আল্লাহ সর্বশক্তিমান (সব কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান) বিষয়ক আয়াতসমূহ ৩৯ টি
আল-বাকারা
২:২০ یَکَادُ الۡبَرۡقُ یَخۡطَفُ اَبۡصَارَہُمۡ ؕ کُلَّمَاۤ اَضَآءَ لَہُمۡ مَّشَوۡا فِیۡہِ ٭ۙ وَ اِذَاۤ اَظۡلَمَ عَلَیۡہِمۡ قَامُوۡا ؕ وَ لَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَذَہَبَ بِسَمۡعِہِمۡ وَ اَبۡصَارِہِمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۲۰﴾

বিদ্যুৎচমক তাদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়ার উপক্রম হয়। যখনই তা তাদের জন্য আলো দেয়, তারা তাতে চলতে থাকে। আর যখন তা তাদের উপর অন্ধকার করে দেয়, তারা দাঁড়িয়ে পড়ে। আর আল্লাহ যদি চাইতেন, অবশ্যই তাদের শ্রবণ ও চোখসমূহ নিয়ে নিতেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

বিদ্যুৎচমক তাদের দৃষ্টিশক্তি প্রায় কেড়ে নেয়, যখনই বিদ্যুৎচমক তাদের সামনে প্রকাশিত হয়, তখনই তারা পথ চলতে থাকে এবং যখন তাদের উপর অন্ধকার ছেয়ে যায়, তখন তারা থমকে দাঁড়ায়, আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদের শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি হরণ করতে পারতেন, আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। তাইসিরুল

অচিরে বিদ্যুৎ তাদের দৃষ্টি হরণ করবে, যখন তাদের প্রতি আলোক প্রদীপ্ত হয় তখন তারা চলতে থাকে এবং যখন তাদের উপর অন্ধকার আচ্ছন্ন হয় তখন তারা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে এবং যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন - নিশ্চয়ই তাদের শ্রবণশক্তি ও তাদের দৃষ্টিশক্তি হরণ করতে পারেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। মুজিবুর রহমান

২০. বিদ্যুৎ চমকে তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেয়ার উপক্রম হয়(১)। যখনই বিদ্যুতালোক তাদের সামনে উদ্ভাসিত হয় তখনই তারা পথ চলে এবং যখন অন্ধকারে ঢেকে যায় তখন তারা থমকে দাঁড়ায় (২)। আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হরণ করতে পারেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সবকিছুর ক্ষমতাবান (৩)।

১. ইবনে আব্বাস বলেন, এখানে بَرْقٌ বলে, কুরআনের অকাট্য আয়াতগুলোকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কুরআনের অকাট্য আয়াতগুলো বা হকের তীব্র আলো যেন মুনাফিকদের গোপন তথ্য ফাঁস করে দিতে চায়। [আত-তাফসীরুস সহীহ]


২. এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফেকদের সম্পর্কে যে উপমা দিচ্ছেন তার মর্মার্থ হলো- এমন ব্যক্তির উদাহরণ যে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতের মধ্যে পথ অতিক্রম করছে, যাতে রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের অন্ধকার। রাতের আধার, মেঘের আঁধার এবং বৃষ্টির আধার। আরও রয়েছে তাতে বিকট শব্দসম্পন্ন বজ্র, বিদ্যুত চমক। এ ভীষণ অন্ধকারে যখন বিদ্যুত চমকায় তখন সে সামনে এগোয়, আবার যখন অন্ধকারে চেয়ে যায় তখন সে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। মুনাফেকদেরও ঠিক অনুরূপ অবস্থা, যখন তারা কুরআনের আদেশ-নিষেধ, পুরস্কার ও শাস্তির কথা শোনে তখন তারা নিজেদের কানে আঙুল দেয়। কুরআনের আদেশ নিষেধ, পুরস্কার-শাস্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে।

কারণ এগুলো তাকে বিব্রত করে। তারা এগুলোকে এমনভাবে অপছন্দ করে যেমনিভাবে ঐ ব্যক্তি মৃত্যুভয়ে বজ্রের শব্দকে অপছন্দ করে কানে আঙুল দিত। কিন্তু মুনাফেকরা যত বিব্রতই হোক তারা কোনভাবেই নিরাপত্তা লাভ করতে পারবে না। কারণ আল্লাহ তাদেরকে তার জ্ঞান, ক্ষমতা ও শক্তি দ্বারা পরিবেষ্টন করে আছেন। তারা কোনভাবেই তার হাত থেকে নিস্কৃতি পাবে না বা তাকে অপারগও করে দিতে পারবে না। বরং আল্লাহ তাদের কর্মকাণ্ডের সূক্ষ্মতিসূক্ষ্ম হিসাব করে সে অনুসারে তাদেরকে শাস্তি দেবেন। [তাফসীর আস-সাদী] ইবনে কাসীর বলেন, এই দ্বিতীয় উপমা সেই মুনাফিকদের জন্য যাদের কাছে সত্য কখনো কখনো প্রকাশ হয়ে পড়ে। আবার কখনো তারা সন্দেহে পতিত হয়। সন্দেহের সময় তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে বৃষ্টির মত। এই বৃষ্টি এখানে অন্ধকার অবস্থায়ই বর্ষিত হয়। সে অন্ধকার হচ্ছে, সংশয়, অবিশ্বাস ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব।

তদুপরি তারা থাকে সীমাহীন ভীতিপ্রদ অবস্থায়। সুতরাং সত্য যখন সে চিনতে পায়, তখন সে তা নিয়ে সে কথা বলে এবং এর অনুসরণও করে, কিন্তু যখন তাদের দোদুল্য মন কুফরের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কেয়ামতের দিনেও তাদের অবস্থা হবে এই যে, যখন লোকদেরকে তাদের ঈমান অনুযায়ী নূর দেয়া হবে, কেউ পাবে বহু মাইল পর্যন্ত, আবার কেউ কেউ তার চেয়েও বেশী, কেউ তার চেয়ে কম, এমনকি শেষ পর্যন্ত কেউ এতটুকু পাবে যে, কিছুক্ষণ আলোকিত হয়ে আবার তা অন্ধকার হয়ে যাবে। কিছু লোক এমনও হবে যে, তারা একটু গিয়েই থেমে যাবে, আবার কিছু দূর পর্যন্ত আলো পাবে, আবার তা নিবে যাবে। আবার এমন কিছু লোকও হবে যাদের আলো সম্পূর্ণভাবে নিভে যাবে। এরাই হচ্ছে প্রকৃত মুনাফিক, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন, “সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বলবে, তোমরা আমাদের জন্য একটু থাম, যাতে আমরা তোমাদের নূরের কিছু গ্রহণ করতে পারি। বলা হবে, তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও ও নূরের সন্ধান কর”। [সূরা আল-হাদীদ ১৩]


৩. উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে পড়েছে যে, পবিত্র কুরআনের প্রথম থেকে এ পর্যন্ত মানুষকে কয়েক শ্রেনীতে ভাগ করা হয়েছে। এক. খাঁটি মুমিন। সূরা আল-বাকারার প্রথম চার আয়াতে তাদের পরিচয় দেয়া হয়েছে। দুই. খাঁটি কাফের। তাদের বর্ণনা পরবর্তী দুই আয়াতে প্রদত্ত হয়েছে। তিন. মুনাফিক, যারা আবার দুশ্রেণীর। প্রথম, খাটি মুনাফেক। আগুন জ্বালানোর উপমা দিয়ে তাদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয়, সন্দেহের দোলায় দোদুল্যমান মুনাফিক। তারা কখনো ঈমানের আলোকে আলোকিত হয়, কখনো কুফরীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। বজ্র ও বিদ্যুতের উদাহরণ পেশ করে তাদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম দলের অবস্থা থেকে তাদের মুনাফেকী একটু নরম। এ বর্ণনার সাথে সূরা আন-নূরের ৩৫ নং আয়াতের বর্ণনার কোন কোন দিকের মিল রয়েছে [ইবনে কাসীর]

এর মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুমিনরা দু’ভাগে বিভক্ত। এক, সাবেকুন বা মুকাররাবুন, দুই. আসহাবুল ইয়ামীন, আবরার বা সাধারণ মুমিন। আর কাফেররা দু'ভাগে বিভক্ত: এক, অনুসৃত, বা কুফরির দিকে আহবানকারী কাফের দল, দুই, অনুসারী বা অনুসরণকারী সাধারণ কাফেররা। অনুরূপভাবে মুনাফিকদেরও শ্রেণী দুটি। প্রথম শ্রেণীর মুনাফিক হচ্ছে সেসব কট্টর মুনাফিক যাদের অন্তরে ঈমানের লেশমাত্র নেই। দ্বিতীয় শ্রেণীর মুনাফিকের অন্তরে ঈমানের কিছু থাকলেও নিফাকের সব চরিত্র তাদের মধ্যে বিদ্যমান। [ইবনে কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

২০। বিদ্যুৎ-চমক তাদের দৃষ্টি-শক্তিকে প্রায় কেড়ে নেয়। যখনই বিদ্যুতালোক তাদের সম্মুখে উদ্ভাসিত হয়, তারা তখনই পথ চলতে থাকে এবং যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়, তখন তারা থমকে দাঁড়ায়। [1] আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হরণ করতেন। [2] নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

(1) এখানে মুনাফিক্বদের অপর আর এক দলের কথা বলা হচ্ছে, যাদের সামনে কখনো সত্য পরিষ্কার হয়ে যায় আবার কখনো তারা এ ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যে নিমজ্জিত থাকে। কাজেই তাদের সন্দিগ্ধ ও সংশয়ী অন্তর হল সেই বৃষ্টির ন্যায় যা অন্ধকারে বর্ষিত হয়; এর গর্জন ও চমকে তাদের অন্তর ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে; এমনকি ভয়ের কারণে নিজেদের আঙ্গুলগুলো কানের মধ্যে গুঁজে দেয়। কিন্তু এই ব্যবস্থাপনা এবং ভয়-ভীতি তাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচাতে পারবে না। কেননা, তারা আল্লাহর বেষ্টনীর মধ্য থেকে বের হতে পারবে না। কখনো সত্যের কিরণ তাদের উপর পড়লে তারা তার প্রতি ঝুঁকে পড়ে, কিন্তু আবার যখন ইসলাম ও মুসলিমদের উপর কঠিন সময় আসে, তখন তারা উদভ্রান্ত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। (ইবনে কাসীর) মুনাফিক্বদের এ দল শেষ পর্যন্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সন্দেহ সংশয়ের শিকার হয়ে সত্য গ্রহণ করা থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়।

(2) এখানে এ ব্যাপারে হুঁশিয়ারী দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাঁর প্রদত্ত সমস্ত যোগ্যতা ছিনিয়ে নিতে পারেন। কাজেই মানুষের উচিত, মহান আল্লাহর আনুগত্য করা থেকে দূরে এবং তাঁর পাকড়াও থেকে নির্ভয় না থাকা।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১০৬ مَا نَنۡسَخۡ مِنۡ اٰیَۃٍ اَوۡ نُنۡسِہَا نَاۡتِ بِخَیۡرٍ مِّنۡہَاۤ اَوۡ مِثۡلِہَا ؕ اَلَمۡ تَعۡلَمۡ اَنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۱۰۶﴾

আমি যে আয়াত রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দেই, তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার মত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

আমি কোন আয়াত রহিত করলে কিংবা ভুলিয়ে দিলে, তাত্থেকে উত্তম কিংবা তারই মত আয়াত নিয়ে আসি, তুমি কি জান না যে, আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান। তাইসিরুল

আমি কোন আয়াতের হুকুম রহিত করলে কিংবা আয়াতটিকে বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তদনুরূপ আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জাননা যে, আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপরই ক্ষমতাবান? মুজিবুর রহমান

১০৬. আমরা কোন আয়াত রহিত করলে বা ভুলিয়ে দিলে তা থেকে উত্তম অথবা তার সমান কোন আয়াত এনে দেই(১)। আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

(১) এই আয়াতে কুরআনী আয়াত রহিত হওয়ার সম্ভাব্য সকল প্রকারই সন্নিবেশিত হয়েছে। অভিধানে ‘নস্‌খ’ শব্দের অর্থ দূর করা, লেখা, স্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া। আয়াতে ‘নস্‌খ’ শব্দ দ্বারা বিধি-বিধান দূর করা - অর্থাৎ রহিত করাকে বুঝানো হয়েছে। এ কারণেই হাদীস ও কুরআনের পরিভাষায় এক বিধানের স্থলে অন্য বিধান প্রবর্তন করাকে ‘নস্‌খ’ বলা হয়। ‘অন্য বিধান’ টি কোন বিধানের বিলুপ্তি ঘোষণাও হতে পারে, আবার এক বিধানের পরিবর্তে অপর বিধান প্রবর্তনও হতে পারে। [ইবনে কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

১০৬। আমি কোন আয়াত (বাক্য) রহিত করলে[1] অথবা ভুলিয়ে দিলে তা থেকে উত্তম কিংবা তার সমতুল্য কোন আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান?

[1] نَسخ (নসখ) এর আভিধানিক অর্থ হল, নকল করা। কিন্তু শরীয়তের পরিভাষায় তা হল, কোন বিধানকে রহিত করে তার পরিবর্তে অন্য বিধান অবতীর্ণ করা। আর এই রহিতকরণ বা পরিবর্তন হয়েছে আল্লাহরই পক্ষ থেকে। যেমন, আদম (আঃ)-এর যুগে সহোদর ভাই-বোনদের আপোসে বিবাহ বৈধ ছিল। পরবর্তীকালে তা হারাম করা হয়। এইভাবে কুরআনেও আল্লাহ কিছু বিধানকে রহিত করে তার পরিবর্তে নতুন বিধান অবতীর্ণ করেছেন। এর সংখ্যার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। শাহ ওলীউল্লাহ 'আল-ফাউযুল কাবীর' নামক কিতাবে এর সংখ্যা পাঁচ বলেছেন। এই রহিতকরণ তিন প্রকারের হয়েছেঃ যথা

(ক) সাধারণভাবে বিধান রহিতকরণঃ অর্থাৎ, কোন বিধান (আয়াতসহ) রহিত করে তার স্থলে অন্য বিধান (ও আয়াত) অবতীর্ণ করা হয়েছে।

(খ) তেলাঅত ব্যতিরেকে বিধান রহিত করা। অর্থাৎ, প্রথম বিধানের আয়াতগুলো কুরআনে বিদ্যমান রাখা হয়, তার তেলাঅতও হয় আবার দ্বিতীয় বিধানও যা পরে অবতীর্ণ করা হয় তাও কুরআনে বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ, 'নাসেখ' (রহিতকারী) এবং 'মানসুখ' (রহিতকৃত) উভয় আয়াতই বিদ্যমান থাকে।

(গ) কেবল তেলাঅত রহিত করা। অর্থাৎ, নবী করীম (সাঃ) ঐ আয়াতকে কুরআনের মধ্যে শামিল করেননি, কিন্তু তার বিধানের উপর আমল বহাল রাখা হয়েছে। যেমন,

 {وَالشّيْخُ وَالشَّيخَةُ إِذَ زَنَيَا فَارْجُمُوْهُمَا الْبَتَّةَ} বৃদ্ধ (বিবাহিত) পুরুষ ও বৃদ্ধা (বিবাহিতা) নারী যদি ব্যভিচার করলে, তাদেরকে অবশ্য অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা কর। (মুআত্তা ইমাম মালিক) আলোচ্য আয়াতে 'নাসখ' এর প্রথম দুই প্রকারের বর্ণনা রয়েছে। (مَا نَنْسَخْ مِنْ آيَةٍ) শব্দে দ্বিতীয় প্রকারের এবং (أَوْ نُنْسِهَا) শব্দে প্রথম প্রকারের নসখের কথা বলা হয়েছে। (نُنْسِهَا) (আমি ভুলিয়ে দিই)এর অর্থ হল, তার বিধান ও তেলাঅত দুটোই উঠিয়ে নিই। যেন আমি তা ভুলিয়ে দিলাম এবং নতুন বিধান নাযিল করলাম। অথবা নবী করীম (সাঃ)-এর হৃদয় থেকেই আমি তা মিটিয়ে দিয়ে একেবারে বিলুপ্ত করে দিলাম। ইয়াহুদীরা তাওরাতের বাক্য রহিত হওয়াকে অসম্ভব মনে করত। ফলে কুরআনের কিছু আয়াত রহিত হওয়ার কারণে তার উপরও আপত্তি উত্থাপন করল। মহান আল্লাহ তাদের খন্ডন করে বললেন, যমীন ও আসমানের রাজত্ব তাঁরই হাতে। তিনি যা উচিত মনে করেন তা-ই করেন। যে সময় যে বিধান লক্ষ্য ও কৌশলের দিক দিয়ে উপযুক্ত মনে করেন, সেটাকেই তিনি বহাল করেন এবং যেটাকে চান রহিত ঘোষণা করেন। এটা তাঁর মহাশক্তির এক নিদর্শন। পূর্বের কিছু ভ্রষ্টলোক (যেমন, আবূ মুসলিম আসফাহানী মুতাযেলী) এবং বর্তমানের কিছু লোক ইয়াহুদীদের মত 'নসখ' মানতে অস্বীকার করেছে। তবে সঠিক কথা তা-ই যা পূর্বের আলোচনায় সুস্পষ্ট হয়েছে। 'নসখ'সুসাব্যস্ত হওয়ারই আকীদা রাখতেন পূর্বের সলফগণ।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১০৯ وَدَّ کَثِیۡرٌ مِّنۡ اَہۡلِ الۡکِتٰبِ لَوۡ یَرُدُّوۡنَکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ اِیۡمَانِکُمۡ کُفَّارًا ۚۖ حَسَدًا مِّنۡ عِنۡدِ اَنۡفُسِہِمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُمُ الۡحَقُّ ۚ فَاعۡفُوۡا وَ اصۡفَحُوۡا حَتّٰی یَاۡتِیَ اللّٰہُ بِاَمۡرِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۱۰۹﴾

আহলে কিতাবের অনেকেই চায়, যদি তারা তোমাদেরকে ঈমান আনার পর কাফির অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারত! সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে হিংসাবশত (তারা এরূপ করে থাকে)। সুতরাং তোমরা ক্ষমা কর এবং এড়িয়ে চল, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর নির্দেশ দেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

গ্রন্থধারীগণের অনেকেই তাদের কাছে সত্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও তাদের অন্তরে পোষিত হিংসার দাহনে ইচ্ছে পোষণ করে যে, যদি তোমাদেরকে তোমাদের ঈমান আনার পর কুফরীতে ফিরিয়ে নিতে পারত; সুতরাং তোমরা ক্ষমা কর ও মার্জনা কর যে পর্যন্ত না আল্লাহ স্বীয় হুকুম প্রকাশ করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান। তাইসিরুল

কিতাবীদের অনেকে তাদের প্রতি সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর তারা তাদের অন্তর্হিত বিদ্বেষ বশতঃ তোমাদেরকে বিশ্বাস স্থাপনের পরে অবিশ্বাসী করতে ইচ্ছা করে; কিন্তু যে পর্যন্ত আল্লাহ স্বয়ং আদেশ আনয়ন না করেন সে পর্যন্ত তোমরা ক্ষমা কর ও উপেক্ষা করতে থাক; নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান। মুজিবুর রহমান

১০৯. কিতাবীদের অনেকেই চায়, যদি তারা তোমাদেরকে তোমাদের ঈমান আনার পর কাফেররূপে ফিরিয়ে নিতে পারত! সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও তাদের নিজেদের পক্ষ থেকে বিদ্বেষবশতঃ (তারা এটা করে থাকে)। অতএব, তোমরা ক্ষমা কর এবং উপেক্ষা কর যতক্ষণ না আল্লাহ তার কোন নির্দেশ দেন(১)-- নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

(১) তখনকার অবস্থানুযায়ী ক্ষমার নির্দেশই ছিল বিধেয়। পরবর্তীকালে আল্লাহ স্বীয় প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেন এবং জিহাদের আয়াতসমূহ নাযিল করেন। অতঃপর ইয়াহুদীদের প্রতিও আইন বলবৎ করা হয় এবং অপরাধের ক্রমানুপাতে দুষ্টদের হত্যা, নির্বাসন, জিযিয়া আরোপ ইত্যাদি শাস্তি দেয়া হয়। সূরা আত-তাওবাহ এর ৫ ও ২৯ নং আয়াতের মাধ্যমে এ আয়াতের এ ক্ষমার বিধান রহিত করা হয়। [তাবারী]

তাফসীরে জাকারিয়া

১০৯। হিংসামূলক মনোভাববশতঃ তাদের নিকট সত্য প্রকাশিত হবার পরও, গ্রন্থধারীদের মধ্যে অনেকেই আকাঙ্ক্ষা করে যে, বিশ্বাসের পর (মুসলিম হওয়ার পর) আবার তোমাদেরকে যদি অবিশ্বাসী (কাফের)রূপে ফিরিয়ে দিতে পারত। সুতরাং তোমরা ক্ষমা কর ও উপেক্ষা কর; যতক্ষণ না আল্লাহ কোন নির্দেশ দেন, আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:১৪৮ وَ لِکُلٍّ وِّجۡہَۃٌ ہُوَ مُوَلِّیۡہَا فَاسۡتَبِقُوا الۡخَیۡرٰتِ ؕ؃ اَیۡنَ مَا تَکُوۡنُوۡا یَاۡتِ بِکُمُ اللّٰہُ جَمِیۡعًا ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۱۴۸﴾

আর প্রত্যেকের রয়েছে একটি দিক, যেদিকে সে চেহারা ফিরায়। সুতরাং তোমরা কল্যাণকর্মে প্রতিযোগিতা কর। তোমরা যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ তোমাদের সবাইকে নিয়ে আসবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

প্রত্যেকের জন্যই একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে, সেদিকেই সে মুখ করে। কাজেই তোমরা সৎ কাজের দিকে ধাবমান হও। যেখানেই তোমরা অবস্থান কর, আল্লাহ তোমাদের সকলকে একত্রিত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান। তাইসিরুল

প্রত্যেকের জন্য এক একটি লক্ষ্যস্থল রয়েছে, ঐ দিকেই সে মুখমন্ডল প্রত্যাবর্তিত করে, অতএব তোমরা কল্যাণের দিকে ধাবিত হও; তোমরা যেখানেই থাকনা কেন, আল্লাহ তোমাদের সকলকেই একত্রিত করবেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাবান। মুজিবুর রহমান

১৪৮. আর প্রত্যেকের একটি দিক রয়েছে, যে দিকে সে চেহারা ফিরায়(১)। অতএব তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতা কর। তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহ্‌ তোমাদের সবাইকে নিয়ে আসবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

