প্রথম মূলনীতি: আল্লাহ তা‘আলার সকল সিফাতই পূর্ণাঙ্গ এবং এতে কোনো প্রকার অপূর্ণতা নেই।

যেমন হায়ত (জীবন), ইলম, (জ্ঞান), কুদরত, (ক্ষমতা) শ্রবণ, দর্শন, রহমত, ইয্যত (পরাক্রমশালিতা), হিকমত (প্রজ্ঞা), সর্বোচ্চে থাকা, আযমত (মহত্ব) ইত্যাদি। এর পক্ষে দলিল হলো ওহী, আকল (বুদ্ধিগত যুক্তি) ও ফিতরাত (স্বচ্ছ মানবপ্রকৃতি)।

ওহী থেকে দলিল: আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿ لِلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡأٓخِرَةِ مَثَلُ ٱلسَّوۡءِۖ وَلِلَّهِ ٱلۡمَثَلُ ٱلۡأَعۡلَىٰۚ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ ٦٠ ﴾ [النحل: ٦٠]

যারা আখিরাতে ঈমান রাখে না, তাদের জন্য মন্দ উদাহরণ এবং আল্লাহর জন্য রয়েছে সর্বোচ্চ উদাহরণ। আর তিনিই পরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী। (সূরা আন্-নাহল: ১৬: ৬০)

‘সর্বোচ্চ উদাহরণ’ অর্থ হলো সর্বোচ্চ গুণ।

বুদ্ধিগত দলিল হলো: বাস্তবে অস্তিত্ববান প্রতিটি বস্তুরই অবশ্যই কিছু গুণবৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ গুণবৈশিষ্ট্য হয়ত পূর্ণাঙ্গ হবে, অথবা অপূর্ণাঙ্গ। দ্বিতীয়টি অর্থাৎ অপূর্ণাঙ্গ গুণ রব তা‘আলার ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য, বরং তা বাতিল। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা মূর্তিসমূহের ইলাহ হওয়ার বাতুলতা এভাবে প্রকাশ করেছেন যে তা অপূর্ণাঙ্গতা ও অক্ষমতার বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট। ইরশাদ হয়েছে:

﴿ وَمَنۡ أَضَلُّ مِمَّن يَدۡعُواْ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَن لَّا يَسۡتَجِيبُ لَهُۥٓ إِلَىٰ يَوۡمِ ٱلۡقِيَٰمَةِ وَهُمۡ عَن دُعَآئِهِمۡ غَٰفِلُونَ ٥ ﴾ [الاحقاف: ٥]

তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে, যে কিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের আহবান সম্পর্কে উদাসীন। (সূরা আল আহকাফ: ৪৬: ৫)

﴿ وَٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ لَا يَخۡلُقُونَ شَيۡ‍ٔٗا وَهُمۡ يُخۡلَقُونَ ٢٠ أَمۡوَٰتٌ غَيۡرُ أَحۡيَآءٖۖ وَمَا يَشۡعُرُونَ أَيَّانَ يُبۡعَثُونَ ٢١ ﴾ [النحل: ٢٠، ٢١]

আর তারা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ডাকে, তারা কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়। (তারা) মৃত, জীবিত নয় এবং তারা জানে না কখন তাদের পুনরুজ্জীবিত করা হবে। (সূরা আন্ নাহল: ১৬: ২০-২১)

আর ইব্রাহীম আ. তাঁর পিতার বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বলেছেন তার বর্ণনায় আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

﴿يَٰٓأَبَتِ لِمَ تَعۡبُدُ مَا لَا يَسۡمَعُ وَلَا يُبۡصِرُ وَلَا يُغۡنِي عَنكَ شَيۡ‍ٔٗا ٤٢ ﴾ [مريم: ٤٢]

হে আমার পিতা, তুমি কেন তার ইবাদাত কর যে না শুনতে পায়, না দেখতে পায় এবং না তোমার কোন উপকারে আসতে পারে? (সূরা মারয়াম: ১৯: ৪২)

ইব্রাহীম আ. তাঁর কাওমের বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বলেছেন তা উল্লেখপূর্বক ইরশাদ হয়েছে:

﴿ قَالَ أَفَتَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكُمۡ شَيۡ‍ٔٗا وَلَا يَضُرُّكُمۡ ٦٦ أُفّٖ لَّكُمۡ وَلِمَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِۚ أَفَلَا تَعۡقِلُونَ ٦٧ ﴾ [الانبياء: ٦٦، ٦٧]

সে বলল, ‘তাহলে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদাত কর, যা তোমাদের কোনো উপকার করতে পারে না এবং কোন ক্ষতিও করতে পারে না’? ‘ধিক তোমাদেরকে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদাত কর তাদেরকে! ‘তবুও কি তোমরা বুঝবে না’? (সূরা আল আম্বিয়া: ২১: ৬৬ -৬৭)

উপরন্তু অনুভূতি ও দৃষ্টির অভিজ্ঞতা থেকে এটা প্রমাণিত যে সৃষ্টিজীবেরও কিছু পূর্ণাঙ্গ গুণ রয়েছে, আর তা আল্লাহ তা‘আলারই দেওয়া। অতএব যিনি পূর্ণাঙ্গ বিষয় দিতে পারেন তিনি তো পূর্ণাঙ্গতার ব্যাপারে অধিক হকদার।

স্বচ্ছ মানবপ্রকৃতি তথা ফিতরতগত দলিল হলো: মানব অন্তরসমূহ মূলত এভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যে তা আল্লাহ তা‘আলাকে মহববত করবে, তাঁকে তা‘যীম ও ইবাদত করবে। স্বচ্ছ অন্তরের অধিকারী প্রতিটি মানুষের এটাই হলো প্রত্যাশা। আর এরূপ অন্তর কেবল ওই সত্তাকেই মহব্বত, তা‘যীম ও ইবাদত করতে পারে যার ব্যাপারে জানা আছে যে তিনি তাঁর রুবুবিয়ত ও উলুহিয়তের উপযুক্ত পূর্ণাঙ্গ গুণ মাধুরিতে গুণান্বিত।

যদি কোনো গুণ এমন থাকে যা অসম্পূর্ণ তবে তা আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য হবে না। যেমন মৃত্যু, অজ্ঞতা, ভুলে যাওয়া, অক্ষমতা, অন্ধত্ব, বধিরত্ব ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱلۡحَيِّ ٱلَّذِي لَا يَمُوتُ﴾ [الفرقان: ٥٧]

আর তুমি ভরসা কর এমন চিরঞ্জীব সত্তার উপর যিনি মরবেন না। (সূরা আল ফুরকান: ২৫: ৫৮)

মূসা আ. এর কথা উল্লেখ করে আল কুরআনে এসেছে:

﴿ عِلۡمُهَا عِندَ رَبِّي فِي كِتَٰبٖۖ لَّا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنسَى ٥٢ ﴾ [طه: ٥٢]

এর জ্ঞান আমার রবের নিকট কিতাবে আছে। আমার রব বিভ্রান্ত হন না এবং বিস্মৃতও হন না। (সূরা তাহা: ২০: ৫২)

অক্ষমতা আল্লাহ তা‘আলাকে স্পর্শ করতে পারে না, এ ব্যাপারে আল কুরআনে এসেছে:

﴿وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِيُعۡجِزَهُۥ مِن شَيۡءٖ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ إِنَّهُۥ كَانَ عَلِيمٗا قَدِيرٗا ٤٤ ﴾ [فاطر: ٤٤]

আল্লাহ তো এমন নন যে, আসমানসমূহ ও জমিনের কোনো কিছু তাঁকে অক্ষম করে দেবে। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। (সূরা ফাতির: ৩৫: ৪৪)

আল্লাহ তা‘আলা সর্বশ্রোতা, এ বিষয়টি তাগিদ করে ইরশাদ হয়েছে:

﴿ أَمۡ يَحۡسَبُونَ أَنَّا لَا نَسۡمَعُ سِرَّهُمۡ وَنَجۡوَىٰهُمۚ بَلَىٰ وَرُسُلُنَا لَدَيۡهِمۡ يَكۡتُبُونَ ٨٠ ﴾ [الزخرف: ٨٠]

না কি তারা মনে করে, আমি তাদের গোপনীয় বিষয় ও নিভৃত সলাপরামর্শ শুনতে পাই না? অবশ্যই হ্যাঁ, আর আমার ফেরেশতাগণ তাদের কাছে থেকে লিখছে। (আয্যুখরুফ: ৪৩: ৮০)

হাদীসে দাজ্জাল সম্পর্কে এসেছে:

«إنه أعور وإن ربكم ليس بأعور»

‘নিশ্চয় সে কানা, আর তোমাদের রব কানা নন।’

অন্য এক হাদীসে এসেছে:

«أيها الناس أربعوا على أنفسكم؛ فإنكم لا تدعون أصم، ولا غائباً»

হে লোকসকল, তোমরা তোমাদের নিজেদের উপর প্রশান্ত থেকে তাকে ডাকো; কারণ তোমরা এমন কাউকে ডাকছ না যিনি বধির ও অনুপস্থিত।'

আর যারা আল্লাহ তা‘আলাকে অপূর্ণাঙ্গ গুণে গুণান্বিত বলে আখ্যায়িত করেছে আল্লাহ তা‘আলা তাদের শাস্তি দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে:

﴿ وَقَالَتِ ٱلۡيَهُودُ يَدُ ٱللَّهِ مَغۡلُولَةٌۚ غُلَّتۡ أَيۡدِيهِمۡ وَلُعِنُواْ بِمَا قَالُواْۘ بَلۡ يَدَاهُ مَبۡسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيۡفَ يَشَآءُۚ﴾ [المائ‍دة: ٦٤]

আর ইয়াহূদীরা বলে: আল্লাহর হাত বাঁধা, তাদের হাতই বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং তারা যা বলেছে তার জন্য তারা লা‘নতগ্রস্ত হয়েছে বরং তাঁর দু’ হাত প্রসারিত, তিনি যেভাবে ইচ্ছা খরচ করেন’। (সূরা আল-মায়েদা: ৫: ৬৪)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:

﴿ لَّقَدۡ سَمِعَ ٱللَّهُ قَوۡلَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ فَقِيرٞ وَنَحۡنُ أَغۡنِيَآءُۘ سَنَكۡتُبُ مَا قَالُواْ وَقَتۡلَهُمُ ٱلۡأَنۢبِيَآءَ بِغَيۡرِ حَقّٖ وَنَقُولُ ذُوقُواْ عَذَابَ ٱلۡحَرِيقِ ١٨١ ﴾ [ال عمران: ١٨١]

নিশ্চয় আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ দরিদ্র এবং আমরা ধনী’। অচিরেই আমি লিখে রাখব তারা যা বলেছে এবং নবীদেরকে তাদের অন্যায়ভাবে হত্যার বিষয়টিও এবং আমি বলব, ‘তোমরা উত্তপ্ত আযাব আস্বাদন কর’। (সূরা আল ইমরান: ৩: ১৮১)

তারা আল্লাহ তা‘আলার ওপর যেসব অপূর্ণাঙ্গ গুণ আরোপ করে তা থেকে যে তিনি পবিত্র এ বিষয়টি ঘোষণা করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ سُبۡحَٰنَ رَبِّكَ رَبِّ ٱلۡعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ ١٨٠ وَسَلَٰمٌ عَلَى ٱلۡمُرۡسَلِينَ ١٨١ وَٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ١٨٢ ﴾ [الصافات: ١٨٠، ١٨٢]

‘তারা যা ব্যক্ত করে তোমার রব তা থেকে পবিত্র মহান, সম্মানের মালিক। আর রাসূলদের প্রতি সালাম। আর সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর জন্য।’ (সূরা আস-সাফফাত: ৩৭: ১৮০ -১৮২)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:

﴿ مَا ٱتَّخَذَ ٱللَّهُ مِن وَلَدٖ وَمَا كَانَ مَعَهُۥ مِنۡ إِلَٰهٍۚ إِذٗا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَٰهِۢ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعۡضُهُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖۚ سُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ ٩١ ﴾ [المؤمنون: ٩١]

আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই। (যদি থাকত) তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজের সৃষ্টিকে নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত; তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে আল্লাহ কত পবিত্র! (সূরা আল মুমিনূন:৯১)

আর যদি গুণটি এমন হয় যা এক অবস্থায় পূর্ণাঙ্গ এবং অন্য অবস্থায় অপূর্ণাঙ্গ, তবে তা উন্মুক্তভাবে আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা বৈধও নয়, আবার নিষিদ্ধও নয়। বরং এ ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা রয়েছে। অর্থাৎ যে অবস্থায় গুণটি পূর্ণাঙ্গ সে অবস্থায় তা আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যাবে। আর যে অবস্থায় তা অপূর্ণাঙ্গ সে অবস্থায় তা আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যাবে না। যেমন ষড়যন্ত্র, কৌশল অবলম্বন, ধোঁকা ইত্যাদি। এসব গুণ ওই অবস্থায় পূর্ণাঙ্গ বলে বিবেচিত হবে যে অবস্থায় তা এমন কারো বিরুদ্ধে করা হবে যে অনুরূপ কর্ম করতে সক্ষম; কেননা তা সে অবস্থায় এটা বোঝাবে যে এ কর্মের কর্তা অভিন্ন ধরনের কর্ম অথবা তার থেকেও শক্তিশালী কর্ম দিয়ে তার শত্রুর মোকাবিলা করতে সক্ষম। এ অবস্থার বিপরীত হলে এ গুণগুলো অপূর্ণাঙ্গ গুণ বলে বিবেচিত হবে। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা তা এমন লোকদের মোকাবিলায় উল্লেখ করেছেন যারা তার সঙ্গে এবং তাঁর রাসূলের সঙ্গে একই আচরণ করে। যেমন ইরশাদ হয়েছে:

﴿وَيَمۡكُرُونَ وَيَمۡكُرُ ٱللَّهُۖ وَٱللَّهُ خَيۡرُ ٱلۡمَٰكِرِينَ ٣٠ ﴾ [الانفال: ٣٠]

‘আর তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও কৌশল করেন। আর আল্লাহ হচ্ছেন উত্তম কৌশলী। (সূরা আল আনফাল: ৮: ৩০)

তিনি আরো বলেছেন:

﴿ إِنَّهُمۡ يَكِيدُونَ كَيۡدٗا ١٥ وَأَكِيدُ كَيۡدٗا ١٦ ﴾ [الطارق: ١٥، ١٦]

‘নিশ্চয় তারা ভীষণ কৌশল করছে। আর আমিও ভীষণ কৌশল করছি।’ (সূরা আত তারিক: ৮৬: ১৫-১৬)

﴿ وَٱلَّذِينَ كَذَّبُواْ بِ‍َٔايَٰتِنَا سَنَسۡتَدۡرِجُهُم مِّنۡ حَيۡثُ لَا يَعۡلَمُونَ ١٨٢ وَأُمۡلِي لَهُمۡۚ إِنَّ كَيۡدِي مَتِينٌ ١٨٣ ﴾ [الاعراف: ١٨٢، ١٨٣]

ইরশাদ হয়েছে:

আর যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, অচিরেই আমি তাদেরকে ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতেও পারবে না। আর আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি। নিশ্চয় আমার কৌশল শক্তিশালী। (সূরা আল আরাফ: ৭: ১৮২-১৮৩)

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন:

﴿ إِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ يُخَٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَٰدِعُهُمۡ﴾ [النساء: ١٤٢]

নিশ্চয় মুনাফিকরা আললাহকে ধোঁকা দেয়। অথচ তিনি তাদের ধোঁকাদানকারী। (সূরা আন নিসা: ৪: ১৪২)

আল্লাহ আরো বলেন:

﴿قَالُوٓاْ ءَامَنَّا وَإِذَا خَلَوۡاْ إِلَىٰ شَيَٰطِينِهِمۡ قَالُوٓاْ إِنَّا مَعَكُمۡ إِنَّمَا نَحۡنُ مُسۡتَهۡزِءُونَ ١٤ ٱللَّهُ يَسۡتَهۡزِئُ بِهِمۡ﴾ [البقرة: ١٤، ١٥]

আর যখন তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এবং যখন গোপনে তাদের শয়তানদের সাথে একান্তে মিলিত হয়, তখন বলে, ‘নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথে আছি। আমরা তো কেবল উপহাসকারী’। আল্লাহ তাদের প্রতি উপহাস করেন। (সূরা আল বাকারা: ২: ১৪-১৫)

এ কারণেই, যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাদের মোকাবিলায় আল্লাহ তা‘আলাও বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, এ কথা বলা হয় নি। ইরশাদ হয়েছে:

﴿ وَإِن يُرِيدُواْ خِيَانَتَكَ فَقَدۡ خَانُواْ ٱللَّهَ مِن قَبۡلُ فَأَمۡكَنَ مِنۡهُمۡۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ٧١ ﴾ [الانفال: ٧١]

আর যদি তারা তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার ইচ্ছা করে, তাহলে তারা তো পূর্বে আল্লাহর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অতঃপর তিনি তাদের উপর (তোমাকে) শক্তিশালী করেছেন। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান। (সূরা আল আনফাল: ৮: ৭১)

এখানে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন যে ‘তিনি তাদের ওপর (তোমাকে) শক্তিশালী করেছেন’, একথা বলেননি যে ‘তিনিও তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন; কেননা বিশ্বাসঘাতকতা আমানতদারির মোকাবিলায় ব্যবহার করা হয়। আর এটা সর্বাবস্থায় খারাপ গুণ।

এ থেকে বুঝা গেল যে, কিছু সাধারণ লোকেরা যে বলে থাকে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, আল্লাহও তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন’, এ কথাটি নিতান্তই জঘন্য। তা থেকে নিষেধ করা ওয়াজিব।

দ্বিতীয় মূলনীতি: সিফাতের অধ্যায় নামের অধ্যায় থেকে প্রশস্ততর।

 কারণ প্রতিটি নামই একটি গুণকে শামিল করে আছে, যেমন আল্লাহর নাম-বিষয়ক মূলনীতির তৃতীয়টিতে উল্লিখিত হয়েছে। আর যেহেতু আল্লাহর সিফাত আল্লাহর কার্যাদির সঙ্গে সম্পৃক্ত, আর আল্লাহর কার্যাদির কোনো সীমা পরিসীমা নেই, যেমন তার কথারও কোনো সীমা পরিসীমা নেই। ইরশাদ হয়েছে:

﴿ وَلَوۡ أَنَّمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ مِن شَجَرَةٍ أَقۡلَٰمٞ وَٱلۡبَحۡرُ يَمُدُّهُۥ مِنۢ بَعۡدِهِۦ سَبۡعَةُ أَبۡحُرٖ مَّا نَفِدَتۡ كَلِمَٰتُ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٞ ٢٧ ﴾ [لقمان: ٢٧]

‘আর জমিনে যত গাছ আছে তা যদি কলম হয়, আর সমুদ্র (হয় কালি), তার সাথে কালিতে পরিণত হয় আরো সাত সমুদ্র, তবুও আল্লাহর বাণীসমূহ শেষ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা লুকমান: ৩১: ২৭)

এর উদাহরণ: আল্লাহর গুণসমূহের মধ্যে কয়েকটি হলো নিম্নরূপ:

الإتيان আগমণ করা, الأخذ পাকড়াও করা, الإمساكধরা, البطش পাকড়াও করা এবং এজাতীয় আরও অগণিত সিফাত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَجَآءَ رَبُّكَ﴾ [الفجر: ٢٢]

আর তোমার রব আসবেন... (সূরা ফজর: ৮৯: ২২)

﴿ هَلۡ يَنظُرُونَ إِلَّآ أَن يَأۡتِيَهُمُ ٱللَّهُ فِي ظُلَلٖ مِّنَ ٱلۡغَمَامِ﴾ [البقرة: ٢١٠]

