শাওয়াল, যিলকদ ও জিলহজ্জ এ তিনটি হল হজ্জের মাস। হজ্জের মাসসমূহে পৃথকভাবে প্রথমে উমরা ও পরে হজ্জ আদায় করাকে তামাত্তু হজ্জ বলে। অর্থাৎ ১ লা শাওয়াল থেকে উকুফে আরাফার পূর্বে (৯ জিলহজ্জ), যেকোনো মুহূর্তে উমরা আদায় করে হালাল হয়ে যাওয়া ও উকুফে আরাফার পূর্বে নতুন করে হজ্জের এহরাম বাঁধা। এবং হজ্জের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদন করা। যারা হাদী সঙ্গে করে মক্কায় গমন করে না—বর্তমানে বহিরাগত হাজিদের কেউই হাদীর পশু সঙ্গে নিয়ে আসে না—তাদের জন্য তামাত্তু হজ্জই উত্তম। কারও কারও মতে সর্বাবস্থায় তামাত্তু হজ্জ উত্তম। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বিদায় হজ্জের সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সাহাবাদের মধ্যে যারা হাদীর জন্তু সঙ্গে নিয়ে আসেননি তাদের সবাইকে তামাত্তু করার পরামর্শ দিয়েছেন, এবং নিজেও এই বলে কামনা ব্যক্ত করেছেন যে, যদি এ বিষয়টি পূর্বে প্রতীয়মান হত তাহলে হাদীর জন্তু সঙ্গে আনতাম না, আর যদি হাদী আমার সাথে না থাকত, তবে হালাল হয়ে যেতাম।[1]

তামাত্তু হজ্জ তিনভাবে আদায় করা যায়

ক) মীকাত থেকে উমরার জন্য এহরাম বেঁধে মক্কায় গিয়ে তাওয়াফ সাঈ করে মাথার চুল হলক অথবা কসর করে হালাল হয়ে যাওয়া ও হজ্জ পর্যন্ত মক্কাতেই অবস্থান করা। ৮ জিলহজ্জ নতুনভাবে হজ্জের এহরাম বেঁধে হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদন করা।

) মীকাত থেকে উমরার নিয়তে এহরাম বেঁধে মক্কা গমন করা ও উমরার কার্যক্রম—তাওয়াফ, সাঈ হলক-কসর—সম্পাদন করে হালাল হয়ে যাওয়া। হজ্জের পূর্বেই যিয়ারতে মদিনা সেরে নেয়া ও মদিনা থেকে মক্কায় আসার পথে আবয়ারে আলী নামক জায়গা থেকে উমরার নিয়তে এহরাম বেঁধে মক্কায় আসা। উমরা আদায় করে হালাল হয়ে যাওয়া, ৮ জিলহজ্জ হজ্জের জন্য নতুনভাবে এহরাম বেঁধে হজ্জ আদায় করা।

) এহরাম না বেঁধে সরাসরি মদিনা গমন করা। যিয়ারতে মদিনা শেষ করে মক্কায় আসার পথে আবয়ারে আলী নামক জায়গা থেকে উমরার নিয়তে এহরাম বাঁধা ও মক্কায় এসে তাওয়াফ সাঈ হলক-কসর করে হালাল হয়ে যাওয়া, ও ৮ জিলহজ্জ হজ্জের জন্য নতুন করে এহরাম বাঁধা।

[1] - لو استقبلت من أمري ما استدبرت ما أهديت ولولا أن معي الهدي لأحللت (বোখারি : হাদিস নং ১৬৬০) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে : لو ظهر لي هذا الرأي الذي رأيته الآن لأمرتكم به في أول الأمر وابتداء خروجي - অর্থ্যাৎ এখন যে অভিমত ব্যক্ত করলাম তা যদি পূর্বে প্রতীয়মান হত, তাহলে আমি শুরুতেই যাত্রা আরম্ভ করার সময় তোমাদেরকে এরূপ করার নির্দেশ দিতাম।

উমরার সাথে যুক্ত করে একই এহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করাকে কেরান হজ্জ বলে। কেরান হজ্জ দু’ভাবে আদায় করা যায়।

) মীকাত থেকে এহরাম বাধার সময় হজ্জ ও উমরা উভয়টার নিয়ত করে এহরাম বাঁধা। মক্কায় পৌঁছে প্রথমে উমরা আদায় করা ও এহরাম অবস্থায় মক্কায় অবস্থান করা। হজ্জের সময় হলে একই এহরামে মিনা-আরাফায় গমন ও হজ্জের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা।

) মীকাত থেকে শুধু উমরার নিয়তে এহরাম বাঁধা। পবিত্র মক্কায় পৌঁছার পর উমরার তাওয়াফ শুরু করার পূর্বে হজ্জের নিয়ত উমরার সাথে যুক্ত করে নেয়া। উমরার তাওয়াফ-সাঈ শেষ করে, এহরাম অবস্থায় হজ্জের অপেক্ষায় থাকা ও ৮ জিলহজ্জ একই এহরামে মিনায় গমন ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পাদন করা।

হজ্জের মাসগুলোয় উমরা না করে শুধু হজ্জ করাকে ইফরাদ হজ্জ বলে। এ ক্ষেত্রে মীকাত থেকে শুধু হজ্জের নিয়তে এহরাম বাঁধতে হয়। মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফে কুদুম (আগমনি তাওয়াফ) করা। ইচ্ছা হলে এ তাওয়াফের পর সাঈও করা যায়। সে ক্ষেত্রে হজ্জের ফরজ-তাওয়াফের পর আর সাঈ করতে হবে না। তাওয়াফে কুদুমের পর এহরাম অবস্থায় মক্কায় অবস্থান করা। ৮ জিলহজ্জ একই এহরামে হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে মিনার দিকে রওয়ানা হওয়া। ইফরাদ হজ্জকারীকে হাদী জবেহ করতে হয় না। তাই ১০ জিলহজ্জ কঙ্কর নিক্ষেপের পর মাথা মুন্ডন করে ইফরাদ হজ্জকারী প্রাথমিকভাবে হালাল হয়ে যেতে পারে।

যদি কোনো ব্যক্তি ফরজ হজ্জ আদায় করতে অক্ষম হয় তাহলে তার পক্ষ থেকে দায়িত্ব নিয়ে অন্য কোনো ব্যক্তির হজ্জ পালনকে বদলি হজ্জ বলে। কয়েকটি হাদিস থেকে বদলি হজ্জের বিধান পাওয়া যায়। নীচে হাদিসগুলো উল্লেখ করা হল।

১.খাছআম গোত্রের জনৈকা মহিলা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ)আল্লাহ তার বান্দাদের ওপর যে ফরজ আরোপ করেছেন তা আমার পিতাকে খুব বৃদ্ধ অবস্থায় পেয়েছে। তিনি বাহনের ওপর স্থির হয়ে বসতে পারেন না। তবে কি আমি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করে দেব? তিনি বললেন, হাঁ। ঘটনাটি ছিল বিদায় হজ্জের সময়কার।[1]

২. আবু রাযিন আল আকিলি থেকে বর্ণিত। তিনি এসে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে জিজ্ঞাসা করে বললেন, আমার পিতা খুব বৃদ্ধ, তিনি হজ্জ ও উমরা পালন করতে পারেন না। সওয়ারির ওপর উঠে চলতেও পারেন না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বললেন, তোমার পিতার পক্ষ থেকে হজ্জ ও উমরা করো।[2]

৩. রাসূলুল্লাহ (সাঃ)এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, لَبَّيْكَ عَنْ شُبْرَمَةَ- শুবরামার পক্ষ থেকে লাববাইক। তিনি বললেন, শুবরামা কে? লোকটি বললেন, আমার ভাই বা আত্মীয়। তিনি বললেন, তুমি কি নিজের হজ্জ করেছ? লোকটি বললেন, না। তিনি বললেন, আগে নিজের হজ্জ করো। তারপর শুবরামার হজ্জ।[3]

তিন প্রকার হজ্জের মধ্যে বদলি হজ্জ কোন প্রকার হবে তা, যে ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ করা হচ্ছে (المحجوج عنه) তিনি নির্ধারণ করে দেবেন। যদি ইফরাদ করতে বলেন তাহলে ইফরাদ করতে হবে, যদি কেরান করতে বলেন তাহলে কেরান করতে হবে, আর যদি তামাত্তু করতে বলেন তাহলে তামাত্তু করতে হবে। এর অন্যথা হলে হবে না। বদলি-হজ্জ, ইফরাদ হজ্জ হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। বরং ওপরে উল্লেখিত দ্বিতীয় হাদিসে হজ্জ ও উমরা উভয়টার কথাই আছে। এতে, বদলি হজ্জকারী তামাত্তু হজ্জ করতে পারবে, এর দিকে ইশারা রয়েছে।

বদলি হজ্জকারী ইফরাদ ভিন্ন অন্য কোনো হজ্জ করলে তার হজ্জ হবে না, হাদিসে এমন কোনো বাধ্য-বাধকতা খোঁজে পাওয়া যায় না। ‘হজ্জ’ শব্দ উচ্চারণ করলে শুধুই ইফরাদ বোঝাবে, এর পেছনেও কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। কেননা হজ্জের সাথে উমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে গিয়েছে বলে এক হাদিসে এসেছে। دَخَلَتِ اْلُعمْرَةُ ِفْي اْلحَجِّ (হজে উমরা প্রবিষ্ট হয়েছে)[4] তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ)খাছয়াম গোত্রের মহিলাকে তাঁর পিতার বদলি-হজ্জ করার অনুমতি দেয়ার সময় যে বলেছেন, فَحُجِّيْ عَنْهُ তোমার পিতার পক্ষ থেকে হজ্জ করো’, এর দ্বারা তিনি উমরাবিহীন হজ্জ বুঝিয়েছেন, এ কথার পেছনে আদৌ কোনো যুক্তি নেই।

বদলি-হজ্জ কেবলই ইফরাদ হজ্জ হতে হবে, ফেকাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবেও এ কথা লেখা নেই। ফেকাহশাস্ত্রের কিতাবে যা লেখা আছে, তা হল, বদলি-হজ্জ যার পক্ষ থেকে করা হচ্ছে তিনি যে ধরনের নির্দেশ দেবেন সে ধরনের হজ্জই করতে হবে। এখানে আমি প্রসিদ্ধ কিতাব বাদায়েউস্সানায়ের (بدائع الصنائع) কিছু এবারত তুলে দিচ্ছি—

إذا أمر بحجة مفردة أو بعمرة مفردة، فقرن فهو مخالف ضامن في قول أبي حنيفة، وقال أبو يوسف ومحمد يجزي ذلك عن الآمر، نستحسن وندع القياس فيه --- ولو أمره أن يحج عنه، فاعتمر ضمن، لأنه خالف، ولو اعتمر، ثم حج من مكة، يضمن النفقة في قولهم جميعا، لأمره له بالحج بسفر، وقد أتى بالحج من غير سفر، لأنه صرف سفره الأول إلى العمرة، فكان مخالفا، فيضمن النفقة —

ولو أمره بالحج عنه بجمع بين إحرام الحج والعمرة، فأحرم بالحج عنه وأحرم بالعمرة عن نفسه، فحج عنه ،واعتمر عن نفسه، صار مخالفا في ظاهر الرواية عن أبي حنيفة.

অর্থাৎ, (যিনি বদলি-হজ্জ করাচ্ছেন) তিনি যদি শুধু হজ্জ করার নির্দেশ দেন অথবা শুধু ওমরা করার নির্দেশ দেন, আর বদলি-হজ্জকারী কেরান হজ্জ করল তবে বদলি-হজ্জকারীকে—ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর কথা অনুসারে—ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (র.) এর নিকট, নির্দেশকারীর পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে। এটাকে বরং এস্তেহসান মনে করি ও এ ব্যাপারে কিয়াস ছেড়ে দিই। যিনি বদলি হজ্জ করাচ্ছে, তিনি যদি হজ্জ করার নির্দেশ দেয় আর বদলি-হজ্জকারী উমরা করে, তবে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কেননা সে নির্দেশ মোতাবেক কাজ করেনি। আর যদি সে উমরা করে, ও পরবর্তীতে মক্কা থেকে হজ্জ করে তা হলে সকলের মতে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কেননা বদলি-হজ্জকারীর প্রতি, যিনি হজ্জ করালেন, তার নির্দেশ ছিল সফরটা হজ্জের জন্য করার, পক্ষান্তরে সে সফর ব্যতীতই করেছে। কারণ প্রথম সফরটা সে উমরার জন্য ব্যবহার করেছে। তাই নির্দেশের উল্টো কাজ করেছে, সে জন্যই তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যদি নির্দেশদাতা হজ্জ ও উমরা উভয়টা এক এহরামে একত্রিত করে আদায় করতে বলেন, আর বদলি-হজ্জকারী নির্দেশদাতার জন্য শুধু হজ্জ করল, কিন্তু উমরা করল নিজের জন্য, তবে সে—ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর এক আপাত বর্ণনা অনুসারে—নির্দেশের উল্টো করল।[5]

ওপরের উদ্ধৃতি এটা স্পষ্ট যে বদলি-হজ্জ যিনি করাচ্ছেন তাঁর কথা মতো হজ্জ সম্পাদন করতে হবে। তিনি যে ধরনের নির্দেশ দেবেন সে ধরনের হজ্জ করতে হবে। নির্দেশ মোতাবেক হজ্জ না করলে কোথায় কোথায় ক্ষতিপূরণ দিতে হবে তা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। বদলি-হজ্জকারীকে, সর্বাবস্থায় ইফরাদ হজ্জ করতে হবে, এ কথা ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মুহাম্মদ ও ইমাম আবু ইউসুফ কেউই বলেননি।

[1] - يارسول الله إن فريضة الله على عباده ، أدركت أبي شيخا كبيرا لا يثبت على الراحلة ، أفأحج عنه ؟ قال: نعم ، وذلك في حجة الوداع (বোখারি : হাদিস নং ১৪১৭)

[2] قال يا رسول الله إن أبي شيخ كبير لا يستطيع الحج والعمرة والظعن فقال حج عن أبيك واعتمر (তিরমিযী : হাদিস নং ৮৫২)

[3] - عن ابن عباس أن رسول الله سمع رجلا يقول لبيك عن شبرمة فقال من شبرمة؟ قال أخي أو قريب لي. قال :هل حججت؟ قال لا قال حج عن نفسك ثم حج عن شبرمة (আবুদাউদ : হাদিস নং ১৪২৪)

[4] - মুসলিম : হাদিস নং ১২১৮

[5] - বাদায়েউস্ সানায়ে : খন্ড ২, পৃ: ২১৩-২১৪
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ৪ পর্যন্ত, সর্বমোট ৪ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে