সূরাঃ ২৯/ আল-আনকাবূত | Al-Ankabut | ٱلْعَنْكَبُوت আয়াতঃ ৬৯ মাক্কী
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
২৯ : ১ الٓـمّٓ ۚ﴿۱﴾

আলিফ-লাম-মীম। আল-বায়ান

আলিফ-লাম-মীম তাইসিরুল

আলিফ লাম মীম, মুজিবুর রহমান

Alif, Lam, Meem Sahih International

১. আলিফ-লাম-মীম;

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) আলিফ-লাম-মীম;

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ২ اَحَسِبَ النَّاسُ اَنۡ یُّتۡرَكُوۡۤا اَنۡ یَّقُوۡلُوۡۤا اٰمَنَّا وَ هُمۡ لَا یُفۡتَنُوۡنَ ﴿۲﴾

মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আল-বায়ান

লোকেরা কি মনে করে যে ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে দেয়া হবে, আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? তাইসিরুল

মানুষ কি মনে করেছে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবেনা? মুজিবুর রহমান

Do the people think that they will be left to say, "We believe" and they will not be tried? Sahih International

২. মানুষ কি মনে করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা(১) না করে অব্যাহতি দেয়া হবে(২)?

(১) يُفْتَنُون শব্দটি فتنة থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ পরীক্ষা। [ফাতহুল কাদীর] ঈমানদার বিশেষত: নবীগণকে এ জগতে বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছে। পরিশেষে বিজয় ও সাফল্য তাদেরই হাতে এসেছে। এসব পরীক্ষা জান ও মালের উপর ছিল। [ফাতহুল কাদীর] এর মাধ্যমে তাদের ঈমানের দৃঢ়তার পরীক্ষা হয়ে যেত। কোন সময় কাফের ও পাপাচারীদের শক্ৰতা এবং তাদের নির্যাতনের মাধ্যমে হয়েছে, যেমন অধিকাংশ নবীগণ, শেষনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবীগণ প্রায়ই এ ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলী এ ধরনের ঘটনাবলী দ্বারা পরিপূর্ণ। কোন সময় এই পরীক্ষা রোগ-ব্যাধি ও অন্যান্য কষ্টের মাধ্যমে হয়েছে। যেমন আইয়ুব আলাইহিস সালাম-এর হয়েছিল। কারও কারও বেলায় সর্বপ্রকার পরীক্ষার সমাবেশও করে দেয়া হয়েছে।

বর্ণনাদৃষ্টে বোঝা যায়, আলোচ্য আয়াত সেসব সাহাবীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছিল, যারা মদীনায় হিজরতের প্রাক্কালে কাফেরদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন। কিন্তু উদ্দেশ্য ব্যাপক। সর্বকালের আলেম, সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিগণ বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং হতে থাকবেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সৎকর্মপরায়ন বান্দাদেরকে, তারপর তাদের অনুরূপ, তারপর তাদের অনুরূপদেরকে। প্রত্যেক মানুষকে তার দ্বীনদারী অনুসারে পরীক্ষা করা হয়। যদি দ্বীনদারী বেশী হয় তাকে বেশী পরীক্ষা করা হয়। [তিরমিযী ২৩৯৮, ইবনে মাজাহ ৪০২৩] কুরআনের অন্যত্রও এ পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে, যেমন: “তোমরা কি মনে করেছ তোমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে অথচ, আল্লাহ এখনো তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ করেছে তাদের জেনে নেননি।” [সূরা আত-তাওবাহ: ১৬]

(২) যে অবস্থায় একথা বলা হয় তা ছিল এই যে, মক্কা মুআযযিামায় কেউ ইসলাম গ্ৰহণ করলেই তার ওপর বিপদ আপদ ও জুলুম-নিপীড়নের পাহাড় ভেঙ্গে পড়তো। এ পরিস্থিতি যদিও দৃঢ় ঈমানের অধিকারী সাহাবীগণের অবিচল নিষ্ঠার মধ্যে কোন প্রকার দোদুল্যমানতা সৃষ্টি করে নি তবুও মানবিক প্রকৃতির তাগিদে অধিকাংশ সময় তাদের মধ্যেও চিত্তচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়ে যেতো। এ ধরনের অবস্থার একটা চিত্র পেশ করে খাব্বাব ইবনে আরত বর্ণিত একটি হাদীস। তিনি বলেন, ‘যে সময় মুশরিকদের কঠোর নির্যাতনে আমরা ভীষণ দুরবস্থার সম্মুখীন হয়ে পড়েছিলাম সে সময় একদিন আমি দেখলাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবাঘরের দেয়ালের ছায়ায় বসে রয়েছেন।

আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি আমাদের জন্য দোআ করেন না? একথা শুনে তাঁর চেহারা আবেগে-উত্তেজনায় রক্তিমবর্ণ ধারণ করলো এবং তিনি বললেন, “তোমাদের পূর্বে যেসব মুমিনদল অতিক্রান্ত হয়েছে তারা এর চাইতেও বেশী নিগৃহীত হয়েছে। তাদের কাউকে মাটিতে গর্ত করে তার মধ্যে বসিয়ে দেয়া হতো এবং তারপর তার মাথার ওপর করাত চালিয়ে দুটুকরা করে দেয়া হতো। কারো অংগ-প্রত্যংগের সন্ধিস্থলে কসম, এ কাজ সম্পন্ন হবেই, এমন কি এক ব্যক্তি সান’আ থেকে হাদ্বারামাউত পর্যন্ত নিঃশংক চিত্তে সফর করবে এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারো ভয় তার মনে থাকবে না।” [বুখারী ৩৬১২, মুসনাদে আহমাদ ৫/১০৯]

এ চিত্তচাঞ্চল্যকে অবিচল ধৈর্য ও সহিষ্ণুতায় রূপান্তরিত করার জন্য মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে বুঝান, দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য অর্জনের জন্য আমার যে সমস্ত প্ৰতিশ্রুতি রয়েছে কোন ব্যক্তি নিছক মৌখিক ঈমানের দাবীর মাধ্যমে তার অধিকারী হতে পারে না। বরং প্রত্যেক দাবীদারকে অনিবাৰ্যভাবে পরীক্ষা অতিক্রম করতে হবেই। অন্যত্র আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা কি মনে করেছে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে, অথচ এখনো তোমরা সে অবস্থার সম্মুখীন হওনি, যে অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী ঈমানদারগণ? তারা সম্মুখীন হয়েছিল নির্মমতা ও দুঃখ-ক্লেশের এবং তাদেরকে অস্থির করে তোলা হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারা চিৎকার করে বলে উঠেছিল আল্লাহর সাহায্য কবে আসবে? (তখনই তাদেরকে সুখবর দেয়া হয়েছিল। এই মর্মে যে) জেনে রাখো, আল্লাহর সাহায্য নিকটেই।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২১৪]

অনুরূপভাবে ওহুদ যুদ্ধের পর যখন মুসলিমদের ওপর আবার বিপদ-মুসীবতের একটি দুযোগপূর্ণ যুগের অবতারণা হয় তখন বলা হয়ঃ “তোমরা কি মনে করে নিয়েছে, তোমরা জান্নাতে প্ৰবেশ করে যাবে, অথচ এখনো আল্লাহ দেখেনইনি যে, তোমাদের মধ্য থেকে কে জিহাদে প্ৰাণ উৎসর্গকারী এবং কে সবরকারী?” [সূরা আলে ইমরান: ১৪২] প্ৰায় একই বক্তব্য সূরা আলে ইমরানের ১৭৯, সূরা তাওবার ১৬ এবং সূরা মুহাম্মাদের ৩১ আয়াতে বলা হয়েছে। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে মহান আল্লাহ মুসলিমদের মনে এ সত্যটি গেথে দিয়েছেন যে, পরীক্ষাই হচ্ছে এমন একটি মানদণ্ড যার মাধ্যমে ভেজাল ও নির্ভেজাল যাচাই করা যায়।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা বিশ্বাস করি’ এ কথা বললেই ওদেরকে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হবে? [1]

[1] অর্থাৎ, মৌখিকভাবে ঈমান আনার পর তাদের কোন পরীক্ষা না নিয়েই এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে --এই ধারণা পোষণ করা ঠিক নয়। বরং তাদের জান-মালে বিপদ-আপদ দিয়ে এবং অন্যান্য সমস্যা দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে, যাতে আসল-নকল, সত্য-মিথ্যা এবং মু’মিন ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ৩ وَ لَقَدۡ فَتَنَّا الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِهِمۡ فَلَیَعۡلَمَنَّ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ صَدَقُوۡا وَ لَیَعۡلَمَنَّ الۡكٰذِبِیۡنَ ﴿۳﴾

আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী। আল-বায়ান

তাদের পূর্বে যারা ছিল আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম; অতঃপর আল্লাহ অবশ্য অবশ্যই জেনে নেবেন কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যেবাদী। তাইসিরুল

আমিতো তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম; আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী। মুজিবুর রহমান

But We have certainly tried those before them, and Allah will surely make evident those who are truthful, and He will surely make evident the liars. Sahih International

৩. আর অবশ্যই আমরা এদের পূৰ্ববতীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম(১); অতঃপর আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা সত্যবাদী এবং তিনি অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা মিথ্যাবাদী।(২)

(১) অর্থাৎ তোমাদের সাথে যা কিছু হচ্ছে, তা কোন নতুন ব্যাপার নয়। ইতিহাসে হরহামেশা এমনটিই হয়ে এসেছে। যে ব্যক্তিই ঈমানের দাবী করেছে তাকে অবশ্যই পরীক্ষার অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে দগ্ধ করা হয়েছে। আর অন্যদেরকেও যখন পরীক্ষা না করে কিছু দেয়া হয়নি তখন তোমাদের এমন কি বিশেষত্ব আছে যে, কেবলমাত্র মৌখিক দাবীর ভিত্তিতেই তোমাদেরকে দেয়া হবে? [দেখুন: সা’দী]

(২) মূল শব্দ হচ্ছে لَيَعْلَمَنَّ এর শাব্দিক অনুবাদ হবে, “আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন”। অর্থাৎ এসব পরীক্ষা ও বিপদাপদের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা খাঁটি-অখাঁটি এবং সৎ ও অসাধুর মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য ফুটিয়ে তুলবেন। কেননা, খাঁটিদের সাথে কপট বিশ্বাসীদের মিশ্রণের ফলে মাঝে মাঝে বিরাট ক্ষতিসাধিত হয়ে যায়। [মুয়াসসার] আলোচ্য আয়াতের উদ্দেশ্য সৎ, অসৎ এবং খাঁটি-অখাঁটি পার্থক্য ফুটিয়ে তোলা। একে এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা জেনে নেবেন কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী। প্রত্যেক মানুষের সত্যবাদিতা ও মিথ্যাবাদিতা তার জন্মের পূর্বেই আল্লাহ্ তা'আলার জানা রয়েছে। তবুও পরীক্ষার মাধ্যমে জানার অর্থ এই যে, এই পার্থক্যকে অপরাপর লোকদের কাছেও প্রকাশ করে দেবেন।

বস্তুত: মানুষকে আল্লাহ্ তা'আলা বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করে থাকেন। ভাল-মন্দ, ধনী-গরিব, দুঃখকষ্ট, সার্বিক অবস্থায় ফেলে তিনি তাদের পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। এসমস্ত অবস্থায় বিশ্বাসে সন্দেহ হলে যদি সে তা তাড়িয়ে দিয়ে ঈমানের উপর স্থির থাকতে পারে তবেই সে সফলকাম। অনুরূপভাবে তার প্রবৃত্তির পাগলা ঘোড়া তাকে যা ইচ্ছে তা করতে বললে সে যদি তা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে তবেই সে এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও পাশ করেছে বলে বিবেচিত হবে। [দেখুন: সা'দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩) আমি অবশ্যই এদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম;[1] সুতরাং আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী।