(১) وجهة শব্দটির আভিধানিক অর্থ এমন বস্তু, যার দিকে মুখ করা হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এর অর্থ কেবলা। এ ক্ষেত্রে উবাই ইবনে কা'ব وجهة এর স্থলে قبلة ও পড়েছেন বলে বর্ণিত রয়েছে। তাফসীরের ইমামগণের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত মোতাবেক আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় এই, প্রত্যেক জাতিরই ইবাদাতের সময় মুখ করার জন্য একটি নির্ধারিত কেবলা চলে আসছে। সে কেবলা আল্লাহর তরফ হতে নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে, অথবা তারা নিজেরাই তা নির্ধারণ করে নিয়েছে। মোটকথা, ইবাদাতের ক্ষেত্রে প্রত্যেক জাতিই কোন না কোন দিকে মুখ করে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় আখেরী নবীর উম্মতগণের জন্য যদি কোন একটা বিশেষ দিককে কেবলা নির্ধারণ করে দেয়া হয়ে থাকে, তবে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কি আছে? [মা'আরিফুল কুরআন]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪৮) প্রত্যেকের (নির্দিষ্ট) একটি দিক আছে, যার দিকে সে মুখ করে দাঁড়ায়। [1] অতএব তোমরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা কর। তোমরা যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ তোমাদের সকলকে একত্র করবেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাবান।

[1] প্রত্যেক ধর্মাবলম্বিরা নিজেরদের পছন্দ মত ক্বিবলা বানিয়ে রেখেছে যেদিকে তারা মুখ করে থাকে। এর দ্বিতীয় অর্থ হল, প্রত্যেক ধর্মাবলম্বিরা নিজেদের জন্য একটি নির্দিষ্ট পন্থা ও তরীকা বানিয়ে রেখেছে। যেমন, কুরআনের অন্য স্থানে এসেছে,

{لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَكِنْ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ} তোমাদের প্রত্যেকের জন্য এক একটি শরীয়ত (আইন) ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তোমাদেরকে এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য (তিনি তা করেননি)। (সূরা মাইদাহ ৪৮ আয়াত) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ হিদায়াত ও গুমরাহী উভয় পথকে পরিষ্কার করে দিয়ে মানুষকে দু'টি পথের মধ্যে কোন একটি নির্বাচন করার যে স্বাধীনতা দিয়েছেন এরই ফলে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন এমন পথ ও মত অবলম্বন করেছে, যা একে অপরের বিপরীত। যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহলে সবাইকে একই পথের পথিক অর্থাৎ, সবাইকে হিদায়াতের পথে পরিচালিত করতে পারতেন। কিন্তু এটা স্বাধীনতা ছিনিয়ে না নিয়ে সম্ভব ছিল না। আর স্বাধীনতা দেওয়ার উদ্দেশ্য, পরীক্ষাকরণ। অতএব হে মুসলিমগণ! তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অগ্রসর হও! অর্থাৎ, নেকী ও সৎ পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো। এটাই হল, আল্লাহর অহী এবং রসূল (সাঃ)-এর অনুসরণের পথ, যা থেকে অন্য ধর্মাবলম্বিরা বঞ্চিত।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২৮৪ لِلّٰہِ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ وَ اِنۡ تُبۡدُوۡا مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ اَوۡ تُخۡفُوۡہُ یُحَاسِبۡکُمۡ بِہِ اللّٰہُ ؕ فَیَغۡفِرُ لِمَنۡ یَّشَآءُ وَ یُعَذِّبُ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۲۸۴﴾

আল্লাহর জন্যই যা রয়েছে আসমানসমূহে এবং যা রয়েছে যমীনে। আর তোমরা যদি প্রকাশ কর যা তোমাদের অন্তরে রয়েছে অথবা গোপন কর, আল্লাহ সে বিষয়ে তোমাদের হিসাব নেবেন। অতঃপর তিনি যাকে চান ক্ষমা করবেন, আর যাকে চান আযাব দেবেন। আর আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

যা কিছু আকাশসমূহে ও ভূমন্ডলে আছে, সবকিছু আল্লাহরই। তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা তোমরা প্রকাশ কর কিংবা গোপন কর আল্লাহ তার হিসাব তোমাদের নিকট হতে গ্রহণ করবেন। সুতরাং যাকে ইচ্ছে তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছে তিনি শাস্তি দিবেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। তাইসিরুল

নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু রয়েছে সবই আল্লাহর এবং তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে তা প্রকাশ কর অথবা গোপন রাখ, আল্লাহ তার হিসাব তোমাদের নিকট হতে গ্রহণ করবেন; অতঃপর তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন; এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়োপরি শক্তিমান। মুজিবুর রহমান

২৮৪. আল্লাহর জন্যই যা আছে আসমানসমূহে ও যা আছে যমীনে। তোমাদের মনে যা আছে তা প্রকাশ কর বা গোপন রাখ, আল্লাহ সেগুলোর হিসেব তোমাদের কাছ থেকে নিবেন(১)। অতঃপর যাকে ইচ্ছে তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছে শাস্তি দিবেন।(২)। আর আল্লাহ সব কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।

(১) আয়াতের মর্মার্থ এই যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার সকল সৃষ্টির যাবতীয় কাজকর্মের হিসাব গ্রহণ করবেন। যে কাজ করা হয়েছে এবং যে কাজের শুধু মনে মনে সং গ্রহণ করা হয়েছে, সে সবগুলোরই হিসাব গ্রহণ করবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেয়ামতের দিন মুমিনকে আল্লাহ্ তা'আলার নিকটবর্তী করা হবে এবং আল্লাহ তাকে এক এক করে সব গোনাহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করবেনঃ এ গোনাহটি কি তোমার জানা আছে? মুমিন স্বীকার করবে। আল্লাহ্ তাআলা বলবেনঃ আমি দুনিয়াতেও তোমার গোনাহ জনসমক্ষে প্রকাশ করিনি, আজও তা ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর নেক কাজের আমলনামা তার হাতে অর্পণ করা হবে। পক্ষান্তরে কাফের ও মুনাফেকদের পাপকাজসমূহ প্রকাশ্যে বর্ণনা করা হবে। [বুখারীঃ ২৪৪১, মুসলিমঃ ২৭৬৮]


(২) এটি আল্লাহর অবাধ ক্ষমতারই একটি বর্ণনা। তার উপর কোন আইনের বাঁধন নেই। কোন বিশেষ আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য তিনি বাধ্য নন। বরং তিনি সর্বময় ও একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। শাস্তি দেয়ার ও মাফ করার পূর্ণ ইখতিয়ার তার রয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৮৪) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সমস্তই আল্লাহর। বস্তুতঃ তোমাদের মনে যা আছে তা প্রকাশ কর অথবা গোপন রাখ, আল্লাহ তার হিসাব তোমাদের নিকট থেকে গ্রহণ করবেন।[1] অতঃপর যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে খুশী শাস্তি দেবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

[1] হাদীসসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন এই আয়াত নাযিল হয়, তখন সাহাবায়ে কেরাম বড়ই বিচলিত হয়ে পড়েন। তাঁরা রসূল (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে আরজি পেশ করে বলেন, হে আল্লাহর রসূল! নামায-রোযা এবং যাকাত ও জিহাদ ইত্যাদি যে সমস্ত আমল করার নির্দেশ আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে, তা আমরা করছি। কারণ, এ কাজগুলো আমাদের সামর্থ্যের বাইরে নয়। কিন্তু অন্তরে যেসব খেয়াল ও কুমন্ত্রণার সৃষ্টি হয় তার উপর তো আমাদের কোন এখতিয়ার নেই। সেগুলো তো মানুষের শক্তির বাইরের জিনিস। অথচ মহান আল্লাহ তারও হিসাব নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। নবী করীম (সাঃ) বললেন, ‘আপাতত তোমরা বল, আমরা শুনলাম ও মান্য করলাম।’ এরপর সাহাবাদের শোনার ও মানার উদ্দীপনা দেখে মহান আল্লাহ উক্ত আয়াতকে

{لا يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا} আয়াত দ্বারা মানসুখ (রহিত) করে দিলেন। (ইবনে কাসীর ও ফাতহুল ক্বাদীর) বুখারী-মুসলিম এবং অন্যান্য সুনান গ্রন্থে বর্ণিত হাদীসটিও এর সমর্থন করে, ‘‘অবশ্যই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরে উদীয়মান খেয়ালের কোন বিচার করবেন না, যে পর্যন্ত না তা কাজে পরিণত করবে অথবা মুখে উচ্চারণ করবে।’’ (বুখারী ২৫২৮-মুসলিম ১২৭নং) এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, অন্তরে উদিত খেয়ালের কোন হিসাব হবে না। কেবল সেই খেয়ালের হিসাব হবে, যা কাজে পরিণত করা হবে। (উক্ত) আয়াতের ব্যাপারে ইমাম ইবনে জারীরের বিপরীত মন্তব্য রয়েছে। তাঁর খেয়াল হল, আয়াতকে রহিত করা হয়নি। কেননা, হিসাব হলেই যে শাস্তি হবে তা জরুরী নয়। অর্থাৎ, এটা জরুরী নয় যে, মহান আল্লাহ যারই হিসাব নিবেন, তাকেই শাস্তি দিবেন। বরং তিনি হিসাব তো প্রত্যেকেরই নিবেন, কিন্তু অনেক মানুষ এমনও থাকবে যাদের হিসাব নেওয়ার পর আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। কিছু লোকের সাথে তো এমনও ব্যবহার করা হবে যে, তাদের একটি একটি পাপকে স্মরণ করিয়ে স্বীকারোক্তি নিয়ে বলবেন, দুনিয়ায় এই পাপগুলোকে আমি গোপন করে রেখেছিলাম। যাও, আজ এগুলোকে আমি মাফ করে দিলাম। (এই হাদীস সহীহ বুখারী ও মুসলিম ইত্যাদিতে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে কাসীর) কোন কোন উলামা বলেছেন, এখানে ‘নাসখ’ (রহিত করণ) পারিভাষিক অর্থে বলা হয়নি, বরং কখনো কখনো ‘নাসখ’ ব্যবহার করা হয় কোন জিনিসকে আরো পরিষ্কারভাবে বিশ্লেষণ করে দেওয়ার অর্থে। তাই সাহাবাদের অন্তরে এই আয়াত থেকে যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল সেটাকে দূর করে দেওয়া হল

{لاَ يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا} এই আয়াত এবং ‘‘অবশ্যই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের খেয়ালের বিচার করবেন না---।’’ এই হাদীস দ্বারা। এভাবে উভয় আয়াতের একটিকে ‘নাসিখ’ এবং অপরটি ‘মানসূখ’ ভাবার কোন প্রয়োজন হবে না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:২৬ قُلِ اللّٰہُمَّ مٰلِکَ الۡمُلۡکِ تُؤۡتِی الۡمُلۡکَ مَنۡ تَشَآءُ وَ تَنۡزِعُ الۡمُلۡکَ مِمَّنۡ تَشَآءُ ۫ وَ تُعِزُّ مَنۡ تَشَآءُ وَ تُذِلُّ مَنۡ تَشَآءُ ؕ بِیَدِکَ الۡخَیۡرُ ؕ اِنَّکَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۲۶﴾

বল, ‘হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন এবং আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন, আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান’। আল-বায়ান

বল, ‘হে আল্লাহ! তুমি সমুদয় রাজ্যের মালিক, যাকে ইচ্ছে রাজ্য দান কর আর যার থেকে ইচ্ছে রাজ্য কেড়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছে সম্মানিত কর আর যাকে ইচ্ছে অপদস্থ কর, তোমারই হাতে সব রকম কল্যাণ, নিশ্চয়ই তুমি সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান’। তাইসিরুল

তুমি বলঃ হে রাজ্যাধিপতি আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার নিকট হতে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন; যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন; আপনারই হাতে রয়েছে কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনিই সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। মুজিবুর রহমান

২৬. বলুন, ‘হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন; যাকে ইচ্ছা আপনি সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা আপনি হীন করেন। কল্যাণ আপনারই হাতে।(১) নিশ্চয়ই আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

