সূরাঃ ১৯/ মারইয়াম | Maryam | مَرْيَم আয়াতঃ ৯৮ মাক্কী
তাফসীরে জাকারিয়া

সূরা সম্পর্কে আলোচনাঃ

আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ বনী ইসরাইল, আল-কাহফ, মারইয়াম, ত্বা-হা এবং আম্বিয়া এগুলো আমার সবচেয়ে প্রাচীন সম্পদ বা সর্বপ্রথম পুঁজি। [বুখারীঃ ৪৭৩৯] তাই এ সূরাসমূহের গুরুত্বই আলাদা। তন্মধ্যে সূরা মারইয়ামের গুরুত্ব আরো বেশী এদিক দিয়েও যে, এ সূরায় ঈসা আলাইহিস সালাম ও তার মা সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যা অনুধাবন করলে নাসারাদের ঈমান আনা সহজ হবে। উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেনঃ হাবশার রাজা নাজাসী জাফর ইবন আবি তালিবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমার কাছে তিনি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর কাছ থেকে যা নিয়ে এসেছেন তার কিছু কি আছে? উম্মে সালামাহ বলেন, তখন জাফর ইবন আবি তালিব বললেনঃ হ্যাঁ। নাজাসী বললেনঃ আমাকে তা পড়ে শোনাও। জাফর ইবন আবি তালিব তখন কাফ-হা-ইয়া-আইন-সাদ থেকে শুরু করে সূরার প্রথম অংশ শোনালেন। উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেনঃ আল্লাহর শপথ করে বলছি, এটা শোনার পর নাজাসী এমনভাবে কাঁদতে থাকল যে, তার চোখের পানিতে দাড়ি পর্যন্ত ভিজে গেল। তার দরবারের আলেমরাও কেঁদে ফেলল। তারা তাদের ধর্মীয় কিতাবসমূহ বন্ধ করে নিল। তারপর নাজাসী বললঃ “অবশ্যই এটা এবং যা মূসা নিয়ে এসেছে সবই একই তাক থেকে বের হয়েছে।’ [মুসনাদে আহমাদ: ৫/৩৬৬–৩৬৮]

আহসানুল বায়ান

সূরা মারয়্যাম [1]

(মক্কায় অবতীর্ণ)
[1] হাবশার হিজরতের ঘটনায় বলা হয়েছে যে, হাবশার বাদশাহ নাজাশী ও তাঁর পারিষদবর্গের সামনে যখন জা’ফর বিন আবু তালিব (রাঃ) সূরা মারয়্যামের প্রাথমিক কিছু আয়াত পাঠ করে শুনালেন, তখন তাঁদের চক্ষুর অশ্রুতে দাড়ি পর্যন্ত ভিজে গিয়েছিল এবং নাজাশী বলেছিলেন, এই কুরআন ও ঈসা (আঃ) যা আনয়ন করেছিলেন, তা একই মশালের আলো। (ফাতহুল কাদীর)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
১৯ : ১ كٓهٰیٰعٓصٓ ۟﴿ۚ۱﴾
كٓهیعٓصٓ ﴿۱﴾

কাফ-হা-ইয়া-‘আঈন-সোয়াদ। আল-বায়ান

কাফ্-হা-ইয়্যা-‘আইন-সাদ। তাইসিরুল

কাফ্ হা ইয়া ‘আঈন সাদ। মুজিবুর রহমান

Kaf, Ha, Ya, 'Ayn, Sad. Sahih International

১. কাফ-হা-ইয়া-আঈন-সোয়াদ;(১)

(১) এ শব্দগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা সূরা আল-বাকারার শুরুতে করা হয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) কা-ফ হা ইয়া আ’ইন স্বা-দ।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ২ ذِكۡرُ رَحۡمَتِ رَبِّكَ عَبۡدَهٗ زَكَرِیَّا ۖ﴿ۚ۲﴾
ذكر رحمت ربك عبدهٗ زكریا ﴿۲﴾

এটা তোমার রবের রহমতের বিবরণ তাঁর বান্দা যাকারিয়্যার প্রতি। আল-বায়ান

এটা তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দাহ যাকারিয়্যার প্রতি। তাইসিরুল

এটা তোমার রবের অনুগ্রহের বিবরণ, তাঁর দাস যাকারিয়ার প্রতি। মুজিবুর রহমান

[This is] a mention of the mercy of your Lord to His servant Zechariah Sahih International

২. এটা আপনার রব-এর অনুগ্রহের বিবরণ তার বান্দা যাকারিয়্যার(১) প্রতি,

(১) হাদীসে এসেছে, যাকারিয়্যা আলাইহিস সালাম কাঠ-মিস্ত্রির কাজ করতেন। [মুসলিম: ২৩৭৯] এতে বুঝা গেল যে, নবী-রাসূলগণ জীবিকা অর্জনের জন্য বিভিন্ন কারিগরি পেশা অবলম্বন করতেন। তারা কখনো অপরের উপর বোঝা হতেন না।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) এটা তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর দাস যাকারিয়ার[1] প্রতি।

[1] যাকারিয়া (আঃ) বানী ইস্রাঈলের একজন নবী ছিলেন। তিনি ছিলেন ছুতোর এবং এই পেশাই ছিল তাঁর জীবিকার একমাত্র উপায়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৩ اِذۡ نَادٰی رَبَّهٗ نِدَآءً خَفِیًّا ﴿۳﴾
اذ نادی ربهٗ ندآء خفیا ﴿۳﴾

যখন সে তার রবকে গোপনে ডেকেছিল। আল-বায়ান

যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করেছিল- এক গোপন আহবানে। তাইসিরুল

যখন সে তার রাব্বকে আহবান করেছিল নিভৃতে। মুজিবুর রহমান

When he called to his Lord a private supplication. Sahih International

৩. যখন তিনি তার রবকে ডেকেছিলেন নিভৃতে,(১)

(১) এতে জানা গেল যে, দোআ অনুচ্চস্বরে ও গোপনে করাই উত্তম। কাতাদা বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্ৰ মন জানেন এবং গোপন শব্দ শুনেন। [তাবারী] তিনি যে দোআ করেছিলেন তা-ই পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত হচ্ছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩) যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করেছিল গোপনে। [1]

[1] গোপনে আহবান বা দু’আ এই জন্যই করেছিলেন যে, প্রথমতঃ এইভাবে দু’আ আল্লাহর নিকট বেশী পছন্দনীয়। কারণ এর মধ্যে কাকুতি-মিনতি বেশী প্রকাশ পায়। দ্বিতীয়তঃ লোকে যাতে তাকে বোকা না ভাবে যে, এই বৃদ্ধ বয়সে সন্তান চাচ্ছে; যখন সন্তান হওয়ার সকল প্রকার বাহ্যিক সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৪ قَالَ رَبِّ اِنِّیۡ وَهَنَ الۡعَظۡمُ مِنِّیۡ وَ اشۡتَعَلَ الرَّاۡسُ شَیۡبًا وَّ لَمۡ اَكُنۡۢ بِدُعَآئِكَ رَبِّ شَقِیًّا ﴿۴﴾
قال رب انی وهن العظم منی و اشتعل الراس شیبا و لم اكن بدعآئك رب شقیا ﴿۴﴾

সে বলেছিল, ‘হে আমার রব! আমার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গেছে এবং বার্ধক্যবশতঃ আমার মাথার চুলগুলো সাদা হয়ে গেছে। হে আমার রব, আপনার নিকট দো‘আ করে আমি কখনো ব্যর্থ হইনি’। আল-বায়ান

সে বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গেছে, আর বার্ধক্যে আমার মস্তক সাদা হয়ে গেছে, হে আমার প্রতিপালক! তোমাকে ডেকে আমি কখনো বিফল হইনি। তাইসিরুল

সে বলেছিলঃ হে আমার রাব্ব! আমার অস্থি দুর্বল হয়েছে, বার্ধক্যে আমার মস্তক শুভ্রোজ্জ্বল হয়েছে; হে আমার রাব্ব! আপনাকে আহবান করে আমি কখনও ব্যর্থকাম হইনি। মুজিবুর রহমান

He said, "My Lord, indeed my bones have weakened, and my head has filled with white, and never have I been in my supplication to You, my Lord, unhappy. Sahih International

৪. তিনি বলেছিলেন, হে আমার রব! আমার অস্থি দুর্বল হয়েছে(১), বার্ধক্যে আমার মাথা শুভ্রোজ্জ্বল হয়েছে(২); হে আমার রব! আপনাকে ডেকে আমি কখনো ব্যৰ্থকাম হইনি।(৩)

(১) অস্থির দুর্বলতা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, অস্থিই দেহের খুঁটি। অস্থির দুর্বলতা সমস্ত দেহের দুর্বলতার নামান্তর। [ফাতহুল কাদীর]

(২) اشتعل এর শাব্দিক অর্থ, প্রজ্জ্বলিত হওয়া, এখানে চুলের শুভ্রতাকে আগুনের আলোর সাথে তুলনা করে তা সমস্ত মস্তকে ছড়িয়ে পড়া বোঝানো হয়েছে। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]

(৩) এখানে দো'আর পূর্বে যাকারিয়্যা আলাইহিস সালাম তার দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন। এর একটি কারণ এই যে, এমতাবস্থায় সন্তান না আসাই স্বাভাবিক। এখানে দ্বিতীয় কারণ এটাও যে, দোআ করার সময় নিজের দুর্বলতা, দুর্দশা ও অভাবগ্রস্থতা উল্লেখ করা দো'আ কবুল হওয়ার পক্ষে সহায়ক। [কুরতুবী] তারপর বলছেন যে, আপনাকে ডেকে আমি কখনও ব্যৰ্থকাম হইনি। আপনি সবসময় আমার দোআ কবুল করেছেন। [কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) সে বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয় আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে, আমার মস্তক শুভ্রোজ্জ্বল হয়েছে;[1] হে আমার প্রতিপালক! তোমাকে আহবান করে আমি কখনো ব্যর্থকাম হইনি।[2]

[1] যেভাবে জ্বালানী আগুনে জলে উঠে সেইভাবে আমার মাথা সাদা চুলে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এর অর্থঃ বার্ধক্য ও দুর্বলতার প্রকাশ।

[2] সেই জন্যই বাহ্যিক সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও আমি তোমার নিকট সন্তান চাচ্ছি।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৫ وَ اِنِّیۡ خِفۡتُ الۡمَوَالِیَ مِنۡ وَّرَآءِیۡ وَ كَانَتِ امۡرَاَتِیۡ عَاقِرًا فَهَبۡ لِیۡ مِنۡ لَّدُنۡكَ وَلِیًّا ۙ﴿۵﴾
و انی خفت الموالی من ورآءی و كانت امراتی عاقرا فهب لی من لدنك ولیا ﴿۵﴾

‘আর আমার পরে স্বগোত্রীয়দের সম্পর্কে আমি আশংকাবোধ করছি। আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা, অতএব আপনি আমাকে আপনার পক্ষ থেকে একজন উত্তরাধিকারী দান করুন’। আল-বায়ান

আমার পরে আমার স্বগোত্রীয়রা (কী করবে) সে সম্পর্কে আমি আশঙ্কাবোধ করছি, আর আমার স্ত্রী হল বন্ধ্যা, কাজেই তুমি তোমার তরফ থেকে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান কর তাইসিরুল

আমি আশংকা করি আমার পর আমার স্বগোত্ররা দীনকে ধ্বংস করে দিবে; আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। সুতরাং আপনি আপনার তরফ হতে আমাকে দান করুন উত্তরাধিকারী – মুজিবুর রহমান

And indeed, I fear the successors after me, and my wife has been barren, so give me from Yourself an heir Sahih International

৫. আর আমি আশংকা করি আমার পর আমার স্বগোত্রীয়দের সম্পর্কে; আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। কাজেই আপনি আপনার কাছ থেকে আমাকে দান করুন উত্তরাধিকারী,

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫) নিশ্চয় আমি আমার পর আমার স্বগোত্রীয়দের ব্যাপারে আশংকা করি।[1] আর আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা, সুতরাং তুমি তোমার নিকট হতে[2] আমাকে দান কর একজন উত্তরাধিকারী।

[1] এই আশংকার অর্থ এই যে, যদি আমার কোন উত্তরাধিকারী আমার ওয়ায ও উপদেশের দায়িত্ব গ্রহণ না করে, তাহলে আমার স্বগোত্রীয় আত্মীয়দের মধ্যে তো কেউ এর যোগ্য নেই। আর এর ফলস্বরূপ হয়তো আমার আত্মীয়রা তোমার রাস্তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেবে।

[2] ‘তোমার নিকট হতে’ এর অর্থ যদিও আমার বাহ্যিক সন্তান-সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে, তবুও তুমি তোমার বিশেষ অনুগ্রহে আমাকে একটি সন্তান দান কর। (যে আমার ওয়ারেস ও উত্তরাধিকারী হবে।)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৬ یَّرِثُنِیۡ وَ یَرِثُ مِنۡ اٰلِ یَعۡقُوۡبَ ٭ۖ وَ اجۡعَلۡهُ رَبِّ رَضِیًّا ﴿۶﴾
یرثنی و یرث من ال یعقوب ٭ و اجعله رب رضیا ﴿۶﴾

‘যে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং ইয়াকূবের বংশের উত্তরাধিকারী হবে। হে আমার রব, আপনি তাকে পছন্দনীয় বানিয়ে দিন’। আল-বায়ান

যে আমার উত্তরাধিকারী হবে আর উত্তরাধিকারী হবে ইয়া‘কুব পরিবারের; আর হে আমার প্রতিপালক! তাকে করুন আপনার সন্তুষ্টির পাত্র। তাইসিরুল

যে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং উত্তরাধিকারীত্ব পাবে ইয়াকূবের বংশের এবং হে আমার রাব্ব! তাকে করুন সন্তোষভাজন। মুজিবুর রহমান

Who will inherit me and inherit from the family of Jacob. And make him, my Lord, pleasing [to You]." Sahih International

৬. যে আমার উত্তরাধিকারিত্ব করবে(১) এবং উত্তরাধিকারিত্ব করবে ইয়াকুবের বংশের(২) এবং হে আমার রব! তাকে করবেন সন্তোষভাজন।

(১) আলেমদের মতে, এখানে উত্তরাধিকারিত্বের অর্থ নবুওয়াত-রিসালত তথা ইলমের উত্তরাধিকার। আর্থিক উত্তরাধিকারিত্ব নয়। কেননা, প্রথমতঃ যাকারিয়্যার কাছে এমন কোন অর্থ সম্পদ ছিল বলেই প্রমাণ নেই, যে কারণে চিন্তিত হবেন যে, এর উত্তরাধিকারী কে হবে। একজন পয়গম্বরের পক্ষে এরূপ চিন্তা করাও অবান্তর। এছাড়া যাকারিয়্যা আলাইহিস সালাম নিজে কাঠ-মিস্ত্রি ছিলেন। নিজ হাতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কাঠ-মিস্ত্রির কাজের মাধ্যমে এমন সম্পদ আহরণ করা সম্ভব হয় না যার জন্য চিন্তা করতে হয়। দ্বিতীয়ত: সাহবায়ে কেরামের ইজমা তথা ঐকমত্য সম্বলিত এক হাদীসে বলা হয়েছেঃ “নিশ্চিতই আলেমগণ পয়গম্বরগণের ওয়ারিশ। পয়গম্বরগণ কোন দীনার ও দিরহাম রেখে যান না; বরং তারা ইলম ও জ্ঞান ছেড়ে যান। যে ব্যক্তি ইলম হাসিল করে, সে বিরাট সম্পদ হাসিল করে।”- [আবু দাউদ: ৩৬৪১, ইবনে মাজহ: ২২৩, তিরমিযী: ২৬৮২]

তৃতীয়ত: স্বয়ং আলোচ্য আয়াতে এর (يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ) বাক্যের যোগ এরই প্রমাণ যে, এখানে আর্থিক উত্তরাধিকারিত্ব বোঝানো হয়নি। কেননা, যে পুত্রের জন্মলাভের জন্যে দোআ করা হচ্ছে, তার পক্ষে ইয়াকুব আলাইহিস সালামের উত্তরাধিকার হওয়াই যুক্তিযুক্ত কিন্তু তাদের নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজনরা যাদের উল্লেখ আয়াতে করা হয়েছে, তারা নিঃসন্দেহে আত্মীয়তায় ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম থেকে অধিক নিকটবর্তী। নিকটবর্তী আত্মীয় রেখে দূরবর্তীর উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করা উত্তরাধিকার আইনের পরিপন্থী। [ইবন কাসীর]

(২) অর্থাৎ আমি কেবলমাত্র নিজের উত্তরাধিকারী চাই না বরং ইয়াকুব বংশের যাবতীয় কল্যাণের উত্তরাধিকারী চাই। সে নবী হবে যেমন তার পিতৃপুরুষরা যেভাবে নবী হয়েছে। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) যে উত্তরাধিকারী হবে আমার এবং উত্তরাধিকারী হবে ইয়াকূবের বংশের। আর হে আমার প্রতিপালক! তাকে তুমি সন্তোষভাজন কর।’

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৭ یٰزَكَرِیَّاۤ اِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلٰمِۣ اسۡمُهٗ یَحۡیٰی ۙ لَمۡ نَجۡعَلۡ لَّهٗ مِنۡ قَبۡلُ سَمِیًّا ﴿۷﴾
یزكریا انا نبشرك بغلم اسمهٗ یحیی لم نجعل لهٗ من قبل سمیا ﴿۷﴾

(আল্লাহ বললেন) ‘হে যাকারিয়্যা, আমি তোমাকে একটি পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম ইয়াহইয়া। ইতিপূর্বে কাউকে আমি এ নাম দেইনি’। আল-বায়ান

তিনি বললেন, ‘হে যাকারিয়া! আমি তোমাকে একটি পুত্রের শুভ সংবাদ দিচ্ছি যার নাম হবে ইয়াহইয়া, পূর্বে এ নামে আমি কাউকে আখ্যায়িত করিনি।’ তাইসিরুল

তিনি বললেনঃ হে যাকারিয়া! আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি - তার নাম হবে ইয়াহইয়া। এই নামে আমি পূর্বে কারও নামকরণ করিনি। মুজিবুর রহমান

[He was told], "O Zechariah, indeed We give you good tidings of a boy whose name will be John. We have not assigned to any before [this] name." Sahih International

৭. তিনি বললেন, হে যাকারিয়্যা! আমরা আপনাকে এক পুত্ৰ সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম হবে ইয়াহইয়া; এ নামে আগে আমরা কারো নামকরণ(১) করিনি।

(১) سَمِيًّا শব্দের অর্থ সমনামও হয় এবং সমতুল্যও হয়। এখানে প্রথম অর্থ নেয়া হলে আয়াতের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট যে, তার পূর্বে ইয়াহইয়া নামে কারও নামকরণ করা হয়নি। [তাবারী] নামের এই অনন্যতা ও অভূতপূর্বতাও কতক বিশেষ গুণে তাঁর অনন্যতার ইঙ্গিতবহ ছিল। কাতাদা রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ ইয়াহইয়া অর্থ জীবিতকরণ, তিনি এমন এক বান্দা যাকে আল্লাহ ঈমানের মাধ্যমে জীবন্ত রেখেছিলেন। [তাবারী]

পক্ষান্তরে যদি দ্বিতীয় অর্থ নেয়া হয় তখন উদ্দেশ্য হবে, তার মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যা তার পূর্ববর্তী নবীগণের কারও মধ্যে ছিল না। সেসব বিশেষ গুণে তিনি তুলনাহীন ছিলেন। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] এতে জরুরী নয় যে, ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম পূর্ববর্তী নবীদের চাইতে সর্বাবস্থায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কেননা, তাদের মধ্যে ইবরাহীম খলীলুল্লাহ ও মূসা কলীমুল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃত ও সুবিদিত।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭) তিনি বললেন, ‘হে যাকারিয়া! অবশ্যই আমি তোমাকে একজন পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি; তার নাম হবে য়্যাহয়্যা; এই নামে আমি পূর্বে কারো নামকরণ করিনি।’ [1]

[1] আল্লাহ তাআলা শুধু তাঁর দু’আই কবুল করলেন না; বরং সন্তানের নামও ঠিক করে দিলেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৮ قَالَ رَبِّ اَنّٰی یَكُوۡنُ لِیۡ غُلٰمٌ وَّ كَانَتِ امۡرَاَتِیۡ عَاقِرًا وَّ قَدۡ بَلَغۡتُ مِنَ الۡكِبَرِ عِتِیًّا ﴿۸﴾
قال رب انی یكون لی غلم و كانت امراتی عاقرا و قد بلغت من الكبر عتیا ﴿۸﴾

সে বলল, ‘হে আমার রব, কিভাবে আমার পুত্র সন্তান হবে, আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা, আর আমিও তো বার্ধক্যের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছি’। আল-বায়ান

সে বলল, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমার পুত্র হবে কেমন করে, আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা, আর আমি বার্ধক্যের শেষ স্তরে পৌঁছে গেছি।’ তাইসিরুল

সে বললঃ হে আমার রাব্ব! কেমন করে আমার পুত্র হবে যখন আমার স্ত্রী বন্ধ্যা এবং আমি বার্ধক্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি! মুজিবুর রহমান

He said, "My Lord, how will I have a boy when my wife has been barren and I have reached extreme old age?" Sahih International

৮. তিনি বললেন, হে আমার রব! কেমন করে আমার পুত্র হবে যখন আমার স্ত্রী বন্ধ্যা ও আমি বার্ধক্যের শেষ সীমায় উপনীত!

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮) সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! কেমন করে আমার পুত্র হবে যখন আমার স্ত্রী বন্ধ্যা ও আমি বার্ধক্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি।’ [1]

[1] عاقِر ঐ মহিলাকে বলা হয় যে বার্ধক্যের কারণে সন্তান জন্মাতে সক্ষম নয়, আর ঐ মহিলাকেও বলা যায়, যে প্রথম হতেই বন্ধ্যা। এখানে দ্বিতীয় অর্থে ব্যবহার হয়েছে। যে কাঠ শুকিয়ে যায় তাকে عِتي বলা হয়। এখানে অর্থ বার্ধক্যের শেষ পর্যায়, যখন শরীরের গোশত শুকিয়ে যায়। বলার উদ্দেশ্য হল, আমার স্ত্রী তো যৌবন কাল হতেই বন্ধ্যা, আর আমিও বৃদ্ধ ব্যক্তি। এখন আমাদের সন্তান হবে কিভাবে? কথিত আছে যাকারিয়া (আঃ)-এর স্ত্রীর নাম ছিল আশা’ বিনতে ফাক্বূদ বিন মীল। ইনি ছিলেন মারয়্যামের মা হান্নার বোন। কিন্তু সঠিক কথা হল আশা’ও মারয়্যামের পিতা ইমরানেরই কন্যা ছিলেন। অতএব (মারয়্যাম ও আশা’ দুই বোন এবং) য়্যাহয়্যা (আঃ) ও ঈসা (আঃ) আপোসে খালাতো ভাই। যেমন সহীহ হাদীসেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। (ফাতহুল কাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ৯ قَالَ كَذٰلِكَ ۚ قَالَ رَبُّكَ هُوَ عَلَیَّ هَیِّنٌ وَّ قَدۡ خَلَقۡتُكَ مِنۡ قَبۡلُ وَ لَمۡ تَكُ شَیۡئًا ﴿۹﴾
قال كذلك قال ربك هو علی هین و قد خلقتك من قبل و لم تك شیئا ﴿۹﴾

সে (ফেরেশতা) বলল, ‘এভাবেই’। তোমার রব বলেছেন, ‘এটা আমার জন্য সহজ। আমি তো ইতঃপূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি, তখন তুমি কিছুই ছিলে না’। আল-বায়ান

তিনি বললেন, ‘এভাবেই হবে, তোমার প্রতিপালক বলেছেন, ‘এটা আমার পক্ষে সহজ। ইতোপূর্বে আমিই তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না।’ তাইসিরুল

তিনি বললেনঃ এরূপই হবে। তোমার রাব্ব বললেনঃ এটা আমার জন্য সহজসাধ্য; আমিতো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলেনা। মুজিবুর রহমান

[An angel] said, "Thus [it will be]; your Lord says, 'It is easy for Me, for I created you before, while you were nothing.' " Sahih International

৯. তিনি বললেন, এরূপই হবে। আপনার রব বললেন, এটা আমার জন্য সহজ; আমি তো আগে আপনাকে সৃষ্টি করেছি। যখন আপনি কিছুই ছিলেন না।(১)

(১) অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্ব প্ৰদান করা এটা তো মহান আল্লাহরই কাজ। তিনি ব্যতীত কেউ কি সেটা করতে পারে? তিনি যখন চাইলেন তখন বন্ধ্যা যুগলের ঘরে এমন অনন্য নাম ও গুণসম্পন্ন সন্তান প্রদান করলেন। এভাবে আল্লাহ্ তা'আলা সবকিছুকেই অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসেন। এর জন্য শুধু তাঁর ইচ্ছাই যথেষ্ট। মহান আল্লাহ বলেনঃ “মানুষ কি স্মরণ করে না যে, আমরা তাকে আগে সৃষ্টি করেছি। যখন সে কিছুই ছিল না?” [সূরা মারইয়াম: ৬৭] আরও বলেনঃ “কালপ্রবাহে মানুষের উপর তো এমন এক সময় এসেছিল যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না।” [সূরা আল-ইনসান: ১] [দেখুন, ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯) তিনি বললেন, ‘এই রূপই হবে; তোমার প্রতিপালক বললেন, এটা আমার জন্য সহজসাধ্য; আমি তো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না।’ [1]

[1] ফিরিশতাগণ যাকারিয়া (আঃ)-এর বিস্ময় এই বলে দূর করলেন যে, আল্লাহ তোমাকে পুত্র সন্তান দেওয়ার ব্যাপারে ফায়সালা করে ফেলেছেন এবং তা তিনি অবশ্যই তোমাকে দান করবেন। আর আল্লাহর পক্ষে এটা মোটেই অসম্ভব নয়; কারণ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন যখন তুমি কিছুই ছিলে না, তিনি তোমাকে বাহ্যিক কারণ না থাকা সত্ত্বেও সন্তান দিতে সক্ষম।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ১০ قَالَ رَبِّ اجۡعَلۡ لِّیۡۤ اٰیَۃً ؕ قَالَ اٰیَتُكَ اَلَّا تُكَلِّمَ النَّاسَ ثَلٰثَ لَیَالٍ سَوِیًّا ﴿۱۰﴾
قال رب اجعل لی ایۃ قال ایتك الا تكلم الناس ثلث لیال سویا ﴿۱۰﴾

সে বলল, ‘হে আমার রব, আমার জন্য একটি নিদর্শন ঠিক করে দিন’। তিনি বললেন, ‘তোমার জন্য এটাই নিদর্শন যে, তুমি সুস্থ থেকেও তিন রাত কারো সাথে কথা বলবে না’। আল-বায়ান

সে বলল, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমার জন্য একটা চিহ্ন স্থির করে দিন।’ তিনি বললেন, ‘তোমার চিহ্ন এই যে, তুমি তিন রাত মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না যদিও তুমি কথা বলতে সক্ষম।’ তাইসিরুল

যাকারিয়া বললঃ হে আমার রাব্ব! আমাকে একটি নিদর্শন দিন। তিনি বললেনঃ তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি সুস্থাবস্থায় কারও সাথে তিন দিন বাক্যালাপ করবেনা। মুজিবুর রহমান

[Zechariah] said, "My Lord, make for me a sign." He said, "Your sign is that you will not speak to the people for three nights, [being] sound." Sahih International

১০. যাকারিয়্যা বললেন, হে আমার রব! আমাকে একটি নিদর্শন দিন। তিনি বললেন, আপনার নিদর্শন এ যে, আপনি সুস্থ(১) থাকা সত্বেও কারো সাথে তিন দিন কথাবার্তা বলবেন না।

(১) سَوِيًّا শব্দের অর্থ সুস্থ। শব্দটি একথা বোঝানোর জন্য যুক্ত করা হয়েছে যে, যাকারিয়্যা আলাইহিস সালাম এর কোন মানুষের সাথে কথা না বলার এ অবস্থাটি কোন রোগবশতঃ ছিল না। এ কারণেই আল্লাহর যিকর ও ইবাদতে তার জিহবা তিন দিনই পূর্ববৎ খোলা ছিল; বরং এ অবস্থা মু'জেযা ও গর্ভসঞ্চারের নিদর্শন স্বরূপই প্রকাশ পেয়েছিল। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০) যাকারিয়া বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নিদর্শন দাও!’ তিনি বললেন, ‘তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি সুস্থ থাকা সত্ত্বেও কারো সাথে ক্রমাগত তিন রাত্রি (দিন) বাক্যালাপ করবে না।’ [1]

[1] রাত্রি বলতে দিন-রাত্রি উভয়কেই বোঝানো হয়েছে। سَوِيَّا অর্থ বিলকুল নীরোগ, সুস্থ। অর্থাৎ তোমার এমন কোন ব্যাধি হবে না, যার ফলে তুমি কথা বলতে পারবে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তোমার মুখ দিয়ে কথা না বের হলে তুমি জেনে নিও যে, সুসংবাদের সময় নিকটবর্তী।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ১১ فَخَرَجَ عَلٰی قَوۡمِهٖ مِنَ الۡمِحۡرَابِ فَاَوۡحٰۤی اِلَیۡهِمۡ اَنۡ سَبِّحُوۡا بُكۡرَۃً وَّ عَشِیًّا ﴿۱۱﴾
فخرج علی قومهٖ من المحراب فاوحی الیهم ان سبحوا بكرۃ و عشیا ﴿۱۱﴾

অতঃপর সে মিহরাব হতে বেরিয়ে তার লোকদের সামনে আসল এবং ইশারায় তাদেরকে বলল যে, ‘তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় তাসবীহ পাঠ কর’। আল-বায়ান

অতঃপর সে তার কুঠরি থেকে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে গেল এবং ইশারায় তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর প্রশংসা-পবিত্রতা বর্ণনা করতে বলল। তাইসিরুল

অতঃপর সে কক্ষ হতে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের নিকট এলো এবং ইঙ্গিতে তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় (আল্লাহর) পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে বলল। মুজিবুর রহমান

So he came out to his people from the prayer chamber and signaled to them to exalt [Allah] in the morning and afternoon. Sahih International

১১. তারপর তিনি (ইবাদাতের জন্য নির্দিষ্ট) কক্ষ হতে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে আসলেন এবং ইঙ্গিতে তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে বললেন।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১১) অতঃপর সে উপাসনাকক্ষ[1] হতে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের নিকট এল ও ইঙ্গিতে তাদেরকে বলল যে, ‘তোমরা সকাল-সন্ধ্যায় (আল্লাহর) পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।’ [2]

[1] مِحراب (মিহরাব) অর্থ ঐ ঘর যেখানে তিনি আল্লাহর ইবাদত করতেন, এই শব্দ حرب হতে গঠিত; যার অর্থ যুদ্ধ, যেহেতু উপাসনাকক্ষে আল্লাহর ইবাদত করতে শয়তানের সাথে যুদ্ধ করতে হয়, তাই ঐ কক্ষের নাম মিহরাব।

[2] সকাল-সন্ধ্যায় পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা বা তসবীহ করার অর্থঃ আসরের ও ফজরের নামায পড়া। অথবা এর অর্থঃ সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর তসবীহতে বেশী মনোযোগী হও।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ১২ یٰیَحۡیٰی خُذِ الۡكِتٰبَ بِقُوَّۃٍ ؕ وَ اٰتَیۡنٰهُ الۡحُكۡمَ صَبِیًّا ﴿ۙ۱۲﴾
ییحیی خذ الكتب بقوۃ و اتینه الحكم صبیا ﴿۱۲﴾

‘হে ইয়াহইয়া, তুমি কিতাবটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর’। আমি তাকে শৈশবেই প্রজ্ঞা* দান করেছি। আল-বায়ান

(তার পুত্রের কাছে নির্দেশ আসল) ‘হে ইয়াহ্ইয়া! এ কিতাব (তাওরাত) সুদৃঢ়ভাবে ধারণ কর।’ আমি তাকে বাল্য কালেই জ্ঞান দান করেছিলাম। তাইসিরুল

আমি বললামঃ হে ইয়াহ্ইয়া! এই কিতাব দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ কর; আমি তাকে শৈশবেই দান করেছিলাম জ্ঞান – মুজিবুর রহমান

[Allah] said, "O John, take the Scripture with determination." And We gave him judgement [while yet] a boy Sahih International

* এখানে ‘হুকম’ বলতে হিকমাত বা প্রজ্ঞা বুঝানো হয়েছে। কারো মতে, তা হল ইলম ও আমল। কেউ বলেছেন, নবুওয়াত বা আকল। ইমাম শওকানী বলেন, উল্লেখিত প্রতিটি বিষয় ‘হুকম’ দ্বারা উদ্দেশ্য হতে পারে।

১২. হে ইয়াহইয়া(১)! আপনি কিতাবটিকে দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করুন। আর আমরা তাকে শৈশবেই দান করেছিলাম প্ৰজ্ঞা।(২)

(১) মাঝখানে এই বিস্তারিত তথ্য পরিবেশিত হয়নি যে, আল্লাহর ফরমান অনুযায়ী ইয়াহইয়ার জন্ম হয় এবং শৈশব থেকে তিনি যৌবনে পদার্পণ করেন। এখন বলা হচ্ছে, যখন তিনি জ্ঞানলাভের নির্দিষ্ট বয়ঃসীমায় পৌঁছেন তখন তাঁর উপর কি দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এখানে মাত্র একটি বাক্যে নবুওয়াতের মহান মর্যাদায় অভিষিক্ত করার সময় তার উপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয় তার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি তাওরাতকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবেন এবং বনী ইসরাঈলকে এ পথে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবেন। আর যদি কিতাব বলে কোন সুনির্দিষ্ট সহীফা ও চিঠি সংবলিত গ্ৰন্থ বুঝানো হয়ে থাকে। তবে তাও উদ্দেশ্য হতে পারে। [দেখুন, ইবন কাসীর]

(২) এখানে الحكم শব্দ দ্বারা জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বুঝ, দৃঢ়তা, স্থিরতা, কল্যাণমূলক কাজে অগ্ৰগামিতা এবং অসৎকাজ থেকে বিমুখতা বুঝানো হয়েছে। ছোট বেলা থেকেই তিনি এ সমস্ত গুণের অধিকারী ছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবন মুবারক বলেন, মা’মার বলেনঃ ইয়াহইয়া ইবন যাকারিয়্যাকে কিছু ছোট ছেলে-পুলে বলল যে, চল আমরা খেলতে যাই। তিনি জবাবে বললেনঃ খেল-তামাশা করার জন্য তো আমাদের সৃষ্টি করা হয়নি! [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১২) (আল্লাহ বললেন,) ‘হে য়্যাহয়্যা! এই কিতাব[1] দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ কর’; আমি শৈশবেই তাকে দান করেছিলাম প্রজ্ঞা। [2]

[1] আল্লাহ যাকারিয়া (আঃ)-কে পুত্র য়্যাহয়্যা দান করলেন। আর তিনি যখন একটু বড় হলেন, তখন মহান আল্লাহ কিতাবকে শক্ত করে ধারণ করার; অর্থাৎ তার উপর আমল করার আদেশ করলেন। ‘কিতাব’ বলতে তাওরাতকে বুঝানো হয়েছে। অথবা তাঁকে যে বিশেষ কিতাব দান করা হয়েছিল তা, যা আমাদের অজানা।

[2] حُكم (প্রজ্ঞা)এর অর্থঃ জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক, কিতাবে উল্লিখিত দ্বীন সম্পর্কে পান্ডিত্য, ইলম ও আমলের সমষ্টি অথবা নবুঅত হতে পারে। ইমাম শাওকানী (রঃ) বলেছেন যে, এতে কোন বাধা নেই যে, حكم বলতে উক্ত সকল অর্থই শামিল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ১৩ وَّ حَنَانًا مِّنۡ لَّدُنَّا وَ زَكٰوۃً ؕ وَ كَانَ تَقِیًّا ﴿ۙ۱۳﴾
و حنانا من لدنا و زكوۃ و كان تقیا ﴿۱۳﴾

আর আমার পক্ষ থেকে তাকে স্নেহ-মমতা ও পবিত্রতা দান করেছি এবং সে মুত্তাকী ছিল। আল-বায়ান

আর (দিয়েছিলাম) আমার পক্ষ থেকে দয়া-মায়া ও পবিত্রতা। সে ছিল আল্লাহভীরু । তাইসিরুল

এবং আমার নিকট হতে হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা; সে ছিল সাবধানী – মুজিবুর রহমান

And affection from Us and purity, and he was fearing of Allah Sahih International

১৩. এবং আমাদের কাছ থেকে হৃদয়ের কোমলতা(১) ও পবিত্ৰতা; আর তিনি ছিলেন মুত্তাকী।

(১) حنان শব্দটি মমতার প্রায় সমার্থক শব্দ। আল্লাহ তার জন্য মায়া-মমতা ঢেলে দিয়েছিলেন। আল্লাহও তাকে ভালবাসতেন। তিনিও আল্লাহর বান্দাদেরকে ভালবাসতেন। একজন মায়ের মনে নিজের সন্তানের জন্য যে চূড়ান্ত পর্যায়ের স্নেহশীলতা থাকে, যার ভিত্তিতে সে শিশুর কষ্টে অস্থির হয়ে পড়ে, আল্লাহর বান্দাদের জন্য ইয়াহইয়ার মনে এই ধরনের স্নেহ-মমতা সৃষ্টি হয়েছিল। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৩) এবং আমার নিকট হতে মমতা ও পবিত্রতা। [1] আর সে ছিল একজন সংযমশীল।

[1] حنان মমতা, দয়া। অর্থাৎ আমি তার অন্তরে পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি দয়া-মমতা করার প্রেরণা এবং কুপ্রবৃত্তি ও সমস্ত পাপ হতে পবিত্রতা দান করেছিলাম।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ১৪ وَّ بَرًّۢا بِوَالِدَیۡهِ وَ لَمۡ یَكُنۡ جَبَّارًا عَصِیًّا ﴿۱۴﴾
و برا بوالدیه و لم یكن جبارا عصیا ﴿۱۴﴾

আর সে ছিল তার পিতা-মাতার সাথে সদাচারী, আর ছিল না অহংকারী, অবাধ্য। আল-বায়ান

আর পিতা-মাতার প্রতি সদয়, সে দাম্ভিক, অবাধ্য ছিল না। তাইসিরুল

মাতা-পিতার অনুগত এবং সে ছিলনা উদ্ধ্যত, অবাধ্য ছিলনা। মুজিবুর রহমান

And dutiful to his parents, and he was not a disobedient tyrant. Sahih International

১৪. পিতা-মাতার অনুগত এবং তিনি ছিলেন না উদ্ধত ও অবাধ্য।(১)

(১) তিনি আল্লাহর অবাধ্যতা ও পিতা-মাতার অবাধ্যতা হতে মুক্ত ছিলেন। হাদীসে এসেছে, “কিয়ামতের দিন আদম সন্তান মাত্ৰই গুনাহ নিয়ে আসবে। তবে ইয়াহইয়া ইবন যাকারিয়্যা এর ব্যতিক্রম। [মুসনাদে আহমাদ: ১/২৫৪, ২৯২]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪) পিতা-মাতার অনুগত এবং সে উদ্ধত ও অবাধ্য ছিল না। [1]

[1] অর্থাৎ, পিতা-মাতা বা নিজ প্রতিপালকের অবাধ্য ছিলেন না। এর অর্থ হল, যদি আল্লাহ তাআলা কারো অন্তরে পিতা-মাতার প্রতি ভালবাসা, স্নেহ-মমতা, তাঁদের আনুগত্য ও খিদমত, তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার বা সদাচার করার শক্তি দান করেন তাহলে তা হবে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ। সুতরাং যদি এর বিপরীত চরিত্র কারো মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলে তা হল আল্লাহর অনুগ্রহ হতে বঞ্চনার ফল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ১৫ وَ سَلٰمٌ عَلَیۡهِ یَوۡمَ وُلِدَ وَ یَوۡمَ یَمُوۡتُ وَ یَوۡمَ یُبۡعَثُ حَیًّا ﴿۱۵﴾
و سلم علیه یوم ولد و یوم یموت و یوم یبعث حیا ﴿۱۵﴾

আর তার উপর শান্তি, যেদিন সে জন্মেছে এবং যেদিন সে মারা যাবে আর যেদিন তাকে জীবিত অবস্থায় উঠানো হবে। আল-বায়ান

তার উপর শান্তি যেদিন সে জন্মেছে, যেদিন তার মৃত্যু হবে আর যেদিন সে জীবন্ত হয়ে উত্থিত হবে। তাইসিরুল

তার প্রতি ছিল শান্তি যেদিন সে জন্ম গ্রহণ করে এবং শান্তি যেদিন তার মৃত্যু হয় এবং যেদিন সে পুনরুজ্জীবিত হবে। মুজিবুর রহমান

And peace be upon him the day he was born and the day he dies and the day he is raised alive. Sahih International

১৫. আর তাঁর প্রতি শান্তি যেদিন তিনি জন্ম লাভ করেন, যেদিন তার মৃত্যু হবে এবং যেদিন তিনি জীবিত অবস্থায় উত্থিত হবেন।(১)

(১) সুফইয়ান ইবনে উয়াইনাহ বলেন, তিন সময়ে মানুষ সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখিন হয়।

এক. যখন সে দুনিয়াতে প্রথম আসে। কারণ সে তাকে এক ভিন্ন পরিবেশে আবিস্কার করে।
দুই. যখন সে মারা যায়। কারণ সে তখন এমন এক সম্প্রদায়কে দেখে যাদেরকে দেখতে সে অভ্যস্ত নয়।
তিন. হাশরের মাঠে; কারণ তখন সে নিজেকে এক ভীতিপ্রদ অবস্থায় জমায়েত দেখতে পায়।

তাই ইয়াহইয়া ইবন যাকারিয়্যা আলাইহিস সালামকে এ তিন বিপৰ্যয়কর অবস্থার বিভিষিকা থেকে নিরাপত্তা প্ৰদান করেছেন। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৫) তার প্রতি শান্তি তার জন্মদিনে, তার মৃত্যুদিনে এবং তার পুনরুজ্জীবনের দিনে। [1]

[1] মানুষের জন্য তিনটি সময় কঠিন ও ভয়াবহ। (ক) যখন মানুষ মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে আসে। (খ) যখন মৃত্যুর কবলে পতিত হয়। এবং (গ) যখন কবর হতে জীবিত করে উঠানো হবে এবং নিজেকে কিয়ামতের ভয়াবহতায় পরিবেষ্টিত দেখবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, এই তিন সময়েই তার জন্য থাকবে শান্তি ও নিরাপত্তা। বিদআতীরা এই আয়াত দ্বারা (মহানবীর) জন্মোৎসব (নবীদিবস) পালন করার বৈধতা প্রমাণ করে। কিন্তু তাদের নিকট জিজ্ঞাস্য যে, মৃত্যুর দিনে মৃত্যু-উৎসব পালন করাও তাদের জন্য জরুরী। কেননা জন্ম দিনের জন্য যেমন সালাম (শান্তি) শব্দ ব্যবহার হয়েছে তেমনি মৃত্যুর জন্যও সালাম শব্দ ব্যবহার হয়েছে। শুধু সালাম শব্দ দ্বারা যদি ‘ঈদে মীলাদ’ (জন্মোৎসব) সাব্যস্ত হয়, তাহলে সালাম শব্দ দ্বারা ‘ঈদে ওফাত’ (মৃত্যু-উৎসব)ও সাব্যস্ত হবে। কিন্তু এখানে মৃত্যু-উৎসব তো দূরের কথা বরং নবী (সাঃ)-এর মৃত্যুকেই অস্বীকার করা হয়। নবী (সাঃ)-এর মৃত্যুকে অস্বীকার করে কুরআনের আয়াতকে তো অস্বীকার করেই থাকে; উপরন্তু তারা তাদের দলীল গ্রহণের পদ্ধতি অনুসারে আলোচ্য আয়াতের এক অংশের উপর ঈমান রাখে এবং ঐ আয়াতেরই দ্বিতীয় অংশের উপর ঈমান রাখে না। {أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ}  অর্থাৎ, তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশের উপর ঈমান আনবে, আর কিছুকে অস্বীকার করবে? (বাক্বারাহঃ ৮৫)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ১৬ وَ اذۡكُرۡ فِی الۡكِتٰبِ مَرۡیَمَ ۘ اِذِ انۡتَبَذَتۡ مِنۡ اَهۡلِهَا مَكَانًا شَرۡقِیًّا ﴿ۙ۱۶﴾
و اذكر فی الكتب مریم اذ انتبذت من اهلها مكانا شرقیا ﴿۱۶﴾

আর স্মরণ কর এই কিতাবে মারইয়ামকে যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে পূর্ব দিকের কোন এক স্থানে চলে গেল। আল-বায়ান

এ কিতাবে (উল্লেখিত) মারইয়ামের কাহিনী বর্ণনা কর- যখন সে তার পরিবারবর্গ হতে আলাদা হয়ে পূর্ব দিকে এক জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিল। তাইসিরুল

বর্ণনা কর এই কিতাবে উল্লেখিত মারইয়ামের কথা, যখন সে তার পরিবারবর্গ হতে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল। মুজিবুর রহমান

And mention, [O Muhammad], in the Book [the story of] Mary, when she withdrew from her family to a place toward the east. Sahih International

১৬. আর স্মরণ করুন। এ কিতাবে মারইয়ামকে, যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল,(১)

(১) অর্থাৎ পূর্বদিকের কোন নির্জন স্থানে চলে গেলেন। নির্জন স্থানে যাওয়ার কি কারণ ছিল, সে সম্পর্কে সম্ভাবনা ও উক্তি বিভিন্নরূপ বৰ্ণিত আছে। কেউ বলেনঃ গোসল করার জন্য পানি আনতে গিয়েছিলেন। কেউ বলেনঃ অভ্যাস অনুযায়ী ইবাদতে মশগুল হওয়ার জন্যে কক্ষের পূর্বদিকস্থ কোন নির্জন স্থানে গমন করেছিলেন। কেউ কেউ বলেনঃ এ কারণেই নাসারারা পূর্বদিককে তাদের কেবলা করেছে এবং তারা পূর্বদিকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৬) (হে রসূল!) তুমি এই কিতাবে (উল্লিখিত) মারয়্যামের কথা বর্ণনা কর; যখন সে তার পরিবারবর্গ হতে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ১৭ فَاتَّخَذَتۡ مِنۡ دُوۡنِهِمۡ حِجَابًا ۪۟ فَاَرۡسَلۡنَاۤ اِلَیۡهَا رُوۡحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِیًّا ﴿۱۷﴾
فاتخذت من دونهم حجابا فارسلنا الیها روحنا فتمثل لها بشرا سویا ﴿۱۷﴾

আর সে তাদের নিকট থেকে (নিজকে) আড়াল করল। তখন আমি তার নিকট আমার রূহ (জিবরীল) কে প্রেরণ করলাম। অতঃপর সে তার সামনে পূর্ণ মানবের রূপ ধারণ করল। আল-বায়ান

সে তাদের থেকে (আড়াল করার জন্য) পর্দা টানিয়ে দিল। তখন আমি তার কাছে আমার রূহ্কে (অর্থাৎ জিবরীলকে) পাঠিয়ে দিলাম। তখন সে (অর্থাৎ জিবরীল) তার সামনে পূর্ণ মানুষের আকৃতি ধারণ করল। তাইসিরুল

অতঃপর তাদের হতে নিজেকে আড়াল করার জন্য সে পর্দা করল; অতঃপর আমি তার নিকট আমার রূহকে (জিবরাঈলকে) পাঠালাম, সে তার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করল। মুজিবুর রহমান

And she took, in seclusion from them, a screen. Then We sent to her Our Angel, and he represented himself to her as a well-proportioned man. Sahih International

১৭. অতঃপর সে তাদের নিকট থেকে নিজেকে আড়াল করল। তখন আমরা তার কাছে আমাদের রূহকে পাঠালাম, সে তার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্ৰকাশ করল।(১)

(১) এখানে ‘রূহ’ বলে জিবরীলকেই বোঝানো হয়েছে। [ইবন কাসীর] ফেরেশতাকে তার আসল আকৃতিতে দেখা মানুষের জন্যে সহজ নয়- এতে ভীষণ ভীতির সঞ্চার হয়। এ কারণে জিবরীল আলাইহিস সালাম মারইয়ামের সামনে মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করেন। [ফাতহুল কাদীর] যেমন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেরা গিরি গুহায় এবং পরবর্তীকালেও এরূপ ভয়-ভীতির সম্মুখীন হয়েছিলেন।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৭) অতঃপর তাদের হতে সে নিজেকে পর্দা করল;[1] অতঃপর আমি তার নিকট আমার রূহ (জিবরীল)কে পাঠালাম, সে তার নিকট পূর্ণ মানুষ আকারে আত্মপ্রকাশ করল। [2]

[1] লোকালয় হতে পৃথক হয়ে নিরালায় আসা ও পর্দা করা আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে ছিল, যাতে তাঁকে কেউ দেখতে না পায় তথা মনে একাগ্রতা সৃষ্টি হয়। অথবা তা মাসিক হতে পবিত্রতা অর্জনের জন্য ছিল। আর পূর্ব দিকের স্থান বলতে বায়তুল মাকদিসের পূর্ব দিককে বুঝানো হয়েছে।

[2] রূহ বলতে জিবরীল (আঃ)। যাকে পূর্ণ মনুষ্য আকৃতিতে মারয়্যামের নিকট পাঠানো হয়েছিল। যখন মারয়্যাম দেখলেন যে, এক ব্যক্তি বিনা বাধায় ভিতরে প্রবেশ করে ফেলেছে, তখন তিনি ভয় পেয়ে গেলেন, হয়তো বা সে কোন অসৎ উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেছে। জিবরীল (আঃ) বললেন, আমি তা নই, যা তুমি ধারণা করছ। আমি তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত দূত। আর আমি তোমাকে এই সুসংবাদ দিতে এসেছি যে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে এক পুত্র-সন্তান দান করবেন। কোন কোন কিরাআতে لِيهَبَ প্রথম পুরুষের শব্দ আছে। কিন্তু (এখানে যেমন আছে) জিবরীল (আঃ) উত্তম পুরুষের শব্দ لأَهَب ব্যবহার করেছেন। যেহেতু বাহ্যিক হেতু স্বরূপ জিবরীল (আঃ) মারয়্যামের কামিসের বুকের উপর খোলা অংশে ফুঁক মেরে দিলেন, আর আল্লাহর হুকুমে তাঁর গর্ভ সঞ্চার হল। এই কারণেই পুত্র দানের সম্বন্ধ নিজের দিকে জুড়েছেন। কিংবা এর অর্থ এও হতে পারে যে, এ কথাটি স্বয়ং আল্লাহর। জিবরীল (আঃ) শুধু তা হুবহু নকল করেছেন; অর্থাৎ, পরিপূর্ণ বাক্য হবে এইরূপঃ أرسَلَنِي يَقُولُ لَكِ أرسَلتُ رَسُولِي إِلَيكِ لأَهَبَ لَكِ আল্লাহ আমাকে (তোমার নিকট) প্রেরণ করেছেন; তিনি বলেন, আমি আমার দূত তোমার নিকট এই সংবাদ দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছি যে, আমি তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করব। আর এই শ্রেণীর ঊহ্য ও অনুক্ত কথা কুরআনের অনেক স্থানে আছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ১৮ قَالَتۡ اِنِّیۡۤ اَعُوۡذُ بِالرَّحۡمٰنِ مِنۡكَ اِنۡ كُنۡتَ تَقِیًّا ﴿۱۸﴾
قالت انی اعوذ بالرحمن منك ان كنت تقیا ﴿۱۸﴾

মারইয়াম বলল, ‘আমি তোমার থেকে পরম করুণাময়ের আশ্রয় চাচ্ছি, যদি তুমি মুত্তাকী হও’। আল-বায়ান

মারইয়াম বলল, ‘আমি তোমা হতে দয়াময় আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি যদি তুমি আল্লাহকে ভয় কর’ (তবে আমার নিকট এসো না)।’ তাইসিরুল

মারইয়াম বললঃ তুমি যদি (আল্লাহকে) ভয় কর তাহলে আমি তোমা হতে দয়াময়ের কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। মুজিবুর রহমান

She said, "Indeed, I seek refuge in the Most Merciful from you, [so leave me], if you should be fearing of Allah." Sahih International

১৮. মার্‌ইয়াম বলল, আমি তোমার থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করছি (আল্লাহকে ভয় কর) যদি তুমি মুত্তাকী হও।(১)

(১) মারইয়াম যখন পর্দার ভেতর আগত একজন মানুষকে নিকটে দেখতে পেলেন, তখন তার উদেশ্য অসৎ বলে আশঙ্কা করলেন এবং বললেনঃ “আমি তোমার থেকে রহমানের আশ্রয় প্রার্থনা করি, যদি তুমি তাকওয়ার অধিকারী হও”। [ইবন কাসীর] এ বাক্যটি এমন, যেমন কেউ কোন যালেমের কাছে অপারগ হয়ে এভাবে ফরিয়াদ করেঃ যদি তুমি ঈমানদার হও, তবে আমার প্রতি যুলুম করো না। এ যুলুম থেকে বাধা দেয়ার জন্যে তোমার ঈমান যথেষ্ট হওয়া উচিত। উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহকে ভয় করা এবং অপকর্ম থেকে বিরত থাকা তোমার জন্যে সমীচীন। [বাগভী] অথবা এর অর্থ: যদি তুমি আল্লাহর নিকট আমার আশ্রয় প্রার্থনাকে মূল্য দাও। তবে আমার কাছ থেকে দূরে থাক। [তাবারী; আদওয়াউল বায়ান]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৮) মারয়্যাম বলল, ‘আমি তোমা হতে পরম করুণাময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করছি; তুমি যদি সংযমশীল হও (তাহলে আমার নিকট থেকে সরে যাও)।’

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ১৯ قَالَ اِنَّمَاۤ اَنَا رَسُوۡلُ رَبِّكِ ٭ۖ لِاَهَبَ لَكِ غُلٰمًا زَكِیًّا ﴿۱۹﴾
قال انما انا رسول ربك ٭ لاهب لك غلما زكیا ﴿۱۹﴾

সে বলল, ‘আমি তো কেবল তোমার রবের বার্তাবাহক, তোমাকে একজন পবিত্র পুত্রসন্তান দান করার জন্য এসেছি’। আল-বায়ান

সে বলল, ‘আমি তোমার প্রতিপালক কর্তৃক প্রেরিত হয়েছি তোমাকে একটি পুত-পবিত্র পুত্র দানের উদ্দেশ্যে।’ তাইসিরুল

সে বললঃ আমিতো শুধু তোমার রাব্ব হতে প্রেরিত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করার (সুসংবাদ জানানোর) জন্য। মুজিবুর রহমান

He said, "I am only the messenger of your Lord to give you [news of] a pure boy." Sahih International

১৯. সে বলল, আমি তো তোমার রব-এর দূত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করার জন্য।(১)

(১) সে দূত হলেন, জিবরীল আলাইহিস সালাম। আল্লাহ্ তাঁর দূত জিবরীলকে পবিত্র ফুঁ নিয়ে পাঠালেন। যে ফুঁর মাধ্যমে মারইয়ামের গর্ভে এমন সন্তানের জন্ম হলো যিনি অত্যন্ত পবিত্র ও কল্যাণময় বিবেচিত হলেন। মহান আল্লাহ তার সম্পর্কে বলেনঃ “স্মরণ করুন, যখন ফিরিশতাগণ বলল, হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি কালেমার সুসংবাদ দিতেছেন। তার নাম মসীহ মারইয়াম তনয় ‘ঈসা, সে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম হবে। সে দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলবে এবং সে হবে পুণ্যবানদের একজন।” [সূরা আলে-ইমরান: ৪৫–৪৬]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯) সে বলল, ‘আমি তো তোমার প্রতিপালক-প্রেরিত (দূত) মাত্র; তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করবার জন্য (আমি প্রেরিত হয়েছি)।’

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৯ : ২০ قَالَتۡ اَنّٰی یَكُوۡنُ لِیۡ غُلٰمٌ وَّ لَمۡ یَمۡسَسۡنِیۡ بَشَرٌ وَّ لَمۡ اَكُ بَغِیًّا ﴿۲۰﴾
قالت انی یكون لی غلم و لم یمسسنی بشر و لم اك بغیا ﴿۲۰﴾

মারইয়াম বলল, ‘কিভাবে আমার পুত্র সন্তান হবে? অথচ কোন মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি। আর আমি তো ব্যভিচারিণীও নই’। আল-বায়ান

সে বলল, ‘কেমন করে আমার পুত্র হতে পারে, যখন কোন মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি, আর আমি অসতীও নই।’ তাইসিরুল

মারইয়াম বললঃ কেমন করে আমার পুত্র হবে যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। মুজিবুর রহমান

She said, "How can I have a boy while no man has touched me and I have not been unchaste?" Sahih International

২০. মারইয়াম বলল, কেমন করে আমার পুত্র হবে, যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই!

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(২০) মারয়্যাম বলল, ‘কেমন করে আমার পুত্র হবে! যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি; আর আমি ব্যভিচারিণীও নই।’

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
তাজউইদ কালার কোড
হামযা ওয়াসল মাদ্দে তাবিঈ ইখফা মাদ্দে ওয়াজিব গুন্নাহ মাদ্দে জায়েয নীরব ইদগাম (গুন্নাহ সহ) ক্বলক্বলাহ লাম শামসিয়্যাহ ইদগাম (গুন্নাহ ছাড়া) ইদগাম শাফাউই ইক্বলাব ইখফা শাফাউই মাদ্দে লাযিম ইদগাম মুতাক্বারিবাইন ইদগাম মুতাজানিসাইন