[1] অর্থাৎ, এটি হল আল্লাহর একটি নিয়ম যা আদি কাল হতে চলে আসছে। সেই জন্য তিনি এই জাতির মু’মিনদেরও পরীক্ষা নেবেন; যেমন পূর্ববর্তী জাতির নেওয়া হয়েছে। এই সকল আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে যে বর্ণনা রয়েছে তাতে বলা হয়েছে যে, সাহাবা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট মক্কার কাফেরদের অত্যাচার ও উৎপীড়নের কথা অভিযোগ করে দু’আর আবেদন জানালেন, যাতে আল্লাহ তাঁদের সাহায্য করেন। তিনি বললেন, দুখঃ-কষ্ট ভোগ করা ঈমানদারদের ইতিহাসের একটি অংশ। তোমাদের পূর্বের কোন কোন মু’মিনকে গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে দাঁড় করিয়ে করাত দিয়ে তাকে দু’ফাঁক করে দেওয়া হয়েছে। অনুরূপ লোহার চিরুনি দিয়ে তাদের শরীর হতে গোশত আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত অত্যাচার তাদেরকে হক পথ হতে ফেরাতে পারেনি। (বুখারীঃ আম্বিয়ার হাদীস অধ্যায়) আম্মার, তাঁর মাতা সুমাইয়্যাহ ও পিতা ইয়াসির, সুহায়েব, বিলাল ও মিকদাদ (রাঃ) ইত্যাদি সাহাবাদের উপর ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে যে অত্যাচারের পাহাড় ভাঙ্গা হয়েছিল তা ইতিহাসের পাতায় আজও সংরক্ষিত আছে। এই পরিস্থিতি ও ঘটনাবলীই এসব আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ। পরন্তু আয়াতের সাধারণ অর্থের দিক দিয়ে কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সকল ঈমানদারও এতে শামিল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ৪ اَمۡ حَسِبَ الَّذِیۡنَ یَعۡمَلُوۡنَ السَّیِّاٰتِ اَنۡ یَّسۡبِقُوۡنَا ؕ سَآءَ مَا یَحۡكُمُوۡنَ ﴿۴﴾

নাকি যারা পাপ কাজ করে তারা মনে করে যে, তারা আমাকে রেখে সামনে চলে যাবে? কতইনা নিকৃষ্ট, যা তারা ফয়সালা করে! আল-বায়ান

যারা মন্দ কাজ করে তারা কি ভেবে নিয়েছে যে, তারা আমার আগে বেড়ে যাবে? তাদের ফয়সালা বড়ই খারাপ! তাইসিরুল

যারা মন্দ কাজ করে তারা কি মনে করে যে, তারা আমার আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে? তাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ! মুজিবুর রহমান

Or do those who do evil deeds think they can outrun Us? Evil is what they judge. Sahih International

৪. তবে কি যারা মন্দকাজ করে তারা মনে করে যে, তারা আমাদের আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে?(১) তাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ!

(১) মূল শব্দ হচ্ছে سابق অর্থাৎ আমার থেকে এগিয়ে যাবে। আয়াতের এ অর্থও হতে পারে, “আমার পাকড়াও এড়িয়ে অন্য কোথাও পালিয়ে যেতে পারবে।” [সা'দী] অপর অর্থ হচ্ছে, তারা কি মনে করে যে, তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও গোনাহসমূহ এমনিতেই ছেড়ে দেয়া হবে? তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ এগুলো থেকে উদাসীন হয়ে যাবেন? আর এজন্যই কি তারা অপরাধগুলো করে যাচ্ছে? [সা’দী]

কারও কারও মতে, এখানে এর অর্থ হচ্ছে, যা কিছু আমি করতে চাই তা করতে আমার সফল না হওয়া এবং যা কিছু তারা করতে চায় তা করতে তাদের সফল হওয়া। [দেখুন, আত-তাফসীরুস সহীহ] আয়াতের আরেকটি অর্থ হচ্ছে, যারা অপরাধী তারা যেন এটা মনে না করে যে, তারা পরীক্ষা থেকে বাদ পড়ে যাবে। তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না। এ ধারণা কখনো ঠিক নয়। তারা যদি এ দুনিয়াতে পারও পেয়ে যায়, তাদের সামনে এমন শাস্তি ও আযাব রয়েছে তা তাদের জন্য যথেষ্ট। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) যারা মন্দ কাজ করে, তারা কি মনে করে যে, তারা আমার আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে?[1] তাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ! [2]

[1] অর্থাৎ, আমার নিকট থেকে পালিয়ে যাবে এবং আমার পাকড়াও থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে।

[2] অর্থাৎ, আল্লাহর ব্যাপারে তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। যখন তিনি সর্বশক্তিমান ও প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে অবগত, তখন তাঁর অবাধ্য হয়ে তাঁর পাকড়াও এবং আযাব হতে বাঁচা কিভাবে সম্ভব?

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ৫ مَنۡ كَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ اللّٰهِ فَاِنَّ اَجَلَ اللّٰهِ لَاٰتٍ ؕ وَ هُوَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ ﴿۵﴾

যে আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করে (সে জেনে রাখুক) অতঃপর নিশ্চয় আল্লাহর নির্ধারিত কাল আসবে। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী। আল-বায়ান

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা করে (সে জেনে রাখুক যে) আল্লাহর নির্ধারিত কাল অবশ্যই আসবে, তিনি সব কিছু শোনেন, সব কিছু জানেন। তাইসিরুল

যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ কামনা করে সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহর নির্ধারিত কাল আসবেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। মুজিবুর রহমান

Whoever should hope for the meeting with Allah - indeed, the term decreed by Allah is coming. And He is the Hearing, the Knowing. Sahih International

৫. যে আল্লাহর সাক্ষাত কামনা করে সে জেনে রাখুক, আল্লাহর নির্ধারিত সময় আসবেই।(১) আর তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।(২)

(১) অর্থাৎ যে ব্যক্তি আখেরাতের জীবনে বিশ্বাসই করে না এবং মনে করে, কারো সামনে নিজের কাজের জবাবদিহি করতে হবে না এবং এমন কোন সময় আসবে না যখন নিজের জীবনের যাবতীয় কাজের কোন হিসেবা-নিকেশ দিতে হবে, তার কথা আলাদা। সে নিজের গাফলতির মধ্যে পড়ে থাকুক এবং নিশ্চিন্তে যা করতে চায় করে যাক। নিজের আন্দাজ-অনুমানের বিপরীত নিজের পরিণাম সে নিজেই দেখে নেবে। কিন্তু যারা আশা রাখে, এক সময় তাদেরকে তাদের মা’বুদের সামনে হাজির হতে হবে এবং নিজের কর্ম অনুযায়ী পুরস্কার ও শাস্তি পেতে হবে, তাদের এ ভুল ধারণায় ডুবে থাকা উচিত নয় যে, মৃত্যুর সময় অনেক দূরে৷ তাদের তো মনে করা উচিত, সে সময় অতি নিকটেই এসে গেছে এবং কাজের অবকাশ খতম হবারই পথে। তাই নিজের শুভ পরিণামের জন্য তারা যা কিছু করতে চায় করে ফেলুক। [বাগভী; জালালাইন; ফাতহুল কাদীর] দীর্ঘ জীবন-কালের ভিত্তিহীন নির্ভরতার ওপর ভরসা করে নিজের সংশোধনে বিলম্ব করা উচিত নয়। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, “কাজেই যে তার রব-এর সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকাজ করে ও তার রব-এর ইবাদাতে কাউকেও শরীক না করে”। [সূরা আল-কাহাফ: ১১০]

(২) অর্থাৎ তাদের এ ভুল ধারণাও পোষণ করা উচিত নয় যে, এমন কোন বাদশাহর সাথে তাদের ব্যাপার জড়িত, যিনি বিভিন্ন ব্যাপারের কোন খোঁজ খবর রাখেন না। যে আল্লাহর সামনে তাদের জবাবদিহি করার জন্য হাজির হতে হবে তিনি বেখবর নন বরং সবকিছু শোনেন ও জানেন। তাঁর কাছে তাদের কোন কথা গোপন নেই। [দেখুন, ইবন কাসীর] তিনি জানেন কে কোন নিয়তে কাজ করে, আরও জানেন কে তাঁর মহব্বতের উপযুক্ত আর কে উপযুক্ত নয়। [সা’দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫) যে আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করে (সে জেনে রাখুক,) আল্লাহর নির্ধারিত কাল নিশ্চয় আসবে।[1] আর তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।[2]

[1] অর্থাৎ, যারা পরকালে বিশ্বাস করে এবং নেকী ও পুণ্যের আশায় সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তাদের আশা পূর্ণ করবেন। তাদেরকে তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দান করবেন। কেননা কিয়ামত অবশ্যই অনুষ্ঠিত হবে এবং তাঁর ন্যায় বিচার নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠিত হবে।

[2] তিনি বান্দার কথা ও দু’আ শ্রবণকারী এবং গুপ্ত ও প্রকাশ্য সকল কর্ম সম্পর্কে অবগত। তিনি সেই অনুযায়ী ফলাফল অবশ্যই দান করবেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ৬ وَ مَنۡ جَاهَدَ فَاِنَّمَا یُجَاهِدُ لِنَفۡسِهٖ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَغَنِیٌّ عَنِ الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۶﴾

আর যে চেষ্টা করে সে তো তার নাফ্সের জন্য চেষ্টা করে। নিশ্চয় আল্লাহ সৃষ্টিকুল থেকে প্রয়োজনমুক্ত। আল-বায়ান

যে লোক (আল্লাহর পথে) সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, সে তার নিজের কল্যাণেই প্রচেষ্টা চালায়, আল্লাহ সৃষ্টিজগত থেকে অবশ্যই বে-পরওয়া। তাইসিরুল

যে কেহ (কঠোর) সাধনা করে, সে তা করে নিজেরই জন্য; আল্লাহতো বিশ্বজগত হতে অনপেক্ষ। মুজিবুর রহমান

And whoever strives only strives for [the benefit of] himself. Indeed, Allah is free from need of the worlds. Sahih International

৬. আর যে কেউ প্রচেষ্টা চালায়, সে তো নিজের জন্যই প্রচেষ্টা চালায়(১); আল্লাহ তো সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।(২)

(১) “মুজাহাদা” শব্দটির মূল অর্থ হচ্ছে, কোন বিরোধী শক্তির মোকাবিলায় দ্বন্দ্ব, প্রচেষ্টা চালানো। আর যখন কোন বিশেষ বিরোধী শক্তি চিহ্নিত করা হয় না বরং সাধারণভাবে “মুজাহাদা” শব্দ ব্যবহার করা হয় তখন এর অর্থ হয় একটি সর্বাত্মক ও সর্বব্যাপী দ্বন্দ্ব-সংঘাত। মুমিনকে এ দুনিয়ায় যে দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম করতে হয় তা হচ্ছে এ ধরনের। তাকে নাফস, শয়তান ও কাফেরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। [সা'দী] তাকে শয়তানের সাথে লড়াই করতে হয়, কারণ সে তাকে সর্বক্ষণ সৎকাজের ক্ষতির ভয় দেখায় এবং অসৎকাজের লাভ ও স্বাদ উপভোগের লোভ দেখিয়ে বেড়ায়। তাকে নিজের নফসের বা কুপ্রবৃত্তির সাথেও লড়তে হয়, যে তাকে সর্বক্ষণ নিজের খারাপ ইচ্ছা-আকাংখার দাসে পরিণত করে রাখার জন্য জোর দিতে থাকে।

নিজের গৃহ থেকে নিয়ে বিশ্ব-সংসারের এমন সকল মানুষের সাথে তাকে লড়তে হয় যাদের আদর্শ, মতবাদ, মানসিক প্রবণতা, চারিত্রিক নীতি, রসম-রেওয়াজ, সাংস্কৃতিক ধারা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিধান সত্য দ্বীনের সাথে সংঘর্ষিক। তাকে কাফেরদের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়। [দেখুন: সা’দী; আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর] এ প্রচেষ্টা এক-দুদিনের নয়, সারাজীবনের। দিন-রাতের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে প্রতি মুহুর্তের। কোন একটি ময়দানে নয়, বরং জীবনের প্রত্যেকটি ময়দানে ও প্রতি দিকে। হাসান বসরী বলেন, একজন মানুষ প্রতিনিয়ত জিহাদ করে যাচ্ছে অথচ একদিনও তরবারী ব্যবহার করেনি। [ইবন কাসীর]

(২) অর্থাৎ আল্লাহ এ জন্য তোমাদের কাছে এ দ্বন্দ্ব-সংগ্রামের দাবী করছেন না যে, নিজের সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার ও প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য তোমাদের সাহায্যের প্রয়োজন, বরং এটিই তোমাদের উন্নতি ও অগ্রগতির পথ, তাই তিনি তোমাদের এ দ্বন্দ্ব-সংগ্রামে লিপ্ত হবার নির্দেশ দিচ্ছেন। এ পথে অগ্রসর হয়ে তোমরা এমন শক্তির অধিকারী হতে পারো যার ফলে দুনিয়ায় তোমরা কল্যাণ ও সুকৃতির ধারক এবং আখেরাতে আল্লাহর জান্নাতের অধিকারী হবে। এ যুদ্ধ চালিয়ে তোমরা আল্লাহর কোন উপকার করবে না বরং তোমরা নিজেরাই উপকৃত হবে। তাছাড়া এ প্রচেষ্টার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পার যার কথা সূরার শুরুতে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। [দেখুন: ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর; সা’দী, ইবনুল কাইয়্যেম, শিফাউল আলীল: ২৪৬]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) যে কেউ সংগ্রাম করে, সে তো নিজের জন্যই সংগ্রাম করে; আল্লাহ অবশ্যই বিশ্বজগতের ওপর নির্ভরশীল নন। [1]

[1] এর অর্থ {مَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاء فَعَلَيْهَا} এর মত। (সূরা জাসিয়াহ ১৫ আয়াত) অর্থাৎ, যে ভাল কাজ করবে তার ফল সে নিজেই ভোগ করবে। তাছাড়া আল্লাহ বান্দাদের কোন কাজের মুখাপেক্ষী নন। যদি পৃথিবীর সবাই আল্লাহর পরহেযগার বান্দা হয়ে যায়, তাহলে তার ফলে তাঁর রাজ্যের শক্তি বৃদ্ধি হবে না। আর যদি সকল মানুষই আল্লাহর নাফরমান ও অবাধ্য হয়ে যায়, তাহলেও তাঁর রাজ্যে কোন প্রকার কমি আসবে না। শাব্দিক অর্থের দিক দিয়ে এতে কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদও শামিল। কারণ, এটিও অন্যতম সৎকর্ম।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ৭ وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَنُكَفِّرَنَّ عَنۡهُمۡ سَیِّاٰتِهِمۡ وَ لَنَجۡزِیَنَّهُمۡ اَحۡسَنَ الَّذِیۡ كَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ﴿۷﴾

আর যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, অবশ্যই আমি তাদের থেকে তাদের পাপসমূহ দূর করে দেব এবং আমি অবশ্যই তাদের সেই উত্তম আমলের প্রতিদান দেব, যা তারা করত। আল-বায়ান

আর যারা ঈমান আনে আর সৎ কাজ করে, আমি অবশ্য অবশ্যই তাদের মন্দ কাজগুলোকে মুছে দেব, আর তাদেরকে অবশ্য অবশ্যই প্রতিদান দেব তাদের উৎকৃষ্ট কাজগুলোর অনুপাতে যা তারা করত। তাইসিরুল

আর যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে, নিশ্চয়ই আমি তাদের মন্দ কর্মগুলি মিটিয়ে দিব এবং তাদের কাজের উত্তম ফল দান করব। মুজিবুর রহমান

And those who believe and do righteous deeds - We will surely remove from them their misdeeds and will surely reward them according to the best of what they used to do. Sahih International

৭. আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে আমরা অবশ্যই তাদের থেকে তাদের মন্দকাজগুলো মিটিয়ে দেব এবং আমরা অবশ্যই তাদেরকে তারা যে উত্তম কাজ করত, তার প্রতিদান দেব।(১)

(১) আয়াতে ঈমান ও সৎকাজের দু'টি ফল। বৰ্ণনা করা হয়েছে, এক: মানুষের দুস্কৃতি ও পাপগুলো তার থেকে দূর করে দেয়া হবে। দুই: তার সর্বোত্তম কাজসমূহের সর্বোত্তম পুরষ্কার তাকে দেয়া হবে। পাপ ও দুস্কৃতি দূর করে দেয়ার অর্থ সৎকাজের কারণে গোনাহ ক্ষমা পেয়ে যাওয়া। কারণ সৎ কাজ সাধারণ গোনাহ মিটিয়ে দেয়। [জালালাইন; সা’দী] যেমন হাদীসে এসেছে, ঈমান আনার আগে মানুষ যতই পাপ করে থাকুক না কেন ঈমান আনার সাথে সাথেই তা সব মাফ হয়ে যাবে। [দেখুন: মুসলিম: ১২১] আর সর্বোত্তম কাজসমূহের সর্বোত্তম পুরস্কার দেয়ারও দু'টি অর্থ হয়। এক. মানুষের সৎকাজগুলোর মধ্যে যেটি হবে সবচেয়ে ভালো সৎকাজ, তাকে সামনে রেখে তার জন্য প্রতিদান ও পুরষ্কার নির্ধারণ করা হবে। যেমন মানুষের সৎকাজের মধ্যে রয়েছে ওয়াজিব-ফরয ও মুস্তাহাব কাজ। এ দু'টি অনুসারে তাকে প্রতিদান দেয়া হবে। কারণ, তার আমলের কিছু আমল আছে মুবাহ বা জয়েয আমল, সেটা অনুসারে নয়। [সা’দী] দুই. মানুষ তার কার্যাবলীর দৃষ্টিতে যতটা পুরষ্কারের অধিকারী হবে তার চেয়ে বেশী ভালো পুরষ্কার তাকে দেয়া হবে। [ফাতহুল কাদীর] একথাটি কুরআনের অন্যান্য স্থানেও বলা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ “যে ব্যক্তি সৎকাজ নিয়ে আসবে তাকে তার থেকে দশগুণ বেশী দেয়া হবে।” [সূরা আল-আন’আম: ১৬০] আরো বলা হয়েছে: “যে ব্যক্তি সৎকাজ নিয়ে আসবে তাকে তার চেয়ে উত্তম প্রতিদান দেয়া হবে।” [সূরা আল কাসাস: ৮৪] অন্যত্র বলা হয়েছে, “আল্লাহ তো কণামাত্রও জুলুম করেন না এবং সৎকাজ হলে তাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেন।” [সূরা আন-নিসা: ৪০]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭) যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আমি নিশ্চয়ই তাদের দোষত্রুটিসমূহকে মার্জনা করে দেব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের উত্তম ফলদান করব। [1]

[1] মহান আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টি হতে অমুখাপেক্ষী। কিন্তু তিনি কেবল কৃপা ও অনুগ্রহ করে ঈমানদারদের উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং এক একটি পুণ্যের কয়েক গুণ বেশি সওয়াব দান করবেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ৮ وَ وَصَّیۡنَا الۡاِنۡسَانَ بِوَالِدَیۡهِ حُسۡنًا ؕ وَ اِنۡ جَاهَدٰكَ لِتُشۡرِكَ بِیۡ مَا لَیۡسَ لَكَ بِهٖ عِلۡمٌ فَلَا تُطِعۡهُمَا ؕ اِلَیَّ مَرۡجِعُكُمۡ فَاُنَبِّئُكُمۡ بِمَا كُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ ﴿۸﴾

আর আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করতে। তবে যদি তারা তোমার উপর প্রচেষ্টা চালায় আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক করতে যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না। আমার দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা করতে আমি তা তোমাদেরকে জানিয়ে দেব। আল-বায়ান

পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য আমি মানুষের প্রতি ফরমান জারি করেছি। তারা যদি তোমার উপর বলপ্রয়োগ করে আমার সঙ্গে শরীক করার জন্য এমন কিছুকে যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদেরকে মান্য কর না। আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন, অতঃপর আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব যা তোমরা করছিলে। তাইসিরুল

আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে; কিন্তু তারা যদি তোমার উপর বল প্রয়োগ করে, আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই তাহলে তুমি তাদেরকে মান্য করনা। আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দিব যা তোমরা করতে। মুজিবুর রহমান

And We have enjoined upon man goodness to parents. But if they endeavor to make you associate with Me that of which you have no knowledge, do not obey them. To Me is your return, and I will inform you about what you used to do. Sahih International

৮. আর আমরা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।(১) তবে তারা যদি তোমার উপর বল প্রয়োগ করে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই(২), তাহলে তুমি তাদেরকে মেনো না(৩) আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসা। অতঃপর তোমরা কি করছিলে তা আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।(৪)

(১) হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে উত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন; সময়মত সালাত আদায় করা। বললঃ তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার। বললঃ তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহর পথে জিহাদ। [বুখারী: ৫৯৭০]

(২) আয়াতে বর্ণিত “যাকে তুমি আমার শরীক হিসেবে জানো না” বাক্যাংশটিও অনুধাবনযোগ্য। এর মধ্যে তাদের কথা না মানার সপক্ষে একটি শক্তিশালী যুক্তি প্ৰদান করা হয়েছে। এতে শির্কের জঘন্যতা প্ৰকাশ পেয়েছে। কারণ শির্কের সপক্ষে কোন জ্ঞান নেই। কেউ শির্ককে সঠিক বলে প্রমাণ করতে পারবে না। [সা’দী] এটা পিতা-মাতার অধিকার যে, ছেলেমেয়েরা তাদের সেবা করবে, তাদেরকে সম্মান ও শ্ৰদ্ধা করবে এবং বৈধ বিষয়ে তাদের কথা মেনে চলবে। কিন্তু শির্কের ব্যাপারে তাদের অনুসরণ করা যাবে না। অনুরূপভাবে কোন গোনাহর কাজেও নয়। যেমনটি রাসূলের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। [মুয়াস্‌সার]

এ অধিকার দেয়া হয়নি যে, মানুষ নিজের জ্ঞানের বিরুদ্ধে পিতামাতার অন্ধ অনুকরণ করবে। শুধুমাত্ৰ বাপ-মায়ের ধর্ম বলেই তাদের ছেলে বা মেয়ের সেই ধর্ম মেনে চলার কোন কারণ নেই। সন্তান যদি এ জ্ঞান লাভ করে যে, তার বাপ-মায়ের ধর্ম ভুল ও মিথ্যা তাহলে তাদের ধর্ম পরিত্যাগ করে তার সঠিক ধর্ম গ্ৰহণ করা উচিত এবং তাদের চাপ প্রয়োগের পরও যে পথের ভ্রান্তি তার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে সে পথ অবলম্বন করা তার উচিত নয়। বাপ-মায়ের সাথে যখন এ ধরনের ব্যবহার করতে হবে তখন দুনিয়ার প্রত্যেক ব্যক্তির সাথেও এ ব্যবহার করা উচিত। যতক্ষণ না কোন ব্যক্তির সত্য পথে থাকা সম্পর্কে জানা যাবে ততক্ষণ তার অনুসরণ করা বৈধ নয়।

(৩) অর্থাৎ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার সাথে সাথে এটাও জরুরী যে, আল্লাহর নির্দেশাবলীর অবাধ্যতা না হয়, সীমা পর্যন্ত পিতা-মাতার আনুগত্য করতে হবে। তারা যদি সন্তানকে কুফর ও শির্ক করতে বাধ্য করে, তবে এ ব্যাপারে কিছুতেই তাদের আনুগত্য করা যাবে না; যেমন হাদীসে আছে, আল্লাহর অবাধ্যতা করে কোন মানুষের আনুগত্য করা বৈধ নয়। [মুসনাদে আহমাদ: ১/১৩১] কোন কোন বর্ণনা মতে আলোচ্য আয়াত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি দশ জন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীগণের অন্যতম ছিলেন এবং অতিশয় মাতৃভক্ত ছিলেন। তার মাতা হামনা বিনতে সুফিয়ান পুত্রের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ অবগত হয়ে খুবই মর্মাহত হয়। সে পুত্ৰকে শাসিয়ে শপথ করল, আমি তখন পর্যন্ত আহার্য ও পানীয় গ্রহণ করব না, যে পর্যন্ত তুমি পৈতৃক ধর্মে ফিরে না আস। আমি এমনিভাবে ক্ষুধা ও পিপাসায় মৃত্যুবরণ করব, যাতে তুমি মাতৃহন্তা রূপে বিশ্ববাসীর দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন হও। [মুসলিম: ১৭৪৮]

এই আয়াত সাদকে মাতার আবদার রক্ষা করতে নিষেধ করল। অন্য বর্ণনায় এসেছে, সাদের জননী একদিন একরাত মতান্তরে তিনদিন তিনরাত শপথ অনুযায়ী অনশন ধর্মঘট অব্যাহত রাখলে সা’দ উপস্থিত হলেন। মাতৃভক্তি পূর্ববৎ ছিল; কিন্তু আল্লাহর ফরমানের মোকাবেলায় তা ছিল তুচ্ছ। তাই জননীকে সম্বোধন করে তিনি বললেনঃ আম্মাজান, যদি আপনার দেহে একশ’ আত্মা থাকত, এবং একটি একটি করে বের হতে থাকত, তা দেখেও আমি আমার দ্বীন ত্যাগ করতাম না। এখন আপনি ইচ্ছা করলে পানাহার করুন অথবা মৃত্যুবরণ করুন। আমি আমার দ্বীন ত্যাগ করতে পারি না। এ কথায় নিরাশ হয়ে তার মাতা অনশন ভঙ্গ করল। [বাগভী]

(৪) অর্থাৎ এ দুনিয়ার আত্মীয়তা এবং আত্মীয়দের সাহায্য-সহযোগিতা কেবলমাত্র এ দুনিয়ার সীমা-ত্রিসীমা পর্যন্তই বিস্তৃত। সবশেষে পিতা-মাতা ও সন্তান সবাইকে তাদের স্রষ্টার কাছে ফিরে যেতে হবে। সেখানে তাদের প্রত্যেকের জবাবদিহি হবে। তাদের ব্যক্তিগত দায়িত্বের ভিত্তিতে। যদি পিতা-মাতা সন্তানকে পথভ্রষ্ট করে থাকে তাহলে তারা পাকড়াও হবে। যদি সন্তান পিতা-মাতার জন্য পথভ্রষ্টতা গ্ৰহণ করে থাকে তাহলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। আর সন্তান যদি সঠিক পথ অবলম্বন করে থাকে এবং পিতা-মাতার বৈধ অধিকার আদায় করার ক্ষেত্রেও কোন প্রকার ত্রুটি না করে থাকে। কিন্তু পিতা-মাতা কেবলমাত্র পথভ্রষ্টতার ক্ষেত্রে তাদের সহযোগী না হবার কারণে তাকে নির্যাতন করে থাকে, তাহলে তারা আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে না। আল্লাহ বলছেন যে, কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যাবর্তন তো আমারই কাছে।

তখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের পিতামাতার প্রতি যে সদ্ব্যবহার করেছ এবং তোমাদের দ্বীনের উপর যে দৃঢ়পদ থেকেছ তার জন্য পুরস্কৃত করব। আর আমি তোমাকে সৎবান্দাদের সাথে হাশর করব, তোমার পিতা-মাতার দলে নয়। যদিও তারা দুনিয়াতে তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল। কারণ, একজন মানুষের হাশর কিয়ামতের দিন তার সাথেই হবে, যাকে সে ভালবাসে অর্থাৎ দ্বীনী ভালবাসা। তাই পরবর্তী আয়াতে বলেছেন যে, “আর যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আমরা অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করব।” [ইবন কাসীর; আরও দেখুন: ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮) আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছি,[1] তবে ওরা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কিছুকে অংশী করতে বাধ্য করে, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মান্য করো না।[2] আমারই নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন; অতঃপর তোমরা যা কিছু করেছ, আমি তা তোমাদেরকে জানিয়ে দেব।

[1] কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে মহান আল্লাহ তাঁর একত্ববাদের ও ইবাদতের আদেশ দানের সাথে সাথে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করারও আদেশ দিয়েছেন। যাতে একথা সুস্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর প্রতিপালকত্ব ও উপাস্যত্বের চাহিদা তারাই সঠিকভাবে বুঝতে ও পূরণ করতে পারে, যারা পিতা-মাতার আনুগত্য ও খিদমতের চাহিদাকে বুঝে ও পূরণ করে থাকে। যে ব্যক্তি এ কথা বুঝতে অক্ষম যে, পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব তার মাতা-পিতার মিলনের একান্ত ফল এবং তার লালন-পালন তাদের সীমাহীন করুণা ও মায়া-মমতার ফসল। অতএব তাদের খিদমতে কোন প্রকার অনীহা ও তাদের কথার কোন প্রকার অবাধ্যতা প্রকাশ করা কোনক্রমেই সন্তানের উচিত নয়। পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান অবশ্যই সৃষ্টিকূলের সৃষ্টিকর্তাকে বুঝতে এবং তাঁর একত্ববাদ ও ইবাদতের চাহিদা পূরণ করতে অক্ষম। এই কারণেই পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার তাকীদ হাদীসেও এসেছে। এক হাদীসে মাতা-পিতার সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁদের অসন্তুষ্টিকে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ বলা হয়েছে। (সূরা ইসরা’ ২৩-২৪ আয়াত দ্রষ্টব্য)

[2] অর্থাৎ, মাতা-পিতা যদি শিরক করতে (অনুরূপ অন্যান্য পাপ করতে) আদেশ করে এবং এর জন্য তারা যদি চাপ সৃষ্টি করে, তবুও তাদের আনুগত্য করা চলবে না। কেননা, لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق অর্থাৎ, আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন ব্যক্তির আনুগত্য চলবে না। (আহমাদ ৫/৬৬, হাকেম, সহীহুল জামে’ ৭৫২০নং) এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে সা’দ বিন আবী অক্কাস (রাঃ)-এর ঘটনা বর্ণিত হয়। কারণ যখন তিনি মুসলমান হয়ে গেলেন, তখন তাঁর মাতা শপথ করেছিলেন যে, আমি আমরণ পানাহার করব না; যদি না তুমি মুহাম্মাদের নবুঅতকে অস্বীকার করেছ! শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর মাতার মুখে জোরপূর্বক খাবার পুরে দিয়েছিলেন। যার জন্য উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।

(মুসলিম, তিরমিযীঃ সূরা আনকাবূতের ব্যাখ্যা পরিচ্ছেদ)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ৯ وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَنُدۡخِلَنَّهُمۡ فِی الصّٰلِحِیۡنَ ﴿۹﴾

আর যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করব। আল-বায়ান

যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আমি অবশ্য অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করব। তাইসিরুল

যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করব। মুজিবুর রহমান

And those who believe and do righteous deeds - We will surely admit them among the righteous [into Paradise]. Sahih International

৯. আর যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আমরা অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করব।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯) যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করব। [1]

[1] অর্থাৎ, যদি কারো পিতা-মাতা মুশরিক হয়, তাহলে তার মুসলিম পুত্র সৎ লোকদের সঙ্গী হবে, পিতা-মাতার সঙ্গী নয়; যদিও সে তার সংসার জীবনে মাতা-পিতার বেশি নিকটবর্তী ছিল। কিন্তু তার ভালবাসা ছিল কেবলমাত্র মুসলিমদের জন্য, সেই হিসাবে المَرْءُ مَع مَن أَحَبّ এর ভিত্তিতে সে সৎকর্মশীলদেরই দলভুক্ত হবে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ১০ وَ مِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّقُوۡلُ اٰمَنَّا بِاللّٰهِ فَاِذَاۤ اُوۡذِیَ فِی اللّٰهِ جَعَلَ فِتۡنَۃَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللّٰهِ ؕ وَ لَئِنۡ جَآءَ نَصۡرٌ مِّنۡ رَّبِّكَ لَیَقُوۡلُنَّ اِنَّا كُنَّا مَعَكُمۡ ؕ اَوَ لَیۡسَ اللّٰهُ بِاَعۡلَمَ بِمَا فِیۡ صُدُوۡرِ الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۱۰﴾

আর কিছু লোক আছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি’, অতঃপর যখন আল্লাহর ব্যাপারে তাদের কষ্ট দেয়া হয়, তখন তারা মানুষের নিপীড়নকে আল্লাহর আযাবের মত গণ্য করে। আর যদি তোমার রবের পক্ষ থেকে কোন বিজয় আসে, তখন অবশ্যই তারা বলে, ‘নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথে ছিলাম’। সৃষ্টিকুলের অন্তরসমূহে যা কিছু আছে আল্লাহ কি তা সম্পর্কে সম্যক অবগত নন? আল-বায়ান

মানুষের মধ্যে কতক আছে যারা বলে ‘আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি।’ অতঃপর তাদেরকে যখন আল্লাহর পথে কষ্ট দেয়া হয়, তখন তারা মানুষের উৎপীড়নকে আল্লাহর ‘আযাবের মত মনে করে। আর যদি (তোমার কাছে) তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সাহায্য আসে তখন তারা অবশ্য অবশ্যই বলে যে, ‘আমরা তো (সব সময়) তোমাদের সাথেই ছিলাম। সকল সৃষ্টির অন্তরে কী আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ কি সর্বাধিক অবগত নন? তাইসিরুল

মানুষের মধ্যে কতক লোক বলেঃ ‘‘আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করি।’’ কিন্তু আল্লাহর পথে যখন তারা কষ্টে পতিত হয় তখন তারা মানুষের পীড়নকে আল্লাহর শাস্তির মত গণ্য করে এবং তোমার রবের নিকট হতে কোন সাহায্য এলে তারা বলতে থাকে, ‘আমরাতো তোমাদের সাথেই ছিলাম’। বিশ্ববাসীর অন্তরে যা আছে আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন? মুজিবুর রহমান

And of the people are some who say, "We believe in Allah," but when one [of them] is harmed for [the cause of] Allah, they consider the trial of the people as [if it were] the punishment of Allah. But if victory comes from your Lord, they say, "Indeed, We were with you." Is not Allah most knowing of what is within the breasts of all creatures? Sahih International

১০. আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ বলে, আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি(১), কিন্তু আল্লাহর পথে যখন তারা নিগৃহীত হয়, তখন তারা মানুষের পীড়নকে আল্লাহর শাস্তির মত গণ্য করে।(২) আর আপনার রবের কাছ থেকে কোন সাহায্য আসলে তারা বলতে থাকে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম(৩) সৃষ্টিকুলের অন্তঃকরণে যা আছে, আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন?

(১) যদিও বক্তা এক ব্যক্তিমাত্র কিন্তু সে “আমি ঈমান এনেছি” বলার পরিবর্তে বলছে, “আমরা ঈমান এনেছি”। এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম অর্থের প্রতি ইংগিত রয়েছে তা হলো মুনাফিক সবসময় নিজেকে মুমিনদের মধ্যে শামিল করার চেষ্টা করে থাকে এবং নিজের ঈমানের উল্লেখ এমনভাবে করে থাকে যাতে মনে হয় সেও ঠিক অন্যদের মতই মুমিন। এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে, যেমন কোন কাপুরুষ যদি কোন সেনাদলের সাথে গিয়ে থাকে এবং সেনাদলের অসম সাহসী সৈনিকেরা লড়াই করে শক্রদলকে বিতাড়িত করে দিয়ে থাকে তাহলে কাপুরুষটি নিজে কোন কাজে অংশ গ্ৰহণ না করে থাকলেও সে এসে লোকদেরকে বলবে, আমরা গিয়েছি, আমরা ভীষণ যুদ্ধ করেছি এবং শক্রকে পরাস্ত করেছি। অর্থাৎ সেও যেন সেই অমিত সাহসী যোদ্ধাদের সাথে মিলে যুদ্ধ করেছিল। [আত-তাফসীরুল কাবীর]

(২) অর্থাৎ আল্লাহর আযাবের ভয়ে যেমন কুফরী ও গোনাহ থেকে বিরত থাকা উচিত এ ব্যক্তি ঠিক তেমনি বান্দা প্রদত্ত নির্যাতন-নিগ্রহের ভয়ে ঈমান ও সৎকাজ থেকে বিরত হয়েছে। ঈমান আনার পর যখন সে কাফেরদের হুমকি, মারধর ও নির্যাতনের সম্মুখীন হয় তখন সে মনে করে যে এটা বোধ হয় আল্লাহর শাস্তি তখন সে ঈমান থেকে সরে যায়। [ইবন কাসীর] অথবা আয়াতের অর্থ, তখন সে এমন পেরেশান হয়ে যায় যে রকম পেরেশান হতে হয় আল্লাহর আযাবের ক্ষেত্রে। ফলে মুরতাদ হয়ে যায় [মুয়াস্‌সার] অথবা আয়াতের অর্থ, তারা মানুষের নির্যাতনের সম্মুখীন হলে সে নির্যাতন তাদের জন্য দ্বীন ইসলাম থেকে ফিরে যাওয়া বা মুরতাদ হওয়ার কারণে পরিণত হয়, যেমন আল্লাহর আযাব কুফরি ও গোনাহ থেকে ফিরে থাকার কারণ হয়। [সাদী; আদওয়াউল বায়ান] এ আয়াতের সমর্থনে অন্য আয়াত হচ্ছে, “আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদাত করে দ্বিধার সাথে; তার মংগল হলে তাতে তার চিত্ত প্রশান্ত হয় এবং কোন বিপর্যয় ঘটলে সে তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ক্ষতিগ্ৰস্ত হয় দুনিয়াতে এবং আখেরাতে; এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।” [সূরা আল হাজ্জ: ১১]

(৩) অর্থাৎ আজ সে নিজেকে বাঁচাবার জন্য কাফেরদের সাথে যোগ দিয়েছে এবং মুমিনদের পক্ষ ত্যাগ করেছে। কারণ সত্য দ্বীনের সম্প্রসারণের জন্য নিজের গায়ে আঁচড়টি লাগাতেও সে প্রস্তুত নয়। কিন্তু যখন এ দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গকারীদেরকে আল্লাহ সাফল্য ও বিজয়-দান করবেন তখন এ ব্যক্তি বিজয়ের ফল গনীমতের মাল ভাগ করে নেবার জন্য এসে যাবে এবং মুসলিমদের বলবে, আমি তো মনে প্ৰাণে তোমাদেরই সাথে ছিলাম, তোমাদের সাফল্যের জন্য দো'আ করছিলাম এবং তোমাদের প্রচেষ্টা, সংগ্রাম ও কুরবানীকে আমি বিরাট মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখেছি। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যারা তোমাদের অমংগলের প্রতীক্ষায় থাকে, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জয় হলে বলে, “আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না।” আর যদি কাফেরদের কিছু বিজয় হয়, তবে তারা বলে, আমরা কি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রবল ছিলাম না এবং আমরা কি তোমাদেরকে মুমিনদের হাত থেকে রক্ষা করিনি?” [সূরা আন-নিসা: ১৪১]

আরও বলেন, “আর নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে এমন লোক আছে, যে গড়িমসি করবেই। অতঃপর তোমাদের কোন মুসীবত হলে সে বলবে, তাদের সংগে না থাকায় আল্লাহ আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আর তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ হলে, যেন তোমাদের ও তার মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই এমনভাবে বলবেই, ‘হায়! যদি তাদের সাথে থাকতাম। তবে আমিও বিরাট সাফল্য লাভ করতাম।” [সূরা আন-নিসা: ৭২–৭৩] আরও বলেন, “অতঃপর হয়ত আল্লাহ বিজয় বা তার কাছ থেকে এমন কিছু দেবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল সে জন্য লজ্জিত হবে।” [সূরা আল-মায়িদাহ: ৫২] মোটকথা পরবর্তী বাক্যে আল্লাহ্ তাদেরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করে বলেছেন যে, তিনি সৃষ্টিকুলের অন্তরের সব খবর জানেন। [আদওয়াউল বায়ান]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০) মানুষের মধ্যে কিছু লোক বলে, ‘আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি’; কিন্তু আল্লাহর পথে যখন ওদেরকে কষ্ট দেওয়া হয়, তখন ওরা মানুষের পীড়নকে আল্লাহর শাস্তির মত গণ্য করে।[1] আর তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে কোন সাহায্য এলে[2] অবশ্যই ওরা বলতে থাকে, ‘আমরা তো তোমাদেরই সঙ্গী।’[3] বিশ্ববাসী (মানুষের) অন্তরে যা কিছু আছে, আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন? [4]

[1] এখানে মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানের লোকদের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে যে, যখন ঈমান আনার কারণে কোন আপদ-বিপদ আসে, তখন তা আল্লাহর আযাবের মতই তাদের অসহনীয় হয়ে ওঠে। যার ফলে সে ঈমান হতে ফিরে যায় এবং সাধারণের ধর্মকে বেছে নেয়।

[2] অর্থাৎ, যদি মুসলিমরা বিজয় ও আধিপত্য লাভ করে।

[3] অর্থাৎ, তোমাদের দ্বীনী ভাই। এ কথাটি অন্যত্র এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘‘যারা তোমাদের (শুভাশুভ পরিণতির) প্রতীক্ষায় থাকে; সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহে তোমাদের বিজয় লাভ হলে তারা (তোমাদেরকে) বলে, ‘আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না?’ আর যদি অবিশ্বাসীদের আংশিক বিজয় লাভ হয়, তাহলে তারা (তাদেরকে) বলে, ‘আমরা কি তোমাদের বিরুদ্ধে জয়ী ছিলাম না এবং আমরা কি তোমাদেরকে বিশ্বাসীদের হাত থেকে রক্ষা করিনি?’ (সূরা নিসা ১৪১আয়াত)

[4] অর্থাৎ, আল্লাহ কি তোমাদের অন্তরের কথা সম্পর্কে অবগত নন এবং তোমাদের হৃদয়ের গোপন খবর জানেন না? অর্থাৎ, তোমরা মৌখিকভাবে মুসলিমদের সাথী হওয়ার কথা প্রকাশ করছ।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ১১ وَ لَیَعۡلَمَنَّ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ لَیَعۡلَمَنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ ﴿۱۱﴾

আর আল্লাহ অবশ্যই জানেন, কারা ঈমান এনেছে এবং তিনি মুনাফিকদেরকেও জানেন। আল-বায়ান

আল্লাহ অবশ্য অবশ্যই জেনে নেবেন কারা ঈমান এনেছে আর অবশ্য অবশ্যই জেনে নেবেন কারা মুনাফিক। তাইসিরুল

আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা ঈমান এনেছে এবং অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা মুনাফিক। মুজিবুর রহমান

And Allah will surely make evident those who believe, and He will surely make evident the hypocrites. Sahih International

১১. আর আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা ঈমান এনেছে এবং অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা মুনাফিক।(১)

(১) আয়াতের শাব্দিক অনুবাদ হচ্ছে, আল্লাহ অবশ্যই জানবেন কারা ঈমান এনেছে, আর অবশ্যই জানবেন কারা মুনাফিক। আল্লাহর এ জানার অর্থ প্রকাশ করে দেয়া। যাতে করে মুমিনদের ঈমান ও মুনাফিকদের মুনাফিকির অবস্থা যাতে উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং যার মধ্যে যা কিছু লুকিয়ে আছে সব সামনে এসে যায় সে জন্য আল্লাহ বারবার পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। [দেখুন, ইবন কাসীর] একথাটিই কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছেঃ “আল্লাহ মুমিনদেরকে কখনো এমন অবস্থায় থাকতে দেবেন না, যে অবস্থায় এখন তোমরা আছে (অর্থাৎ সাচ্চা ঈমানদার ও মুনাফিক সবাই মিশ্রিত হয়ে আছো) যতক্ষণ না তিনি পবিত্ৰ লোকদেরকে অপবিত্ৰ লোকদের থেকে সুস্পষ্টভাবে আলাদা করে দেবেন।” [সূরা আলে ইমরান: ১৭৯]

আরও এসেছে, “আর আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব, যতক্ষণ না আমরা জেনে নেই তোমাদের মধ্যে জিহাদকারী ও ধৈর্যশীলদেরকে এবং আমরা তোমাদের কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করি।” [সূরা মুহাম্মাদ: ৩১] অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা শুধু তাঁর জ্ঞান অনুসারে কোন ফয়সালা করতে চান না। তিনি চান তাদের অন্তরের লুকানো বিষয় প্রকাশ হয়ে পড়ুক। আর সে জন্যই তিনি তাদেরকে পরীক্ষা করেন। এ পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করতে চান। যাতে কিয়ামতের মাঠে বলতে না পারে যে, আপনি আমাদের যদি পরীক্ষা করতেন হয়ত আমরা সে পরীক্ষায় টিকে যেতাম। [সা'দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১১) আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন কারা বিশ্বাসী এবং কারা মুনাফিক (কপট)।[1]

[1] এর অর্থ হল যে, মহান আল্লাহ সুখ ও দুঃখ দিয়ে তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন, যাতে মু’মিন ও মুনাফিকের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যায়। যে উভয় অবস্থায় আল্লাহর আনুগত্য করবে সে মু’মিন, আর যে কেবলমাত্র সুখে-সম্পদে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে আসলে নিজ প্রবৃত্তির অনুগত; আল্লাহর নয়। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে, {وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِينَ مِنكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُمْ}  অর্থাৎ, আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব; যতক্ষণ না আমি তোমাদের মধ্যে মুজাহিদ ও ধৈর্যশীলদেরকে জেনে নিই এবং আমি তোমাদের অবস্থা পরীক্ষা করি। (সূরা মুহাম্মাদ ৩১ আয়াত) যে উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদেরকে ভীষণ পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়েছিল, তার পরবর্তীকালে মহান আল্লাহ বলেন,

{مَّا كَانَ اللّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَآ أَنتُمْ عَلَيْهِ حَتَّىَ يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ} অর্থাৎ, অপবিত্র (মুনাফিক)-কে পবিত্র (মু’মিন) হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছ আল্লাহ সে অবস্থায় বিশ্ববাসিগণকে ছেড়ে দিতে পারেন না। (সূরা আলে ইমরান ১৭৯ আয়াত)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ১২ وَ قَالَ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا لِلَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّبِعُوۡا سَبِیۡلَنَا وَ لۡنَحۡمِلۡ خَطٰیٰكُمۡ ؕ وَ مَا هُمۡ بِحٰمِلِیۡنَ مِنۡ خَطٰیٰهُمۡ مِّنۡ شَیۡءٍ ؕ اِنَّهُمۡ لَكٰذِبُوۡنَ ﴿۱۲﴾

আর কাফিররা মুমিনদেরকে বলে, ‘তোমরা আমাদের পথ অনুসরণ কর এবং যেন আমরা তোমাদের পাপ বহন করি।’ অথচ তারা তাদের পাপের কিছুই বহন করবে না। নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী। আল-বায়ান

কাফিররা মু’মিনদেরকে বলে, ‘আমাদের পথ অনুসরণ কর, আমরা তোমাদের পাপের বোঝা বহন করব, মূলতঃ তারা তাদের পাপের কিছুই বহন করবে না, অবশ্যই তারা মিথ্যেবাদী। তাইসিরুল

কাফিরেরা মু’মিনদেরকে বলেঃ ‘আমাদের পথ অনুসরণ কর, আমরা তোমাদের পাপভার বহন করব।’ কিন্তু তারাতো তাদের পাপভারের কিছুই বহন করবেনা। তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। মুজিবুর রহমান

And those who disbelieve say to those who believe, "Follow our way, and we will carry your sins." But they will not carry anything of their sins. Indeed, they are liars. Sahih International

১২. আর কাফিররা মুমিনদেরকে বলে, তোমরা আমাদের পথ অনুসরণ কর তাহলে আমরা তোমাদের পাপভার বহন করব।(১) কিন্তু ওরা তো তাদের পাপভারের কিছুই বহন করবে না। নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী।(২)

(১) কুরাইশ সর্দারদের এ উক্তিটি ছিল সেসব ঈমানদারদের প্রতি যারা তাওহীদ ও আখেরাতের পুরস্কার ও শাস্তিতে বিশ্বাস করত। তারা তাদেরকে তাওহীদের কথা, মৃত্যু পরবর্তী জীবন, হাশর-নশর, হিসেব ও শাস্তি-পুরষ্কার সম্পর্কে বলত, এসব কথা একদম বাজে ও উদ্ভট। কিন্তু ধরে নেয়া যাক যদি আখেরাতের কোন জীবন এবং সেখানে জবাবদিহির কোন বিষয় থেকেই থাকে, তাহলে তার দায়ভার আমরা গ্ৰহণ করছি। আল্লাহর সামনে সমস্ত শাস্তি ও পুরস্কারের বোঝা আমরা মাথা পেতে নেবো। আমাদের কথায় তোমরা এ নতুন দ্বীন ত্যাগ করো এবং নিজেদের পিতৃ পুরুষের দ্বীনের দিকে ফিরে এসো। [দেখুন: মুয়াস্‌সার]

(২) ‘মিথ্যাচার’ মানে তারা যে বলেছিল “তোমরা আমাদের অনুসরণ করো এবং তোমাদের গোনাহগুলো আমরা নিজেদের ওপর চাপিয়ে নেবো।” এটা পুরোপুরি মিথ্যাচার। [দেখুন: মুয়াসসার] কারণ কিয়ামতে একে অপরের বোঝা কখনও বহন করবে না। আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন, “আর কোন বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না; এবং কোন ভারাক্রান্ত ব্যক্তি যদি কাউকেও তা বহন করতে ডাকে তবে তার থেকে কিছুই বহন করা হবে না— এমনকি নিকট আত্মীয় হলেও।”। [সূরা ফাতির: ১৮] আরও বলেন, “আর সুহৃদ সুহৃদের খোঁজ নেবে না, তাদেরকে করা হবে এককে অন্যের দৃষ্টিগোচর। অপরাধী সেদিনের শাস্তির বদলে দিতে চাইবে তার সন্তানসন্ততিকে—” [সূরা আল-মা'আরিজ: ১০–১১]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১২) অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসীদেরকে বলে, ‘তোমরা আমাদের পথ ধর; আমরা তোমাদের পাপভার বহন করব!’[1] কিন্তু ওরা তো তোমাদের পাপভারের কিছুই বহন করবে না। ওরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।[2]

[1] অর্থাৎ, তোমরাও পূর্ব-পুরুষদের ঐ ধর্মে ফিরে এস, যে ধর্মের আমরা অনুসারী। কারণ, এটিই সত্য ধর্ম। যদি প্রচলিত ধর্ম পালনের জন্য তোমাদের কোন পাপ হয়, তাহলে তার গুরুভার আমরা বহন করব এবং তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমাদের।

[2] মহান আল্লাহ বলেন, ওরা নিঃসন্দেহে মিথ্যাবাদী। কিয়ামতের দিন এমন হবে যে, সেদিন কেউ কারো বোঝা বহন করবে না। এমনকি আত্মীয়রাও এক অপরের বোঝা বইবে না।{وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَإِن تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلَى حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى} (সূরা ফাত্বির ১৮ আয়াত) সেখানে এক বন্ধু অপর বন্ধুর খোঁজ নেবে না। তাদের মধ্যে পৃথিবীতে যতই বন্ধুত্ব থাকুক না কেন।{وَلَا يَسْأَلُ حَمِيمٌ حَمِيمًا} এখানেও উক্ত বোঝা বহনের কথা খন্ডন করা হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ১৩ وَ لَیَحۡمِلُنَّ اَثۡقَالَهُمۡ وَ اَثۡقَالًا مَّعَ اَثۡقَالِهِمۡ ۫ وَ لَیُسۡـَٔلُنَّ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ عَمَّا كَانُوۡا یَفۡتَرُوۡنَ ﴿۱۳﴾

আর অবশ্যই তারা বহন করবে তাদের বোঝা এবং তাদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা। আর তারা কিয়ামতের দিন অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে সে সম্পর্কে, যা তারা মিথ্যা বানাত। আল-বায়ান

তারা অবশ্য অবশ্যই তাদের নিজেদের পাপের বোঝা বহন করবে, নিজেদের বোঝার সাথে আরো বোঝা, আর তারা যে সব মিথ্যে উদ্ভাবন করত সে সম্পর্কে ক্বিয়ামত দিবসে তারা অবশ্য অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে। তাইসিরুল

এবং তারা নিজেদের বোঝা বহন করবে এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরও বোঝা; এবং তারা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করে সেই সম্পর্কে কিয়ামাত দিবসে অবশ্যই তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে। মুজিবুর রহমান

But they will surely carry their [own] burdens and [other] burdens along with their burdens, and they will surely be questioned on the Day of Resurrection about what they used to invent. Sahih International

১৩. তারা তো বহন করবে নিজেদের ভার এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা(১); আর তারা যে মিথ্যা রটনা করত সে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে।

(১) অর্থাৎ কাফেররা মুসলিমগণকে বলত, তোমরা অহেতুক আখেরাতে শাস্তির ভয়ে আমাদের পথে চলছ না। আমরা কথা দিচ্ছি, যদি তোমাদের কথাই সত্য হয় যে, আমাদের পথে চললে আখেরাতে শাস্তি পেতে হবে, তবে তোমাদের পাপভার আমরাই বহন করব। যা কিছু শাস্তি হবে, আমাদেরই হবে। [ইবন কাসীর] সাধারণ মুসলিমগণের সাথে কাফেরদের এমনি ধরনের উক্তির জওয়াবে আল্লাহ তা'আলা বলছেন, যারা এরূপ বলে তারা সম্পূর্ণ মিথ্যাবাদী। আখেরাতের ভয়াবহ আযাব দেখে তারা তাদের পাপভার বহন করবেই না। কাজেই তাদের এই ওয়াদা মিথ্যা। তাছাড়া তোমাদের পাপভোর বহন করে তারা তোমাদেরকে মুক্ত করে দেবে- একথা তো ভ্রান্ত ও মিথ্যা, তবে তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করা ও সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা স্বয়ং একটি বড় পাপ। এই পাপভারও তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হবে। ফলে তারা নিজেদের পাপভারও বহন করবে এবং যাদের বিভ্রান্ত করেছিল, তাদের পাপভারও এক সাথে বহন করবে। [ইবন কাসীর]

এ আয়াত থেকে জানা গেল যে, যে ব্যক্তি অপরকে পাপকাজে লিপ্ত করতে অনুপ্রাণিত করে অথবা পাপকাজে তাকে সাহায্য করে, সে-ও আসল পাপীর অনুরূপ অপরাধী। কুরআন মজীদের অন্য এক জায়গায় এ নিয়মটিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, “যাতে কিয়ামতের দিন তারা নিজেদের বোঝাও পুরোপুরি বহন করে এবংএমন সবলোকদের বোঝার একটি অংশও বহন করে যাদেরকে তারা জ্ঞান ছাড়াই গোমরাহ করে।” [সূরা আন-নাহল: ২৫] আর এ নিয়মটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিমোক্ত হাদীসটিতে বর্ণনা করেছেন: “যে ব্যক্তি সঠিক পথের দিকে আহবান জানায় সে তাদের সমান প্রতিদান পাবে যারা তার আহবানে সাড়া দিয়ে সঠিক পথ অবলম্বন করে, এ জন্য তাদের প্ৰাপ্যে কোন কমতি করা হবে না। আর যে ব্যক্তি গোমরাহীর দিকে আহবান জানায় সে তাদের সবার সমান গোনাহের ভাগী হবে যারা তার অনুসরণ করে এবং এ জন্য তাদের গোনাহের মধ্যে কোন কমতি করা হবে না।” [মুসলিম: ২৬৭৪]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৩) ওরা অবশ্যই নিজেদের পাপভার বহন করবে এবং তার সঙ্গে আরও কিছু পাপের বোঝা[1] এবং ওরা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, সে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই ওদেরকে প্রশ্ন করা হবে।

[1] অর্থাৎ, কুফরের নেতারা ও ভ্রষ্টতার দিকে আহবানকারীরা নিজেরা শুধু নিজেদের বোঝাই বইবে না; বরং তার সাথে ঐ সকল লোকেদের পাপের বোঝাও তাদের উপর হবে, যারা তাদের চেষ্টায় পথভ্রষ্ট হয়েছিল। এ বিষয়টি সূরা নাহলের ২৫নং আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে। হাদীসের মধ্যে আছে, ‘‘যে ব্যক্তি সৎপথের দিকে আহবান করে (দাওয়াত দেয়) সে ব্যক্তির ঐ পথের অনুসারীদের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ হবে। এতে তাদের সওয়াব থেকে কিছু মাত্র কম হবে না। আর যে ব্যক্তি অসৎ পথের দিকে আহবান করে সেই ব্যক্তির ঐ পথের অনুসারীদের সমপরিমাণ গোনাহর ভাগী হবে। এতে তাদের গোনাহ থেকে কিছুমাত্র কম হবে না।’’ (মুসলিম ২৬৭৪নং প্রমুখ) এই নিয়মানুসারে কিয়ামত পর্যন্ত অন্যায়ভাবে যত হত্যা হবে তাদের পাপের একটি অংশ আদমের পুত্র কাবীলের উপর বর্তাবে। কারণ, মানুষের ইতিহাসে সেই প্রথম অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল। (মুসনাদে আহমাদ)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ১৪ وَ لَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا نُوۡحًا اِلٰی قَوۡمِهٖ فَلَبِثَ فِیۡهِمۡ اَلۡفَ سَنَۃٍ اِلَّا خَمۡسِیۡنَ عَامًا ؕ فَاَخَذَهُمُ الطُّوۡفَانُ وَ هُمۡ ظٰلِمُوۡنَ ﴿۱۴﴾

আর আমি অবশ্যই নূহকে তার কওমের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদের মধ্যে পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর অবস্থান করেছিল। অতঃপর মহা-প্লাবন তাদের গ্রাস করল, এমতাবস্থায় যে তারা ছিল যালিম। আল-বায়ান

আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম, অতঃপর সে পঞ্চাশ বছর কম হাজার বছর তাদের মাঝে অবস্থান করেছিল। অতঃপর মহাপ্লাবন তাদেরকে গ্রাস করল কারণ তারা ছিল সীমালঙ্ঘনকারী। তাইসিরুল

আমিতো নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম এবং সে তাদের মধ্যে পঞ্চাশ কম হাজার বছর অবস্থান করেছিল। অতঃপর প্লাবন তাদেরকে গ্রাস করে। কারণ তারা ছিল সীমালংঘনকারী। মুজিবুর রহমান

And We certainly sent Noah to his people, and he remained among them a thousand years minus fifty years, and the flood seized them while they were wrongdoers. Sahih International

১৪. আর আমরা তো নুহকে তার সস্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম।(১) তিনি তাদের মধ্যে অবস্থান করেছিলেন পঞ্চাশ কম হাজার বছর। অতঃপর প্লাবন তাদেরকে গ্ৰাস করে; এমতাবস্থায় যে তারা ছিল যালিম।(২)

(১) পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে কাফেরদের বিরোধিতা ও মুসলিমদের উপর নির্যাতনমূলক অবস্থা বর্ণিত হয়েছিল। আলোচ্য আয়াতসমূহে নির্যাতনমূলক ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সান্তনা দেয়ার জন্যে পূর্ববর্তী নবীগণ ও তাদের উম্মতের কিছু অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। [দেখুন: ইবন কাসীর] উদ্দেশ্য এই যে, প্রাচীনকাল থেকেই সত্যপন্থীদের উপর কাফেরদের তরফ থেকে নির্যাতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এসব-উৎপীড়নের কারণে তারা কোন সময় সাহস হারাননি। মুমিনদের উচিত কাফেরদের উৎপীড়নের পরওয়া না করা। পূর্ববর্তী নবীগণের মধ্যে সর্বপ্রথম নূহ আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত: এর কারণ এই যে, তিনিই প্রথম নবী, যিনি কুফর ও শিরকের মোকাবেলা করেছেন। দ্বিতীয়ত: তার সম্প্রদায়ের তরফ থেকে তিনি যতটুকু নির্যাতিত হয়েছিলেন, অন্য কোন নবী ততটুকু হননি। কেননা, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে বিশেষভাবে সুদীর্ঘ জীবন দান করেছিলেন এবং তার সমস্ত জীবন কাফেরদের নিপীড়নের মধ্যে অতিবাহিত হয়।

কুরআনের এ সূরায় বর্ণিত তার বয়স সাড়ে নয়শ' বছর তো অকাট্য ও নিশ্চিতই। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, এটা তার প্রচার ও দাওয়াতের বয়স। এর আগে এবং প্লাবনের পরেও তার আরও বয়স আছে। [ফাতহুল কাদীর] মোটকথা, এই অসাধারণ সুদীর্ঘ বয়স অবিরাম দাওয়াত ও তাবলীগে ব্যয় করা এবং প্রতিক্ষেত্রেই কাফেরদের তরফ থেকে নানারকম উৎপীড়ন সহ্য করা সত্বেও কোন সময় সাহস না হারানো—এগুলো সব নূহ আলাইহিস সালাম-এরই বৈশিষ্ট্য। এখানে এ জিনিসটি বর্ণনা করাই উদ্দেশ্য যে, হে মুহাম্মাদ! আপনি কাফের মুশরিকদের অবাধ্যতায় আফসোস করে নিজেকে ক্ষতিগ্ৰস্ত করবেন না। কারণ হেদায়াত আল্লাহর হাতে তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়াত করবেন আর যাকে ইচ্ছে হেদায়াত থেকে দূরে রাখবেন। আপনার দায়িত্ব তো তাবলীগের মাধ্যমেই সমাপ্ত হবে। তবে এটা জেনে রাখুন যে, আল্লাহ আপনার দ্বীনকে জয়ী করবেন। আপনার শক্ৰদের বিনাশ করবেন। [ইবন কাসীর]

আর আয়াতের মাধ্যমে মুমিনদের হেদায়াত দেয়া হচ্ছে যে, তোমরা তো মাত্ৰ পাঁচ বছর থেকে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করছো এবং একটি গোমরাহ জাতির হঠকারিতা বরদাশত করে চলছো। কিন্তু আমার এ বান্দা যে অনবরত সাড়ে নয়শ’ বছর ধরে এসবের মোকাবিলা করেছে তার সবর ও দৃঢ়তার কথা ভেবে দেখো। তুলনামূলক অধ্যয়নের জন্য দেখুন সূরা আলে ইমরান: ৩৩–৩৪; সূরা আন নিসা: ১৬৩; সূরা আল আন’আম: ৮৪; সূরা আল-আ’রাফ: ৫৯ থেকে ৬৪; সূরা ইউনুস: ৭১ ও ৭৩; সূরা হূদ: ২৫ ও ৪৮; সূরা আল আম্বিয়া: ৭৬ ও ৭৭; সূরা আল মুমিনুন: ২৩ ও ৩০; সূরা আল ফুরকান: ৩৭; সূরা আশ শো'আরা: ১০৫ থেকে ১২৩; সূরা আস সাফ্‌ফাত: ৭৫ ও ৮২; সূরা আল কামার: ৯০; সূরা আল হাক্কাহ: ১১ ও ১২ আয়াত এবং সূরা নূহ সম্পূর্ণ।

(২) অর্থাৎ তারা নিজেদের যুলুম-নিপীড়ন চালিয়ে যেতে থাকা অবস্থায় মহাপ্লাবনের গ্রাসে পরিণত হয়। যদি মহাপ্লাবন আসার আগে তারা নিজেদের যুলুম-নিপীড়ন থেকে বিরত হতো তাহলে আল্লাহ তাদের ওপর এ আযাব পাঠাতেন না। কিন্তু তারা নূহের কথা না শুনে যুলুম ও শির্কেই নিপতিত ছিল। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪) আমি অবশ্যই নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম; সে ওদের মধ্যে অবস্থান করেছিল সাড়ে ন’শ বছর।[1] অতঃপর বন্যা ওদেরকে গ্রাস করল; কারণ ওরা ছিল সীমালংঘনকারী।

[1] কুরআনের শব্দাবলীতে এ কথা জানা যায় যে, এটি ছিল তাঁর দাওয়াত ও তাবলীগের বয়স। তাঁর পূর্ণ বয়স কত ছিল তা পরিষ্কার নয়। কেউ কেউ বলেন, নবুঅতের পূর্বে ৪০ বছর ও বন্যার পর ৬০ বছর ঐ সংখ্যায় পরিগণিত। এছাড়া আরো অন্য উক্তিও আছে। এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ১৫ فَاَنۡجَیۡنٰهُ وَ اَصۡحٰبَ السَّفِیۡنَۃِ وَ جَعَلۡنٰهَاۤ اٰیَۃً لِّلۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۱۵﴾

অতঃপর তাকে ও নৌকা আরোহীদেরকে আমি রক্ষা করলাম, আর এটাকে করলাম সৃষ্টিকুলের জন্য একটি নিদর্শন। আল-বায়ান

অতঃপর আমি তাকে ও নৌকারোহীদেরকে রক্ষে করলাম আর এটাকে করলাম বিশ্বজগতের জন্য নিদর্শন। তাইসিরুল

অতঃপর আমি তাকে এবং যারা তরণীতে আরোহণ করেছিল তাদেরকে রক্ষা করলাম এবং বিশ্ব জগতের জন্য একে করলাম একটি নিদর্শন। মুজিবুর রহমান

But We saved him and the companions of the ship, and We made it a sign for the worlds. Sahih International

১৫. অতঃপর আমরা তাকে এবং যারা নৌকায় আরোহণ করেছিল তাদেরকে রক্ষা করলাম এবং সৃষ্টিকুলের জন্য এটাকে করলাম একটি নিদর্শন।(১)

(১) অর্থাৎ এ নৌকাটিকে আমরা সৃষ্টিকুলের জন্য শিক্ষণীয় নির্দশন করেছি। পরবর্তীকালের লোকদের জন্য শিক্ষণীয় করে দেয়া হয়েছে। অন্যত্র এসেছে, “আর নূহকে আমরা বহন করালাম কাঠ ও কীলক নির্মিত এক নৌযানে, যা চলত আমাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে; এটা পুরস্কার তাঁর জন্য, যিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। আর আমরা এটাকে রেখে দিয়েছি এক নিদর্শনরূপে; অতএব উপদেশ গ্ৰহণকারী কেউ আছে কি?” [সূরা আল-কামারঃ ১৩–১৫] এর মাধ্যমে একথাই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নৌকাটিই ছিল শিক্ষণীয় নির্দশন। শত শত বছর ধরে সেটি পর্বতশৃংগে অবস্থান করছিল। এর মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে যেতে থেকেছে যে, এ ভূখণ্ডে এক সময় এমন ভয়াবহ প্লাবন এসেছিল যার ফলে এ নৌকাটি পাহাড়ের মাথায় উঠে যায়। [ফাতহুল কাদীর] অথবা আয়াতে ঈমানদারদেরকে নাজাত দেয়াকেই নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। [মুয়াস্‌সার]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৫) অতঃপর আমি তাকে এবং পানি-জাহাজের আরোহীদেরকে রক্ষা করলাম এবং বিশ্ব-জগতের জন্য একে করলাম একটি নিদর্শন।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ১৬ وَ اِبۡرٰهِیۡمَ اِذۡ قَالَ لِقَوۡمِهِ اعۡبُدُوا اللّٰهَ وَ اتَّقُوۡهُ ؕ ذٰلِكُمۡ خَیۡرٌ لَّكُمۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۱۶﴾

আর (স্মরণ কর) ইবরাহীমকে, যখন সে তার কওমকে বলেছিল, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাঁর তাকওয়া অবলম্বন কর; এটি তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জান’। আল-বায়ান

স্মরণ কর যখন ইবরাহীম তার সম্প্রদায়কে বলেছিল- ‘তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর আর তাঁকে ভয় কর। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, তোমরা যদি জানতে! তাইসিরুল

স্মরণ কর ইবরাহীমের কথা, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাঁকে ভয় কর, তোমাদের জন্য এটাই শ্রেয় যদি তোমরা জানতে। মুজিবুর রহমান

And [We sent] Abraham, when he said to his people, "Worship Allah and fear Him. That is best for you, if you should know. Sahih International

১৬. আর স্মরণ করুন ইবরাহীমকে(১), যখন তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তার তাকওয়া অবলম্বন কর; তোমাদের জন্য এটাই উত্তম। যদি তোমরা জানতে!

(১) এখানে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি অনেক কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। নমরূদের অগ্নি, অতঃপর শাম থেকে হিজরত করে তরুলতাহীন জনশূন্য প্রান্তরে অবস্থান, আদরের দুলালকে যবেহ করার ঘটনা ইত্যাদি। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী প্রসঙ্গে লুত আলাইহিস সালাম ও তার উম্মতের ঘটনাবলী এবং সূরার শেষ পর্যন্ত অন্য কয়েকজন নবী ও তাদের উম্মতের অবস্থা এগুলো সব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উম্মতে মুহাম্মদীর সান্ত্বনার জন্যে এবং তাদেরকে দ্বীনের কাজে দৃঢ়পদ রাখার জন্যে বর্ণিত হয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৬) স্মরণ কর ইব্রাহীমের কথা, যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর এবং তাঁকে ভয় কর; তোমাদের জন্য এটিই শ্রেয় যদি তোমরা জানতে।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ১৭ اِنَّمَا تَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ اَوۡثَانًا وَّ تَخۡلُقُوۡنَ اِفۡكًا ؕ اِنَّ الَّذِیۡنَ تَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ لَا یَمۡلِكُوۡنَ لَكُمۡ رِزۡقًا فَابۡتَغُوۡا عِنۡدَ اللّٰهِ الرِّزۡقَ وَ اعۡبُدُوۡهُ وَ اشۡكُرُوۡا لَهٗ ؕ اِلَیۡهِ تُرۡجَعُوۡنَ ﴿۱۷﴾

‘তোমরা তো আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তিগুলোর পূজা করছ এবং মিথ্যা বানাচ্ছ। নিশ্চয় তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা কর তারা তোমাদের জন্য রিয্ক-এর মালিক নয়। তাই আল্লাহর কাছে রিয্ক তালাশ কর, তাঁর ইবাদাত কর এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। আল-বায়ান

তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে প্রতিমার পূজা করছ আর তোমরা মিথ্যে উদ্ভাবন করছ। আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যে সবগুলোর পূজা করছ তারা তোমাদেরকে রিযক দানের কোন ক্ষমতা রাখে না, কাজেই তোমরা আল্লাহর নিকট রিযক তালাশ কর, আর তাঁরই ‘ইবাদাত কর, আর তাঁরই প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তোমাদেরকে তাঁরই দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। তাইসিরুল

তোমরাতো আল্লাহ ব্যতীত শুধু মূর্তি পূজা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ। তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের পূজা কর তারা তোমাদের জীবনোপকরনের মালিক নয়। সুতরাং তোমরা জীবনোপকরণ কামনা কর আল্লাহর নিকট এবং তাঁরই ইবাদাত কর ও তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। মুজিবুর রহমান

You only worship, besides Allah, idols, and you produce a falsehood. Indeed, those you worship besides Allah do not possess for you [the power of] provision. So seek from Allah provision and worship Him and be grateful to Him. To Him you will be returned." Sahih International

১৭. তোমরা তো আল্লাহ ছাড়া শুধু মূর্তিপূজা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ।(১) তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত কর তারা তো তোমাদের রিযিকের মালিক নয়। কাজেই তোমরা আল্লাহর কাছেই রিযিক চাও এবং তারই ইবাদাত কর। আর তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তোমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।(২)

(১) অর্থাৎ তোমরা এসব মূর্তি তৈরী করছে না বরং মিথ্যা তৈরী করছো। এ মূর্তিগুলোর অস্তিত্ব নিজেই একটি মূর্তিমান মিথ্যা। তার ওপর তোমাদের এ আকীদা-বিশ্বাস যে, এরা দেব-দেবী, আল্লাহর অবতার, তাঁর সন্তান, আল্লাহর সান্নিধ্যে অবস্থানকারী ও তাঁর কাছে শাফা’আতকারী অথবা এদের মধ্য থেকে কেউ রোগ নিরাময়কারী আবার কেউ সন্তান-দাতা এবং কেউ রিযিকদাতা এসবই মিথ্যা কথা। তোমরা নিজেদের ধারণা ও কল্পনার মাধ্যমে এসব রচনা করেছো। আসল সত্য এছাড়া আর কিছুই নয় যে, এগুলো নিছক হাতে গড়া নিষ্প্রাণ মূর্তি এবং এদের কোন ক্ষমতা ও প্রভাব নেই। এগুলো কখনো ইলাহ হতে পারে না। [দেখুন: সা'দী: মুয়াস্‌সার]

(২) এ কয়েকটি বাক্যের মধ্যে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সমস্ত যুক্তি একত্র করেছেন। মনে হয় যেন তিনি বলছেন, যে নিজে অসম্পূর্ণ, অন্যের দ্বারস্থ হতে হয় তার অস্তিত্বের জন্য, যে মূর্তিগুলো তোমাদের কোন প্রকারের কোন রিযিক দান করতে পারে না, তারা সামান্য- সামান্যতমও কোন প্রকার ইবাদাতের মালিক হতে পারে না। তোমাদেরকে তো আল্লাহর দিকে ফিরে যেতেই হবে। সুতরাং তোমরা তারই ইবাদাত কর। [সা'দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৭) তোমরা তো আল্লাহ ব্যতীত কেবল প্রতিমার উপাসনা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ;[1] তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের উপাসনা কর, তারা তোমাদের রুযী দানে অক্ষম। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিকটেই রুযী কামনা কর এবং তাঁর উপাসনা ও কৃতজ্ঞতা কর।[2] তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।[3]

[1] أَوثَان শব্দটি وَثَن এর বহুবচন। যেমন, أَصنَام শব্দটি صَنَم এর বহুবচন। দুয়েরই অর্থ হল প্রতিমা। কেউ কেউ বলেন, স্বর্ণ-রৌপ্য, পিতল ও পাথরের তৈরী মূর্তিকে صَنَم বলা হয়। আর وَثَن মূর্তি এবং চুন-পাথর নির্মিত আস্তানাকেও বলা হয়। تَخلُقُون إِفكًا এর অর্থ تَكذِبُونَ كَذِبًا (মিথ্যা উদ্ভাবন করা)। এর অন্য একটি অর্থ হল, تَعمَلُونها وتَنحِتُونَها لِلإفْك (মিথ্যা উদ্দেশ্য লাভের আশায় তা গড় ও নির্মাণ কর।) ভাবার্থের দিক দিয়ে উভয়ই অর্থ সঠিক। অর্থাৎ, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ইবাদত করছ, তারা তো পাথর-নির্মিত মূর্তি মাত্র; না তারা শুনতে পায়, আর না দেখতে, তারা না উপকার করতে পারে, না অপকার। তোমরা নিজেরাই তাদেরকে বানিয়েছ। তাদের সত্য হওয়ার প্রমাণ তো কোন কিছুই তোমাদের নিকট নেই। অথবা এ সকল মূর্তি, যা তোমরা নিজ হাতে তৈরী কর, যখন তা বিশেষ একটি গঠন ও রূপ লাভ করে, তখন তোমরা মনে কর যে, ওর মধ্যে ইলাহী ক্ষমতা এসে গেছে। ফলে তোমরা ওর নিকটে নানা আশা ও কামনা করে থাক। তাদেরকে বিপত্তারণ ও সংকট মোচনকারী হিসাবে মান্য করতে শুরু কর!

[2] যখন এই সকল মূর্তি তোমাদের জীবিকার বা উপার্জনের কোন প্রকার ক্ষমতা রাখে না; তারা না বৃষ্টি বর্ষণ করতে পারে, আর না পৃথিবীতে কোন প্রকার গাছ-পালা উৎপন্ন করতে পারে, না সূর্যের আলো পৌঁছানোর ক্ষমতা রাখে, আর না তোমাদের এমন শক্তি প্রদানে সক্ষম যার দ্বারা প্রকৃতির ঐ সমস্ত জিনিস হতে উপকৃত হতে পার। সুতরাং তোমরা তোমাদের জীবিকা আল্লাহর নিকটেই কামনা কর এবং তাঁরই ইবাদত কর ও তাঁরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।

[3] অর্থাৎ, মৃত্যুবরণ করার পর পুনর্জীবন লাভ করে যখন তাঁর নিকট ফিরে যেতে হবে, তখন তাকে ছেড়ে অন্যের নিকট নিজের মাথা কেন নত কর? তাঁকে ছেড়ে অন্যের ইবাদত কেন কর? এবং অন্যকে কেন দুঃখ-কষ্ট নিবারণকারী ও প্রয়োজন পূর্ণকারী মনে কর?

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ১৮ وَ اِنۡ تُكَذِّبُوۡا فَقَدۡ كَذَّبَ اُمَمٌ مِّنۡ قَبۡلِكُمۡ ؕ وَ مَا عَلَی الرَّسُوۡلِ اِلَّا الۡبَلٰغُ الۡمُبِیۡنُ ﴿۱۸﴾

আর তোমরা যদি মিথ্যারোপ কর, তবে তোমাদের পূর্বে অনেক জাতি মিথ্যারোপ করেছিল। আর রাসূলের উপর দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টভাবে পৌঁছানো। আল-বায়ান

তোমরা যদি (রাসূলকে) মিথ্যে বলে অস্বীকার কর তবে তোমাদের পূর্বের বংশাবলীও অস্বীকার করেছিল, সুস্পষ্টভাবে প্রচার করা ব্যতীত রসূলের উপর কোন দায়িত্ব নেই। তাইসিরুল

তোমরা যদি আমাকে মিথ্যাবাদী বল তাহলে জেনে রেখ যে, তোমাদের পূর্ববর্তীরাও নাবীদেরকে মিথ্যাবাদী বলেছিল। সুস্পষ্টভাবে প্রচার করা ছাড়া রাসূলের আর কোন দায়িত্ব নেই। মুজিবুর রহমান

And if you [people] deny [the message] - already nations before you have denied. And there is not upon the Messenger except [the duty of] clear notification. Sahih International

১৮. আর যদি তোমরা মিথ্যারোপ কর তবে তো তোমাদের পূর্ববর্তীরাও মিথ্যারোপ করেছিল। সুস্পষ্টভাবে প্রচার করা ছাড়া রাসূলের আর কোন দায়িত্ব নেই।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৮) তোমরা যদি আমাকে মিথ্যাবাদী বল, তাহলে (জেনে রাখ,) তোমাদের পূর্ববর্তিগণও নবীদেরকে মিথ্যাবাদী বলেছিল।[1] আর (সত্যকে) স্পষ্টভাবে প্রচার করে দেওয়াই রসূলের দায়িত্ব।’[2]

[1] এটি ইবরাহীম (আঃ)-এর উক্তিও হতে পারে যা তিনি নিজ জাতির উদ্দেশ্যে করেছিলেন। অথবা আল্লাহরও কথা হতে পারে যাতে মক্কাবাসীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আর এতে নবী (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে যে, যদি মক্কার কাফেররা তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করে, তাহলে এতে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছুই নেই। নবীদের সাথে এই আচরণই করা হয়ে থাকে। পূর্বের জাতিরাও তাদের নবীদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করেছে। আর তার কুফলস্বরূপ তাদেরকে পৃথিবী হতে নিশ্চিহ্ন হতে হয়েছে।

[2] অতএব তুমিও প্রচারের কাজ চালিয়ে যাও; কেউ হিদায়াতপ্রাপ্ত হোক বা না-ই হোক। এ দায়িত্ব তোমার নয় এবং এ সম্পর্কে তুমি জিজ্ঞাসিতও হবে না। কারণ, হিদায়াত দান করা একমাত্র আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। যিনি নিজ হিকমত ও নিয়মানুসারে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দানে ধন্য করেন। আর অন্যদেরকে ভ্রষ্ট ও অন্ধকার পথের পথিক বানিয়ে উদভ্রান্ত ছেড়ে দেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ১৯ اَوَ لَمۡ یَرَوۡا كَیۡفَ یُبۡدِئُ اللّٰهُ الۡخَلۡقَ ثُمَّ یُعِیۡدُهٗ ؕ اِنَّ ذٰلِكَ عَلَی اللّٰهِ یَسِیۡرٌ ﴿۱۹﴾

তারা কি দেখে না, আল্লাহ কিভাবে সৃষ্টির সূচনা করেন? তারপর তিনি তার পুনরাবৃত্তি করবেন। নিশ্চয় এটি আল্লাহর জন্য সহজ। আল-বায়ান

তারা কি লক্ষ্য করে না যে, আল্লাহ কীভাবে সৃষ্টির সূচনা করেন অতঃপর তার পুনরাবর্তন ঘটান, নিশ্চয় এটা আল্লাহর জন্য সহজ। তাইসিরুল

তারা কি লক্ষ্য করেনা যে, কিভাবে আল্লাহ সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান করেন? অতঃপর পুনরায় সৃষ্টি করবেন। এটাতো আল্লাহর জন্য সহজ। মুজিবুর রহমান

Have they not considered how Allah begins creation and then repeats it? Indeed that, for Allah, is easy. Sahih International

১৯. তারা কি লক্ষ্য করে না(১), কিভাবে আল্লাহ্‌ সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান করেন? তারপর তিনি তা আবার সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয় এটা আল্লাহর জন্য সহজ।

(১) ১৯–২৩ নং পর্যন্ত আয়াতগুলো কি ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বাকী কথা নাকি আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বতন্ত্ৰ প্ৰসংগ, এ নিয়ে দুটি মত রয়েছে। ইবন কাসীর বলেন, এটি ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কথার বাকী অংশ। তবে ইবন জারীর তাবারী বলেন, এটি মূল আলোচনার মাঝখানে স্বতন্ত্র প্রাসংগিক বিষয় হিসেবে আনা হয়েছে। সে হিসেবে ইবরাহীমের কাহিনীর ধারা বর্ণনা ছিন্ন করে আল্লাহ মক্কার কাফেরদেরকে সম্বোধন করে একথাগুলো বলেছেন। অর্থাৎ হে কুরাইশরা তোমরা তাদের মতই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যারোপ করেছ। যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীরা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের উপর মিথ্যারোপ করেছে। [তাবারী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯) ওরা কি লক্ষ্য করে না যে, কিভাবে আল্লাহ সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান করেন, অতঃপর তা পুনরায় সৃষ্টি করবেন? [1] নিশ্চয়ই এ আল্লাহর জন্য অতি সহজ। [2]

[1] তাওহীদ (একতত্ত্ববাদে) ও রিসালাতের পর এখানে পরকালের প্রমাণ দেওয়া হচ্ছে, যা কাফেররা অস্বীকার করত। তিনি বলেছেন, প্রথম যখন তোমাদের কোন অস্তিতত্ত্বই ছিল না, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করলেন। তারপর তোমরা দেখা, শোনা ও বুঝার ক্ষমতা লাভ করলে। পরে যখন আবার তোমরা মৃত্যুর পর মাটিতে মিশে যাবে এবং বাহ্যিক দৃষ্টিতে তোমাদের কোনই নাম-নিশান থাকবে না, তখন মহান আল্লাহ তোমাদেরকে পুনর্বার সৃষ্টি করবেন।

[2] অর্থাৎ, তোমাদের কাছে এ কাজ যতই অসম্ভব মনে হোক না কেন, আল্লাহর কাছে তা নিতান্ত সহজ কাজ।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৯ : ২০ قُلۡ سِیۡرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ فَانۡظُرُوۡا كَیۡفَ بَدَاَ الۡخَلۡقَ ثُمَّ اللّٰهُ یُنۡشِیٴُ النَّشۡاَۃَ الۡاٰخِرَۃَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلٰی كُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿ۚ۲۰﴾

বল, ‘তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ’ কীভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছিলেন, তারপর আল্লাহই আরেকবার সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

বল- ‘তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর, অতঃপর লক্ষ্য কর কীভাবে আল্লাহ সৃষ্টির সূচনা করেছেন, অতঃপর আল্লাহ সৃষ্টি করবেন পরবর্তী সৃষ্টি, আল্লাহ সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান। তাইসিরুল

বলঃ পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং অনুধাবন কর কিভাবে তিনি সৃষ্টি শুরু করেছেন? অতঃপর আল্লাহ পুনর্বার সৃষ্টি করবেন পরবর্তী সৃষ্টি। আল্লাহতো সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। মুজিবুর রহমান

Say, [O Muhammad], "Travel through the land and observe how He began creation. Then Allah will produce the final creation. Indeed Allah, over all things, is competent." Sahih International

২০. বলুন, তোমরা যমীনে ভ্রমণ করে অতঃপর প্রত্যক্ষ কর, কিভাবে তিনি সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন? তারপর আল্লাহ সৃষ্টি করবেন পরবর্তী সৃষ্টি। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(২০) বল, ‘পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ,[1] কিভাবে তিনি সৃষ্টি আরম্ভ করেন, অতঃপর তিনি পুনর্বার সৃষ্টি করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।’

[1] বিশ্ব-জাহানে ছড়িয়ে থাকা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি লক্ষ্য কর। পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখ, তাকে কিভাবে বিছিয়ে দিয়েছেন, তাতে পাহাড়-পর্বত নদ-নদী ও সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে বিভিন্ন প্রকার ফল-ফসল উৎপন্ন করেছেন। এ সব কি এ কথার প্রমাণ বহন করে না যে, এ সব সৃষ্টি করা হয়েছে ও এ সবের সৃষ্টিকর্তা কেউ অবশ্যই আছেন?

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
তাজউইদ কালার কোড
হামযা ওয়াসল মাদ্দে তাবিঈ ইখফা মাদ্দে ওয়াজিব গুন্নাহ মাদ্দে জায়েয নীরব ইদগাম (গুন্নাহ সহ) ক্বলক্বলাহ লাম শামসিয়্যাহ ইদগাম (গুন্নাহ ছাড়া) ইদগাম শাফাউই ইক্বলাব ইখফা শাফাউই মাদ্দে লাযিম ইদগাম মুতাক্বারিবাইন ইদগাম মুতাজানিসাইন