(১) আয়াতে আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছেঃ “আপনার হাতেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ”। আয়াতের প্রথমাংশে রাজত্ব দান করা ও ছিনিয়ে নেয়া এবং সম্মান ও অপমান উভয়দিক উল্লেখ করা হয়েছিল। এতে রয়েছে কল্যাণ ও অকল্যাণ। কিন্তু আয়াতে শুধু আল্লাহর হাতেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ একথা বলা হয়েছে। অকল্যাণ আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় এধরণের শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। তার কারণ হল, সহীহ আকীদা অনুসারে আল্লাহর প্রতি অকল্যাণের সম্পর্ক দেখানো জায়েয নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে বলেছেনঃ অকল্যাণ আপনার পক্ষ থেকে নয়। [মুসলিমঃ ৭৭১] কেননা, আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার জন্য অকল্যাণ চান না। মানুষের যাবতীয় অকল্যাণ মানুষের হাতের কামাই করা।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৬) বল, ‘হে রাজ্যাধিপতি আল্লাহ! তুমি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান কর এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নাও, যাকে ইচ্ছা সম্মানিত কর এবং যাকে ইচ্ছা অপমানিত কর। তোমার হাতেই যাবতীয় কল্যাণ। [1] নিশ্চয় তুমি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

[1] এই আয়াতে রয়েছে মহান আল্লাহর সীমাহীন শক্তি ও তাঁর মহা কুদরতের প্রকাশ। তিনি বাদশাহকে ফকীর করেন এবং ফকীরকে বাদশাহ। তিনিই সমস্ত কর্তৃত্বের মালিক। الْخَيْرُ بِيَدِكَ (যাবতীয় কল্যাণ তোমার হাতে) না বলে, بِيَدِكَ الْخَيْرُ (তোমারই হাতে যাবতীয় কল্যাণ) বলা হয়েছে। অর্থাৎ, বিধেয় পদকে আগে আনা হয়েছে। উদ্দেশ্য নির্দিষ্টীকরণ। অর্থাৎ, সমস্ত কল্যাণ কেবল তোমার হাতেই। তুমি ছাড়া কল্যাণদাতা আর কেউ নেই। অকল্যাণের স্রষ্টা যদিও মহান আল্লাহই, তবুও এখানে কেবল কল্যাণের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে, অকল্যাণের নয়। কারণ, কল্যাণ আল্লাহর নিছক অনুগ্রহ। পক্ষান্তরে অকল্যাণ হল মানুষের কর্মের ফল যা তাদেরকে ভুগতে হয়। অথবা অকল্যাণও যেহেতু তাঁরই নির্ধারিত নিয়তির অংশ, সুতরাং তাতেও কোন না কোন প্রকার মঙ্গল আছে। এই দিক দিয়ে তাঁর সমস্ত কাজই কল্যাণময়। (ফাতহুল ক্বাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:২৯ قُلۡ اِنۡ تُخۡفُوۡا مَا فِیۡ صُدُوۡرِکُمۡ اَوۡ تُبۡدُوۡہُ یَعۡلَمۡہُ اللّٰہُ ؕ وَ یَعۡلَمُ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ وَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۲۹﴾

বল, ‘তোমরা যদি তোমাদের অন্তরসমূহে যা আছে তা গোপন কর অথবা প্রকাশ কর, আল্লাহ তা জানেন। আর আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও যমীনে যা আছে, তাও তিনি জানেন। আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান’। আল-বায়ান

বল, ‘তোমরা তোমাদের অন্তরের বিষয়কে গোপন কর অথবা প্রকাশ কর, আল্লাহ তা জানেন, আর তিনি জানেন যা কিছু আকাশসমূহে এবং ভূভাগে আছে; আল্লাহ সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান’। তাইসিরুল

তুমি বলঃ তোমাদের অন্তরসমূহে যা রয়েছে তা তোমরা গোপন কর অথবা প্রকাশ কর আল্লাহ তা অবগত আছেন এবং নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যা কিছু রয়েছে আল্লাহ তা জ্ঞাত আছেন; এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। মুজিবুর রহমান

২৯. বলুন, ‘তোমাদের অন্তরে যা আছে তা যদি তোমরা গোপন কর বা ব্যক্ত কর, আল্লাহ তা অবগত আছেন(১)। আর আসমানসমূহে যা আছে এবং যমীনে যা আছে তাও তিনি জানেন। আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।

(১) আল্লাহ তা'আলা প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছু সম্যকরূপে জানেন। মানুষের অন্তরে কি আছে, এমনকি কি উদিত হবে তাও আল্লাহ জানেন। কারণ, হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তা'আলা যখন প্রথম কলম সৃষ্টি করলেন, তখন তাকে বললেন, লিখ। তখন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যা হবে তা সবই লিখা হতে লাগল। [মুসনাদে আহমাদ ৫/৩১৭] সুতরাং মানুষের মনে কি উদিত হবে সেটাও কলম লিখে রেখেছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৯) বল, ‘তোমাদের মনে যা আছে, তা যদি তোমরা গোপন রাখ কিংবা প্রকাশ কর, আল্লাহ তা অবগত আছেন। আর আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তাও তিনি অবগত আছেন এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।’

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৮৯ وَ لِلّٰہِ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ وَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۱۸۹﴾

আর আল্লাহর জন্যই আসমান ও যমীনের রাজত্ব। আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

বস্তুতঃ আসমান ও যমীনে আছে আল্লাহরই রাজত্ব এবং আল্লাহ সকল জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। তাইসিরুল

আল্লাহরই জন্য নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের আধিপত্য এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়োপরি শক্তিমান। মুজিবুর রহমান

১৮৯. আর আসমান ও যমীনের সার্বভৌম মালিকানা একমাত্র আল্লাহরই; আর আল্লাহ্ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৮৯) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:১৩৩ اِنۡ یَّشَاۡ یُذۡہِبۡکُمۡ اَیُّہَا النَّاسُ وَ یَاۡتِ بِاٰخَرِیۡنَ ؕ وَ کَانَ اللّٰہُ عَلٰی ذٰلِکَ قَدِیۡرًا ﴿۱۳۳﴾

হে মানুষ, যদি আল্লাহ চান তোমাদেরকে সরিয়ে দেবেন এবং অপরকে আনবেন। আর আল্লাহ এর উপর সক্ষম। আল-বায়ান

তিনি ইচ্ছে করলে হে মানুষ! তোমাদেরকে বিলুপ্ত ক’রে তিনি অন্য সম্প্রদায়কে আনতে পারেন, আল্লাহ তা করতে পুরোপুরি সক্ষম। তাইসিরুল

হে লোক সকল! যদি তিনি ইচ্ছা করেন তাহলে তোমাদেরকে বিলুপ্ত করে অন্যদেরকে আনয়ন করতে পারেন এবং আল্লাহ এ ব্যাপারে শক্তিমান। মুজিবুর রহমান

১৩৩. হে মানুষ! তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে অপসারিত করতে ও অপরকে আনতে পারেন(১); আর আল্লাহ্ তা করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।

(১) এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, তিনি আল্লাহ ইচ্ছা করলে ওহী নাযিল হওয়ার সময়ে যারা ছিল তাদেরকে নিয়ে গিয়ে তাদের স্থলে অন্যদের অন্যদের স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন। অন্য আয়াতে তিনি যে অন্য কাউকে এনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন সেটার প্রমাণও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, “তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে অপসারিত করতে এবং তোমাদের পরে যাকে ইচ্ছে তোমাদের স্থানে আনতে পারেন, যেমন তোমাদেরকে তিনি অন্য এক সম্প্রদায়ের বংশ থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আল-আনআমঃ ১৩৩]

অন্য আয়াতে এটাও বলা হয়েছে যে, যাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হবে, তারা তাদের মতো হবে না, বরং তাদের চেয়ে ভালো হবে। বলা হয়েছে, “আর যদি তোমরা বিমুখ হও, তবে তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন; তারপর তারা তোমাদের মত হবে না [সূরা মুহাম্মাদ: ৩৮] অন্য আয়াতে এ কাজটিকে তাঁর জন্য অত্যন্ত সহজ বলে ঘোষণাও করেছেন। তিনি বলেন, “তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে অপসৃত করতে পারেন এবং এক নূতন সৃষ্টি নিয়ে আসতে পারেন। আর এটা আল্লাহর পক্ষে কঠিন নয়।” [সূরা ইবরাহীম ১৯; সূরা ফাতির: ১৬]।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৩৩) হে মানব সম্প্রদায়! তিনি ইছা করলে তোমাদেরকে অপসারিত করতে ও অপর (জাতি)কে আনয়ন করতে পারেন এবং আল্লাহ তা করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। [1]

[1] এ হল আল্লাহ তাআলার পূর্ণ পরাক্রমশালিতার বিকাশ। অন্যত্র বলেছেন, [وَإِنْ تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لا يَكُونُوا أَمْثَالَكُمْ] (محمد: 38) অর্থাৎ, যদি তোমরা বিমুখ হও তাহলে তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন; অতঃপর তারা তোমাদের মত হবে না।’’ (সূরা মুহাম্মাদঃ ৩৮)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:১৪৯ اِنۡ تُبۡدُوۡا خَیۡرًا اَوۡ تُخۡفُوۡہُ اَوۡ تَعۡفُوۡا عَنۡ سُوۡٓءٍ فَاِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَفُوًّا قَدِیۡرًا ﴿۱۴۹﴾

যদি তোমরা ভালো কিছু প্রকাশ কর, কিংবা গোপন কর অথবা মন্দ ক্ষমা করে দাও, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

তোমরা যদি ভাল কাজ প্রকাশ্যে কর কিংবা তা গোপনে কর কিংবা মন্দকে ক্ষমা কর তবে আল্লাহও দোষত্রুটি মোচনকারী, ক্ষমতার অধিকারী। তাইসিরুল

যদি তোমরা সৎ কাজ প্রকাশ্যে কর অথবা গোপনে কর অথবা যদি তোমরা অপরাধ ক্ষমা করে দাও তাহলে জেনে রেখ যে, আল্লাহ নিজেও ক্ষমাকারী, সর্বশক্তিমান। মুজিবুর রহমান

১৪৯. তোমরা সৎকাজ প্রকাশ্যে করলে বা গোপনে করলে কিংবা দোষ ক্ষমা করলে তবে আল্লাহও দোষ মোচনকারী, ক্ষমতাবান।(১)

(১) আল্লাহ তা'আলা একদিকে মযলুমকে তার প্রতি যুলুমের সমতুল্য প্রতিশোধ গ্রহণ করার অনুমতি দিয়েছেন। অপরদিকে প্রতিশোধ গ্রহণ করার পরিবর্তে উন্নত চরিত্রের শিক্ষা ও ক্ষমার মনোভাব সৃষ্টি করার জন্য আখেরাতের উত্তম প্রতিদানের আশ্বাস শুনিয়ে ক্ষমা ও ত্যাগের আদর্শ গ্রহণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছেন। এ আয়াতে মুখ্য উদ্দেশ্য কারো অন্যায়কে ক্ষমা করার আদর্শ শিক্ষা দেয়া। প্রকাশ্যে বা গোপনে নেক কাজ করার উল্লেখ করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ক্ষমা করাও একটি বিশিষ্ট সৎকার্য।

যে ব্যক্তি অন্যের অপরাধ মার্জনা করবে, সে আল্লাহ তা'আলার ক্ষমা ও করুণার যোগ্য হবে। আয়াতের শেষে আল্লাহর দুটি গুণবাচক নাম উল্লেখ করে বলে দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা সর্বশক্তিমান, যাকে ইচ্ছা তিনি শাস্তি দিতে পারেন এবং যখন ইচ্ছা প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারেন। তথাপি তিনি অতি ক্ষমাশীল। আর মানুষের শক্তি ও ক্ষমতা যখন সামান্য ও সীমাবদ্ধ, তাই ক্ষমা বা মার্জনার পথ অবলম্বন করা তার জন্য অধিক বাঞ্ছনীয়।

এ হচ্ছে অন্যায়-অত্যাচার প্রতিরোধ ও সামাজিক সংস্কার সাধনের ইসলামী মূলনীতি এবং অভিভাবকসুলভ সিদ্ধান্ত। একদিকে ন্যায়সঙ্গত প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার প্রদান করে ইনসাফ ও ন্যায়নীতিকে সমুন্নত রাখা হয়েছে, অপরদিকে উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতা শিক্ষা দিয়ে ক্ষমা বা মার্জনা করতে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। যার অনিবার্য ফলশ্রুতি সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছেঃ “তোমার ও অন্য যে ব্যক্তির মধ্যে দুশমনী ছিল, এমতাবস্থায় সে ব্যক্তি আন্তরিক বন্ধু হয়ে যাবে।” [সূরা ফুসসিলাতঃ ৩৪]

আইন-আদালত বা প্রতিশোধ গ্রহণ করার মাধ্যমে যদিও অন্যায়-অত্যাচার প্রতিরোধ করা যায়, কিন্তু এর দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকে। যার ফলে পারস্পরিক বিবাদের সূত্রপাত হওয়ার আশংকা বিদ্যমান থাকে। কিন্তু কুরআনুল কারীম যে অপূর্ব নৈতিকতার আদর্শ শিক্ষা দিয়েছে, তার ফলে দীর্ঘকালের শক্রতাও গভীর বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হয়ে থাকে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সাদকাহ দ্বারা সম্পদ কমে না এবং কোন বান্দার মধ্যে ক্ষমা প্রবণতার গুণের কারণে আল্লাহ তা'আলা কেবল তার মর্যাদাই বৃদ্ধি করেন। আর যে কেউ আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করেন। [মুসলিম: ২৫৮৮]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৪৯) যদি তোমরা সৎকাজ প্রকাশ্যে কর অথবা গোপনে কর অথবা অপরাধ ক্ষমা কর,[1] তাহলে নিশ্চয় আল্লাহও পরম ক্ষমাশীল, মহা শক্তিমান।

[1] কোন ব্যক্তি যদি কারো উপর যুলুম বা অন্যায়-উৎপীড়ন করে, তাহলে শরীয়তে মযলুম ব্যক্তির জন্য ততটুকু পরিমাণে প্রতিশোধ নেওয়ার অনুমতি আছে, যতটুকু পরিমাণ যুলুম তার প্রতি করা হয়েছে। নবী (সাঃ) বলেন, ‘‘আপোসের মধ্যে গালিগালাজ করে এমন দুই ব্যক্তি যা কিছু বলে পাপ সূচনাকারী ব্যক্তির উপরই বর্তায়; যদি না অত্যাচারিত ব্যক্তি (অর্থাৎ যাকে প্রথমে গালি দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিশোধে সেও গালি দিয়েছে সে) সীমালংঘন করে।’’ (মুসলিম ৪৫৮৭নং) কিন্তু প্রতিশোধ গ্রহণের অনুমতির সাথে সাথে ক্ষমা প্রদর্শন করার প্রতি অধিক অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। কেননা আল্লাহ তাআলা প্রতিশোধ নেওয়ার ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গরূপে ক্ষমতাবান, তা সত্ত্বেও তিনি ক্ষমা করে দেন। এই জন্য তিনি বলেন, {وَجَزَاء سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللهِ إِنَّهُُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ} অর্থাৎ, মন্দের প্রতিফল তো অনুরূপ মন্দই। কিন্তু যে ক্ষমা করে দেয় ও আপোস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট আছে। নিশ্চয় তিনি অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন না। (সূরা শূরা ৪০) আর হাদীসে মহানবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘অপরাধ মার্জনা করার কারণে, আল্লাহ (মার্জনাকারীর) সম্মান ও ইজ্জত বাড়িয়ে দেন।’’ (মুসলিম)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:১৭ لَقَدۡ کَفَرَ الَّذِیۡنَ قَالُوۡۤا اِنَّ اللّٰہَ ہُوَ الۡمَسِیۡحُ ابۡنُ مَرۡیَمَ ؕ قُلۡ فَمَنۡ یَّمۡلِکُ مِنَ اللّٰہِ شَیۡئًا اِنۡ اَرَادَ اَنۡ یُّہۡلِکَ الۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ وَ اُمَّہٗ وَ مَنۡ فِی الۡاَرۡضِ جَمِیۡعًا ؕ وَ لِلّٰہِ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ مَا بَیۡنَہُمَا ؕ یَخۡلُقُ مَا یَشَآءُ ؕ وَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۱۷﴾

অবশ্যই তারা কুফরী করেছে যারা বলে ‘নিশ্চয় মারইয়াম পুত্র মাসীহই আল্লাহ’। বল, যদি আল্লাহ ধ্বংস করতে চান মারইয়াম পুত্র মাসীহকে ও তার মাকে এবং যমীনে যারা আছে তাদের সকলকে ‘তাহলে কে আল্লাহর বিপক্ষে কোন কিছুর ক্ষমতা রাখে? আর আসমানসমূহ, যমীন ও তাদের মধ্যবর্তী যা রয়েছে, তার রাজত্ব আল্লাহর জন্যই। তিনি যা ইচ্ছা তা সৃষ্টি করেন এবং আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

তারা কুফরী করেছে যারা বলে মাসীহ্ ইবনে মারইয়ামই আল্লাহ। বল, মাসীহ ইবনে মারইয়াম, আর তার মা এবং পৃথিবীতে যারা আছে সকলকে ধ্বংস করতে চাইলে আল্লাহর বিরুদ্ধে কারো এতটুকু ক্ষমতা আছে কি? আসমানসমূহে আর পৃথিবীতে ও এদের মধ্যে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই মালিকানাধীন। তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন। আল্লাহ্ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই তারা কাফির যারা বলেঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ স্বয়ং হচ্ছেন মসীহ্ (ঈসা) ইবনে মারইয়াম! তুমি বলঃ যদি আল্লাহ মসীহ্ (ঈসা) ইবনু মারইয়ামকে ও তার মাতাকে এবং ভূ-পৃষ্ঠে যারা আছে তাদের সবাইকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করেন তাহলে এরূপ কে আছে যে তাদেরকে আল্লাহ হতে এতটুকু রক্ষা করতে পারে? আল্লাহরই কর্তৃত্ব নির্দিষ্ট রয়েছে আকাশসমূহে ও যমীনে এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত যাবতীয় কিছুর উপর; তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই সৃষ্টি করেন, আর আল্লাহ সকল বস্তুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। মুজিবুর রহমান

১৭. যারা বলে, নিশ্চয় মারইয়াম-তনয় মসীহই আল্লাহ্‌, তারা অবশ্যই কুফরী করেছে।(১) বলুন, আল্লাহ যদি মারইয়াম-তনয় মসীহ, তার মাতা এবং দুনিয়ার সকলকে ধ্বংস করতে ইচ্ছে করেন তবে তাঁকে বাধা দেবার শক্তি কার আছে? আর আসমানসমূহ ও যমীনে এবং এ দুয়ের মধ্যে যা কিছু আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন(২) এবং আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।

(১) আলোচ্য আয়াতে নাসারাদের একটি উক্তির খণ্ডন করা হয়েছে- যা তাদের একদলের বিশ্বাসও ছিল। অর্থাৎ তাদের একদলের বিশ্বাস ছিল যে, ঈসা মসীহ হুবহু আল্লাহ। কিন্তু আয়াতে যে যুক্তি দ্বারা বিষয়টির খণ্ডন করা হয়েছে, তাতে নাসারাদের সব দলের একত্ববাদ বিরোধী ভ্রান্ত বিশ্বাসেরই খণ্ডন হয়ে যায়, তা মসীহ আলাইহিস সালামের আল্লাহর সন্তান হওয়া সংক্রান্ত বিশ্বাসই হোক অথবা তিন ইলাহর অন্যতম ইলাহ হওয়ার বিশ্বাসই হোক। আল্লাহ তা’আলা বলছেন যে, যদি তিনি ঈসা ও তার মা মারইয়ামকে মারতে ইচ্ছা করেন, তবে কি এমন কেউ আছে যে তাদেরকে মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারে?

তারা নিজেরাও সেটা করতে সক্ষম নয়। সুতরাং তারা কিভাবে ইলাহ হতে পারে? আল্লাহ তা'আলার সামনে মসীহ 'আলাইহিস সালাম এতই অক্ষম যে, তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেন না এবং যে জননীর খেদমত ও হেফাযত তার কাছে প্রাণের চেয়েও প্রিয়, সে জননীকেও রক্ষা করতে পারেন না। সুতরাং তিনিই কিভাবে ইলাহ হতে পারেন। আর তার মা যেহেতু মারা গেছেন সেহেতু কিভাবেই বা তিনি তিন ইলাহর অন্যতম ইলাহ বলে বিবেচিত হবেন? [তাফসীর মুয়াসসার ও সা’দী]


(২) ‘তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন’ এ বাক্যে নাসারাদের পূর্বোক্ত ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণকে খণ্ডন করা হয়েছে। কেননা, মসীহকে আল্লাহ মনে করার আসল কারণ তাদের মতে এই ছিল যে, তিনি জগতের সাধারণ নিয়মের বিপরীতে পিতা ছাড়া শুধুমাত্র মায়ের গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি মানুষ হলে নিয়মানুযায়ী পিতা-মাতা উভয়ের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করতেন। আলোচ্য বাক্যে এর উত্তর দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা যাকে ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। যেমন অন্যত্র বলেছেন যে, “ঈসার উদাহরণ তো আদমের মত” [সূরা আলে-ইমরানঃ ৫৯]

এ আয়াতেও উক্ত সন্দেহের নিরসন করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর সাধারণ নিয়মের বাইরে মসীহ আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা তার ইলাহ হওয়ার প্রমাণ হতে পারে না। লক্ষণীয় যে, আদমকে আল্লাহ তা'আলা পিতা ও মাতা উভয়ের মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছিলেন। সুতরাং আল্লাহ সবকিছুই করতে পারেন। তিনিই স্রষ্টা, রব ও উপাসনার যোগ্য। অন্য কেউ তার অংশীদার নয়। [সা’দী; মুয়াসসার; ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৭) নিশ্চয় তারা অবিশ্বাসী (কাফের), যারা বলে, ‘মারয়্যাম-তনয় মসীহই আল্লাহ।’ বল, ‘মারয়্যাম-তনয় মসীহ, তার মাতা এবং পৃথিবীর সকলকে যদি আল্লাহ ধ্বংস করতে ইচ্ছা করেন, তবে তাঁকে বাধা দেবার শক্তি কার আছে?’ আকাশ ও ভূ-মন্ডলে এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে, তার সার্বভৌমতব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। [1]

[1] এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজ অসীম ক্ষমতা ও পূর্ণ সার্বভৌমত্বের কথা বর্ণনা করেছেন। উদ্দেশ্য খ্রিষ্টানদের সেই আকীদা ও বিশ্বাসকে খন্ডন করা, যাতে তারা মনে করে যে, মসীহ (আঃ) স্বয়ং আল্লাহ। ‘মসীহ (আঃ) স্বয়ং আল্লাহ’ (যীশুই ঈশ্বর) এই আকীদায় বিশ্বাসী প্রথমে অল্প সংখ্যক লোক ছিল অর্থাৎ, খ্রিষ্টানদের একটি ফির্কাই ছিল, যারা ‘ইয়াকূবিয়াহ’ নামে পরিচিত। কিন্তু বর্তমানে তাদের প্রায় সকল ফির্কাই কোন না কোন দিক দিয়ে ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ মনে করে থাকে। এই জন্য খ্রিষ্টধর্মে ত্রিত্ববাদ অথবা ট্রিনিটির বিশ্বাস মূল ভিত্তি হিসাবে গুরুত্ব লাভ করেছে। অথচ কুরআনে কারীমের এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, কোন নবী বা রসূলকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করা প্রকাশ্য কুফরী। খ্রিষ্টানরা মসীহ (আঃ)-কে আল্লাহ বানিয়ে এই কুফরী করেছে। যদি অন্য কোন ফির্কা বা দল অন্য কোন নবী বা রসূলকে মানুষ ও রসূল হওয়ার আসন থেকে উঠিয়ে আল্লাহর আসনে আসীন করে, তাহলে তারাও কুফরী করবে। (আমরা এই ভ্রান্ত আকীদা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:১৯ یٰۤاَہۡلَ الۡکِتٰبِ قَدۡ جَآءَکُمۡ رَسُوۡلُنَا یُبَیِّنُ لَکُمۡ عَلٰی فَتۡرَۃٍ مِّنَ الرُّسُلِ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا مَا جَآءَنَا مِنۡۢ بَشِیۡرٍ وَّ لَا نَذِیۡرٍ ۫ فَقَدۡ جَآءَکُمۡ بَشِیۡرٌ وَّ نَذِیۡرٌ ؕ وَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۱۹﴾

হে কিতাবীরা, তোমাদের নিকট আমার রাসূল এসেছে, রাসূলদের একটি বিরতির পর তোমাদের জন্য তিনি স্পষ্ট বর্ণনা করছেন. যেন তোমরা না বল যে, ‘আমাদের নিকট কোন সুসংবাদদাতা কিংবা সতর্ককারী আসেনি’। অবশ্যই তোমাদের নিকট সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এসেছে। আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

ওহে আহলে কিতাব! রসূল প্রেরণে বিরতির পর তোমাদের কাছে আমার রসূল এসে স্পষ্টভাবে তোমাদের নিকট বর্ণনা করে দিচ্ছে যাতে তোমরা বলতে না পার যে, আমাদের কাছে কোন সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী আগমন করেনি। এখন তাই সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী এসে গেছে। আর আল্লাহ হচ্ছেন সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। তাইসিরুল

হে আহলে কিতাব! রাসূলদের আগমন দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার পর তোমাদের নিকট আমার রাসূল এসে পৌঁছেছে, যে তোমাদেরকে স্পষ্টভাবে (আল্লাহর হুকুম) বলে দিচ্ছে, যেন তোমরা (কিয়ামাত দিনে) বলতে না পার যে, তোমাদের নিকট কোন সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রর্দশনকারী আগমন করেনি। (এখন তো) তোমাদের নিকট সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রর্দশনকারী এসে গেছে, আর আল্লাহ সকল বস্তুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। মুজিবুর রহমান

১৯. হে কিতাবীরা! রাসূল পাঠানোতে বিরতির পর(১) আমাদের রাসূল তোমাদের কাছে এসেছেন। তিনি তোমাদের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা করেছেন, যাতে তোমরা না বল যে, কোন সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারী আমাদের কাছে আসেনি। অবশ্যই তোমাদের কাছে সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী এসেছেন।(২) আর আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।

(১) অর্থাৎ নবীগণের আগমন-পরম্পরা কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকার পর আল্লাহ্ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠিয়েছেন। ঈসা আলাইহিস সালামের পর শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত লাভের সময় পর্যন্ত যে সময়টুকু অতিবাহিত হয়েছে, সে সুদীর্ঘকাল সময়ে আর কোন নবী আসে নি। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ মূসা ও ঈসা 'আলাইহিমাস সালামের মাঝখানে এক হাজার সাতশ’ বছরের ব্যবধান ছিল। এ সময়ের মধ্যে নবীগণের আগমন একাদিক্রমে অব্যাহত ছিল। এতে কখনও বিরতি ঘটেনি। শুধু বনী-ইসরাঈলের মধ্য থেকেই এক হাজার নবী এ সময়ে প্রেরিত হয়েছিলেন।

তারপর ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসল্লামের নবুওয়ত লাভের মাঝখানে মাত্র চারশ’ বা পাঁচশ বা ছয়শ’ বছরকাল নবীগণের আগমন বন্ধ ছিল। এ সময়টিকেই فترة তথা বিরতির সময় বলা হয়। এর আগে কখনও এত দীর্ঘ সময় নবীগণের আগমন বন্ধ ছিল না। [কুরতুবী; ইবন কাসীর] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি ইবন মারইয়ামের সবচেয়ে নিকটতম মানুষ। নবীরা বৈমাত্রেয় ভাই, আমার ও তাঁর মাঝে কোন নবী নেই। [মুসলিম: ২৩৬৫; অনুরূপ বুখারী ৩৪৪২]


(২) আলোচ্য আয়াতে আহলে-কিতাবদের সম্বোধন করে একথা বলার মধ্যে এদিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, তোমাদের উচিত তার আগমনকে আল্লাহ প্রদত্ত বিরাট দান ও বড় নেয়ামত মনে করা। কেননা, নবীর আগমন সুদীর্ঘকাল বন্ধ ছিল। এখন তোমাদের জন্যে তা আবার খোলা হয়েছে।

নবী আসার পর তোমাদের আর কোন ওজর আপত্তি অবশিষ্ট রইল না। সুতরাং তোমাদের উচিত ঈমান আনা। আর যদি তা না কর তবে মনে রেখ যে, আল্লাহ তা'আলা অপরাধীকে শাস্তি ও আনুগত্যকারীকে শান্তি দিতে সক্ষম। [ইবন কাসীর, মুয়াসসার ও তাবারী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯) হে ঐশীগ্রন্থধারিগণ! রসূলগণের আগমন বন্ধ থাকার পর তোমাদের নিকট আমার রসূল (মুহাম্মাদ) এসেছে; সে তোমাদের নিকট (শরীয়ত) স্পষ্টভাবে বর্ণনা করছে। যাতে তোমরা বলতে না পার যে, ‘কোন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী আমাদের নিকট আসেনি।’ এখন তো তোমাদের নিকট একজন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এসেছে।[1] বস্তুতঃ আল্লাহ সর্বশক্তিমান।

[1] ঈসা (আঃ) ও মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর মাঝে প্রায় ৫৭০ অথবা ৬০০ বছরের মত যে ব্যবধান, এই ব্যবধান কালকে ‘ফাতরাহ’ (দুই জন প্রেরিত রসূলের মধ্যবর্তী সময়-কাল) বলে। আহলে কিতাবদেরকে বলা হচ্ছে যে, এই ব্যবধান-কালের পর আমি সর্বশেষ রসূল মুহাম্মাদকে প্রেরণ করলাম। এবার তো তোমরা এ কথা বলার সুযোগ পাবে না যে, আমাদের নিকট কোন সুসংবাদদাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী নবী ও রসূল আসেননি।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:৪০ اَلَمۡ تَعۡلَمۡ اَنَّ اللّٰہَ لَہٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ یُعَذِّبُ مَنۡ یَّشَآءُ وَ یَغۡفِرُ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۴۰﴾

তুমি কি জান না যে, নিশ্চয় আল্লাহ, তাঁর জন্যই আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব, তিনি যাকে ইচ্ছা আযাব দেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

তুমি কি জান না আল্লাহ, আকাশসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্ব তাঁরই, যাকে ইচ্ছে তিনি শাস্তি দেন, যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। তাইসিরুল

তুমি কি জাননা যে, আল্লাহরই জন্য রয়েছে আধিপত্য আসমানসমূহে এবং যমীনে, তিনি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন! আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। মুজিবুর রহমান

৪০. আপনিকি জানেননা যে, আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই? যাকে ইচ্ছে তিনি শাস্তি দেন আর যাকে ইচ্ছে তিনি ক্ষমা করেন এবং আল্লাহ্ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪০) তুমি কি জান না যে, আকাশ ও ভূমন্ডলের সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই, যাকে ইচ্ছা তিনি শাস্তি দেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:১২০ لِلّٰہِ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ مَا فِیۡہِنَّ ؕ وَ ہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۱۲۰﴾

আসমানসমূহ ও যমীন এবং তাদের মধ্যে যা কিছু আছে তার রাজত্ব আল্লাহরই এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

আসমানসমূহের আর যমীনের আর এদের মাঝে যা কিছু আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই, আর তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। তাইসিরুল

আল্লাহরই জন্য অধিপত্য রয়েছে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল এবং ঐ সমস্ত কিছুর যা এতদুভয়ের মাঝে বিদ্যমান; আর তিনি সকল বিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাবান। মুজিবুর রহমান

১২০. আসমান ও যমীন এবং এদুয়ের মধ্যে যা কিছু আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১২০) আকাশ ও ভূমন্ডলে এবং তাদের মধ্যে যা কিছু আছে, তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই এবং তিনি সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:১৭ وَ اِنۡ یَّمۡسَسۡکَ اللّٰہُ بِضُرٍّ فَلَا کَاشِفَ لَہٗۤ اِلَّا ہُوَ ؕ وَ اِنۡ یَّمۡسَسۡکَ بِخَیۡرٍ فَہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۱۷﴾

আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোন দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূরকারী কেউ নেই। আর যদি কোন কল্যাণ দ্বারা স্পর্শ করেন তবে তিনিই তো সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

আল্লাহ তোমার কোন ক্ষতি করতে চাইলে তিনি ছাড়া কেউ তা সরাতে পারবে না। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ করতে চান, তবে তো সব কিছুই করার তাঁর ক্ষমতা রয়েছে। তাইসিরুল

আল্লাহ যদি কারও ক্ষতি সাধন করেন তাহলে তিনি ছাড়া সেই ক্ষতি দূর করার আর কেহ নেই, আর যদি তিনি কারও কল্যাণ করেন, (তাহলে আল্লাহ সেটাও করতে পারেন, কেননা) তিনি সমস্ত কিছুর উপর ক্ষমতাবান। মুজিবুর রহমান

১৭. আর যদি আল্লাহ্‌ আপনাকে কোন দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা মোচনকারী আর কেউ নেই। আর যদি তিনি আপনাকে কোন কল্যাণ দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি তো সব কিছুর উপর ক্ষমতাবানত।(১)

(১) এ আয়াতে ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি লাভক্ষতির মালিক প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ তা'আলা। সত্যিকারভাবে কোন ব্যক্তি কারো সামান্য উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না। আল্লাহ যদি কারও লাভ করতে চান তবে তা বন্ধ করার ক্ষমতা কারও নেই। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আর আল্লাহ যদি আপনার মংগল চান তবে তার অনুগ্রহ প্রতিহত করার কেউ নেই। তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে তার কাছে সেটা পৌছান।” [সূরা ইউনুস: ১০৭]

এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইমাম বাগভী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, ‘একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটে সওয়ার হয়ে আমাকে পিছনে বসিয়ে নিলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেনঃ হে বৎস! আমি আরয করলামঃ আদেশ করুন, আমি হাযির আছি। তিনি বললেনঃ তুমি আল্লাহর বিধি-বিধানকে হেফাযত করবে, আল্লাহ তোমাকে হেফাযত করবেন। তুমি আল্লাহর বিধি-বিধানকে হেফাযত করো তাহলে আল্লাহকে সাহায্যের সাথে তোমার সামনে পাবে। তুমি শান্তি ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে স্মরণ রাখলে, বিপদের সময় তিনি তোমাকে স্মরণ রাখবেন। কোন কিছু চাইতে হলে তুমি আল্লাহর কাছেই চাও এবং সাহায্য চাইতে হলে আল্লাহর কাছেই চাও।

জগতে যা কিছু হবে, ভাগ্যের লেখনী তা লিখে ফেলেছে। সমগ্র সৃষ্টজীব সম্মিলিতভাবে তোমার কোন উপকার করতে চাইলে যা তোমার তাকদিরে লিখা নেই তারা কখনো তা করতে পারবে না। পক্ষান্তরে যদি তারা সবাই মিলে তোমার এমন কোন ক্ষতি করতে চায়, যা তোমার ভাগ্যে নেই, তবে কখনোই তারা তা করতে সক্ষম হবে না। যদি তুমি বিশ্বাস সহকারে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে আমল করতে পার তবে অবশ্যই তা করো। সক্ষম না হলে ধৈর্য ধর। কেননা, তুমি যা অপছন্দ করো তার বিপক্ষে ধৈর্য ধারণ করায় অনেক মঙ্গল রয়েছে। মনে রাখবে, আল্লাহর সাহায্য ধৈর্যের সাথে জড়িত-কষ্টের সাথে সুখ এবং অভাবের সাথে স্বাচ্ছদ্য জড়িত। [মুসনাদে আহমাদ: ১/৩০৭]

পরিতাপের বিষয়, কুরআনুল কারীমের এ সুস্পষ্ট ঘোষণা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আজীবনের শিক্ষা সত্ত্বেও মুসলিমরা এ ব্যাপারে পথ ভ্রান্ত। তারা আল্লাহ্ তা'আলার সব ক্ষমতা সৃষ্টজীবের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছে। আজ এমন মুসলিমের সংখ্যা নগণ্য নয়, যারা বিপদের সময় আল্লাহ্ তা'আলাকে স্মরণ করে না এবং তারা তার কাছে দো'আ করার পরিবর্তে বিভিন্ন নামের দোহাই দেয় এবং তাদেরই সাহায্য কামনা করে। তারা আল্লাহ তা'আলার প্রতি লক্ষ্য করে না। কোন সৃষ্ট জীবকে অভাব পূরণের জন্য ডাকা এ কুরআনী নির্দেশের পরিপন্থী ও প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণার নামান্তর। আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিমদেরকে সরল পথে কায়েম রাখুন।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৭) আর যদি আল্লাহ তোমাকে ক্লেশদান করেন, তাহলে তিনি ব্যতীত আর কেউ তার মোচনকারী নেই। আর যদি তিনি তোমার কল্যাণ করেন, তাহলে তিনিই তো সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। [1]

[1] অর্থাৎ, ইষ্টানিষ্টের মালিক এবং সারা জাহানে সর্বপ্রকারের কর্তৃত্বকারী কেবল আল্লাহই। তাঁর বিচার-ফায়সালাকে খন্ডাবার মত কেউ নেই। একটি হাদীসে এই বিষয়টাকে এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, اللَّهُمَّ لاَ مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ)) ‘‘হে আল্লাহ! তুমি যা দান কর, তা কেউ রোধ করতে পারে না। আর তুমি যা রোধ কর, তা কেউ দিতেও পারে না। আর ধনীদের ধন তোমার আযাব থেকে বাঁচতে কোন উপকারে আসবে না।’’ (বুখারীঃ ই’তিসাম অধ্যায়, মুসলিম, সালাত ও মাসাজিদ অধ্যায়) নবী করীম (সাঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের পর এই দু’আটি পাঠ করতেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১১ হূদ
১১:৪ اِلَی اللّٰہِ مَرۡجِعُکُمۡ ۚ وَ ہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۴﴾

আল্লাহর নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাশীল। আল-বায়ান

তোমাদের প্রত্যাবর্তন আল্লাহর কাছেই, আর তিনি সব কিছুই করতে সক্ষম। তাইসিরুল

আল্লাহরই নিকট তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে এবং তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। মুজিবুর রহমান

৪. আল্লাহরই কাছে তোমাদের ফিরে যাওয়া এবং তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) আল্লাহরই নিকট তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে এবং তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৬ আন-নাহাল
১৬:৭০ وَ اللّٰہُ خَلَقَکُمۡ ثُمَّ یَتَوَفّٰىکُمۡ ۟ۙ وَ مِنۡکُمۡ مَّنۡ یُّرَدُّ اِلٰۤی اَرۡذَلِ الۡعُمُرِ لِکَیۡ لَا یَعۡلَمَ بَعۡدَ عِلۡمٍ شَیۡئًا ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌ قَدِیۡرٌ ﴿۷۰﴾

আর আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন। তোমাদের অনেকে এমনও আছে, যাকে একেবারে বৃদ্ধ বয়সে উপনীত করা হয়, যাতে সে জ্ঞান লাভের পরেও সবকিছু অজানা হয়ে যায়। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। আল-বায়ান

আল্লাহ্ই তোমাদেরকে পয়দা করেছেন, অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন। তোমাদের কাউকে অকর্মণ্য বয়সে ফিরিয়ে দেয়া হয়, যাতে জ্ঞান লাভ করার পরেও আর কোন কিছুর জ্ঞান থাকে না। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, সর্বাপেক্ষা শক্তিমান। তাইসিরুল

আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন এবং তোমাদের মধ্যে কেহকে কেহকে উপনীত করা হয় জরাজীর্ণ বয়সে। ফলে তারা যা কিছু জানত সে সম্বন্ধে তারা সজ্ঞান থাকেনা; আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। মুজিবুর রহমান

৭০. আর আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে প্রত্যাবর্তিত(১) করা হবে নিকৃষ্টতম বয়সে(২); যাতে জ্ঞান লাভের পরেও তার সবকিছু অজানা হয়ে যায়। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, পূর্ণ ক্ষমতাবানত।(৩)

(১) এখানে আল্লাহ্ তা'আলা তার বান্দাদের মধ্যে তাঁর কর্মকাণ্ড কিভাবে সম্পন্ন করেন সেটা বর্ণনা করছেন। তিনিই তাদেরকে অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্ব দিয়েছেন। তারপর তাদেরকে মৃত্যু প্রদান করেন। তাদের মধ্যে আবার কাউকে বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হওয়া পর্যন্ত ছাড় দেন। যেমন, অন্য আয়াতেও বলেছেন, আল্লাহ্‌ তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেন দুর্বলতা থেকে, দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি; শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বক্ষম। [সূরা আর-রূম: ৫৪] [ইবন কাসীর] এখানে (مَنْ يُرَدُّ) শব্দ দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, পূর্বেও মানুষের উপর দিয়ে এক প্রকার দুর্বলতা ও শক্তিহীনতার যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। সেটা ছিল তার প্রাথমিক শৈশবের যুগ।

তখন সে কোনরূপ জ্ঞান-বুদ্ধির অধিকারী ছিল না। তার হস্তপদ ছিল দুর্বল ও অক্ষম। সে ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণ করতে এবং উঠা-বসা করতে অপরের মুখাপেক্ষী ছিল। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাকে যৌবন দান করেছেন। এটা ছিল তার উন্নতির যুগ। এরপর ক্রমান্বয়ে তাকে বার্ধক্যের স্তরে পৌছে দেন। এ স্তরে তাকে দুর্বলতা, শক্তিহীনতা ও ক্ষয়ের ঐ সীমায় প্রত্যাবর্তিত করা হয়, যা ছিল শৈশবে। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন, অবশ্যই আমরা সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে, তারপর আমরা তাকে হীনতাগ্রস্তদের হীনতমে পরিণত করি— [সূরা আত-তীন: ৪-৫] [দেখুন, ফাতহুল কাদীর]


(২) (أَرْذَلِ الْعُمُرِ) বলে বার্ধক্যের সে বয়স বোঝানো হয়েছে, যাতে মানুষের দৈহিক ও মানসিক শক্তি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বয়স থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলতেনঃ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ سُوءِ الْعُمُرِ وَفي رِوَاية مِنْ أنْ أُرَدَّ إلى أرذَلِ العُمُرِ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি মন্দ বয়স থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। অন্য এক রেওয়ায়েতে আছেঃ অকৰ্মণ্য বয়সে ফিরিয়ে দেয়া থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। [বুখারীঃ ৪৭০৭] (أَرْذَلِ الْعُمُرِ) এর নির্দিষ্ট কোন সংখ্যা নেই। তবে উল্লেখিত সংজ্ঞাটি অগ্রগণ্য মনে হয়। কুরআনও এর প্রতি (لِكَيْ لَا يَعْلَمَ بَعْدَ عِلْمٍ شَيْئًا) বলে ইঙ্গিত করেছে। অর্থাৎ যে বয়সে হুশ-জ্ঞান অবশিষ্ট না থাকে। ফলে জানা বিষয়ও ভুলে যায়। [ফাতহুল কাদীর]


(৩) নিশ্চয় আল্লাহ্‌ মহাজ্ঞানী, মহাশক্তিশালী। তিনি জ্ঞান দ্বারা প্রত্যেকের বয়স জানেন এবং শক্তি দ্বারা যা চান, করেন। তিনি ইচ্ছা করলে শক্তিশালী যুবকের উপর অকৰ্মণ্য বয়সের লক্ষণাদি চাপিয়ে দেন এবং ইচ্ছা করলে একশ’ বছরের বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিকেও শক্ত সমর্থ যুবক করে রাখেন। এসবই লা-শরীক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ক্ষমতাধীন।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭০) আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে উপনীত করা হয় নিকৃষ্টতম বয়সে; ফলে সে যা কিছু জানত সে সম্বন্ধে সজ্ঞান থাকে না;[1] আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।

[1] যখন মানুষের স্বাভাবিক বয়স পার হয়ে যায়, তখন তার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এমন কি কখনো কখনো স্মৃতিশক্তি সম্পূর্ণ লোপ পায়, ফলে সে এক শিশুতে পরিণত হয়। এটিই হল أرذل العمر (স্থবিরতা) যা হতে নবী (সাঃ)ও আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৬ আন-নাহাল
১৬:৭৭ وَ لِلّٰہِ غَیۡبُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ وَ مَاۤ اَمۡرُ السَّاعَۃِ اِلَّا کَلَمۡحِ الۡبَصَرِ اَوۡ ہُوَ اَقۡرَبُ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۷۷﴾

আর আসমানসমূহ ও যমীনে গায়েবী বিষয় আল্লাহরই। আর কিয়ামতের ব্যাপারটি শুধু চোখের পলকের ন্যায়। কিংবা তা আরো নিকটবর্তী। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

আকাশসমূহ ও যমীনের অদৃশ্যের জ্ঞান কেবল আল্লাহরই আছে। ক্বিয়ামাতের ব্যাপার তো চোখের পলকের মত বরং তাত্থেকেও দ্রুত। আল্লাহ সব কিছু করতেই সক্ষম। তাইসিরুল

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহরই এবং কিয়ামাতের ব্যাপারতো চোখের পলকের ন্যায়, বরং ওর চেয়েও সত্ত্বর; আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। মুজিবুর রহমান

৭৭. আর আসমানসমূহ ও যমীনের গায়েবী বিষয় আল্লাহরই। আর কিয়ামতের ব্যাপার তো চোখের পলকের ন্যায়(১), অথবা তা থেকেও সত্বর। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।

(১) উপরোক্ত দুটি উদাহরণ পেশ করার পর আল্লাহ তা'আলা এখানে নিজের প্রশংসা করছেন যে, তিনিই শুধু গায়বের সংবাদের মালিক। তিনি ছাড়া আর কেউ গায়েব জানে না। আসমান ও যমীনে যা বর্তমানে গায়েব আছে তা একমাত্র তিনিই জানেন। অনুরূপভাবে কিয়ামতের দিনের খবরও তিনিই জানেন; বান্দাদের কাছে তা গায়েব রাখা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭৭) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহরই[1] এবং কিয়ামতের ব্যাপার তো চক্ষুর পলকের ন্যায়; বরং তার চেয়েও সত্বর। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।[2]

[1] অর্থাৎ, আকাশ ও পৃথিবীতে অসংখ্য অদৃশ্য ও গায়বী জিনিস ও জ্ঞান আছে, যার মধ্যে কিয়ামত কখন হবে তার জ্ঞান অন্যতম। এ সকলের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। এই কারণে ইবাদতের যোগ্য একমাত্র তিনিই, ঐ সব মূর্তিরা বা মৃত ব্যক্তিরা নয়, যাদের কোন জ্ঞানই নেই এবং কারো লাভ-ক্ষতি করার ক্ষমতাও নেই।

[2] মহান আল্লাহর পরিপূর্ণ ক্ষমতার একটি প্রমাণ যে, এত বিশাল পৃথিবী তাঁর আদেশে চোখের পলকে বা তার চেয়েও কম সময়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। এটি অতিরঞ্জিত কথা নয়; বরং বাস্তব সত্য। কারণ তাঁর ক্ষমতা অপরিসীম। যার অনুমান আমরা করতেই পারি না। তিনি যা চান كُن (হও) শব্দ দিয়ে তা হয়ে যায়। কিয়ামতও তাঁর كُن বলাতেই সংঘটিত হবে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২২ আল-হজ্জ
২২:৬ ذٰلِکَ بِاَنَّ اللّٰہَ ہُوَ الۡحَقُّ وَ اَنَّہٗ یُحۡیِ الۡمَوۡتٰی وَ اَنَّہٗ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ۙ﴿۶﴾

এটি এজন্য যে, আল্লাহই সত্য এবং তিনিই মৃতকে জীবন দান করেন এবং তিনিই সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

এ রকম হয় এজন্য যে, আল্লাহ হলেন সত্য সঠিক, আর তিনিই মৃতকে জীবিত করেন, আর তিনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান। তাইসিরুল

এটা এ জন্য যে, আল্লাহ সত্য এবং তিনিই মৃত্যুকে জীবন দান করেন এবং তিনি সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। মুজিবুর রহমান

৬. এটা এ জন্যে যে, আল্লাহই সত্য(১) এবং তিনিই মৃতকে জীবিত করেন এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান;

(১) এ ধারাবাহিক বক্তব্যের মধ্যে এ বাক্যাংশটির তিনটি অর্থ হয়। এক. আল্লাহই সত্য এবং মৃত্যুর পর পুনরায় জীবনদানের কোন সম্ভাবনা নেই, তোমাদের এ ধারণা ডাহা মিথ্যা। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর] দুই. আল্লাহ, তিনি প্রকৃত স্বাধীন ক্ষমতা সম্পন্ন কর্তা, যিনি প্রতি মুহুর্তে নিজের শক্তিমত্তা, সংকল্প, জ্ঞান ও কলা-কৌশলের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ব-জাহান ও এর প্রতিটি বস্তু পরিচালনা করছেন। [দেখুন, ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] তিন. তিনি কোন খেলোয়াড় নন যে, নিছক মন ভুলাবার জন্য খেলনা তৈরী করেন এবং তারপর অযথা তা ভেঙ্গে চুরে মাটির সাথে মিশিয়ে দেন। বরং তিনি সত্য তাঁর যাবতীয় কাজ গুরুত্বপূর্ণ, উদ্দেশ্যমূলক ও বিজ্ঞানময়। তিনি তাঁর কর্মকাণ্ডে হক ও যথার্থ। তিনি কিয়ামত যথার্থ কারণেই সংঘটিত করবেন। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর] বস্তুত: এখানে হক শব্দের অর্থ হচ্ছে, এমন অস্তিত্ব, যার কোন পরিবর্তন নেই, অস্থায়ী নয়। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) এটা এ জন্য যে, আল্লাহই সত্য এবং তিনিই মৃতকে জীবন দান করেন এবং তিনিই সর্ববিষয়ে শক্তিমান।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২২ আল-হজ্জ
২২:৩৯ اُذِنَ لِلَّذِیۡنَ یُقٰتَلُوۡنَ بِاَنَّہُمۡ ظُلِمُوۡا ؕ وَ اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی نَصۡرِہِمۡ لَقَدِیۡرُۨ ﴿ۙ۳۹﴾

যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে, যাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে। কারণ তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দানে সক্ষম। আল-বায়ান

যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয় তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল, কেননা তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম। তাইসিরুল

যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে। কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম। মুজিবুর রহমান

৩৯. যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে(১); কারণ তাদের প্ৰতি অত্যাচার করা হয়েছে(২)। আর নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম।(৩)

(১) ইবনে আব্বাস বলেন, এ আয়াত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। যখন তাদেরকে মক্কা থেকে বের করে দেয়া হয়। [ইবন কাসীর] অধিকাংশ মনীষী বলেছেন, জিহাদের ব্যাপারে এটিই প্রথম নাযিলকৃত আয়াত। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মক্কা থেকে বের করে দেয়া হলো, তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এরা অবশ্যই ধ্বংস হবে, তারা তাদের নবীকে বের করে দিয়েছে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন’। তখন এ আয়াত নাযিল হয়। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, যুদ্ধ হতে যাচ্ছে। আর এটিই প্রথম যুদ্ধের আয়াত। [তিরমিযী: ৩১৭১; মুসনাদে আহমাদ: ১/২১৬] এর আগে মুসলিমদেরকে যুদ্ধ করতে নিষেধ করা হয়েছিল। তাদেরকে সবর করতে নির্দেশ দেয়া হচ্ছিল। [মুয়াসসার]


(২) এদের উপর যে ধরনের অত্যাচার করে বের করে দেয়া হয় তা অনুমান করার জন্য একটি ঘটনা থেকেই বোঝা যায়: সুহাইব রুমী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যখন হিজরত করতে থাকেন তখন কুরাইশ বংশীয় কাফেররা তাকে বলে, তুমি এখানে এসেছিলে খালি হাতে। এখন অনেক ধনী হয়ে গেছে। যেতে চাইলে তুমি খালি হাতে যেতে পারো। নিজের ধন-সম্পদ নিয়ে যেতে পারবে না। অথচ তিনি নিজে পরিশ্রম করেই এ ধন-সম্পদ উপার্জন করেছিলেন। কারো দান তিনি খেতেন না। ফলে বেচারা হাত-পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ান এবং সবকিছু ঐ জালেমদের হাওয়ালা করে দিয়ে এমন অবস্থায় মদীনায় পৌঁছেন যে, নিজের পরণের কাপড়গুলো ছাড়া তাঁর কাছে আর কিছুই ছিল না। [ইবন হিব্বান: ১৫/৫৫৭]

মক্কা থেকে মদীনায় যারাই হিজরত করেন তাদের প্রায় সবাইকেই এ ধরনের যুলুম-নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে আসার সময়ও যালেমরা তাদেরকে নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে বের হয়ে আসতে দেয়নি। মোটকথাঃ মক্কায় মুসলিমদের উপর কাফেরদের নির্যাতন চরম সীমায় পৌছে গিয়েছিল। এমন কোন দিন যেত না যে, কোন না কোন মুসলিম তাদের নিষ্ঠুর হাতে আহত ও প্রহৃত হয়ে না আসত। মক্কায় অবস্থানের শেষ দিনগুলোতে মুসলিমদের সংখ্যাও যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল। তারা কাফেরদের যুলুম ও অত্যাচার দেখে তাদের মোকাবেলায় যুদ্ধ করার অনুমতি চাইতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বলতেনঃ সবর কর। আমাকে এখনো যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়নি। দীর্ঘ দশ বছর পর্যন্ত এমনিতর পরিস্থিতি অব্যাহত রইল।


(৩) অর্থাৎ তিনি তাঁর মুমিন বান্দাদের বিনা যুদ্ধে সাহায্য করতে সক্ষম। কিন্তু তিনি চান তাঁর বান্দারা তাদের প্রচেষ্টা তাঁর আনুগত্যে কাজে লাগাবে। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “অতএব যখন তোমরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধে মুকাবিলা কর তখন ঘাড়ে আঘাত কর, অবশেষে যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে মজবুতভাবে বাঁধ; তারপর হয় অনুকম্পা, নয় মুক্তিপণ। যতক্ষণ না যুদ্ধ এর ভার (অস্ত্র) নামিয়ে না ফেলে। এরূপই, আর আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদের থেকে প্ৰতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট হতে দেন না। অচিরেই তিনি তাদেরকে পথনির্দেশ করবেন এবং তাদের অবস্থা ভাল করে দিবেন। আর তিনি তাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পরিচয় তিনি তাদেরকে জানিয়েছিলেন।” [সূরা মুহাম্মদ: ৪–৬] আর এজন্যই ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, তিনি অবশ্যই সে সাহায্য করেছেন। [ইবন কাসীর]

জিহাদ তো তিনি তখনই ফরয করেছেন যখন তার উপযোগিতা দেখা গিয়েছিল। কেননা, তারা যখন মক্কায় ছিল তখন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল কম। যদি তখন জিহাদের কথা বলা হত, তবে তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যেত। আর এজন্যই যখন মদীনাবাসীরা আকাবার রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বাই’আত বা শপথ নিয়েছিল, তারা ছিল আশি জনেরও কিছু বেশী। তখন তারা বলেছিল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি উপত্যকাবাসীদের উপর আক্রমন করবো না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে এ জন্য নির্দেশ দেয়া হয়নি। তারপর যখন তারা সীমালঙ্ঘন করল, আর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের কাছ থেকে বের করে দিল এবং তাকে হত্যা করতে চাইল। আর সাহাবায়ে কিরামের কেউ হাবশাতে কেউ মদীনাতে হিজরত করল। তারপর যখন মদীনাতে তারা স্থির হলো এবং তাদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে পৗঁছালেন, তারা তার চারপাশে জমা হলেন। তাকে সাহায্য করার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। আর তাদের জন্য একটি ইসলামী দেশ হলো, একটি কেল্লা হলো যেখানে তারা আশ্রয় নিতে পারে, তখনই আল্লাহ শক্ৰদের সাথে জিহাদ করার অনুমতি দিলেন। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩৯) যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তারা অত্যাচারিত।[1] আর নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম।

[1] অধিকাংশ সালাফের মত এই যে, এই আয়াতে সর্বপ্রথম জিহাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে। যার দু’টি উদ্দেশ্য এখানে উল্লেখ করা হয়েছে; অত্যাচার বন্ধ করা ও আল্লাহর কালেমা উঁচু করা। কারণ যদি অত্যাচারিত মানুষের সাহায্য না করা হয় এবং তাদের ফরিয়াদে সাড়া না দেওয়া হয়, তাহলে পৃথিবীতে সবলরা দুর্বলদেরকে এবং শক্তিশালীরা শক্তিহীনদেরকে বাঁচতেই দেবে না। যার কারণে পৃথিবী অরাজকতা ও অশান্তিতে ভরে উঠবে। অনুরূপ আল্লাহর কালেমাকে উঁচু এবং বাতিলকে ধ্বংস করার চেষ্টা না করলে, বাতিল শক্তির আধিপত্য পৃথিবীর সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা হরণ করে নেবে এবং আল্লাহর নাম নেওয়ার জন্য কোন উপাসনালয় অবশিষ্ট থাকবে না। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুনঃ সূরা বাক্বারার ২৫১ নং আয়াতের টীকা।) صَومَعة صَوَامِع এর বহুবচন, এর অর্থ ছোট গীর্জা بِيعَة بِيَع এর বহুবচন, এর অর্থ বড় গীর্জা। صَلَوات বলতে ইয়াহুদীদের উপাসনালয় ও مَساجد বলতে মুসলিমদের উপাসনালয় মসজিদকে বুঝানো হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ২০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৩৯ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 পরের পাতা »