদীস ও সুন্নাহ উলামাদের মাঝে সীমাবদ্ধ এবং তারাই হলেন এই মানহাজ (মতাদর্শ)এর অধিকারী। যে ফিকাহ কিয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে, যা নবী -এর হাদীস থেকে উপলব্ধি করা যায়। তিনি বলেছেন,

ولا تزال طائفة من أمتي منصورين على الحق لا يضرهم من خذلهم حتى يأتي أمر الله

“আমার উম্মতের মধ্যে এক দল চিরকাল হক (সত্যের উপর সাহায্যপ্রাপ্ত (বিজয়ী) থাকবে, আল্লাহর আদেশ (কিয়ামতের পূর্বমুহূর্ত) আসা পর্যন্ত, যারা তাদেরকে পরিত্যাগ করবে তারা তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না।”

আমি (লেখক) বলি, (শায়খ রাহিমাহুল্লাহ) যে হাদীস উল্লেখ করেছেন, তা বুখারী-মুসলিমে মুআবিয়া (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত।

বলা বাহুল্য, বিগত আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, সালাফের পারিভাষিক অর্থ হল, সাহাবা ও তাবেঈনগণ এবং তারাও, যারা কিয়ামত পর্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুগমন করবেন, তাঁদের তরীকায় চলমান থাকবেন এবং তাদের পদাঙ্কানুসরণ করবেন।

[১]. বুখারী ২৯৫২, মুসলিম ২৫৩৩নং

[২]. মুস্তাদরাক ২/ ১৫০, আহমাদ ৬৫৬নং, বাইহাক্বীর কুবরা ৮/ ১৭ ৯, আহমাদের ইসনাদকে ইমাম ইবনে কাষীর ‘আল-বিদায়াহ অন-নিহায়াহ’ গ্রন্থে ‘সহীহ’ বলেছেন। দ্রঃ ইরওয়া ২৪৫৯নং
‘সালাফে সালেহ’এর কতিপয় শরয়ী প্রতিনাম

একাধিক আহলে ইলমের বাণী লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তারা সলফদের অন্য আরো নাম ব্যবহার করেছেন, যা উক্ত মহৎ নামেরই অর্থ নির্দেশ করে। অবশ্য তাতে এ কথা বোঝা সঠিক নয় যে, সেগুলির আপোসে মত-পার্থক্য আছে। বরং অর্থের দিক থেকে সকল নামই পরিপূর্ণভাবে অভিন্ন। আর সে সকল নামের উৎপত্তি এমন স্পষ্ট উক্তিসমূহ থেকে হয়েছে, যা তার প্রতি নির্দেশ বহন করে। সুতরাং সালাফ’ এর নামসমূহের কতিপয় নাম হলঃ

• আহলুস সুন্নাতি ওয়াল-জামাআহ

• আহলুল হাদীস

• আহলুল আষার

• ফিকাহ নাজিয়াহ

• তায়েফাহ মানসূরাহ

• গুরাবা

* আহলুস সুন্নাতি ওয়াল-জামাআহ

এর ব্যাপারে ইমাম সুফিয়ান সওরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'যখন তোমার কাছে প্রতীচ্য দেশে কোন একজন এবং প্রাচ্যের দেশে অন্য একজন সাহেবুস সুন্নাহ (সুন্নাহপন্থী) ব্যক্তি সম্বন্ধে খবর পৌছে, তাহলে তাদের নিকট সালাম পাঠাও এবং তাদের জন্য দুআ কর। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ কতই না অল্প।[১]

শায়খুল ইসলাম আহমাদ বিন আব্দুল হালীম ইবনে তাইমিয়্যাহ হারানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, “বিদআত যেমন বিচ্ছিন্নতার সাথে সংযুক্ত, তেমনই সুন্নাহ জামাআহর সাথে সংযুক্ত। তাই বলা হয়, আহলস সন্নাতি ওয়াল-জামাআহ, যেমন বলা হয়, 'আহলুল বিদআতি ওয়া-ফুরক্বাহ।”[২]

তিনি অন্য এক জায়গায় আহলুস সুন্নাহর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, যারা আল্লাহর কিতাব, তার রসূল (সা.)-এর সুন্নাত এবং (ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী মুহাজির ও আনসারগণ এবং যেসব লোক সরল অন্তরে তাদের অনুগামী হয়েছেন, তারা যে বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন, তা সুদৃঢ়ভাবে ধারণকারী।[৩]

তিনি আরো বলেছেন, 'আহলে সুন্নাহ ওয়াল-জামাআতের মযহাব পুরনো মযহাব। যা আবু হানীফা, মালেক, শাফেয়ী ও আহমাদকে আল্লাহর সৃষ্টি করার পূর্বেই পরিচিত ছিল। যেহেতু তা হল সেই সাহাবার মযহাব, যারা তা তাদের নবীর নিকট থেকে গ্রহণ করেছেন। যে ব্যক্তি এ মযহাবের বিরুদ্ধাচরণ করবে, সে আহলে সুন্নাহর নিকট ‘বিদআতী’ গণ্য হবে।[৪]

* আহলুল হাদীস (আহলে হাদীস) বা আহলুল আষার (আহলে আষার)

এ নামও (পূর্ববর্তী) উলামাগণের উক্তিতে বর্তমান ছিল---যেমন আমি বলেছি। উদাহরণ স্বরূপ ইমাম আহমাদ, বুখারী প্রমুখের উক্তিতে।

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘সলফ, আহলে হাদীস, সুন্নাহ ও জামাআহর মযহাব হল-----[৫]

অতঃপর তিনি তাদের মযহাব উল্লেখ করেছেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে আহলে হাদীস, সুন্নাহ ও জামাআহ’ নামে অভিহিত করেছেন।

হাফেয ইমাম আবু হাতেম রাযী বলেছেন, আহলে বিদআহ (বিদআতী)দের লক্ষণ হল, আহলে আষারের নিন্দা করা।[৬]

খত্বীব (রাহিমাহুল্লাহ) শারাফু আসহাবিল হাদীস (৭৩পৃঃ)তে সহীহ সূত্রে আহমাদ বিন সিনান আল-ক্বাত্ত্বান থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, দুনিয়াতে এমন কোন বিদআতী নেই, যে আহলে হাদীসকে ঘৃণা করে না। যেহেতু যখনই কোন ব্যক্তি বিদআতী হয়, তখনই হাদীসের মিষ্টতা তার হৃদয় থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

এই নামকরণের কারণ বর্ণনায় হাফেয লালকাঈ বলেছেন, ‘অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তি যখন কোন মাযহাবের বিশ্বাসী হয়, তখন যে উক্তি সে নতুন উদ্ভাবন করেছে, তার প্রতি নিজের সম্পর্ক জুড়ে নেয় এবং নিজের রায়ের উপরই নির্ভরশীল হয়। কিন্তু আসহাবুল হাদীসের উক্তি-ওয়ালা হলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)। তারা তারই প্রতি নিজেদের সম্পর্ক জুড়ে থাকেন, তাঁরই ইলমের উপর নির্ভরশীল হন, তারই ইমের দলীল গ্রহণ করে থাকেন, তারই ইলমের আশ্রয় গ্রহণ করেন, তারই ইলমের রায়ের অনুসরণ করেন, এ নিয়েই তারা গর্ববোধ করেন, তারই নৈকট্য লাভ করে তারা তার সুন্নাহর দুশমনদের উপর আক্রমণ হানেন। সুতরাং উল্লেখযোগ্য মর্যাদায় তাদের সমতুল্য কে হবে এবং গর্বের ময়দানে ও নামের উচ্চতায় কে তাদের মোকাবিলা করবে? যেহেতু তাঁদের নাম কিতাব ও সুন্নাহর অর্থ থেকে সংগৃহীত। এ নাম কিতাব ও সুন্নাহতে পরিব্যপ্ত। যেহেতু তারাই কিতাব ও সুন্নাহকে বাস্তবায়ন করেন। অথবা তারা উভয়কে গ্রহণ করার ব্যাপারে পৃথক বৈশিষ্ট্য রাখেন। সুতরাং তারা আল্লাহর কিতাবে উল্লিখিত ‘হাদীস’-এর সাথে সম্পর্ক জোড়ার মাঝেই ঘোরাঘুরি (গমনাগমন) করেন। হাদীসের কথা মহান আল্লাহ তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন,

اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ

“আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন উত্তম ‘হাদীস’ (বাণী) সম্বলিত এমন এক গ্রন্থ।” (যুমারঃ ২৩)

আর তা হল কুরআন। সুতরাং তারা কুরআনের ধারক ও বাহক, তারাই কুরআন-ওয়ালা এবং তার ক্বারী ও হাফেয (পাঠক ও স্মৃতিস্থকারী)।

আবার তারাই রাসূলুল্লাহ -এর হাদীসের প্রতি সম্পর্ক জোড়েন। সুতরাং তারাই তার বর্ণনাকারী ও বহনকারী। অতএব নিঃসন্দেহে (হাদীসের) উভয় অর্থ তাদের মাঝে পাওয়ার ফলে তারাই এ নামের হকদার হন। যেহেতু আমরা প্রত্যক্ষ করছি, লোকেরা কিতাব ও সুন্নাহ তাদের নিকট থেকেই সংগ্রহ করছে এবং তাঁদেরই শুদ্ধীকরণের উপর সকল মানুষ ভরসা রাখছে--- [৭]

শায়খুল ইসলাম বলেছেন, আহলে হাদীস বলতে আমাদের উদ্দেশ্য তারা নন, যারা কেবল হাদীস শ্রবণ, লিখন ও বর্ণনের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেন। বরং আমাদের উদ্দেশ্য হল প্রত্যেক সেই ব্যক্তি, যিনি বেশি যত্নের সাথে হাদীস হিফ্য করবেন, চিনবেন, বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিকভাবে বুঝবেন এবং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিকভাবে অনুসরণ করবেন। অনুরূপ আহলে কুরআনও (সেই ব্যক্তি)।[৮]

* ফিকাহ নাজিয়াহ ও তায়েফাহ মানসুরাহ

এই নামকরণ এসেছে প্রসিদ্ধ হাদীস, ফির্কাবন্দীর হাদীসে,

إن بني إسرائيل افترقت على إحدى وسبعين فرقة وإن أمتي ستفترق على ثنتين وسبعين فرقة كلها في النار إلا واحدة وهي الجماعة

“নিশ্চয় বানী ইসরাঈল ৭১ ফির্কায় বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মত বিভক্ত হবে ৭২ ফির্কায়; এদের মধ্যে একটি ছাড়া সবগুলিই হবে জাহান্নামী। আর ঐ ফির্কাটি হল (আহলে) জামাআত।”[৯]

হাদিসটি প্রসিদ্ধ ও সহীহ-শুদ্ধ। যারা এটিকে দুর্বল প্রমাণিত করার চেষ্টা করেছেন, তাদের কথা ভিন্ন। অনুরূপ পূর্বে উল্লিখিত মুআবিয়া (রাঃ)-এর হাদীসে এসেছে,

لا تزال طائفة من أمتي منصورين على الحق

“আমার উম্মতের মধ্যে একটি তায়েফাহ (দল) চিরকাল হক (সত্যের) উপর (মানসূর) সাহায্যপ্রাপ্ত থাকবে---।”

হাফেয লালকাঈ বলেন,(১০) ‘সুতরাং তা হল তায়েফাহ মানসূরাহ (সাহায্যপ্রাপ্ত দল) ও ফিকাহ নাজিয়াহ (পরিত্রাণ লাভকারী দল), পথপ্রাপ্ত গোষ্ঠী, সুন্নাহকে সুদৃঢ়তার সাথে ধারণকারী ন্যায়পরায়ণ জামাআত। পাঠক---আল্লাহ আপনার হিফাযত করুন! প্রণিধান করুন এই উচ্চ পর্যায়ের মহৎ গুণাবলীতে।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) আল-আক্বীদাতুল ওয়াসিত্বিয়াহ’ পুস্তিকার ভূমিকায় বলেছেন, অতঃপর এ হল ফিকাহ নাজিয়াহ, কিয়ামত কায়েম হওয়া পর্যন্ত (মানসূরাহ) সাহায্যপ্রাপ্ত আহলে সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহর বিশ্বাস।

আমাদের শায়খদের শায়খ আল্লামা হাফেয হাকামী (রাহিমাহুল্লাহ) তার উপকারী গ্রন্থ ‘মাআরিজুল কাকূল’ (১/১৯)এ বলেছেন, ‘সত্যবাদী সত্যায়িতের খবরে এসেছে যে, ফিকাহ নাজিয়াহ হল, যারা তিনি ও তাঁর সাহাবা যে মতাদর্শের উপর ছিলেন, তার অনুরূপ মতাদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

* গুরাবা

(গরীবের বহুবচন গুরাবা। গারীব বলা হয় কোন বিরল, উদ্ভট, বহিরাগত বিদেশী অজানা-অচেনা মানুষকে। ---অনুবাদক)

কোন সুন্নীর জন্য সহীহ গ্রন্থে প্রসিদ্ধ গুরাবার হাদীস অবিদিত নয়।

بَدَأَ الإِسْلاَمُ غَرِيباً، وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيباً، فَطُوبى لِلْغُرَبَاءِ

“নিশ্চয় ইসলাম (প্রবাসীর মত অসহায়) অল্পসংখ্যক মানুষ নিয়ে শুরুতে আগমন করেছে এবং অনুরূপ অল্প সংখ্যক মানুষ নিয়েই ভবিষ্যতে প্রত্যাগমন করবে, যেমন শুরুতে আগমন করেছিল। সুতরাং সুসংবাদ ঐ (প্রবাসীর মতো) গুরাবা’ লোকেদের জন্য।”[১১]

ইমাম সুফিয়ান সওরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'আহলে সুন্নাহর জন্য কল্যাণকামী হও। কারণ তাঁরা হলেন গুরাবা।[১২]

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) মাদারিজুস সালিকীন’ গ্রন্থে গুরাবার হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, 'মুসলিমদের মাঝে মু’মিনগণ গুরাবা। মুমিনদের মাঝে আহলে ইলমগণ গুরাবা। তাঁদের মধ্যে আহলে সুন্নাহ, যারা সুন্নাহকে খেয়ালখুশি ও বিদআত থেকে পৃথক করেন, তারা গুরাবা। সুন্নাহর দিকে আহবানকারিগণ এবং বিরোধীদের কষ্টদানে ধৈর্যধারণকারিগণ তাদের মধ্যে বেশি গুরাবা। কিন্তু তারাই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ-ওয়ালা। সুতরাং তাদের মধ্যে গুরবাত (গুরাবার অবস্থা) নেই। আসলে তাদের গুরবাত হল সেই সংখ্যগুরুদের মাঝে, যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ

“আর যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল, তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করে দেবে। (আনআমঃ ১১৬)

সুতরাং তারাই হল আল্লাহ, তার রসূল ও তাঁর দ্বীনের ক্ষেত্রে গুরাবা। আর তাদের গুরবাত হল নিঃসঙ্গতার আতঙ্ক সৃষ্টিকারী। যদিও তারা (মানব সমাজে) পরিচিত উল্লেখযোগ্য---।