‘তারা কি এরই অপেক্ষা করছে যে, মেঘের ছায়ায় আল্লাহ তাদের নিকট আগমন করবেন।’ (সূরা আল বাকারা: ২: ২১০)

আল্লাহ বলেছেন:

﴿فَأَخَذَهُمُ ٱللَّهُ بِذُنُوبِهِمۡۗ﴾ [ال عمران: ١١]

ফলে তাদের পাপের কারণে আল্লাহ তাদরেকে পাকড়াও করেছেন। (সূরা আলে ইমরান: ৩: ১১)

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন:

﴿َيُمۡسِكُ ٱلسَّمَآءَ أَن تَقَعَ عَلَى ٱلۡأَرۡضِ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦٓۚ﴾ [الحج: ٦٥]

‘আর তিনিই আসমানকে আটকিয়ে রেখেছেন, যাতে তাঁর অনুমতি ছাড়া তা জমিনের উপর পড়ে না যায়।’ (সূরা আল হাজ্জ: ২২: ৬৫)

আল্লাহ আরো বলেন:

﴿ إِنَّ بَطۡشَ رَبِّكَ لَشَدِيدٌ ١٢ ﴾ [البروج: ١٢]

‘নিশ্চয় তোমার রবের পাকড়াও বড়ই কঠিন।’ (সূরা আল বুরুজ: ৮৫: ১২)

আবার ইরশাদ হয়েছে:

﴿يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلۡيُسۡرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلۡعُسۡرَ﴾ [البقرة: ١٨٥]

আল্লা­হ তোমাদের জন্য সবকিছু সহজ করে দিতে চান এবং কঠিন চান না। (সূরা আল বাকারা: ২: ১৮৫)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«ينزل ربنا كل ليلة إلى السماء الدنيا»

(আমাদের রব প্রতিদিনই নিম্নাকাশে নেমে আসেন।) [1]অতএব, আমরা আল্লাহর সঙ্গে এসব গুণ ঠিক সেভাবেই সম্পৃক্ত করব যেভাবে ওপরে বর্ণিত হলো। আর এগুলো দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার নাম তৈরি করব না, বলব না যে আল্লাহর নাম হলো الجائي (আগন্তক), الآتي (আগন্তক), الآخذ (পাকড়াওকারী), الممسك (ধারক), الباطش (পাকড়াও কারী), المريد (ইচ্ছুক), النازل (অবতরণকারী) ইত্যাদি। যদিও আমরা এসব গুণ ব্যবহার করে আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে সংবাদ দিই এবং এসব গুণে আল্লাহ তা‘আলাকে গুণান্বিত করি।

[1] - বুখারী, হাদীস নং (১১৪৫), মুসলিম, হাদীস নং (৭৫৮)
তৃতীয় মূলনীতি: আল্লাহ তা‘আলার গুণসমূহ দু‘ভাগে বিভক্ত। সাব্যস্তজাত গুণ ও অসাব্যস্তজাত গুণ।

 সাব্যস্তজাত গুণ: যা আল্লাহ তা‘আলা তার কিতাবে অথবা তার রাসূলের যবানে নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন। আর এসবই হলো পূর্ণাঙ্গ গুণ যাতে কোনো অপূর্ণাঙ্গতা নেই। যেমন জীবন, ইলম, কুদরত, আরশের ওপরে থাকা, নিম্নাকাশে অবতরণ, চেহারা, দু’হাত, ইত্যাদি।

এসব গুণ আল্লাহ তা‘আলার জন্য তাঁর শান অনুযায়ী প্রকৃত অর্থে সাব্যস্ত করা ওয়াজিব। এর দলিল হলো ওহী ও আকল।

ওহী থেকে দলিল হলো, আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ مِن قَبۡلُۚ وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلَۢا بَعِيدًا ١٣٦ ﴾ [النساء: ١٣٦]

হে মুমিনগণ, তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি এবং সে কিতাবের প্রতি যা তিনি তাঁর রাসূলের উপর নাযিল করেছেন এবং সে কিতাবের প্রতি যা তিনি পূর্বে নাযিল করেছেন। আর যে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কেউ কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং শেষ দিনকে অস্বীকার করবে, সে ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত হবে। (সূরা আন্ নিসা: ৪: ১৩৬)

আল্লাহর প্রতি ঈমান তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমানকেও শামিল করে। আর রাসূলের প্রতি যে কিতাব নাযিল হয়েছে তাঁর প্রতি ঈমান, কিতাবে-থাকা আল্লাহর সকল গুণের প্রতিও ঈমান। আর প্রেরিত পুরুষ হিসেবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান ওইসব সংবাদের প্রতি ঈমানকেও শামিল করে যা তিনি তাঁর প্রেরক অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে দিয়েছেন।

মানব বিবেক-বুদ্ধির দলিল হলো, আল্লাহ তা‘আলা নিজের ব্যাপারে এসব বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন। আর তিনি নিজের ব্যাপারে অন্যের চেয়ে ভালো জানেন। তিনি সর্বোচ্চ সত্যবাদী এবং তাঁর কথা সর্বোচ্চ সৌন্দর্যমন্ডিত। অতএব আল্লাহ তা‘আলা যেভাবে সংবাদ দিয়েছেন বিনা দ্বিধায় তা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা ওয়াজিব; কেননা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তো তখন আসে যখন সংবাদটি এমন কোনো উৎস থেকে আসে যার ব্যাপারে অজ্ঞতা, মিথ্যা ও ভাব প্রকাশে অপারগতার ধারণা করা যেতে পারে। আর এ তিন প্রকার দোষের প্রতিটি থেকেই আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে যেসব সংবাদ দিয়েছেন সেসবের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রবের ব্যাপারে সকল মানুষের চেয়ে ভালো জানেন। তিনি এ ব্যাপারে সমধিক সত্যবাদী ও সুভাকাঙ্খী। আর ভাব প্রকাশে তিনি মানুষের মধ্যে সব থেকে অধিক পারঙ্গম। অতএব তিনি যেসব সংবাদ দিয়েছেন তা গ্রহণ করা ওয়াজিব।

