সূরাঃ ১০/ ইউনুস | Yunus | يُونُس আয়াতঃ ১০৯ মাক্কী
তাফসীরে জাকারিয়া

সূরা সংক্রান্ত আলোচনাঃ

আয়াত সংখ্যাঃ ১০৯

নাযিল হওয়ার স্থানঃ সূরা ইউনুস মক্কায় নাযিল হয়েছে। [ইবন কাসীর] কেউ কেউ সূরার মাত্র তিনটি আয়াতকে মাদানী বলে উল্লেখ করেছেন, যা মদীনায় হিজরত করার পর নাযিল হয়েছে। [কুরতুবী]

নামকরণঃ এ সূরার নাম সূরা ইউনুস। কারণ সূরার ৯৮ নং আয়াতে এর উল্লেখ রয়েছে।

আহসানুল বায়ান

সূরা ইউনুস

(মক্কায় অবতীর্ণ) [1]
[1] সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ। তবে তার দু’টি আয়াত কেউ কেউ তিনটি আয়াতকে মাদানী বলে উল্লেখ করেছেন। (ফাতহুল কাদীর)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
১০ : ১ الٓرٰ ۟ تِلۡكَ اٰیٰتُ الۡكِتٰبِ الۡحَكِیۡمِ ﴿۱﴾
الٓر تلك ایت الكتب الحكیم ﴿۱﴾

আলিফ্-লাম-রা। এগুলো প্রজ্ঞাপূর্ণ কিতাবের আয়াত। আল-বায়ান

আলিফ-লাম-র, এগুলো মহা বিজ্ঞানময় গ্রন্থের আয়াতসমূহ। তাইসিরুল

আলিফ লাম রা, এটা হচ্ছে অতি সূক্ষ্ম তত্ত্বপূর্ণ কিতাবের আয়াত। মুজিবুর রহমান

Alif, Lam, Ra. These are the verses of the wise Book Sahih International

১. আলিফ-লাম-রা(১)। এগুলো প্রজ্ঞাপূর্ণ কিতাবের আয়াত।

(১) এগুলোকে হরফে মোকাত্তা'আত’ বলা হয়। এগুলোর আলোচনা পূর্বে সূরা আল-বাকারায় করা হয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) আলিফ লা-ম রা। এ হল বিজ্ঞানময় গ্রন্থের আয়াত। [1]

[1] الحَكِيْمِ (বিজ্ঞানময়) কিতাব অর্থাৎ, কুরআন কারীমের বিশেষণ। এর একটি অর্থ তাই যা অনুবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। তার আরো কয়েকটি অর্থ করা হয়েছে। যেমন الْمُحْكَمِ - অর্থাৎ, হালাল ও হারাম এবং দন্ডবিধি ও যাবতীয় বিধান দানে মযবুত। حَكِيْمٌ -حَاكِمٌ এর অর্থে। অর্থাৎ, মতভেদ ইত্যাদিতে মানুষের মাঝে ফায়সালা বা সমাধান দাতা গ্রন্থ। (সূরা বাক্বারাহঃ ২৩) حكيم - محكوم فيه এর অর্থে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা এই কুরআনে ন্যায় ও ইনসাফের সাথে ফায়সালা দিয়েছেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ২ اَكَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا اَنۡ اَوۡحَیۡنَاۤ اِلٰی رَجُلٍ مِّنۡهُمۡ اَنۡ اَنۡذِرِ النَّاسَ وَ بَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنَّ لَهُمۡ قَدَمَ صِدۡقٍ عِنۡدَ رَبِّهِمۡ ؕؔ قَالَ الۡكٰفِرُوۡنَ اِنَّ هٰذَا لَسٰحِرٌ مُّبِیۡنٌ ﴿۲﴾
اكان للناس عجبا ان اوحینا الی رجل منهم ان انذر الناس و بشر الذین امنوا ان لهم قدم صدق عند ربهم قال الكفرون ان هذا لسحر مبین ﴿۲﴾

এটা কি মানুষের জন্য আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তির নিকট ওহী প্রেরণ করেছি যে, তুমি মানুষকে সতর্ক কর এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর যে, তাদের রবের নিকট তাদের জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদা। কাফিররা বলে, ‘এ তো স্পষ্ট যাদুকর’। আল-বায়ান

মানুষের কাছে কি এটা আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি তাদেরই মধ্যেকার একজন লোকের কাছে ওয়াহী পাঠিয়েছি যে, লোকদের সতর্ক করে দাও, আর যারা ঈমান আনে তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে মহা মর্যাদা, (কিন্তু) কাফিররা বলে, ‘এ ব্যক্তি তো প্রকাশ্য যাদুকর’। তাইসিরুল

লোকদের জন্য এটা কি বিস্ময়কর মনে হয়েছে যে, আমি তাদের মধ্য হতে একজনের নিকট অহী প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তুমি সকলকে ভয় প্রদর্শন কর এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে এই সুসংবাদ দাও যে, তারা তাদের রবের নিকট পূর্ণ মর্যাদা লাভ করবে। কাফিরেরা বলতে লাগল যে, এ ব্যক্তিতো নিঃসন্দেহে প্রকাশ্য যাদুকর। মুজিবুর রহমান

Have the people been amazed that We revealed [revelation] to a man from among them, [saying], "Warn mankind and give good tidings to those who believe that they will have a [firm] precedence of honor with their Lord"? [But] the disbelievers say, "Indeed, this is an obvious magician." Sahih International

২. মানুষের জন্য এটা কি আশ্চর্যের বিষয় যে, আমরা তাদেরই একজনের কাছে ওহী পাঠিয়েছি এ মর্মে যে, আপনি মানুষকে সতর্ক করুন(১) এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য তাদের রবের কাছে আছে উচ্চ মর্যাদা।(২) কাফিররা বলে, এ তো এক সুস্পষ্ট জাদুকর।

(১) এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা কাফের মুশরিকদের একটি সন্দেহ ও তার উত্তর তুলে ধরেছেন। সন্দেহটি ছিল এই যে, কাফেররা তাদের মূর্খতার দরুন সাব্যস্ত করে রেখেছিল যে, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে যে নবী বা রাসূল আসবেন তিনি মানুষ হবেন না। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাদের এ সন্দেহকে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটা যে শুধু কুরাইশ কাফেরদের সন্দেহ তা নয়। পূর্ববর্তী উম্মতরাও তা বলেছিল। তারা বলেছিল “মানুষই কি আমাদেরকে পথের সন্ধান দেবে?” [সূরা আত-তাগাবুনঃ ৬]

নূহ ও হুদ এর কাওমও এ রকম বিস্মিত হয়েছিল। তখন নবীগণ তার জবাবে বলেছেন, “তোমরা কি বিস্মিত হচ্ছ যে, তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের রবের কাছ থেকে তোমাদের কাছে উপদেশ এসেছে?” [সূরা আল-আরাফঃ ৬৩; ৬৯] অনুরূপভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাওমও বলেছে, “সে কি বহু ইলাহকে এক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? এটা তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার! [সূরা সোয়াদঃ ৫] ইবন আব্বাস বলেন, যখন আল্লাহ্ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রাসূল হিসেবে পাঠালেন তখন আরবরা সেটা মানতে অস্বীকার করেছিল। অথবা তাদের মধ্যে অনেকেই এ জন্য অস্বীকার করেছিল যে, আল্লাহ মহান যে তিনি তাঁর রাসূল বানাবেন মুহাম্মাদের মত একজন মানুষকে। তিনি এটা করতেই পারেন না। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। [ইবন কাসীর]

আল্লাহ তা'আলা তাদের এই ভ্রান্ত ধারণার উত্তর কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রকারে দিয়েছেন। এক আয়াতে বলেছেনঃ “যমীনের উপর যদি ফিরিশতারা বাস করত, তাহলে আমি তাদের জন্য কোন ফিরিশতাকেই রাসূল বানিয়ে পাঠাতাম।” [আল-ইসরাঃ ৯৫] যার মূল কথা হল এই যে, রিসালাতের উদ্দেশ্য ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না রাসূল এবং যাদের মধ্যে রাসূল পাঠানো হচ্ছে এ দুয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকে। বস্তুতঃ ফিরিশতার সম্পর্ক থাকে ফিরিশতাদের সাথে আর মানুষের সম্পর্ক থাকে মানুষের সাথে। যখন মানুষের জন্য রাসূল পাঠানোই উদ্দেশ্য, তখন কোন মানুষকেই রাসূল বানানো উচিত।

(২) এ বাক্যের দ্বারা সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। ইবনে আব্বাস বলেন, এর অর্থ ‘যিকরুল আউয়াল’ তথা লাওহে মাহফুযে তাদের তাকদীরে সৌভাগ্যবান লিখা হয়েছে। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন, তারা যে উত্তম আমল পেশ করেছে সে জন্য উত্তম প্রতিদান রয়েছে। [ইবন কাসীর; সাদী] অতএব, বাক্যের অর্থ দাঁড়ালো এই যে, ঈমানদারদেরকে এ সুসংবাদ দিয়ে দিন যে, তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে অনেক বড় সম্মানিত মর্যাদা রয়েছে যা তারা নিশ্চিতই পাবে এবং পাওয়ার পর কখনো তা শেষ হয়ে যাবে না। চিরকালই তারা সে সম্মানিত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকবেন। এ আয়াতের তাফসীর যদি আমরা কুরআনের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, এর সমার্থে সূরা আল-কাহফের ২-৩ নং আয়াতে এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে, তারা সেখানে সর্বদা অবস্থান করবে। মুজাহিদ বলেন, এর দ্বারা পূর্বে তারা যে আমল করেছে যেমন, তাদের সালাত, সাওম, সাদকা, তাসবীহ ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে। [ইবন কাসীর]

কোন কোন মুফাসসির বলেছেন, এক্ষেত্রে صدق শব্দ প্রয়োগের মাঝে এমন ইশারা করাও উদ্দেশ্য যে, জান্নাতের এসব উচ্চমর্যাদা একমাত্র সত্যনিষ্ঠা ও ইখলাসের কারণেই পাওয়া যাবে। কোন কোন মুফাসসির বলেন এখানে যাবতীয় কল্যাণ উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। মুজাহিদ রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ এখানে (قَدَمَ صِدْقٍ) বলে তাদের সৎকর্মকাণ্ডসমূহকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন, তাদের সালাত, সাওম, সাদকা, তাসবীহ ইত্যাদি। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) লোকদের জন্য এটা কি বিস্ময়কর[1] যে, আমি তাদের মধ্য হতে একজনের নিকট অহী প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তুমি লোকদেরকে সতর্ক কর এবং বিশ্বাসীদেরকে এই সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রতিপালকের নিকট উচ্চ মর্যাদা। [2] অবিশ্বাসীরা বলে, ‘এ ব্যক্তি তো নিঃসন্দেহে প্রকাশ্য যাদুকর।’[3]

[1] এটি বিস্ময়ের জন্য অস্বীকৃতিমূলক জিজ্ঞাসা, যাতে তিরস্কার বা ধমকও শামিল আছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মানব জাতির মধ্য হতে একজনকে রসূল করে প্রেরণ করেছেন; এতে আশ্চর্য হওয়া উচিত নয়। কারণ, রসূল তাদের স্বজাতি হওয়ার কারণে তিনি সঠিকভাবে তাদেরকে পথপ্রদর্শন করতে সক্ষম হবেন। যদি তিনি স্বজাতি না হয়ে ফিরিশতা বা জীন হতেন, তাহলে উভয় অবস্থাতেই রিসালাতের আসল উদ্দেশ্য সাধন হত না। কারণ মানুষ তাঁর সাথে একাত্মতাবোধ না করে ভিন্নতাবোধ করত। দ্বিতীয়ত তারা তাঁকে দেখতেও পেত না। আর যদি কোন জীন অথবা ফিরিশতাকে মানুষরূপে প্রেরণ করতাম, তবে ঐ একই প্রশ্ন আসত যে, এরাও তো আমাদের মতই মানুষ। ফলে তাদের উক্ত বিস্ময়ের কোন অর্থই থাকত না।

[2] قَدَمَ صِدْقٍ এর অর্থ ‘উচ্চ মর্যাদা’ উত্তম প্রতিদান ও ঐ সকল নেক আমল যা একজন মু’মিন তার জীবনে করে থাকে।

[3] কাফেররা মহানবী (সাঃ)-কে অস্বীকার করার যখন কোন পথ পেত না, তখন তারা এই বলে নিজেদেরকে বাঁচাতে চাইত যে, এ তো একজন যাদুকর। (নাউযু বিল্লাহ)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ৩ اِنَّ رَبَّكُمُ اللّٰهُ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ ؕ مَا مِنۡ شَفِیۡعٍ اِلَّا مِنۡۢ بَعۡدِ اِذۡنِهٖ ؕ ذٰلِكُمُ اللّٰهُ رَبُّكُمۡ فَاعۡبُدُوۡهُ ؕ اَفَلَا تَذَكَّرُوۡنَ ﴿۳﴾
ان ربكم الله الذی خلق السموت و الارض فی ستۃ ایام ثم استوی علی العرش یدبر الامر ما من شفیع الا من بعد اذنهٖ ذلكم الله ربكم فاعبدوه افلا تذكرون ﴿۳﴾

নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ। যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, তারপর আরশে উঠেছেন। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন। তার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদাত কর। তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? আল-বায়ান

নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক হলেন আল্লাহ যিনি আকাশমন্ডলী আর পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি যাবতীয় বিষয়াদি পরিচালনা করেন। তাঁর অনুমতি প্রাপ্তি ছাড়া সুপারিশ করার কেউ নেই। ইনিই হলেন আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। কাজেই তোমরা তাঁরই ‘ইবাদাত কর, তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না? তাইসিরুল

নিশ্চয়ই আল্লাহই হচ্ছেন তোমাদের রাব্ব, যিনি আসমানসমূহকে এবং যমীনকে সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হলেন, তিনি প্রত্যেক কাজ পরিচালনা করে থাকেন। তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার কেহ নেই; এমন আল্লাহ হচ্ছেন তোমাদের রাব্ব। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদাত কর; তবুও কি তোমরা বুঝছনা? মুজিবুর রহমান

Indeed, your Lord is Allah, who created the heavens and the earth in six days and then established Himself above the Throne, arranging the matter [of His creation]. There is no intercessor except after His permission. That is Allah, your Lord, so worship Him. Then will you not remember? Sahih International

৩. তোমাদের রব তো আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন(১), তারপর তিনি আরশের উপর উঠলেন(২)। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন।(৩) তার অনুমতি লাভ না করে সুপারিশ করার কেউ নেই(৪)। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব; কাজেই তোমরা তারই ইবাদাত কর(৫)। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?(৬)

(১) এ আয়াতে তাওহীদকে এমন অনস্বীকার্য বাস্তবতার দ্বারা প্রমাণ করা হয়েছে যে, আসমান ও যমীনকে সৃষ্টি করার মধ্যে অতঃপর সমস্ত কাজকর্ম পরিচালনার মধ্যে যখন আল্লাহ তা'আলার কোন শরীক-অংশীদার নেই, তখন ইবাদাত-বন্দেগী এবং হুকুম পালনের ক্ষেত্রে অন্য কেউ কি করে শরীক হতে পারে? বরং এতে (ইবাদাতে) অন্য কাউকে শরীক করা একান্তই অবিচার এবং সীমালঙ্ঘনের শামিল। এ আয়াতে এরশাদ হয়েছে যে, আসমান ও যমীনকে আল্লাহ তা'আলা মাত্র ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। এখানে কি পরিমাণ সময় উদ্দেশ্য তা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন। যদিও কোন কোন মুফাসসির এ দিনগুলোকে আমাদের বর্তমান দিন এর মত মনে করেছেন। কোন কোন মুফাসসির মত প্রকাশ করেছেন যে, এ দিনগুলো অন্য আয়াতে বর্ণিত, একদিন সমান একহাজার বছরের মত। [ইবন কাসীর]

(২) তারপর বলেছেন (ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ) অর্থাৎ আরশের উপর উঠেছেন। কুরআন এবং হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, আল্লাহ্ তা'আলার আরশ এক প্রকাণ্ড সৃষ্টি আর তা সমস্ত সৃষ্টিজগতের ছাদস্বরূপ। আল্লাহ্ তা'আলা তার আরশের উপর উঠা বাস্তব বিষয়। এটা আল্লাহর একটি মহান কার্যগত গুণ। তিনি যে রকম তার আরশের উপর উঠাও সেরকম। আমরা তার আরশের উপর উঠা কথাটা বুঝি তবে সে উঠার ধরণ আমরা জানিনা। আল্লাহর আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা সূরা আল-বাকারায় করা হয়েছে।

(৩) সৃষ্টিজগতের যাবতীয় কর্মকাণ্ড তিনিই পরিচালনা করেন। “আসমানও যমীনের অণু পরিমান বস্তুও তাঁর জ্ঞানের বাইরে নেই।” [সাবাঃ ৩] কোন ব্যাপারে মনযোগ দিতে গিয়ে অন্য ব্যাপার তাঁর বাধা হয় না। [বুখারী] অগণিত আবেদনকারীর আবেদন তাঁর জন্য কোন সমস্যা সৃষ্টি করে না। চাওয়ার প্রচণ্ডতায় তিনি বিরক্ত হোন না। বৃহৎ কর্মকাণ্ডগুলো পরিচালনা করতে গিয়ে ছোট ছোট বস্তুগুলো তার খেয়ালচ্যুত হয়না। চাই তা সমুদ্রে বা পাহাড়ে বা জনবসতিপূর্ণ এলাকা যেখানেই হোক না কেন। [এ ব্যাপারে আরো দেখুনঃ সূরা হুদঃ ৬, সূরা আল-আনআমঃ ৫৯]

(৪) অর্থাৎ দুনিয়ার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অন্য কারোর হস্তক্ষেপ করা তো দূরের কথা, কারো আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে তাঁর কোন ফায়সালা পরিবর্তন করার অথবা করো ভাগ্য ভাঙা-গড়ার ইখতিয়ারও নেই। বড়জোর সে আল্লাহর কাছে দোআ করতে পারে। কিন্তু তার দোআ কবুল হওয়া না হওয়া পুরোপুরি আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহর এ একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার রাজ্যে নিজের কথা নিশ্চিতভাবে কার্যকর করিয়ে নেবার মতো শক্তিধর কেউ নেই। এমন শক্তি কারোর নেই যে, তার সুপারিশকে প্রত্যাখ্যাত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে। এ সুপারিশের বিষয়টি আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করেছেন। [দেখুনঃ সূরা আল-বাকারাহঃ ২৫৫, সূরা আন-নাজমঃ ২৬, সূরা সাবাঃ ২৩]

(৫) উপরের তিনটি বাক্যে প্রকৃত সত্য বর্ণনা করা হয়েছিল, অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তোমাদের রব। এখন বলা হচ্ছে, এ প্রকৃত সত্যের উপস্থিতিতে তোমাদের কোন ধরনের কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত। মূলত রবুবীয়াত তথা বিশ্ব-জাহানের সার্বভৌম ক্ষমতা, নিরংকুশ কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব যখন পরোপুরি আল্লাহর আয়ত্বাধীন তখন এর অনিবার্য দাবী স্বরুপ মানুষকে তাঁরই বন্দেগী করতে হবে। [ইবন কাসীর] অন্য আয়াতেও আল্লাহ তা'আলা সেটা বলেছেন, তিনি বলেন, “আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ। অতঃপর তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে? [সূরা আয-যুখরুফঃ ৮৭) আরও বলেন, “বলুন, সাত আসমান ও মহা-আরশের রব কে? অবশ্যই তারা বলবে, ‘আল্লাহ। বলুন, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না? [সূরা আল-মুমিনুন: ৮৬-৮৭] তাছাড়া সূরা ইউনুসের এ আয়াতের আগের ও পরের আয়াতেও একই বক্তব্য এসেছে।

(৬) অর্থাৎ যখন এ সত্য তোমাদের সামনে প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে এবং তোমাদের পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এ সত্যের উপস্থিতিতে তোমাদের কি কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে তখন এরপরও কি তোমাদের চোখ খুলবে না এবং তোমরা এমন বিভ্রান্তির মধ্যে ডুবে থাকবে? তোমরা কি তোমাদের অস্বীকার ও গোড়ামীতেই রত থাকবে যে তোমরা মোটেই উপদেশ গ্রহণ করবে না? [আইসারুত তাফাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩) নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন,[1] তিনি প্রত্যেক কাজ পরিচালনা করে থাকেন।[2] তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশকারী কেউ নেই।[3] ঐ (স্রষ্টা ও পরিচালক) আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর।[4] তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?

[1] বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন সূরা আ’রাফের ৫৪নং আয়াতের টীকা।

[2] অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করে তিনি এমনিই ছেড়ে দেননি, বরং সারা বিশ্ব-জাহানকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন যে, কখনো পরস্পরের মাঝে কোন সংঘর্ষ হয় না। সকল বস্তু তাঁরই নির্দেশে নিজ নিজ কর্মে রত আছে।

[3] মুশরিক ও কাফের - যারা এখানে সম্বোধিত - তাদের বিশ্বাস ছিল যে, যে সকল মূর্তির তারা উপাসনা করে, তারা আল্লাহর নিকট তাদের জন্য সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, সেখানে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। আর এই অনুমতিও একমাত্র তাদের জন্য দেওয়া হবে, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করবেন। الأنبياء-২৮  (وَلاَ يَشفَعُونَ إِلاَّ لِمَن ارتَضَى)

النجم-২৬) (لا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى)

[4] অর্থাৎ এমন আল্লাহ যিনি বিশ্ব-জগতের স্রষ্টা এবং তার পরিচালক ও ব্যবস্থাপক। এ ছাড়া সমস্ত এখতিয়ারের পরিপূর্ণ মালিক একমাত্র তিনিই। ফলে একমাত্র তিনিই উপাসনা পাওয়ার যোগ্য।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ৪ اِلَیۡهِ مَرۡجِعُكُمۡ جَمِیۡعًا ؕ وَعۡدَ اللّٰهِ حَقًّا ؕ اِنَّهٗ یَبۡدَؤُا الۡخَلۡقَ ثُمَّ یُعِیۡدُهٗ لِیَجۡزِیَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ بِالۡقِسۡطِ ؕ وَ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا لَهُمۡ شَرَابٌ مِّنۡ حَمِیۡمٍ وَّ عَذَابٌ اَلِیۡمٌۢ بِمَا كَانُوۡا یَكۡفُرُوۡنَ ﴿۴﴾
الیه مرجعكم جمیعا وعد الله حقا انهٗ یبدؤا الخلق ثم یعیدهٗ لیجزی الذین امنوا و عملوا الصلحت بالقسط و الذین كفروا لهم شراب من حمیم و عذاب الیم بما كانوا یكفرون ﴿۴﴾

তাঁরই কাছে তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন। আল্লাহর ওয়াদা সত্য। নিশ্চয় তিনি সৃষ্টির সূচনা করেন। তারপর তার পুনরাবর্তন ঘটান। যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদেরকে ইনসাফপূর্ণ প্রতিদান দেয়ার জন্য। আর যারা কুফরী করেছে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তপ্ত পানীয় এবং বেদনাদায়ক আযাব। এ কারণে যে তারা কুফরী করত। আল-বায়ান

তাঁর কাছেই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন। আল্লাহর ওয়া‘দা নিশ্চিত সত্য। তিনি সৃষ্টির সূচনা করেন, পরে তিনিই আবার সৃষ্টি করবেন যাতে তিনি- যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে- তাদেরকে পূর্ণ ইনসাফের সাথে প্রতিদান দিতে পারেন। আর যারা কুফুরী করেছে তাদের জন্য আছে অতি উত্তপ্তপানীয় ও বেদনা দায়ক শাস্তি, যেহেতু তারা সত্য প্রত্যাখ্যান করত। তাইসিরুল

তোমাদের সকলকে তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে, আল্লাহর ও‘য়াদা সত্য; নিশ্চয়ই তিনিই প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনিই পুনর্বার সৃষ্টি করবেন, যাতে এরূপ লোকদের যারা ঈমান এনেছে এবং ভাল কাজ করেছে তাদেরকে ইনসাফ মত প্রতিফল প্রদান করেন; আর যারা অবিশ্বাসী তারা পান করার জন্য পাবে উত্তপ্ত পানি এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি তাদের কুফরীর কারণে। মুজিবুর রহমান

To Him is your return all together. [It is] the promise of Allah [which is] truth. Indeed, He begins the [process of] creation and then repeats it that He may reward those who have believed and done righteous deeds, in justice. But those who disbelieved will have a drink of scalding water and a painful punishment for what they used to deny. Sahih International

৪. তারই কাছে তোমাদের সকলের ফিরে যাওয়া(১); আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য।(২) সৃষ্টিকে তিনিই প্রথম অস্তিত্বে আনেন, তারপর সেটার পুনরাবৃত্তি ঘটাবেন(৩) যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদেরকে ইনসাফপূর্ণ প্রতিফল প্রদানের জন্য। আর যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য রয়েছে অত্যন্ত গরম পানীয়(৪) ও অতীব কষ্টদায়ক শাস্তি; কারণ তারা কুফরী করত।

(১) অর্থাৎ তোমাদের এ দুনিয়া থেকে ফিরে গিয়ে নিজেদের রবের কাছে হিসেব দিতে হবে। সে সুনির্দিষ্ট সময়ে তিনি তোমাদের সবাইকে একত্রিত কববেন। [ইবন কাসীর; সা’দী]

(২) এ আয়াতে সমগ্র সৃষ্টিজগতের বহু নিদর্শন উল্লেখিত হয়েছে, যা আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ কুদরত ও পরিপূর্ণ হেকমতের স্বাক্ষর বহন করে এবং এ দাবী প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা সৃষ্টিকে ধ্বংস করে গুড়িয়ে দিতে সক্ষম এবং পরে পুনরায় সেই কণাসমূহকে একত্রিত করে একেবারে নতুন অবস্থায় জীবিত করে হিসাব-নিকাশের পর পুরস্কার কিংবা শাস্তির আইন জারি করবেন। কুরাইশ কাফেরদের অধিকাংশই আল্লাহকে তাদের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মানত। তাই আল্লাহ তা'আলা এর দ্বারাই তাদের উপর দলীল নিচ্ছেন যে, যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করতে পারেন তিনি অবশ্যই ধ্বংসের পর দ্বিতীয়বার সেটাকে অস্তিত্বে আনতে সক্ষম। [কুরতুবী] আর এটা তার ওয়াদা। এ ওয়াদা তিনি অবশ্যই পূরণ করবেন। কারণ, এর মাধ্যমে তিনি যারা হৃদয় দিয়ে ঈমান এনেছে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে ওয়াজিব ও মুস্তাহাব পালন করে নেক আমল করেছে, তাদেরকে প্রতিফল দিবেন। [সা'দী]। আর যারা কুফরী করবে তাদেরকেও তাদের কুফরীর কারণে তিনি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিবেন।

(৩) এ বাক্যটির মধ্যে দাবী ও প্রমাণ উভয়েরই সমাবেশ ঘটেছে। দাবী হচ্ছে, আল্লাহ পুনর্বার মানুষকে সৃষ্টি করবেন। এর প্রমাণ হিসেবে বলা হয়েছে, তিনিই প্রথমবার মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আর যে ব্যক্তি একথা স্বীকার করে যে, আল্লাহই সৃষ্টির সূচনা করেছেন। সে কখনো আল্লাহর পক্ষে এ সৃষ্টির পুনরাবৃত্তিকে অসম্ভব বা দুর্বোধ্য মনে করতে পারে না। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যেভাবে আমরা প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব; এটা আমার কৃত প্রতিশ্রুতি, আর আমরা তা পালন করবই।” [সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৪]

(৪) এ অত্যন্ত গরম পানীয় কাফেরদের জন্য শাস্তি স্বরূপ থাকবে। এ প্রচণ্ড গরম পানীয়ের বিভিন্ন গুণাগুণ অন্যান্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। সূরা আর-রাহমানের ৪৪ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ “তারা জাহান্নামের আগুন ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটোছুটি করবে” আবার কোথাও বলা হয়েছেঃ “এবং যাদেরকে পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি যা তাদের নাড়ীভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে?”। [সূরা মুহাম্মাদঃ ১৫] আরো বলা হয়েছে “তাদের মাথার উপর ঢেলে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি, যা দ্বারা তাদের উদরে যা আছে তা এবং তাদের চামড়া বিগলিত করা হবে।” [সূরা আল-হাজ্জঃ ১৯–২০]

অন্য আয়াতে বলা হয়েছেঃ “তারা পানীয় চাইলে তাদেরকে দেয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয়, যা তাদের মুখমন্ডল দগ্ধ করবে।” [সূরা আল-কাহফঃ ২৯] আরো বলা হয়েছেঃ “তারপর তোমরা পান করবে তার উপর অতি উষ্ণ পানি, ফলে তারা পান করবে তৃষ্ণার্ত উটের ন্যায়।” [সূরা আল-ওয়াকি'আহঃ ৫৪–৫৫] কুরআনের কোন কোন আয়াতে এ গরম পানিকে পুঁজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, বলা হয়েছেঃ “এবং পান করানো হবে গলিত পুঁজ; যা সে অতি কষ্টে একেক ঢোক করে গিলবে এবং তা গিলা প্রায় সহজ হবে না।” [সূরা ইবরাহীমঃ ১৬–১৭] আবার কোন কোন স্থানে বলা হয়েছে যে, তাদের জন্য সমভাবে গরম পানীয় ও পুঁজ উভয়টিই থাকবে, “কাজেই তারা আস্বাদন করুক ফুটন্ত পানি ও পুঁজ”। [সূরা সোয়াদঃ ৫৭] আরো এসেছেঃ “সেখানে তারা আস্বাদন করবে না শীত, না কোন পানীয়, ফুটন্ত পানি ও পুজ ছাড়া।” [সূরা আন-নাবা ২৪–২৫]।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) তোমাদের সকলকে তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য; নিশ্চয় তিনিই প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনিই পুনর্বারও সৃষ্টি করবেন, যাতে তাদেরকে ইনসাফ মত প্রতিফল প্রদান করেন যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে। আর যারা কুফরী করেছে তারা তাদের আচরিত কুফরীর ফলে পান করার জন্য পাবে উত্তপ্ত পানি এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [1]

[1] এই আয়াতে কিয়ামত সংঘটন, আল্লাহর নিকট সকলের উপস্থিতি এবং উত্তম প্রতিদান ও শাস্তির বর্ণনা আছে। উক্ত বিষয় কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ভাবে বর্ণিত হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ৫ هُوَ الَّذِیۡ جَعَلَ الشَّمۡسَ ضِیَآءً وَّ الۡقَمَرَ نُوۡرًا وَّ قَدَّرَهٗ مَنَازِلَ لِتَعۡلَمُوۡا عَدَدَ السِّنِیۡنَ وَ الۡحِسَابَ ؕ مَا خَلَقَ اللّٰهُ ذٰلِكَ اِلَّا بِالۡحَقِّ ۚ یُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ ﴿۵﴾
هو الذی جعل الشمس ضیآء و القمر نورا و قدرهٗ منازل لتعلموا عدد السنین و الحساب ما خلق الله ذلك الا بالحق یفصل الایت لقوم یعلمون ﴿۵﴾

তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় এবং চাঁদকে আলোময় আর তার জন্য নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মনযিল, যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা এবং (সময়ের) হিসাব। আল্লাহ এগুলো অবশ্যই যথার্থভাবে সৃষ্টি করেছেন। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন। আল-বায়ান

তিনি সূর্যকে করেছেন তেজোদীপ্ত, আর চন্দ্রকে করেছেন আলোকময় আর তার (হ্রাস বৃদ্ধির) মানযিলসমূহ সঠিকভাবে নির্ধারণ করেছেন যাতে তোমরা বৎসর গুণে (সময়ের) হিসাব রাখতে পার। আল্লাহ এটা অনর্থক সৃষ্টি করেননি, তিনি নিদর্শনগুলোকে বিশদভাবে বর্ণনা করেন জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য। তাইসিরুল

আল্লাহ এমন, যিনি সূর্যকে দীপ্তিমান এবং চাঁদকে আলোকময় বানিয়েছেন এবং ওর (গতির) জন্য মানযিলসমূহ নির্ধারিত করেছেন যাতে তোমরা বছরসমূহের সংখ্যা ও হিসাব জানতে পার; আল্লাহ এসব বস্তু অযথা সৃষ্টি করেননি, তিনি এই প্রমাণসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন ঐসব লোকের জন্য যারা জ্ঞানবান। মুজিবুর রহমান

It is He who made the sun a shining light and the moon a derived light and determined for it phases - that you may know the number of years and account [of time]. Allah has not created this except in truth. He details the signs for a people who know Sahih International

৫. তিনিই সূর্যকে দীপ্তিময় ও চাঁদকে আলোকময় করেছেন এবং তার জন্য মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার। আল্লাহ এগুলোকে যথাযথ ভাবেই সৃষ্টি করেছেন।(১) তিনি এসব নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা জানে।

(১) অর্থাৎ তিনি এগুলো অনাহুত সৃষ্টি করেননি বরং তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞাময়, তাঁর প্রত্যেকটি কাজই প্রজ্ঞায় পূর্ণ। আসমান ও যমীন সৃষ্টির মাঝে কোন হেকমত নেই এমন কথা শুধুমাত্র কাফেররাই বলতে পারে। [এ ব্যাপারে আরো দেখুন, সূরা সোয়াদঃ ২৭, সূরা আল-মূমিনূনঃ ১১৫–১১৬]।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫) তিনিই সেই সত্তা যিনি সূর্যকে দীপ্তিমান ও চন্দ্রকে আলোকময় বানিয়েছেন[1] এবং ওর (গতির) জন্যে কক্ষসমূহ নির্ধারিত করেছেন, যাতে তোমরা বছরসমূহের সংখ্যা ও (সময়ের) হিসাব জানতে পার।[2] আল্লাহ এসব বস্তু অযথা সৃষ্টি করেননি, তিনি জ্ঞানবান সম্প্রদায়ের জন্য এই সমস্ত নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন।

[1] ضِيَآءٌ , ضُوْءٌ সমার্থবোধক শব্দ। এখানে ‘মুযাফ’ (সম্বন্ধপদের প্রথমাংশ) উহ্য আছে; অর্থাৎ, ذات ضياء والقمر ذا نور ‘‘সূর্যকে দীপ্তিমান এবং চন্দ্রকে আলোময় বানিয়েছেন।’’ অথবা তাকে অতিশয়োক্তি বলে ধরা হবে; অর্থাৎ ঠিক যেন তা নিজেই প্রদীপ্ত ও আলো। আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তার পরিচালনার কথা বর্ণনার পর উদাহরণ স্বরূপ আরো কিছু বস্তুর বর্ণনা করা হচ্ছে, যা বিশ্ব-পরিচালনার অন্তর্ভুক্ত। তার মধ্যে সূর্য ও চন্দ্র অধিক গুরুতত্ত্বপূর্ণ। সূর্যের তাপ ও তার আলোর প্রয়োজনীয়তা প্রত্যেকেই জানে। অনুরূপ চন্দ্রের মৃদু জ্যোৎস্নালোকের যে মধুরতা ও উপকারিতা আছে, তাও বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। বৈজ্ঞানিকদের মতে সূর্যের নিজস্ব আলো আছে আর চন্দ্রের নিজস্ব আলো নেই বরং সূর্যের আলো থেকে আলো গ্রহণ করে থাকে। (ফাতহুল কাদীর) والله أعلم بالصواب

[2] অর্থাৎ আমি চন্দ্র পরিভ্রমণের কক্ষপথ নির্ধারণ করে দিয়েছি। কক্ষপথ বলতে তার ঐ পরিভ্রমণপথকে বুঝায়, যা চাঁদ এক দিন ও এক রাত্রে তার বিশেষ পরিক্রমণ দ্বারা অতিক্রম করে। উক্ত কক্ষ হল আটাশটি। প্রত্যেক রাত্রে একটি কক্ষ সমাপ্ত করে, তাতে কখনো কোন ব্যতিক্রম হয় না। প্রথম কক্ষগুলিতে চাঁদকে ছোট ও সরু দেখা যায়। তারপর ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এমন কি চৌদ্দ রাত্রি বা চৌদ্দতম কক্ষে গিয়ে তা পূর্ণ (পূর্ণিমার) চন্দ্র রূপে প্রকাশ হয়। তার পর পুনরায় ছোট ও সরু হতে আরম্ভ করে, এমনকি শেষে এক বা দুই রাত্রি লুক্কায়িত থাকে এবং পরে প্রথম দিনের ক্ষীণচন্দ্র রূপে উদিত হয়। চন্দ্রের উপকারিতা এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, ‘‘যাতে তোমরা বছরের গণনা ও সময়ের হিসাব করতে পার।’’ অর্থাৎ চন্দ্রের সেই কক্ষপথ ও গতি দ্বারাই মাস ও বছর গণনা হয়, যার দ্বারা তোমাদের সকল বস্তুর হিসাব রাখা সহজ হয়। অর্থাৎ বছর বার মাসের, মাস উনত্রিশ বা ত্রিশ দিনের, দিবারাত্রি চবিবশ ঘণ্টার, সমান সমান দিন হলে বার ঘণ্টা করে এবং শীত ও গ্রীষ্মকালে কমবেশি হয়ে থাকে। তাছাড়া পার্থিব উপকার ও কাজ-কারবার শুধু সেই চন্দ্রের কক্ষপথের সাথে সম্পৃক্ত নয়; বরং তাতে দ্বীনী লাভও অর্জন হয়। নতুন চাঁদ দ্বারা হজ্জ, রমযানের রোযা, নিষিদ্ধ মাস এবং অন্যান্য ইবাদতের সময়কাল নির্দিষ্ট করা হয়, প্রত্যেক মু’মিন তার গুরুতত্ত্ব দিয়ে থাকে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ৬ اِنَّ فِی اخۡتِلَافِ الَّیۡلِ وَ النَّهَارِ وَ مَا خَلَقَ اللّٰهُ فِی السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَّقُوۡنَ ﴿۶﴾
ان فی اختلاف الیل و النهار و ما خلق الله فی السموت و الارض لایت لقوم یتقون ﴿۶﴾

নিশ্চয় রাত ও দিবসের বিবর্তনে এবং আসমানসমূহ ও যমীনে যা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, তাতে বহু নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে। আল-বায়ান

নিশ্চয়ই রাত ও দিনের আবর্তনে, আর আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মাঝে আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন তাতে মুত্তাকী সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। তাইসিরুল

নিঃসন্দেহে রাত ও দিনের পরিবর্তনের মধ্যে এবং আল্লাহ যা কিছু আসমানসমূহে ও যমীনে সৃষ্টি করেছেন তৎসমুদয়ের মধ্যে প্রমাণসমূহ রয়েছে ঐ লোকদের জন্য যারা আল্লাহর ভয় পোষণ করে। মুজিবুর রহমান

Indeed, in the alternation of the night and the day and [in] what Allah has created in the heavens and the earth are signs for a people who fear Allah Sahih International

৬. নিশ্চয় দিন ও রাতের পরিবর্তনে এবং আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনে যা সৃষ্টি করেছেন(১) তাতে নিদর্শন রয়েছে এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে।

(১) আসমান ও যমীনে আল্লাহ্ তা'আলা যা সৃষ্টি করেছেন তাতে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, সেগুলো আল্লাহরই মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করছে। কুরআনের অন্যান্য আয়াতেও আল্লাহ্ তা'আলা এ বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। যেমন, সূরা ইউসুফঃ ১০৫, সূরা ইউনুসঃ ১০১, সূরা সাবাঃ ৯, সূরা আলে ইমরানঃ ১৯০। এগুলোর পরিবর্তনের অর্থ, একটির পর অপরটি এমনভাবে আসা তাদের সুনির্দিষ্ট নিয়মের কোন ব্যঘাত ঘটে না। [ইবন কাসীর] এ ব্যাপারে সূরা আল-আরাফ এর ৫৪, সূরা ইয়াসীন এর ৪০ নং এবং সূরা আল-আন’আমের ৯৬ নং আয়াতেও চাঁদ ও সূর্যের নিয়মানুবর্তিতার কথা বর্ণিত হয়েছে। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) নিঃসন্দেহে রাত্রি ও দিবসের পরিবর্তনের মধ্যে এবং আল্লাহ যা কিছু আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে সাবধানী সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ৭ اِنَّ الَّذِیۡنَ لَا یَرۡجُوۡنَ لِقَآءَنَا وَ رَضُوۡا بِالۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَ اطۡمَاَنُّوۡا بِهَا وَ الَّذِیۡنَ هُمۡ عَنۡ اٰیٰتِنَا غٰفِلُوۡنَ ۙ﴿۷﴾
ان الذین لا یرجون لقآءنا و رضوا بالحیوۃ الدنیا و اطمانوا بها و الذین هم عن ایتنا غفلون ﴿۷﴾

নিশ্চয় যারা আমার সাক্ষাতের আশা রাখে না এবং দুনিয়ার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট আছে ও তা নিয়ে পরিতৃপ্ত রয়েছে। আর যারা আমার নিদর্শনাবলী হতে গাফেল । আল-বায়ান

যারা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের আশা রাখে না, এবং দুনিয়ার জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে আর তাতেই নিশ্চিন্ত হয় এবং যারা আমার নিদর্শনগুলো হতে একেবারে উদাসীন, তাইসিরুল

যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা পোষণ করেনা এবং পার্থিব জীবনেই পরিতৃপ্ত এবং এতেই নিশ্চিন্ত থাকে এবং যারা আমার নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে গাফিল । মুজিবুর রহমান

Indeed, those who do not expect the meeting with Us and are satisfied with the life of this world and feel secure therein and those who are heedless of Our signs Sahih International

৭. নিশ্চয় যারা আমাদের সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না, দুনিয়ার জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট হয়েছে এবং এতেই পরিতৃপ্ত থাকে(১), আর যারা আমাদের নিদর্শনাবলী সম্পর্কে গাফিল,

(১) কাতাদা বলেন, দুনিয়াদারদের তুমি দেখবে যে, তারা দুনিয়ার জন্যই খুশী হয়, দুনিয়ার জন্যই চিন্তিত হয়, দুনিয়ার জন্যই চিন্তিত হয়, দুনিয়ার জন্যই অসন্তুষ্ট হয় আর দুনিয়ার জন্যই সন্তুষ্ট হয়। [তাবারী] এ আয়াতে জাহান্নামের অধিবাসীদের বিশেষ লক্ষণসমূহ বর্ণনা করা হচ্ছে। প্রথমতঃ তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আশা করে না, বিশ্বাসও করে না। দ্বিতীয়তঃ তারা আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবন ও তার অনন্ত-অসীম সুখ-দুঃখের কথা ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে গেছে। তৃতীয়তঃ পৃথিবীতে তারা এমন নিশ্চিত হয়ে বসেছে যেন এখান থেকে আর কোথাও তাদের যেতেই হবে না; চিরকালই যেন এখানে থাকবে। কখনো তাদের একথা মনে হয় না যে, এ পৃথিবী থেকে প্রত্যেকটি লোকের বিদায় নেয়া এমন বাস্তব বিষয় যে, এতে কখনো কোন সন্দেহ হতে পারে না।

তাছাড়া এখান থেকে নিশ্চিতই যখন যেতে হবে, তখন যেখানে যেতে হবে, সেখানকার জন্যও তো খানিকটা প্রস্তুতি নেয়া কর্তব্য ছিল। চতুর্থতঃ এসব লোক আমার নিদর্শনাবলী ও আয়াতসমূহের প্রতি ক্রমাগত গাফিলতী করে চলেছে। সুতরাং এরা না আল্লাহর কুরআনের আয়াত দ্বারা উপকৃত হয়, না আসমান-যমীন কিংবা এ দুয়ের মধ্যবর্তী কোন সাধারণ সৃষ্টি অথবা নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটুও চিন্তা-ভাবনা করে। তাই তাদের ঠিকানা, অবস্থান ও বাসস্থান হবে জাহান্নাম যেখান থেকে তারা আর কোথাও যেতে বা পালাতে পারবে না। কারণ তারা কুফরী, শির্ক ও বিভিন্ন প্রকার পাপের মাধ্যমে তাই অর্জন করেছে। [সা'দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭) যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না এবং পার্থিব জীবন নিয়েই পরিতৃপ্ত থাকে এবং এতেই যারা নিশ্চিন্ত থাকে এবং যারা আমার নিদর্শনাবলী সম্বন্ধে উদাসীন;

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ৮ اُولٰٓئِكَ مَاۡوٰىهُمُ النَّارُ بِمَا كَانُوۡا یَكۡسِبُوۡنَ ﴿۸﴾
اولٓئك ماوىهم النار بما كانوا یكسبون ﴿۸﴾

তারা যা উপার্জন করত, তার কারণে আগুনই হবে তাদের ঠিকানা। আল-বায়ান

তাদের আবাস হল জাহান্নাম তাদের কৃতকর্মের কারণে। তাইসিরুল

এইরূপ লোকদের ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম, তাদের কার্যকলাপের কারণে। মুজিবুর রহমান

For those their refuge will be the Fire because of what they used to earn. Sahih International

৮. তাদেরই আবাস আগুন; তাদের কৃতকর্মের জন্য।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮) এই লোকদের নিজেদের কৃতকর্মের ফলে ঠিকানা হবে জাহান্নাম।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ৯ اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ یَهۡدِیۡهِمۡ رَبُّهُمۡ بِاِیۡمَانِهِمۡ ۚ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِهِمُ الۡاَنۡهٰرُ فِیۡ جَنّٰتِ النَّعِیۡمِ ﴿۹﴾
ان الذین امنوا و عملوا الصلحت یهدیهم ربهم بایمانهم تجری من تحتهم الانهر فی جنت النعیم ﴿۹﴾

নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে, তাদের রব ঈমানের কারণে তাদেরকে পথ দেখাবেন, আরামদায়ক জান্নাতসমূহে যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। আল-বায়ান

যারা ঈমান আনে আর সৎ ‘আমাল করে, তাদের প্রতিপালক তাদের ঈমানের বদৌলতে তাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করবেন। নি‘মাতরাজি দ্বারা পরিপূর্ণ জান্নাতে, তাদের পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং ভাল কাজ করেছে, তাদের রাব্ব তাদেরকে লক্ষ্য স্থলে (জান্নাতে) পৌঁছে দিবেন তাদের ঈমানের কারণে, শান্তির উদ্যানসমূহে, তাদের (বাসস্থানের) তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ বইতে থাকবে। মুজিবুর রহমান

Indeed, those who have believed and done righteous deeds - their Lord will guide them because of their faith. Beneath them rivers will flow in the Gardens of Pleasure Sahih International

৯. নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের রব তাদের ঈমান আনার কারণে তাদেরকে পথ নির্দেশ করবেন(১); নিয়ামতে ভরপুর জান্নাতে তাদের পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে।(২)

(১) আয়াতে (بِإِيمَانِهِمْ) শব্দের সাথে যে ب হরফটি ব্যবহৃত হয়েছে, তার দুটি অর্থ হতে পারে- (এক) কারণে। তখন আয়াতের অর্থ হবে- যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদেরকে তাদের প্রভু ঈমানের কারণে মহাপুরষ্কারের ব্যবস্থা করবেন। তিনি তাদেরকে হিদায়াত দিবেন। তিনি তাদেরকে তাদের জন্য যা উপকারী তা শিক্ষা দিবেন। হিদায়াতের কারণে তারা ভালো আমল করার তৌফিক লাভ করবেন, তারা আল্লাহর আয়াত ও নিদর্শনসমূহে দৃষ্টি দিতে পারবেন। এ দুনিয়াতে সৎপথে পরিচালিত করবেন। হিদায়াতুল মুস্তাকীম নসীব করবেন আর আখেরাতে পুল-সিরাতের পথে তাদের পরিচালিত করবেন যাতে তারা জান্নাতে পৌছতে পারে। [সা’দী] (দুই) সাহায্যে বা দ্বারা। [কাশশাফ; ইবন কাসীর] মুজাহিদ রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ তাদের জন্য আলোর ব্যবস্থা করবেন ফলে তারা সে আলোকে আলোকিত হয়ে পথ চলতে পারবে। [তাবারী] অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনও তাদের আলোকিত হবে। তারা তাদের জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে জানা থাকার কারণে অন্ধকারে হাতিয়ে বেড়াবে না। তাদের জীবন হবে আলোকিত জীবন। [দেখুনঃ সূরা আল-আনআমঃ ১২২, সূরা আশ-শুরাঃ ৫২, সূরা আল হাদীদঃ ২৮]

আর আখেরাতের জীবনেও তারা তাদের প্রভুর যাবতীয় কল্যাণ লাভে সামর্থ হবেন। পুলসিরাতেও তাদের আলোর ব্যবস্থা থাকবে। যাবতীয় সংকটময় মুহুর্তে তাদের প্রভু তাদের পথ দেখানোর ব্যবস্থা করবেন। [দেখুনঃ সূরা আল-হাদীদঃ ১৩] কাতাদা ও ইবন জুরাইজ বলেন, তার আমল তার জন্য সুন্দর সূরত ও সুগন্ধিযুক্ত বাতাসের রূপ ধারণ করে যখন সে কবর থেকে উঠবে তখন তার সম্মুখীন হয়ে তাকে যাবতীয় কল্যাণের সুসংবাদ জানাবে। সে তখন তাকে বলবে, তুমি কে? সে বলবে, আমি তোমার আমল। তখন তার সামনে আলোর ব্যবস্থা করবে যতক্ষণ না সে জান্নাতে প্রবেশ করায়। আর এটাই এ আয়াতের অর্থ। পক্ষান্তরে কাফেরের জন্য তার আমল কুৎসিত সূরত ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে আসবে এবং তার সার্বক্ষণিক সাথী হবে যতক্ষণ না সে তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাচ্ছে। [তাবারী; ইবন কাসীর]

(২) যদি কেউ প্রশ্ন করে, কিভাবে বলা হল যে, তাদের নিচ দিয়ে নালাসমূহ প্রবাহিত হবে, আর আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের সবখানেই জান্নাতের এ নালাসমূহকে বাগানের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কথা জানিয়েছে, এটা তো সম্ভব শুধু এক অবস্থায়, সেটা হচ্ছে, তারা যমীনের উপরে থাকবে, আর নালাসমূহ থাকবে যমীনের নীচ দিয়ে? এটা তো জান্নাতের নালাসমূহের বৈশিষ্ট্য নয়। কারণ, সেগুলো প্রবাহিত হবে যমীনের মধ্যে কোন প্রকার গর্ত না করে? উত্তর হচ্ছে, এ অর্থ নেয়াটা শুদ্ধ নয়। বরং নিচে দিয়ে নালা প্রবাহিত হওয়ার অর্থ তাদের নিকট দিয়ে প্রবাহিত হওয়া। তাদের সামনে দিয়ে নে'আমতপূর্ণ বাগানসমূহে।

এর অনুরূপ কথা আল্লাহ্ তা'আলা মারইয়ামকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, “অবশ্যই তোমার রব তোমার নিচ দিয়ে প্রস্রবণ প্রবাহিত করেছেন।” [সূরা মারইয়াম: ২৪] আর এটা জানা কথা যে, সে প্রস্রবণটি মারইয়ামের বসার নিচে ছিল না। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে যে, তার নিকটে। তার সামনে। অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা'আলা ফিরআউনের ভাষণ সম্পর্কে বলেছেন, সে বলেছিল: “মিসরের রাজত্ব কি আমার নয়? আর এ নালাসমূহ কি আমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত নয়?” [সূরা আয-যুখরুফ ৫১] এখানে নিচ দিয়ে অর্থ, কাছে বা সামনে। [তাবারী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯) নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাস করেছে এবং ভাল কাজ করেছে, তাদের প্রতিপালক তাদের বিশ্বাসের কারণে তাদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন,[1] শান্তির উদ্যানসমূহে তাদের (বাসস্থানের) তলদেশ দিয়ে নদীমালা প্রবাহিত থাকবে।

[1] এর দ্বিতীয় অর্থ এই করা হয়েছে যে, পৃথিবীতে ঈমান আনার কারণে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা মু’মিনদের জন্য পুলস্বিরাত পার হওয়া সহজ করে দেবেন। এই অর্থে بإيمانهم এ بـ (সাবাবিয়্যাহ) কারণ বর্ণনার জন্য ব্যবহার হয়েছে। কোন কোন তফসীরবিদের মতে তা ‘ইস্তিআনাহ’ (সাহায্যের) অর্থে ব্যবহার হয়েছে। আর তার অর্থ হবে যে, তাদের প্রতিপালক তাদের বিশ্বাস ও ঈমানের সাহায্যে তাদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাদের জন্য এমন আলোর ব্যবস্থা করবেন, যার সাহায্যে তারা চলাফেরা করবে; যেমন সূরা হাদীদে (১২নং আয়াতে) এর বর্ণনা এসেছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ১০ دَعۡوٰىهُمۡ فِیۡهَا سُبۡحٰنَكَ اللّٰهُمَّ وَ تَحِیَّتُهُمۡ فِیۡهَا سَلٰمٌ ۚ وَ اٰخِرُ دَعۡوٰىهُمۡ اَنِ الۡحَمۡدُ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۱۰﴾
دعوىهم فیها سبحنك اللهم و تحیتهم فیها سلم و اخر دعوىهم ان الحمد لله رب العلمین ﴿۱۰﴾

সেখানে তাদের কথা হবে, ‘হে আল্লাহ, তুমি পবিত্র মহান’ এবং তাদের অভিবাদন হবে, ‘সালাম’। আর তাদের শেষ কথা হবে যে, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সকল সৃষ্টির রব’। আল-বায়ান

তার ভিতরে তাদের দু’আ হবে, ‘‘পবিত্র তুমি হে আল্লাহ’’। আর সেখানে তাদের অভিবাদন হবে ‘‘শান্তি’’, আর তাদের দু‘আর সর্বশেষ কথা হবে ‘‘সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য’’। তাইসিরুল

সেখানে তাদের বাক্য হবেঃ হে আল্লাহ! তুমি মহান, পবিত্র! এবং পরস্পরের অভিবাদন হবে সালাম (আসসালামু ‘আলাইকুম), আর তাদের দু‘আর শেষ বাক্য হবে ‘আলহামদুলিল্লাহি রাবিবল ‘আলামীন’ (সমস্ত প্রশংসা সারা জাহানের রাব্ব মহান আল্লাহর জন্য)। মুজিবুর রহমান

Their call therein will be, "Exalted are You, O Allah," and their greeting therein will be, "Peace." And the last of their call will be, "Praise to Allah, Lord of the worlds!" Sahih International

১০. সেখানে তাদের ধ্বনি হবেঃ হে আল্লাহ! আপনি মহান, পবিত্র(১)! এবং সেখানে তাদের অভিবাদন হবে, ‘সালাম’(২) আর তাদের শেষ ধ্বনি হবেঃ ‘সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর প্রাপ্য!(৩)

(১) এ আয়াতে জান্নাতবাসীদের প্রথম ও প্রধান অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। [সা’দী] বলা হয়েছে যে, জান্নাতবাসীদের دعوى হবে (سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ)। এখানে دعوى শব্দটির অর্থ কি, এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত রয়েছে। কারণ, دعوى শব্দটির কয়েকটি অর্থ রয়েছে-

(এক) দাবী করা। তখন আয়াতের অর্থ হবে, দুনিয়ায় ও আখেরাতে সবসময়ই জান্নাতবাসীগণের দাবী ছিল আল্লাহ্ তা'আলাকে যাবতীয় দোষ-ত্রুটিমুক্ত ঘোষণা করা, তার জন্য উলুহিয়াত তথা যাবতীয় ইবাদাত সাব্যস্ত করা। তাই তারা জান্নাতেও এটার দাবী করবে। [তাবারী] কোন কোন মুফাসসির আবার এ অর্থ করেছেন যে, এখানে দাবী করার অর্থ সার্বক্ষণিক এ কাজে লেগে থাকা। ছুটতে থাকে। [ফাতহুল কাদীর]

(দুই) দো'আ করা। [তাবারী] আর দোআ করার অর্থ নির্ধারণে আলেমগণ বেশকিছু মতামত ব্যক্ত করেছেন- (ক) তাদের আহবান ও সম্বোধন হবে তাসবীহ ও তাহমীদের মাধ্যমে। (খ) তাদের ইবাদত হবে সুবাহানাকাল্লাহুম্মা এ কালেমার মাধ্যমে। [বাগভী] (গ) তাদের কথা ও কাজও হবে উক্ত কালেমার মাধ্যমে। [বাগভী] এসবগুলোই অর্থ হতে পারে। কারণ, আমরা জানি যে, দুআ দু'প্রকার। (এক) চাওয়ার মাধ্যমে দু’আ। যেমন আল্লাহ আমাকে অমুক বস্তু দান করুন। এ ধরণের দোআ অনেক পরিচিত। (দুই) ইবাদাত ও প্রশংসার মাধ্যমে দোআ যাতে আল্লাহর প্রশংসা এবং শুকরিয়া থাকে। এ হিসাবে কুরআন ও সুন্নায় বহু দোআ এসেছে। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ সবচেয়ে উত্তম দোআ হলো আলহামদুলিল্লাহ। [তিরমিযীঃ ৩৩০৫, ইবনে মাজাহঃ ৩৭৯০] অনুরূপভাবে অন্য হাদীসে বলা হয়েছেঃ মুসীবতের দো’আ হচ্ছে- لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ، وَرَبُّ الْأَرْضِ، وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ  অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া ইবাদাতের যোগ্য কোন মা’বুদ নেই, তিনি মহান, সহিষ্ণু। আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বুদ নেই, তিনি আরশের মহান রব। আল্লাহ ছাড়া ইবাদাতের যোগ্য কোন মা’বুদ নেই, তিনি আসমানযমীনের রব এবং আরশের মহান রব। [বুখারীঃ ৬৩৪৫, মুসলিমঃ ২৭৩০]

অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ যিননূন (ইউনুস) 'আলাইহিস সালাম যখন মাছের পেটে ছিলেন তখন তার দোআ (লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনায যোয়ালিমীন) এ দোআ দ্বারা যখনই কোন মুসলিম কিছুর জন্য দোআ করবে, আল্লাহ তার দোআ কবুল করবেন। [তিরমিযীঃ ৩৫০০]

এ সমস্ত হাদীস এবং এ জাতীয় অন্যান্য অনেক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, আল্লাহর প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে দোআ করার নির্দেশ শরীআতে এসেছে। তাই অনেক আলেম এ ধরণের প্রশংসাসূচক দোআকে চাওয়াসূচক দোআ হতে শ্রেষ্ঠ বলে মত প্রকাশ করেছেন। এসব কিছু থেকে একথা স্পষ্ট হচ্ছে যে, জান্নাতের অধিবাসীগণের আল্লাহর প্রশংসা, পবিত্রতা ঘোষণা করা মূলতঃ আল্লাহর কাছে দো'আ করা।
কোন কোন মুফাসসির বলেন, যেহেতু তাদের উপর থেকে ইবাদতের যাবতীয় বোঝা নামিয়ে দেয়া হয়েছে, তখন তাদের কাছে শুধু বাকী থাকবে সবচেয়ে বড় স্বাদের বিষয়। আর তা হচ্ছে আল্লাহর যিকর করা। যা অন্যান্য যাবতীয় নে’আমতের চেয়ে তাদের কাছে বেশী মজাদায়ক হবে। যাতে থাকবে না কোন কষ্ট। [সা'দী]

(তিন) আশা-আকাঙ্খা করা, [ফাতহুল কাদীর] অর্থাৎ জান্নাতে তাদের সবধরণের নেয়ামত লাভের পর তাদের আর কোন চাহিদা বাকী থাকবে না। তাই তারা শুধু ‘সুবাহানাকাল্লাহুম্মা’ বা হে আল্লাহ! আপনি কতই না পবিত্র এ প্রশংসামূলক বাক্যই তাদের দ্বারা সর্বক্ষণ ঘোষিত হোক এমনটি আশা করবে এবং বলতে চাইবে। [ইবন কাসীর]

মোটকথা, জান্নাতবাসীদের যাবতীয় দোআ, কাজ, কথা, দাবী, আশা-আকাঙ্খা সবকিছুই হবে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ ও তার তাহমীদ বা প্রশংসায় নিয়োজিত থাকা। এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতবাসীগণ জান্নাতে খাবে এবং পান করবে, কিন্তু কোন থুথু, পায়খানা-পেশাব, সর্দি-কাশির সম্মুখীন হবে না। শুধুমাত্র ঢেকুর আসবে যাতে মিস্কের সুঘ্ৰাণ থাকবে। তাদের মনে শ্বাস-প্রশ্বাসের মতই আল্লাহর তাসবীহতাহমীদ (সুবাহানাল্লাহ-আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ করতে ইলহাম (মনে উদিত করে দেয়া) হবে। [মুসলিমঃ ২৮৩৫]

(২) জন্নাতবাসীদের দ্বিতীয় অবস্থা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে (وَتَحِيَّتُهُمْ فِيهَا سَلَامٌ) প্রচলিত অর্থে تَحِيَّةٌ বলা হয় এমন শব্দ বা বাক্যকে যার মাধ্যমে কোন আগন্তুক কিংবা অভ্যাগতকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। যেমন, সালাম, স্বাগতম, খোশ আমদেদ, কিংবা আহলান ওয়া সাহলান প্রভৃতি। সুতরাং আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা অথবা ফিরিশতাদের পক্ষ থেকে জান্নাতবাসীদেরকে سلام এর মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানানো হবে। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর] অর্থাৎ এ সুসংবাদ দেয়া হবে যে, তোমরা যে কোন রকম কষ্ট ও অপছন্দনীয় বিষয় থেকে হেফাযতে থাকবে। এ সালাম স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকেও হতে পারে। যেমন, সূরা ইয়াসীনে রয়েছে (سَلَامٌ قَوْلًا مِنْ رَبٍّ رَحِيمٍ) আবার ফিরিশতাদের পক্ষ থেকেও হতে পারে। আবার ফিরিশতা কর্তৃক তাদের রবের পক্ষ থেকেও হতে পারে। [বাগভী] যেমন, অন্যত্র এরশাদ হয়েছে (وَالْمَلَائِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِمْ مِنْ كُلِّ بَابٍ ٭ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ) অর্থাৎ ফিরিশতাগণ প্রতিটি দরজা দিয়ে সালামুন আলাইকুম বলতে বলতে জান্নাতবাসীদের কাছে আসতে থাকবেন। [সূরা আর-রাদঃ ২৩–২৪]

আর এ দুটি বিষয়ে বিরোধ-বৈপরীত্ব নেই যে, কখনো সরাসরি স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে এবং কখনো ফিরিশতাদের পক্ষ থেকে সালাম আসবে। আবার জান্নাতীগণ পরস্পরকে এ সালামের মাধ্যমে সাদর সম্ভাষণ জানাবেন। [ফাতহুল কাদীর; সাদী] আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ (تَحِيَّتُهُمْ يَوْمَ يَلْقَوْنَهُ سَلَامٌ) অর্থাৎ “যেদিন তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সেদিন তাদের পরস্পর সম্ভাষণ হবে সালামের মাধ্যমে।” [সূরা আহযাবঃ ৪৪, অনুরূপ আয়াত আরো দেখুন, ওয়াকি'আঃ ২৫–২৬] অর্থাৎ সালাম শব্দটি তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে, ফিরিশতাদের পক্ষ থেকে এবং মুমিনগণ পরস্পর নিজেদের মধ্যে বিনিময় করবে। সালাম শব্দের আরেক অর্থ দোআ বা যাবতীয় আপদ থেকে নিরাপত্তা। তখন অর্থ হবে, জাহান্নামবাসীরা যে বিপদের সম্মুখীন হয়েছে তা থেকে তোমাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করা হচ্ছে। [তাবারী]

(৩) জান্নাতবাসীদের তৃতীয় অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, জান্নাতবাসীদের সর্বশেষ দোআ হবে (الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) অর্থাৎ জান্নাতবাসীরা জান্নাতে পৌছার পর আল্লাহ তা'আলাকে জানার ক্ষেত্রে বিপুল উন্নতি লাভ করবে। তখন তারা শুধু তার প্রশংসাই করতে থাকবে। জান্নাতবাসীদের প্রাথমিক দোআ হবে (سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ) আর সর্বশেষ দোআ হবে (الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) এতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন-এর বিশেষ কিছু গুণ-বৈশিষ্টের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। [বাগভী] যেমন, পরাক্রম ও মহত্ত্ব গুণ যাতে যাবতীয় দোষ-ত্রুটি হতে আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। আরো রয়েছে ‘সিফাতে করম’ যাতে তার মহানুভবতা, পরিপূর্ণতা ও পরাকাষ্ঠার উল্লেখ রয়েছে। কুরআনুল কারীমের (تَبَارَكَ اسْمُ رَبِّكَ ذِي الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ) [সূরা আর-রাহমান: ৭৮]

আয়াতে এতদুভয় গুণ-বৈশিষ্টের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ আয়াত এবং এ জাতীয় অন্যান্য আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা সদা প্রশংসিত। সহীহ হাদীসে এসেছে, “জান্নাতবাসীগণকে তাসবীহ ও তাহমীদ যথা সুবহানাল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহর ইলহাম এমনভাবে করা হবে যেমনিভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের ইলহাম করা হবে।” [মুসলিমঃ ২৮৩৫] এটা একথাই প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহ সদা প্রসংশিত। আমরা যদি কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের প্রতি তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে, আল্লাহ নিজেকে বিভিন্নভাবে প্রশংসনীয় বলে ব্যক্ত করেছেন। সূরা আল-ফাতিহার তাফসীরে তার বর্ণনা চলে গেছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০) সেখানে তাদের বাক্য হবে, ‘সুবহানাকাল্লাহুম্মা’ (হে আল্লাহ! তুমি মহান পবিত্র)![1] এবং পরস্পরের অভিবাদন হবে সালাম।[2] আর তাদের শেষ বাক্য হবে, ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ (সমস্ত প্রশংসা সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য)।

[1] অর্থাৎ জান্নাতিগণ সর্বদা আল্লাহর প্রশংসা ও তসবীহ পাঠে রত থাকবে। যেমন হাদীসে এসেছে যে ‘‘জান্নাতিগণের মুখে এমনভাবে তসবীহ ও তাহমীদ স্বয়ংক্রিয় করা হবে, যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস স্বয়ংক্রিয়।’’ (মুসলিম) অর্থাৎ, যেমন নিজের কোন ইচ্ছা ব্যতিরেকে যেরূপ শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকে, অনুরূপ জান্নাতীদের মুখে কোন ইচ্ছা ছাড়াই আল্লাহর হামদ ও তাসবীহর শব্দ আসতে থাকবে।

[2] অর্থাৎ তারা পরস্পরকে এই (আসসালামু আলাইকুম) বলে সালাম দেবে, ফিরিশতাগণও তাদেরকে সালাম দেবেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ১১ وَ لَوۡ یُعَجِّلُ اللّٰهُ لِلنَّاسِ الشَّرَّ اسۡتِعۡجَالَهُمۡ بِالۡخَیۡرِ لَقُضِیَ اِلَیۡهِمۡ اَجَلُهُمۡ ؕ فَنَذَرُ الَّذِیۡنَ لَا یَرۡجُوۡنَ لِقَآءَنَا فِیۡ طُغۡیَانِهِمۡ یَعۡمَهُوۡنَ ﴿۱۱﴾
و لو یعجل الله للناس الشر استعجالهم بالخیر لقضی الیهم اجلهم فنذر الذین لا یرجون لقآءنا فی طغیانهم یعمهون ﴿۱۱﴾

আর আল্লাহ যদি মানুষের অকল্যাণ (প্রার্থনায় সাড়া দিতে) তাড়াতাড়ি করতেন যেভাবে তিনি তাদের কল্যাণ (প্রার্থনায় সাড়া দিতে) তাড়াতাড়ি করেন, তাহলে অবশ্যই তাদের সময় ফুরিয়ে যেত। সুতরাং যারা আমার সাক্ষাতের আশা রাখে না, আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় দিশেহারা হয়ে ঘুরতে ছেড়ে দেই। আল-বায়ান

মানুষের অপকর্মের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ যদি মানুষের অকল্যাণ করার ব্যাপারে দ্রুততা অবলম্বন করতেন যতটা দ্রুততার সঙ্গে তারা (দুনিয়ার) কল্যাণ পেতে চায়, তবে তাদের কাজ করার অবকাশ কবেই না খতম করে দেয়া হত, (কিন্তু আল্লাহ তা করেন না)। কাজেই যারা আমার সাক্ষাতের আশা রাখে না, তাদেরকে আমি তাদের অবাধ্যতায় দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়ানোর অবকাশ দেই। তাইসিরুল

আর আল্লাহ যদি মানুষের উপর ত্বরিত ক্ষতি সাধন করতেন, যেমন তারা ত্বরিত উপকার লাভ করতে আগ্রহ রাখে, তাহলে তাদের অঙ্গীকার কবেই পূর্ণ হয়ে যেত! অনন্তর আমি সেই লোকদেরকে, যারা আমার নিকট উপস্থিত হওয়ার চিন্তা করেনা, ছেড়ে দিই তাদের অবস্থার উপর, যেন তারা তাদের অবাধ্যতার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। মুজিবুর রহমান

And if Allah was to hasten for the people the evil [they invoke] as He hastens for them the good, their term would have been ended for them. But We leave the ones who do not expect the meeting with Us, in their transgression, wandering blindly Sahih International

১১. আর আল্লাহ যদি মানুষের অকল্যাণে (সাড়া দিতে) তাড়াতাড়ি করেন, যেভাবে তাদের কল্যাণে (সাড়া দিতে) তাড়াতাড়ি করেন, তবে অবশ্যই তাদের মৃত্যুর সময় এসে যেত।(১)। কাজেই যারা আমাদের সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না তাদেরকে আমরা তাদের অবাধ্যতায় উদভ্রান্তের মত ঘুরতে ছেড়ে দেই।

(১) এ আয়াতে الشر বা খারাপ বস্তু কি? এ নিয়ে মতভেদ আছে। এক. কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ এখানে খারাপ বস্তু বলতে নদর ইবনে হারেস নামীয় কাফেরের বদদোআ বোঝানো হয়েছে। যাতে সে বলেছিলঃ হে আল্লাহ! যদি মুহাম্মাদের দ্বীন সত্য হয়, তবে আমার উপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করে আমাকে ধ্বংস করে দিন। [বাগভী] এর উত্তরে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ সর্ববিষয়েই ক্ষমতাশীল, প্রতিশ্রুত এ আযাব এক্ষণেই নাযিল করতে পারেন। কিন্তু তিনি তার মহান হেকমত ও দয়া করুণার দরুন এ মূৰ্খরা নিজেদের জন্য যে বদদোআ করে এবং বিপদ ও অকল্যাণ কামনা করে তা নাযিল করেন না।

যদি আল্লাহ তা'আলা তাদের বদদোআগুলোও তেমনিভাবে যথাশীঘ্ৰ কবুল করে নিতেন, যেভাবে তাদের ভাল দোআগুলো কবুল করেন, তাহলে এরা সবাই ধ্বংস হয়ে যেত। দুই. অধিকাংশ মুফাসসিরীনের মতে এক্ষেত্রে বদদোআর মর্ম এই যে, কোন কোন সময় কেউ কেউ রাগের বশবর্তী হয়ে নিজের সন্তান-সন্ততির কিংবা অর্থ-সম্পদ ধ্বংসের বদদোআ করে বসে কিংবা বস্তুসামগ্রীর প্রতি অভিসম্পাত করতে আরম্ভ করে- আল্লাহ তা'আলা স্বীয় করুণা ও মহানুভবতাবশতঃ সহসাই এসব দোআ কবুল করেন না। [তাবারী; কুরতুবী; বাগভী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]

এতে প্রতীয়মান হয় যে, কল্যাণ ও মঙ্গলের শুভ দোআ-প্রার্থনার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার রীতি হচ্ছে যে, অধিকাংশ সময় তিনি সেগুলো শীঘ্ৰ কবুল করে নেন। অবশ্য কখনো কখনো হেকমত ও কল্যাণের কারণে কবুল না হওয়া এর পরিপন্থী নয়। কিন্তু মানুষ যে কখনো নিজেদের অজান্তে এবং কোন দুঃখ-কষ্ট ও রাগের বশে নিজের কিংবা নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য বদদোআ করে বসে, অথবা আখেরাতের প্রতি অস্বীকৃতির দরুন আযাবকে প্রহসন মনে করে নিজের জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানাতে থাকে সেগুলো তিনি সঙ্গে সঙ্গে কবুল করেন না; বরং অবকাশ দেন, যাতে অস্বীকারকারীরা বিষয়টি চিন্তা-ভাবনা করে নিজেদের অস্বীকৃতি থেকে ফিরে আসার সুযোগ পায় এবং কোন সাময়িক দুঃখকষ্ট, রাগ-রোষ কিংবা যদি মনোবেদনার কারণে বদদোআ করে বসে, তাহলে সে যেন নিজের কল্যাণ-অকল্যাণ, ভাল-মন্দ লক্ষ্য করে, তার পরিণতি বিবেচনা করে তা থেকে বিরত হবার অবকাশ পেতে পারে।

তারপরও কোন কোন সময় এমন কবুলিয়ত বা মঞ্জুরীর সময় আসে, যখন মানুষের মুখ থেকে যে কোন কথা বের হয়, তা সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়ে যায়। সেজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ নিজের সন্তান-সন্ততি ও অর্থ-সম্পদের জন্য কখনো বদদোআ করো না। এমন যেন না হয় যে, সে সময়টি হয় মঞ্জুরীর সময় এবং দোআ সাথে সাথে কবুল হয়ে যায়। [আবু দাউদঃ ১৫৩২, মুসলিমঃ ৩০০৯]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১১) যদি আল্লাহ মানুষের অকল্যাণ তরান্বিত করতেন যেভাবে তারা তাদের কল্যাণ তরান্বিত করতে আগ্রহী, তাহলে অবশ্যই তারা ধ্বংস হয়ে যেত।[1] সুতরাং যারা আমার সাক্ষাতের আশা রাখে না, আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যে ঘুরপাক খেতে ছেড়ে দিই।

[1] এর এক অর্থ এই যে, যেমন মানুষ কোন উত্তম বস্তু অন্বেষণে তাড়াতাড়ি করে, অনুরূপ তারা শাস্তি অন্বেষণেও তাড়াতাড়ি করে, তারা পয়গম্বরদেরকে বলে যে, ‘যদি তোমরা সত্যই পয়গম্বর হও, তাহলে সেই শাস্তি আনয়ন কর, যা থেকে তোমরা আমাদেরকে ভীতিপ্রদর্শন করছ।’ আল্লাহ তাআলা বলেন যে, আমি যদি তাদের চাওয়া অনুযায়ী শীঘ্র শাস্তি প্রেরণ করতাম, তবে তারা অনেক পূর্বে মৃত্যু ও ধ্বংস কবলিত হয়ে যেত। কিন্তু আমি ঢিল দিয়ে তাদেরকে পূর্ণ সুযোগ দিই। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, মানুষ যেমন নিজের জন্য ভালাই ও মঙ্গলের দু’আ করে, যা আমি মঞ্জুর করি। অনুরপ মানুষ যখন রাগান্বিত অবস্থায় বা কষ্টে থাকে, তখন নিজের জন্য ও আপন সন্তান-সন্ততি ইত্যাদির জন্য বদ্দুআ করে, তা আমি এই জন্য ছেড়ে দিই যে, সে তো মুখে ধ্বংস চাচ্ছে, কিন্তু তার অন্তরে সে ইচ্ছা নেই। কিন্তু যদি আমি মানুষের বদ্দুআ অনুযায়ী তাদেরকে সাথে সাথে ধ্বংস করতে আরম্ভ করতাম, তবে অতি সতত্ত্বর এরা মৃত্যু ও ধ্বংস কবলিত হয়ে যেত। এই জন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘‘তোমরা নিজেদের উপর, নিজেদের সন্তানের উপর এবং নিজেদের সম্পদ ও কারবারের উপর বদ্দুআ করো না। এমন না হয়ে যায় যে, তোমাদের বদ্দুআ এমন সময়ে হয়ে যায়, যে সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে দু’আ কবুল করা হয়, অতঃপর তিনি তোমাদের সে বদ্দুআ কবুল করে নেন।’’ (মুসলিম, আবু দাউদ)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ১২ وَ اِذَا مَسَّ الۡاِنۡسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنۡۢبِهٖۤ اَوۡ قَاعِدًا اَوۡ قَآئِمًا ۚ فَلَمَّا كَشَفۡنَا عَنۡهُ ضُرَّهٗ مَرَّ كَاَنۡ لَّمۡ یَدۡعُنَاۤ اِلٰی ضُرٍّ مَّسَّهٗ ؕ كَذٰلِكَ زُیِّنَ لِلۡمُسۡرِفِیۡنَ مَا كَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ﴿۱۲﴾
و اذا مس الانسان الضر دعانا لجنبهٖ او قاعدا او قآئما فلما كشفنا عنه ضرهٗ مر كان لم یدعنا الی ضر مسهٗ كذلك زین للمسرفین ما كانوا یعملون ﴿۱۲﴾

আর যখন মানুষকে বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে। অতঃপর আমি যখন তার বিপদ দূর করে দেই, তখন সে এমনভাবে চলতে থাকে মনে হয় যেন তাকে কোন বিপদ স্পর্শ করার কারণে সে আমাকে ডাকেনি। এভাবেই সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য তারা যা আমল করত তা শোভিত করে দেয়া হয়েছে। আল-বায়ান

মানুষকে যখন দুঃখ ক্লেশ স্পর্শ করে, তখন তারা শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। অতঃপর যখন আমি তার দুঃখ ক্লেশ দূর করে দেই, তখন সে এমনভাবে চলে যায়, মনে হয় যেন তাকে দুঃখ-ক্লেশ স্পর্শ করার কারণে সে আমাকে কখনই ডাকেনি। এভাবেই যারা সীমালঙ্ঘন করে তাদের জন্য তাদের কাজকর্মগুলোকে চাকচিক্যময় বানিয়ে দেয়া হয়েছে। তাইসিরুল

আর যখন মানুষকে কোন ক্লেশ স্পর্শ করে তখন আমাকে ডাকতে থাকে শুয়ে, বসে এবং দাঁড়িয়েও; অতঃপর যখন আমি তার সেই কষ্ট দূর করে দিই তখন সে নিজের পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। যে কষ্ট তাকে স্পর্শ করেছিল তা মোচন করার জন্য সে যেন আমাকে কখনও ডাকেইনি; এই সীমা লংঘনকারীদের কার্যকলাপ তাদের কাছে এইরূপই পছন্দনীয় মনে হয়। মুজিবুর রহমান

And when affliction touches man, he calls upon Us, whether lying on his side or sitting or standing; but when We remove from him his affliction, he continues [in disobedience] as if he had never called upon Us to [remove] an affliction that touched him. Thus is made pleasing to the transgressors that which they have been doing Sahih International

১২. আর মানুষকে যখন দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে তখন সে শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে আমাদেরকে ডেকে থাকে(১) অতঃপর আমরা যখন তার দুঃখ-দৈন্য দূর করি, তখন সে এমনভাবে চলতে থাকে যেন তাকে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করার পর তার জন্য সে আমাদেরকে ডাকেইনি। এভাবেই সীমালংঘনকারীদের কাজ তাদের কাছে শোভনীয় করে দেয়া হয়েছে।

(১) এ আয়াতে সাধারণ মানুষের এক রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তা হলো এই যে, সাধারণ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় এরা আল্লাহ ও আখেরাতের বিরুদ্ধে যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হয়, অন্যান্যদেরকে আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করে এবং তাদেরই কাছে উদ্দেশ্য সিদ্ধির আশা করে, কিন্তু যখন কোন বিপদে পড়ে তখন এরা নিজেরাও আল্লাহ ব্যতীত সমস্ত লক্ষ্যস্থলের প্রতি নিরাশ হয়ে গিয়ে শুধু আল্লাহকেই ডাকতে আরম্ভ করে। শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে সর্বাবস্থায় একমাত্র তাকেই ডাকতে বাধ্য হয়। [সা’দী] অথচ তারই সাথে তাদের অনুগ্রহ বিমুখতার অবস্থা হল এই যে, যখনই আল্লাহ্ তা'আলা তাদের বিপদাপদ দূর করে দেন, তখনই আল্লাহ্ তা'আলার ব্যাপারে এমন মুক্ত হয়ে যায়, যেন কখনো তাঁকে ডাকেইনি, তার কাছে যেন কোন বাসনাই প্রার্থনা করেনি। এ বিষয়টি আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের অন্যান্য স্থানেও উল্লেখ করেছেন। যেমন, সূরা আয-যুমারঃ ৮, আয-যুমারঃ ৪৯, আল-ইসরাঃ ৮৩, ফুসসিলাতঃ ৫১৷

কিন্তু যাদের হেদায়াত নসীব হয়েছে এবং ঈমান এনেছে, তারা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ রাখে। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে সূরা হুদের ১১ নং আয়াতে ব্যতিক্রম বলে ঘোষণা করেছেন। অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুমিনের কাজ-কারবার দেখে আশ্চৰ্য্য হতে হয়, আল্লাহ তার জন্য যা কিছুই ঘটাক সেটাই তার জন্য কল্যাণের রূপ নেয়। যদি তার কোন ক্ষতি বা দুঃখজনক কিছু ঘটে তখন সে তাতে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি তার কোন খুশী বা লাভজনক কিছু হয় তাতে সে কৃতজ্ঞ হয়, শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। এটা একমাত্র মুমিনই পেতে পারে, আর কারো পক্ষে নয়’। [মুসলিমঃ ২৯৯৯]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১২) আর যখন মানুষকে কোন ক্লেশ স্পর্শ করে, তখন শুয়ে, বসে অথবা দাঁড়িয়েও আমাকে ডাকতে থাকে। অতঃপর যখন আমি তার সেই কষ্ট ওর নিকট হতে দূর করে দিই, তখন সে নিজের পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসে; যেন তাকে যে কষ্ট স্পর্শ করেছিল তা মোচন করার জন্য আমাকে ডাকেইনি;[1] এইভাবেই সীমালংঘনকারীদের কার্যকলাপ তাদের কাছে শোভনীয় করা হয়েছে। [2]

 [1] এটা মানুষের ঐ অবস্থার বিবরণ, যা অধিকাংশ মানুষের অভ্যাস। বরং অনেক আল্লাহতে বিশ্বাসী মানুষও এই শিথিলতার শিকার হয়ে থাকে। আর তা এই যে, মসীবতের সময় খুব ‘আল্লাহ-আল্লাহ’ করা হয়, দু’আ করা হয়, তওবা-ইস্তিগফারের যথাযথ খেয়াল রাখা হয়। কিন্তু যখন আল্লাহ তাআলা মসীবতের সেই কঠিন সময় পার করে দেন, তখন আল্লাহর দরবারে দু’আ করা থেকে গাফেল হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলা তাদের দু’আ কবুল করে তাদেরকে যে বালা-মসীবত থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার তওফীক তাদের ভাগ্যে জোটে না।

[2] এই আমল শোভন করা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ অথবা অবকাশস্বরূপ হতে পারে। শয়তানের পক্ষ থেকে কুমন্ত্রণা দ্বারাও হতে পারে। আবার মানুষের ঐ আত্মার পক্ষ থেকেও হতে পারে, যে আত্মা মানুষকে নোংরা কাজে উদ্বুদ্ধ করে।

(يوسف-৫৩) إِنَّ النَّفْسَ لأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ বস্তুতঃ সীমালংঘনকারীরাই এর শিকার হয়। এখানে অর্থ এই দাঁড়ালো যে, দু’আ থেকে বিমুখতা, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা থেকে ঔদাস্য এবং প্রবৃত্তিপূজা ইত্যাদি কর্মকে তাদের জন্য সুশোভিত করে দেওয়া হয়েছে। (ফাতহুল কাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ১৩ وَ لَقَدۡ اَهۡلَكۡنَا الۡقُرُوۡنَ مِنۡ قَبۡلِكُمۡ لَمَّا ظَلَمُوۡا ۙ وَ جَآءَتۡهُمۡ رُسُلُهُمۡ بِالۡبَیِّنٰتِ وَ مَا كَانُوۡا لِیُؤۡمِنُوۡا ؕ كَذٰلِكَ نَجۡزِی الۡقَوۡمَ الۡمُجۡرِمِیۡنَ ﴿۱۳﴾
و لقد اهلكنا القرون من قبلكم لما ظلموا و جآءتهم رسلهم بالبینت و ما كانوا لیؤمنوا كذلك نجزی القوم المجرمین ﴿۱۳﴾

আর অবশ্যই আমি তোমাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি, যখন তারা যুলম করেছে। আর তাদের নিকট তাদের রাসূলগণ প্রমাণাদিসহ আগমন করেছিল, কিন্তু তারা ঈমান আনার ছিল না। এভাবে আমি অপরাধী কওমকে শাস্তি প্রদান করি। আল-বায়ান

তোমাদের পূর্বেকার বহু জনগোষ্ঠীকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি যখন তারা বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছিল, তাদের কাছে রসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছিল, কিন্তু তারা আদৌ ঈমান আনেনি। এভাবেই আমি অপরাধীদেরকে (পাপের) প্রতিদান দিয়ে থাকি। তাইসিরুল

আমি তোমাদের পূর্বে বহু সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি, যখন তারা যুলম করেছিল, অথচ তাদের নিকট তাদের রাসূলগণও প্রমাণাদীসহ আগমন করেছিল, কিন্তু কিছুতেই তারা ঈমান আনলনা। আর আমি অপরাধীদেরকে এই রূপেই শাস্তি দিয়ে থাকি। মুজিবুর রহমান

And We had already destroyed generations before you when they wronged, and their messengers had come to them with clear proofs, but they were not to believe. Thus do We recompense the criminal people Sahih International

১৩. আর অবশ্যই আমরা তোমাদের আগে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি যখন তারা যুলুম করেছিল। আর তাদের কাছে তাদের রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ এসেছিল, কিন্তু তারা ঈমান আনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এভাবে আমরা অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়ে থাকি।(১)

(১) অর্থাৎ কেউ যেন আল্লাহ্ তা'আলার অবকাশ দানের কারণে এমন ধারণা করে না বসে যে, পৃথিবীতে আযাব আসতেই পারে না। বিগত জাতিসমূহের ইতিহাস এবং তাদের ঔদ্ধত্য ও কৃতঘ্নতার সাক্ষীস্বরূপ বিভিন্ন রকম আযাব এ পৃথিবীতেই এসে গেছে। এটা হচ্ছে জাতিসমূহের ব্যাপারে আল্লাহর নীতি। [সা’দী] আল্লাহ্ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দোআ কবুল করে নিয়েছেন যে, কোন সাধারণ ব্যাপক আযাব এ উম্মতের উপর আসবে না। ফলে আল্লাহ তা'আলার এহেন করুণা, অনুগ্রহ এসব লোককে এমন নির্ভয় করে দিয়েছে যে, তারা একান্ত দুঃসাহসের সাথে আল্লাহর আযাবকে আমন্ত্রণ জানাতে এবং তার দাবী করতে তৈরী হয়ে যায়। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন যে, আল্লাহ্ তা'আলার আযাব সম্পর্কে এ নিশ্চিন্ততা কোন অবস্থাতেই তাদের জন্য সমীচীন ও কল্যাণকর নয়। কারণ, গোটা উম্মত এবং সমগ্র বিশ্বের উপর ব্যাপক আযাব না আসলেও বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের উপর আযাব নেমে আসা অসম্ভব নয়।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৩) আমি অবশ্যই তোমাদের পূর্বে বহু সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিয়েছি, যখন তারা সীমালংঘন করেছিল। তাদের নিকট তাদের রসূলগণও প্রমাণাদিসহ আগমন করেছিল; কিন্তু তারা বিশ্বাস করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমি অপরাধীদেরকে এইরূপেই শাস্তি দিয়ে থাকি। [1]

[1] এটা মক্কার কাফেরদের জন্য সতর্কবাণী যে, পূর্ব জাতির ন্যায় তোমরাও ধ্বংস হতে পার।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ১৪ ثُمَّ جَعَلۡنٰكُمۡ خَلٰٓئِفَ فِی الۡاَرۡضِ مِنۡۢ بَعۡدِهِمۡ لِنَنۡظُرَ كَیۡفَ تَعۡمَلُوۡنَ ﴿۱۴﴾
ثم جعلنكم خلٓئف فی الارض من بعدهم لننظر كیف تعملون ﴿۱۴﴾

তারপর আমি তোমাদেরকে যমীনে তাদের পরে স্থলাভিষিক্ত করেছি, যাতে আমি দেখি তোমরা কেমন আমল কর। আল-বায়ান

অতঃপর তাদের পর আমি তোমাদেরকে পৃথিবীতে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছি এটা দেখার জন্য যে, তোমরা কী রকম ‘আমাল কর। তাইসিরুল

অতঃপর আমি তাদের স্থলে তোমাদেরকে তাদের পর ভূমন্ডলে আবাদ করলাম, যেন আমি প্রত্যক্ষ করি যে, তোমরা কি রূপ কাজ কর। মুজিবুর রহমান

Then We made you successors in the land after them so that We may observe how you will do. Sahih International

১৪. তারপর আমরা তোমাদেরকে তাদের পর যমীনে স্থলাভিষিক্ত করেছি, তোমরা কিরূপ কাজ কর তা দেখার জন্য।(১)

(১) অর্থাৎ অতঃপর পূর্ববর্তী জাতি-সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার পর আমি তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছি। এই মর্যাদা ও সম্মান দানের পিছনে আসল উদ্দেশ্য হলো তোমাদের পরীক্ষা নেয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “দুনিয়া হলো সুফলা সুমিষ্ট জিনিস, আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাতে প্রতিনিধিত্ব করাবেন। এতে করে তিনি দেখতে চান তোমাদের আমল কেমন? সুতরাং তোমরা দুনিয়ার ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন কর এবং মহিলাদের ব্যাপারেও তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। কেননা বনী ইসরাঈলদের প্রথম পরীক্ষা ছিল মহিলাদের দ্বারা”। [মুসলিমঃ ২৭৪২]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪) অতঃপর আমি তাদের স্থলে তোমাদেরকে তাদের পর ভূমন্ডলে আবাদ করলাম,[1] যেন আমি প্রত্যক্ষ করি যে, তোমরা কিরূপ কাজ কর।

[1] خلائف, خليفة এর বহুবচন। যার অর্থ হল, পূর্ব জাতির প্রতিনিধি। অথবা এক অপরের প্রতিনিধি বা স্থলাভিষিক্ত।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ১৫ وَ اِذَا تُتۡلٰی عَلَیۡهِمۡ اٰیَاتُنَا بَیِّنٰتٍ ۙ قَالَ الَّذِیۡنَ لَا یَرۡجُوۡنَ لِقَآءَنَا ائۡتِ بِقُرۡاٰنٍ غَیۡرِ هٰذَاۤ اَوۡ بَدِّلۡهُ ؕ قُلۡ مَا یَكُوۡنُ لِیۡۤ اَنۡ اُبَدِّلَهٗ مِنۡ تِلۡقَآیِٔ نَفۡسِیۡ ۚ اِنۡ اَتَّبِعُ اِلَّا مَا یُوۡحٰۤی اِلَیَّ ۚ اِنِّیۡۤ اَخَافُ اِنۡ عَصَیۡتُ رَبِّیۡ عَذَابَ یَوۡمٍ عَظِیۡمٍ ﴿۱۵﴾
و اذا تتلی علیهم ایاتنا بینت قال الذین لا یرجون لقآءنا ائت بقران غیر هذا او بدله قل ما یكون لی ان ابدلهٗ من تلقآیٔ نفسی ان اتبع الا ما یوحی الی انی اخاف ان عصیت ربی عذاب یوم عظیم ﴿۱۵﴾

আর যখন তাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টরূপে পাঠ করা হয়, তখন, যারা আমার সাক্ষাতের আশা রাখে না, তারা বলে, ‘এটি ছাড়া অন্য কুরআন নিয়ে এসো। অথবা একে বদলাও’। বল, ‘আমার নিজের পক্ষ থেকে এতে কোন পরিবর্তনের অধিকার নেই। আমিতো শুধু আমার প্রতি অবতীর্ণ ওহীর অনুসরণ করি। নিশ্চয় আমি যদি রবের অবাধ্য হই তবে ভয় করি কঠিন দিনের আযাবের’। আল-বায়ান

যখন আমার সুস্পষ্ট আয়াতগুলো তাদের কাছে পঠিত হয়, তখন যারা আমার সাক্ষাতের আশা রাখে না তারা বলে, ‘এটা বাদে অন্য আরেকটা কুরআন আন কিংবা ওটাকে বদলাও’। বল, ‘‘আমার নিজের ইচ্ছেমত ওটা বদলানো আমার কাজ নয়, আমার কাছে যা ওয়াহী করা হয় আমি কেবল সেটারই অনুসরণ করে থাকি। আমি আমার প্রতিপালকের অবাধ্যতা করলে এক অতি বড় বিভীষিকার দিনে আমি শাস্তির ভয় করি’’। তাইসিরুল

আর যখন তাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় - যা অতি স্পষ্ট, তখন ঐ সব লোক, যাদের আমার নিকট উপস্থিত হওয়ার চিন্তা নেই - এইরূপ বলেঃ এটা ছাড়া অন্য কোন কুরআন আনয়ন করুন অথবা এতেই কিছু পরিবর্তন করে দিন। বলঃ আমার দ্বারা ইহা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, আমিতো শুধুমাত্র উহারই অনুসরণ করব যা অহীযোগে আমার কাছে পৌঁছেছে। আমি যদি আমার রবের নাফরমানী করি তাহলে আমি এক অতি ভীষণ দিনের শাস্তির আশংকা রাখি। মুজিবুর রহমান

And when Our verses are recited to them as clear evidences, those who do not expect the meeting with Us say, "Bring us a Qur'an other than this or change it." Say, [O Muhammad], "It is not for me to change it on my own accord. I only follow what is revealed to me. Indeed I fear, if I should disobey my Lord, the punishment of a tremendous Day." Sahih International

১৫. আর যখন আমাদের আয়াত, যা সুস্পষ্ট, তাদের কাছে পাঠ করা হয় তখন যারা আমাদের সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না(১) তারা বলে, অন্য এক কুরআন আন এটা ছাড়া, বা এটাকে বদলাও। বলুন, নিজ থেকে এটা বদলানো আমার কাজ নয়। আমার প্রতি যা ওহী হয়, আমি শুধু তারই অনুসরণ করি(২)। আমি আমার রবের অবাধ্যতা করলে অবশ্যই মহা দিনের শাস্তির আশংকা করি।

(১) এ আয়াতে আখেরাত অস্বীকারকারীদের একটি ভ্রান্ত ধারণা এবং অন্যায় আবদারের খণ্ডন করা হয়েছে। এসব লোক আল্লাহ তা'আলার ওহী ও রেসালাত সম্পর্কিত কোন পরিচয় জানত না। যে কুরআনুল কারীম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে পৌছেছে, তার সম্পর্কে এদের ধারণা ছিল এই যে, এটি স্বয়ং তারই কালাম, তারই রচনা। এ ধারণার প্রেক্ষিতেই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে দাবী জানায় যে, কুরআন এটি তো আমাদের বিশ্বাসের বিরোধী; যে মূর্তি-বিগ্রহকে আমাদের পিতা-পিতামহ সততঃ সম্মান করে এসেছে, কুরআন সে সমুদয়কে বাতিল ও পরিতাজ্য সাব্যস্ত করে। তদুপরি কুরআন আমাদের বলে যে, মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হতে হবে এবং সেখানে হিসাব-নিকাশ হবে। এসব বিষয় আমাদের বুঝে আসে না। আমরা এসব মানতে রাযী নই। সুতরাং হয় আপনি এ কুরআনের পরিবর্তে অন্য কুরআন তৈরী করে দিন যাতে এসব বিষয় থাকবে না, আর না হয় অন্ততঃ এতেই সংশোধন করে সে বিষয়গুলো বাদ দিয়ে দিন। [দেখুন, বাগভী; কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]

তারা আরও চাচ্ছিল যে, হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করে দিন। [তাবারী; কুরতুবী] আল্লাহ্ তা'আলা তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস দূর করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে হেদায়াত দান করেছেন যে, আপনি তাদের বলে দিনঃ এটি আমার কালামও নয় এবং নিজের ইচ্ছামত আমি এতে কোন পরিবর্তন-পরিবর্ধনও করতে পারি না। আমি তো শুধুমাত্র আল্লাহর ওহীর তাবেদার। আমি আমার ইচ্ছামত এতে যদি সামান্যতম পরিবর্তনও করি, তাহলে অতি কঠিন গোনাহগার হয়ে পড়ব এবং নাফরমানদের জন্য যে আযাব নির্ধারিত রয়েছে, আমি তার ভয় করি। কাজেই আমার পক্ষে এমনটি অসম্ভব। [ফাতহুল কাদীর]

(২) এটি হচ্ছে ওপরের দুটি কথার জবাব। এখানে একথাও বলে দেয়া হয়েছে যে, আমি এ কিতাবের রচয়িতা নই বরং অহীর মাধ্যমে এটি আমার কাছে এসেছে এবং এর মধ্যে কোন রকম রদবদলের অধিকারও আমার নেই। আর তাছাড়া এ ব্যাপারে কোন প্রকার সমঝোতার সামান্যতম সম্ভাবনাও নেই। যদি গ্রহণ করতে হয় তাহলে এ সমগ্র দীনকে হুবহু গ্রহণ করতে হবে, নয়তো পুরোপুরি রদ করে দিতে হবে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৫) আর যখন তাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে পাঠ করা হয়,[1] তখন যারা আমার সাক্ষাতের ভয় করে না, তারা বলে, ‘এটা ছাড়া অন্য কোন কুরআন আনয়ন কর অথবা এতে পরিবর্তন কর।’[2] তুমি বলে দাও, ‘আমার জন্য এটা সম্ভব নয় যে, আমি নিজের পক্ষ হতে এতে পরিবর্তন করি।[3] আমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ হয়, আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি। যদি আমি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হই, তাহলে আমি এক অতি ভীষণ দিনের শাস্তির আশংকা করি।’ [4]

[1] অর্থাৎ, এমন আয়াত যার দ্বারা আল্লাহর উপাস্যতত্ত্ব ও একতত্ত্ববাদকে বুঝা যায়।

[2] অর্থ এই যে, এই কুরআন মাজীদের পরিবর্তে অন্য কুরআন আনয়ন কর অথবা এই কুরআনে আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিবর্তন সাধন কর।

[3] অর্থাৎ, দুটো প্রস্তাবই মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়, যেহেতু এতে আমার কোন এখতিয়ার নেই।

[4] এটা পূর্ব কথার তাকীদ। আমি তো শুধু সেই কথার অনুসারী, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার প্রতি অবতীর্ণ হয়। তাতে কিছু রদবদল বা কমবেশি করলে কিয়ামতের দিনের শাস্তি থেকে আমি রক্ষা পাব না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ১৬ قُلۡ لَّوۡ شَآءَ اللّٰهُ مَا تَلَوۡتُهٗ عَلَیۡكُمۡ وَ لَاۤ اَدۡرٰىكُمۡ بِهٖ ۫ۖ فَقَدۡ لَبِثۡتُ فِیۡكُمۡ عُمُرًا مِّنۡ قَبۡلِهٖ ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ ﴿۱۶﴾
قل لو شآء الله ما تلوتهٗ علیكم و لا ادرىكم بهٖ فقد لبثت فیكم عمرا من قبلهٖ افلا تعقلون ﴿۱۶﴾

বল, ‘যদি আল্লাহ চাইতেন, আমি তোমাদের উপর তা পাঠ করতাম না। আর তিনি তোমাদেরকে এ সম্পর্কে অবহিত করতেন না। কেননা, ইতঃপূর্বে আমি তোমাদের মধ্যে দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেছি। তবে কি তোমরা বুঝ না’? আল-বায়ান

বল, ‘‘আল্লাহর ইচ্ছে হলে আমি তোমাদের কাছে তা তিলাওয়াত করতাম না, আর আল্লাহও তোমাদেরকে তার খবর দিতেন না। আমি তো এর পূর্বে একটা দীর্ঘ সময় তোমাদের মাঝে অতিবাহিত করেছি, তা সত্ত্বেও তোমরা কি বুঝবে না? তাইসিরুল

তুমি বলে দাওঃ যদি আল্লাহর ইচ্ছা হত তাহলে, না আমি তোমাদেরকে এটা পাঠ করে শোনাতাম আর না আল্লাহ তোমাদেরকে ওটা জানাতেন। কেননা আমি এর পূর্বেওতো জীবনের এক দীর্ঘ সময় তোমাদের মধ্যে অতিবাহিত করেছি; তাহলে কি তোমরা এতটুকু জ্ঞান রাখনা? মুজিবুর রহমান

Say, "If Allah had willed, I would not have recited it to you, nor would He have made it known to you, for I had remained among you a lifetime before it. Then will you not reason?" Sahih International

১৬. বলুন, আল্লাহ যদি চাইতেন আমিও তোমাদের কাছে এটা তিলাওয়াত করতাম না এবং তিনিও তোমাদেরকে এ বিষয়ে জানাতেন না। আমি তো এর আগে তোমাদের মধ্যে জীবনের দীর্ঘকাল অবস্থান করেছি(১); তবুও কি তোমরা বুঝতে পার না?(২)

(১) এ সময়টুকু ছিল, চল্লিশ বৎসর। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ “আল্লাহ্ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চল্লিশ বৎসর বয়সে নবুওয়াত দেন।” [বুখারীঃ ৩৫৪৮, মুসলিমঃ ২৩৪৭]

(২) মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে নিজে এ কিতাবের রচয়িতা নন বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে অহীর মাধ্যমে এটি তার ওপর নাযিল হচ্ছে, তার এ দাবীর সপক্ষে এটি একটি জোরালো যুক্তি। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন তো তাদের মাঝেই ছিল। নবুওয়াত লাভের আগে পুরো চল্লিশটি বছর তিনি তাদের মধ্যে অতিবাহিত করেছিলেন। কোন লেখা পড়া জানতেন না। [কুরতুবী] তিনি তাদের শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের চোখের সামনে তাঁর শিশুকাল অতিক্রান্ত হয়। সেখানেই বড় হন। যৌবনে পদার্পণ করেন তারপর প্রৌঢ়ত্বে পৌছেন। থাকা-খাওয়া, ওঠা-বসা, লেনদেন, বিয়ে শাদী ইত্যাদি সব ধরনের সামাজিক সম্পর্ক তাদের সাথেই ছিল এবং তার জীবনের কোন দিক তাদের কাছে গোপন ছিল না।

তার এ জীবনধারার মধ্যে দুটি বিষয় একেবারেই সুস্পষ্ট ছিল। মক্কার প্রত্যেকটি লোকই তা জানতো। এক, নবুওয়াত লাভ করার আগে তার জীবনের পুরো চল্লিশটি বছরে তিনি এমন কোন শিক্ষা, সাহচর্য ও প্রশিক্ষণ লাভ করেননি এবং তা থেকে এমন তথ্যাদি সংগ্রহ করেননি যার ফলে একদিন হঠাৎ নবুওয়াতের দাবী করার সাথে সাথেই তার কণ্ঠ থেকে এ তথ্যাবলীর ঝর্ণাধারা নিঃসৃত হতে আরম্ভ করেছে। দ্বিতীয় যে কথাটি তাঁর পূর্ববর্তী জীবনে সুস্পষ্ট ছিল সেটি এই যে, নবুওয়াত লাভের পূর্ব থেকেই তিনি সততা ও আমানতদারীতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। [কুরতুবী] মিথ্যা, প্রতারণা, জালিয়াতী, ধোঁকা, শঠতা, ছলনা এবং এ ধরনের অন্যান্য অসৎগুণাবলীর কোন সামান্যতম গন্ধও তাঁর চরিত্রে পাওয়া যেতো না।

মূলতঃ এটা এমন একটি দিক যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের অত্যন্ত সুস্পষ্ট দলীল। সম্রাট হিরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তোমরা কি তাকে (অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে) এ-ধরনের (অর্থাৎ নবুওয়তের) দাবীর পূর্বে কখনো মিথ্যা বলার অপবাদ দিতে? আবু সুফিয়ান তখন বলেছিল, না-- অথচ আবু সুফিয়ান ঐ সময় কাফেরদের সর্দার ছিল। তারপরও সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে হক কথা বলতে বাধ্য হয়েছিল। আর জানা কথা যে, শক্রদের মুখ থেকে যে প্রশংসা বের হয় তা যথার্থ প্রশংসা।

মোটকথাঃ তখন সম্রাট হিরাক্লিয়াস বলেছিলেনঃ “আমি এটা অবশ্যই বুঝি যে, সে মানুষের সাথে মিথ্যা কথা ত্যাগ করেছে তারপর সে আল্লাহর উপর মিথ্যা কথা বলবে এটা কখনো হতে পারে না” [বুখারীঃ ৭, মুসলিমঃ ১৭৭৩] অনুরূপভবে জাফর ইবনে আবি তালেবও আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাসির দরবারে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে বলেছেন যে, “আল্লাহ আমাদের মধ্যে এমন একজন রাসূলকে পাঠিয়েছেন যার গুণাগুণ বংশ পরিচয় ও আমানতদারী সম্পর্কে আমাদের সবাই জানে”। [মুসনাদে আহমাদ: ১/২০১]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৬) বল, ‘আল্লাহর ইচ্ছা হলে আমি তোমাদের কাছে এটা পাঠ করতাম না এবং আল্লাহ তোমাদেরকে ওটা জানাতেন না।[1] আমি এর পূর্বেও তো জীবনের এক দীর্ঘ সময় তোমাদের মধ্যে অতিবাহিত করেছি; তবুও কি তোমরা বুঝতে পার না?’ [2]

[1] অর্থাৎ সমস্ত কিছু আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর; তিনি চাইলে আমি তোমাদেরকে তা না পড়ে শুনাতাম, আর না তোমরা তা জানতে পারতে। অনেকে أَدْرَاكُمْ এর অর্থ أَعْلَمَكُمْ بِهِ عَلَى لِسَانِيْ অর্থাৎ, আর না তিনি তোমাদেরকে আমার মুখ দ্বারা এই কুরআন জানাতেন।

[2] অর্থাৎ, তোমরা তো জান যে, নবুঅত দাবী করার পূর্বে দীর্ঘ চল্লিশ বছর আমি তোমাদের মাঝে অতিবাহিত করেছি। আমি কি তখন কোন শিক্ষকের নিকট কিছু শিক্ষা নিয়েছিলাম? অনুরূপ তোমরা আমার আমানতদার ও সত্যবাদী হওয়ার কথাও স্বীকার করতে। এখন কি সম্ভব যে, আমি আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করতে আরম্ভ করব? উক্ত দুটি কথার অর্থ এই যে, এই কুরআন একমাত্র আল্লাহরই অবতীর্ণকৃত গ্রন্থ। আমি না কারোর নিকট শ্রবণ করে বা শিখে তা বর্ণনা করেছি, আর না এমনিই মিছামিছি আমি তা আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করেছি।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ১৭ فَمَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنِ افۡتَرٰی عَلَی اللّٰهِ كَذِبًا اَوۡ كَذَّبَ بِاٰیٰتِهٖ ؕ اِنَّهٗ لَا یُفۡلِحُ الۡمُجۡرِمُوۡنَ ﴿۱۷﴾
فمن اظلم ممن افتری علی الله كذبا او كذب بایتهٖ انهٗ لا یفلح المجرمون ﴿۱۷﴾

অতএব যে আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে, তার চেয়ে বড় যালিম কে ? নিশ্চয় অপরাধীরা সফল হবে না। আল-বায়ান

তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে যে মিথ্যা রচনা ক’রে আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয় অথবা আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করে; নিশ্চিতই অপরাধীরা সাফল্য লাভ করতে পারে না। তাইসিরুল

অতএব সেই ব্যক্তির চেয়ে অধিক অত্যাচারী (যালিম) কে যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে? নিঃসন্দেহে এমন পাপাচারীদের কিছুতেই মঙ্গল হবেনা। মুজিবুর রহমান

So who is more unjust than he who invents a lie about Allah or denies His signs? Indeed, the criminals will not succeed Sahih International

১৭. অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা বা আল্লাহর আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করে তার চেয়ে বড় যালিম আর কে?(১) নিশ্চয় অপরাধীরা সফলকাম হবে না।(২)

(১) অর্থাৎ তার চাইতে বড় যালেম আর কেউ নেই যে আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করে এবং তাঁর বাণী পরিবর্তন করে। আর তিনি যা নাযিল করেছেন তার সাথে কোন কিছু যোগ করে দেয়। অনুরূপভাবে তোমাদের থেকে বড় যালেমও আর কেউ হবে না যদি তোমরা কুরআনকে অস্বীকার কর এবং আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দাও এবং বল যে, এটা আল্লাহর কালাম নয়। এটাই আল্লাহ তা'আলা তার রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তিনি তাদেরকে এটা জানিয়ে দেন। [কুরতুবী]

(২) অর্থাৎ যারা আল্লাহর উপর মিথ্যাচার করে তারা কখনো সফলকাম হবে না। তাদের কর্মকাণ্ড মানুষের কাছে মিথ্যা হিসেবে বিবেচিত হবেই। মূলত: নবী সত্য বা মিথ্যা এটা জানার বিভিন্ন পদ্ধতি বিদ্যমান। তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, দু'জনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, কথাবার্তা, চাল-চলন ইত্যাদি তুলনা করা। বিবেকবান মাত্রই এ কাজটি সহজে করতে পারে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মুসাইলামা কাযযাবের কোন তুলনা কি চলে? আমর ইবনে আস একবার মুসাইলামার কাছে গেল। মুসাইলামা তার পুরাতন বন্ধু ছিল। আমর তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। তখন মুসাইলামা তাকে জিজ্ঞাসা করলঃ হে আমর! তোমাদের লোকের (অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর) উপর এ সময়ে কি নাযিল হয়েছে? আমর ইবনে আস জবাবে বললঃ আমি তার সাথীদের একটি সূরা পড়তে শুনেছি।

মুসাইলামা বললঃ সেটা কি? আমর বললঃ (وَالْعَصْرِ ٭ إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ ٭ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ) সূরাটি শুনে মুসাইলামা কিছুক্ষণ চিন্তা করতে থাকলো, তারপর বললোঃ আমার উপরও অনুরূপ নাযিল করা হয়েছে। আমর বললোঃ সেটা কি? সে বললঃ يَاوَبَرَ إنَّهَا أنْتَ أُذْنَانِ وَصَدَرُ وَسَائِرُكَ حَقْرٌ نَقْرٌ তারপর মুসাইলামা বাহাদুরী নেয়ার আশায় আমরের দিকে তাকিয়ে বললোঃ আমর! কেমন লাগলো? তখন আমর বললোঃ আল্লাহর শপথ করে বলছি, তুমি অবশ্যই এটা জানো যে, আমি জানি, তুমি মিথ্যা বলছ। [ইবন কাসীর; ইবন রাজাব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম: ১১২] এটাই যদি একজন কাফেরের বিশ্লেষণ তাহলে মুমিন কত সহজেই সত্য নবী ও মিথ্যা নবীর মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে তা বলাই বাহুল্য।

অপরদিকে আমরা সত্য নবীর ব্যাপারেও তার সততার সাক্ষ্য খুব সহজভাবেই দেখতে পাই। আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম বলেনঃ “যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমণ করলেন তখন লোকেরা চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসলো। আমিও তাদের সাথে আসার পর যখন আমি তাকে দেখলাম তখনি বুঝতে পারলাম যে, তার চেহারা কোন মিথ্যুক লোকের চেহারা নয়। তখন আমি প্রথম যে কথা কয়টি শুনেছিলাম তা হলোঃ হে মানব সম্প্রদায়! সালামের প্রসার কর, খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখো এবং রাতে মানুষেরা যখন ঘুমন্ত থাকে তখন সালাত আদায় কর, ফলে তোমরা প্রশান্তির সাথে বা সালামের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে”। [মুস্তাদরাকে হাকেমঃ ৪২৮৩]।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৭) অতএব সে ব্যক্তির চেয়ে অধিক অত্যাচারী কে হবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করে? নিঃসন্দেহে এমন অপরাধিগণ সফলকাম হবে না।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ১৮ وَ یَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ مَا لَا یَضُرُّهُمۡ وَ لَا یَنۡفَعُهُمۡ وَ یَقُوۡلُوۡنَ هٰۤؤُلَآءِ شُفَعَآؤُنَا عِنۡدَ اللّٰهِ ؕ قُلۡ اَتُنَبِّـُٔوۡنَ اللّٰهَ بِمَا لَا یَعۡلَمُ فِی السَّمٰوٰتِ وَ لَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ سُبۡحٰنَهٗ وَ تَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِكُوۡنَ ﴿۱۸﴾
و یعبدون من دون الله ما لا یضرهم و لا ینفعهم و یقولون هؤلآء شفعآؤنا عند الله قل اتنبـٔون الله بما لا یعلم فی السموت و لا فی الارض سبحنهٗ و تعلی عما یشركون ﴿۱۸﴾

আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদত করছে, যা তাদের ক্ষতি করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, ‘এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী’। বল, ‘তোমরা কি আল্লাহকে আসমানসমূহ ও যমীনে থাকা এমন বিষয়ে সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন’? তিনি পবিত্র মহান এবং তারা যা শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। আল-বায়ান

আর তারা আল্লাহকে ছেড়ে ‘ইবাদাত করে এমন কিছুর যা না পারে তাদের কোন ক্ষতি করতে, আর না পারে কোন উপকার করতে। আর তারা বলে, ‘‘ওগুলো আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী’’। বল, ‘‘তোমরা কি আল্লাহকে এমন কিছুর সংবাদ দিতে চাও, যা তিনি অবগত নন, না আকাশমন্ডলীতে আর না যমীনে? মহান পবিত্র তিনি, তোমরা যা কিছুকে তাঁর শরীক গণ্য কর তাত্থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে। তাইসিরুল

আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন বস্তুসমূহের ইবাদাত করে যারা তাদের কোন অপকার করতে পারেনা এবং তাদের কোন উপকারও করতে পারেনা। আর তারা বলে, এরা হচ্ছে আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বলে দাওঃ তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন, না আসমানে, আর না যমীনে? তিনি পবিত্র এবং তাদের মুশরিকী কার্যকলাপ হতে তিনি অনেক উর্ধ্বে। মুজিবুর রহমান

And they worship other than Allah that which neither harms them nor benefits them, and they say, "These are our intercessors with Allah " Say, "Do you inform Allah of something He does not know in the heavens or on the earth?" Exalted is He and high above what they associate with Him Sahih International

১৮. আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদাত করছে যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, এগুলো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। বলুন, তোমরা কি এমন কিছুর সংবাদ দেবে যা তিনি জানেন না?(১) তিনি মহান, পবিত্র এবং তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে।

(১) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলাই সর্বজ্ঞানী। আসমান ও যমীনে যা আছে তার জ্ঞান সেটাকে ঘিরে আছে। তিনি তোমাদের জানাচ্ছেন যে, তার কোন শরীক নেই, তার সাথে কোন ইলাহ নেই। আর হে মুশরিক সম্প্রদায়! তোমরা মনে করছ যে, তাঁর শরীক পাওয়া যায়? তোমরা কি তাকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ যা তার কাছে গোপন রয়েছে এবং তোমরা জেনে নিয়েছ? এটা নিঃসন্দেহে বড় অসার কথা। এ মূৰ্খ লোকগুলো কি রাব্বুল আলামীনের চেয়ে বেশী জানে? এ বিষয়টি সম্পর্কে সামান্য চিন্তা করলেই এর অসারতা ধরা পড়ে। [সা’দী]

কারণ, কোন জিনিসের আল্লাহর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার মানেই হচ্ছে এই যে, সেটির কোন অস্তিত্বই নেই। কারণ, যা কিছুর অস্তিত্ব আছে সবই আল্লাহর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই আল্লাহ তো জানেন না আকাশে ও পৃথিবীতে তার কোন শরীক আছে। অনুরূপভাবে তিনি জানেন না তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে কোন সুপারিশকারী আছে, এটি সুপারিশকারীদের অস্তিত্বহীনতার ব্যাপারে একটি চমৎকার বর্ণনা পদ্ধতি। অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবীতে যখন কোন সুপারিশকারী আছে বলে আল্লাহর জানা নেই এখন তোমরা কোন সুপারিশকারীদের কথা বলছ? [ফাতহুল কাদীর] অন্য আয়াতেও আল্লাহ্ তা'আলা এ কথাটি বলেছেন। তিনি বলেন, “আর তারা আল্লাহর বহু শরীক সাব্যস্ত করেছে। বলুন, তাদের পরিচয় দাও। নাকি তোমরা যমীনের মধ্যে এমন কিছুর সংবাদ দিতে চাও যা তিনি জানেন না?” [সূরা আর-রাদ: ৩৩]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৮) আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর উপাসনা করে[1] যা তাদের কোন অপকারও করতে পারে না এবং কোন উপকারও করতে পারে না।[2] অথচ তারা বলে, এরা হচ্ছে আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী।[3] তুমি বলে দাও, ‘তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন, না আকাশসমূহে, আর না পৃথিবীতে?[4] তিনি পবিত্র এবং তারা যে অংশী করে, তা হতে তিনি ঊর্ধ্বে।’ [5]

[1] অর্থাৎ, আল্লাহর ইবাদত অতিক্রম করে, পূর্ণভাবে আল্লাহর ইবাদত বর্জন করে নয়। কারণ মুশরিকরা আল্লাহর ইবাদত করত এবং তার সাথে সাথে গায়রুল্লাহরও ইবাদত করত।

[2] অথচ প্রকৃত উপাস্যের যোগ্যতা এই থাকবে যে, তিনি তাঁর অনুগতদেরকে উত্তম প্রতিদান এবং তাঁর অবাধ্যদেরকে শাস্তি প্রদানে ক্ষমতাবান হবেন।

[3] অর্থাৎ, তাদের সুপারিশে আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রয়োজন পূরণ করেন। আমাদের দুরবস্থা দূর করে দেন এবং শত্রুদের সুখ নষ্ট করে দেন। অর্থাৎ, মুশরিকরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের উপাসনা করত, তাদেরকে উপকার ও অপকারে স্বেচ্ছাধীন (এবং স্বতন্ত্র উপাস্য) ভাবত না, বরং আল্লাহ ও নিজেদের মাঝে মাধ্যম বা অসীলা ভাবত।

[4] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা জানেন না যে, তাঁর কেউ অংশীদার আছে, বা তাঁর দরবারে সুপারিশকারীও হবে? ঠিক যেন মুশরিকরা আল্লাহ তাআলাকে জানাতে চায় যে, তুমি জান না। আমরা তোমাকে জানাচ্ছি যে, তোমার অংশীদারও আছে এবং এমন সুপারিশকারীও আছে, যারা তার বিশ্বাসীদের জন্য সুপারিশ করবে!

[5] আল্লাহ তাআলা বলেন, মুশরিকদের এসব কথা ভিত্তিহীন, আল্লাহ তাআলা এ সকল কথা থেকে পবিত্র এবং বহু ঊর্ধ্বে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ১৯ وَ مَا كَانَ النَّاسُ اِلَّاۤ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً فَاخۡتَلَفُوۡا ؕ وَ لَوۡ لَا كَلِمَۃٌ سَبَقَتۡ مِنۡ رَّبِّكَ لَقُضِیَ بَیۡنَهُمۡ فِیۡمَا فِیۡهِ یَخۡتَلِفُوۡنَ ﴿۱۹﴾
و ما كان الناس الا امۃ واحدۃ فاختلفوا و لو لا كلمۃ سبقت من ربك لقضی بینهم فیما فیه یختلفون ﴿۱۹﴾

আর মানুষ তো এক উম্মতই ছিল। পরে তারা বিভক্ত হয়ে পড়ল। আর তোমার রবের পক্ষ থেকে বাণী বিগত না হলে তাদের মধ্যে মীমাংসা হয়ে যেত, যা নিয়ে তারা মতবিরোধ করে। আল-বায়ান

মানুষ ছিল এক উম্মতভুক্ত। পরে তারা মতভেদ সৃষ্টি করল। তোমার প্রতিপালক পূর্বেই যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করতেন, তাহলে যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে তার মীমাংসা অবশ্যই করে দেয়া হত। তাইসিরুল

আর সমস্ত মানুষ (প্রথম) এক উম্মাতই ছিল, অতঃপর তারা মতভেদ সৃষ্টি করল। আর যদি তোমার রবের পক্ষ হতে এক নির্দেশ বাণী প্রথমে সাব্যস্ত হয়ে না থাকত তাহলে যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে তার চূড়ান্ত মীমাংসা হয়ে যেত। মুজিবুর রহমান

And mankind was not but one community [united in religion], but [then] they differed. And if not for a word that preceded from your Lord, it would have been judged between them [immediately] concerning that over which they differ. Sahih International

১৯. আর মানুষ ছিল একই উম্মত, পরে তারা মতভেদ সৃষ্টি করে(১)। আর আপনার রবের পূর্ব ঘোষণা না থাকলে তারা যে বিষয়ে মতভেদ ঘটায় তার মীমাংসা তো হয়েই যেত।(২)

(১) অর্থাৎ সমস্ত আদম সন্তান প্রথমে একত্ববাদে বিশ্বাসী একই উম্মত ও একই জাতি ছিল। শির্ক ও কুফরের নামও ছিল না। পরে একত্ববাদে মতবিরোধ সৃষ্টি করে বিভিন্ন জাতি ও বিভিন্ন সম্পপ্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যায়। একই উম্মত এবং সবার মুসলিম থাকার সময়কাল কতদিন এবং কবে ছিল তা বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, নূহ আলাইহিস সালাম-এর যুগ পর্যন্ত এমনি অবস্থা ছিল।

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আদম ও নৃহের মধ্যে দশ প্রজন্ম ছিল যারা তাওহীদের উপর ছিল। [তাবারী; ইবন কাসীর]। এরপর মানুষের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয় এবং ঈমানের বিরুদ্ধে কুফর ও শির্কী বিস্তার লাভ করে, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তার নবী-রাসূলদেরকে ভীতিপ্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদানকারী হিসেবে কিতাবসহ প্রেরণ করেন। “যাতে যে কেউ ধ্বংস হবে সে যেন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর ধ্বংস হয় এবং যে জীবিত থাকবে সে যেন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর জীবিত থাকে।” [সূরা আল-আনফাল ৪২] [ইবন কাসীর]

(২) কোন কোন মুফাসসির বলেন, সে কলেমাটি হচ্ছে এই যে, তিনি এ উম্মতকে সবশেষে আনবেন এবং তাদেরকে দুনিয়াতে আযাব না দিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দিবেন। যদি এ অবকাশ না থাকত তবে অবশ্যই তাদের আযাব দিয়ে শেষ করে দেয়া হতো অথবা কিয়ামত অনুষ্ঠিত হয়ে যেত। [কুরতুবী] কোন কোন তাফসীরবিদ বলেন, এখানে ‘কালেমা’ বলে এটাই বোঝানো হয়েছে যে, তিনি কাউকে দলীল-প্রমাণাদি ছাড়া পাকড়াও করবেন না। আর সেটা হচ্ছে, রাসূল প্রেরণ। যেমন অন্য আয়াতে বলেছেন, “আর আমরা রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত শাস্তি প্রদানকারী নই।” [সূরা আল-ইসরাঃ ১৫]

কারও কারও মতে, এখানে কালেমা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে বর্ণিত একটি কালেমাকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে এসেছে, আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর প্রাধান্য পাবে’। [বুখারী: ৭৫৫৩; মুসলিম: ২৭৫১] যদি তা না হতো তবে তিনি অপরাধীদেরকে তাওবার সময় দিতেন না। [কুরতুবী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯) সমস্ত মানুষ (প্রথমে) এক জাতিই ছিল, অতঃপর তারা মতভেদ সৃষ্টি করল।[1] যদি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে পূর্ব-ঘোষণা না থাকত, তাহলে যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে, তার চূড়ান্ত মীমাংসা হয়ে যেত। [2]

[1] অর্থাৎ শিরক হল মানুষের নিজেদের মনগড়া কর্ম। কেননা, প্রথমে এর কোন অস্তিতত্ত্বই ছিল না। সকল মানুষ একই দ্বীন ও একই পথের পথিক ছিল। আর সে পথ হল ইসলামের পথ, যার আসল ভিত্তি হল তাওহীদ। নূহ (আঃ) পর্যন্ত মানুষ সেই তাওহীদের উপর অটল ছিল। পরবর্তীতে তাদের মাঝে একতত্ত্ববাদে মতবিরোধ সৃষ্টি হয় এবং কিছু মানুষ আল্লাহর সাথে, অন্যদেরকেও উপাস্য, প্রয়োজন পূরণকারী এবং দুঃখ-কষ্ট মোচনকারী ভাবতে আরম্ভ করে।

[2] অর্থাৎ যদি আল্লাহর এই ফায়সালা না হত যে, ‘‘পূর্ণ প্রমাণ সাব্যস্ত হওয়ার পূর্বে কাউকে শাস্তি দিব না’’, অনুরূপ তিনি সৃষ্টি-জগতের (হিসাব-নিকাশের) জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত না করে থাকতেন, তাহলে অবশ্যই তিনি তাদের মাঝে ঘটিত মতবিরোধের ফায়সালা করে দিতেন এবং মু’মিনদেরকে বড় সুখী ও কাফেরদেরকে শাস্তি ও কষ্টের সম্মুখীন করতেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১০ : ২০ وَ یَقُوۡلُوۡنَ لَوۡ لَاۤ اُنۡزِلَ عَلَیۡهِ اٰیَۃٌ مِّنۡ رَّبِّهٖ ۚ فَقُلۡ اِنَّمَا الۡغَیۡبُ لِلّٰهِ فَانۡتَظِرُوۡا ۚ اِنِّیۡ مَعَكُمۡ مِّنَ الۡمُنۡتَظِرِیۡنَ ﴿۲۰﴾
و یقولون لو لا انزل علیه ایۃ من ربهٖ فقل انما الغیب لله فانتظروا انی معكم من المنتظرین ﴿۲۰﴾

আর তারা বলে, ‘তাঁর রবের পক্ষ থেকে তার উপর কোন নিদর্শন কেন নাযিল করা হয় না’? বল, ‘গায়েবের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহরই। অতএব তোমরা অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় রয়েছি’। আল-বায়ান

তারা বলে, ‘‘তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে কোন নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না কেন?’’ এদের জবাবে বলে দাও, ‘‘অদৃশ্য জগতের একচ্ছত্র মালিক হলেন আল্লাহ, কাজেই তোমরা অপেক্ষা কর (এবং ভবিষ্যতে কী হয় দেখ), আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষমান থাকলাম। তাইসিরুল

আর তারা বলেঃ তার প্রতি তার রবের পক্ষ হতে কোন মু’জিযা কেন নাযিল হলনা? তুমি বলে দাওঃ গাইবের খবর শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন। অতএব তোমরা প্রতীক্ষায় থাক, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষায় থাকলাম। মুজিবুর রহমান

And they say, "Why is a sign not sent down to him from his Lord?" So say, "The unseen is only for Allah [to administer], so wait; indeed, I am with you among those who wait." Sahih International

২০. আর তারা বলে, ‘তার রবের কাছ থেকে তার কাছে কোন নিদর্শন নাযিল হয় না কেন?(১) বলুন, গায়েবের জ্ঞান তো শুধু আল্লাহরই আছে। কাজেই তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি।(২)

(১) অর্থাৎ এ ব্যাপারে নিদর্শন যে, তিনি যথার্থই সত্য নবী এবং যা কিছু তিনি পেশ করছেন তা পুরোপুরি ঠিক। এ প্রসঙ্গে একটি কথা মনে রাখতে হবে। সেটি হচ্ছে, নিদর্শন পেশ করার দাবী তারা এ জন্য করেনি যে, তারা সাচ্চা দিলে সত্যের দাওয়াত গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল। আসলে নিদর্শনের এ দাবী শুধুমাত্র ঈমান না আনার জন্য একটি বাহানা হিসেবে পেশ করা হচ্ছিল। তাদেরকে যাই কিছু দেখানো হতো তা দেখার পরও তারা একথাই বলতো, আমাদের কোন নিদর্শনই দেখানো হয়নি। কারণ তারা ঈমান আনতে চাচ্ছিল না। আল্লাহ বলেনঃ “কত মহান তিনি যিনি ইচ্ছে করলে আপনাকে দিতে পারেন এর চেয়ে উৎকৃষ্ট বস্তু-উদ্যানসমূহ যার নিম্নদেশে নদী-নালা প্রবাহিত এবং তিনি দিতে পারেন আপনাকে প্রাসাদসমূহ! কিন্তু তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে এবং যে কিয়ামতকে অস্বীকার করে তার জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুন। [সূরা আল-ফুরকানঃ ১০] অন্য আয়াতে বলেনঃ “পূর্ববর্তীগণের নিদর্শন অস্বীকার করাই আমাকে নিদর্শন পাঠান থেকে বিরত রাখে।” [সূরা আল-ইসরাঃ ৫৯l

কারণ, তাদের চাহিদা মোতাবেক নিদর্শন পাঠানোর পর যদি ঈমান না আনে তাহলে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। কারণ, আল্লাহর নিয়ম হচ্ছে যে, সুনির্দিষ্ট কোন নিদর্শন চাওয়া হলে সেটা দেয়ার পর যদি ঈমান না আনে তবে তাদের ধ্বংস করা হয়। আর এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে যখন নিদর্শন দেয়া ও অবকাশ না দেয়া আর নিদর্শন না দিয়ে অবকাশ দেয়ার মধ্যে কোন একটি গ্রহণ করার অধিকার প্রদান করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বিতীয়টি গ্রহণ করেছিলেন [ইবন কাসীর] কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে মোটেই কোন নিদর্শন দেখাননি। তাদেরকে অনেক বড় নিদর্শন দেখিয়েছেন। যেমন তাদের চাহিদা মোতাবেক চাঁদকে এমনভাবে দ্বিখণ্ডিত করে দেখিয়েছেন যে, কাফেরগন দুখণ্ডের মাঝে পাহাড় দেখতে পেয়েছিল। [বুখারীঃ ৩৬৩৬, মুসলিমঃ ২৮০০] কিন্তু তারপরও তারা ঈমান আনেনি। বরং আরো বেশী নিদর্শন দাবী করতে লাগল। আসলে তাদের উদ্দেশ্য ঈমান আনা নয়, তাদের উদ্দেশ্য হঠকারিতা। আল্লাহ বলেনঃ “তারা যত নিদর্শনই দেখুক না কেন ঈমান আনবে না”। [সূরা আল-আনআমঃ ২৫] আরো বলেনঃ “তারা যাবতীয় নিদর্শন দেখলেও ঈমান আনবে না”। [সূরা আল-আরাফঃ ১৪৬]

আরো বলেনঃ “নিশ্চয়ই যাদের বিরুদ্ধে আপনার প্রতিপালকের বাক্য সাব্যস্ত হয়ে গেছে, তারা ঈমান আনবে না। যদিও তাদের কাছে সবগুলো নিদর্শন আসে, যতক্ষন পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেখতে পাবে”। [সূরা ইউনুসঃ ৯৬–৯৭] অন্য আয়াতে বলেনঃ “আমরা তাদের কাছে ফিরিশতা পাঠালেও, মৃতেরা তাদের সাথে কথা বললেও এবং সকল বস্তুকে তাদের সামনে হাজির করলেও তারা কখনো ঈমান আনবে না; তবে যদি আল্লাহর ইচ্ছে হয়।” [সূরা আল-আনআমঃ ১১১]।

অহংকার ও সত্যকে অস্বীকার করা তাদের মজ্জাগত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা সুস্পষ্ট বিষয়কেও জেনে বুঝে অস্বীকার করতে দ্বিধা করে না। আল্লাহ বলেনঃ “যদি তাদের জন্য আকাশের দরজা খুলে দেই এবং তারা সারাদিন তাতে আরোহন করতে থাকে, তবুও তারা বলবে,আমাদের দৃষ্টি সম্মোহিত করা হয়েছে; না, বরং আমরা এক জাদুগ্ৰস্ত সম্প্রদায়।” [সূরা আল-হিজরঃ ১৪–১৫] আরো বলেনঃ “তারা আকাশের কোন খন্ড ভেংগে পড়তে দেখলে বলবে, এটা তো এক পুঞ্জিভূত মেঘ। [সূরা আত-তূরঃ ৪৪] আল্লাহ আরো বলেনঃ “আমরা যদি আপনার প্রতি কাগজে লিখিত কিতাবও নাযিল করতাম আর তারা যদি সেটা হাত দিয়ে স্পর্শও করত তবুও কাফিররা বলত, এটা স্পষ্ট জাদু ছাড়া আর কিছু নয়।” [সূরা আল-আনআমঃ ৭]

(২) অর্থাৎ আয়াত নাযিল করা একান্ত গায়েবী বিষয়। [কুরতুবী] আল্লাহ যা কিছু নাযিল করেছেন তা আমি পেশ করে দিয়েছি। আর যা তিনি নাযিল করেননি তা আমার ও তোমাদের জন্য “গায়েবী বিষয়” এর ওপর আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইখতিয়ার নেই। তিনি চাইলে তা নাযিল করতে পারেন। এখন আল্লাহ যা কিছু নাযিল করেননি তা আগে তিনি নাযিল করুন—একথার ওপর যদি তোমাদের ঈমান আনার বিষয়টি আটকে থাকে তাহলে তোমরা তার অপেক্ষায় বসে থাকো। [কুরতুবী] অথবা আয়াতের অর্থ, তোমরা আমাদের আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষা কর। তিনি হককে অবশ্যই বাতিলের উপর প্রকাশ করে দিবেন। [বাগভী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২০) তারা বলে, ‘তাঁর প্রতি তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ হতে কোন নিদর্শন অবতীর্ণ করা হয়নি কেন?’[1] সুতরাং তুমি বলে দাও, ‘অদৃশ্যের খবর শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন।[2] অতএব তোমরা প্রতীক্ষায় থাক, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষায় থাকলাম।’

[1] এদের উদ্দেশ্য হল, কোন বড় ও স্পষ্ট নিদর্শন বা মু’জিযাহ; যেমন সামুদ জাতির জন্য উটনী প্রকাশ করা হয়েছিল। অনুরূপ তাদের দাবী ছিল, এ (মক্কার কাফের)-দের জন্য সাফা পাহাড়কে সোনার পাহাড়ে পরিবর্তন করে অথবা মক্কার সমস্ত পর্বতমালা দূর করে তার স্থলে নদী ও বাগান তৈরী করে অথবা অনুরূপ কোন মু’জিযাহ (অলৌকিক বস্তু) প্রকাশ করে দেখানো হোক।

[2] অর্থাৎ আল্লাহ যদি চান, তবে তাদের চাহিদা অনুযায়ী মু’জিযা প্রকাশ করে দেখাতে পারেন। কিন্তু তার পরেও যদি তারা ঈমান না আনে, তবে আল্লাহর নীতি এই যে, এরূপ জাতিকে তিনি অতি সতত্ত্বর ধ্বংস করে দেন। ফলে একমাত্র তিনিই জানেন যে, কোন জাতির জন্য তাদের চাহিদা মত মু’জিযা প্রকাশ করে দেওয়া তাদের জন্য মঙ্গল হবে, না অমঙ্গল। অনুরূপ এটাও একমাত্র তিনিই জানেন যে, যদি তাদের চাহিদা মত মু’জিযা না দেখানো হয়, তাহলে তাদেরকে কতটা অবকাশ দেওয়া হবে? যার ফলে আয়াতের শেষাংশে বলেছেন, "তোমরা অপেক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় রইলাম।"

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
তাজউইদ কালার কোড
হামযা ওয়াসল মাদ্দে তাবিঈ ইখফা মাদ্দে ওয়াজিব গুন্নাহ মাদ্দে জায়েয নীরব ইদগাম (গুন্নাহ সহ) ক্বলক্বলাহ লাম শামসিয়্যাহ ইদগাম (গুন্নাহ ছাড়া) ইদগাম শাফাউই ইক্বলাব ইখফা শাফাউই মাদ্দে লাযিম ইদগাম মুতাক্বারিবাইন ইদগাম মুতাজানিসাইন