* প্রকৃত গুরবাত

প্রকৃত গুরবাত হল, এই সৃষ্টির মাঝে আল্লাহ-ওয়ালা ও তার রসুলের সুন্নাত-ওয়ালাদের গুরবাত। এ হল সেই গুরবাত, যার গুরাবাদের প্রশংসা করেছেন রাসূলুল্লাহ ঐক্ত এবং তার আনীত দ্বীনের বিষয়ে অবহিত করেছেন যে, গারীব (প্রবাসীর মতো অজানা-অচেনা) অবস্থায় তার সূচনা হয়েছে। আর তা ঐভাবেই ফিরে যাবে, যেভাবে তার সূচনা হয়েছে। তার অবলম্বীরা হবে গুরাবা। অবশ্য এই গুরবাত এমন হতে পারে যে, কোন স্থানে থাকবে, কোন স্থানে থাকবে না। কোন কালে থাকবে, কোন কালে থাকবে না, কোন জাতির মধ্যে থাকবে, কোন জাতির মধ্যে থাকবে না। কিন্তু এই শ্রেণীর গুরাবাগণ প্রকৃত আল্লাহওয়ালা। যেহেতু তারা আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে আশ্রয় নেয় না, তার । রসূল ছাড়া অন্যের সাথে সম্পর্ক জোড়ে না এবং তার আনীত বিষয়। ছাড়া অন্য কিছুর দিকে আহ্বানও করে না।

নবী ঐ যে গুরাবাদের ঈর্ষা প্রকাশ করেছেন, তাদের কিছু গুণাবলী হল, লোকেরা যখন সুন্নাহর ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করে, তখন তারা সুন্নাহকে মজবুত করে ধারণ করে। লোকেরা যা (বিদআত) উদ্ভাবন। করে, তারা তা বর্জন করে; যদিও সেটা তাদের নিকট ভালো বলে পরিচিত।

তাওহীদ বাস্তবায়ন করা; যদিও অধিকাংশ লোকে তা করতে অস্বীকার করে।

তারাই হল প্রকৃতপ্রস্তাবে হাতের মুঠোয় অঙ্গার ধারণকারী। অথচ অধিকাংশ মানুষ বরং সকল মানুষই তাদেরকে ভৎসনা করে। এই জগৎসংসারে তাদের গুরবাত (বা বিরলতা)র কারণে সকলেই তাদেরকে বিরলপন্থী, বিদআতী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জন-মানব থেকে বিচ্ছিন্ন গণ্য করে থাকে। বরং সেই প্রকৃত ইসলাম, যার উপর রাসূলুল্লাহ ক্ষ ও তাঁর সাহাবা গণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, তা তার প্রাথমিক প্রকাশকাল অপেক্ষা বর্তমানে বেশি বিরল হয়ে গেছে। যদিও তার প্রকাশ্য নিদর্শন ও রেখাচিহ্ন সুপ্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত। বলা বাহুল্য, প্রকৃত ইসলাম অনেক বিরল। আর তার অবলম্বীরা মনুষ্যসমাজে সবচেয়ে বেশি গুরাবা।

[১]. শারহু উসুলি ইতিক্বাদি আহলিস সুন্নাহ, লালকাঈ ৫০নং

[২]. আল-ইস্তিক্বামাহ ১/৪২

[৩]. মাজমুউ ফাতাওয়া ৩/৩৭৫

[৪]. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ ২/৬০ ১, মাজমুউ ফাতাওয়া ২৪/২৪১

[৫]. মাজমুউ ফাতাওয়া ৪/৯৫

[৬]. আকীদাতুস সালাফ আসহাবিল হাদীস, স্বাবুনী ১০৫পৃঃ, শারহু উসূলি ইতিক্বাদি আহলিস সুন্নাহ, লালকাঈ ১/১৭৯

[৭]. শারহু উসুলি ই’তিক্কাদি আহলিস সুন্নাহ ১/২৩-২৪।

[৮]. মাজমূউ ফাতাওয়া ৪/৯৫, আরো দ্রঃ লাওয়ামিউল আনওয়ার, সাফারীনী ১/৬৪।

[৯]. ইবনে মাজাহ ৩৯৯৩, সিঃ সহীহাহ ২০৪, ১৪৯২নং, হাদীসটির পরিপূর্ণ তাহক্বীক ভাই আহমাদ সরদারের মাস্টার্স থীসিস ‘আল-মাবাহিমুল আক্কাদিয়্যাহ ফী হাদীসি ইফতিরাকূিল উম্মাহ’ দ্রষ্টব্য। এটি মদীনা ইউনাভার্সিটির ইলমী গবেষণা বিভাগ থেকে প্রকাশিত। (এর অন্য বর্ণনায় ৭৩ ফির্কার কথা আছে।)।

[১০]. শারহু উসূলি ইতিক্বাদি আহলিস সুন্নাহ অলজামাঅহ ১/২৪

[১১]. সহীহ মুসলিম ৩৮ ৯নং, এ মর্মে আরো বহু হাদীস আছে, যথাস্থানে তা দ্রষ্টব্য।

[১২]. শারহু উসুলি ইতিক্বাদি আহলিস সুন্নাহ, লালকাঈ ১/৪৯নং/৯৪
সালাফিয়াতের অনুসরণ করা ও তার সাথে সম্বন্ধ জোড়ার বিধান

এ ব্যাপারে বলি, প্রত্যেক মুসলিম ফরয-নফল নামাযের সময় কিবলার দিকে মুখ করে থাকে। আর নিশ্চয় তাতে জরুরী ভিত্তিতে সূরা ফাতেহা পাঠ করে থাকে। যেহেতু এটা হল নামাযের অন্যতম রুকন (স্তম্ভ)। তাতে রয়েছে মহান আল্লাহর বাণী,

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ

“আমাদেরকে সরল পথ দেখাও।”

অর্থাৎ, নামাযী আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে থাকে, তিনি যেন তাকে সরল পথ প্রদর্শন করেন। কিন্তু কী সে সরল পথ, যা আমরা আল্লাহর নিকট তার প্রাপ্তি কামনা করি?

উত্তরঃ এর অর্থে আহলুল ইলমগণের বক্তব্য প্রায় কাছাকাছি। আপনার জন্য ইমাম আবুল আলিয়াহ আর-রিয়াহী (রাহিমাহুল্লাহ) তার সারসংক্ষেপ পেশ করেছেন।

ইমাম ইবনে জারীর তার তফসীর গ্রন্থে হাসান সূত্রে বর্ণনা করেছেন, হামযাহ বিন মুগীরাহ বলেছেন, একদা আমি আবুল আলিয়াহকে মহান আল্লাহ বাণী, (اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ) “আমাদেরকে সরল পথ দেখাও।” এর সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি উত্তরে বললেন, ‘(সরল পথ হল) রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তার পরে তার দুই সাহাবী আবু বাকর ও উমার।

অতঃপর আমি হাসানের নিকট এসে এ কথা বলে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার মত কী?' তিনি বললেন, 'সত্য বলেছেন ও উপদেশ দিয়েছেন।

(প্রিয় পাঠক!) আপনি কি চান, আল্লাহ আপনাকে সরল পথ দেখান? তাহলে রাসুলুল্লাহ -এর সুন্নাহ এবং তাঁর সাহাবাগণের সুন্নাহ অবলম্বন করুন। তার সাহাবাগণের তরীকায় চলুন। যাদের মস্তকে রয়েছেন খুলাফায়ে রাশেদীন এবং তাদের মস্তকে রয়েছেন আবু বাকর ও উমার।

ইমাম ইবনে কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর গ্রন্থ ‘যামুত তাবীল’ (৩৮পৃঃ)তে বলেন, যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সা.) সরল পথের উপর প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং তাঁর পথে চলমান ব্যক্তি অবশ্যই আল্লাহর সরল পথে চলমান হবে। তাই আমাদের জন্য আবশ্যক, তার অনুসরণ করা। সেখানে থামা, যেখানে তিনি থেমেছেন। সেই বিষয়ে নীরব থাকা, যে বিষয়ে তিনি নীরব থেকেছেন।

শায়খুল ইসলাম ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বাদাইউল ফাওয়াইদ’ গ্রন্থে (২/৪০এ) বলেন, ‘বিশ নং মাসআলাহঃ স্বিরাতে মুস্তাকীম (সরল পথ) কী? আমরা এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করব। যেহেতু এ ব্যাপারে লোকেদের বক্তব্য ভিন্ন-ভিন্ন। আর তার প্রকৃতত্ব একটি জিনিস, আর তা হলঃ

আল্লাহর পথ, যা তিনি রসূলগণ প্রমুখাৎ নিজ বান্দাদের জন্য স্থাপন করেছেন। সেই পথকে তিনি বান্দাদের জন্য নিজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথ করেছেন। সুতরাং সেই পথ ছাড়া তাঁর কাছে পৌছনোর। কোন ভিন্ন পথ নেই। বরং সেই পথ ছাড়া সকল পথ বন্ধ।[১]

আর তা হল একমাত্র তারই ইবাদত করা এবং একমাত্র তার রসূলেরই অনুসরণ করা। সুতরাং তার ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক করা যাবে না এবং তাঁর রসূলের অনুসরণে অন্য কাউকে শরীক করা যাবে না। বলা বাহুল্য, খাটিভাবে তওহীদ অবলম্বন করতে হবে এবং খাটিভাবে রসূল (সা.)-এর অনুসরণ করতে হবে।

সংক্ষেপে উল্লিখিত বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন হল, রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তার সাহাবাগণের পথ অবলম্বন করার বিধান কী? উত্তর হল, ওয়াজেব, অপরিহার্য। এ বিধানের ভূরিভূরি দলীল-প্রমাণ কিতাব ও সুন্নাহতে রয়েছে, প্রণিধান করলে (প্রাপ্ত হবেন)। ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) তার অনন্য গ্রন্থ (ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন ৪/ ১২৩-১৫৯)এ সলফ ও সাহাবাগণের অনুসরণ ওয়াজেব হওয়ার ব্যাপারে একটি উপকারী অধ্যায় উল্লেখ করেছেন। আমরা (সেখান হতে পাঠকের খিদমতে) কিছু দলীল পেশ করব। একঃমহান আল্লাহ বলেছেন,

وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ۖ وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا ۖ وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ۚ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

“তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার অংশী (শির্ক) করতে পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস কর এবং যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন কর, অতঃপর আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে অবহিত করব।” (লুকমানঃ ১৫)

দলীল গ্রহণের পদ্ধতিঃ

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,[২] এ হল সূক্ষ্ম ফিকহ (সমঝ), যা ধৈর্যশীলগণ ব্যতীত অন্য কেউ প্রাপ্ত হন না। তিনি বলেছেন, 'সমস্ত সাহাবাগণই মহান আল্লাহর অভিমুখী ছিলেন। তাই তাদের পথ অবলম্বন করা ওয়াজেব। আর তাঁদের উক্তি, কর্ম এবং বিশ্বাস তাদের বৃহত্তম পথেরই অন্তর্ভুক্ত।

আর তারা যে আল্লাহ-অভিমুখী, তার প্রমাণ হল, মহান আল্লাহ তাদেরকে ইসলামের জন্য হিদায়াত করেছেন। পরন্ত তিনি বলেছেন,

وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ

“যে তার অভিমুখী হয়, তাকে তিনি হিদায়াত করেন।” (শূরাঃ ১৩)

দুইঃ মহান আল্লাহর বাণী,

قُلْ هَٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي ۖ وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ

“তুমি বল, এটাই আমার পথ। আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করি সজ্ঞানে আমি এবং আমার অনুসারিগণও। আল্লাহ পবিত্র। আর আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (ইউসুফঃ ১০৮)

দলীল গ্রহণের পদ্ধতিঃ ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,[৩] আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা অবহিত করেছেন যে, যে ব্যক্তি রসূল (সা.)-এর অনুসরণ করেছে, সে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে সজ্ঞানে দাওয়াত দেয়, তার অনুসরণ করা ওয়াজেব। হয়ে যায়। যেহেতু মহান আল্লাহ জ্বিনদের কথা উদ্ধৃত করেছেন এবং তা পছন্দ করেছেন, সেখানে তিনি বলেছেন,

يَا قَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللَّهِ وَآمِنُوا بِهِ

“হে আমাদের সম্প্রদায়! আল্লাহর দিকে আহবানকারীর আহবানে সাড়া দাও এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।” (আহকাফঃ ৩১)।

আর যেহেতু যে ব্যক্তি সজ্ঞানে আল্লাহর দিকে মানুষকে আহন। করে, সে আসলে হক জেনে তার দিকে আহ্বান করে। আর আল্লাহর আহকামের দিকে আহ্বান করাই হল আল্লাহর দিকে আহ্বান করা।

যেহেতু তা হল তিনি যা আদেশ ও নিষেধ করেছেন, তাতে তার আনুগত্য করার দিকে আহান। তাহলে সাহাবাগণ রসূল (সা.)-এর অনুসরণ করেছেন। তাই তারা যখন আল্লাহর দিকে আহান করবেন, তাদের অনুসরণ করা ওয়াজেব হবে।”

তিনঃ মহান আল্লাহর বাণী,

وَمَن يَعْتَصِم بِاللَّهِ فَقَدْ هُدِيَ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

“যে আল্লাহকে অবলম্বন করবে, সে অবশ্যই সরল পথ পাবে।” (আলে ইমরানঃ ১০১)।

দলীল গ্রহণের পদ্ধতিঃ

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,[৪] উক্ত আয়াত থেকে দলীল এইভাবে গ্রহণ করা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ তাকে অবলম্বনকারীদের ব্যাপারে খবর দিয়েছেন যে, তারা হকপথ প্রাপ্ত। সুতরাং আমরা বলি, সাহাবা গণ আল্লাহকে অবলম্বনকারী, বিধায় তারা সরল পথপ্রাপ্ত। অতএব তাদের অনুসরণ করা ওয়াজেব।”

চারঃ মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَىٰ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ ۖ وَسَاءَتْ مَصِيرًا

“আর যে ব্যক্তি তার নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর রসুলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং মুমিনদের পথ ভিন্ন অন্য পথ অনুসরণ করবে, তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব। আর তা কত মন্দ আবাস!” (নিসাঃ ১১৫)

দলীল গ্রহণের পদ্ধতিঃ

ইমাম ইবনে কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,[৫] সুতরাং যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, সে আখেরাতে সলফগণের সাথী হবে এবং তারা যে জান্নাত ও সন্তুষ্টির প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন, সেই প্রতিশ্রুতি সেও লাভ করবে, তার উচিত, সরল মনে তাদের অনুসরণ করা। পক্ষান্তরে যে। ব্যক্তি তাদের পথ ছেড়ে ভিন্ন পথ গ্রহণ করবে, সে ব্যক্তি মহান। আল্লাহর উক্ত বাণীর ব্যাপকতায় প্রবেশ করবে। অতঃপর তিনি সরা নিসার এই আয়াত উল্লেখ করেছেন।

তিনি উক্ত গ্রন্থের একটি অধ্যায়ে বলেছেন, দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ সলফের অনুসরণ করা ওয়াজেব, তার বর্ণনা। তাঁদের মযহাব অবলম্বন করা এবং তাঁদের পথের পথিক হওয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধকরণ। কিতাব, সুন্নাহ ও ইমামগণের উক্তি থেকে তার বিবরণ।”[৬]

অতঃপর উক্ত অধ্যায়ে দলীল উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘কিতাব থেকে দলীল হল--- তারপর তিনি সূরা নিসার উক্ত আয়াত উল্লেখ করেছেন। অতঃপর তিনি বলেছেন, সুতরাং তিনি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির হুমকি দিয়েছেন, যারা তাদের পথ ছেড়ে ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। পক্ষান্তরে তাঁদের অনুসারীদেরকে তিনি সন্তুষ্টি ও জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,

وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

“আর যেসব মুহাজির ও আনসার (ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী এবং প্রথম, আর যেসব লোক সরল অন্তরে তাদের অনুগামী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট। তিনি তাদের জন্য এমন। উদ্যানসমূহ প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশে নদীমালা প্রবাহিত; যার মধ্যে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে, এ হল বিরাট সফলতা।” (তাওবাহঃ ১০০)।

