সূরাঃ ৫৯/ আল-হাশর | Al-Hashr | ٱلْحَشْر আয়াতঃ ২৪ মাদানী
তাফসীরে জাকারিয়া

সূরা সম্পর্কেঃ
এ সূরাকে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সূরা বনী নাদ্বীর বলতেন। সমগ্র সূরা হাশর ইয়াহূদী বনু নাদ্বীর গোত্র সম্পর্কে নাযিল হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। [বুখারী ৪৮৮২]

আহসানুল বায়ান

সূরা আল-হাশর [1]

মদীনায় অবতীর্ণ
[1] এই সূরাটি ইয়াহুদীদের একটি গোত্র ‘বানু-নাযবীর’ এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। এই জন্য এই সূরাটিকে ‘সূরা নাযবীর’ অথবা ‘সূরা বানী নাযবীর’ও বলা হয়। (বুখারী, তাফসীর সূরা হাশ্র, ফাতহুল ক্বাদীর)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৫৯ : ১ سَبَّحَ لِلّٰهِ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ ۚ وَ هُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَكِیۡمُ ﴿۱﴾

আসমানসমূহে ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করছে এবং তিনি মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর গৌরব ও মহিমা ঘোষণা করে। আর তিনি (আল্লাহ) পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। তাইসিরুল

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। মুজিবুর রহমান

Whatever is in the heavens and whatever is on the earth exalts Allah, and He is the Exalted in Might, the Wise. Sahih International

১. আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ্‌র পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ২ هُوَ الَّذِیۡۤ اَخۡرَجَ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا مِنۡ اَهۡلِ الۡكِتٰبِ مِنۡ دِیَارِهِمۡ لِاَوَّلِ الۡحَشۡرِ ؕؔ مَا ظَنَنۡتُمۡ اَنۡ یَّخۡرُجُوۡا وَ ظَنُّوۡۤا اَنَّهُمۡ مَّانِعَتُهُمۡ حُصُوۡنُهُمۡ مِّنَ اللّٰهِ فَاَتٰىهُمُ اللّٰهُ مِنۡ حَیۡثُ لَمۡ یَحۡتَسِبُوۡا ٭ وَ قَذَفَ فِیۡ قُلُوۡبِهِمُ الرُّعۡبَ یُخۡرِبُوۡنَ بُیُوۡتَهُمۡ بِاَیۡدِیۡهِمۡ وَ اَیۡدِی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ٭ فَاعۡتَبِرُوۡا یٰۤاُولِی الۡاَبۡصَارِ ﴿۲﴾

আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তিনিই তাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ী থেকে বের করে দিয়েছিলেন প্রথমবারের মত। তোমরা ধারণাও করনি যে, তারা বেরিয়ে যাবে। আর তারা ধারণা করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর আযাব এমন এক দিক থেকে আসল যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি এবং তিনি তাদের অন্তরসমূহে ত্রাসের সঞ্চার করলেন, ফলে তারা তাদের বাড়ী-ঘর আপন হাতে ও মুমিনদের হাতে ধ্বংস করতে শুরু করল। অতএব হে দৃষ্টিমান লোকেরা তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।’ আল-বায়ান

কিতাবধারীদের অন্তর্ভুক্ত কাফিরদেরকে আক্রমণের প্রথম ধাপেই তিনিই তাদের বাড়ী থেকে বের ক’রে দিলেন। তোমরা ধারণাও করনি যে, তারা বের হবে। আর তারা মনে করেছিল যে, তাদের দূর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহ (’র কবল) থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে এমন দিক থেকে পাকড়াও করলেন যা তারা ভাবতেও পারেনি। তিনি তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করলেন। তারা তাদের নিজেদের হাত দিয়েই নিজেদের ঘরবাড়ী ধ্বংস করল, আর মু’মিনদের হাতেও (ধ্বংস করাল)। অতএব হে দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষেরা! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর। তাইসিরুল

তিনিই কিতাবীদের মধ্যে যারা কাফির তাদেরকে প্রথম সমাবেশেই তাদের আবাসভূমি হতে বিতাড়িত করেছিলেন। তোমরা কল্পনাও করনি যে, তারা নির্বাসিত হবে এবং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্ভেদ্য দুর্গগুলি তাদেরকে রক্ষা করবে আল্লাহ হতে; কিন্তু আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক হতে এলো যা ছিল তাদের ধারনাতীত এবং তাদের অন্তরে তা ত্রাসের সঞ্চার করল। তারা ধ্বংস করে ফেলল তাদের বাড়ীঘর নিজেদের হাতে এবং মু’মিনদের হাতেও। অতএব হে চক্ষুম্মান ব্যক্তিবর্গ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর! মুজিবুর রহমান

It is He who expelled the ones who disbelieved among the People of the Scripture from their homes at the first gathering. You did not think they would leave, and they thought that their fortresses would protect them from Allah; but [the decree of] Allah came upon them from where they had not expected, and He cast terror into their hearts [so] they destroyed their houses by their [own] hands and the hands of the believers. So take warning, O people of vision. Sahih International

২. কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তিনিই তাদেরকে প্রথম সমাবেশের জন্য তাদের আবাসভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিলেন।(১) তোমরা কল্পনাও করনি যে, তারা বেরিয়ে যাবে। আর তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে রক্ষা করবে আল্লাহ্‌র পাকড়াও থেকে; কিন্তু আল্লাহ্‌ তাদের কাছে এমনভাবে আসলেন যা তারা কল্পনাও করেনি। আর তিনি তাদের অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার করলেন। ফলে তারা ধ্বংস করে ফেলল নিজেদের বাড়ি-ঘর নিজেদের হাতে এবং মুমিনদের হাতেও(২); অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যাক্তিগন তোমরা উপদেশ গ্ৰহণ কর।

(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা পৌঁছে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে সর্বপ্রথম মদিনায় ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারী ইয়াহূদী গোত্রসমূহের সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ইয়াহূদীরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হবে না এবং কনো আক্রমণকারীকে সাহায্য করবে না। তারা আক্রান্ত হলে মুসলিমরা তাদেরকে সাহায্য করবে। শান্তিচুক্তিতে আরও অনেক ধারা ছিল। এমনিভাবে বনু নাদীরসহ ইয়াহূদীদের সকল গোত্র এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। মদীনা থেকে দুই মেইল দূরে বনু নাদীরের বসতি, দূর্বেদ্য দূর্গ্য এবং বাগ-বাগিচা ছিল। ওহুদ যুদ্ধ পর্যন্ত বাহ্যতঃ তাদেরকে এই শান্তিচুক্তির অনুসারী দেখা যায়। কিন্তু ওহুদ যুদ্ধের পরে বিশ্বাসঘাতকতা ও গোপন দুরভিসন্ধি শুরু করে দেয়। এই বিশ্বাসঘাতকতার সূচনা এভাবে হয় যে, বনু নাদ্বীরের জনৈক সর্দার কা’ব ইবনে আশরাফ ওহুদ যুদ্ধের পর আরও চল্লিশজন ইয়াহূদীদের সাথে নিয়ে মক্কা পৌঁছে এবং ওহুদ যুদ্ধ ফেরত কুরাইশী কাফেরদের সাথে সাক্ষাৎ করে।

দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পক্ষের মধ্যের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চুক্তি চুড়ান্ত হয়। চুক্তি সম্পাদনের পর কা’ব ইবনে আশরাফ মদীনায় ফিরে এলে জিবরীল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদ্যোপান্ত ঘটনা এবং চুক্তির বিবরণ বলে দেন। এরপর বনু নাদ্বীর আরও অনেক চক্রান্ত করতে থাকে। তন্মধ্যে একটি আলোচ্য আয়াতের সাথে সম্পর্কিত যার কারণে তাদেরকে মদীনা থেকে চলে যেতে হয়। ঘটনাটি হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আগমন করার পর ইয়াহুদীদের সাথে সম্পাদিত শান্তিচুক্তির একটি শর্ত এই ছিল যে, কারো দ্বারা ভুলবশত: হত্যা হয়ে গেলে মুসলিম ও ইয়াহুদী সবাই এর রক্তের বিনিময় পরিশোধ করবে।

একবার আমর ইবনে উমাইয়া দমরীর হাতে দুটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এর রক্ত বিনিময় আদায় করা মুসলিম-ইয়াহুদী সকলেরই কর্তব্য ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য মুসলিমদের কাছ থেকে চাঁদা তুললেন। অতঃপর চুক্তি অনুযায়ী ইয়াহুদীদের কাছ থেকেও রক্ত বিনিময়ের অর্থ গ্রহণ করার ইচ্ছা করলেন। সে মতে তিনি বনু-নাদ্বীর গোত্রের কাছে গমন করলেন। তারা দেখল যে, রাসূলকে হত্যা করার এটাই প্রকৃষ্ট সুযোগ। তাই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক জায়গায় বসিয়ে দিয়ে বলল, আপনি এখানে অপেক্ষা করুন। আমরা রক্ত বিনিময়ের অর্থ সংগ্ৰহ করার ব্যবস্থা করছি। এরপর এরা গোপনে পরামর্শ করে স্থির করল যে, তিনি যে প্রাচীরের নীচে উপবিষ্ট আছেন, এক ব্যক্তি সেই প্রাচীরের উপরে উঠে একটি বিরাট ও ভারী পাথর তার উপর ছেড়ে দিবে, যাতে তার মৃত্যু ঘটে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তৎক্ষণাৎ ওহির মাধ্যমে এই চক্রান্তের বিষয় অবগত হয়ে গেলেন। তিনি সে স্থান ত্যাগ করে চলে এলেন এবং ইয়াহুদীদেরকে বলে পাঠালেনঃ তোমরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে চুক্তি লঙ্ঘন করেছ। অতএব, তোমাদেরকে দশ দিনের সময় দেয়া হলো। এই সময়ের মধ্যে তোমরা যেখানে ইচ্ছা চলে যাও। এই সময়ের পর কেউ এ স্থানে দৃষ্টিগোচর হলে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হবে।

বনু-নাদ্বীর মদিনা ত্যাগ করে চলে যেতে সম্মত হলে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মুনাফিক তাদেরকে বাধা দিয়ে বললঃ তোমরা এখানেই থাক। অন্যত্র যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমার অধীনে দুই হাজার যোদ্ধার একটি বাহিনী আছে। তারা প্ৰাণ দিবে, কিন্তু তোমাদের গায়ে একটি আঁচড়ও লাগতে দিবে না। বনু-নাদ্বীর তাদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সদৰ্পে বলে পাঠালঃ আমরা কোথাও যাব না। আপনি যা করতে পারেন, করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সাথে নিয়ে বনুনাদ্বীর গোত্রকে আক্রমণ করলেন। বনু-নাদ্বীর দুর্গের ফটক বন্ধ করে বসে রইল এবং মুনাফিকরাও আত্মগোপন করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে চতুর্দিক থেকে অবরোধ করলেন এবং তাদের খজুর বৃক্ষে আগুন ধরিয়ে দিলেন এবং কিছু কর্তন করিয়ে দিলেন। অবশেষে নিরূপায় হয়ে তারা নির্বাসনদণ্ড মেনে নিল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই অবস্থায়ও তাদের প্রতি সৌজন্য প্রদর্শন করে আদেশ দিলেন, আসবাবপত্র যে পরিমাণ সঙ্গে নিয়ে যেতে পার, নিয়ে যাও। তবে কোনো অস্ত্ৰ-শস্ত্র সঙ্গে নিতে পারবে না। এগুলো বাজেয়াপ্ত করা হবে। সে মতে বনু-নাদ্বীরের কিছু লোক সিরিয়ায় এবং কিছু লোক খাইবরে চলে গেল। সংসারের প্রতি অসাধারণ মোহের কারণে তারা গৃহের কড়ি-কাঠ, তক্তা ও কপাট পর্যন্ত উপড়িয়ে নিয়ে গেল। ওহুদ যুদ্ধের পর চতুর্থ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে এই ঘটনা সংঘটিত হয়। এরপর উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার খেলাফতকালে তাদেরকে পুনরায় অন্যান্য ইয়াহুদীদের সাথে খাইবর থেকে সিরিয়ায় নির্বাসিত করেন। এই নির্বাসনদ্বয়ই ‘প্রথম সমাবেশ’ ও ‘দ্বিতীয় সমাবেশ’ নামে অভিহিত। প্রথম হাশর রাসূলের যুগে আর দ্বিতীয় হাশর হয়েছিলো উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে। উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর সময়ে ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে আরব উপদ্বীপ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তাদের শেষ হাশর হবে কিয়ামতের দিন। কোন কোন আলেমের মতে এখানে প্রথম হাশর অর্থ প্রথম সমাবেশ। অর্থাৎ বনী নাদীর গোত্রের করার জন্য মুসলিমরা সবেমাত্র একত্রিত হয়েছিলো। লড়াই ও রক্তপাতের কোন অবকাশই সৃষ্টি হয়নি। ইতিমধ্যেই আল্লাহ তা'আলার কুদরাতে তারা দেশান্তরিত হতে প্ৰস্তুত হয়ে গিয়েছে। [দেখুন: ইবন কাসীর,কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]

(২) গৃহের দরজা, কপাট ইত্যাদি নিয়ে যাওয়ার জন্যে তারা নিজেদের হাতে নিজেদের গৃহ ধ্বংস করছিল। পক্ষান্তরে তারা যখন দুর্গের অভ্যন্তরে ছিল, মুসলিমগণ তাদের গৃহ ও গাছপালা ধ্বংস করছিল। [দেখুন: ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) তিনিই আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসী, তাদেরকে প্রথম সমাবেশেই তাদের আবাসভূমি হতে বিতাড়িত করেছেন।[1] তোমরা কল্পনাও করনি যে, তারা নির্বাসিত হবে এবং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহ (এর শাস্তি) হতে রক্ষা করবে;[2] কিন্তু আল্লাহ (এর শাস্তি) তাদের এমন এক দিক হতে এল, যা ছিল তাদের ধারণার বাইরে[3] এবং তাদের অন্তরে তা ত্রাসের সঞ্চার করল।[4] তারা তাদের বাড়ী-ঘর ধ্বংস করছিল নিজেদের হাতে[5] এবং মুমিনদের হাতেও।[6] অতএব হে চক্ষুষমান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। [7]

[1] মদীনার উপকণ্ঠে ইয়াহুদীদের তিনটি গোত্র বসবাস করত। বানু-নায্বীর, বানু-কুরাইযা এবং বানু-ক্বাইনুক্বা। মদীনায় হিজরতের পর নবী (সাঃ) এদের সাথে সন্ধিচুক্তিও করেছিলেন। কিন্তু এরা গোপনে ষড়যন্ত্র করত এবং মক্কার কাফেরদের সাথেও তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্পর্ক রেখেছিল। এমনকি, একদা যখন নবী (সাঃ) তাদের কাছে গিয়েছিলেন, বানু-নাযবীর গোত্রের লোকেরা উপর থেকে রসূল (সাঃ)-এর উপর একটি ভারী পাথর ফেলে তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে রেখেছিল। যথা সময়ে অহীর মাধ্যমে এ ব্যাপারে তাঁকে অবহিত করে দেওয়া হয়। তিনি নিরাপদে সেখান থেকে চলে আসেন এবং তাদের চুক্তি ভঙ্গের কারণে রসূল (সাঃ) তাদের উপর সসৈন্যে আক্রমণ করেন। এরা কিছু দিন তাদের দুর্গে অবরুদ্ধ থেকে অবশেষে প্রাণভিক্ষা স্বরূপ দেশত্যাগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। আর রসূল (সাঃ) তা গ্রহণ করেন। এ ঘটনাকে أَوَّل الحَشْر (প্রথম সমাবেশ) বলে এই জন্য আখ্যায়িত করা হয়েছে যে, এটা ছিল তাদের নির্বাসন। আর এটা হয়েছিল মদীনা থেকে। এখান থেকে তারা খায়বারে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল। এখান হতে উমার (রাঃ) তাদেরকে পুনরায় বহিষ্কার করে শাম (সিরিয়ার) দিকে বিতাড়িত করেন। যার ব্যাপারে বলা হয় যে, এখানেই প্রত্যেক মানুষের সর্বশেষ হাশর (সমাবেশ তথা কিয়ামত-কোর্ট) হবে।

[2] কারণ, তারা অতি মজবুত দুর্গ নির্মাণ করে রেখেছিল। আর এ নিয়ে তাদের গর্বও ছিল এবং মুসলিমরাও মনে করতেন যে, অতি সহজে এ দুর্গ জয় করা সম্ভব হবে না।

[3] আর তা এই ছিল যে, রসূল (সাঃ) তাদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলেছিলেন যা তাদের ধারণা ও চিন্তার বাইরে ছিল।

[4] এই ত্রাস ও ভীতির কারণেই তারা বহিষ্কার হতে প্রস্তুত হয়েছিল। তা না হলে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই (মুনাফিকদের সর্দার) এবং অন্যান্য লোকেরা তাদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে ছিল যে, তোমরা মুসলিমদের সামনে নতি স্বীকার করবে না, আমরা তোমাদের সাথে আছি। এ ছাড়া মহান আল্লাহ নবী করীম (সাঃ)-কে এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন যে, এক মাসের দূরত্বে অবস্থিত শত্রুর মধ্যেও তাঁর ভীতি সঞ্চারিত হয়ে যেত। ফলে তাদের মধ্যে কঠিন আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়ে গেল এবং সব রকমের উপায়-উপকরণ থাকা সত্ত্বেও তারা অস্ত্র ফেলে দিয়ে কেবল এই শর্তটা মুসলিমদেরকে মেনে নিতে বলল যে, যতটা পরিমাণ জিনিসপত্র তারা বয়ে নিয়ে যেতে পারবে, ততটা পরিমাণ জিনিসপত্র তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। সুতরাং এই অনুমতি পাওয়ার পর বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা নিজেদের বাড়ীর দরজা পর্যন্ত তুলে ফেলে!

[5] অর্থাৎ, যখন তারা নিশ্চিত হয়ে গেল যে, দেশ থেকে বহিষ্কার হতেই হবে, তখন তারা অবরোধ অবস্থায় ভিতর থেকেই নিজেদের বাড়ীগুলোকে ধ্বংস করতে শুরু করে দিল। যাতে তা মুসলমানদেরও যেন কোন কাজে না আসে। অথবা অর্থ হল, আসবাব-পত্র নিয়ে যাওয়ার অনুমতি থেকে পূর্ণরূপে উপকৃত হওয়ার জন্য নিজেদের উটগুলোতে সাধ্যমত আসবাব বোঝাই করার জন্য নিজেদের ঘরগুলোকেও ভেঙ্গে-চুরে যা নেওয়ার তা নিয়ে উটের উপর রেখে নিল।

[6] বাইরে থেকে মুসলিমরাও তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করার কাজে লেগে ছিলেন, যাতে তাদেরকে গ্রেফতার করা সহজ হয়। অথবা অর্থ হল, তাদের ভাঙ্গা-চোরা ঘরগুলো থেকে অবশিষ্ট আসবাব বের করার এবং তা সংগ্রহ করার জন্য মুসলিমদেরকে আরো অনেক কিছুই নষ্ট করতে হয়।

[7] এ থেকে যে, কিভাবে আল্লাহ তাদের অন্তরে মুসলিমদের ভয় ঢুকিয়ে দেন। অথচ তারা এক শক্তিশালী এবং বহু উপায়-উপকরণের অধিকারী (রণকুশল) গোত্র ছিল। কিন্তু যখন মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত অবকাশ শেষ হয়ে গেল এবং তিনি তাদেরকে নিজ পাকড়াও-এর পঞ্জার মধ্যে করার চূড়ান্ত ফায়সালা করে নিলেন, তখন না তাদের শক্তি-সামর্থ্য এবং উপায়-উপকরণ কোন কাজে এল, আর না অন্য কোন সাহায্যকারীরা তাদের কোন সাহায্য করতে পারল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ৩ وَ لَوۡ لَاۤ اَنۡ كَتَبَ اللّٰهُ عَلَیۡهِمُ الۡجَلَآءَ لَعَذَّبَهُمۡ فِی الدُّنۡیَا ؕ وَ لَهُمۡ فِی الۡاٰخِرَۃِ عَذَابُ النَّارِ ﴿۳﴾

আর আল্লাহ যদি তাদের জন্য নির্বাসন লিপিবদ্ধ না করতেন, তবে তিনি তাদেরকে দুনিয়াতে শাস্তি দিতেন এবং তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে আগুনের শাস্তি। আল-বায়ান

আল্লাহ যদি তাদের জন্য নির্বাসন না লিখে দিতেন, তাহলে তিনি তাদেরকে দুনিয়াতেই অবশ্য অবশ্যই (অন্য) শাস্তি দিতেন, পরকালে তো তাদের জন্য জাহান্নামের শাস্তি আছেই। তাইসিরুল

আল্লাহ তাদের নির্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে তাদেরকে পৃথিবীতে অন্য শাস্তি দিতেন; পরকালে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। মুজিবুর রহমান

And if not that Allah had decreed for them evacuation, He would have punished them in [this] world, and for them in the Hereafter is the punishment of the Fire. Sahih International

৩. আর আল্লাহ তাদের নির্বাসনদণ্ড লিপিবদ্ধ না করলেও তিনি তাদেরকে দুনিয়াতে (অন্য) শাস্তি দিতেন(১); আর আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে। আগুনের শাস্তি।

(১) ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ইয়াহুদীদের মধ্যে বনু নাদ্বীর ও বনু কুরাইযা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু নদীরকে দেশত্যাগের নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি বনু কুরাইযাকে তাদের স্বস্থানে থাকতে দিয়ে তাদের উপর দয়া দেখালেন। কিন্তু তারাও পরবর্তীতে রাসূলের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করলেন, মহিলা ও সন্তান-সন্ততিদেরকে মুসলিমদের মাঝে বন্টন করে দিলেন। তবে তাদের মাঝে কেউ কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ অবলম্বন করলে রাসূল তাদেরকে অভয় দিলেন, পরে তারা ঈমান এনেছিল। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইয়াহুদীদের বনু কাইনুকা, বনী হারেসা সহ যাবতীয় গোষ্ঠীকেই মদীনা থেকে তাড়িয়ে দিলেন। [মুসলিম: ১৭৬৬]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩) আল্লাহ তাদের নির্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে, অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে (অন্য) শাস্তি দিতেন;[1] আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি।

[1] অর্থাৎ, পূর্ব থেকেই যদি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যে তাদের দেশ ত্যাগ করার কথা লেখা না থাকত, তাহলে তাদেরকে দুনিয়াতেই কঠিন আযাবের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেওয়া হত। যেমন, পরবর্তীতে তাদের ভাই ইয়াহুদীদের অপর এক গোত্র (বানু-কুরাইযা)-কে এমন কঠিন শাস্তি দেওয়া হয় যে, তাদের যুবক পুরুষদেরকে হত্যা করা হয়, অন্যদের বন্দী করা হয় এবং তাদের বিষয়-সম্পত্তিকে মুসলিমদের জন্য ‘মালে গনীমত’ বানিয়ে দেওয়া হয়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ৪ ذٰلِكَ بِاَنَّهُمۡ شَآقُّوا اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ ۚ وَ مَنۡ یُّشَآقِّ اللّٰهَ فَاِنَّ اللّٰهَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ﴿۴﴾

এটি এ জন্য যে, তারা সত্যিই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। আর যে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর। আল-বায়ান

এর কারণ এই যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রবল বিরোধিতা করেছে; আর যে-ই আল্লাহর বিরোধিতা করবে, আল্লাহ তাকে শাস্তিদানে বড়ই কঠোর। তাইসিরুল

উহা এ জন্য যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল, এবং কেহ আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করলেতো আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। মুজিবুর রহমান

That is because they opposed Allah and His Messenger. And whoever opposes Allah - then indeed, Allah is severe in penalty. Sahih International

৪. এটা এ জন্যে যে, নিশ্চয় তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। আর কেউ আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করলে আল্লাহ তো শাস্তি দানে কঠোর।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) এটা এ জন্য যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। আর কেউ আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করলে আল্লাহ তো শাস্তিদানে কঠোর।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ৫ مَا قَطَعۡتُمۡ مِّنۡ لِّیۡنَۃٍ اَوۡ تَرَكۡتُمُوۡهَا قَآئِمَۃً عَلٰۤی اُصُوۡلِهَا فَبِاِذۡنِ اللّٰهِ وَ لِیُخۡزِیَ الۡفٰسِقِیۡنَ ﴿۵﴾

তোমরা যে সব নতুন খেজুর গাছ কেটে ফেলছ অথবা সেগুলোকে তাদের মূলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ। তা তো ছিল আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি ফাসিকদের লাঞ্ছিত করতে পারেন। আল-বায়ান

তোমরা খেজুরের যে গাছগুলো কেটেছ আর যেগুলোকে তাদের মূলকান্ডের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছ, তা আল্লাহর অনুমতিক্রমেই (করেছ)। আর (এ অনুমতি আল্লাহ এজন্য দিয়েছেন) যেন তিনি পাপাচারীদেরকে অপমানিত করেন। তাইসিরুল

তোমরা যে খেজুর বৃক্ষগুলি কর্তন করেছ এবং যেগুলি কান্ডের উপর স্থির রেখে দিয়েছ, তাতো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে; এটা এ জন্য যে, আল্লাহ পাপাচারীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। মুজিবুর রহমান

Whatever you have cut down of [their] palm trees or left standing on their trunks - it was by permission of Allah and so He would disgrace the defiantly disobedient. Sahih International

৫. তোমরা যে খেজুর গাছগুলো কেটেছ এবং যেগুলোকে কাণ্ডের উপর স্থিত রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে(১); এবং এ জন্যে যে, আল্লাহ ফাসিকদেরকে লাঞ্ছিত। করবেন।

(১) বনু নাদ্বীর এর বসতি খেজুর বাগানের ঘেরা ছিল। তারা যখন দুর্গের ভিতরে অবস্থান গ্রহণ করল, তখন কিছু কিছু মুসলিম তাদেরকে উত্তেজিত ও ভীত করার জন্যে তাদের কিছু খেজুর গাছ কর্তন করে অথবা অগ্নিসংযোগ করে খতম করে দিল। অপর কিছু সংখ্যক সাহাবী মনে করলেন, ইনশাআল্লাহ বিজয় তাদের হবে এবং পরিণামে এসব বাগ-বাগিচা মুসলিমদের অধিকারভুক্ত হবে। এই মনে করে তারা বৃক্ষ কর্তনে বিরত রইলেন। এটা ছিল মতের গরমিল। পরে যখন তাদের মধ্যে কথাবার্তা হল, তখন বৃক্ষ কর্তনকারীরা এই মনে করে চিন্তিত হলেন যে, যে বৃক্ষ পরিণামে মুসলিমদের হবে, তা কর্তন করে তারা অন্যায় করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াত নাযিল হল। এতে উভয় দলের কার্যক্রমকে আল্লাহর ইচ্ছার অনুকুলে প্রকাশ করা হয়েছে। [তিরমিযী: ৩৩০৩]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫) তোমরা যে খেজুর বৃক্ষগুলো কর্তন করেছ এবং যেগুলো কান্ডের উপর স্থির রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে এবং যাতে তিনি পাপাচারীদেরকে লাঞ্ছিত করেন। [1]

[1] لِيْنَة এক প্রকার খেজুর। যেমন, আজওয়া, বারনী প্রভৃতি খেজুরের প্রকার। অথবা এর অর্থ, সাধারণ খেজুর গাছ। অবরোধকালীন সময়ে নবী (সাঃ)-এর নির্দেশক্রমে মুসলিমরা বানী-নায্বীরের খেজুর বাগানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কিছু গাছ কেটে দিয়েছিলেন এবং কিছু গাছ নিজ অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ রকম করার লক্ষ্য ছিল, শত্রুর আড়কে ভেঙ্গে দেওয়া এবং এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া যে, মুসলিমরা এখন তোমাদের উপর সম্পূর্ণরূপে জয়যুক্ত হয়েছেন। তাঁরা এখন যেভাবে চাইবেন সেভাবেই তোমাদের ধন-সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন। মহান আল্লাহও মুসলিমদের এই কৌশলভিত্তিক কাজকে সঠিক বলে অনুমোদন করেন এবং এটাকে ইয়াহুদীদের লাঞ্ছনার মাধ্যম বানিয়ে দেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ৬ وَ مَاۤ اَفَآءَ اللّٰهُ عَلٰی رَسُوۡلِهٖ مِنۡهُمۡ فَمَاۤ اَوۡجَفۡتُمۡ عَلَیۡهِ مِنۡ خَیۡلٍ وَّ لَا رِكَابٍ وَّ لٰكِنَّ اللّٰهَ یُسَلِّطُ رُسُلَهٗ عَلٰی مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ عَلٰی كُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۶﴾

আল্লাহ ইয়াহুদীদের নিকট থেকে তাঁর রাসূলকে ফায়* হিসেবে যা দিয়েছেন তোমরা তার জন্য কোন ঘোড়া বা উটে আরোহণ করে অভিযান পরিচালনা করনি। বরং আল্লাহ তাঁর রাসূলগণকে যাদের ওপর ইচ্ছা কতৃত্ব প্রদান করেন। আল্লাহ সকল কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। আল-বায়ান

আল্লাহ তাঁর রসূলকে তাদের কাছ থেকে যে ফায় (বিনা যুদ্ধে পাওয়া সম্পদ) দিয়েছেন তার জন্য তোমরা ঘোড়াও দৌড়াওনি, আর উটেও চড়নি, বরং আল্লাহ তাঁর রসূলগণকে যার উপর ইচ্ছে আধিপত্য দান করেন; আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। তাইসিরুল

আল্লাহ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে যে ‘ফাই’ তাঁর রাসূলকে দিয়েছেন, উহার জন্য তোমরা অশ্ব কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি; আল্লাহতো যার উপর ইচ্ছা তাঁর রাসূলদের কর্তৃত্ব দান করেন; আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। মুজিবুর রহমান

And what Allah restored [of property] to His Messenger from them - you did not spur for it [in an expedition] any horses or camels, but Allah gives His messengers power over whom He wills, and Allah is over all things competent. Sahih International

*যুদ্ধ ছাড়াই যে ধন-সম্পদ অর্জিত হয় তাকে في বলে। এটি সাধারণত বায়তুল মালে জমা রাখা হয় এবং রাসূল স্বীয় তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে তা ব্যবহার করতেন। আর যুদ্ধের মাধ্যমে যা অর্জিত হয় তাকে গনিমত غنيمت বলা হয়।

৬. আর আল্লাহ ইয়াহুদীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে যে ‘ফায়’ দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়ায় কিংবা উটে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি(১); বরং আল্লাহ যার উপর ইচ্ছে তাঁর রাসূলগণকে কর্তৃত্ব দান করেন; আর আল্লাহ্ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।

(১) আয়াতে বর্ণিত أفاء শব্দটি فيء থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ, প্রত্যাবর্তন করানো। যুদ্ধ ও জিহাদ ব্যতীত কাফেরদের কাছ থেকে অর্জিত সকল প্রকার ধন-সম্পদকেই “ফায়” বলা হত। [ইবন কাসীর] সে হিসেবে আলোচ্য আয়াতের সারমর্ম এই যে, যে ধনসম্পদ যুদ্ধ ও জিহাদ ব্যতিরেকে অর্জিত হয়েছে, তা মুজাহিদ ও যোদ্ধাদের মধ্যে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের আইনানুযায়ী বন্টন করা হবে না বরং তা পুরোপুরিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এখতিয়ারে থাকবে। তিনি যাকে যতটুকু ইচ্ছা! করবেন দেবেন, অথবা নিজের জন্যে রাখবেন। উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, “বনু নাদীর এর সম্পদ ছিল এমন সম্পদ যা আল্লাহ তাঁর রাসূলের করায়ত্ব করে দিয়েছিলেন। যাতে মুসলিমদের কোন ঘোড়া বা উটের ব্যবহার লাগেনি। অর্থাৎ যুদ্ধ করতে হয়নি। সুতরাং তা ছিল বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্পদ। তিনি এটা থেকে তার পরিবারের বাৎসরিক খোরাকির ব্যবস্থা করতেন। বাকী যা থাকত তা যোদ্ধাস্ত্র ও আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ হিসেবে থাকত। [বুখারী: ৪৮৮৫, মুসলিম: ১৭৫৭]

অন্য বর্ণনায় এসেছে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তা’আলা ‘ফায়’ তাঁর রাসূলের হাতে দিয়ে দিয়েছেন। তারপর উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু (وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يُسَلِّطُ رُسُلَهُ عَلَىٰ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ) এ আয়াত পাঠ করে বললেন, এতে ‘ফায়’ বিশেষভাবে রাসূলকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তবে তোমাদেরকে বাদ দিয়ে তিনি নিজে সেটা নিয়ে নেননি। তোমাদের উপর নিজেকে প্রাধান্য দেননি। [বুখারী: ৩০৯৩]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) আল্লাহ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে (বিনা যুদ্ধে) যে সম্পদ তাঁর রসূলকে দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়া ছুটাওনি এবং উটও নয়। কিন্তু আল্লাহ যার উপর ইচ্ছা তাঁর রসূলদেরকে কর্তৃত্ব দান করেন।[1] আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।

[1] বানু-নায্বীরের এই এলাকা যা মুসলিমদের দখলে এসেছিল, তা মদীনা হতে তিন-চার মাইল দূরত্বে অবস্থিত ছিল। অর্থাৎ, মুসলিমদেরকে তার জন্য সুদীর্ঘ সফর করার প্রয়োজন হয়নি এবং এর জন্য মুসলিমদেরকে উট ও ঘোড়া দৌড়াতে হয়নি। অনুরূপ যুদ্ধ করারও প্রয়োজন পড়েনি। বরং সন্ধির মাধ্যমে এই এলাকা জয় হয়ে যায়। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তাঁর রসূল (সাঃ)-কে বিনা যুদ্ধেই তাদের উপর জয়যুক্ত করে দিয়েছিলেন। আর এই জন্য এখান থেকে প্রাপ্ত মালকে ‘মালে ফাই’ গণ্য করা হয়। এই মালের বিধান গনীমতের মালের বিধান থেকে আলাদা। অর্থাৎ, فَيْءٌ সেই মালকে বলা হয়, যা বিনা যুদ্ধে শত্রুপক্ষ ত্যাগ করে পালিয়ে যায় অথবা যা সন্ধির মাধ্যমে লাভ হয়। পক্ষান্তরে যে মাল দস্তরমত যুদ্ধ করে জয়যুক্ত হয়ে অর্জিত হয় তাকে ‘মালে গনীমত’ বলা হয়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ৭ مَاۤ اَفَآءَ اللّٰهُ عَلٰی رَسُوۡلِهٖ مِنۡ اَهۡلِ الۡقُرٰی فَلِلّٰهِ وَ لِلرَّسُوۡلِ وَ لِذِی الۡقُرۡبٰی وَ الۡیَتٰمٰی وَ الۡمَسٰكِیۡنِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ۙ كَیۡ لَا یَكُوۡنَ دُوۡلَۃًۢ بَیۡنَ الۡاَغۡنِیَآءِ مِنۡكُمۡ ؕ وَ مَاۤ اٰتٰىكُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡهُ ٭ وَ مَا نَهٰىكُمۡ عَنۡهُ فَانۡتَهُوۡا ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ۘ﴿۷﴾

আল্লাহ জনপদবাসীদের নিকট থেকে তাঁর রাসূলকে ফায় হিসেবে যা দিয়েছেন তা আল্লাহর, রাসূলের, আত্মীয়-স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীন ও মুসাফিরদের এটি এ জন্য যে, যাতে ধন-সম্পদ তোমাদের মধ্যকার বিত্তশালীদের মাঝেই কেবল আবর্তিত না থাকে। রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর। আল-বায়ান

যে ধন-সম্পদ আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে নিয়ে তাঁর রসূলকে দিলেন তা আল্লাহর জন্য তাঁর রসূলের জন্য আর রসূলের আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও পথিকদের জন্য যাতে তা তোমাদের মধ্যকার সম্পদশালীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়। রসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর তোমাদেরকে যাত্থেকে নিষেধ করে তাত্থেকে বিরত থাক, আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা। তাইসিরুল

আল্লাহ এই জনপদবাসীদের নিকট হতে তাঁর রাসূলকে যা কিছু দিয়েছেন তা আল্লাহর, তাঁর রাসূলের, রাসূলের স্বজনগণের এবং ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান শুধু তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে। অতএব রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। মুজিবুর রহমান

And what Allah restored to His Messenger from the people of the towns - it is for Allah and for the Messenger and for [his] near relatives and orphans and the [stranded] traveler - so that it will not be a perpetual distribution among the rich from among you. And whatever the Messenger has given you - take; and what he has forbidden you - refrain from. And fear Allah; indeed, Allah is severe in penalty. Sahih International

৭. আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে ‘ফায়’ হিসেবে যা কিছু দিয়েছেন তা আল্লাহর, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীন ও পথচারীদের(১), যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান শুধু তাদের মধ্যেই ঐশ্বৰ্য আবর্তন না করে। রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্ৰহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক(২) এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্ শাস্তি দানে কঠোর।

(১) أهل القرى বলে এ আয়াতে বনু নাদীর ও বনু কুরাইযা ইত্যাদি গোত্রকে বোঝানো হয়েছে। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]

(২) এ আয়াত দ্বারা সাহাবায়ে কিরাম সবসময়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত যে অবশ্য পালনীয় তা বর্ণনা করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এক মহিলা এসে বলল, শুনেছি আপনি উল্কি আঁকা ও পরচুলা ব্যবহার করা থেকে নিষেধ করেন? এটা কি আপনি আল্লাহর কিতাবে পেয়েছেন? নাকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে পেয়েছেন? তিনি বললেন, অবশ্যই হ্যাঁ, আমি সেটা আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের সুন্নাত সব জায়গায়ই পেয়েছি। মহিলা বলল, আমি তো আল্লাহর কিতাব ঘেটে শেষ করেছি কিন্তু কোথাও পাইনি। তিনি বললেন, তবে কি তুমি তাতে (وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا) “রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্ৰহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক” এটা পাওনি? সে বললঃ হ্যাঁ, তারপর ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, পরচুলা ব্যবহারকারিনী, উল্কি অংকনকারীনী, ভ্ৰু প্লাককারীনীর প্রতি আল্লাহ লা'নত করেছেন। [দেখুন: বুখারী: ৪৮৮৬, ৪৮৮৭, মুসলিম: ২১২৫, আবু দাউদ: ৪১৬৯, তিরমিযী: ২৭৮২, নাসায়ী: ৫০৯৯, ইবনে মাজহ: ১৯৮৯, মুসনাদে আহমাদ: ১/৪৩২]

অনুরূপভাবে ইবনে উমর ও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম বলেন যে, “তারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুব্বা, হানতাম, নাকীর ও মুযাফফাত, (এগুলো জাহেলী যুগের বিভিন্ন প্রকার মদ তৈরী করার পাত্ৰ বিশেষ) এ কয়েক প্রকার পাত্ৰ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তিলাওয়াত করলেন, (وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا) [মুসলিম: ১৯৯৭, আবু দাউদ: ৩৬৯০, নাসায়ী: ৫৬৪৩]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭) আল্লাহ এই জনপদবাসীদের নিকট হতে তাঁর রসূলকে (বিনা যুদ্ধে) যে সম্পদ দিয়েছেন, তা আল্লাহর, রসূলের, (তাঁর) আত্মীয়গণের এবং ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদের জন্য, যাতে তোমাদের মধ্যে যারা ধনবান শুধু তাদের মধ্যেই ধন-মাল আবর্তন না করে। আর রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ৮ لِلۡفُقَرَآءِ الۡمُهٰجِرِیۡنَ الَّذِیۡنَ اُخۡرِجُوۡا مِنۡ دِیَارِهِمۡ وَ اَمۡوَالِهِمۡ یَبۡتَغُوۡنَ فَضۡلًا مِّنَ اللّٰهِ وَ رِضۡوَانًا وَّ یَنۡصُرُوۡنَ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ ؕ اُولٰٓئِكَ هُمُ الصّٰدِقُوۡنَ ۚ﴿۸﴾

এই সম্পদ নিঃস্ব মুহাজিরগণের জন্য ও যাদেরকে নিজেদের ঘর-বাড়ী ও ধন-সম্পত্তি থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। অথচ এরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির অন্বেষণ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করেন। এরাই তো সত্যবাদী। আল-বায়ান

(আর এ সম্পদ) সে সব দরিদ্র মুহাজিরদের জন্য যাদেরকে তাদের বাড়ীঘর ও সম্পত্তি-সম্পদ থেকে উৎখাত করা হয়েছে। যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে, আর তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে সাহায্য করে। এরাই সত্যবাদী। তাইসিরুল

এই সম্পদ অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য যারা নিজেদের ঘরবাড়ী ও সম্পত্তি হতে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্য করে। তারাইতো সত্যাশ্রয়ী। মুজিবুর রহমান

For the poor emigrants who were expelled from their homes and their properties, seeking bounty from Allah and [His] approval and supporting Allah and His Messenger, [there is also a share]. Those are the truthful. Sahih International

৮. এ সম্পদ নিঃস্ব মুহাজিরদের জন্য যারা নিজেদের বাড়িঘর ও সম্পত্তি হতে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ও সস্তুষ্টির অন্বেষণ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্য করে। এরাই তো সত্যাশ্রয়ী।(১)

(১) এ আয়াতে মুহাজিরদের বিশেষ বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে।

তাদের প্রথম গুণ এই যে, তারা স্বদেশ ও সহায়সম্পত্তি থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন। তারা মুসলিম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমর্থক ও সাহায্যকারী শুধু এই অপরাধে মক্কার কাফেররা তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। শেষ পর্যন্ত তারা মাতৃভূমি ধন-সম্পদ ও বাস্তু-ভিটা ছেড়ে হিজরত করতে বাধ্য হন। তাদের কেউ কেউ ক্ষুধার তাড়নায় অতিষ্ঠ হয়ে পেটে পাথর বেধে নিতেন এবং কেউ কেউ শীতে বস্ত্রের অভাবে গর্ত খনন করে শীতের তীব্ৰতা থেকে আত্মরক্ষা করতেন।

তাদের দ্বিতীয় গুণ হল, তারা কোন জাগতিক স্বার্থের বশবর্তী হয়ে ইসলাম গ্ৰহণ করেননি এবং দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে হিজরত করে মাতৃভূমি ও ধন-সম্পদ ত্যাগ করেননি; কেবলমাত্র আল্লাহর রহমত ও সস্তুষ্টিই তাদের কাম্য ছিল।

মুহাজিরদের তৃতীয় বৈশিষ্ট বা গুণ এই যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সন্তুষ্ট করার জন্যই কেবল উপরোক্ত সব কিছু করেছেন। আল্লাহ তা'আলাকে সাহায্য করা অর্থ তাঁর দ্বীনের সাহায্য করা।

চতুর্থ গুণ হল, তারা কথা ও কাজে সত্যবাদী। [তাবারী, ইবন কাসীর, কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮) (এ সম্পদ) অভাবগ্রস্ত মুহাজির (ধর্মের জন্য স্বদেশত্যাগী)দের জন্য, যারা নিজেদের ঘর-বাড়ী ও সম্পত্তি হতে বহিষ্কৃত হয়েছে; তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে সাহায্য করে। তারাই তো সত্যাশ্রয়ী। [1]

[1] এই আয়াতে ‘মালে ফাই’ কোথায় ব্যয় করা হবে তার সঠিক দিক নির্দেশনা করা হয়েছে। অনুরূপ মুহাজির সাহাবীদের ফযীলত, তাঁদের ঐকান্তিকতা এবং তাঁদের সততার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এর পরেও তাঁদের ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা কুরআনকে অস্বীকার করার নামান্তর।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ৯ وَ الَّذِیۡنَ تَبَوَّؤُ الدَّارَ وَ الۡاِیۡمَانَ مِنۡ قَبۡلِهِمۡ یُحِبُّوۡنَ مَنۡ هَاجَرَ اِلَیۡهِمۡ وَ لَا یَجِدُوۡنَ فِیۡ صُدُوۡرِهِمۡ حَاجَۃً مِّمَّاۤ اُوۡتُوۡا وَ یُؤۡثِرُوۡنَ عَلٰۤی اَنۡفُسِهِمۡ وَ لَوۡ كَانَ بِهِمۡ خَصَاصَۃٌ ؕ۟ وَ مَنۡ یُّوۡقَ شُحَّ نَفۡسِهٖ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ۚ﴿۹﴾

আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদীনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালবাসে। আর মুহাজরিদেরকে যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোন ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম। আল-বায়ান

(আর এ সম্পদ তাদের জন্যও) যারা মুহাজিরদের আসার আগে থেকেই (মাদীনাহ) নগরীর বাসিন্দা ছিল আর ঈমান গ্রহণ করেছে। তারা তাদেরকে ভালবাসে যারা তাদের কাছে হিজরাত করে এসেছে। মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তা পাওয়ার জন্য তারা নিজেদের অন্তরে কোন কামনা রাখে না, আর তাদেরকে (অর্থাৎ মুহাজিরদেরকে) নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয়- নিজেরা যতই অভাবগ্রস্ত হোক না কেন। বস্তুত: যাদেরকে হৃদয়ের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে তারাই সফলকাম। তাইসিরুল

মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা এই নগরীতে বসবাস করেছে ও ঈমান এনেছে তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে বিদ্বেষ পোষণ করেনা, আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও; যারা কার্পণ্য হতে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে তারাই সফলকাম। মুজিবুর রহমান

And [also for] those who were settled in al-Madinah and [adopted] the faith before them. They love those who emigrated to them and find not any want in their breasts of what the emigrants were given but give [them] preference over themselves, even though they are in privation. And whoever is protected from the stinginess of his soul - it is those who will be the successful. Sahih International

৯. আর তাদের জন্যও, মুহাজিরদের আগমনের আগে যারা এ নগরীকে নিবাস হিসেবে গ্ৰহণ করেছে ও ঈমান গ্রহণ করেছে, তারা তাদের কাছে যারা হিজরত করে এসেছে তাদের ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা তাদের অন্তরে কোন (না পাওয়াজনিত) হিংসা অনুভব করে না, আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্ৰাধিকার দেয় নিজের অভাবগ্ৰস্ত হলেও।(১) বস্তুতঃ যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।(২)

(১) এখানে আনসারগণের কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। তারা মদীনায় অবস্থান গ্রহণ করেছেন এবং ঈমানে খাঁটি ও পাকাপোক্ত হয়েছেন। সুতরাং আনসারদের একটি গুণ এই যে, যে শহর আল্লাহ তা'আলার কাছে ‘দারুল হিজরত’ ও ‘দারুল ঈমান হওয়ার ছিল, তাতে তাদের অবস্থান ও বসতি মুহাজিরগণের পূর্বেই ছিল। মুহাজিরগণের এখানে স্থানান্তরিত হওয়ার পূর্বেই তারা ঈমান কবুল করে পাকাপোক্ত হয়ে গিয়েছিলেন।

আনসারদের দ্বিতীয় গুণ বৰ্ণনা প্রসংগে বলা হয়েছে যে, “তারা তাদেরকে ভালবাসে, যারা হিজরত করে তাদের শহরে আগমন করেছেন।” এটা দুনিয়ার সাধারণ মানুষের রুচির পরিপন্থী। সাধারণত: লোকেরা এহেন ভিটে-মাটিহীন দুৰ্গত মানুষকে স্থান দেয়া পছন্দ করে না। সর্বত্রই দেশী ও ভিনদেশীর প্রশ্ন উঠে। কিন্তু আনসারগণ কেবল তাদেরকে স্থানই দেননি, বরং নিজ নিজ গৃহে আবাদ করেছেন, নিজেদের ধন-সম্পদে অংশীদার করেছেন এবং অভাবনীয় ইযযত ও সম্ভ্রমের সাথে তাদেরকে স্বাগত জানিয়েছেন। এক একজন মুহাজিরকে জায়গা দেয়ার জন্য কয়েকজন আনসারী আবেদন করেছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত লটারীর মাধ্যমে এর নিস্পত্তি করতে হয়েছে। [দেখুন-ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর,বাগাভী] হাদীসে এসেছে, আনসারগণ এসে বললেন, আমাদের মধ্যে ও আমাদের মুহাজির ভাইদের মধ্যে খেজুরের বাগানও ভাগ করে দিন। রাসূল বললেন, না, তা করা যাবে না। তখন তারা মুহাজিরগণকে বললেন, তাহলে আপনারা আমাদের খেজুর বাগানের পরিচর্যায় শরীক হোন আমরা আপনাদেরকে ফলনে শরীক করবো, তারা বললেন, হ্যাঁ। আমরা তা শুনলাম ও মেনে নিলাম। [বুখারী: ২৩২৫]

অন্য এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনা হিজরত করার পর মুহাজিরগণ এসে তাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যাদের কাছে এসেছি তাদের মত আমরা কাউকে দেখিনি। তারা বেশী থাকলে সবচেয়ে বেশী দানশীল আর কম থাকলে তাতে সহানুভূতির সাথে বন্টন করে দেয়। তারা আমাদেরকে খরচের ব্যাপারে যথেষ্ট করে দিয়েছে। তারা তাদের পেশাতেও আমাদেরকে শরীক করে নিয়েছে। আমরা ভয় পাচ্ছি যে, এরা আমাদের সব সওয়াব নিয়ে যাবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “না, যতক্ষণ তোমরা তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দো'আ করছ এবং তাদের প্রশংসা করছ।” [তিরমিযী: ২৪৮৭, মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৩৬]

আনসারদের তৃতীয় গুণ (وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا) অর্থাৎ ‘মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা তাদের অন্তরে কোন (না পাওয়া জনিত) হিংসা অনুভব করে না’ এই বাক্যের সম্পর্ক একটি বিশেষ ঘটনার সাথে, যা বনু নদীর গোত্রের নির্বাসন এবং তাদের বাগান ও গৃহের উপর মুসলিমদের দখল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় সংঘটিত হয়েছিল। অর্থ এই যে, এ বন্টনে যা কিছু মুহাজিরদেরকে দেয়া হল, মদীনার আনসারগণ সানন্দে তা গ্ৰহণ করে নিলেন; যেন তাদের এসব জিনিসের প্রয়োজন ছিল না। মুহাজিরগণকে দেয়াটা খারাপ মনে করা অথবা অভিযোগ করার তো সামান্যতম কোন সম্ভাবনাই ছিল না। এর মুকাবিলায় “যখন বাহরাইন বিজিত হল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রাপ্ত ধন-সম্পদ সম্পূর্ণই আনসারদের মধ্যে বিলি-বন্টন করে দিতে চাইলেন; কিন্ত তারা তাতে রাযী হলেন না, বরং বললেন, আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কিছুই গ্ৰহণ করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মুহাজির ভাইগণকেও এই ধন-সম্পদ থেকে অংশ না দেয়া হয়।” [বুখারী: ৩৭৯৪]

আনসারগণের চতুর্থ গুণ হচ্ছে, (وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ) অর্থাৎ আনসারগণ নিজেদের উপর মুহাজিরগণকে অগ্ৰাধিকার দিতেন। নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর আগে তাদের প্রয়োজন মেটাতেন; যদিও নিজের অভাবগ্ৰস্ত ও দারিদ্রপীড়িত ছিলেন। এটাই মূলত: উত্তম সাদাকাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সবচেয়ে উত্তম সাদাকাহ হচ্ছে, কষ্টে অর্জিত অল্প সম্পদ থেকে দান করা” [আবু দাউদ: ১৬৭৭, মুসনাদে আহমাদ: ২/৩৫৮, সহীহ ইবনে খুজাইমাহঃ ২৪৪৪, ইবনে হিব্বান: ৩৩৪৬, মুস্তাদরাকে হাকিম: ১/৪১৪]

যে সম্পদের প্রয়োজন তার নিজের খুব বেশী তা থেকে দান করতে সক্ষম হওয়া খুব উচু মনের অধিকারী ব্যক্তি ব্যতীত আর কারও পক্ষে সম্ভব হয় না।  অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “তারা খাবারের মহব্বত থাকা সত্বেও তা অন্যদের খাওয়ায়”। [সূরা আল-ইনসান: ৮] অন্যত্র আল্লাহ্ আরো বলেছেন, “আর সম্পদের প্রতি মহব্বত থাকা সত্বেও তা দান করা”। সূরা আল-বাকারাহ: ১৭৭]

সুতরাং দান বা সাদাকাহ করার সর্বোচ্চ পর্যায় হচ্ছে, নিজের প্রয়োজন থাকা সত্বেও নিজের প্রয়োজনের উপর অন্যের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়ে তা দান বা সাদাকাহ করা। আনসারগণ ঠিক এ কাজটিই করতেন। হাদীসে এসেছে, এক লোক রাসূলের দরবারে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ক্ষুধা আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের স্ত্রীদের কাছে খাবার চেয়ে পাঠালেন কিন্তু তাদের কাছে কিছুই পেলেন না। তখন তিনি বললেন, এমন কোন লোককি পাওয়া যাবে যে, আজ রাতে এ লোকটিকে মেহমানদারী করবে? আল্লাহ তাকে রহমত করবেন। আনসারী এক লোক দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি। লোকটি তার স্ত্রীর নিকট গিয়ে তাকে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেহমান, সুতরাং কোন কিছু বাকী না রেখে সবকিছু দিয়ে হলেও মেহমানদারী করবে। মহিলা বললেন, আল্লাহর শপথ, আমার কাছে তো কেবল বাচ্চার খাবারই অবশিষ্ট আছে। আনসারী বললেন, ঠিক আছে, রাতের খাবারের সময় হলে বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে দিও, তারপর আমরা বাতি নিভিয়ে দিব, এ রাতটি আমরা কষ্ট করে না খেয়েই কাটিয়ে দিব, যাতে মেহমান খেতে পারে। কথামত তাই করা হলো, সকালে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আনসার লোকটি আসলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, “মহান আল্লাহ গতরাত্রে তোমাদের কাণ্ড দেখে হোসেছেন অথবা বলেছেন, আশ্চর্যাম্বিত হয়েছেন।” আর তখনই এ আয়াত নাযিল হয়েছিল [বুখারী: ৩৭৯৮, ৪৮৮৯, মুসলিম: ২০৫৪]

(২) আনসারগণের আত্মত্যাগ ও আল্লাহ্ তা'আলার পথে সবকিছু বিসর্জন দেয়ার কথা বর্ণনা করার পর সাধারণ বিধি হিসেবে বলা হয়েছে যে, যারা মনের কার্পণ্য থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে, তারাই আল্লাহ তা’আলার কাছে সফলকাম। আয়াতে বৰ্ণিত شح শব্দের অর্থ কৃপণতা। [বাগভী] কুরআন ও হাদীসে এর নিন্দা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তোমরা কৃপণতা থেকে বেঁচে থাক; কেননা কৃপণতা তোমাদের পূর্বের লোকদেরকে ধ্বংস করেছিল। তাদেরকে কৃপণতা অন্যায় রক্ত প্রবাহে উদ্ধৃদ্ধ করেছিল এবং হারামকে হালাল করতে বাধ্য করেছিল। [মুসলিম: ২৫৭৮] অন্য হাদীসে এসেছে, “ঈমান ও কৃপণতা কোন বান্দার অন্তরে এক সাথে থাকতে পারে না।” [মুসনাদে আহমাদ ২/৩৪২]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯) আর তাদের (মুহাজিরদের আগমনের) পূর্বে যারা এ নগরী (মদীনা)তে বসবাস করেছে[1] ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, তার জন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না,[2] বরং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তারা (তাদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়।[3] আর যাদেরকে নিজ আত্মার কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম। [4]

[1] এ থেকে আনসারী সাহাবাদেরকে বুঝানো হয়েছে। যাঁরা মুহাজির সাহাবাদের মদীনা আসার পূর্ব থেকেই মদীনার বাসিন্দা ছিলেন এবং মুহাজিরদের হিজরত করে মদীনা আসার পূর্বেই তাঁদের অন্তরে ঈমান প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মুহাজির সাহাবাদের ঈমান আনার পূর্বেই আনসারী সাহাবাগণ ঈমান এনেছিলেন। কেননা, তাঁদের অধিকাংশই মুহাজির সাহাবাদের ঈমান আনার পর ঈমান এনেছেন। অর্থাৎ, مِنْ قَبْلِهِمْ (তাদের পূর্বে)এর অর্থ, مِنْ قَبْلِ هِجْرَتِهِمْ (তাঁদের হিজরত করার পূর্বে)। আর الدَارٌ বলতে دَارُ الْهِجْرَةِ অর্থাৎ, মদীনাকে বুঝানো হয়েছে।

[2] অর্থাৎ, মুহাজির সাহাবীদেরকে আল্লাহর রসূল (সাঃ) যা কিছু দিতেন তাতে তাঁরা না হিংসা করতেন, আর না মনে কোন প্রকার সংকীর্ণতা অনুভব করতেন। যেমন, ‘মালে ফাই’ পাওয়ার প্রথম অধিকারী তাঁদেরকেই গণ্য করা হয়। এতে আনসার সাহাবীগণ কিছুই মনে করেননি।

[3] অর্থাৎ, নিজেদের তুলনায় মুহাজিরদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতেন। নিজেরা ক্ষুধার্ত থাকতেন, কিন্তু মুহাজিরদেরকে খাওয়াতেন। যেমন, হাদীসে একটা ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যে, একদা নবী (সাঃ)-এর নিকট একজন মেহমান এল। কিন্তু রসূল (সাঃ)-এর ঘরে কিছুই ছিল না। সুতরাং একজন আনসারী সাহাবী তাঁকে নিজের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে জানালে স্ত্রী বললেন, ‘ঘরে তো কেবল ছেলেদের খাবার মত সামান্য কিছু আছে।’ পরে উভয়ে পরামর্শ করলেন যে, ছেলেদেরকে আজ (ভুলিয়ে-ভালিয়ে) ক্ষুধার্ত রেখেই ঘুম পাড়িয়ে দাও এবং আমরা নিজেরাও কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে যাব। তবে মেহমানকে খাওয়ানোর সময় (ছল করে) বাতিটা নিভিয়ে দেবে, যাতে সে আমাদের ব্যাপারে জানতে না পারে যে, আমরা তার সাথে খাবার খাচ্ছি না। সকালে যখন এই সাহাবী রসূল (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলেন, তখন তিনি তাঁকে বললেন যে, মহান আল্লাহ তোমার ও তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। ﴿وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ﴾ (সহীহ বুখারী, সূরা হাশরের তফসীর) তাঁদের ত্যাগের একটি বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত এও যে, একজন আনসারী সাহাবীর নিকট দু’জন স্ত্রী ছিল। তিনি তাঁর মুহাজির ভাইকে প্রস্তাব দিলেন যে, আমি তোমার জন্য আমার একজন স্ত্রীকে তালাক দেব। ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর তুমি তাকে বিবাহ করে নেবে! (বুখারী, বিবাহ অধ্যায়)

[4] হাদীসে আছে যে, কৃপণতা হতে দূরে থাক। কারণ, এই কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এই কৃপণতাই তাদেরকে নিজেদের রক্তপাত করতে এবং হারামকে হালাল করে নিতে প্ররোচিত করেছিল। (মুসলিমঃ নেকী অধ্যায়, পরিচ্ছেদঃ অত্যাচার করা হারাম)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ১০ وَ الَّذِیۡنَ جَآءُوۡ مِنۡۢ بَعۡدِهِمۡ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَا اغۡفِرۡ لَنَا وَ لِاِخۡوَانِنَا الَّذِیۡنَ سَبَقُوۡنَا بِالۡاِیۡمَانِ وَ لَا تَجۡعَلۡ فِیۡ قُلُوۡبِنَا غِلًّا لِّلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا رَبَّنَاۤ اِنَّكَ رَءُوۡفٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۱۰﴾

যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে: ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন; এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু। আল-বায়ান

(এ সম্পদ তাদের জন্যও) যারা অগ্রবর্তীদের পরে (ইসলামের ছায়াতলে) এসেছে। তারা বলে- ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে আর আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা কর যারা ঈমানের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রবর্তী হয়েছে, আর যারা ঈমান এনেছে তাদের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে কোন হিংসা বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি বড়ই করুণাময়, অতি দয়ালু।’ তাইসিরুল

যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলেঃ হে আমাদের রাব্ব! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রগামী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন এবং মু’মিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেননা। হে আমাদের রাব্ব! আপনিতো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। মুজিবুর রহমান

And [there is a share for] those who came after them, saying, "Our Lord, forgive us and our brothers who preceded us in faith and put not in our hearts [any] resentment toward those who have believed. Our Lord, indeed You are Kind and Merciful." Sahih International

১০. আর যারা তাদের পরে এসেছে(১), তারা বলে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে ও ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।

(১) এই আয়াতের بعد অর্থেসাহাবায়ে কিরাম মুহাজির ও আনসারগণের পরে কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকল মুসলিম শামিল আছে এবং এ আয়াত তাদের সবাইকে “ফায়” এর মালে হকদার সাব্যস্ত করেছে। [ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর] তবে ইমাম মালেক বলেন, যারা সাহাবায়ে কিরামের জন্য কোন প্রকার বিদ্বেষ পোষণ করবে বা তাদেরকে গালি দেবে তারা ‘ফায়’ এর সম্পপদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। [বাগভী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০) যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং বিশ্বাসে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাদেরকে ক্ষমা কর এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না।[1] হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তো অতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।’

[1] এরা হল ‘মালে ফাই’ পাওয়ার তৃতীয় অধিকারী দল। অর্থাৎ, সাহাবীদের পর আগত এবং তাঁদের অনুসরণকারী। এতে তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন এবং কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল ঈমানদার ও আল্লাহভীরু শামিল। তবে শর্ত হল, তাদেরকে আনসার ও মুহাজিরদেরকে মু’মিন জেনে তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনাকারী হতে হবে। তাঁদের ঈমানে সন্দেহ পোষণকারী, তাঁদেরকে গালি-মন্দকারী এবং তাঁদের বিরুদ্ধে নিজেদের অন্তরে বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণকারী হলে হবে না। ইমাম মালেক (রঃ) এই আয়াত থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে বলেছেন যে, ‘রাফেযী (শিয়া), যে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-দেরকে গাল-মন্দ করে, সে ‘মালে ফাই’ থেকে কোন অংশ পাবে না। কেননা, মহান আল্লাহ সাহাবীদের প্রশংসা করেছেন, কিন্তু রাফেযী তাঁদের নিন্দা গেয়ে বেড়ায়। (ইবনে কাসীর) আয়েশা (রাঃ)  বলেন, তোমাদেরকে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সাহাবীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তোমরা তাঁদেরকে গালি দিলে! আমি তোমাদের নবীকে বলতে শুনেছি যে, ‘‘এই জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত ধ্বংস হবে না, যতক্ষণ না তাদের পরবর্তী লোকেরা পূর্ববর্তী লোকেদেরকে অভিসম্পাত করবে।’’ (বাগবী)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ১১ اَلَمۡ تَرَ اِلَی الَّذِیۡنَ نَافَقُوۡا یَقُوۡلُوۡنَ لِاِخۡوَانِهِمُ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا مِنۡ اَهۡلِ الۡكِتٰبِ لَئِنۡ اُخۡرِجۡتُمۡ لَنَخۡرُجَنَّ مَعَكُمۡ وَ لَا نُطِیۡعُ فِیۡكُمۡ اَحَدًا اَبَدًا ۙ وَّ اِنۡ قُوۡتِلۡتُمۡ لَنَنۡصُرَنَّكُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ یَشۡهَدُ اِنَّهُمۡ لَكٰذِبُوۡنَ ﴿۱۱﴾

তুমি কি মুনাফিকদেরকে দেখনি যারা আহলে কিতাবের মধ্য হতে তাদের কাফির ভাইদেরকে বলে, ‘তোমাদেরকে বের করে দেয়া হলে আমরাও তোমাদের সাথে অবশ্য বেরিয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনোই কারো আনুগত্য করব না। আর তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা হলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব।’ আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা মিথ্যাবাদী। আল-বায়ান

তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা মুনাফিকী করেছিল? আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কুফুরী করেছিল তাদের সেই ভাইদেরকে তারা (অর্থাৎ মুনাফিকরা) বলেছিল- ‘তোমরা যদি বহিস্কৃত হও, তাহলে অবশ্য অবশ্যই আমরাও তোমাদের সাথে বেরিয়ে যাব, আর তোমাদের ব্যাপারে আমরা কক্ষনো কারো কথা মেনে নেব না। আর যদি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়, তাহলে আমরা অবশ্য অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব। আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তারা অবশ্যই মিথ্যেবাদী। তাইসিরুল

তুমি কি মুনাফিকদেরকে দেখনি? তারা কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদের ঐ সব সঙ্গীকে বলেঃ তোমরা যদি বহিস্কৃত হও তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশত্যাগী হব এবং আমরা তোমাদের ব্যাপারে কখনও কারও কথা মানবো না এবং যদি তোমরা আক্রান্ত হও তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব। কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। মুজিবুর রহমান

Have you not considered those who practice hypocrisy, saying to their brothers who have disbelieved among the People of the Scripture, "If you are expelled, we will surely leave with you, and we will not obey, in regard to you, anyone - ever; and if you are fought, we will surely aid you." But Allah testifies that they are liars. Sahih International

১১. আপনি কি মুনাফিকদেরকে দেখেননি? তারা কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদের সেসব ভাইকে বলে, তোমরা যদি বহিস্কৃত হও, আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশত্যাগী হব এবং আমরা তোমাদের ব্যাপারে কখনো কারো কথা মানবো না এবং যদি তোমরা আক্রান্ত হও আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১১) তুমি কি মুনাফিকদেরকে দেখনি? তারা আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছে, তাদের সেই ভাইদেরকে বলে, ‘তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশত্যাগী হব এবং আমরা তোমাদের ব্যাপারে কখনো কারো কথা মানব না এবং যদি তোমরা আক্রান্ত হও তবে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব।’[1] কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। [2]

[1] যেমন পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে যে, মুনাফিকরা বানু-নায্বীরের কাছে এই বার্তা পাঠিয়েছিল।

[2] তাদের মিথ্যাবাদিতা পরিষ্কার হয়ে সামনে এসে গেল। বানু-নায্বীর দেশত্যাগ করতে বাধ্য হল। এরা না তাদের সাহায্যে এগিয়ে এল, আর না তাদের সমর্থনে মদীনা ছাড়ার আগ্রহ দেখাল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ১২ لَئِنۡ اُخۡرِجُوۡا لَا یَخۡرُجُوۡنَ مَعَهُمۡ ۚ وَ لَئِنۡ قُوۡتِلُوۡا لَا یَنۡصُرُوۡنَهُمۡ ۚ وَ لَئِنۡ نَّصَرُوۡهُمۡ لَیُوَلُّنَّ الۡاَدۡبَارَ ۟ ثُمَّ لَا یُنۡصَرُوۡنَ ﴿۱۲﴾

তারা (ইহুদিরা) যদি বহিষ্কৃত হয় তবে এরা (মুনাফিকরা) কখনো তাদের সাথে বেরিয়ে যাবে না আর তাদের (ইয়াহুদীদের) সাথে যদি যুদ্ধ করা হয় এরা (মুনাফিকরা) কখনো তাদেরকে সাহায্য করবে না। আর যদি তাদেরকে সাহায্য করে তবে তারা অবশ্যই পিঠ দেখিয়ে পালাবে; এরপর তারা কোন সাহায্যই পাবে না। আল-বায়ান

তারা বহিস্কৃত হলেও এরা তাদের সাথে বেরিয়ে যাবে না। তাদের উপর আক্রমণ করা হলেও এরা তাদেরকে কক্ষনো সাহায্য করবে না। আর এরা সাহায্য করলেও তারা (অর্থাৎ মুনাফিকরা) অবশ্য অবশ্যই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে, অতঃপর তারা (অর্থাৎ কাফিররা) আর কোন সাহায্যই পাবে না। তাইসিরুল

বস্তুতঃ তারা বহিস্কৃত হলে মুনাফিকরা তাদের সাথে দেশ ত্যাগ করবেনা এবং তারা আক্রান্ত হলে তারা তাদেরকে সাহায্য করবেনা এবং তারা সাহায্য করতে এলেও অবশ্যই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে, অতঃপর তারা কোন সাহায্যই পাবেনা। মুজিবুর রহমান

If they are expelled, they will not leave with them, and if they are fought, they will not aid them. And [even] if they should aid them, they will surely turn their backs; then [thereafter] they will not be aided. Sahih International

১২. বস্তুত তারা বহিস্কৃত হলে মুনাফিকরা তাদের সাথে দেশত্যাগ করবে না এবং তারা আক্রান্ত হলে এরা তাদেরকে সাহায্য করবে না এবং এরা সাহায্য করতে আসলেও অবশ্যই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে; তারপর তারা কোন সাহায্যই পাবে না।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১২) বস্তুতঃ তারা বহিষ্কৃত হলে, (মুনাফিকরা) তাদের সাথে দেশ ত্যাগ করবে না এবং তারা আক্রান্ত হলে, তারা তাদেরকে সাহায্য করবে না[1] এবং তারা সাহায্য করতে এলেও[2] অবশ্যই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে,[3] অতঃপর তারা কোন সাহায্যই পাবে না। [4]

[1] এটা মুনাফিকদের পূর্বের মিথ্যা অঙ্গীকারের অতিরিক্ত কিছু ব্যাখ্যা। হলও তা-ই। বানু-নায্বীর নির্বাসিত হল এবং বানু-কুরাইযাকে হত্যা ও বন্দী করা হল। কিন্তু মুনাফিকরা তাদের কারো সাহায্যের জন্য এগিয়ে এল না।

[2] এটা একটি আপাত স্বীকার্য কথা। কারণ, যে জিনিস না হওয়ার কথা মহান আল্লাহ বলে দিয়েছেন, তার অস্তিত্ব কিভাবে সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, তারা ইয়াহুদীদের সাহায্য করার ইচ্ছা করলেও।

[3] অর্থাৎ, পরাজিত হয়ে।

[4] উদ্দেশ্য ইয়াহুদী। অর্থাৎ, যখন তাদের সাহায্যকারী মুনাফিকরাই পরাজিত হয়ে যাবে, তখন ইয়াহুদীরা কিভাবে সাহায্য পাবে ও সফলকাম হবে? কেউ কেউ এ থেকে মুনাফিকদেরকে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, তাদেরকে কোন সাহায্য করা হবে না, বরং আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন এবং তাদের মুনাফিক্বী অভ্যাস তাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ১৩ لَاَنۡتُمۡ اَشَدُّ رَهۡبَۃً فِیۡ صُدُوۡرِهِمۡ مِّنَ اللّٰهِ ؕ ذٰلِكَ بِاَنَّهُمۡ قَوۡمٌ لَّا یَفۡقَهُوۡنَ ﴿۱۳﴾

প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে আল্লাহর চাইতে তোমাদের ভয় বেশী; এটা এ কারণে যে, তারা অবুঝ সম্প্রদায়। আল-বায়ান

তাদের অন্তরে আল্লাহর চেয়ে তোমাদের ভয়ই বেশি প্রবল। এর কারণ এই যে, তারা এক বিবেক-বুদ্ধিহীন সম্প্রদায়। তাইসিরুল

প্রকৃত পক্ষে, তাদের অন্তরে আল্লাহ অপেক্ষা তোমরাই অধিকতর ভয়ংকর। এটা এ জন্য যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়। মুজিবুর রহমান

You [believers] are more fearful within their breasts than Allah. That is because they are a people who do not understand. Sahih International

১৩. প্রকৃতপক্ষে এদের অন্তরে আল্লাহর চেয়ে তোমাদের ভয়ই সবচেয়ে বেশী। এটা এজন্যে যে, এরা এক অবুঝ সম্প্রদায়।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৩) প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে[1] আল্লাহ অপেক্ষা তোমরাই অধিকতর ভয়ংকর; এটা এই জন্য যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়। [2]

[1] ইয়াহুদীদের অথবা মুনাফিকদের কিংবা ওদের সকলের অন্তরে।

[2] অর্থাৎ, তোমাদের এই ভয় তাদের অন্তরে প্রবেশ করার কারণ হল তাদের নির্বুদ্ধিতা। কেননা, তাদের যদি জ্ঞান-বুদ্ধি থাকত, তাহলে বুঝে নিত যে, মুসলিমদের জয় ও আধিপত্য মহান আল্লাহর পক্ষ হতে। কাজেই ভয় করতে হলে আল্লাহকেই করতে হয়, মুসলিমদেরকে নয়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ১৪ لَا یُقَاتِلُوۡنَكُمۡ جَمِیۡعًا اِلَّا فِیۡ قُرًی مُّحَصَّنَۃٍ اَوۡ مِنۡ وَّرَآءِ جُدُرٍ ؕ بَاۡسُهُمۡ بَیۡنَهُمۡ شَدِیۡدٌ ؕ تَحۡسَبُهُمۡ جَمِیۡعًا وَّ قُلُوۡبُهُمۡ شَتّٰی ؕ ذٰلِكَ بِاَنَّهُمۡ قَوۡمٌ لَّا یَعۡقِلُوۡنَ ﴿ۚ۱۴﴾

তারা সম্মিলিতিভাবে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না তবে সুরক্ষিত জনপদের মধ্যে অবস্থান করে বা দেয়ালের পেছন হতে; তারা নিজেরা নিজেদেরকে প্রবল শক্তিধর মনে করে; তুমি তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ মনে করছ অথচ তাদের অন্তরসমূহ বিচ্ছিন্ন। এটি এজন্য যে, তারা নির্বোধ সম্প্রদায়। আল-বায়ান

তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সমর্থ নয়, সুরক্ষিত জনপদে বা দেয়ালের আড়ালে অবস্থান ছাড়া। তাদের নিজেদের মধ্যেই আছে ভীষণ শত্রুতা। তুমি তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ মনে কর কিন্তু তাদের অন্তরগুলো ভিন্ন ভিন্ন। এর কারণ এই যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়। তাইসিরুল

তারা সবাই সমবেতভাবেও তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সমর্থ হবেনা, কিন্তু শুধু সুরক্ষিত জনপদের অভ্যন্তরে অথবা দুর্গ প্রাচীরের অন্তরালে থেকে, পরস্পরের মধ্যে তাদের যুদ্ধ প্রচন্ড। তুমি মনে কর তারা ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু তাদের মনের মিল নেই; এটা এ জন্য যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়। মুজিবুর রহমান

They will not fight you all except within fortified cities or from behind walls. Their violence among themselves is severe. You think they are together, but their hearts are diverse. That is because they are a people who do not reason. Sahih International

১৪. এরা সবাই সংঘবদ্ধভাবেও তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সমর্থ হবে না, কিন্তু শুধু সুরক্ষিত জনপদের ভিতরে অথবা দূর্গ-প্রাচীরের আড়ালে থেকে; পরস্পরের মধ্যে তাদের যুদ্ধ প্রচণ্ড। আপনি মনে করেন তারা ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু তাদের মনের মিল নেই; এটা এজন্যে যে, এরা এক নির্বোধ সম্প্রদায়।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪) কেবলমাত্র সুরক্ষিত জনপদের অভ্যন্তরে অথবা দুর্গ-প্রাচীরের আড়ালে থেকে ছাড়া তারা সবাই সমবেতভাবেও তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সমর্থ হবে না।[1] পরস্পরের মধ্যে তাদের যুদ্ধ প্রচন্ড।[2] তুমি মনে কর তারা ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু তাদের মনগুলি ভিন্ন ভিন্ন। [3] এটা এ জন্য যে, ওরা হল নির্বোধ সম্প্রদায়।[4]

[1] অর্থাৎ, এই মুনাফিক ও ইয়াহুদীরা আপোসে মিলিত হয়েও উবমুক্ত ময়দানে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার হিম্মত রাখে না। অবশ্য দুর্গে আবদ্ধ হয়ে অথবা দেওয়ালের পিছনে লুকিয়ে তোমাদের উপর আক্রমণ করতে পারে। আর এ থেকে পরিষ্কার যে, এরা অত্যধিক ভীরু এবং তোমাদের ভয়ে কম্পমান।

[2] অর্থাৎ, আপোসে এরা একে অপরের ঘোর বিরোধী। তাই এদের আপোসের গালি-গালাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ একটি সাধারণ ব্যাপার।

[3] এই হল মুনাফিকদের আপোসের অন্তরের অবস্থা অথবা ইয়াহুদী ও মুনাফিকদের অবস্থা কিংবা মুশরিক ও কিতাবধারীদের অবস্থা। অর্থাৎ, সত্যের বিরোধিতায় তাদেরকে দেখে লাগে এক রকম। কিন্তু আসলে তাদের অন্তর এক রকম নয়। তারা একে অপর থেকে ভিন্ন এবং তাদের অন্তঃকরণ একে অপরের বিরুদ্ধে হিংসা ও বিদ্বেষে পরিপূর্ণ।

[4] অর্থাৎ, এই বিরোধ ও দ্বন্দ্বের কারণ হল তাদের নির্বুদ্ধিতা। যদি তাদের বুঝার মত জ্ঞান-বুদ্ধি থাকত, তাহলে তারা সত্যকে জেনে নিয়ে তা গ্রহণ করে নিত।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ১৫ كَمَثَلِ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِهِمۡ قَرِیۡبًا ذَاقُوۡا وَبَالَ اَمۡرِهِمۡ ۚ وَ لَهُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ﴿ۚ۱۵﴾

তাদের অব্যবহিত পূর্বসূরিদের ন্যায়, যারা নিজেদের কৃতকর্মের কুফল আস্বাদন করেছে; আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আল-বায়ান

এরা তাদের (অর্থাৎ ইয়াহূদী বানু কাইনুকার) মত যারা এদের পূর্বে নিকটবর্তী সময়েই তাদের কৃতকর্মের কুফল আস্বাদন করেছে। তাদের জন্য আছে মর্মান্তিক শাস্তি। তাইসিরুল

তাদের তুলনা তাদের পূর্বে যারা নিজেদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করেছে, এবং তাদের জন্যও রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। মুজিবুর রহমান

[Theirs is] like the example of those shortly before them: they tasted the bad consequence of their affair, and they will have a painful punishment. Sahih International

১৫. এরা সে লোকদের মত, যারা এদের অব্যবহিত পূর্বে নিজেদের কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করেছে(১), আর তাদের জন্য রয়েছে। যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

(১) এখানে কাদের কথা বলা হচ্ছে তা নির্ধারণ করা নিয়ে দু'টি মত রয়েছে। মুজাহিদ বলেন, এরা হচ্ছে বদরের কাফের যোদ্ধা। পক্ষান্তরে ইবনে আব্বাস বলেন, এরা হচ্ছে বনু কাইনুকা এর ইয়াহুদীরা। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৫) (ওরা) তাদের মত, যারা তাদের অব্যবহিত পূর্বে গত হয়েছে, যারা নিজেদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করেছে।[1] আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [2]

[1] এ থেকে কেউ কেউ মক্কার মুশরিকদেরকে বুঝিয়েছেন। যারা বানু-নায্বীর যুদ্ধের কিছু দিন পূর্বে বদর যুদ্ধে চরমভাবে পরাজিত হয়েছিল। অর্থাৎ, এরাও পরাজয় ও লাঞ্ছনার শিকার হওয়ার ব্যাপারে মুশরিকদের মতনই, যাদের যামানা অতি নিকটেই অতিবাহিত হয়েছে। কেউ কেউ ইয়াহুদীদের দ্বিতীয় গোত্র বানু-ক্বাইনুক্বা’কে বুঝিয়েছেন। যাদেরকে বানু-নায্বীরদের পূর্বে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং যারা কাল ও স্থান উভয় দিক দিয়েই এদের কাছাকাছি ছিল।(ইবনে কাসীর)

[2] এই যে শাস্তি তারা ভোগ করল এটা তো দুনিয়ার শাস্তি। এ ছাড়াও তাদের জন্য রয়েছে আখেরাতের শাস্তি; যা হবে অতীব যন্ত্রণাদায়ক।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ১৬ كَمَثَلِ الشَّیۡطٰنِ اِذۡ قَالَ لِلۡاِنۡسَانِ اكۡفُرۡ ۚ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ اِنِّیۡ بَرِیۡٓءٌ مِّنۡكَ اِنِّیۡۤ اَخَافُ اللّٰهَ رَبَّ الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۱۶﴾

(এরা) শয়তান-এর ন্যায়, সে মানুষকে বলেছিল, ‘কুফরি কর’, অতঃপর যখন সে কুফরি করল তখন সে বলল, আমি তোমার থেকে মুক্ত; নিশ্চয় আমি সকল সৃষ্টির রব আল্লাহকে ভয় করি। আল-বায়ান

(তাদের মিত্ররা তাদেরকে প্রতারিত করেছে) শয়ত্বানের মত। যখন মানুষকে সে বলে- ‘কুফুরী কর’। অতঃপর মানুষ যখন কুফুরী করে তখন শয়ত্বান বলে- ‘তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।’ তাইসিরুল

তাদের তুলনা হচ্ছে শাইতান, যখন সে মানুষকে বলে, কুফরী কর। অতঃপর যখন সে কুফরী করে তখন শাইতান বলেঃ তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আমি জগতসমূহের রাব্ব আল্লাহকে ভয় করি। মুজিবুর রহমান

[The hypocrites are] like the example of Satan when he says to man, "Disbelieve." But when he disbelieves, he says, "Indeed, I am disassociated from you. Indeed, I fear Allah, Lord of the worlds." Sahih International

১৬. এরা শয়তানের মত, সে মানুষকে বলে, কুফরী কর; তারপর যখন সে কুফরী করে তখন সে বলে, তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, নিশ্চয় আমি সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহকে ভয় করি।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৬) (ওরা) শয়তানের মত, যে মানুষকে বলে, অবিশ্বাস কর। অতঃপর যখন সে অবিশ্বাস করে, তখন শয়তান বলে, ‘তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, [1] নিশ্চয় আমি বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।’ [2]

[1] এখানে ইয়াহুদী ও মুনাফিকদের আর একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। মুনাফিকরা ইয়াহুদীদের কোনই সাহায্য না করে যেমন অসহায় ছেড়ে দিয়েছিল, অনুরূপ আচরণ শয়তানও করে মানুষের সাথে। প্রথমে সে মানুষকে ভ্রষ্ট করে। সুতরাং সে যখন তার অনুসরণ করে কুফরী করে বসে, তখন সে (শয়তান) তার সাথে সম্পর্ক-ছিন্নতার কথা ঘোষণা করে।

[2] শয়তান তার এই কথায় সত্যবাদী নয়। উদ্দেশ্য কেবল সেই কুফরী থেকে স্বতন্ত্রতা ও সম্পর্কহীনতার ঘোষণা দেওয়া, যা মানুষ তার চক্রান্তে করে থাকে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ১৭ فَكَانَ عَاقِبَتَهُمَاۤ اَنَّهُمَا فِی النَّارِ خَالِدَیۡنِ فِیۡهَا ؕ وَ ذٰلِكَ جَزٰٓؤُا الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۱۷﴾

তাদের দু’জনের পরিণতি ছিল এই যে, তারা দু’জনেই জাহান্নামী হবে, সেখানে তারা স্থায়ী হবে; আর এটাই যালিমদের প্রতিদান। আল-বায়ান

কাজেই তাদের উভয়ের পরিণাম হবে এই যে, তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, আর যালিমদের এটাই প্রতিফল। তাইসিরুল

ফলে উভয়ের পরিণাম হবে জাহান্নাম। সেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং এটাই যালিমদের কর্মফল। মুজিবুর রহমান

So the outcome for both of them is that they will be in the Fire, abiding eternally therein. And that is the recompense of the wrong-doers. Sahih International

১৭. ফলে তাদের দু'জনের পরিণাম এই যে, তারা দু’জনই জাহান্নামী হবে। সেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং এটাই যালিমদের প্রতিদান।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৭) ফলে উভয়ের পরিণাম হবে জাহান্নাম। সেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং এটাই সীমালংঘনকারীদের কর্মফল। [1]

[1] অর্থাৎ, خلود في النار জাহান্নামের চিরন্তন শাস্তি।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ১৮ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ لۡتَنۡظُرۡ نَفۡسٌ مَّا قَدَّمَتۡ لِغَدٍ ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ ﴿۱۸﴾

হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আর প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা সে আগামীকালের জন্য কি প্রেরণ করেছে; তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত। আল-বায়ান

হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। প্রত্যেকেই চিন্তা করে দেখুক, আগামীকালের জন্য সে কী (পুণ্য কাজ) অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পুরোপুরি খবর রাখেন। তাইসিরুল

হে মু’মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর, প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক যে, আগামী কালের জন্য সে কি অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর আল্লাহকে ভয় কর; তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। মুজিবুর রহমান

O you who have believed, fear Allah. And let every soul look to what it has put forth for tomorrow - and fear Allah. Indeed, Allah is Acquainted with what you do. Sahih International

১৮. হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; এবং প্ৰত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা আগামী কালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে।(১) আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।

(১) এ আয়াতে কেয়ামত বোঝাতে গিয়ে لِغَدٍ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ আগামীকাল। [কুরতুবী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৮) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। [1] আর প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক যে, আগামী কালের (কিয়ামতের) জন্য সে কি অগ্রিম পাঠিয়েছে। [2] তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। [3]

[1] এখানে ঈমানদারদেরকে সম্বোধন করে তাদেরকে নসীহত করা হচ্ছে। আল্লাহকে ভয় করার অর্থ হল, তিনি যে সমস্ত কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা সম্পাদন কর এবং যা করতে নিষেধ করেছেন, তা করো না। আয়াতে এই কথাটা তাকীদ স্বরূপ দু’বার বলা হয়েছে। কারণ এই তাকওয়া (আল্লাহর ভয়)ই মানুষকে সৎকর্ম করতে এবং অসৎকর্ম থেকে বাঁচাতে উৎসাহ দান করে।

[2] কিয়ামতকে ‘আগামী কাল’ বলে আখ্যায়িত করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এর সংঘটন কাল বেশী দূরে নয়, বরং অতি নিকটে।

[3] সুতরাং তিনি সকলকে তার আমলের প্রতিদান দেবেন। নেককারদেরকে তাদের নেক কাজের বদলা এবং পাপীদেরকে তাদের পাপের বদলা।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ১৯ وَ لَا تَكُوۡنُوۡا كَالَّذِیۡنَ نَسُوا اللّٰهَ فَاَنۡسٰهُمۡ اَنۡفُسَهُمۡ ؕ اُولٰٓئِكَ هُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ ﴿۱۹﴾

তোমরা তাদের মত হইও না, যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল ফলে আল্লাহও তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছিলেন; আর তারাই হল ফাসিক। আল-বায়ান

তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহও তাদেরকে করেছেন আত্মভোলা। এরা পাপাচারী লোক। তাইসিরুল

আর তাদের মত হয়োনা যারা আল্লাহকে বিস্মৃত হয়েছে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করেছেন। তারাইতো পাপাচারী মুজিবুর রহমান

And be not like those who forgot Allah, so He made them forget themselves. Those are the defiantly disobedient. Sahih International

১৯. আর তোমরা তাদের মত হয়ে না যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে; ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করেছেন। তারাই তো ফাসিক।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯) আর তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহকে বিস্মৃত হয়েছে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করেছেন। [1] তারাই তো পাপাচারী।

[1] অর্থাৎ, আল্লাহ শাস্তিস্বরূপ তাদেরকে এমন করে দিলেন যে, তারা এমন সব কাজ করা থেকে উদাসীন হয়ে গেল যাতে ছিল তাদের উপকার এবং যার দ্বারা তারা নিজেদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাতে পারত। এইভাবে মানুষ আল্লাহকে ভুলে আসলে নিজেকেই ভুলে যায়। তার জ্ঞান-বুদ্ধি তাকে সঠিক দিক-নির্দেশনা করে না। চোখ দু’টি তাকে সঠিক পথ দেখায় না এবং তার কান সত্য কথা শুনতে বধির হয়ে যায়। ফলে তার দ্বারা এমন কাজ হয়ে যায়, যাতে থাকে তার নিজেরই ধ্বংস ও বিনাশ।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৯ : ২০ لَا یَسۡتَوِیۡۤ اَصۡحٰبُ النَّارِ وَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ؕ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ هُمُ الۡفَآئِزُوۡنَ ﴿۲۰﴾

জাহান্নামবাসী ও জান্নাতবাসীরা সমান নয়; জান্নাতবাসীরাই সফলকাম। আল-বায়ান

জাহান্নামের অধিবাসী আর জান্নাতের অধিবাসী সমান হতে পারে না, জান্নাতের অধিবাসীরাই সফল। তাইসিরুল

জাহান্নামের অধিবাসী এবং জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম। মুজিবুর রহমান

Not equal are the companions of the Fire and the companions of Paradise. The companions of Paradise - they are the attainers [of success]. Sahih International

২০. জাহান্নামের অধিবাসী এবং জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই তো সফলকাম।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(২০) জাহান্নামের অধিবাসী এবং জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। [1] জান্নাতের অধিবাসীরাই সফলকাম। [2]

[1] যারা আল্লাহকে ভুলে এ কথাও ভুলে গেছে যে, তারা এইভাবে নিজেদেরই উপর অত্যাচার করছে এবং এক দিন এমন আসবে যে, এর ফলস্বরূপ তাদের এই দেহ, যার জন্যে তারা দুনিয়াতে বহু কষ্ট ও অনেক দৌড়-ঝাঁপ করছে, তা জাহান্নামের আগুনের জ্বালানী হবে। আর এদের বিপরীত কিছু লোক এমন আছে, যারা আল্লাহকে স্মরণে রাখে। তাঁর যাবতীয় বিধি-বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে। এক দিন আসবে, যেদিন আল্লাহ তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং স্বীয় জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। যেখানে তাদের আরাম ও শান্তির জন্য সব রকমের নিয়ামত ও সুখ-সুবিধা থাকবে। এই উভয় দল অর্থাৎ, জান্নাতী ও জাহান্নামী সমান হবে না। আর উভয় দল সমান কিভাবেই বা হতে পারে? এক দল নিজের পরিণামকে স্মরণে রেখে তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় দল নিজের পরিণাম থেকে ছিল উদাসীন। তাই তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার ব্যাপারে অপরাধমূলক উদাসীনতা প্রদর্শন করেছে।

[2] যেমন, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণকারী সফলকাম হয় এবং ভিন্নজন অসফল হয়, অনুরূপ আল্লাহভীরু মু’মিন জান্নাত লাভের সফলতা অর্জন করবে। কারণ, এর জন্য সে দুনিয়াতে সৎকর্মের মাধ্যমে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ, দুনিয়া হল কর্মক্ষেত্র ও পরীক্ষালয়। যে এই বাস্তবতাকে বুঝে নেবে এবং পরিণাম থেকে উদাসীন হয়ে জীবন-যাপন করবে না, সে সফলতা অর্জন করবে। পক্ষান্তরে যে পার্থিব জীবনের বাস্তবতাকে বুঝতে না পেরে পরিণাম থেকে উদাসীন হয়ে অন্যায়-অনাচারে লিপ্ত থাকবে, সে ক্ষতিগ্রস্ত ও অসফল হবে। اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ الْفَائْزِيْنَ

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
তাজউইদ কালার কোড
হামযা ওয়াসল মাদ্দে তাবিঈ ইখফা মাদ্দে ওয়াজিব গুন্নাহ মাদ্দে জায়েয নীরব ইদগাম (গুন্নাহ সহ) ক্বলক্বলাহ লাম শামসিয়্যাহ ইদগাম (গুন্নাহ ছাড়া) ইদগাম শাফাউই ইক্বলাব ইখফা শাফাউই মাদ্দে লাযিম ইদগাম মুতাক্বারিবাইন ইদগাম মুতাজানিসাইন