بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৫৮ সূরাঃ আল-মুজাদালা | Al-Mujadila | سورة المجادلة - আয়াত সংখ্যাঃ ২২ - মাদানী
৫৮:১ قَدۡ سَمِعَ اللّٰہُ قَوۡلَ الَّتِیۡ تُجَادِلُکَ فِیۡ زَوۡجِہَا وَ تَشۡتَکِیۡۤ اِلَی اللّٰہِ ٭ۖ وَ اللّٰہُ یَسۡمَعُ تَحَاوُرَکُمَا ؕ اِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌۢ بَصِیۡرٌ ﴿۱﴾

আল্লাহ অবশ্যই সে রমনীর কথা শুনেছেন যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছিল আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিল। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শোনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। আল-বায়ান

আল্লাহ তার কথা শুনেছেন যে নারী (খাওলাহ বিনত সা‘লাবাহ) তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছে, আল্লাহ তোমাদের দু’জনের কথা শুনছেন, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। তাইসিরুল

(হে রাসূল) আল্লাহ শুনেছেন সেই নারীর কথা যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করেছে এবং আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করেছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শোনেন; আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। মুজিবুর রহমান

১. আল্লাহ অবশ্যই শুনেছেন সে নারীর কথা; যে তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর কাছেও ফরিয়াদ করছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শুনেন; নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা।(১)

(১) শরীআতের পরিভাষায় এই বিশেষ মাসআলাটিকে ‘যিহার’ বলা হয়। এই সূরার প্রাথমিক আয়াতসমূহে যিহারের শরীআতসম্মত বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। এতে আল্লাহ তা’আলা খাওলা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার ফরিয়াদ শুনে তার জন্য তার সমস্যা সমাধান করে দিয়েছেন। তার খাতিরে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে এসব আয়াত নাযিল করেছেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ সেই সত্তা পবিত্র, যার শোনা সবকিছুকে শামিল করে। যিনি সব আওয়ায ও প্রত্যেকের ফরিয়াদ শুনেন; খাওলা বিনতে সালাবাহ যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তার স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করছিল, তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু এত নিকটে থাকা সত্বেও আমি তার কোনো কোনো কথা শুনতে পারিনি। অথচ আল্লাহ তা’আলা সব শুনেছেন এবং বলেছেনঃ (قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ) [বুখারী: ৭৩৮৫, নাসায়ী: ৩৪৬০]।

তাই সাহাবায়ে কেরাম এই মহিলার প্রতি অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করতেন। একদিন খলীফা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একদল লোকের সাথে গমনরত ছিলেন। পথিমধ্যে এই মহিলা সামনে এসে দণ্ডায়মান হলে তিনি দাঁড়িয়ে তার কথাবার্তা শুনলেন। কেউ কেউ বললঃ আপনি এই বৃদ্ধার খাতিরে এতবড় দলকে পথে আটকিয়ে রাখলেন। খলিফা বললেনঃ জান ইনি কে? এ সেই মহিলা, যার কথা আল্লাহ তা’আলা সপ্ত আকাশের উপরে শুনেছেন। অতএব, আমি কি তার কথা এড়িয়ে যেতে পারি? আল্লাহর কসম, তিনি যদি স্বেচ্ছায় প্রস্থান না করতেন, তবে আমি রাত্রি পর্যন্ত তার সাথে এখানেই দাঁড়িয়ে থাকতাম। [ইবনে কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) (হে রসূল!) অবশ্যই আল্লাহ শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শুনেন।[1] নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

[1] এখানে খাওলা বিনতে মালেক বিন সা’লাবা (রাঃ) র ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাঁর স্বামী তাঁর সাথে ‘যিহার’ করেছিল। ‘যিহার’ মানে স্ত্রীকে এই বলা যে, ‘তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মত।’ জাহেলী যুগে যিহারকে তালাক গণ্য করা হত। সুতরাং খাওলা (রাঃ)  বড়ই অস্থির হয়ে পড়েন। আর তখন যিহারের ব্যাপারে কোন বিধান অবতীর্ণ হয়নি। ফলে তিনি রসূল (সাঃ)-এর কাছে এলেন। তিনিও এ ব্যাপারে একটু নীরবতা অবলম্বন করলেন এবং খাওলা (রাঃ)  তাঁর সাথে বাদানুবাদ করেই যাচ্ছিলেন। ঠিক এ সময়ই এই আয়াতগুলো নাযিল হয়। এতে যিহারের মাসআলা, তার বিধান এবং তার কাফফারার কথা বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে। (আবূ দাউদ তালাক অধ্যায়ঃ যিহার পরিচ্ছেদ) আয়েশা (রাঃ)  বলেন, মহান আল্লাহ কিভাবে মানুষের কথা শুনে থাকেন যে, একটি মহিলা রসূল (সাঃ)-এর সাথে বাদানুবাদ করছিল এবং তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করছিল। আমি তার কথা শুনতে পাইনি, কিন্তু মহান আল্লাহ সাত আসমানের উপর থেকে তার কথা শুনে নিয়েছেন। (ইবনে মাজাহঃ ভূমিকা, বুখারীতেও বিনা সনদে সংক্ষিপ্তভাবে তাওহীদ অধ্যায়ে এ বর্ণনা রয়েছে)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৮:২ اَلَّذِیۡنَ یُظٰہِرُوۡنَ مِنۡکُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِہِمۡ مَّا ہُنَّ اُمَّہٰتِہِمۡ ؕ اِنۡ اُمَّہٰتُہُمۡ اِلَّا الّٰٓیِٴۡ وَلَدۡنَہُمۡ ؕ وَ اِنَّہُمۡ لَیَقُوۡلُوۡنَ مُنۡکَرًا مِّنَ الۡقَوۡلِ وَ زُوۡرًا ؕ وَ اِنَّ اللّٰہَ لَعَفُوٌّ غَفُوۡرٌ ﴿۲﴾

তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার* করে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছে। আর তারা অবশ্যই অসঙ্গত ও অসত্য কথা বলে। আর নিশ্চয় আল্লাহ অধিক পাপ মোচনকারী, বড়ই ক্ষমাশীল। আল-বায়ান

তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে জিহার করে (অর্থাৎ স্ত্রীকে বলে যে, তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মত) তাদের স্ত্রীরা তাদের মা নয়। তাদের মা তো কেবল তারাই যারা তাদের জন্ম দিয়েছে। তারা অবশ্যই ঘৃণ্য ও মিথ্যে কথা বলে, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপ মোচনকারী, বড়ই ক্ষমাশীল। তাইসিরুল

তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে তারা জেনে রাখুক যে, তাদের স্ত্রীরা তাদের মা নয়; যারা তাদেরকে জন্মদান করে শুধু তারাই তাদের মা; তারাতো অসঙ্গত ও ভিত্তিহীন কথাই বলে; নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপ মোচনকারী, ক্ষমাশীল। মুজিবুর রহমান

* স্ত্রীকে মায়ের সাথে অথবা মায়ের কোন অংগের সাথে তুলনা করাকে ‘যিহার’ বলে। প্রাচীন আরব সমাজে স্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলনা করার মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হত। ইসলামে এর মাধ্যমে সরাসরি বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। তবে অসঙ্গত কথা বলার কারণে কাফ্ফারা দিতে হয়।

২. তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, তারা জেনে রাখুক—তাদের স্ত্রীরা তাদের মা নয়, যারা তাদেরকে জন্ম দান করে শুধু তারাই তাদের মা; তারা তো অসঙ্গত ও অসত্য কথাই বলে।(১) আর নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক পাপ মোচনকারী ও বড় ক্ষমাশীল।

(১) يُظَاهِرُونَ শব্দটি ظهار থেকে উদ্ভূত। আরবে অনেক সময় এমন ঘটনা ঘটতো যে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হলে স্বামী ক্রোধান্বিত হয়ে বলত أنت على كظهر أمي এর আভিধানিক অর্থ হলো, “তুমি আমার জন্য ঠিক আমার মায়ের পিঠের মত।” জাহেলী যুগে আরবদের কাছে “যিহার” তালাক বা তার চেয়ে অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা বলে মনে করা হত। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে এর অর্থ ছিল এই যে, স্বামী তার স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্কই ছিন্ন করছে না বরং তাকে নিজের মায়ের মত হারাম করে নিচ্ছে। এ কারণে আরবদের মতে তালাক দেয়ার পর তা প্রত্যাহার করা যেত। কিন্তু যিহাআর প্রত্যাহার করার কোন সম্ভাবনাই অবশিষ্ট থাকত না।

আলোচ্য আয়াতের মাধ্যমে ইসলামী শরীআত এই প্রথার দ্বিবিধ সংস্কার সাধন করেছে। প্রথমতঃ স্বয়ং প্রথাকেই অবৈধ ও গোনাহ সাব্যস্ত করেছে। কেননা স্ত্রীকে মাতা বলে দেয়া একটা আসার ও মিথ্যা বাক্য। তাদের এই অসার উক্তির কারণে স্ত্রী মা হয়ে যায় না। মা তো সে-ই যার পেট থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছে, তাদের এই উক্তি মিথ্যা এবং পাপও। কারণ, বাস্তব ঘটনার বিপরীতে স্ত্রীকে মাতা বলছে। দ্বিতীয় সংস্কার এই করেছেন যে, যদি কোনো মূর্খ অর্বাচীন ব্যক্তি এরূপ করেই বসে, তবে এই বাক্যের কারণে ইসলামী শরীআতে স্ত্রী চিরতরে হারাম হবে না। কিন্তু এই বাক্য বলার পর স্ত্রীকে পূর্ববৎ ভোগ করার অধিকারও তাকে দেয়া হবে না। বরং তাকে জরিমানাস্বরূপ কাফফারা আদায় করতে হবে। [দেখুন: ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে (তারা জেনে রাখুক যে,) তাদের স্ত্রীরা তাদের মাতা নয়; যারা তাদেরকে জন্মদান করে, শুধু তারাই তাদের মাতা,[1] তারা তো অসঙ্গত ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপমোচনকারী, পরম ক্ষমাশীল। [2]

[1] এখানে যিহারের বিধান এই বর্ণনা হল যে, মুখে ‘মা’ বলে দিলেই স্ত্রী মা হয়ে যায় না। পক্ষান্তরে যদি কেউ তার স্ত্রীকে মায়ের পরিবর্তে নিজের মেয়ে অথবা নিজের বোনের পিঠের মত বলে দেয়, তাহলে তা যিহার গণ্য হবে কি না? ইমাম মালিক এবং ইমামা আবূ হানীফা (রঃ) এটাকেও যিহার গণ্য করেছেন। পক্ষান্তরে অন্যান্য উলামাগণ এটাকে যিহার গণ্য করেন না। (প্রথম উক্তিটাই বেশী সঠিক মনে হচ্ছে।) অনুরূপভাবে এ ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে যে, যদি কেউ বলে যে, ‘তুমি আমার মায়ের মত’ এবং পিঠের কথা উল্লেখই না করে। তাহলে এ ব্যাপারে আলেমগণ বলেন, যদি যিহারের নিয়তে উক্ত শব্দ ব্যবহার করে, তাহলে তা যিহার হবে, অন্যথা হবে না। ইমাম আবূ হানীফা (রঃ) বলেন, যদি এমন কোন অঙ্গের সাথে তুলনা করে, যা দেখা জায়েয, তবে তা যিহার হবে না। ইমাম শাফেয়ী (রঃ)র কথা হল, কেবল পিঠের সাথে তুলনা করলে যিহার হবে (নচেৎ না)। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[2] এই জন্যই তিনি ঐ গর্হিত ও মিথ্যা কথার পাপ থেকে ক্ষমা লাভের উপায়স্বরূপ কাফফারার (প্রায়শ্চিত্ত ও জরিমানার) বিধান দিয়েছেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৮:৩ وَ الَّذِیۡنَ یُظٰہِرُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ ثُمَّ یَعُوۡدُوۡنَ لِمَا قَالُوۡا فَتَحۡرِیۡرُ رَقَبَۃٍ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّتَمَآسَّا ؕ ذٰلِکُمۡ تُوۡعَظُوۡنَ بِہٖ ؕ وَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ ﴿۳﴾

আর যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে অতঃপর তারা যা বলেছে তা থেকে ফিরে আসে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। আল-বায়ান

যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে জিহার করে, অতঃপর তারা যে কথা বলেছে তা প্রত্যাহার করে নেয় তবে পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বে তাদেরকে একটি দাস মুক্ত করতে হবে, এর দ্বারা তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। তাইসিরুল

যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে ‘‘যিহার’’ করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তাহলে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করতে হবে - এই নির্দেশ তোমাদেরকে দেয়া হল। তোমরা যা কর আল্লাহ তা সম্যক অবগত। মুজিবুর রহমান

৩. আর যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে(১), তবে একে অন্যকে স্পর্শ করার আগে একটি দাস মুক্ত করতে হবে, এ দিয়ে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া যাচ্ছে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।

(১) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা يَعُودُونَ শব্দের অর্থ করেছেন يندمون অর্থাৎ একথা বলার পর তারা অনুতপ্ত হয় এবং স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করতে চায়। [দেখুন: বাগভী] এই আয়াত থেকে আরও জানা গেল যে, স্ত্রীর সাথে মেলামেশা হালাল হওয়ার উদ্দেশ্যেই কাফফারা ওয়াজিব হয়েছে। খোদ যিহার কাফফারার কারণ নয়। বরং যিহার করা এমন গোনাহ, যার কাফ্‌ফারা হচ্ছে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। আয়াত শেষে (وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورٌ) বলে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাই কোনো ব্যক্তি যদি যিহার করার পর স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করতে না চায়, তবে কোনো কাফফারা দিতে হবে না। তবে স্ত্রীর অধিকার ক্ষুন্ন করা না জায়েয। স্ত্রী দাবী করলে কাফফারা আদায় করে মেলামেশা করা অথবা তালাক দিয়ে মুক্ত করা ওয়াজিব। স্বামী স্বেচ্ছায় এরূপ না করলে স্ত্রী আদালতে রুজু হয়ে স্বামীকে এরূপ করতে বাধ্য করতে পারে। [দেখুন: কুরতুবী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩) যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে,[1] তাহলে (এর প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে[2] একটি দাসের মুক্তিদান। এর দ্বারা তোমাদেরকে সদুপদেশ দেওয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন।

[1] এখন এই বিধানকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে। রুজু’ বা প্রত্যাহার করা মানেঃ স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে চাওয়া।

[2] অর্থাৎ, সহবাস করার পূর্বে কাফফারা আদায় করবে। (ক) একটি ক্রীতদাস স্বাধীন করবে। (খ) তা না পারলে লাগাতার কোন বিরতি ছাড়াই দু’ মাস রোযা রাখবে। যদি রাখতে রাখতে মধ্যখানে কোন শরীয়তী কারণ ছাড়াই রোযা বন্ধ করে দেয়, তাহলে পুনরায় আবার নতুনভাবে প্রথম থেকে দু’ মাসের রোযা পূর্ণ করতে হবে। আর শরীয়তী কারণ বলতে যেমন, অসুস্থতা বা সফরে যাওয়া ইত্যাদি। (গ) যদি লাগাতার দু’মাস রোযা রাখতে না পারে, তবে ষাটজন মিসকীনকে (এক বেলা) আহার করাবে। কেউ কেউ বলেন, প্রত্যেক মিসকীনকে দুই মুদ্দ (অর্ধসা’ অর্থাৎ, সওয়া এক কিলো), আবার কেউ বলেন, এক মুদ্দ (গম বা চাল) দিলেই যথেষ্ট হবে। তবে কুরআনের আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, খাবার পেটপুরে খাওয়াতে হবে অথবা পেট ভরে যায় এতটা পরিমাণ খাদ্য দিতে হবে। অনুরূপ সকল মিসকীনকে একই সাথে খাওয়ানোও জরুরী নয়, বরং একাধিক কিস্তীর মাধ্যমে এ সংখ্যা পূরণ করা যেতে পারে। (ফাতহুল ক্বাদীর) তবে এটা জরুরী যে, যতক্ষণ না নির্দিষ্ট সংখ্যা পূরণ হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে সহবাস করা জায়েয হবে না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৮:৪ فَمَنۡ لَّمۡ یَجِدۡ فَصِیَامُ شَہۡرَیۡنِ مُتَتَابِعَیۡنِ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّتَمَآسَّا ۚ فَمَنۡ لَّمۡ یَسۡتَطِعۡ فَاِطۡعَامُ سِتِّیۡنَ مِسۡکِیۡنًا ؕ ذٰلِکَ لِتُؤۡمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَ رَسُوۡلِہٖ ؕ وَ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَ لِلۡکٰفِرِیۡنَ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ﴿۴﴾

কিন্তু যে তা পাবে না, সে লাগাতার দু’মাস সিয়াম পালন করবে, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে। আর যে (এরূপ করার) সামর্থ্য রাখে না সে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। এ বিধান এ জন্য যে, তোমরা যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন। আর এগুলো আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমা এবং কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আল-বায়ান

কিন্তু যার (দাস সংগ্রহ করার) সামর্থ্য নেই, সে এক নাগাড়ে দু’মাস রোযা রাখবে পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বে। আর যে তা করতে পারবে না, সে ষাট জন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। এ নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এ জন্য যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনো। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। (যারা এটা অস্বীকার করবে সেই) কাফিরদের জন্য আছে মর্মান্তিক শাস্তি। তাইসিরুল

কিন্তু যার এ সামর্থ্য নেই, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে তাকে একাদিক্রমে দুই মাস সিয়াম পালন করতে হবে। যে তাতেও অসমর্থ হবে সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে; এটা এ জন্য যে, তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর। এগুলি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান, কাফিরদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। মুজিবুর রহমান

৪. কিন্তু যার এ সামর্থ্য থাকবে না, একে অন্যকে স্পর্শ করার আগে তাকে একাদিক্ৰমে দু’মাস সিয়াম পালন করতে হবে; যে তাতেও অসমৰ্থ, সে ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াবে(১); এটা এ জন্যে যে, তোমরা যেন আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান আন। আর এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান; আর কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শান্তি।

(১) অর্থাৎ যিহারের কাফফারা এই যে, একজন দাস অথবা দাসীকে মুক্ত করবে। এরূপ করতে সক্ষম না হলে একাদিক্ৰমে দুই মাস রোযা রাখবে। রোগ-ব্যাধি কিংবা দুর্বলতাবশতঃ এতগুলো রোযা রাখতেও সক্ষম না হলে ষাট জন মিসকীনকে পেট ভরে আহার করাবো। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) কিন্তু যার এ সামর্থ্য থাকবে না, (তার প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একাদিক্রমে দুই মাস রোযা পালন। যে তাতেও অসমর্থ হবে, সে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াবে। এটা এই জন্য যে, তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস স্থাপন কর। এ হল আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি-বিধান। আর অবিশ্বাসীদের জন্য বেদনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৮:৫ اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحَآدُّوۡنَ اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ کُبِتُوۡا کَمَا کُبِتَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ وَ قَدۡ اَنۡزَلۡنَاۤ اٰیٰتٍۭ بَیِّنٰتٍ ؕ وَ لِلۡکٰفِرِیۡنَ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ ۚ﴿۵﴾

যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে তাদেরকে অপদস্থ করা হবে যেভাবে অপদস্থ করা হয়েছিল তাদের পূর্ববর্তীদেরকে। আর আমি নাযিল করেছি সুস্পষ্ট প্রমাণাদি। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে অপমানজনক আযাব। আল-বায়ান

যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতা করে তাদেরকে লাঞ্ছিত করা হবে যেমন লাঞ্ছিত করা হয়েছিল তাদের পূর্ববর্তীদেরকে। আমি সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেছি আর (অস্বীকারকারী) কাফিরদের জন্য আছে অপমানজনক শাস্তি, তাইসিরুল

যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদেরকে অপদস্থ করা হবে যেমন অপদস্থ করা হয়েছে তাদের পূর্ববর্তীদেরকে; আমি সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেছি; কাফিরদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। মুজিবুর রহমান

৫. নিশ্চয় যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তাদেরকে অপদস্থ করা হবে যেমন অপদস্থ করা হয়েছে তাদের পূর্ববর্তীদেরকে;(১) আর আমরা সুস্পষ্ট আয়াত নাযিল করেছি; আর কাফিরদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি—

(১) মূল আয়াতে ব্যবহৃত শব্দটি হচ্ছে كُبِتُوا এর অর্থ হচ্ছে লাঞ্ছিত করা, ধ্বংস করা, অভিসম্পাত দেয়া, দরবার থেকে বিতাড়িত করা, ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া, অপমানিত করা। [ইবন কাসীর, বাগভী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫) যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদেরকে অপদস্থ করা হবে,[1] যেমন অপদস্থ করা হয়েছে তাদের পূর্ববর্তীদেরকে।[2] অবশ্যই আমি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেছি। আর অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।

[1] كُبِتُوا কর্মবাচ্যসূচক ক্রিয়াপদ। ভবিষ্যতে ঘটবে এমন ঘটনাবলীকে অতীত কালের ক্রিয়া দ্বারা বর্ণনা করে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, তার ঘটা ও বাস্তবায়ন এত সুনিশ্চিত যে, যেন তা হয়েই গেছে। বাস্তবে হলও তাই। মক্কার এই মুশরিকরা বদরের দিন লাঞ্ছিত হল। কিছুকে হত্যা এবং কিছুকে বন্দী করা হল। মুসলিমরা তাদের উপর জয়লাভ করলেন। মুসলিমদের বিজয়ই ছিল তাদের জন্য বড় লাঞ্ছনাদায়ক ব্যাপার।

[2] অর্থাৎ অতীতের উম্মতদেরকে এই বিরোধিতার কারণেই অপদস্থ, লাঞ্ছিত ও ধ্বংস করা হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৮:৬ یَوۡمَ یَبۡعَثُہُمُ اللّٰہُ جَمِیۡعًا فَیُنَبِّئُہُمۡ بِمَا عَمِلُوۡا ؕ اَحۡصٰہُ اللّٰہُ وَ نَسُوۡہُ ؕ وَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ شَہِیۡدٌ ﴿۶﴾

যে দিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুজ্জীবিত করে উঠাবেন অতঃপর তারা যে আমল করেছিল তা তাদেরকে জানিয়ে দেবেন। আল্লাহ তা হিসাব করে রেখেছেন যদিও তারা তা ভুলে গেছে। আর আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী। আল-বায়ান

সেদিন, যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে আবার জীবিত করে উঠাবেন এবং তাদের কৃতকর্মের সংবাদ তাদেরকে জানিয়ে দিবেন, আল্লাহ তা হিসেব করে রেখেছেন যদিও তারা (নিজেরা) ভুলে গেছে। আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী। তাইসিরুল

সেদিন, যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে একত্রে পুনরুত্থিত করবেন এবং তাদেরকে জানিয়ে দিবেন যা তারা করত; আল্লাহ উহার হিসাব রেখেছেন, যদিও তারা তা বিস্মৃত হয়েছে। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা। মুজিবুর রহমান

৬. সে দিন, যেদিন আল্লাহ্‌ তাদের সবাইকে পুনরুজ্জীবিত করে উঠাবেন। অতঃপর তারা যা আমল করেছিল তিনি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন; আল্লাহ্‌ তা হিসেব করে রেখেছেন যদিও তারা তা ভুলে গেছে। আর আল্লাহ্‌ সব কিছুর প্রত্যক্ষদর্শী।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে একত্রে পুনরুত্থিত করবেন এবং তাদেরকে জানিয়ে দেবেন যা তারা করত; আল্লাহ ওর হিসাব রেখেছেন, আর তারা তা ভুলে গেছে। [1] আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা। [2]

[1] এটা মস্তিষ্কে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান। অর্থাৎ, পাপ এত প্রচুর এবং এত প্রকারের যে, তা গণনা করা বাহ্যিকভাবে অসম্ভব মনে হচ্ছে। মহান আল্লাহ বললেন, তোমাদের জন্য তা অবশ্যই অসম্ভব, বরং তোমাদের তো নিজেদের কৃতকর্মও স্মরণে থাকবে না। কিন্তু আল্লাহর জন্য এটা কোন সমস্যার ব্যাপার নয়। তিনি প্রত্যেকের আমলকে হিসাব করে সুরক্ষিত রেখেছেন।

[2] তাঁর কাছে কোন জিনিস গুপ্ত নয়। পরের আয়াতে এ কথার আরো তাকীদ স্বরূপ বলা হয়েছে যে, তিনি সব কিছুই জানেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৮:৭ اَلَمۡ تَرَ اَنَّ اللّٰہَ یَعۡلَمُ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ مَا یَکُوۡنُ مِنۡ نَّجۡوٰی ثَلٰثَۃٍ اِلَّا ہُوَ رَابِعُہُمۡ وَ لَا خَمۡسَۃٍ اِلَّا ہُوَ سَادِسُہُمۡ وَ لَاۤ اَدۡنٰی مِنۡ ذٰلِکَ وَ لَاۤ اَکۡثَرَ اِلَّا ہُوَ مَعَہُمۡ اَیۡنَ مَا کَانُوۡا ۚ ثُمَّ یُنَبِّئُہُمۡ بِمَا عَمِلُوۡا یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ ﴿۷﴾

তুমি কি লক্ষ্য করনি যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে নিশ্চয় আল্লাহ তা জানেন? তিন জনের কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না, আর পাঁচ জনেরও হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। এর চেয়ে কম হোক কিংবা বেশি হোক, তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন, তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক অবগত। আল-বায়ান

তুমি কি জান না যে, যা আকাশে আছে আর যা যমীনে আছে আল্লাহ সব জানেন। তিনজনের মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন আল্লাহ হন না, আর পাঁচজনেও হয় না, ষষ্ঠজন তিনি ছাড়া, এর কম সংখ্যকেও হয় না, আর বেশি সংখ্যরেও হয় না, তিনি তাদের সঙ্গে থাকা ব্যতীত, তারা যেখানেই থাকুক না কেন। অতঃপর ক্বিয়ামত দিবসে তিনি জানিয়ে দেবেন যা তারা ‘আমাল করেছিল। আল্লাহ সকল বিষয়ে পূর্ণভাবে অবগত। তাইসিরুল

তুমি কি অনুধাবন করনা, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয়না যাতে চতুর্থ হিসাবে তিনি উপস্থিত থাকেননা; এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয়না যাতে ষষ্ঠ হিসাবে তিনি উপস্থিত থাকেননা; তারা এতদপেক্ষা কম হোক বা বেশি হোক, তারা যেখানেই থাকুকনা কেন তিনি তাদের সাথে আছেন। তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামাত দিবসে তা জানিয়ে দিবেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক অবগত। মুজিবুর রহমান

৭. আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন। না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ট জন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশী হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন।(১) তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।

(১) তবে মনে রাখতে হবে যে, সাথে থাকার অর্থ এ নয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কোন সৃষ্টির ভিতরে বা সৃষ্টির সাথে লেগে আছেন। বরং এখানে সাথে থাকার অর্থ জ্ঞানের মাধ্যমে তাদের সাথে থাকা। কারণ, আয়াতের শেষে “নিশ্চয় আল্লাহ্ সব কিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।” এ কথাটি বলে তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ্ তাঁর আরাশের উপর, তাঁর সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা অবস্থানে রয়েছেন। স্রষ্টাকে সৃষ্টির সাথে লেগে আছে বা প্রবিষ্ট হয়ে আছে মনে করা শির্ক ও কুফরী। এ তাফসীরের অন্যান্য স্থানেও এ বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন সূরা ত্বা-হা: ৪৬; সূরা আশ-শু'আরা: ১৫; সূরা আল-হাদীদ: ৪। এ সব আয়াতের সব স্থানেই এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান তাঁর বান্দাকে পরিবেষ্টন করে আছে।

তার জ্ঞান ও ক্ষমতার বাইরে কেউ নেই। এরই নাম হচ্ছে, সাধারণভাবে আল্লাহ তাঁর বান্দার সাথে থাকা। তবে এর পাশাপাশি আল্লাহ তা'আলা তার মুমিন বান্দাদের সাথে বিশেষভাবেও সাথে থাকেন। আর সে সাথে থাকা বলতে বুঝায় সাহায্য-সহযোগিতা ও প্রতিষ্ঠা করা। যেমন সূরা আল-বাকারাহ: ১৯৪; সূরা আল আনফাল: ১৯; সূরা আত-তাওবাহঃ ৩৬; ১২৩; সূরা আন-নাহল: ১২৮; সূরা আল আনকাবূত: ৬৯ ও সূরা মুহাম্মাদ: ৩৫ নং আয়াত। এ সব আয়াতে ‘সাথে থাকা’ সাহায্য-সহযোগিতার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি সৎ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক জানেন ও তাদেরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করেন।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭) তুমি কি অনুধাবন কর না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, আল্লাহ তা জানেন। তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না, যাতে চতুর্থজন হিসাবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যে ষষ্ঠজন হিসাবে তিনি থাকেন না; তারা এ অপেক্ষা কম হোক বা বেশী হোক[1] এবং যেখানেই থাকুক না কেন,[2] তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন জানিয়ে দেবেন তারা যা করে।[3] নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত।

[1] অর্থাৎ, উক্ত সংখ্যাগুলোকে বিশেষ করে উল্লেখ করার অর্থ এই নয় যে, তার থেকে কম বা তার থেকে বেশী সংখ্যক লোকের মাঝে হওয়া কথাবার্তা তিনি জানতে পারেন না, বরং এ সংখ্যা কেবল দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হল এ কথা জানিয়ে দেওয়া যে, সংখ্যা কম হোক অথবা বেশী, তিনি সকলের সাথে আছেন এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য প্রতিটি কথার খবর রাখেন।

[2] নির্জন স্থানে হোক অথবা লোকালয়ে, শহরে হোক অথবা জঙ্গল-মরুভূমিতে, আবাদ-জনপদে হোক অথবা জনশূন্য পাহাড়, প্রান্তর বা গুহাতে, যেখানেই হোক না কেন তাঁর দৃষ্টি ও জ্ঞান থেকে গোপন থাকতে পারবে না।

[3] অর্থাৎ, সেই অনুযায়ী প্রত্যেককে প্রতিদান দেবেন। নেককারদেরকে তাদের নেকীর প্রতিদান এবং বদকারদেরকে তাদের বদীর প্রতিফল দেবেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৮:৮ اَلَمۡ تَرَ اِلَی الَّذِیۡنَ نُہُوۡا عَنِ النَّجۡوٰی ثُمَّ یَعُوۡدُوۡنَ لِمَا نُہُوۡا عَنۡہُ وَ یَتَنٰجَوۡنَ بِالۡاِثۡمِ وَ الۡعُدۡوَانِ وَ مَعۡصِیَتِ الرَّسُوۡلِ ۫ وَ اِذَا جَآءُوۡکَ حَیَّوۡکَ بِمَا لَمۡ یُحَیِّکَ بِہِ اللّٰہُ ۙ وَ یَقُوۡلُوۡنَ فِیۡۤ اَنۡفُسِہِمۡ لَوۡ لَا یُعَذِّبُنَا اللّٰہُ بِمَا نَقُوۡلُ ؕ حَسۡبُہُمۡ جَہَنَّمُ ۚ یَصۡلَوۡنَہَا ۚ فَبِئۡسَ الۡمَصِیۡرُ ﴿۸﴾

তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল? তারপরও তারা তারই পুনরাবৃত্তি করল যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। আর তারা পাপাচার, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য গোপন পরামর্শ করে। আর তারা যখন তোমার কাছে আসে তখন তারা তোমাকে এমন (কথার দ্বারা) অভিবাদন জানায় যেভাবে আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন করেননি। আর তারা মনে মনে বলে, ‘আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন? তাদের জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। তারা তাতে প্রবেশ করবে। আর তা কতইনা নিকৃষ্ট গন্তব্যস্থল! আল-বায়ান

তুমি কি তাদেরকে দেখনি যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল, অতঃপর তারা আবার তাই করল যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল, তারা গোপনে পরামর্শ করল পাপাচার, সীমালঙ্ঘন আর রসূলকে অমান্য করা নিয়ে। তারা যখন তোমার কাছে আসে তখন তারা তোমাকে এমনভাবে সম্ভাষণ করে যেমনভাবে আল্লাহ তোমাকে সম্ভাষণ করেননি। তারা মনে মনে বলে- ‘আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে ‘আযাব দেন না কেন? জাহান্নামই তাদের জন্য যথেষ্ট, তাতে তারা জ্বলবে, কতই না নিকৃষ্ট সেই গন্তব্যস্থল! তাইসিরুল

তুমি কি তাদেরকে লক্ষ্য করনা, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল; অতঃপর তারা যা নিষিদ্ধ তারই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচরণ, সীমা লংঘন ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য কানাকানি করে। তারা যখন তোমার নিকট আসে তখন তারা তোমাকে এমন কথা দ্বারা অভিবাদন করে যদ্বারা আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন করেননি। তারা মনে মনে বলেঃ আমরা যা বলি উহার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেননা কেন? জাহান্নামই তাদের উপযুক্ত শাস্তি, সেখানে তারা প্রবেশ করবে, কত নিকৃষ্ট সেই আবাস! মুজিবুর রহমান

৮. আপনি কি তাদেরকে লক্ষ্য করেন না, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল? তারপর তারা যা নিষিদ্ধ তারই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচরণ, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য গোপন পরামর্শ করে।(১) আর তারা যখন আপনার কাছে আসে তখন তারা আপনাকে এমন কথা দ্বারা অভিবাদন করে যা দ্বারা আল্লাহ আপনাকে অভিবাদন করেননি। আর তারা মনে মনে বলে, আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন?(২) জাহান্নামই তাদের জন্য যথেষ্ট, যেখানে তারা দগ্ধ হবে, আর কত নিকৃষ্ট সে গন্তব্যস্থল!

(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যেখানে তোমরা তিনজন একত্রিত সেখানে দুইজন তৃতীয় জনকে ছেড়ে পরস্পরে কানাকানি ও গোপন কথাবার্তা বলবে না, যে পর্যন্ত আরও লোক না এসে যায়। কারণ, এতে সে মনঃক্ষুন্ন হবে, সে নিজেকে পর বলে ভাববে এবং তার বিরুদ্ধেই কথাবার্তা হচ্ছে বলে সে সন্দেহ করবে।” [মুসলিম: ২১৮৪]


(২) আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস বলেন, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত হলে السلام عليكم বলার পরিবর্তে السَّامُ عَلَيْكُمْ  বলত। سامٌ শব্দের অর্থ মৃত্যু। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়। ইয়াহুদীরা এভাবে সালাম করে চুপিসারে বলত, আমাদের এই গোনাহের কারণে আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন? [মুসনাদে আহমাদ: ২/১৭০]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮) তুমি কি তাদেরকে লক্ষ্য কর না, যাদেরকে গোপন পরামর্শ করতে নিষেধ করা হয়েছিল; অতঃপর তারা যা নিষিদ্ধ তারই পুনরাবৃত্তি করে[1] এবং পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রসূলের বিরুদ্ধাচরণের জন্য কানাকানি করে।[2] তারা যখন তোমাকে এমন শব্দ দ্বারা অভিবাদন জানায়, যার দ্বারা আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন জানাননি।[3] তারা মনে মনে বলে, ‘আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেয় না কেন?’[4] জাহান্নামই তাদের উপযুক্ত শাস্তি; সেখানে তারা প্রবেশ করবে। [5] সুতরাং কত নিকৃষ্ট সেই আবাস!

[1] এ থেকে উদ্দেশ্য মদীনার ইয়াহুদী এবং মুনাফিকবরা। যখন মুসলিমরা তাদের পাশ দিয়ে পেরিয়ে যেতেন, তখন তারা আপোসে মাথায় মাথা লাগিয়ে এমনভাবে চুপে চুপে কানাকানি করত যে, মুসলিমরা মনে করতেন তারা মনে হয় তাঁদের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র করছে অথবা মুসলিমদের কোন সৈন্য দলের উপর শত্রুপক্ষ আক্রমণ করে তাদের ক্ষতি সাধন করেছে, যার খবর এদের কাছে পৌঁঁছে গেছে। এতে মুসলিমরা ভয় পেয়ে যেতেন। তাই রসূল (সাঃ) তাদেরকে কানাকানি করতে নিষেধ করে দিলেন। কিন্তু কিছু দিন পর তারা পুনরায় এই নিন্দনীয় কাজের পুনরাবৃত্তি করল। আয়াতে তাদের এই নিন্দনীয় কাজের কথাই বর্ণনা করা হচ্ছে।

[2] অর্থাৎ, তাদের কানাকানি কোন সৎকর্ম বা আল্লাহভীরুতার ব্যাপারে হত না; বরং তা হত পাপ, সীমালঙ্ঘন ও রসূল (সাঃ)-এর অবাধ্যতামূলক কাজে। যেমন, কারো গীবত করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, অশ্লীল কথা-বার্তা এবং একে অপরকে রসূল (সাঃ)-এর অবাধ্যতা করার উপর উস্কানি দেওয়া ইত্যাদি।

[3] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা অভিবাদন জানানো বা সালাম দেওয়ার তরীকা এইভাবে শিখিয়েছেন যে, তোমরা বলবে, السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ কিন্তু এই ইয়াহুদীরা নবী করীম (সাঃ)-এর কাছে উক্ত সালামের পরিবর্তে বলত, السَّامُ عَلَيْكُمْ অথবা السَّامُ عَلَيْكَ (তোমার উপর মৃত্যু আসুক)। তাই রসূল (সাঃ) তাদের সালামের উত্তরে কেবল বলতেন, وَعَلَيْكُمْ অথবা وَعَلَيْكَ (আর তোমারদের উপরেও) এবং মুসলিমদেরকেও তাকীদ করলেন যে, আহলে কিতাবদের কেউ তোমাদেরকে সালাম করলে, তোমরা উত্তরে কেবল বলবে, وَعَلَيْكَ। (মুসলিম, আদব অধ্যায়)

[4] অর্থাৎ, তারা আপোসে অথবা মনে মনে বলত যে, যদি মুহাম্মাদ সত্য নবী হত, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের এই জঘন্য আচরণের কারণে আমাদেরকে অবশ্যই পাকড়াও করত।

[5] আল্লাহ বলেন, যদি আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা ও পূর্ণ কৌশলের ভিত্তিতে দুনিয়াতে তাদেরকে সত্বর পাকড়াও না করেন, এ জন্য কি তারা জাহান্নামের আযাব থেকেও বেঁচে যাবে? না, কক্ষনো না। জাহান্নাম তাদের অপেক্ষায় আছে, যাতে তারা প্রবেশ করবে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৮:৯ یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا تَنَاجَیۡتُمۡ فَلَا تَتَنَاجَوۡا بِالۡاِثۡمِ وَ الۡعُدۡوَانِ وَ مَعۡصِیَتِ الرَّسُوۡلِ وَ تَنَاجَوۡا بِالۡبِرِّ وَ التَّقۡوٰی ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ الَّذِیۡۤ اِلَیۡہِ تُحۡشَرُوۡنَ ﴿۹﴾

হে মুমিনগণ, তোমরা যখন গোপনে পরামর্শ করবে তখন তোমরা যেন গুনাহ, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণের ব্যাপারে গোপন পরামর্শ না কর। আর তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার বিষয়ে গোপন পরামর্শ কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর কাছে তোমাদেরকে সমবেত করা হবে। আল-বায়ান

হে মু’মিনগণ! তোমরা যখন গোপন পরামর্শ কর, তখন পাপাচার, সীমালঙ্ঘন আর রসূলকে অমান্য করার পরামর্শ কর না। তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়া অবলম্বনের ব্যাপারে পরামর্শ করো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যাঁর কাছে তোমাদেরকে সমবেত করা হবে। তাইসিরুল

হে মু’মিনগণ! তোমরা যখন গোপন পরামর্শ কর, সেই পরামর্শ যেন পাপাচরণ, সীমা লংঘন ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ সম্পর্কে না হয়। কল্যাণকর কাজ ও তাকওয়া অবলম্বনের পরামর্শ কর এবং ভয় কর আল্লাহকে যাঁর নিকট তোমরা সমবেত হবে। মুজিবুর রহমান

৯. হে মুমিনগণ! তোমরা যখন গোপন পরামর্শ করবে তখন সে গোপন পরামর্শ যেন পাপাচরণ, সীমালঙ্ঘন ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ সম্পর্কে না কর।(১) আর তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়া অবলম্বনের পরামর্শ করো। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যার কাছে তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।

(১) এ ব্যাপারে যে মজলিসী রীতিনীতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন তা এই যে, “যখন তিন ব্যক্তি এক জায়গায় বসা থাকবে, তখন তাদের মধ্য থেকে দু’জনের তৃতীয় জনকে বাদ দিয়ে গোপন সলা পরামর্শ করা উচিত নয়। কেননা, এটা তৃতীয় ব্যক্তির মনোকষ্টের কারণ হবে।” [বুখারী: ৬২৮৮, মুসলিম: ২১৮৩, মুসনাদে আহমাদঃ ১/৩৭৫]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যখন গোপন পরামর্শ কর, সে পরামর্শ যেন পাপাচরণ, সীমালংঘন ও রসূলের বিরুদ্ধাচরণ সম্পর্কে না হয়।[1] তোমরা কল্যাণমূলক কাজ ও আল্লাহভীরুতা অবলম্বনের পরামর্শ কর।[2] আর সেই আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নিকট তোমরা সমবেত হবে।

[1] যেমন ইয়াহুদী এবং মুনাফিকদের স্বভাব। এটা ঈমানদারদেরকে তরবিয়ত দান ও তাঁদের চরিত্র গঠনের জন্য বলা হচ্ছে যে, যদি তোমরা তোমাদের ঈমানের দাবীতে সত্য হও, তাহলে তোমাদের কানাকানি ইয়াহুদী এবং মুনাফিকদের মত পাপ ও অন্যায়ের জন্য হওয়া উচিত নয়।

[2] অর্থাৎ, যে কাজে মঙ্গলই মঙ্গল আছে, যার বুনিয়াদ হয় আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্যের উপর। কেননা, এটাই হল কল্যাণমূলক ও আল্লাহভীরুতার কাজ।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৫৮:১০ اِنَّمَا النَّجۡوٰی مِنَ الشَّیۡطٰنِ لِیَحۡزُنَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ لَیۡسَ بِضَآرِّہِمۡ شَیۡئًا اِلَّا بِاِذۡنِ اللّٰہِ ؕ وَ عَلَی اللّٰہِ فَلۡیَتَوَکَّلِ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ ﴿۱۰﴾

গোপন পরামর্শ তো হল মুমিনরা যাতে দুঃখ পায় সে উদ্দেশ্যে কৃত শয়তানের কুমন্ত্রণা মাত্র। আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সে তাদের কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। অতএব আল্লাহরই ওপর মুমিনরা যেন তাওয়াক্কুল করে। আল-বায়ান

গোপন পরামর্শ হল মু’মিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্য শয়ত্বান প্ররোচিত কাজ। তবে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না। মু’মিনদের কর্তব্য হল একমাত্র আল্লাহরই উপর ভরসা করা। তাইসিরুল

শাইতানের প্ররোচনায় হয় এই গোপন পরামর্শ, মু’মিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্য; কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত শাইতান তাদের সামান্যতম ক্ষতি সাধনেও সক্ষম নয়। মু’মিনদের কর্তব্য হল আল্লাহর উপর নির্ভর করা। মুজিবুর রহমান

১০. গোপন পরামর্শ তো কেবল শয়তানের প্ররোচনায় হয় মুমিনদেরকে দুঃখ দেয়ার জন্য। তবে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া শয়তান তাদের সামান্যতম ক্ষতি সাধনেও সক্ষম নয়। অতএব আল্লাহর উপরই মুমিনরা যেন নির্ভর করে।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০) এই গোপন পরামর্শ তো শয়তানেরই প্ররোচনা, যাতে বিশ্বাসীরা দুঃখ পায়।[1] তবে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত শয়তান তাদের সামান্যতমও ক্ষতি সাধনে সক্ষম নয়। আর বিশ্বাসীদের কর্তব্য আল্লাহর উপরই নির্ভর করা। [2]

[1] অর্থাৎ, পাপাচার, সীমালঙ্ঘন এবং রসূল (সাঃ)-এর অবাধ্যতার বিষয়ে কানাকানি করা হল শয়তানের কাজ। কারণ, শয়তানই এ কাজ করতে উস্কানি দেয় এবং এর মাধ্যমে সে মু’মিনদেরকে মনঃকষ্ট ও দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায়।

[2] তবে এ সব কানাকানি এবং শয়তানী কার্যকলাপ মু’মিনদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না, যদি আল্লাহর ইচ্ছা না থাকে। কাজেই তোমরা শত্রুদের এই নিকৃষ্ট আচরণে চিন্তিত না হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। কেননা, যাবতীয় বিষয়ের একচ্ছত্র এখতিয়ার ও ক্ষমতা কেবল তাঁরই হাতে এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাশীল। ইয়াহুদী এবং মুনাফিকদের হাতে কিছুই নেই; যারা তোমাদের সর্বনাশ করতে চায়।

কানাকানি করার ব্যাপারেই মুসলিমদেরকে একটি নৈতিক শিক্ষা এও দেওয়া হয়েছে যে, যখন তোমরা তিনজন একত্রে থাকবে, তখন তোমাদের মধ্য থেকে একজনকে বাদ দিয়ে দু’জনে আপোসে কানাকানি করবে না। কারণ, এ কাজ ঐ একজনের মনে দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করবে। (বুখারীঃ অনুমতি অধ্যায়, মুসলিমঃ সালাম অধ্যায়) অবশ্য তার সম্মতি ও অনুমতি থাকলে এমন করা জায়েয হবে। কেননা, এই ক্ষেত্রে দুই ব্যক্তির কানাকানি করা কারো জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ 1 to 10 of 22 পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 Next »