বলা বাহুল্য, নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসারীদেরকে তিনি সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যে প্রতিশ্রুতি তিনি তাদেরকে দিয়েছেন, আর তা হল তার সন্তুষ্টি, তার জান্নাত ও মহা সাফল্য।

পাঁচঃ ইরবায বিন সারিয়াহর প্রসিদ্ধ হাদীসে নবী (সা.)-এর বাণী,

فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ؛ فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ

“সুতরাং তোমরা আমার সুন্নত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের রীতিকে আঁকড়ে ধরবে এবং তা দাঁত দিয়ে মজবুত করে ধরে থাকবে। আর তোমরা দ্বীনে নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ (বিদআত) থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।”

হাদীসটিকে সুনান-প্রণেতাগণ বর্ণনা করেছেন। আর সেটা সহীহ হাদীস।[৭]

দলীল গ্রহণের পদ্ধতিঃ

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,[৮] ‘সুতরাং [নবী (সা.)] নিজের সুন্নাহর সাথে তাঁর খলীফাগণের সুন্নাহকে সংযুক্ত করেছেন। এবং তার অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন; যেমন নিজের সুন্নাহকে অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন। পরন্তু তার অনুসরণ করার ব্যাপারে। অধিক তাকীদ করেছেন। এমনকি তা দাঁত দিয়ে মজবুত করে ধরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আর তাদের সুন্নাহ বলতে তাদের দেওয়া ফতোয়া এবং উম্মতের জন্য তাঁদের চালুকৃত রীতিও শামিল।

ইমাম ইবনে কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,[৯] ‘সুতরাং তিনি তাঁর খলীফাগণের সুন্নাহকে ধারণ করার আদেশ দিয়েছেন, যেমন নিজের সুন্নাহকে ধারণ করার আদেশ দিয়েছেন। সেই সাথে অবহিত করেছেন যে, নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ বিদআত ও ভ্রষ্টতা। আর তা হল সেই কর্ম, যাতে না রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ করা হয়েছে, আর না-ই তাঁর সাহাবাগণের সুন্নাহর অনুসরণ করা হয়েছে।

আলোচ্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উদ্ধৃতি

একঃ ইমাম উষমান বিন সাঈদ দারেমী তার বিশাল কিতাব আররাদু আলাল জাহমিয়্যাহ’ (২০৯-২১০নং, ১০৬-১০৭পৃঃ)তে মহান আল্লাহর দর্শন সম্বন্ধে জাহমীদের উক্তি আমরা এই আষার (সাহাবীর উক্তি ও আমল) গ্রহণ করি না এবং তা দলীলও মনে করি না’---এর খন্ডন করতে গিয়ে বলেছেন, আমি বললাম, ঠিক আছে, আর। আল্লাহর কিতাবও গ্রহণ করো না। কী মনে কর তোমরা, যদি তোমরা আষার গ্রহণ না কর? তোমরা কি সন্দেহ কর যে, তা সলফ থেকে বর্ণিত, তাদের নিকট থেকে আগত, তাদের মাঝে বহুল প্রচলিত, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা তাদের উলামা ও ফুকাহার নিকট থেকে উত্তরাধিকারী হয়ে আসছেন? তারা বলল, হ্যাঁ। আমরা বললাম, যথেষ্ট। তোমাদের স্বীকারোক্তি যে, সে আষারসমূহ প্রসিদ্ধ ও বর্ণিত, যা উলামা ও ফুক্বাহাগণ গ্রহণ করেছেন। এটা তোমাদের বিপক্ষে প্রমাণ, যা আমাদের উক্ত দাবীর সপক্ষে প্রমাণ। সুতরাং তোমরা তাদের নিকট থেকে তোমাদের দাবীর সপক্ষে অনুরূপ প্রমাণ উপস্থিত কর, যার মাধ্যমে তোমরা সমস্ত আষারকে মিথ্যাজ্ঞান করছ।

তোমরা এ ব্যাপারে কোন খবর বা আষার উপস্থিত করতে সক্ষম হবে না। অথচ তোমরা---ইন শাআল্লাহ---অবশ্যই জেনেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তার সাহাবাগণের সুন্নাহসমূহ, তাদের ফায়সালামীমাংসা ও বিচারাদি এই আষার ও সনদসমূহ ছাড়া প্রাপ্তিলাভ হবে। যদিও তাতে মতবিরোধ বর্তমান। আষারই হল সুন্নাহ লাভের উপায়। এটাই হল সেই পদ্ধতি, যা মুসলিমরা মান্য করে চলেছে। তা হল তাদের দ্বীনে মহান আল্লাহর কিতাবের পর তাদের ইমাম। সেখান । হতেই তারা ইলম উদ্ধৃত করে, তার সাহায্যেই বিচার-ফায়সালা করে, তারই মাধ্যমে তারা প্রতিষ্ঠিত থাকে, তারই উপরে তারা নির্ভর করে, তা দিয়েই তারা সৌন্দর্যমন্ডিত হয়, তাদের দ্বিতীয়জন প্রথমজনের নিকট থেকে তার উত্তরাধিকারী হয়, তাদের উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তিকে তা পৌঁছে দেয়, তা তারা প্রমাণ রূপে ব্যবহার করে, তা শ্রোতার কাছে পৌছে দেওয়ার মাঝে সওয়াব কামনা করে, তারা তার। নাম দেয়, সুনান ও আষার, ফিকহ ও ইলম।

তার সন্ধানে তারা পৃথিবীর প্রাচ্য ও প্রতীচ্য সফর করে, তারই মাধ্যমে তারা আল্লাহর হালালকে হালাল এবং তার হারামকে হারাম গণ্য করে। তারই মাধ্যমে হক ও বাতিল এবং সুন্নাত ও বিদআতের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করে। কুরআনের তফসীর, তার অর্থ ও আহকাম প্রমাণে তাকে দলীলরূপে ব্যবহার করে। তারই মাধ্যমে হিদায়াত থেকে ভ্রষ্ট ব্যক্তির ভ্রষ্টতা জানতে পারে। সুতরাং যে ব্যক্তি তা হতে বিমুখ হয়, সে আসলে সলফের কথা, কর্ম ও আদর্শ থেকে বিমুখ হয় এবং তাদের বিরুদ্ধাচরণ করার ইচ্ছা পোষণ করে। যার ফলে নিজের খেয়াল-খুশীকে তার দ্বীনরূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহর কিতাবকে নিজ রায় দ্বারা আল্লাহর উদ্দেশ্যের বিপরীত অর্থে গ্রহণ করে।

সুতরাং যদি তোমরা মুমিনদের দলভুক্ত হও এবং তাদের সলফদের মতাদর্শের অনুসারী হও, তাহলে ইলমকে তাদের আষার থেকে গ্রহণ কর। তার পথে হিদায়াত গ্রহণ কর। আর এই আষারসমূহকে ইমামরূপে মানতে সন্তুষ্ট হও, যেমন জাতি তাকে নিজেদের জন্য ইমামরূপে মানতে সন্তুষ্ট। শপথ করে বলছি, আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে তোমরা তাদের থেকে বেশি জ্ঞান রাখো না, তাদের মতো সমান জ্ঞানও নেই তোমাদের। আর বর্ণিত আষারসমূহের অনুসরণ ব্যতীত তাদের অনুগমন অসম্ভব। অতএব যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করবে না, সে ব্যক্তি আসলে মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করতে চায়। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ ۖ وَسَاءَتْ مَصِيرًا

“যে ব্যক্তি ---- মুমিনদের পথ ভিন্ন অন্য পথ অনুসরণ করবে, তাকে আমি সেদিকেই ফিরিয়ে দেব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব। আর তা কত মন্দ আবাস!” (নিসাঃ ১১৫)

দুইঃ ইমাম ইবনে কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তার গ্রন্থ 'যাহ্মত তা’বীল’ (৩৩পৃঃ)তে বলেন, ‘সলফ (রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম)দের অনুসরণ করা যে ওয়াজেব, তা কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমার দলীলে প্রমাণিত। যুক্তিও তাই নির্দেশ করে। যেহেতু সলফগণ হয় সঠিক হবেন, না হয় বেঠিক হবেন। এ দুয়ের অন্যথা নয়। সুতরাং তারা। সঠিক হলে তাদের অনুসরণ ওয়াজেব। কারণ সঠিকতার অনুসরণ করা ওয়াজেব এবং আকীদা ও বিশ্বাসে ভুলে পড়া হারাম।

পক্ষান্তরে যদি তারা সঠিক হন, তাহলে তারাই হলেন ‘সিরাত্বে মুস্তাক্বীম (সরল পথের) অনুসারী এবং তাঁদের বিরুদ্ধাচরণকারী ‘স্বিরাত্বে জাহীম (জাহান্নামের পথের) দিকে পরিচালক শয়তানের পথের অনুসারী। অথচ আল্লাহ তার পথকেই অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন এবং তা ছাড়া অন্য পথের অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন,

وَأَنَّ هَٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

“নিশ্চয়ই এটি আমার সরল পথ। সুতরাং এরই অনুসরণ কর এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করো না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। যেন তোমরা সাবধান হও।” (আনআমঃ ১৫৩)

পরন্তু যদি কোন ধারণাকারী এই ধারণা করে যে, তারা বেঠিক, তাহলে সে গোটা ইসলামের সত্যতায় আঘাতকারী হবে। যেহেতু যদি এ ব্যাপারে তাদের ভুল করা সম্ভাব্য হয়, তাহলে এ ছাড়া গোটা ইসলামের অন্য বিষয়েও তাদের ভুল সম্ভাব্য হয়ে যাবে। আর তখন উচিত হবে, তারা যে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তা বর্ণনা না করা, তাঁরা নবী -এর যে মু'জেযাসমূহ বর্ণনা করেছেন, তা প্রামাণ্য ধারণা না করা। তা হলে তো বর্ণনাই বাতিল হয়ে যাবে এবং শরীয়তও লয়প্রাপ্ত হবে! আর কোন মুসলিমের জন্য এমন কথা বলা ও বিশ্বাস করা বৈধ নয়। যেমনটি বলেছি, দলীল আছে ভূরিভূরি।

[১]. সেই পথ ছাড়া অন্য কোন পথই তার কাছে পৌছেনি। যেহেতু এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দু পর্যন্ত কেবল একটাই সরল রেখা টানা সম্ভব।---অনুবাদক)

[২]. ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন ৪/ ১৩০

[৩]. ইলামুল মুওয়াক্কিঈন ৪/ ১৩০-১৩১

[৪]. ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন ৪/ ১৩৪

[৫]. যাম্মুত তাবীল’ ৭পৃঃ

[৬]. যাম্মুত তাবীল’ ২৬পৃঃ

[৭]. আবু দাউদ ৪৬০৯, তিরমিযী ২৬৭৬, ইবনে মাজাহ ৪২-৪৩নং, আহমাদ ৪/১২৬, ইবনে হিব্বান (ইহসান) ৫নং প্রমুখ, তিরমিযী বলেছেন, 'হাসান সহীহ। ইবনে হিব্বান ‘সহীহ বলেছেন। আবু নুআইম বলেছেন, 'শামী। বর্ণনাকারীদের সহীহর অন্তর্ভুক্ত উত্তম হাদীস।” (জামিউল উলুমি ওয়াল-হিকাম ২/৪১০৯) আলবানী সহীহ বলেছেন। দ্রঃ মিশকাত ১৬৫, ইরওয়া ২৪৫৫নং

[৮]. ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন ৪/ ১৪০

[৯]. যাম্মুত তাবীল’ ২৬পৃঃ

প্রিয় পাঠক! আল্লাহ আপনাকে তওফীক দিন। জানলেন যে, বিগত সলফ তথা মুমিনদের পথ অনুসরণ করা ওয়াজেব। আর এরই উপর ভিত্তি করে বলা যায়, তাদের সাথে সম্পর্ক জোড়া (এবং নিজেকে ‘সালাফী’ বলা) আপনার জন্য মর্যাদা ও সম্মানের বিষয়।

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,[১] যে ব্যক্তি সলফের মযহাব প্রকাশ করে, তাদের সাথে সম্পর্ক জোড়ে এবং তাদের প্রতি সম্পৃক্ত হয়, তাহলে তাতে তার কোন দোষ হয় না। বরং তার নিকট থেকে সেটা গ্রহণ করা ওয়াজেব। যেহেতু সলফের মযহাব হক বৈ নয়।

সুপ্রিয় পাঠক! আপনি যদি ইমামগণের উপদেশ-অনুদেশাবলী নিয়ে ভেবে দেখেন, তাহলে দেখতে পাবেন, তারা সলফে সালেহর পথ অবলম্বন ও অনুসরণ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। কিছু উপদেশ নিম্নরূপঃ

১। শামবাসীদের ইমাম, ইমাম আওযায়ী বলেছেন, সুন্নাহর উপর নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখো। (সলফ) গোষ্ঠী যেখানে থেমেছেন, সেখানে থেমে যাও। তুমি তাই বল, যা তারা বলেছেন। তুমি সেই জিনিস থেকে নিজেকে বিরত রাখো, যে জিনিস থেকে তারা নিজেদেরকে বিরত রেখেছেন। তুমি তোমার সলফে সালেহর পথের পথিক হও। যেহেতু তা তোমার জন্য যথেষ্ট হবে, যেমন তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল।[২]

২। তিনি আরো বলেছেন, 'তুমি সলফদের আষার অবলম্বন করে। থেকো, যদিও লোকেরা তোমাকে প্রত্যাখ্যান করে। আর ব্যক্তিগত রায়সমূহ থেকে দূরে থেকো, যদিও তোমার জন্য উক্তিকে সুশোভিত করা হয়। যেহেতু বিষয় যখন স্পষ্ট হওয়ার তখন স্পষ্ট হবে। আর সে। বিষয়ে তখন তুমি সরল পথে চলমান থাকবে। [৩]

৩। ইমাম ইসমাঈল স্বাবুনী বলেছেন, '(আসহাবুল হাদীস) নবী - এর অনুসরণ করে এবং তার সাহাবাবর্গের অনুগমন করে, যারা তারকারাজির মতো।---তারা সলফে সালেহীনের অনুগামী দ্বীনের ইমামগণ ও মুসলিমদের উলামাগণের অনুসরণ করে এবং সেই সুদৃঢ় দ্বীন ও স্পষ্ট হক মজবুত সহকারে ধারণ করে, যা তারা মজবুত সহকারে ধারণ করে ছিলেন।[৪]

৪। ইমাম বার্বাহারী বলেন, “যে ভিত্তির উপর জামাআতের প্রতিষ্ঠা, তা হল মুহাম্মাদ -এর সাহাবাগণ। তারাই হলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ। সুতরাং যে ব্যক্তি তাদের নিকট থেকে (ইলম) গ্রহণ করবে না, সে ভ্রষ্ট হয়ে যাবে, সে বিদআত করবে। আর প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।[৫]

এ মর্মে আমাদের শায়খ আল্লামা যায়দ বিন হাদী আল-মাদখালী (হাফিযাহুল্লাহু ওয়া রাআ’হ)র একটি সুন্দর ও শক্তিশালী উক্তি উদ্ধৃত করে ইতি টানব। উক্তিটি আসলে একজনের সুদীর্ঘ প্রশ্নের উত্তরে কথিত। তার প্রশ্নের প্রথমাংশে বলা হয়েছে, কিছু লোকে বলে, কেন আমরা “সালাফী” উপাধি গ্রহণ করব? কেন রাসূল (মুহাম্মাদ) (সা.) এর দিকে সম্পর্ক জুড়ে “মুহাম্মাদী” বলা হবে না?

এ প্রশ্নের উত্তরে হাফিযাহুল্লাহ বলেছেন, আমরা তাকে বলব, যে ব্যক্তি সলফে সালেহর মযহাব প্রকাশ করে এবং তার দিকে সম্পর্ক জুড়ে (নিজেকে সালাফী বলে), তার বিরুদ্ধে তোমার আপত্তি তোলা অন্যায়। এই আপত্তিতে তোমার উদ্বুদ্ধ হওয়ার কারণ হল, হয় তোমার বীভৎস অজ্ঞতা। সঠিক সালাফিয়াত ও সালাফী, কিতাব ও সুন্নাহর ধারক ও বাহক, যারা নবী (সা.)-এর সাহাবা এবং যারা তাদের পথের পথিক, ইলম ও দাওয়াতের ইমাম, যারা শ্রেষ্ঠ শতাব্দীগুলিতে জীবনধারণ করেছেন এবং যাদের শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, তাদের ব্যাপারে তোমার অজ্ঞতা।

আর তা না হয় তুমি দ্বীন শিক্ষার্থীদের মাঝে সংশয় সৃষ্টি করতে চাইছ। যে, সালাফিয়াত একটি দল বা সংগঠন, যার প্রতিষ্ঠাতা হল মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব। সুতরাং তার থেকে দুরে থাকতে হবে এবং তার সাথে সম্পর্ক জোড়া বৈধ নয়। সত্য এই যে, যে ব্যক্তি সালাফ বা সালাফিয়াতের দিকে নিজের সম্পর্ক জোড়ে, তার বিরুদ্ধে আপত্তি তোলা কারো জন্য বৈধ নয়। অতএব যে বলবে, আমি সালাফী এবং আমার আকীদাহ সালাফিয়াহ’, তার নিন্দা করা ঠিক নয়। বরং রাব্বানী উলামা ও তাদের ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ মতানুসারে তার নিকট থেকে তা গ্রহণ করা (মেনে নেওয়া) ওয়াজেব। আর তা এই কারণে যে, সলফদের মযহাব হক বৈ নয়। আর সালাফ শব্দের প্রতি সম্বদ্ধ সালাফিয়াত’ এমন নামকরণ, যা মুসলিম উম্মাহ থেকে ক্ষণকালের জন্যও বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। বরং সালাফিয়াত হল মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ। এর বিপরীত হল, বিদআতী সংগঠনসমূহের সাথে সম্পর্ক জোড়া; যেমন ইখওয়ানী দল ও তবলীগী ফিকাহ এবং তাদের সমর্থক দল। যাদের (পরিচিতি) ও মতাদর্শের বিবরণ পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে।

বাকী থাকল সালাফী আকীদাহ ও তাতে বিশ্বাসী সালাফীগণের বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপনকারীর উক্তি, মুহাম্মাদী’ বলা হয় না কেন?

এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলব, এ হল তার পক্ষ থেকে মানুষের মাঝে সংশয় সৃষ্টি ও গোলমাল পাকানোর অপচেষ্টা, যা পূর্বোক্ত আপত্তির শ্রেণীভুক্ত। যেহেতু উম্মাহর সকলের জন্য বলা হয়, “উম্মতে মুহাম্মাদিয়্যাহ”। অর্থাৎ, মুহাম্মাদ তার নবী। সে উম্মত আবার দুই ভাগে বিভক্ত; (এক) উম্মতে দাওয়াহ (যাদেরকে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি)। (দুই) উম্মতে ইজাবাহ (যাদেরকে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, আর তারা তা গ্রহণ করেছে)।

এই উম্মতে ইজাবাহ আবার ৭৩ দলে বিভক্ত। যাদের একটি দল ছাড়া বাকীরা জাহান্নামী। আর সে দলটি হল, যেটি সেই মতাদর্শে প্রতিষ্ঠিত, যার উপর নবী করীম ও তার সাহাবাগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। বলা বাহুল্য, নবী (সা.)-এর সাহাবাগণই হলেন সলফ। অতঃপর তাদের পর যারা এসেছেন, তাদের তরীকা অবলম্বন করেছেন এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন, তাদেরকেও তাদের সাথে মিলিত করা হবে এবং বলা হবে, তারা সালাফী এবং তাদের আকীদাহ সালাফিয়্যাহ।[৬]

অবশেষে হে প্রিয়! আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, তুমি সুন্নাহর কিতাবসমূহ অধ্যয়ন কর। তাতে তুমি অগণিত সংখ্যক স্পষ্ট উক্তি প্রাপ্ত হবে, যা তোমাকে সেই অসিয়তের ব্যাপারে স্থির-নিশ্চিত করবে, যা আমি সলফের পথ অবলম্বন করা এবং তা হতে দূরে থাকার ব্যাপারে সতর্ক করার লক্ষ্যে উল্লেখ করেছি। আর আল্লাহই তওফীকদাতা।

[১]. মাজমুউ ফাতাওয়া ৪/ ১৪৯

[২]. আশ-শারীআহ, আজুরী ৫৮পৃঃ প্রমুখ।

[৩]. ঐ, আরো দ্রঃ শারাফু আসহাবিল হাদীস, খাত্বীব ৭পৃঃ সহীহ

[৪]. আক্বীদাতুস সালাফ আসহাবিল হাদীস ৮২পৃঃ

[৫]. শারহুস সুন্নাহ ৬৫পৃঃ

[৬]. আল-আজবিবাতুল আযারিয়্যাহ আনিল মাসাইলিল মানহাজিয়্যাহ ৭৭৭৯পৃঃ
[৫].
সালাফ ও সালাফিয়াতের অনুসরণ করার মাহাত্ম্য

যে মুসলিম প্রকৃত সালাফিয়্যাহর অনুসারী হবে, অর্থাৎ সলফের মানহাজের সত্যিকার ও সত্যনিষ্ঠ অনুগামী হবে, তার সকল প্রকার কল্যাণ লাভ হবে। লাভ করবে বিশাল সওয়াব ও মহা পুরস্কার। যেহেতু সে আসলে অবলম্বন করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশিত পথ। নিমে এর কিছু মাহাত্ম্য ও মর্যাদা বিবৃত হলঃ

১। সালাফিয়াত অবলম্বনকারী ইলাহী নির্দেশের অনুসারী। আর এ কাজে সে আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন করবে।

যেহেতু ইবাদত হল, প্রত্যেক সেই প্রকাশ্য ও গুপ্ত কথা ও কাজের ব্যাপক নাম, যা আল্লাহ ভালোবাসেন ও যাতে তিনি তুষ্ট হন।

এই ভিত্তিতে বলা যায়, সলফে সালেহর অনুসরণ করা ওয়াজেব। হওয়ার ব্যাপারে যে সকল নির্দেশিকা আমাদের চোখে (ইতিপুর্বে) পার হয়ে গেছে, তার অনুসরণ যে ব্যক্তি করবে, সে আসলে আল্লাহর নির্দেশের অনুসারী হবে। আর যে আল্লাহর নির্দেশের অনুসারী হবে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসবেন। যেহেতু সে তার শরীয়তের অনুবর্তী।

২। সালাফিয়াত অবলম্বনকারী হিদায়াত (সুপথ) পাবে এবং ভ্রষ্টতা ও বক্রতা থেকে নিরাপত্তা লাভ করবে।

এ বিষয়টিও স্পষ্ট। জাবের ঐ কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বিদায়ী হজ্জে নবী (সা.) বলেছেন,

وَقَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ، كِتَابُ اللهِ

“অবশ্যই আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস ছেড়ে যাচ্ছি; যদি তা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করে থাকো, তবে কখনই তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হল আল্লাহর কিতাব।”[১]

আমি বলি, আল্লাহর কিতাবে কী আছে? তাতে আছে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সলফে সালেহর অনুসরণের আদেশ। যেমন তার প্রমাণসমূহ পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। একই শ্রেণীর আরো প্রমাণ হল, আল্লাহর এই বাণী,

لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا

“তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (আহযাবঃ ২১)।

ইমাম ইবনে কাষীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কথা, কর্ম ও অবস্থাসমূহে তাঁকে নিজের আদর্শ মানার ব্যাপারে এই আয়াতটি বিশাল মৌলনীতি। এই জন্য মহান আল্লাহ মানুষকে আদেশ করেছেন, যাতে তারা খন্দক যুদ্ধের দিন নবী (সা.)-কে তার ধৈর্যধারণে, ধৈর্য ধারণের প্রতিযোগিতায়, (শত্রুর বিরুদ্ধে) সদা প্রস্তুত থাকাতে, তার জিহাদ ও সংগ্রামে এবং নিজ প্রতিপালকের নিকট থেকে বিপদমুক্তির অপেক্ষায় নিজেদের আদর্শ বানায় (এবং তার অনুসরণ করে)।[২]

৩। সালাফিয়াত অবলম্বনকারী নিন্দিত মতানৈক্য ও বিচ্ছিন্নতায় পতিত হওয়া থেকে সুরক্ষিত।

যেহেতু দুই অহী (কুরআন ও হাদীস)এর বাণী---সুপ্রিয় পাঠক--- আমাদেরকে হকের উপর, হকের সাথে ও হকের জন্য ঐক্যবদ্ধ ও সম্মিলিত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

“তোমরা সকলে আল্লাহর রশি (ধর্ম বা কুরআন)কে শক্ত করে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (আলে ইমরান : ১০৩)

তিনি আরো বলেছেন,

وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ * مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا ۖ كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ

“অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না; যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মত সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত। (রূমঃ ৩১-৩২)

পূর্বোক্ত ইরবায ইবনে সারিয়াহ (রাঃ) এর হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

وإنه من يعش منكم فسيرى اختلاف كثير

“(স্মরণ রাখ) তোমাদের মধ্যে যে আমার পর জীবিত থাকবে, সে অনেক মতভেদ বা অনৈক্য দেখবে।”

এ কথা শুনে যেন তারা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রসূল! বাচার পথ কী? পরিত্রাণের উপায় কী? উত্তরে তিনি বললেন, (فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيينَ) “তোমরা আমার সুন্নত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের রীতিকে আঁকড়ে ধরবে এবং তা দাঁত দিয়ে মজবুত করে ধরে থাকবে।---”

হাদীসটির কিয়দংশ এই বকতময় দাওয়াতের লক্ষণ ও চিহ্ন’ নিয়ে আলোচনা পর্বে বিইযনিল্লাহ উল্লিখিত হবে।

ইমাম বাগবী শারহুস সুন্নাহ’ (১/২০৬)তে উক্ত ইরবায (রাঃ)-এর হাদীসের টীকায় বলেছেন, 'এতে বিদআত ও খেয়ালখুশির বহিঃপ্রকাশ। ঘটার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। আর আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। তাই তিনি তাঁর সুন্নাত ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত অবলম্বন করতে, ঐকান্তিকভাবে সর্বাত্মক প্রচেষ্টার সাথে তা আঁকড়ে ধরতে এবং তার পরীপন্থী নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।

৪। শয়তানের পথরাজি থেকে নিষ্কৃতি।

ইমাম মুহাম্মাদ বিন নাত্র আল-মিরওয়াযী ‘সুন্নাহ’ গ্রন্থের (৯পৃঃ)তে বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَأَنَّ هَٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ

“নিশ্চয়ই এটি আমার সরল পথ। সুতরাং এরই অনুসরণ কর এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করো না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।” (আনআমঃ ১৫৩)

সুতরাং আল্লাহ আমাদেরকে অবহিত করেছেন যে, তার পথ হল একক ও সরল। আরও পথ আছে অনেক। যে ব্যক্তি সে পথরাজির। অনুসরণ করবে, তা তাকে তার সরল পথ থেকে বাধাপ্রাপ্ত করবে। অতঃপর নবী (সা.) আমাদের জন্য তাঁর সুন্নাহ দিয়ে তা বিস্তৃত করেছেন।

এর পর তিনি সনদসহ আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)-এর হাদীস উল্লেখ করেছেন। যা ইমাম আহমাদ প্রমুখের গ্রন্থেও আছে। আর তা সহীহ হাদীস। (আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন,)

خَطَّ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَطًّا . ثُمَّ قَالَ : " هَذَا سَبِيلُ اللَّهِ " ثُمَّ خَطَّ خُطُوطًا عَنْ يَمِينِهِ وَعَنْ شِمَالِهِ وَقَالَ : هَذِهِ سُبُلٌ عَلَى كُلِّ سَبِيلٍ مِنْهَا شَيْطَانٌ يَدْعُو إِلَيْهِ، وَقَرَأَ : وَأَنَّ هَٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ

রসূল (সা.) আমাদের জন্য স্বহস্তে একটি রেখা টানলেন। অতঃপর তিনি বললেন, “এটি আল্লাহর সরল পথ।” অতঃপর ঐ রেখার ডানে ও বামে কতকগুলি রেখা টেনে বললেন, “এগুলি বিভিন্ন পথ। এই পথগুলির প্রত্যেটির উপর একটি করে শয়তান আছে; যে ঐ পথের প্রতি মানুষকে আহ্বান করে।” অতঃপর তিনি আল্লাহ তাআলার এই বাণী পাঠ করলেন---যার অর্থ, “নিশ্চয় এটি আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ কর এবং বিভিন্ন পথের অনুসরণ করো না। করলে তা তোমাদেরকে তার পথ হতে বিচ্ছিন্ন করবে।” (সুরা আনআম ১৫৩ আয়াত)।

অতঃপর তিনি উক্ত হাদীসের কতিপয় সূত্র উল্লেখ করেছেন। তারপর বলেছেন, সুতরাং আল্লাহ অতঃপর তার রসূল (সা.) আমাদেরকে নব রচিত কর্মাবলী এবং মনের খেয়ালখুশির অনুসরণ থেকে সতর্ক করেছেন, যা আল্লাহর নির্দেশ ও তাঁর নবীর তরীকা অনুসরণ করা থেকে বাধাপ্রাপ্ত করে।

উক্ত হাদীস থেকে স্পষ্টতঃ বোঝা যায় যে, যে ব্যক্তি নবুঅতের আদর্শের অনুবর্তী হবে, সে ব্যক্তি শয়তানের পথসমূহের এবং তার ভ্ৰষ্টকারী রাস্তাসমূহের ফাদে ফেঁসে যাওয়া হতে নিরাপত্তা লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি মু'মিনদের পথ এড়িয়ে চলবে, সে ব্যক্তি শয়তানের রশিতে আবদ্ধ হয়ে যাবে। নাউযু বিল্লাহি মিন যালিক।

ইমাম ইবনুল কাইয়ুম ‘আল-ফাওয়াইদ’ গ্রন্থে (৪৭পৃঃ)তে বলেছেন, 'যখন লোকেরা কিতাব ও সুন্নাহকে জীবন-সংবিধান বানানো হতে এবং উভয়ের কাছে বিচার-ফায়সালা নিতে বিমুখ হল, তা যথেষ্ট নয়---এই ধারণা করল এবং রায়, কিয়াস, ইস্তিহসান (ভালো মনে করে করা কর্ম) ও বুযুর্গদের উক্তির দিকে ফিরে গেল, তখন এর ফলে তাদের প্রকৃতিতে বিকৃতি, তাদের হৃদয়ে অন্ধকার, তাদের বুঝে আবিলতা এবং তাদের বিবেক-বুদ্ধিতে বিলুপ্তি প্রকাশ পেল। তাদের মাঝে এ সকল বিপত্তি ব্যাপক আকার ধারণ করল। তাদের ওপর এমন। আধিপত্য লাভ করল যে, তারই মাঝে ছােট বড় হল এবং বড় বুড়ো হল। যার ফলে তারা সেগুলিকে আপত্তিকর মনেই করল না।

অতঃপর তাদের ওপর এল অন্য এক সাম্রাজ্য। যাতে সুন্নাহর জায়গায় বিদআত বিবেক-বুদ্ধির জায়গায় মনমানি, বুদ্ধিমত্তার জায়গায় খেয়ালখুশি, হিদায়াতের জায়গায় ভ্রষ্টতা, সৎকর্মের জায়গায় অসৎকর্ম, জ্ঞানের জায়গায় অজ্ঞতা, ইখলাসের জায়গায় রিয়া (লোকপ্রদর্শন), হকের জায়গায় বাতিল, সত্যের জায়গায় মিথ্যা, উপদেশের জায়গায়। চাটুকারিতা এবং ন্যায়ের জায়গায় অন্যায় দখল গ্রহণ করল। অনিবার্যরূপে এ সকল বিষয়ের জন্য সাম্রাজ্য ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠালাভ করল এবং তার অধিবাসীরাই হল বিখ্যাত। অথচ ইতিপূর্বে উক্ত সকল বিষয় ছিল তার বিপরীতের জায়গায়। আর তার অধিবাসীরাই ছিল বিখ্যাত।

সুতরাং যখন তুমি দেখবে যে, উক্ত সকল বিষয়ের সাম্রাজ্য আগত হয়েছে, তার পতাকা স্থাপিত হয়েছে এবং তার সৈন্যদল সওয়ারী গ্রহণ করেছে, তখন (তোমার জন্য) আল্লাহর কসম---মাটির উপরের অংশের চাইতে ভিতরের অংশই শ্রেষ্ঠ (বেঁচে থাকার চাইতে মরে যাওয়া ভালো), সমভূমি চাইতে পর্বত-চূড়াই শ্রেষ্ঠ এবং মানুষের সংসর্গে থাকার চাইতে হিংস্র প্রাণীদের সংসর্গে থাকাটাই বেশি। নিরাপদ।

৫। সালাফিয়াত অবলম্বকারীর জন্য রয়েছে তার অনুগামীরও সওয়াব।

যেহেতু ইমাম মুসলিম জারীর বিন আব্দুল্লাহ কর্তৃক হাদীস বর্ণিত করেছেন,

من سن في الإسلام سنة حسنة فله أجرها وأجر من عمل بها من بعده من غير أن ينقص من أجورهم شيء

“যে ব্যক্তি ইসলামে ভাল রীতি চালু করবে, সে তার নিজের এবং ঐ সমস্ত লোকের সওয়াব পাবে, যারা তার (মৃত্যুর পর তার উপর আমল করবে। তাদের সওয়াবের কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।” (সহীহ মুসলিম ২৩১৮নং)

এই হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ এ কথারই দলীল যে, সে ব্যক্তি বিশাল সওয়াবের অধিকারী হবে, যে ব্যক্তি নবী ৪জি ও তাঁর সাহাবাবঞ্জ -এর আদর্শ এবং উম্মতের সলফে সালেহর আদর্শকে জীবিত করবে। লোকেদের মাঝে তা প্রচার করবে এবং অন্যেরা তার অনুসরণ করবে। সে তার সওয়াব পাবে, যে তার উপর আমল করবে এবং তাদের সওয়াবের কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।

হাফ্যে নাওয়াবী শারহু মুসলিম গ্রন্থে (৭/১০৪)এ বলেছেন, 'এই হাদীসে কল্যাণময় কর্ম শুরু করা এবং ভালো রীতি চালু করায় উৎসাহ প্রদান রয়েছে। আর অসার ও জঘন্য কর্ম উদ্ভাবন করার ব্যাপারে সতর্কীকরণ রয়েছে।

৬। সালাফিয়াত অবলম্বনকারী ইহ-পরকালে সুখী।

এই সুখের কারণ হল, সালাফী মহান আল্লাহ ও তাঁর রসূল ৫-এর নির্দেশ পালনকারী। পক্ষান্তরে নির্দেশ থেকে বিমুখ ব্যক্তি সুখী নয়। তার ব্যাপারে ধমক দিয়ে বলা হয়েছে,

وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ

“যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, অবশ্যই তার হবে সংকীর্ণতাময় জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।” (ত্বা-হাঃ ১২৪)।

তাহলে সালাফিয়াত অবলম্বনকারী বিমুখ অথবা অনুসারী? সালাফিয়াত অবলম্বনকারী অনুসারী, বিমুখ নয়। যেহেতু সে নিজ প্রতিপালককে স্মরণকারী, তার নবী ৪-কে অনুসরণকারী। সুতরাং সে হল স্থায়ী নিয়ামত ও ব্যাপক সওয়াবের জন্য প্রতিশ্রুত। মহান আল্লাহ বলেছেন,

تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ ۚ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ وَذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

“এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। আর যে আল্লাহ ও রসূলের অনুগত হয়ে চলবে, আল্লাহ তাকে বেহেস্তে স্থান দান করবেন; যার নীচে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং এ মহা সাফল্য।” (নিসাঃ ১৩)

তিনি আরো বলেছেন,

فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا

“যদি কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তাহলে সে বিষয়কে আল্লাহ ও রসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। এটিই হল উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর।” (নিসাঃ ৫৯) ।

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) আর-রিসালাতুত তাবুকিয়্যাহ’ (পুস্তিকার ৭৫-৭৬পৃষ্ঠায়) উক্ত আয়াতের পাদটীকায় বলেছেন, 'এ বাণী এই কথার দলীল যে, আল্লাহর আনুগত্য, তার রসূল -এর আনুগত্য এবং আল্লাহ ও তার রসূলকে বিচারক মান্য করা হল বিলম্বে ও অবিলম্বের সুখ লাভের হেতু। যে ব্যক্তি বিশ্বসংসার ও তার মাঝে সংঘটিত মন্দসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে, সে জানতে পারবে যে, প্রত্যেক মন্দের কারণ হল, রসুল (সা.)-এর বিরুদ্ধাচরণ করা এবং তার আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়া। পক্ষান্তরে ইহকালের প্রত্যেক কল্যাণের কারণ হল, নবী (সা.)-এর আনুগত্য। অনুরূপ পরকালের অকল্যাণসমূহ, তার কষ্টরাজি ও শাস্তিসমূহের মৌলিক কারণ হল নবী (সা.)-এর বিরুদ্ধাচরণ।

বলা বাহুল্য, দুনিয়া ও আখেরাতের অকল্যাণের মূল উৎস হল নবী (সা.)-এর বিরুদ্ধাচরণ এবং তার সন্নিবিষ্ট পরিণতি।

সুতরাং মানুষ যদি রসূল (সা.)-এর যথাযথরূপে আনুগত্য করত, তাহলে পৃথিবীতে কোন মন্দ ও অকল্যাণই সংঘটিত হতো না। এটা যেরূপ সাধারণ অমঙ্গল ও পৃথিবীতে আপতিত বিপদাপদের ক্ষেত্রে সর্ববিদিত, অনুরূপই তা বান্দার নিজ দেহ-মনে যে অমঙ্গল, কষ্ট ও দুঃখ-দুশ্চিন্তা আপতিত হয়, তার ক্ষেত্রেও। এ সকল কিছুর কারণ হল রসূল (সা.)-এর বিরুদ্ধাচরণ। আর যেহেতু তার আনুগত্য সেই দুর্গ, যাতে প্রবেশকারী নিরাপত্তা লাভ করে এবং সেই গুহা, যাতে আশ্রয়প্রার্থী পরিত্রাণ লাভ করে, সেহেতু জানা গেল যে, দুনিয়া ও আখেরাতের অমঙ্গলের একমাত্র কারণ হল নবী (সা.)-এর আনীত বিষয় সম্বন্ধে অজ্ঞতা এবং সে বিষয় থেকে বাইরে অবস্থান করা। এ হল এ কথারই অকাট্য প্রমাণ যে, নবী -এর আনীত বিষয়কে ইলম হিসাবে জ্ঞান রাখা এবং আমল হিসাবে পরিণত করা ছাড়া বান্দার কোন পরিত্রাণ ও কোন সুখ নেই।

* একটি সতর্কতা

এ স্থলে সতর্ক মানুষকে একটি সতর্কবার্তা ও উপদেশ দেওয়া বাঞ্ছনীয়। আর উপদেশ মুমিনের জন্য উপকারী।

যারা নিজেদেরকে ‘সালাফী’ বলে দাবী করে, তাদের প্রত্যেকেই যে নিজের দাবীতে সত্যবাদী হবে, তা নয়। আর সুপ্রিয় পাঠক! এ কথা কঠিনীকরণের অন্তর্ভুক্ত নয়। কক্ষনো নয় আল্লাহর কসম! বরং উক্ত দাবীর সপক্ষে দলীল থাকা আবশ্যক। আমল থেকে প্রমাণ থাকা জরুরী, যা এই বিশাল মর্যাদাপূর্ণ (সালাফী) শব্দটি সার্থক বোঝা যায়। সরল রাজপথের একনিষ্ঠ পথিক হিসাবে প্রমাণ থাকা আবশ্যক। নচেৎ আমরা এমন অনেকের ব্যাপারে পড়ি ও শুনি, যারা এই সালাফিয়্যাহর সাথে মিথ্যার আশ্রয় ও ছদ্মবেশ নিয়ে নিজেদের সম্পর্ক জোড়ে, অথচ তারা তরীকা ও মানহাজে (পদ্ধতি ও আদর্শে) এবং মৌলিক ও গৌণ বিষয়ে তার বিপরীত! (এরা ‘চোরের নৌকায় সাধুর নিশান’ ব্যবহার করে।)

একটি অবাক কান্ড এই যে, কিছু রটনাকারী এই মর্যাদাপূর্ণ নামের সাথে কতিপয় বিভ্রান্তিকর বিকৃত নাম প্রয়োগ করে থাকে। যেমন : জিহাদী সালাফী, ইলমী সালাফী, দাওয়াত ও কিতালের সালাফী জামাআত ইত্যাদি। যার মাঝে রয়েছে খেয়ালখুশীর পূজারী ও বিদআতীদের পদচিহ্নের হুবহু অনুগমন।

ইমাম হাসান বসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'হে আদম-সন্তান! তুমি তার কথায় ধোকা খেয়ো না, যে বলে, “মানুষ যাকে ভালোবাসে, (কিয়ামতে) সে তার সঙ্গী হবে।”[৩]

নিঃসন্দেহে যে ব্যক্তি যে জাতিকে ভালোবাসবে, সে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। তুমি কক্ষনোই পুণ্যবানদের সাথে মিলিত হতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, তাদের আদর্শ গ্রহণ করবে, তাদের তরীকার অনুগামী হবে, তাদের আদর্শ অনু্যায়ী তোমার সকাল-সন্ধ্যা হবে, এই আগ্রহে যে, তুমি তাদের দলভুক্ত হবে। সুতরাং তুমি তাদের পথের পথিক হবে, তাদের তরীকা গ্রহণ করবে; যদিও আমলে তুমি পিছিয়ে থাকো। যেহেতু মূল বিষয়টি হল, সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকা।

তুমি কি ইয়াহুদী-খ্রিস্টান ও সর্বনাশী খেয়ালখুশীর পূজারীদের অবস্থা লক্ষ্য করনি, যারা তাদের নবীদেরকে ভালোবাসে? ইয়াহুদী-খ্রিস্টান এবং অনুরূপ খেয়ালখুশীর পূজারীরা কি তাদের নবীদের ভালোবাসার দাবী করে না? অথচ তারা তাদের সাথী হতে পারবে না। যেহেতু তারা তাদের কথা ও কাজে তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে। তারা তাদের পথ ছেড়ে ভিন্ন পথে চলে থাকে। সুতরাং তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। নাউযু বিল্লাহি মিন যালিক।[৪]

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'যখন ভালোবাসার দাবীদার বেশি হতে লাগল, তখন দাবীর সত্যতার সপক্ষে প্রমাণ চাওয়া হল। নচেৎ লোকেদেরকে যদি নিজ নিজ দাবী অনুযায়ী প্রদান করা হয়, তাহলে তো নিশ্চিন্ত ব্যক্তি দুশ্চিন্তাগ্রস্তের অন্তর্জালা হওয়ার কথা দাবী করবে। বলা বাহুল্য, আপাতদৃষ্টিতে (ভালোবাসার) দাবীদার ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়েছে। তাই বলা হল, ‘প্রমাণ ছাড়া এ দাবী গ্রহণযোগ্য নয়।

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ

“বল, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ কর।” (আলে ইমরানঃ ৩১)

তখন সারা সৃষ্টি পিছিয়ে গেল! কেবল অবিচল থাকল কথা, কর্ম ও চরিত্রে প্রিয় হাবীব (সা.) এর অনুসারিগণ।[৫]

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) স্বাওনুল মানত্বিকৃ’ (গ্রন্থের ১৫৮পৃষ্ঠায়) উল্লেখ করেছেন, ইমাম আবুল মুযাফফার সামআনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'আমরা অনুসরণ করতে আদিষ্ট ও আহত হয়েছি এবং বিদআত হতে আমাদেরকে নিষেধ ও তিরস্কার করা হয়েছে। সুতরাং আহলুস সুন্নাহর প্রতীক হল, সলফে সালেহর অনুসরণ করা এবং প্রত্যেক নব উদ্ভূত ও বিদআতকে বর্জন করা।

সুতরাং যারা (নিজেদের পরিচিতির কোন) প্রতীক (বা নিশান) তুলে ধরে, তাদের প্রত্যেকেই যে সত্যবাদী, তা নয়।

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'আহলে হাদীস বলতে আমাদের উদ্দেশ্য তারা নন, যারা কেবল হাদীস শ্রবণ, লিখন ও বর্ণনের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেন। বরং আমাদের উদ্দেশ্য হল প্রত্যেক সেই ব্যক্তি, যিনি বেশি যত্নের সাথে হাদীস হিফ্য করবেন, চিনবেন, বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিকভাবে বুঝবেন এবং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিকভাবে অনুসরণ করবেন।”[৬]

* প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য (প্রসঙ্গক্রমে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। সম্ভবতঃ আপনারা জানেন, এই বৰ্কতময় শহর (মক্কা মুকারামা) শারাফাহাল্লাহতে ১৪০০ হিজরীর প্রারম্ভে কী ঘটেছিল? একটি বিদ্রোহী ফির্কা আল্লাহর ঘর পবিত্র মাসজিদুল কা’বার ‘হারাম’কে কয়েক দিনের জন্য হালাল করে নিয়েছিল! এই ফির্কাও মিথ্যা ও অসত্য দাবী করে নিজেদেরকে “সালাফী’ পরিচয় দিয়েছিল!!

এ ব্যপারে আমাদের শায়খ আল্লামা মুহাম্মাদ আমান (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল-জামিআতুল ইসলামিয়্যাহ’ পত্রিকায় [৭] অনেক কিছু লিখেছিলেন। তখন তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। একটি লেখায় তিনি বলেছিলেন, উক্ত ঘটনার পর প্রথম আযানকে ফিতনার সমাপ্তি ঘোষণা গণ্য করা হল, যা ছিল বিষাদ, দুশ্চিন্তা ও দুঃখে পরিপূর্ণ। এ সবের পরিবর্তে জায়গা নিল খুশি ও আনন্দ। আল্লাহর নিয়ামত লাভের খুশি। নির্বোধ জুহাইমানীদের দুষ্কর্মের ফলে আপতিত অপবিত্রতা থেকে পবিত্র মসজিদকে পবিত্র করার সক্ষমতার নিয়ামত।

* এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য উক্ত শিশু প্রকৃতির নির্বোধেরা নিজেদেরকে “সালাফী’ বলে পরিচয় দিয়েছিল---যেমনটি আমার কাছে খবর পৌঁছেছিল। তাদের মুখনিঃসৃত বাক্য কি সাংঘাতিক! তারা তো শুধু মিথ্যাই বলে।

পক্ষান্তরে এই (সালাফী) নামে নিজেদেরকে পরিচয় দেওয়ার কারণ দুটির মধ্যে একটি হতে পারেঃ

১। হয় তারা সালাফিয়্যাহর সঠিক অর্থ জানে না। সে ক্ষেত্রে তাদের এ নাম ব্যবহার করা অজ্ঞতার কারণে হবে। সে অজ্ঞতা জেনেও না জানার ভান করে হতে পারে।

২। না হয় তাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রতারণা ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচার। সতরাং তাদের এই ব্যবহার ছিল উক্ত প্রিয় নামকে বিকৃত করার নিকষ্ট ইচ্ছার ফলস্বরূপ। যে নামের অর্থই হল এই উম্মতের প্রথম অগ্রগামী দল এবং যারা তাদের পথের পথিক।

সম্মানিত পাঠকের জেনে রাখা দরকার যে, জুহাইমানীরা ‘সালাফী নয়। তারা দাওয়াতের উপযুক্তও নয়। আসলে তারা নকল সালাফী, সালাফিয়্যাতের দাবীদার এবং ইসলামের দাওয়াত দেয় এমন ধারণাকারী। অথচ তারা নিজেরাই মূল ইসলাম থেকেই বহু দূরে, তার দিকে দাওয়াত দেওয়া তো দূরের কথা।

[১]. সহীহ মুসলিম ৩০০৯নং

[২]. তফসীর ইবনে কাসীর ৩/৪৭৫

[৩]. এটি বুখারী-মুসলিমের হাদীসের একটি অংশ। কিন্তু কিছু লোক এটিকে তাদের দলীল ধারণা করে। অথচ সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা, কর্ম, বরং খোজ নিয়ে দেখলে---তাঁর আকীদারও বিরোধী। আর এটাই হল ইমাম হাসান (রাহিমাহুল্লাহ)র উদ্দেশ্য।

[৪]. শারহু মুসনাদি সুলামিয়াতিল ইমাম আহমাদ ১/৬১৭

[৫]. মাদারিজুস সালিকীন ৩/৮

[৬]. মাজমুউ ফাতাওয়া ৪/৯৫, আরো দ্রঃ লাওয়ামিউল আনওয়ার, সাফারীনী ১/৬৪

[৭]. সংখ্যা ৪৫, বছর ১২/১৪০০হিঃ
সালাফী মানহাজের (মতাদর্শের) চিহ্ন ও পথ-নির্দেশিকা

ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, সালাফিয়াত হল সরল পথ। যে তার পথিক হয়, সে পরিত্রাণ পায়। আর যে তা বর্জন করে, সে ভ্রষ্ট ও পথচ্যুত হয়। নাউযু বিল্লাহি মিন যালিক। এই জন্য এই বৰ্কতময় মানহাজ ও বৰ্কতময় দাওয়াতের সুস্পষ্ট বহু বৈশিষ্ট্য ও নিদর্শন। রয়েছে। যা সংক্ষেপে নবী (সা.) ও তার পরে তাঁর সাহাবাবর্গের দাওয়াত ও মানহাজের চিহ্ন ও পথ-নির্দেশিকা; এর অন্যথা নয়।

বলা বাহুল্য সেই মানহাজ অথবা সালাফী দাওয়াতের কতিপয় চিহ্ন ও পথ-নির্দেশিকা নিম্নরূপ

১। মহান আল্লাহর জন্যই ইবাদত বাস্তবায়ন করা।

২। এককভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্যই অনুসরণ বাস্তবায়ন করা।

৩। শরয়ী দলীলসমূহ (কুরআন-হাদীস) বোঝার ক্ষেত্রে সলফে সালেহর বুঝকে অবলম্বন করা এবং এথেকে বের হয়ে না যাওয়া।

৪। বিদআত ও বিদআতী সম্পর্কে সতর্ক হওয়া ও সতর্ক করা।

৫। অতিরঞ্জন ও অবহেলার মাঝে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা।

৬। হক ও ন্যায়ের উপর অবিচল থাকা।

৭। সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করায় আগ্রহী হওয়া।

৮। বিচ্ছিন্নতা ও মতবিরোধকে ছুঁড়ে ফেলা।

৯। উপকারী ইলম অর্জন করা, তা মানুষের মাঝে প্রচার করা এবং তার দিকে দাওয়াত দেওয়া। আর সেই সাথে এ কাজে আসা কষ্টের উপর ধৈর্যধারণ করা।

১০। ইলম অনুযায়ী আমল করা। সুপ্রিয় পাঠক! উক্ত সকল আলামতের বহু দলীল আছে। যিনি দুই অহীর বাণী ও নবী (সা.) এর জীবনচরিত নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেন, তিনি প্রাপ্ত হবেন।

উক্ত আলামতগুলির সপক্ষে ব্যাপক দলীলসমূহের মধ্যে একটি বিশাল গুরুত্বপূর্ণ হাদীস হল ইরবায বিন সারিয়াহ (রাঃ)-এর হাদীস। যা ইতিপূর্বে আমাদের আলোচনায় একাধিকবার উল্লিখিত হয়েছে। তা আবারও পুনরুক্ত হচ্ছে, যেহেতু তা বড় ফলদায়ী। ইরবায ইবনে সারিয়াহ (রাঃ) বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ , আমাদেরকে এমন মর্মস্পর্শী বক্তৃতা শুনালেন যে, তাতে অন্তর ভীত হল এবং চোখ দিয়ে অশ্রু বয়ে গেল। সুতরাং আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল! এ যেন বিদায়ী ভাষণ মনে হচ্ছে। তাই আপনি আমাদেরকে অন্তিম উপদেশ দিন। তিনি বললেন,

‏أوصيكم بتقوى الله ، والسمع والطاعة وإن تأمر عليكم عبد حبشي، وإنه من يعش منكم فسيرى اختلافاً كثيراً‏.‏ فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين، عضوا عليها بالنواجذ، وإياكم ومحدثات الأمور فإن كل بدعة ضلالة‏

“আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতি এবং (রাষ্ট্রনেতার) কথা শোনার ও তার আনুগত্য করার উপদেশ দিচ্ছি, যদিও তোমাদের উপর কোন নিগ্রো (আফ্রিকার কৃষ্ণকায় অধিবাসী) রাষ্ট্রনেতা হয়। (স্মরণ রাখ) তোমাদের মধ্যে যে আমার পর জীবিত থাকবে, সে অনেক মতভেদ বা অনৈক্য দেখবে। সুতরাং তোমরা আমার সুন্নত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের রীতিকে আঁকড়ে ধরবে এবং তা দাঁত দিয়ে মজবুত করে। ধরে থাকবে। আর তোমরা দ্বীনে নব উদ্ভাবিত কর্মসমুহ (বিদআত) থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” (আবু দাউদ ৪৬০ ১, তিরমিযী ২৬৭৬, ইবনে মাজাহ ৪২নং)

আর নাসাঈর এক বর্ণনায় আছে, আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতা জাহান্নামে। (নিয়ে যায়)।”

প্রিয় পাঠক! বারাকাল্লাহু ফীক। আমার সাথে প্রণিধান করুন, এই ব্যাপক হাদীসটিতে উক্ত সালাফী মানহাজের আলামত ও পথনির্দেশিকা স্পষ্টকারী কত উপকারিতা রয়েছে।

এতে রয়েছেঃ মহান আল্লাহর তাকওয়া (ভয়-ভীতি) অবলম্বন। করার অসিয়ত। আর তার পালনে রয়েছে মহান আল্লাহর জন্য ইবাদত (পূর্ণ দাসত্ব) বাস্তবায়ন। এতে রয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অবলম্বন করার অসিয়ত ও আদেশ। যার পালনে রয়েছে এককভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্যই অনুসরণ বাস্তবায়ন।

এতে রয়েছেঃ খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাহ অবলম্বন করার অসিয়ত ও আদেশ। যার পালনে রয়েছে সলফে সালেহর বুঝকে অবলম্বন করার পদ্ধতি বাস্তবায়ন।

এতে রয়েছেঃ বিদআত থেকে সতর্কীকরণ। যার পালনে রয়েছে। বিদআত ও বিদআতী সম্পর্কে সতর্ক হওয়া ও সতর্ক করার নির্দেশ বাস্তবায়ন।

এতে আরো রয়েছেঃ যে ব্যক্তি সলফের বুঝে সুন্নাহ অবলম্বন করবে, সে মধ্যপন্থা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে। যার প্রকৃতত্ব হল অতিরঞ্জন ও অবজ্ঞার মাঝামাঝি। দুই বিপরীতধর্মী আচরণের মধ্যস্থলে।

এতে আরো রয়েছে ও নিন্দনীয় বিচ্ছিন্নতা ও মতবিরোধ থেকে সতর্কীকরণ। বলা হয়েছে, “সে অনেক মতভেদ বা অনৈক্য দেখবে।” আর যে সুন্নাহ অবলম্বন করবে, সে অনেক মতবিরোধ থেকে নিরাপত্তা লাভ করবে।

এই নববী নিদের্শনার স্পষ্ট উক্তি ও তার অন্তর্নিহিত উদঘাটিত ব্যাখ্যায় যা সন্নিবিষ্ট রয়েছে, তা হল এই যে, হকের মাধ্যমে হকের উপরে হকের জন্য সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করতে হবে। যেহেতু তিনি বলেছেন, “তোমরা আমার সুন্নত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের রীতিকে আঁকড়ে ধরবে এবং তা দাঁত দিয়ে মজবুত করে ধরে থাকবে।”

আর স্পষ্ট বিদিত কথা যে, উপকারী শরয়ী ইলম ছাড়া উক্ত অর্থসমূহকে আমলী রূপ দেওয়া ও উক্ত আলামতসমূহ প্রকাশ পাওয়া সম্ভব নয়। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'কল্যাণ, সুখ, সংশুদ্ধি ও পূর্ণতা দুটির মাঝে সীমাবদ্ধঃ উপকারী ইলম ও নেক আমল।[১]

উক্ত আলামতসমূহের সবগুলির অথবা কিছুর আরো দলীল নিম্নরূপঃ

১। মহান আল্লাহ তার মজবুত রশি ধারণ করার আদেশ দিতে এবং তা বর্জন করায় সতর্ক করতে গিয়ে বলেছেন,

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

“তোমরা সকলে আল্লাহর রশি (ধর্ম বা কুরআন)কে শক্ত করে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (আলে ইমরান : ১০৩)

مُنِيبِينَ إِلَيْهِ وَاتَّقُوهُ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ * مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا ۖ كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ

“তোমরা বিশুদ্ধ-চিত্তে তার অভিমুখী হও; তাকে ভয় কর। যথাযথভাবে নামায পড় এবং অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মত সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে; প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত।” (রূমঃ ৩১-৩২)

وَأَنَّ هَٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

“নিশ্চয়ই এটি আমার সরল পথ। সুতরাং এরই অনুসরণ কর এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করো না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা সাবধান হও।” (আনআমঃ ১৫৩)।

তিনি আরো বলেছেন,

إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ ۚ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

“অবশ্যই যারা দ্বীন সম্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তাদের বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। তিনিই তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে। তাদেরকে অবহিত করবেন।” (আনআমঃ ১৫৯)

এ মর্মে আরো অনেক আয়াত রয়েছে। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, 'তোমরা জানো যে, বিশাল (গুরুত্বপূর্ণ) মৌলনীতি, যা দ্বীনের ব্যাপকতার অন্তর্ভুক্ত, তা হল পরস্পরের হৃদয়ের মধ্যে প্রীতি স্থাপন, একতা ও পারস্পরিক সদ্ভাব প্রতিষ্ঠা।

অতঃপর তিনি কতিপয় আয়াত উল্লেখ করেছেন। তারপর বলেছেন, ‘অনুরূপ আরো (কুরআনের) স্পষ্ট উক্তি, যা জামাআত ও ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করতে আদেশ এবং বিচ্ছিন্নতা ও মতবিরোধ করতে নিষেধ করে। আর এই মৌলনীতি-ওয়ালা হল আহলুল জামাআহ (জামাআত-ওয়ালা)। যেমন এই নীতি থেকে যারা বের হয়ে যায়, তারা হল আহলুল ফুরক্বাহ (বিচ্ছিন্নতাবাদী)।[২]

তিনি অন্য এক জায়গায় বলেছেন, 'এই জন্য ফিকাহ নাজিয়াহর গুণ বর্ণনায় বলা হয়েছে, তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ। আর তারা হল বৃহত্তম জনগোষ্ঠী। পক্ষান্তরে অবশিষ্ট ফিকাসমূহ বিরলপন্থী, বিচ্ছিন্নতাবাদী, বিদআতী ও খেয়ালখুশীর পূজারী। ওদের নির্দিষ্ট ফির্কা ফিকাহ নাজিয়াহর নিকটবর্তী স্থানে পৌঁছতে সক্ষম নয়, তার সমান হওয়া তো দুরের কথা। বরং ওদের নির্দিষ্ট ফির্কা নেহাতই সংখ্যালঘ। হতে পারে। আর ঐ সকল ফির্কার প্রতীক বা নিশান হল, কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমা থেকে দূরে সরে যাওয়া।[৩]

২। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল (সা.) বলেছেন,

إنَّ اللَّهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلاثًا، ويَكْرَهُ لَكُمْ ثَلاثًا، فَيَرْضَى لَكُمْ: أنْ تَعْبُدُوهُ، ولا تُشْرِكُوا به شيئًا، وأَنْ تَعْتَصِمُوا بحَبْلِ اللهِ جَمِيعًا ولا تَفَرَّقُوا، ويَكْرَهُ لَكُمْ: قيلَ وقالَ، وكَثْرَةَ السُّؤالِ، وإضاعَةِ المالِ

“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য ৩টি কাজ পছন্দ করেন এবং ৩টি কাজ অপছন্দ করেন। তিনি তোমাদের জন্য এই পছন্দ করেন যে, তোমরা তাঁর ইবাদত কর এবং তার সাথে অন্য কিছুকে শরীক করো না, সকলে একতাবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রশি (কুরআন বা দ্বীন)কে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং আল্লাহ তোমাদের উপর যাকে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন তার আনুগত্য কর। আর তিনি তোমাদের জন্য ভিত্তিহীন বাজে কথা বলা (বা জনরবে থাকা), অধিক (অনাবশ্যক) প্রশ্ন করা (অথবা প্রয়োজনের অধিক যা করা) এবং ধন-মাল বিনষ্ট (অপচয়) করাকে অপছন্দ করেন।” (মুসলিম ৪৫৭৮নং)

ইমাম আহমাদের বর্ণনায় কিছু অতিরিক্ত শব্দ এসেছে,

وأن تناصحوا من ولاه الله أمركم

“আর আল্লাহ যাকে তোমাদের রাষ্ট্রনেতা বানিয়েছেন, তার শুভাকাঙ্ক্ষী হও।” (আহমাদ ৮৭৯৯নং)

ইমাম ইবনে আব্দুল বারী (রাহিমাহুল্লাহ) তামহীদ গ্রন্থে (২ ১/২৭২) এ উক্ত হাদীসের নিমে বলেছেন, 'এতে রয়েছে সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় আল্লাহর রশিকে মজবুত সহকারে ধারণ করার প্রতি উৎসাহদান। এ স্থলে আল্লাহর রশির অর্থে দুটি উক্তি আছে, প্রথম হল ঃ আল্লাহর কিতাব। এবং দ্বিতীয় হল ও জামাআত। আর ইমাম (রাষ্ট্রনেতা) ছাড়া জামাআত হয় না। আমার কাছে এর। (উভয়) অর্থ অন্তঃপ্রবিষ্ট ও কাছাকাছি। যেহেতু আল্লাহর কিতাব ঐক্যের আদেশ দেয় এবং বিচ্ছিন্নতা থেকে নিষেধ করে। অতঃপর তিনি পুর্বোক্ত কিছু আয়াত উল্লেখ করেছেন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) মিনহাজুস সুন্নাহ। (৫/ ১৩৪)এ ‘আল্লাহর রশি’র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, তাঁর রশির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তার কিতাব, তার দ্বীন, ইসলাম, ইখলাস, তাঁর আদেশ, তার অঙ্গীকার, তার আনুগত্য ও জামাআত। এ সকল ব্যাখ্যা সাহাবা ও তাবেঈন কর্তৃক বর্ণিত। এর প্রত্যেকটি ব্যাখ্যাই শুদ্ধ। যেহেতু কুরআন দ্বীনে ইসলাম অবলম্বন করার আদেশ দেয়। আর তা হল তার অঙ্গীকার, আদেশ ও আনুগত্য। সম্মিলিতভাবে মজবুত সহকারে তা ধারণ করা সম্ভব হবে কেবল জামাআতের মাধ্যমেই। পরন্তু দ্বীনে ইসলামের প্রকৃতত্ব হল আল্লাহর জন্য ইখলাস (একনিষ্ঠ, বিশুদ্ধচিত্ত ও অকপট হওয়া)।

ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত হাদীসের নিয়ে বলেছেন, মানুষের দ্বীন ও দুনিয়ায় ত্রুটি ঘটার একমাত্র কারণ হল উক্ত তিন আদেশ অথবা তার কিছু লঙ্ঘন করা।”[৪]

৩। সূরা ফাতিহায় মহান আল্লাহর বাণী,

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ * صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ

“আমাদেরকে সরল পথ দেখাও, তাদের পথ --যাদেরকে তুমি নিয়ামত দান করেছ। তাদের পথ --যারা ক্রোধভাজন (ইয়াহুদী) নয় এবং যারা পথভ্রষ্টও (খ্রিষ্টান) নয়।”

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) ইগাষাতুল লাহফান গ্রন্থে (১১৩১)এ বলেছেন, সেই সরল পথ, যার অনুসরণ করতে মহান আল্লাহ আমাদেরকে অসিয়ত করেছেন, তা হল সেই পথ, যে পথে ছিলেন নবী কি ও তার সাহাবাবগ। আর তা হল ঋজু পথ। সে পথের বাইরের সকল পথ বক্রপথসমুহের অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য বক্রতা অসামান্য হতে পারে, যা সরল পথ থেকে অনেক দুরে হয়। আর তা সামান্যও হতে পারে। আর উভয়ের মাঝে আছে বহু স্তর, যার সংখ্যা কেবল আল্লাহই জানেন। এ হল বাস্তব জগতের পথের মতো। পথিক কখনো পথচ্যুত হয়ে বহু দূরে চলে যায়। আবার কখনো কম দূরে চলে যায়।

সুতরাং সরল পথে প্রতিষ্ঠিত থাকা অথবা না থেকে বক্রপথ অবলম্বন করার বিষয়টি জানার নিক্তি হল রাসূলুল্লাহ ও তাঁর সাহাবাবর্গের পথ। আর সে পথ থেকে বিচ্যুত অবহেলাকারী যালেম অথবা অপব্যাখ্যাকারী মুজতাহিদ অথবা অজ্ঞ অন্ধানকরণকারী। এদের প্রত্যেকের কর্ম থেকে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। তাহলে অবশিষ্ট থাকে। কেবল মধ্যপন্থা (সরল পথের অনুসরণ) এবং সুন্নাহকে আঁকড়ে ধারণ। আর এটাই হল দ্বীনের কেন্দ্রবিন্দু।

সুতরাং যে ব্যক্তি সঠিক সালাফিয়াত সজ্ঞানে ন্যায়নিষ্ঠভাবে অবলম্বন করবে, সে সর্বনাশী ও ভ্ৰষ্টকারী ফির্কাসমূহের মাঝে (মধ্যপন্থায়) অবস্থান করবে। যেহেতু হক থাকে দুই ভ্রষ্টতার মাঝে।

ইমাম আওযায়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কত এমন কোন আদেশ নেই, যাতে শয়তান দুটি আচরণ দ্বারা। বিরোধিতা করে না। দুটির মধ্যে যে কোন একটি কার্যকরী হলে সে অন্যটার পরোয়া করে না। সে দুটি হলঃ অতিরঞ্জন করা এবং অবজ্ঞা করা।[৫]

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, “মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কত এমন কোন আদেশ নেই, যাতে শয়তানের দুটি প্ররোচনা। থাকে না। হয় অবজ্ঞা ও অবহেলা, না হয় অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি। সুতরাং দুটি পাপের মধ্যে যে কোন একটি দিয়ে বান্দার উপর বিজয়লাভ করলে, তাতে সে কোন পরোয়া করে না। বলা বাহুল্য, সে বান্দার হৃদয়ে আগত হয়ে তা শুকে পরীক্ষা করে, অতঃপর যদি দেখে তাতে শৈথিল্য, আলস্য বা হেলাফেলা রয়েছে, তাহলে সে সেই সুযোগ গ্রহণ করে তার মনে নিরুৎসাহ, ও কর্মবিমুখতা সৃষ্টি করে। কুঁড়েমি, গয়ংগচ্ছ, দীর্ঘসূত্রতা প্রক্ষেপ করে। আর কর্ম না করার নানা ওজর-অজুহাত ও অপব্যাখ্যার দরজা খুলে দেয় এবং তার মনে আশার বাসা তৈরি করে। পরিশেষে বান্দা হয়তোবা নির্দেশিত কর্ম বিলকুল ত্যাগ করে বসে।

পক্ষান্তরে যদি সে বান্দার হৃদয়ে সতর্কতা, ফুর্তি, আগ্রহ, উৎসাহ, স্পৃহা, প্রচেষ্টা ইত্যাদি লক্ষ্য করে, তাহলে সে এই সুযোগ গ্রহণ করে তাকে অতিরিক্ত চেষ্টা করতে অনুপ্রাণিত করে। সে তাকে বলে, এতটুক করা যথেষ্ট নয়। তোমার হিম্মত আরো বেশি। তোমাকে সবার চাইতে বেশি আমল করা উচিত। ওরা ঘুমালে তুমি ঘুমায়ো না, ওরা রোযা ছাড়লে তুমি ছেড়ো না, ওরা শৈথিল্য করলে তুমি করো না, ওরা (উযুতে) তিনবার মুখ-হাত ধুলে তুমি সাতবার ধােও, ওরা নামাযের জন্য উযু করলে তুমি তার জন্য গোসল কর।” ইত্যাদি। এইভাবে সে নানাবিধ অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি সৃষ্টি করে তার আমলে। ফলে সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়, কর্মের সীমা লংঘন করে। যেমন প্রথমজনকে এর বিপরীতভাবে আমলে অবজ্ঞা, অবহেলা। ও আমল বর্জনে বাধ্য করে। তার উদ্দেশ্য, দুজনেই যেন ‘স্বিরাত্বে। মুস্তাক্বীম’ থেকে সুদুরে চলে যায়। এ যেন তার কাছে না আসে, নিকটবর্তী না হয় এবং ও যেন তা লংঘন করে এবং অতিক্রম করে যায়।

অধিকাংশ মানুষ এই ফিতনায় পতিত। এ থেকে মুক্তি দিতে পারে একমাত্র সুগভীর ইম, সুদৃঢ় ঈমান, শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাশক্তি এবং আমলে মধ্যপন্থা। আর আল্লাহই সাহায্যস্থল।”[৬]

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তার পুস্তিকা ‘আল-আক্বীদাতুল ওয়াসিত্বিয়্যাহ’তে[৭] আহলে সুন্নাহর মধ্যপন্থার বিবরণে বলেন, 'অনুরূপ সুন্নাহর সকল দরজায় তাঁরা মধ্যপন্থী। যেহেতু তারা আল্লাহর কিতাব, তার রসূল ৪-এর সুন্নাত এবং (ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী মুহাজির ও আনসারগণ এবং যেসব লোক সরল অন্তরে তাদের অনুগামী হয়েছেন, তাঁরা যে বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন, তা সুদৃঢ়ভাবে ধারণকারী।

[১]. মাজমুউ ফাতাওয়া শাইখিল ইসলাম ১৯/ ১৬৯

[২]. মাজমুউ ফাতাওয়া শাইখিল ইসলাম ২৮/৫১

[৩]. মাজমুউ ফাতাওয়া শাইখিল ইসলাম ৩/৩৪৬, ৪৩৫

[৪]. আদ্-দুরারুস সানিয়্যাহ ২/ ১৩২

[৫]. আল-মাক্বাসিদুল হাসানাহ ২০৫পৃঃ)

[৬]. আল-ওয়াবিলুস স্বাইয়িব ২৯-৩০পৃঃ

[৭]. মাজমূউ ফাতাওয়া ৩/৩৭৫

যা ইতিপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, তা হল হকের উপর নির্বিচল থাকা।

মহান আল্লাহ বলেছেন,

الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِن دِيَارِهِم بِغَيْرِ حَقٍّ إِلَّا أَن يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهُ ۗ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَّهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا ۗ وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ

“তাদেরকে তাদের ঘরবাড়ী হতে অন্যায়ভাবে বহিস্কৃত করা হয়েছে। শুধু এ কারণে যে, তারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। আল্লাহ যদি মানব জাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত খ্রিষ্টান সংসার-বিরাগীদের উপাসনা স্থান, গীর্জা, ইয়াহুদীদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ; যাতে অধিক স্মরণ করা হয় আল্লাহর নাম। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাকে (তার ধর্মকে) সাহায্য করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই মহাশক্তিমান, চরম পরাক্রমশালী।” (হাজ্জঃ ৪০)।

يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ

“যারা বিশ্বাসী তাদেরকে আল্লাহ শাশ্বত বাণী দ্বারা ইহজীবনে ও পরজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখেন।” (ইব্রাহীমঃ ২৭)।

হুযাইফা (রাঃ) বলেছেন, প্রকৃত ভ্রষ্টতা হল, তুমি সেটাকে ভালো জানছ, যেটাকে আপত্তিকর জানতে এবং সেটাকে আপত্তিকর জানছ, যেটাকে ভালো জানতে! সাবধান! মহান আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে রঙ বদল করা (বহুরূপী হওয়া) থেকে দূরে থেকো। যেহেতু আল্লাহর দ্বীন এক।[১]

প্রিয় পাঠকমন্ডলী! আল্লাহ আপনাদের হিফাযত করুন। সম্ভবতঃ আপনাদের মনে পড়ে আহলুস সুন্নাহর ইমাম আহমাদের অবস্থান। যাকে মহান আল্লাহর পথে নির্যাতন করা হয়েছে। কিন্তু তিনি অটল থেকেছেন। তাকে বেত্রাঘাত করা হয়েছে। (রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ওয়া আরয়াহ) আল্লাহর পথে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, তবুও তিনি হক কথা বলা থেকে পিছপা হননি।

আর ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) এর উপরেও আল্লাহর পথে নির্যাতন করা হয়েছে, তিনিও অবিচল থেকেছেন। (রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ওয়া আরয্বাহ।)

বলা বাহুল্য, হকের উপর অটল থাকা এই মানহাজের একটি আলামত। আর তাদেরও আলামত, যারা এ মানহাজে সত্যনিষ্ঠ বিজ্ঞ। আল্লাহর কসম! যে ব্যক্তি তাদের জীবন-কথা পাঠ করবে এবং সলফে সালেহর জীবন-চরিত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে, তার নিকট উক্ত বিষয় স্পষ্ট হয়ে যাবে। আপনি ইমাম মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন সাহল রামলী (রাহিমাহুল্লাহ)র জীবন-কথা পড়ে দেখুন। এই আদর্শ ইমাম (রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ওয়া আরহ)এর উপরে ভীষণভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে।

হাফেয যাহাবী ‘আসিয়ার’ গ্রন্থে তাঁর জীবন-কথায় উল্লেখ করেছেন, হাফেয আবু যার বলেছেন, 'বানী উবাইদ তাকে কারারুদ্ধ করে এবং সুন্নাহর ব্যাপারে তাঁকে শূলবিদ্ধ করে। আমি শুনেছি, দারাকুত্বনী তার কথা উল্লেখ করে কেঁদেছেন ও বলেছেন, ইমাম মুহাম্মাদ বিন আহমাদের যখন চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছিল, তখন তিনি বলছিলেন,

كان ذلك في الكتاب مسطورا

“এটা তো কিতাবে লিপিবদ্ধ ছিল।” আমি বলি, তার বারবার উক্ত আয়াতখন্ড পাঠ করা এ কথার দলীল যে, তিনি আল্লাহর ফায়সালা ও তকদীরে বিশ্বাসী (ও সন্তুষ্ট) ছিলেন।

ইবনুল আকফানী তার দেহের চামড়া ছাড়ানোর কাহিনী উল্লেখ করার পর বলেছেন, তার দেহের চামড়া যে ছাড়িয়েছে, সে ছিল। একজন ইয়াহুদী। এই ইয়াহুদী কসাইও তার এই কষ্টে কষ্ট পেয়ে তার প্রতি সদয় হয়েছিল এবং দয়া করেই তাঁর হৃৎপিন্ডে খঞ্জরাঘাত করে তাকে হত্যা করেছিল। তিনি বলেন, সুতরাং তার দেহের চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে তাতে জাব (গম-যবের কাঁচকি বা বিচালিচূর্ণ) ভর্তি করে শূলে চড়ানো হয়েছিল।[২]

তাকে শূলবিদ্ধ করা হয়েছিল সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার দোষে! যে জিনিসের জন্য তিনি ধৈর্যধারণ করতে পেরেছেন, কে পারবে তার মতো? (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি।)।

ইমাম আবুল মুযাফফার সামআনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আহলে হাদীস যে হকপন্থী, তার অন্যতম প্রমাণ এই যে, তুমি যদি তাঁদের গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন কর, যা তাদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, প্রাচীন থেকে নব্য পর্যন্ত, তাদের দেশ ও কাল ভিন্ন-ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও, তাদের মাঝে দেশের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও, তাদের প্রত্যেকের ভিন্নভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করা সত্ত্বেও, তাঁদের লিখিত গ্রন্থসমূহ যদি অধ্যয়ন কর, তাহলে দেখবে, তাদের আকীদার বিবরণ-পদ্ধতি এক, ধরন অভিন্ন। তারা তাতে একই পন্থায় চলমান থাকেন, তার থেকে চত হন না এবং ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন না। তাতে তাদের বক্তব্য এক। তাদের কর্ম এক। তুমি তাদের মাঝে না কোন প্রকারের মতানৈক্য দেখতে পাবে, আর না সামান্য পরিমাণও কোন বিষয়ে বিভক্তি। বরং যদি তুমি তাদের জবানি ও তাঁদের সলফ থেকে উদ্ধৃত সকল বক্তব্য একত্রিত কর, তাহলে দেখতে পাবে, তার সবটাই যেন একই হৃদয়। থেকে আগত হয়েছে। একই জিহবা থেকে নিঃসৃত হয়েছে।

বলা বাহুল্য, হকের সপক্ষে এর থেকে স্পষ্ট কোন দলীল থাকতে পারে কি? মহান আল্লাহ বলেছেন,

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا

“তারা কি কুরআন সম্বন্ধে চিন্তা-ভাবনা করে না? এ (কুরআন) যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো তরফ থেকে (অবতীর্ণ) হত, তাহলে নিশ্চয় তারা তাতে অনেক পরস্পর-বিরোধী কথা পেত।” (নিসাঃ ৮২)

তিনি আরো বলেছেন,

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا

“তোমরা সকলে আল্লাহর রশি (দ্বীন বা কুরআন)কে শক্ত করে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর; তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করলেন। ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে গেলে।” (আলে ইমরান : ১০৩)[৩]

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, 'তুমি দেখবে আহলুল কালাম (ফির্কা)র লোকেরা সবার চাইতে বেশি এক কথা থেকে অন্য কথায় ফিরে যায়। এক জায়গায় কোন কথা নিশ্চিতরূপে বলে অতঃপর অন্য জায়গায় তার বিপরীত কথা নিশ্চিতরূপে বলে এবং তার বক্তাকে কাফের আখ্যায়িত করে। আর এ হল নিশ্চিত বিশ্বাস না থাকার দলীল। যেহেতু ঈমান হল তাই, যা কাইসার বলেছিলেন, যখন আবু সুফিয়ানকে নবী (সা.)-এর সাথে ইসলামে দীক্ষিত মুসলিমদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ কি দ্বীনে প্রবেশ করার পর তা অপছন্দ করে (মুর্তাদ হয়ে) ফিরে যায়?’ আবু সুফিয়ান বলেছিলেন, না, বাদশা বলেছিলেন, ‘অনুরূপ ঈমান। যখন তার প্রফুল্লতা হৃদয়ের সাথে মিশে যায়, তখন কেউ তা অপছন্দ করে না। (বুখারী ৭নং)

এই জন্য কিছু সলফ উমার বিন আব্দুল আযীয বা অন্য কেউ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি নিজের দ্বীনকে তর্ক-বিতর্কের লক্ষ্যবস্তু বানাবে, তার দল-বদল বেশি হবে।

পক্ষান্তরে আহলুস সুন্নাহ ও আহলুল হাদীস, তাদের উলামা অথবা নেক জনসাধারণের ব্যাপারে কেউ জানে না যে, তিনি নিজ উক্তি অথবা আকীদা থেকে রুজু করেছেন। বরং এ বিষয়ে সকল মানুষের চাইতে তারাই বেশি ধৈর্যধারণ করে থাকেন; যদিও তাদেরকে নানা কষ্ট দিয়ে পরীক্ষায় ফেলা হয় এবং বিভিন্ন ফিতনায় ফেলে নিপীড়িত করা হয়। আর এ হল পূর্ববর্তী আম্বিয়া ও তাদের অনুগামিগণের অবস্থা; যেমন আসহাবুল উখদূদ এবং অনুরূপ আরো অন্যান্যদের অবস্থা। যেমন এই উম্মতের সলফ সাহাবা, তাবেঈন ও ইমামগণের অবস্থা।

মোটের উপর কথা, আহলুল কালাম ও ফালসাফা-ওয়ালা (দার্শনিক)দের চাইতে আহলুল হাদীস ও আহলুস সুন্নাহর অবিচলতা ও স্থিরতা অনেক গুণে বেশি।”[৪]

[১]. আবুল কাসেম বাগাবী ‘আল-জাদিয়াত ২/৩২০২নং, বাইহাক্বীর কুবরা ১০/৪২, লালকাঈ শারহু উসুলি ইতিক্বাদি আহলিস সুন্নাহ ১/১২০নং, হারেষ বিন আবু উসামাহ ‘আল-মুসনাদ’ ১/৪৭০নং

[২]. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা’ ১৬/ ১৪৮

[৩]. তাঁর এ কথাগুলিকে তাঁর নিকট থেকে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ‘স্বওনুল মান্ত্বিক ওয়াল-কালাম’ (১৬৫পৃষ্ঠা)তে উদ্ধৃত করেছেন।

[৪]. মাজমুউ ফাতাওয়া শাইখিল ইসলাম ৪/৫০

আর এতে থাকবে আলোচ্য বিষয়ের উপর আলোকপাতকারী বক্তব্য। প্রিয় পাঠকমন্ডলী! সংক্ষিপ্ত এই আলোচনা চক্রে গুরুত্বপূর্ণ বহু প্রতিবেদন আমাদের দৃষ্টিতে গত হয়েছে। যে মানুষ নিজের পরিত্রাণ ও মুক্তির ব্যাপারে আগ্রহী, তার জন্য আবশ্যক, প্রাচীন বিষয় উম্মতের সলফে সালেহর তরীকা মজবুত সহকারে ধারণ করে থাকার যে নির্দেশসমূহ জানা হল, তা পালন করা। মহান আল্লাহ বলেছেন,

فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

“সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকেও শরীক না করে।” (কাহফঃ ১১০)

لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا

“তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (আহযাব : ২১)।

ইতিপূর্বে ইমামগণ থেকে সলফে সালেহর তরীকা অবলম্বনের প্রতি উৎসাহদান, উদ্বুদ্ধকরণ ও আদেশ দানের বিভিন্ন উদ্ধৃতি উল্লিখিত হয়েছে, এ স্থলে আমি অতিরিক্ত আরো কিছু আলোময় ও উজ্জ্বলকারী বাণী উল্লেখ করব। যা দিয়ে উপদেশ দেব। আর উপদেশ মু'মিনদেরকে উপকত করে। তা হল নিম্নরূপঃ

১। উমার বিন আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ)র একজন গভর্নর তাকে খেয়ালখুশি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তার উত্তরে লিখেছিলেন, 'অতঃপর বলি যে, আমি তোমাকে অসিয়ত করছি, তুমি আল্লাহ-ভীতি রাখবে, তার ব্যাপারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে, তাঁর। রীতি ও তাঁর রসূল (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ করবে এবং তাঁর পরবর্তীকালে যেখানে তার সুন্নত প্রচলিত রয়েছে এবং তা সকলের জন্য যথেষ্ট, সেখানে নব উদ্ভাবনকারীরা যা উদ্ভাবন করেছে, তা বর্জন করবে।

সুতরাং তুমি সুন্নাহ অবলম্বন কর। কারণ আল্লাহর হুকুমে তা তোমার জন্য বাঁচার অসীলা।

জেনে রেখো, লোকে তখনই বিদআত রচনা করে, যখন তার পূর্বে কোন এমন বিষয় অতীত হয়ে যায়, যা তার দলীল ও উপদেশ হয়। পরন্তু সুন্নাহ তিনি বিধিবদ্ধ করেছেন, যিনি জেনেছেন তার বিপরীত যে ত্রুটি, পদস্থলন, বোকামি ও অতিরিক্ত গভীর ভাবনার বিষয় থাকে। সুতরাং তুমি তোমার নিজের জন্য তাই নিয়ে তুষ্ট হও, যা নিয়ে (পূর্ববর্তী) সম্প্রদায় নিজেদের জন্য তুষ্ট ছিলেন। যেহেতু তারাই অগ্রণী এবং তারা সজ্ঞানে (থামার জায়গায়) থেমেছেন, সফল বা সমীক্ষক দৃষ্টির সাথে বিরত হয়েছেন। নিশ্চিতরূপে তাঁরাই রহস্য উদ্ঘাটনে বেশি সক্ষম ছিলেন। আর তাতে কোন মাহাত্ম থাকলে তারাই তার বেশি হকদার ছিলেন। অতএব যদি তাই হিদায়াত হয়, যার উপর তোমরা প্রতিষ্ঠিত আছ, তাহলে সে ব্যাপারে তোমরা তাদের।

অগ্রগামী হয়েছ। (অথচ তা অসম্ভব। আর যদি বল যে, যা নব উদ্ভাবিত হয়েছে, তা তাদের পর, তাহলে আসলে তা উদ্ভাবন করেছে। কেবল সেই লোক, যে তাদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করেছে। এবং তাদের অপেক্ষা নিজেকে প্রিয় মনে করেছে। পরন্তু তারা সে। বিষয়ে যে কথা বলেছেন, তা যথেষ্ট। তার যে বিবরণ তারা দিয়েছেন, তা সন্তোষজনক। তাদের নিমের ব্যক্তি শিথিলপন্থী এবং তাদের উর্ধের ব্যক্তি সংকীর্ণতা সৃষ্টিকারী। বহু সম্প্রদায় তাদের নিমে থেকে শিথিল হয়ে গেছে এবং অন্য বহু লোক তাদের উপরে উঠতে চেয়ে অতিরঞ্জন করেছে। আর তারা এরই মাঝামাঝিতে সরল হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত।[১]

২। ইমাম মুহাম্মাদ বিন মুসলিম যুহরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমাদের উলামাগণের মধ্যে যারা বিগত হয়েছেন, তারা বলতেন,

সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরলে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। আর ইলমকে শীঘ্রই তুলে নেওয়া হবে। বলা বাহুল্য, ইলম অবশিষ্ট থাকলে দ্বীন ও দুনিয়া কায়েম থাকবে। আর ইলম চলে গেলে সব কিছুই চলে যাবে।[২]

৩। ইমাম ইবনে হিব্বান (রাহিমাহুল্লাহ) সহীহ গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন, তার সুন্নাহর অবলম্বনে রয়েছে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা এবং ব্যাপক মর্যাদা। তার দীপমালা নির্বাপিত হয় না। তার দলীল ও হুজ্জত খন্ডন ও ব্যর্থ করা যায় না। যে তা অবলম্বন করে, সে রক্ষা পায় এবং যে তার বিরুদ্ধাচরণ করে, সে অনুতপ্ত হয়। যেহেতু তা হল সুরক্ষিত দুর্গ এবং মজবুত স্তম্ভ। যার মর্যাদা স্পষ্ট এবং রশি সুদৃঢ়। যে তা মজবুত সহকারে ধারণ করে, সে নেতৃত্ব লাভ করে এবং যে তার বিরুদ্ধাচরণ কামনা করে, সে ধ্বংস হয়ে যায়। তার প্রতি সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ বিলম্বে সৌভাগ্যবান হয় এবং সৃষ্টির মাঝে অবিলম্বে ঈর্ষিত হয়।[৩]

৪। ইমাম ইবনে কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) আম্মুল মুওয়াসবিসীন (গ্রন্থের ৪১পৃষ্ঠা)য় বলেছেন, সুন্নাহর অনুসরণে রয়েছে শরীয়ত সমর্থনের বর্কত, মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি, মর্যাদার উন্নতি, হৃদয়ের প্রশান্তি, দেহের স্থিরতা, শয়তানের লাঞ্ছনা এবং সরল পথের অনুসরণ।

৫। ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, আল্লাহর (নৈকট্য লাভের) সবচেয়ে নিকটবর্তী অসীলা হল সুন্নাহ অবলম্বন করা, প্রকাশ্যে ও গোপনে তার সাথে অবস্থান করা, আল্লাহর প্রতি সর্বদা মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা এবং কথায় ও কাজে একমাত্র তারই সন্তুষ্টি কামনা করা। এই তিন অসীলা ছাড়া কেউই আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হয়নি। আর এই তিনটি অসীলা থেকে অথবা তার একটি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ছাড়া কেউ তার নৈকট্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি।”[৪]

৬। ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, কুরআনের তফসীরে, হাদীসের অর্থে এবং হালাল-হারামের মন্তব্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ইলম হল তাই, যা সাহাবা, তাবেঈন, তাবা-তাবেঈন এবং ইসলামের অনুসরণীয় প্রসিদ্ধ। সর্বশেষ ইমামগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে। যাদের নাম আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি।

বলা বাহুল্য, এ মর্মে তাদের নিকট থেকে যা বর্ণিত হয়েছে, তা বোঝা, অনুধাবন করা এবং ফিকহী জ্ঞান লাভ করার সাথে তার সংরক্ষণ করা হল সকল ইলমের সেরা ইলম। আর তাদের পরবর্তীকালে (ইলমের মধ্যে) যে প্রশস্ততা প্রকাশ পেয়েছে, তার অধিকাংশে কোন মঙ্গল নেই। অবশ্য যদি তা তাদের বক্তব্য সম্পর্কিত কোন ব্যাখ্যা হয়, তাহলে তার কথা ভিন্ন। নচেৎ যা তাদের বক্তব্যের পরিপন্থী, তার অধিকাংশ বাতিল অথবা তাতে কোন উপকার নেই। তাদের পরবর্তীদের বক্তব্যে এমন কোন হকই পাওয়া যায় না, যা তাদের বক্তব্যে সংক্ষিপ্ত শব্দে ও বাক্যে পাওয়া যায় না।

আর তাদের পরবর্তীদের বক্তব্যে এমন কোন বাতিলও পাওয়া যায় না, যা তাদের বক্তব্যে তার বাতিল হওয়ার বিবরণ পাওয়া যায় না। যে বোঝে ও চিন্তা-গবেষণা করে (সে তা অবশ্যই পেয়ে যায়)। পরন্তু তাঁদের বক্তব্যে পাওয়া যায় চমৎকার অর্থ ও সূক্ষ আপত্তি, যার প্রতি তাদের পরবর্তীরা পৌঁছতে পারে না এবং সে বিষয়ে তাদের অবগতিও নেই। তাই যে ব্যক্তি তাঁদের বক্তব্য থেকে ইলম গ্রহণ করে না, তার উক্ত সকল কল্যাণ হাতছাড়া হয়। এর সাথে সে তাদের পরবর্তীদের অনুসরণ করে অনেক বাতিলে এসে আপতিত হয়।

অবশ্য যে ব্যক্তি তাদের বক্তব্যসমূহ একত্রিত করার ইচ্ছা করবে, তার প্রয়োজন হবে সে সব বক্তব্যের শুদ্ধ-অশুদ্ধা জানার। আর তা সম্ভব হবে ‘আল-জারহু ওয়াত-তা’দীল’ এবং ‘আল-ইলাল ইলম অর্জনের মাধ্যমে। সুতরাং যে ব্যক্তির উক্ত ইলম সম্বন্ধে জ্ঞান রাখে না, সে যা উদ্ধত করছে তার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারবে না এবং তার নিকট হক-বাতিলের মাঝে তালগোল পেকে যাবে। বর্তমান যুগে অনুসরণীয় সলফদের বক্তব্য লেখা ইমাম শাফেয়ী, আহমাদ, ইসহাক ও আবু উবাইদ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। তাদের। পরবর্তীকালে যা ঘটেছে, তার ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যেহেতু তাদের পরে বহু (বিদআত ও ফিতনার) ঘটনা ঘটেছে।[৫]

সুতরাং আল্লাহর কাছেই তার সুন্দর নামাবলী ও সুউচ্চ গুণাবলীর অসীলায় প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের সকলকে সেই কাজের তওফীক দেন, যা তিনি ভালোবাসেন ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন। আমরা যেখানেই থাকি, সেখানেই যেন আমাদেরকে বৰ্কতপ্রাপ্ত রাখেন। আমাদেরকে ইসলাম ও সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত রাখেন। ফিতনা থেকে মুক্ত অবস্থায় আমাদের মৃত্যুদান করেন এবং তার নেক বান্দাগণের সাথে আমাদেরকে মিলিত করেন। নিশ্চয় তিনি অতি বড় দানশীল মহানুভব, সর্বশ্রোতা ও আহবানে সাড়াদানকারী।

وصلى الله وسلم وبارك على رسول الله وعلى آله وصحبه ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين، والحمد لله رب العالمين

[১]. আজুরীর আশ-শারীআহ ৪৮পৃঃ, ইবনে ওয়াযাহর আল-বিদাউ ওয়াননাহয়্যু আনহা ৭৪নং, সনদ সহীহ। অনুরূপ আছে আবু নুআইমের হিয়া (৫/৩৩৮)তে। আরো দ্রঃ শাহেবীর আল-ই'তিস্যাম ১/৫০

[২]. সুনান দারেমী ১/৪৪, সনদ সহীহ

[৩]. আল-ইহসান ১/ ১০২

[৪]. আল-ফাওয়াইদ ১০৮ পৃঃ

[৫]. ফাযুল ইলমিস সালাফি আলা ইলমিল খালাফ ৪০-৪২পৃঃ
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১০ পর্যন্ত, সর্বমোট ১৯ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 পরের পাতা »