অসাব্যস্তজাত সিফাত: আর তা হলো আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবানে যা অসাব্যস্ত করেছেন তা। আর এসবই হলো আল্লাহর জন্য অপূর্ণাঙ্গ গুণ। যেমন মৃত্যু, নিদ্রা, অজ্ঞতা, ভুলে যাওয়া, অক্ষমতা এবং অবসাদ। অতএব এসব গুণ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত না করা ওয়াজিব। এর পাশাপাশি এসবের বিপরীত গুণগুলো পূর্ণাঙ্গরূপে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা ওয়াজিব। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা নিজের জন্য যা অসাব্যস্ত করেছেন তা এ জন্য অসাব্যস্ত করেছেন যে এসবের বিপরীতগুলো আল্লাহর জন্য পূর্ণাঙ্গরূপে সাব্যস্ত। শুধু অসাব্যস্ত করা উদ্দেশ্য নয়। কেননা অসাব্যস্ত করা কোনো পূর্ণাঙ্গতা নয়। তবে যদি অসাব্যস্তকরণ পূর্ণাঙ্গতা শামিল করে তবে তার কথা ভিন্ন। এটা এ কারণে যে অসাব্যস্ত বিষয় হলো অস্তিত্বহীন বিষয়। আর অস্তিত্বহীন বিষয় কোনো বিষয়ই না। অতএব তা পূর্ণাঙ্গ হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আর অসাব্যস্তকরণ কখনো কখনো পাত্রের অনুপযোগিতার কারণে হয়ে থাকে। অতএব এ অবস্থায়ও তা পূর্ণাঙ্গতাকে হারায়। উদাহরণত, যদি বলি দেওয়াল জুলুম করে না, তবে এ কথা শুদ্ধ হবে না; কারণ দেওয়ালের জুলুম করার কোনো ক্ষমতাই নাই।

আবার কখনো কখনো অপূর্ণাঙ্গতা হয় অক্ষমতার কারণে, ফলে তা অপূর্ণাঙ্গতা বিবেচিত হয়। যেমন কোনো কবি বলেন,

এ গোত্র কোনো যিম্মাদারীরই অন্যথা করতে পারে না,

তারা মানুষকে সরিষা পরিমাণও জুলুমের ক্ষমতা রাখে না

অন্য কবি বলেন,

কিন্তু আমার জাতি যদিও তারা অনেক সম্মানিত বংশীয় তবুও তারা

যত অপমানিতই হোক না কেন কোনো অনিষ্টের ক্ষমতা রাখে না[1]।

কোনো গুণকে অসাব্যস্ত করার অর্থ তার বিপরীত পূর্ণাঙ্গ গুণকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা। এর উদাহরণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿ وَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱلۡحَيِّ ٱلَّذِي لَا يَمُوتُ﴾ [الفرقان: ٥٧]

আর তুমি ভরসা কর এমন চিরঞ্জীব সত্তার উপর যিনি মরবেন না। (সূরা আল ফুরকান: ২৫: ৫৮)

অতএব আল্লাহর জন্য মৃত্যুকে অসাব্যস্ত করার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জীবনকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা শামিল রয়েছে।

আরেকটি উদাহরণ:

﴿وَلَا يَظۡلِمُ رَبُّكَ أَحَدٗا ٤٩ ﴾ [الكهف: ٤٩]

আর তোমার রব কারো প্রতি জুলুম করেন না। (সূরা আল কাহাফ: ১৮: ৪৯)

অতএব আল্লাহর জন্য জুলুম অসাব্যস্ত করার মধ্যে তাঁর জন্যে পূর্ণাঙ্গ ইনসাফ সাব্যস্ত করা শামিল রয়েছে।

তৃতীয় উদাহরণ: আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِيُعۡجِزَهُۥ مِن شَيۡءٖ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ﴾ [فاطر: ٤٤]

আল্লাহ তো এমন নন যে, আসমানসমূহ ও জমমেনের কোনো কিছু তাকে অক্ষম করে দেবে। (সূরা ফাতির: ৩৫: ৪৪)

এখানে আল্লাহ তা‘আলার জন্য অক্ষমতাকে অসাব্যস্ত করা হয়েছে। আর অক্ষমতাকে অসাব্যস্ত করার মধ্যে আল্লাহর জন্য ইলম ও কুদরতকে পূর্ণাঙ্গরূপে সাব্যস্ত করা শামিল রয়েছে। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা আয়াতের শেষে বলেছেন:

إِنَّهُۥ كَانَ عَلِيمٗا قَدِيرٗا

নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। (সূরা ফাতির: ৩৫: ৪৪)

কেননা অক্ষমতার কারণ হয়তো কোনো কিছুকে অস্তিত্বদানের কার্যকারণের ব্যাপারে অজ্ঞতা, অথবা ক্ষমতার অপ্রতুলতা। আর আল্লাহ তা‘আলা পূর্ণাঙ্গ ইলমের অধিকারী এবং আকাশ ও পৃথিবীতে তাঁর ক্ষমতাকে খর্বকারী কেউ নেই।এ উদাহরণ থেকে জানা গেল যে অসাব্যস্তজাত গুণগুলো কখনো কখনো একাধিক পূর্ণাঙ্গতাকে শামিল করে।

[1] উভয় কবিই প্রকারান্তরে তাদের গোত্রের অযোগ্যতা ও অক্ষমতার কথাই প্রকাশ করেছে। [সম্পাদক]
চতুর্থ মূলনীতি: সাব্যস্তজাত গুণগুলো প্রশংসা ও পূর্ণাঙ্গসূচক গুণ। অতএব এসব গুণ যত বেশি হবে এবং এসবের অর্থে যত বেশি বিভিন্নতা আসবে, যিনি এসব গুণে গুণান্বিত তাঁর পূর্ণাঙ্গতা তত অধিক প্রকাশ পাবে।

এ কারণেই যেমনটি সর্বজন বিদিত যে, সাব্যস্তজাত যেসব গুণের কথা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন তা অসাব্যস্তজাত গুণ থেকে অনেক বেশি।

এর বিপরীতে অসাব্যস্তজাত গুণগুলো কেবল তিন অবস্থায় উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা হলো নিম্নরূপ:

প্রথমত. আল্লাহর পূর্ণাঙ্গতার ব্যাপকতা বোঝানোর অবস্থায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١ ﴾ [الشورى: ١١]

তাঁর মত কিছু নেই, আর তিনি হলেন সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সূরা আশ্শুরা:৪২: ১১)[1]

﴿ وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ كُفُوًا أَحَدُۢ ٤ ﴾ [الاخلاص: ٤]

আর তাঁর কোনো সমকক্ষও নেই। (সূরা আল ইখলাস: ১১২: ৪)

দ্বিতীয়ত: মিথ্যাবাদীরা আল্লাহর ব্যাপারে যা দাবি করেছে তা নস্যাৎ করার অবস্থায়। যেমন ইরশাদ হয়েছে:

﴿ أَن دَعَوۡاْ لِلرَّحۡمَٰنِ وَلَدٗا ٩١ وَمَا يَنۢبَغِي لِلرَّحۡمَٰنِ أَن يَتَّخِذَ وَلَدًا ٩٢ ﴾ [مريم: ٩١، ٩٢]

কারণ তারা পরম করুণাময়ের সন্তান আছে বলে দাবি করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা পরম করুণাময়ের জন্য শোভনীয় নয়। (সূরা মারয়াম: ১৯: ৯১-৯২)

তৃতীয়ত: এই সুনির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলার পূর্ণাঙ্গতায় কোনো কমতি থাকতে পারে এ ধরনের ধারণা নস্যাৎ করার ক্ষেত্রে। যেমন ইরশাদ হয়েছে:

﴿ وَمَا خَلَقۡنَا ٱلسَّمَآءَ وَٱلۡأَرۡضَ وَمَا بَيۡنَهُمَا لَٰعِبِينَ ١٦ ﴾ [الانبياء: ١٦]

আসমান-জমিন ও তাদের মাঝখানে যা কিছু আছে তার কোনো কিছুই আমি খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। (সূরা আল আম্বিয়া: ২১: ১৬)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:

﴿ وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ وَمَا بَيۡنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ وَمَا مَسَّنَا مِن لُّغُوبٖ ٣٨ ﴾ [ق: ٣٨]

আর অবশ্যই আমি আসমানসমূহ ও জমিন এবং এতদোভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি। আর আমাকে কোনরূপ ক্লান্তি স্পর্শ করেনি। (সূরা ক্বাফ: ৫০: ৩৮)

>
[1] - দেখুন, মুহাম্মদ ইবনে আমীন আশ্শানকিতী, আদওয়াউল বয়ান,
পঞ্চম মূলনীতি: সাব্যস্তজাত গুণ দু‘ভাগে বিভক্ত। আল্লাহর সত্তাসংলগ্ন গুণ ও তাঁর কর্মসংলগ্ন গুণ।
  • সত্তাসংলগ্ন গুণ হলো, যেগুলো অনাদি কাল থেকে আল্লাহর সত্তার সঙ্গে রয়েছে এবং অনন্তকাল ধরে থাকবে। যেমন ইলম, কুদরত, শ্রবণ, দর্শন, পরাক্রমশীলতা, হিকমত, সর্বোচ্চতা, ‘আযমত। এর মধ্যে সংবাদজাত গুণ যেমন চেহারা, দু‘হাত, দু‘চোখ ইত্যাদিও শামিল রয়েছে।
  • আর কর্মসংলগ্ন গুণ হলো ওইসব গুণ, যা আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ এমন সব কর্ম যা আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে করেন এবং ইচ্ছা না করলে করেন না। যেমন আরশের ওপর উঠা এবং নিম্নাকাশে অবতরণ করা।

আবার কখনও কখনও সিফাতে যাতিয়া অর্থাৎ সত্তাসংলগ্ন গুণ দু’ভাবে কর্মসংলগ্ন গুণও হতে পারে, যেমন কালাম বা কথা। এ গুণটি তার মৌলিকতার বিবেচনায় সিফাতে যাতিয়া (সত্তাসংলগ্ন গুণ); কেননা আল্লাহ তা‘আলা অনাদি অনন্তকাল ধরে মুতাকাল্লিম থেকেছেন এবং থাকবেন। আর সুনির্দিষ্ট কোনো কথার ক্ষেত্রে ‘কালাম’ গুণটি সিফাতে ফি‘লিয়া তথা কর্মসংলগ্ন গুণ। কেননা কথা বলা আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি যখন যা ইচ্ছা করেন বলেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿ إِنَّمَآ أَمۡرُهُۥٓ إِذَآ أَرَادَ شَيۡ‍ًٔا أَن يَقُولَ لَهُۥ كُن فَيَكُونُ ٨٢ ﴾ [يس: ٨٢]

নিশ্চয়ই তাঁর ব্যাপার শুধু এই যে, কোন কিছুকে তিনি যদি ‘হও’ বলতে চান, তখনই তা হয়ে যায়। (ইয়াসীন: ৩৬: ৮২)

﴿ وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمٗا ٣٠ ﴾ [الانسان: ٣٠]

আর আল্লাহ ইচ্ছা না করলে তোমরা ইচ্ছা করতে পারবে না; নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রাজ্ঞ। (সূরা আল ইনসান:৩০)

ষষ্ঠ মূলনীতি: সিফাত (গুণাগুণ) সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে বড় দুটি নিষিদ্ধ বিষয় থেকে মুক্ত থাকা খুবই জরুরি। এর একটি হলো ‘তামছীল’ (সাদৃশ্য নির্ধারণ) আর অপরটি হলো ‘তাকয়ীফ’ (ধরণ নির্ধারণ)।

‘তামছীল’ হলো, গুণাগুণ সাব্যস্তকারী ব্যক্তির এ বিশ্বাস আসা যে, আল্লাহর জন্য সে যে গুণাগুণ সাব্যস্ত করছে তা সৃষ্টিজীবের গুণাগুণের অনুরূপ (সৃষ্টিজীবের গুণাগুণের মতো)। এ ধরনের বিশ্বাস বাতিল বিশ্বাস। এর প্রমাণ ওহী ও মানববুদ্ধি।

ওহী থেকে এর প্রমাণ হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ﴾ [الشورى: ١١]

তার মত কিছু নেই। (সূরা আশ-শূরা: ৪২: ১১)

তিনি আরো বলেন:

﴿ أَفَمَن يَخۡلُقُ كَمَن لَّا يَخۡلُقُۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ١٧ ﴾ [النحل: ١٧]

সুতরাং যে সৃষ্টি করে, সে কি তার মত, যে সৃষ্টি করে না? অতএব তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না? (সূরা আন্-নাহল: ১৬: ১৭)

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন:

﴿هَلۡ تَعۡلَمُ لَهُۥ سَمِيّٗا ٦٥ ﴾ [مريم: ٦٥]

তুমি কি তাঁর সমতুল্য কাউকে জান? (মারয়াম: ১৯: ৬৫)

আরো বলেন:

﴿ وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ كُفُوًا أَحَدُۢ ٤ ﴾ [الاخلاص: ٤]

আর তাঁর কোনো সমকক্ষও নেই। (সূরা আল ইখলাস: ১১২: ৪)

মানববুদ্ধির দলিল

প্রথমত: এটা স্বতসিদ্ধভাবে জানা যে সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টিবস্তুর মধ্যে সত্তাগতভাবে পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্যের দাবি হলো এ উভয়ের মধ্যে গুণের ক্ষেত্রেও পার্থক্য হবে। কেননা প্রত্যেক গুণান্বিতের তার উপযুক্ত গুণ বা সিফাত থাকে। এটা ভিন্ন ভিন্ন সৃষ্টবস্তুর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন গুণ থাকার মধ্যে স্পষ্ট। উদাহরণত উটের ক্ষমতা ও পরমাণুর ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অতএব যদি সৃষ্টিবস্তুর গুণের মধ্যে পরস্পরে পার্থক্য থাকে যদিও তারা সৃষ্টিবস্তু হওয়া হিসেবে সমতুল্য, তাহলে সৃষ্টবস্তু ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যে পার্থক্যের বিষয়টি তো আরো স্পষ্ট এবং অধিক শক্তিশালী।

দ্বিতীয়ত: যিনি সৃষ্টকর্তা রব, যিনি সকল দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ তিনি গুণের ক্ষেত্রে কীভাবে সৃষ্টিবস্তুর সমতুল্য হবেন যে নাকি অপূর্ণাঙ্গ ও মুখাপেক্ষী। অতএব যদি কেউ সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টিবস্তু সমতুল্য বলে বিশ্বাস করে তবে তার এ বিশ্বাস সৃষ্টিকর্তার অধিকারকে খর্ব করবে; কেননা যিনি পূর্ণাঙ্গ তাকে অপূর্ণাঙ্গের সঙ্গে উদাহরণ দেওয়া পূর্ণাঙ্গকে অপূর্ণাঙ্গ করে দেওয়া।

তৃতীয়ত: সৃষ্টিবস্তুর মধ্যেও এ বিষয়টি লক্ষ্যণীয় যে নামের ক্ষেত্রে অভিন্নতা থাকলেও প্রকৃতি ও ধরন-ধারণের ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকে। যেমন মানুষের যে হাত রয়েছে তা হাতির হাতের মত নয়। মানুষের শক্তি উটের শক্তির মত নয়। যদিও নাম অভিন্ন। অর্থাৎ এটাও হাত এবং ওটাও হাত। এটাও শক্তি আর ওটাও শক্তি। তবে ধরন-ধারণ ও গুণবৈশিষ্ট্যের মধ্যে পার্থক্য আছে। এর দ্বারা বুঝা গেল যে নাম এক হলেও প্রকৃতিগতভাবে সমতুল্য হওয়া জরুরি নয়।

আর ‘তাশবীহ’ অর্থাৎ সাদৃশ্য নির্ণয় করা ‘তামছীল’ তথা সমতুল্য বলে ধারণা করার মতই। তবে এ দুটির মধ্যে এভাবে পার্থক্য করা যেতে পারে যে, ‘তামছীল’ হলো সকল সিফাতের ক্ষেত্রে সমতুল্য বলে ধারণা করা। আর তাশবীহ হলো অধিকাংশ গুণের ক্ষেত্রে সমতুল্য বলে ধারণা করা। তবে ‘তামছীল’ শব্দটি ব্যবহার করাই হবে অধিক সঙ্গতিপূর্ণ। কেননা এ ক্ষেত্রে আল কুরআনে একই ধাতুর শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন:

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ﴾ [الشورى: ١١]

তার মত কিছু নেই। (সূরা আশ্শুরা: ৪২: ১১)

‘তাকয়ীফ’: তাকয়ীফ হলো সুনির্দিষ্ট কোনো উদাহরণযুক্ত না করেই আল্লাহ তা‘আলার সিফাতের ব্যাপারে ধারণা করা যে তার ধরন এই এই। যেমন কেউ বলল, আল্লাহ তা‘আলার চেহারা আছে আর তার আকার-আকৃতি হলো এই এই। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো মাখলুকের চেহারার উদাহরণ উল্লেখ করল না। এ ধরনের বিশ্বাসও বাতিল বিশ্বাস। এর প্রমাণ ওহী ও মানববুদ্ধির যুক্তি।

ওহী থেকে প্রমাণ হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿وَلَا يُحِيطُونَ بِهِۦ عِلۡمٗا ١١٠ ﴾ [طه: ١١٠]

কিন্তু তারা জ্ঞান দিয়ে তাঁকে বেষ্টন করতে পারবে না। (সূরা তাহা: ২০: ১১০)

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন:

﴿ وَلَا تَقۡفُ مَا لَيۡسَ لَكَ بِهِۦ عِلۡمٌۚ إِنَّ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡبَصَرَ وَٱلۡفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَٰٓئِكَ كَانَ عَنۡهُ مَسۡ‍ُٔولٗا ٣٦ ﴾ [الاسراء: ٣٦]

আর যে বিষয় তোমার জানা নেই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ - এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে। (সূরা আল ইসরা: ১৭: ৩৬)

এটা স্পষ্ট যে আমাদের রব তা‘আলার সিফাতের ধরন-ধারণ কি তা আমাদের জানা নেই। কেননা তিনি সিফাত সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, কিন্তু সিফাতের আকার-প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের জানাননি। অতএব সিফাতের আকার-প্রকৃতি বর্ণনা করার অর্থ এমন বিষয়ে কথা বলা যে বিষয়ে আমাদের আদৌ কোনো জ্ঞান নেই।

মানববুদ্ধির দলিল হলো: কোনো একটি জিনিসের গুণবৈশিষ্ট্যের আকার-প্রকৃতি ওই জিনিসটির সত্তার আকার-প্রকৃতির ব্যাপারে জ্ঞান লাভের পর অথবা ওই জিনিসটির সমতুল্য কোনো জিনিসের জ্ঞান লাভের পর অথবা ওই জিনিস সম্পর্কে সত্যবাদী কোনো ব্যক্তির সংবাদের পরই সম্ভব।

আর আল্লাহ তা‘আলার সিফাতের ক্ষেত্রে উল্লিখিত এ তিনটি পন্থার কোনোটিই প্রযোজ্য নয়। অতএব ‘তাকয়ীফ’ প্রক্রিয়াকে বাতিল বলে বিশ্বাস করা ওয়াজিব। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার সিফাতের আকার-প্রকৃতি কি তা জানা আমাদের পক্ষে অসম্ভব।

উপরন্তু আমরা এ প্রশ্ন করতে পারি যে, আপনি আল্লাহ তা‘আলার সিফাতের জন্যে কি ধরনের আকার-প্রকৃতি নির্ধারণ করবেন?

কারণ আপনি আপনার বুদ্ধি-বিচার দ্বারা যে ধরনের আকার-প্রকৃতিই নির্ধারণ করুন না কেন আল্লাহ তা‘আলা তার থেকেও বড় ও সম্মানিত।

আর আপনি যে ধরনের আকার-প্রকৃতি নির্ধারিত করবেন তাতে আপনি নিশ্চিতরূপেই মিথ্যাবাদী হবেন; কেননা এ ব্যাপারে আপনার কোনো ইলম নেই।

অতএব আল্লাহ তা‘আলার সিফাতের ব্যাপারে সকল প্রকার ‘তাকয়ীফ’ তথা আকার-প্রকৃতি নির্ধারণ থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। হোক তা অন্তরের কল্পনা দ্বারা অথবা জিহ্বার কথা দ্বারা অথবা হাত দ্বারা লিখার মাধ্যমে।

এ ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাস কি হবে তার ব্যাখ্যা খোঁজে পাওয়া যায় ইমাম মালিক র. এর প্রসিদ্ধ উক্তিতে, যা তিনি নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাপারে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন। আয়াতটি হলো:

﴿ ٱلرَّحۡمَٰنُ عَلَى ٱلۡعَرۡشِ ٱسۡتَوَىٰ ٥ ﴾ [طه: ٥]

দয়াময় (আল্লাহ) আরশের উপর উঠেছেন। (সূরা তাহা: ২০: ৫)

উক্ত আয়াতের নিরিখে প্রশ্নকারী প্রশ্ন করে বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে কীভাবে উঠেছেন?’ প্রশ্নটি শোনে ইমাম মালিক র. মাথা নিচু করলেন, এমনকি তাঁর কপাল থেকে ঘাম বেরুতে শুরু করল। এরপর তিনি বললেন:

الاستواء غير مجهول، والكيف غير معقول، والإيمان به واجب، والسؤال عنه بدعة

অর্থাৎ (ইস্তিওয়া তথা ‘ওপরে ওঠা’ অজানা নয়, আর আকার-প্রকৃতি বোধগম্য নয় [অর্থাৎ আল্লাহর ক্ষেত্রে ইস্তিওয়া শব্দের অর্থের আকার-প্রকৃতি কি তা বোধগম্য নয়] তবে এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব এবং এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা বিদ‘আত।) ইমাম মালিক র. এর উস্তাদ রাবিয়া র. এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন: (‘ইস্তিওয়া’ (উপরে উঠা) অজানা নয়, আর এর ধরন-ধারণ বোধগম্য নয়।)

তাদের দুজনের পর আলেমগণ উল্লিখিত নীতির উপরই চলেছেন। আর যদি আকার-প্রকৃতি বোধগম্য বিষয় না হয়ে থাকে এবং এ ব্যাপারে শরীয়তেও কোনো স্পষ্ট বক্তব্য উল্লিখিত না হয়ে থাকে তাহলে এর অর্থ হলো যে যুক্তি ও শরীয়ত উভয়টিই আকার-প্রকৃতি নির্ধারণমূলক সকল দলিল থেকে মুক্ত। অতএব এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।

সুতরাং খুব সাবধান হোন আকার-প্রকৃতি নির্ধারণ এবং এ জাতীয় যেকোনো প্রয়াস থেকে; কেননা যদি এরূপ কাজে আপনি নিপতিত হন তবে তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া কঠিন হবে। আর যদি আপনার অন্তরে এ জাতীয় কোনো কিছু উদিত হয়, তবে নিশ্চিতরূপে জানুন যে তা শয়তানের কুমন্ত্রণা। এ ক্ষেত্রে আপনি আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় প্রার্থনা করুন; কেননা একমাত্র তিনিই আশ্রয় দাতা। ইরশাদ হয়েছে:

﴿ وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ ٱلشَّيۡطَٰنِ نَزۡغٞ فَٱسۡتَعِذۡ بِٱللَّهِۖ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ ٣٦ ﴾ [فصلت: ٣٦]

আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা কখনো তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে তুমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করবে। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা। (সূরা ফুসসিলাত: ৪১: ৩৬)

সপ্তম মূলনীতি: আল্লাহ তা‘আলার সিফাতসমূহ ওহীনির্ভর। এ ক্ষেত্রে বুদ্ধি বিবেচনার কোনো স্থান নেই।

অতএব আমরা আল্লাহ তা‘আলার জন্য এমন কোনো সিফাত বা গুণবৈশিষ্ট্য উল্লেখ করব না যা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। ইমাম আহমদ র. বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলা নিজেকে যেসব গুণে গুণান্বিত করেছেন অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার যেসব গুণের কথা উল্লেখ করেছেন তা ব্যতীত অন্যকোনো গুণ আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করা শুদ্ধ হবে না। এ ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহকে অতিক্রম করা যাবে না। (দেখুন আল্লাহ তা‘আলার নাম-বিষয়ক পঞ্চম মূলনীতি)

নির্দিষ্ট কোনো সিফাত আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত কি না তা কুরআন-সুন্নাহ থেকে তিনভাবে প্রমাণিত করা যাবে:

প্রথমত: সিফাতটি সরাসরি উল্লিখিত থাকা: যেমন আল ইয্যাহ (শক্তি), আল কুউয়াহ (শক্তি), আর রাহমাহ (রহমত), আল বাত্শ (পাকড়াও করা), আল ওয়াজ্হ (চেহারা), আল য়াদাইন (দু‘হাত)। এসব সিফাত সরাসরি উল্লিখিত রয়েছে।

দ্বিতীয়ত: সিফাত সংবলিত নাম উল্লিখিত থাকা: যেমন আল গাফুর (ক্ষমাশীল), এ নামটি ‘আল মাগফিরাহ’ (ক্ষমা) সিফাতকে শামিল করে আছে। আস্‌সামীউ‘ (সর্বশ্রোতা), এ নামটি আস্‌সাসাম্‘উ (শ্রবণ) সিফাতকে শামিল করে আছে। (দেখুম: নাম সম্পর্কে তৃতীয় নীতি)

তৃতীয়ত: সরাসরি কোনো ক্রিয়াপদ অথবা ক্রিয়াপদের অর্থ প্রকাশক শব্দ উল্লিখিত থাকা যা সিফাতকে নির্দেশ করে: যেমন আরশের ওপরে ওঠা, নিম্নাকাশে অবতরণ করা, কিয়ামতের দিন বান্দাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য আসা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়া। উল্লিখিত প্রতিটি সিফাত নিম্নোক্ত আয়াত ও হাদীসে ধারাবাহিকভাবে উল্লিখিত রয়েছে:

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿ ٱلرَّحۡمَٰنُ عَلَى ٱلۡعَرۡشِ ٱسۡتَوَىٰ ٥ ﴾ [طه: ٥]

দয়াময় যিনি আরশের ওপরে উঠেছেন। (সূরা তাহা: ২০: ৫)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস:

«ينزل ربنا كل ليلة إلى السماء الدنيا»

(আমাদের রব প্রতি রাতেই নিম্নাকাশে অবতরণ করেন)

আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿ وَجَآءَ رَبُّكَ وَٱلۡمَلَكُ صَفّٗا صَفّٗا ٢٢ ﴾ [الفجر: ٢٢]

আর তোমার রব ও ফেরেশতাগণ উপস্থিত হবেন সারিবদ্ধভাবে। (সূরা আল ফাজর: ৮৯: ২২)

এবং সবশেষে বলেন:

﴿إِنَّا مِنَ ٱلۡمُجۡرِمِينَ مُنتَقِمُونَ ٢٢ ﴾ [السجدة: ٢٢]

নিশ্চয় আমি অপরাধীদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী। (সূরা আস্‌সাজদা: ৩২: ২২)

দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ৭ পর্যন্ত, সর্বমোট ৭ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে