بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
১৮ সূরাঃ আল-কাহফ | Al-Kahf | سورة الكهف - আয়াত সংখ্যাঃ ১১০ - মাক্কী
১৮:১ اَلۡحَمۡدُ لِلّٰہِ الَّذِیۡۤ اَنۡزَلَ عَلٰی عَبۡدِہِ الۡکِتٰبَ وَ لَمۡ یَجۡعَلۡ لَّہٗ عِوَجًا ؕ﴿ٜ۱﴾

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দার উপর কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাতে রাখেননি কোন বক্রতা । আল-বায়ান

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন, আর তাতে কোন বক্রতার অবকাশ রাখেননি। তাইসিরুল

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যিনি তাঁর দাসের প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে তিনি অসঙ্গতি রাখেননি। মুজিবুর রহমান

১. যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই যিনি তাঁর বান্দার উপর কিতাব নাযিল করেছেন(১) এবং তাতে তিনি বক্রতা রাখেননি;(২)

(১) সূরার শুরুতে মহান আল্লাহ নিজেই নিজের প্রশংসা করছেন। এ ধরনের প্রশংসা একমাত্র তাঁরই। প্রথম ও শেষ সর্বাবস্থায় শুধু তাঁরই প্রশংসা করা যায়। তিনি তাঁর বান্দা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কিতাব নাযিল করেছেন সুতরাং তিনি প্রশংসিত; কারণ এর মাধ্যমে তিনি মানুষদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে এসেছেন। এর চেয়ে বড় নেয়ামত আর কী-ই বা আছে। [ইবন কাসীর]


(২) অর্থাৎ এর মধ্যে এমন কোন কথাবার্তা নেই যা বুঝতে পারা যায় না। আবার সত্য ও ন্যায়ের সরল রেখা থেকে বিচুত এমন কথাও নেই যা মেনে নিতে কোন সত্যপন্থী লোক ইতস্তত করতে পারে। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যিনি তাঁর বান্দার প্রতি এই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে তিনি কোন প্রকার বক্রতা রাখেননি।[1]

[1] ‘বক্রতা’ অর্থাৎ, অসঙ্গতি, পরস্পরবিরোধিতা, মতবিরোধিতা বা জটিলতা রাখেননি। অথবা এতে (যে পথ নির্দেশিত হয়েছে তার মধ্যে) কোন বক্রতা রাখেননি এবং মধ্যম পন্থা হতে বিচ্যুতি ঘটার কোন কিছু এতে নেই। বরং এটাকে সুপ্রতিষ্ঠিত, সরল ও সোজা রাখা হয়েছে। অথবা قَيِّم অর্থ, এমন কিতাব, যাতে বান্দাদের সেই সব ব্যাপারের প্রতি খেয়াল রাখা ও যত্ন নেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার মঙ্গল নিহিত আছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৮:২ قَیِّمًا لِّیُنۡذِرَ بَاۡسًا شَدِیۡدًا مِّنۡ لَّدُنۡہُ وَ یُبَشِّرَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ الَّذِیۡنَ یَعۡمَلُوۡنَ الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ اَجۡرًا حَسَنًا ۙ﴿۲﴾

সরলরূপে, যাতে সে তাঁর পক্ষ থেকে কঠিন আযাব সম্পর্কে সতর্ক করে এবং সুসংবাদ দেয়, সেসব মুমিনকে, যারা সৎকর্ম করে, নিশ্চয় তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান। আল-বায়ান

(তিনি সেটাকে করেছেন) সত্য, স্পষ্ট ও অকাট্য তাঁর কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য। আর যারা সৎকাজ করে সেই মু’মিনদেরকে সুসংবাদ দেয়ার জন্য যে, তাদের জন্য আছে উত্তম প্রতিফল। তাইসিরুল

একে করেছেন সুপ্রতিষ্ঠিত তাঁর কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য এবং বিশ্বাসীগণ, যারা সৎকাজ করে তাদেরকে এই সুসংবাদ দেয়ার জন্য যে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তম পুরস্কার – মুজিবুর রহমান

২. সরলরূপে(১), তাঁর কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য এবং মুমিনগণ যারা সৎকাজ করে, তাদেরকে এ সুসংবাদ দেয়ার জন্য যে, তাদের জন্য আছে উত্তম পুরস্কার,

(১) এমন সরল ও সহজরূপে যে তাতে নেই কোন স্ববিরোধিতা। [মুয়াস্‌সার]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) তিনি একে করেছেন সুপ্রতিষ্ঠিত; যাতে ওটা তাঁর নিকট হতে (অবতীর্ণ)[1] কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করে এবং সৎকর্মশীল বিশ্বাসীগণ এই সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য আছে উত্তম পুরস্কার (জান্নাত);

[1] مِنْ لَّدُنْهُ (তাঁর নিকট হতে) অর্থাৎ, আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৮:৩ مَّاکِثِیۡنَ فِیۡہِ اَبَدًا ۙ﴿۳﴾

তারা তাতে অনন্তকাল অবস্থান করবে। আল-বায়ান

তাতে তারা চিরকাল থাকবে। তাইসিরুল

যেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী – মুজিবুর রহমান

৩. যাতে তারা স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে,

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩) যেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৮:৪ وَّ یُنۡذِرَ الَّذِیۡنَ قَالُوا اتَّخَذَ اللّٰہُ وَلَدًا ٭﴿۴﴾

আর যেন সতর্ক করে তাদেরকে, যারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন’। আল-বায়ান

আর তাদেরকে সতর্ক করার জন্য যারা বলে, ‘আল্লাহ পুত্র গ্রহণ করেছেন।’ তাইসিরুল

এবং সতর্ক করার জন্য তাদেরকে যারা বলে যে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। মুজিবুর রহমান

৪. আর সতর্ক করার জন্য তাদেরকে যারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্ৰহণ করেছেন,(১)

(১) যারা আল্লাহর সন্তান-সন্ততি আছে বলে দাবী করে এদের মধ্যে রয়েছে নাসারা, ইহুদী ও আরব মুশরিকরা। [ফাতহুল কাদীর] তাছাড়া পাক-ভারতের হিন্দুরাও আল্লাহর জন্য সন্তান-সন্ততি সাব্যস্ত করে থাকে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) এবং তাদেরকেও সতর্ক করে, যারা বলে যে, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন।’[1]

[1] যেমন, ইয়াহুদীরা বলে, ‘উযাইর আল্লাহর বেটা’, খ্রিষ্টানরা বলে, ‘ঈসা আল্লাহর বেটা’ এবং কোন কোন মুশরিকদল বলে থাকে, ‘ফিরিশতাগণ আল্লাহর বেটী!’

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৮:৫ مَا لَہُمۡ بِہٖ مِنۡ عِلۡمٍ وَّ لَا لِاٰبَآئِہِمۡ ؕ کَبُرَتۡ کَلِمَۃً تَخۡرُجُ مِنۡ اَفۡوَاہِہِمۡ ؕ اِنۡ یَّقُوۡلُوۡنَ اِلَّا کَذِبًا ﴿۵﴾

এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও না। বড় মারাত্মক কথা, যা তাদের মুখ থেকে বের হয়। মিথ্যা ছাড়া তারা কিছুই বলে না! আল-বায়ান

এ সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নেই, আর তাদের পিতৃ-পুরুষদেরও ছিল না। তাদের মুখ থেকে বের হয় বড়ই সাংঘাতিক কথা। তারা যা বলে তা মিথ্যে ছাড়া কিছুই নয়। তাইসিরুল

এ বিষয়ে তাদের কোনই জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও ছিলনা; তাদের মুখ-নিঃসৃত বাক্য কি উদ্ভট! তারাতো শুধু মিথ্যাই বলে। মুজিবুর রহমান

৫. এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও ছিল না। তাদের মুখ থেকে বের হওয়া বাক্য কী সাংঘাতিক! তারা তো শুধু মিথ্যাই বলে।(১)

(১) অৰ্থাৎ তাদের এ উক্তি যে, অমুক আল্লাহর পুত্র অথবা অমুককে আল্লাহ পুত্র হিসেবে গ্ৰহণ করেছেন, এগুলো তারা এ জন্য বলছে না যে, তাদের আল্লাহর পুত্র হবার বা আল্লাহর কাউকে পুত্র বানিয়ে নেবার ব্যাপারে তারা কিছু জানে। বরং নিছক নিজেদের ভক্তি শ্রদ্ধার বাড়াবাড়ির কারণে তারা একটি মনগড়া মত দিয়েছে এবং এভাবে তারা যে কত মারাত্মক গোমরাহীর কথা বলছে এবং বিশ্বজাহানের মালিক ও প্ৰভু আল্লাহর বিরুদ্ধে যে কত বড় বেয়াদবী ও মিথ্যাচার করে যাচ্ছে তার কোন অনুভূতিই তাদের নেই। এভাবে তারা নিজেরা যেমন পথভ্রষ্ট হচ্ছে তেমনি ভ্ৰষ্ট করছে তাদের সন্তান-সন্ততিদেরকেও। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫) এই বিষয়ে তাদের কোনই জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও ছিল না; তাদের মুখনিঃসৃত বাক্য[1] কি সাংঘাতিক! তারা তো শুধু মিথ্যাই বলে।

[1] সেই ‘বাক্য’ এই যে, আল্লাহর সন্তান-সন্ততি আছে। যা একেবারে মনগড়া মিথ্যা।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৮:৬ فَلَعَلَّکَ بَاخِعٌ نَّفۡسَکَ عَلٰۤی اٰثَارِہِمۡ اِنۡ لَّمۡ یُؤۡمِنُوۡا بِہٰذَا الۡحَدِیۡثِ اَسَفًا ﴿۶﴾

হয়তো তুমি তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে দুঃখে নিজকে শেষ করে দেবে, যদি তারা এই কথার প্রতি ঈমান না আনে। আল-বায়ান

তারা এ বাণীতে (কুরআনে) বিশ্বাস না করার কারণে মনে হচ্ছে (হে নাবী!) তুমি তার দুঃখে তোমার নিজের জান বিনাশ করে দেবে। তাইসিরুল

তারা এই বাণী বিশ্বাস না করলে তাদের পিছনে পিছনে ঘুরে সম্ভবতঃ তুমি দুঃখে আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে। মুজিবুর রহমান

৬. তারা এ বাণীতে ঈমান না আনলে সম্ভবত তাদের পিছনে ঘুরে আপনি দুঃখে আত্ম-বিনাশী হয়ে পড়বেন।(১)

(১) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে সে সময় যে মানসিক অবস্থার টানাপোড়ন চলছিল এখানে সেদিকে ইংগিত করা হয়েছে। তিনি তাদের হিদায়াতের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তারা আল্লাহ্‌র আযাবের সম্মুখীন হবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তার এ মানসিক অবস্থাকে একটি হাদীসে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ “আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত এমন এক ব্যক্তির মতো যে আলোর জন্য আগুন জ্বালালো কিন্তু পতংগরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করলো পুড়ে মরার জন্য। সে এদেরকে কোনক্রমে আগুন থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করে। কিন্তু এ পতংগরা তার কোন প্রচেষ্টাকেই ফলবতী করতে দেয় না। আমার অবস্থাও অনুরূপ। আমি তোমাদের হাত ধরে টান দিচ্ছি। কিন্তু তোমরা আগুনে লাফিয়ে পড়ছো।” [বুখারীঃ ৩২৪৪, ৬১১৮ ও মুসলিমঃ ২২৮৪] সূরা আশ শু'আরার ৩ নং আয়াতেও এ ব্যাপারে আলোচনা এসেছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) তারা এই বাণী[1] বিশ্বাস না করলে তাদের পিছনে পিছনে ঘুরে সম্ভবতঃ তুমি দুঃখে আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে।

[1] بِهَذَا الْحَدِيْثِ (এই বাণী) বলতে কুরআন করীম। কাফেরদের ঈমান আনার ব্যাপারে রসূল (সাঃ) যে অতীব উদগ্রীব ছিলেন এবং (ঈমান আনা থেকে) তাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়াতে যে তিনি কঠিন কষ্ট বোধ করতেন, এই আয়াতে তাঁর সেই মানসিক অবস্থা ও অভিপ্রায়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৮:৭ اِنَّا جَعَلۡنَا مَا عَلَی الۡاَرۡضِ زِیۡنَۃً لَّہَا لِنَبۡلُوَہُمۡ اَیُّہُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ﴿۷﴾

নিশ্চয় যমীনের উপর যা রয়েছে, তা আমি শোভা করেছি তার জন্য, যাতে তাদেরকে পরীক্ষা করি যে, কর্মে তাদের মধ্যে কে উত্তম। আল-বায়ান

যমীনের উপর যা কিছু আছে আমি সেগুলোকে তার শোভা-সৌন্দর্য করেছি যাতে আমি মানুষকে পরীক্ষা করতে পারি যে, ‘আমালের ক্ষেত্রে কারা উত্তম। তাইসিরুল

পৃথিবীর উপর যা কিছু আছে আমি সেগুলিকে ওর শোভনীয় করেছি মানুষকে এই পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কর্মে কে শ্রেষ্ঠ? মুজিবুর রহমান

৭. নিশ্চয় যমীনের উপর যা কিছু আছে আমরা সেগুলোকে তার শোভা করেছি(১), মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কাজে কে শ্ৰেষ্ঠ।

(১) অর্থাৎ পৃথিবীর জীবজন্তু, উদ্ভিদ, জড় পদার্থ এবং ভূগর্ভস্থ বিভিন্ন বস্তুর খনি- এগুলো সবই পৃথিবীর সাজ-সজ্জা ও চাকচিক্য। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “দুনিয়া সুমিষ্ট নয়নাভিরাম দৃশ্যে ভরা, আল্লাহ এতে তোমাদেরকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ করে দেখতে চান তোমরা এতে কি ধরনের আচরণ কর। সুতরাং তোমরা দুনিয়ায় মত্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাক এবং মহিলাদের থেকেও বেঁচে থাক। কেননা; বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রথম ফিতনা ছিল মহিলাদের মধ্যে।” [মুসলিম: ২৭৪২]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭) পৃথিবীর উপর যা কিছু আছে[1] আমি সেগুলিকে ওর শোভা করেছি মানুষকে এই পরীক্ষা করবার জন্য যে, তাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম।

[1] ভূ-পৃষ্ঠে জীব-জন্তু, উদ্ভিদ, জড় ও খনিজপদার্থ এবং মটির নীচে লুক্কায়িত অন্যান্য গুপ্তধন, এ সবই হল দুনিয়ার শোভা-সৌন্দর্য ও তার চাকচিক্য।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৮:৮ وَ اِنَّا لَجٰعِلُوۡنَ مَا عَلَیۡہَا صَعِیۡدًا جُرُزًا ؕ﴿۸﴾

আর নিশ্চয় তার উপর যা রয়েছে তাকে আমি উদ্ভিদহীন শুষ্ক মাটিতে পরিণত করব। আল-বায়ান

আমি অবশ্যই তার উপর যা আছে তা বৃক্ষলতাহীন শুকনো ধূলা মাটিতে পরিণত করব। তাইসিরুল

ওর উপর যা কিছু আছে তা অবশ্যই আমি উদ্ভিদশূন্য মৃত্তিকায় পরিণত করব। মুজিবুর রহমান

৮. আর তার উপর যা কিছু আছে তা অবশ্যই আমরা উদ্ভিদশূন্য ময়দানে পরিণত করব।(১)

(১) অর্থাৎ পৃথিবী পৃষ্ঠে তোমরা এই যেসব সাজ সরঞ্জাম দেখছো এবং যার মন ভুলানো চাকচিক্যে তোমরা মুগ্ধ হয়েছ, এতো নিছক একটি সাময়িক সৌন্দর্য, নিছক তোমাদের পরীক্ষার জন্য এর সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। এসব কিছু আমি তোমাদের আয়েশ আরামের জন্য সরবরাহ করেছি, তোমরা এ ভুল ধারণা করে বসেছে। এগুলো আয়েশ আরামের জিনিস নয়, বরং পরীক্ষার উপকরণ। যেদিন এ পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবে সেদিনই ভোগের এসব সরঞ্জাম খতম করে দেয়া হবে এবং তখন এ পৃথিবী একটি লতাগুল্মহীন ধূ ধূ প্রান্তর ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। [দেখুন, ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮) ওর উপর যা কিছু আছে তা অবশ্যই আমি উদ্ভিদশূন্য ময়দানে পরিণত করব।[1]

[1] صَعِيْدًا পরিষ্কার ময়দান। جُرُزٌ একেবারে সমতল, যাতে কোন গাছ-পালা থাকে না। অর্থাৎ, এমন এক দিন আসবে, যেদিন এ দুনিয়া তার যাবতীয় সৌন্দর্য ও চাকচিক্য সহ ধ্বংস হয়ে যাবে এবং ভূ-পৃষ্ঠ একটি গাছ-পালাহীন সমতল ময়দানে পরিণত হবে। অতঃপর আমি নেককার ও বদকারদেরকে তাদের আমল অনুযায়ী প্রতিদান দেব।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৮:৯ اَمۡ حَسِبۡتَ اَنَّ اَصۡحٰبَ الۡکَہۡفِ وَ الرَّقِیۡمِ ۙ کَانُوۡا مِنۡ اٰیٰتِنَا عَجَبًا ﴿۹﴾

তুমি কি মনে করেছ যে, গুহা ও রাকীমের* অধিবাসীরা ছিল আমার আয়াতসমূহের এক বিস্ময়? আল-বায়ান

তুমি কি মনে কর যে, গুহা ও রকীমের অধিবাসীরা ছিল আমার নিদর্শনগুলোর মধ্যে বিস্ময়কর? তাইসিরুল

তুমি কি মনে কর যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর? মুজিবুর রহমান

* রাকীম একটি পাহাড়ের নাম, অথবা যে গ্রাম থেকে তারা বের হয়েছিল সে গ্রামের নাম, অথবা একটি ফলক- যাতে ঐ সব যুবকের নাম লিখা ছিল।

৯. আপনি কি মনে করেন যে, কাহফ(১) ও রাকীমের(২) অধিবাসীরা আমাদের নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর?(৩)

(১) كهف এর অর্থ বিস্তীর্ণ পার্বত্য গুহা। বিস্তীর্ণ না হলে তাকে غار বলা হয়। [কুরতুবী]


(২) رقيم এর শাব্দিক অর্থ مرقوم বা লিখিত বস্তু। এ স্থলে কি বোঝানো হয়েছে, এ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণের বিভিন্ন উক্তি বর্ণিত রয়েছে-

(এক) সাঈদ ইবন জুবাইর বলেন, এর অর্থ একটি লিখিত ফলক। সমসাময়িক বাদশাহ এই ফলকে আসহাবে কাহফের নাম লিপিবদ্ধ করে গুহার প্রবেশপথে বুলিয়ে রেখেছিল। এ কারণেই আসহাবে কাহফকে রকীমও বলা হয়।

(দুই) মুজাহিদ বলেন, রকীম সে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত উপত্যকার নাম, যাতে আসহাবে কাহফের গুহা ছিল।

(তিন) ইবন আব্বাস বলেন, সে পাহাড়টিই রকীম।

(চার) ইকরিমা বলেনঃ আমি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে বলতে শুনেছি যে, রকীম কোন লিখিত ফলকের নাম না কি জনবসতির নাম, তা আমার জানা নেই।

(পাঁচ) ক'ব আহবার, ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেবাহ, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন যে, রকীম রোমে অবস্থিত আয়লা অর্থাৎ আকাবার নিকটবর্তী একটি শহরের নাম। [ইবন কাসীর]

মূলতঃ আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রকীম একই দলের দুই নাম, না তারা আলাদা দু’টি দল? এ মতভেদ নিয়েই উপরোক্ত মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। যদিও কোন সহীহ হাদীসে এ সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট বর্ণনা নেই, কিন্তু ইমাম বুখারী ‘সহীহ’ নামক গ্রন্থে আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রকীমের দুটি আলাদা আলাদা শিরোনাম রেখেছেন। ইমাম বুখারীর এ কাজ থেকে বোঝা যায় যে, তার মতে আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রকীম পৃথক পৃথক দু’টি দল। হাফেজ ইবনে হাজার ও অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে কুরআনের পূর্বাপর বর্ণনা অনুযায়ী আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রকীম একই দল।


(৩) অর্থাৎ যে আল্লাহ্ এ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, রাত-দিনের ব্যবস্থা করেছেন, সূর্য ও চন্দ্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্ররাজিকে তাদের কক্ষপথে পর্যন্ত ঘুম পাড়িয়ে রাখা তারপর তাদেরকে ঘুমাবার আগে তারা যেমন তর-তাজা ও সুস্থ-সবল ছিল ঠিক তেমনি অবস্থায় জাগিয়ে তোলা কি তোমরা কিছুমাত্র অসম্ভব বলে মনে কর? যদি চন্দ্র, সূর্য ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে কেউ কখনো চিন্তা-ভাবনা করে তাহলে একথা কেউ মনে করতে পারে না যে, আল্লাহর জন্য এটা কোন কঠিন কাজ। মহান আল্লাহর জন্য তো এটা ক্ষুদ্র ব্যাপার। [দেখুন, ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯) তুমি কি মনে কর যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর? [1]

[1] অর্থাৎ, এই একটাই বৃহৎ ও বিস্ময়কর নিদর্শন নয়, বরং আমার প্রতিটি নিদর্শনই বিস্ময়কর। আসমান ও যমীনের এই সৃষ্টি, তার ব্যবস্থাপনা, সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রকে আয়ত্তাধীন করা এবং রাত ও দিনের পরিবর্তন ও অন্যান্য অসংখ্য নিদর্শন কি কম বিস্ময়কর? كَهْفٌ সেই গুহাকে বলা হয় যা পাহাড়ে থাকে। رَقِيم (রাকীম) কারো নিকট সেই গ্রামের নাম, যেখান থেকে এই যুবকরা গুহায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। কেউ বলেছেন, সেই পাহাড়ের নাম, যাতে ঐ গুহা ছিল। অনেকের মতে, رَقِيْمٌ মানে مَرْقُوْمٌ অর্থাৎ, লোহা অথবা সীসার তৈরী তক্তি যাতে গুহার অধিবাসীদের নাম অঙ্কিত ছিল। এটাকে رَقِيم (অঙ্কিত বা লিপিবদ্ধ)এ জন্য বলা হয় যে, এতে নাম লিপিবদ্ধ ছিল। বর্তমান তত্ত্ব-গবেষণা দ্বারা জানা যায় যে, প্রথম কথাটাই বেশী সঠিক। কারণ, যে পাহাড়ে এই গুহা রয়েছে, তার সন্নিকটেই রয়েছে একটি জনপদ, যেটাকে এখন الرقيب (আররাকীব) বলা হয়। বহুকাল অতিবাহিত হওয়ার কারণে الرقيم এর বিকৃত রূপ হয়েছে الرقيب (আররাক্বীব)।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৮:১০ اِذۡ اَوَی الۡفِتۡیَۃُ اِلَی الۡکَہۡفِ فَقَالُوۡا رَبَّنَاۤ اٰتِنَا مِنۡ لَّدُنۡکَ رَحۡمَۃً وَّ ہَیِّیٴۡ لَنَا مِنۡ اَمۡرِنَا رَشَدًا ﴿۱۰﴾

যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল অতঃপর বলল, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দিন এবং আমাদের জন্য আমাদের কর্মকান্ড সঠিক করে দিন’। আল-বায়ান

যুবকরা যখন গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করল তখন তারা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তোমার নিকট হতে আমাদেরকে রহমত দান কর আর আমাদের ব্যাপারটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন কর।’ তাইসিরুল

যুবকরা যখন গুহায় আশ্রয় নিল তখন তারা বলেছিলঃ হে আমাদের রাব্ব! আপনি নিজ হতে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করুন। মুজিবুর রহমান

১০. যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল তখন তারা বলেছিল, হে আমাদের রব! আপনি নিজ থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করুন।(১)

(১) এ ধরনের দো'আ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও করতেন এবং উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলতেনঃ اللَّهُمَّ مَا قَضَيْتَ لَنَا مِنْ قَضَاءٍ فَاجْعَلْ عَاقِبَتَهُ رُشْدًا “হে আল্লাহ! আমাদের জন্য আপনি যা ফয়সালা করেছেন সেগুলোর সুন্দর সমাপ্তি দিন”। [মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৮১]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০) যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল, তখন তারা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি নিজের তরফ থেকে আমাদেরকে করুণা দান কর এবং আমাদের কাজ-কর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা কর।’[1]

[1] এরা হল সেই যুবকদল, যাদেরকে ‘আসহাবে কাহ্ফ’(গুহার অধিবাসী) বলা হয়েছে। (বিস্তারিত আলোচনা ১৪৮নং টীকায় আসছে।) তারা যখন নিজেদের দ্বীনের রক্ষার্থে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল, তখন এই প্রার্থনা করেছিল। আসহাবে কাহ্ফদের এই ঘটনায় যুবকদের জন্য রয়েছে গুরুতত্ত্বপূর্ণ শিক্ষা। বর্তমানে যুবকদের বেশীর ভাগ সময় নষ্ট হয় অনর্থক কার্যকলাপে তথা আল্লাহর প্রতি তাদের তেমন কোন ভ্রূক্ষেপ থাকে না। আজকের মুসলিম যুবকেরা যদি তাদের যৌবনকালকে আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করত, তাহলে কতই না ভাল হত!

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ 1 to 10 of 110 পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 4 5 6 · · · 10 11 Next »