আল্লাহ পরাক্রমশালী (পরাক্রান্ত) বিষয়ক আয়াতসমূহ ৬২ টি
আল-বাকারা
২:১২৯ رَبَّنَا وَ ابۡعَثۡ فِیۡہِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡہُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِکَ وَ یُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَ الۡحِکۡمَۃَ وَ یُزَکِّیۡہِمۡ ؕ اِنَّکَ اَنۡتَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۱۲۹﴾

‘হে আমাদের রব, তাদের মধ্যে তাদের থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যে তাদের প্রতি আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে আর তাদেরকে পবিত্র করবে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’। আল-বায়ান

‘হে আমাদের প্রতিপালক! এদের কাছে একজন রসূল এদের মধ্য হতে প্রেরণ কর, যে এদেরকে তোমার আয়াতগুলো পড়ে শুনাবে এবং এদেরকে কিতাব ও জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেবে এবং এদেরকে বিশুদ্ধ করবে, নিশ্চয় তুমি ক্ষমতাশালী, প্রজ্ঞাময়।’ তাইসিরুল

হে আমাদের রাব্ব! তাদেরই মধ্য হতে এমন একজন রাসূল প্রেরণ করুন যিনি তাদেরকে আপনার নিদর্শনাবলী পাঠ করে শুনাবেন এবং তাদেরকে গ্রন্থ ও বিজ্ঞান শিক্ষা দান করবেন ও তাদেরকে পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময়। মুজিবুর রহমান

১২৯. হে আমাদের রব! আর আপনি তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রাসূল পাঠান(১), যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করবেন(২); তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন(৩) এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন(৪) আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’।

(১) হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি আমার সূচনা বলে দিচ্ছি, আমার পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দোআ, ঈসা 'আলাইহিস সালাম-এর সুসংবাদ এবং আমার মা স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, তার থেকে একটি আলো বের হল, যে আলোতে সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়েছে। [মুসনাদে আহমাদঃ ৫/২৬২] ঈসা আলাইহিস সালাম-এর সুসংবাদের অর্থ তার এ উক্তি (وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ) “আমি এমন এক নবীর সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আসবেন। তার নাম আহমাদ”। [সূরা আস-সাফঃ ৬] তার জননী গর্ভাবস্থায় স্বপ্নে দেখেন যে, তার পেট থেকে একটি নূর বের হয়ে সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকোজ্জ্বল করে তুলেছে। কুরআনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাবের আলোচনা প্রসংগে দু’জায়গায়, সূরা আলে-ইমরানের ১৬৪তম আয়াতে এবং সূরা জুমুআয় ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দোআয় উল্লেখিত ভাষারই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। এভাবে ইংগিত করা হয়েছে যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যে নবীর জন্য দোআ করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম।


(২) ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দোআর কারণে আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য তিনটি। তন্মধ্যে প্রথম হচ্ছে, আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা। তিলাওয়াতের আসল অর্থ অনুসরণ করা। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় এ শব্দটি কুরআন ও অন্যান্য আসমানী কিতাব পাঠ করার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ, যে লোক এসব কালাম পাঠ করে, এর অনুসরণ করাও তার একান্ত কর্তব্য। আসমানী গ্রন্থ ঠিক যেভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়, হুবহু তেমনিভাবে পাঠ করা জরুরী। নিজের পক্ষ থেকে তাতে কোন শব্দ অথবা স্বরচিহ্নটিও পরিবর্তন পরিবর্ধন করার অনুমতি নেই। ইমাম রাগেব বলেন, “আল্লাহর কালাম ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থ অথবা কালাম পাঠ করাকে সাধারণ পরিভাষায় তিলাওয়াত বলা যায় না’। [মুফরাদাতুল কুরআন]


(৩) ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দো’আ অনুসারে নবী রাসূলগন বিশেষ করে আমাদের রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দ্বিতীয় কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দান। এখানে কিতাব বলে আল্লাহর কিতাব বুঝানো হয়েছে। ‘হিকমত’ শব্দটি আরবী অভিধানে একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যথা– সত্যে উপনীত হওয়া, ন্যায় ও সুবিচার, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ইত্যাদি। ইমাম রাগেব বলেন, এ শব্দটি আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হলে এর অর্থ হয় সকল বস্তুর পূর্ণজ্ঞান ও সুদৃঢ় উদ্ভাবন। অন্যের জন্য ব্যবহৃত হলে এর অর্থ হয়, বিদ্যমান বস্তুসমূহের বিশুদ্ধ জ্ঞান, সৎকর্ম, ন্যায়, সুবিচার, সত্য কথা ইত্যাদি। এখন লক্ষ্য করা দরকার যে, আয়াতে হিকমতের অর্থ কি? মূলত: এখানে হিকমত শব্দের অর্থ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ। ইবনে কাসীর ও ইবনে জরীর রাহিমাহুল্লাহ কাতাদাহ থেকে এ ব্যাখ্যাই উদ্ধৃত করেছেন। হিকমত অর্থ কেউ কুরআনের তাফসীর, কেউ দ্বীনের গভীর জ্ঞান, কেউ শরীআতের বিধি-বিধানের জ্ঞান, কেউ এমন বিধিবিধানের জ্ঞান অর্জন বলেছেন, যা শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বর্ণনা থেকেই জানা যায়। নিঃসন্দেহে এসব উক্তির সারমর্ম হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ।


(৪) ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দোআ অনুসারে নবী-রাসূলগণ বিশেষ করে আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তৃতীয় কর্তব্য হচ্ছে পরিশুদ্ধি ও পবিত্রকরণ। আয়াতে উল্লেখিত يُزَكِّيهِمْ শব্দটি زكاة শব্দ থেকে উদ্ভুত। এর অর্থ পবিত্রতা। বাহ্যিক ও আত্মিক সকল প্রকার পবিত্রতার অর্থেই এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বাহ্যিক না-পাকী সম্পর্কে সাধারণ মুসলিমরাও ওয়াকিফহাল। আত্মিক না-পাকী হচ্ছে কুফর, শির্ক, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর ভরসা করা, অহংকার, হিংসা, শক্রতা, দুনিয়াপ্রীতি ইত্যাদি। কুরআন ও সুন্নাহতে এসব বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এ আয়াত থেকে আরও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হেদায়াত ও সংশোধনের ধারা দুটি, আল্লাহর রাসূল ও আল্লাহর গ্রন্থ। এ দুটি ব্যতীত কারও হেদায়াত লাভ হতে পারে না। এ আয়াতসমূহে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম অনেকগুলো দোআ করেছিলেন,

১) “আপনার নির্দেশে আমি এই জনমানবহীন প্রান্তরে নিজ পরিবার-পরিজনকে রেখে যাচ্ছি। আপনি একে একটি শান্তিপূর্ণ শহর বানিয়েদিন-যাতে এখানে বসবাস করা আতংকজনক না হয় এবং জীবনধারণের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সহজলভ্য হয়।” আল্লাহ্ তা'আলা কবুল করেছেন এবং সে উষর মরু প্রান্তর মক্কা নগরীতে পরিণত হয়েছে।

২) “হে রব! শহরটিকে শান্তির ভূমি করে দিন”। অর্থাৎ হত্যা, লুন্ঠন, কাফেরদের অধিকার স্থাপন, বিপদাপদ থেকে সুরক্ষিত ও নিরাপদ রাখুন। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর এই দোআও কবুল হয়েছে। মক্কা মুকাররামা শুধু একটি জনবহুল নগরীই নয়, সারা বিশ্বের প্রত্যাবর্তনস্থলও বটে। বিশ্বের চারদিক থেকে মুসলিমগণ এ নগরীতে পৌছাকে সর্ববৃহৎ সৌভাগ্য মনে করে। নিরাপদ ও সুরক্ষিতও এতটুকু হয়েছে যে, আজ পর্যন্ত কোন শক্রজাতি অথবা শক্রসম্রাট এর উপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। আল্লাহ তা'আলা হারাম শরীফের চতুঃসীমানায় জীব-জন্তুকেও নিরাপত্তা দান করেছেন। এই এলাকায় শিকার করা জায়েয নয়।

৩) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর তৃতীয় দোআ এই যে, এ শহরের অধিবাসীদের উপজীবিকা হিসেবে যেন ফল-মূল দান করা হয়। মক্কা-মুকাররমা ও পাশ্ববর্তী ভূমি কোনরূপ বাগ-বাগিচার উপযোগী ছিল না। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছিল না পানির নাম -নিশানা। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা ইবরাহীমের দোআ কবুল করেন। মক্কার কাছেই তায়েফে যাবতীয় ফলমূল প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয় যা মক্কার বাজারেই বেচা-কেনা হয়। এখনো সারা বিশ্ব থেকে ফলমূল মক্কায় নিয়ে আসা হয়।

৪) ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর চতুর্থ দোআ হচ্ছে, “হে আমাদের রব! আমাদের উভয়কে আপনার একান্ত অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধর হতে আপনার এক অনুগত জাতি উত্থিত করুন। আমাদেরকে ইবাদাতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হোন। আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। এ দোআটিও ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান ও আল্লাহভীতিরই ফল, আনুগত্যের অদ্বিতীয় কীর্তি স্থাপন করার পরও তিনি এরূপ দো'আ করেন যে, আমাদের উভয়কে আপনার আজ্ঞাবহ করুন। কারণ, আল্লাহ সম্পর্কিত জ্ঞান যার যত বৃদ্ধি পেতে থাকে সে তত বেশী অনুভব করতে থাকে যে, যথার্থ আনুগত্য তার দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না। এ দোআতে স্বীয় সন্তান-সন্ততিকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এতে বুঝা যায় যে, যিনি আল্লাহর পথে নিজের সন্তান-সন্ততিকে বিসর্জন দিতেও এতটুকু কুন্ঠিত নন, তিনিও সন্তানদের প্রতি কতটুকু আন্তরিকতা ও ভালবাসা রাখেন। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা শারিরিকের চাইতে আত্মিক ও জাগতিকের চাইতে পরলৌকিক আরামের জন্য চিন্তা করেন বেশী। এ কারণেই ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দোআ করলেন - “আমার সন্তানদের মধ্য থেকে একটি দলকে পূর্ণ আনুগত্যশীল কর”।

৫) ইবরাহীম 'আলাইহিস সালাম ভবিষ্যত বংশধরদের দুনিয়া ও আখেরাতের সার্বিক মংগলের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করেছেন যে, আমার বংশধরের মধ্যে একজন নবী প্রেরণ করুন - যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাদের তিলাওয়াত করে শোনাবেন, কুরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দেবেন এবং বাহ্যিক ও আত্মিক অপবিত্রতা থেকে তাদের পবিত্র করবেন। দোআয় নিজের বংশধরের মধ্য থেকেই নবী হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর কারণ প্রথমতঃ এই যে, এটা তার সন্তানদের জন্য গৌরব-এর বিষয়। দ্বিতীয়তঃ এতে তাদের কল্যাণও নিহিত রয়েছে। কারণ স্বগোত্র থেকে নবী হলে তার চাল-চলন ও অভ্যাস-আচরণ সম্পর্কে তারা উত্তমরূপে অবগত থাকবে। ধোঁকাবাজি ও প্রবঞ্চনার সম্ভাবনা থাকবে না।

তাফসীরে জাকারিয়া

১২৯। হে আমাদের প্রতিপালক! আর তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রসূল প্রেরণ কর, [1] যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের নিকট আবৃত্তি করবে; তাদেরকে কিতাব (ধর্মগ্রন্থ) ও হিকমত (জ্ঞান ও প্রজ্ঞা) [2] শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে (শিরক থেকে) পবিত্র করবে। [3] নিশ্চয় তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’

[1] এটা ইবরাহীম (আঃ)-এর শেষ দু'আ। তাঁর এ দু'আও আল্লাহ তাআলা কবুল করেন এবং ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানের মধ্য থেকে মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে প্রেরণ করেন। আর এই জন্যই রসূল (সাঃ) বলেছেন, আমি হলাম আমার পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর দু'আ, ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদ এবং আমার জননীর স্বপ্ন । (ফাতহুররাব্বানী ২০/১৮১-১৮৯)

[2] 'কিতাব' বলতে কুরআন মাজীদ, আর 'হিকমত' বলতে হাদীস। আয়াতসমূহ তেলাঅত বা আবৃত্তি করার পর কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কুরআন মাজীদের কেবল তেলাঅতও উদ্দিষ্ট ও বাঞ্ছিত এবং তা সওয়াব ও নেকী লাভের মাধ্যম। তবে তার অর্থ ও তাৎপর্যও যদি বুঝা যায়, তাহলে তা হবে সোনার উপর সোহাগা। কিন্তু যদি কেউ কুরআনের তরজমা ও অর্থ না জানে, তবুও তার জন্য তেলাঅতের ব্যাপারে উদাসীনতা জায়েয নয়। কারণ, তেলাঅত করাই পৃথক একটি নেকীর কাজ। তবে যথাসম্ভব তার অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝার চেষ্টা করা উচিত।

[3] তেলাঅত এবং কিতাব ও হিকমতের শিক্ষার পর রসূল (সাঃ)-এর আগমনের এটা হল চতুর্থ উদ্দেশ্য। আর তা হল, তাদেরকে শিরক ও কুসংস্কারের আবর্জনা থেকে এবং চরিত্র ও কর্মের সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২০৯ فَاِنۡ زَلَلۡتُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَتۡکُمُ الۡبَیِّنٰتُ فَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ﴿۲۰۹﴾

অতএব তোমরা যদি পদস্খলিত হও, তোমাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর, তবে জেনে রাখ যে, আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

তোমাদের নিকট সুস্পষ্ট হুকুম পৌঁছার পরেও যদি তোমাদের পদস্খলন ঘটে তবে জেনে রেখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়। তাইসিরুল

অতঃপর স্পষ্ট দলীল প্রমাণাদী তোমাদের নিকট সমাগত হওয়ার পরেও যদি তোমরা পদস্খলিত হয়ে যাও তাহলে জেনে রেখ, আল্লাহ হচ্ছেন মহাপরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময়। মুজিবুর রহমান

২০৯. অতঃপর তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণাদি আসার পর যদি তোমাদের পদস্থলন ঘটে, তবে জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(২০৯) অতঃপর প্রকাশ্য নিদর্শন আসার পরও যদি তোমাদের পদস্খলন ঘটে, তবে জেনে রাখ যে, আল্লাহ মহা পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২২০ فِی الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃِ ؕ وَ یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الۡیَتٰمٰی ؕ قُلۡ اِصۡلَاحٌ لَّہُمۡ خَیۡرٌ ؕ وَ اِنۡ تُخَالِطُوۡہُمۡ فَاِخۡوَانُکُمۡ ؕ وَ اللّٰہُ یَعۡلَمُ الۡمُفۡسِدَ مِنَ الۡمُصۡلِحِ ؕ وَ لَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَاَعۡنَتَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ﴿۲۲۰﴾

দুনিয়া ও আখিরাতের ব্যাপারে। আর তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে ইয়াতীমদের সম্পর্কে। বল, সংশোধন করা তাদের জন্য উত্তম। আর যদি তাদেরকে নিজদের সাথে মিশিয়ে নাও, তবে তারা তোমাদেরই ভাই। আর আল্লাহ জানেন কে ফাসাদকারী, কে সংশোধনকারী এবং আল্লাহ যদি চাইতেন, অবশ্যই তোমাদের জন্য (বিষয়টি) কঠিন করে দিতেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

দুনিয়া এবং আখিরাত সম্বন্ধে। আরও তারা তোমাকে ইয়াতীমদের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে; বল, ‘তাদের উপকার করা উত্তম’ এবং যদি তাদের সঙ্গে তোমরা একত্রে থাক, তবে তারা তো তোমাদেরই ভাই। বস্তুতঃ আল্লাহ জানেন কে অনিষ্টকারী আর কে কল্যাণকামী এবং আল্লাহ যদি ইচ্ছে করতেন, নিশ্চয়ই এ বিষয়ে তোমাদেরকে কঠোরতার মধ্যে নিক্ষেপ করতেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ প্রবল পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়। তাইসিরুল

পার্থিব ও পারলৌকিক বিষয়ে। তারা তোমাকে ইয়াতীমদের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে; তুমি বলঃ তাদের হিত সাধন করাই উত্তম; এবং যদি তোমরা তাদেরকে সম্মিলিত করে নাও তাহলে তারা তোমাদের ভাই; আর কে অনিষ্টকারী, কে হিতাকাংখী আল্লাহ তা অবগত আছেন এবং যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তাহলে তিনি তোমাদেরকে বিপদে ফেলতেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময়। মুজিবুর রহমান

২২০. দুনিয়া এবং আখেরাতের ব্যাপারে। আর লোকেরা আপনাকে ইয়াতিমদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে; বলুন, তাদের জন্য সুব্যবস্থা করা উত্তম। তোমরা যদি তাদের সাথে একত্রে থাক তবে তারা তো তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ জানেন কে উপকারকারী এবং কে অনিষ্টকারী(১)। আর আল্লাহ ইচ্ছে করলে এ বিষয়ে তোমাদেরকে অবশ্যই কষ্টে ফেলতে পারতেন। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ প্রপবল পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।

(১) ইবনে আব্বাস বলেন, যখন “তোমরা উত্তম পদ্ধতি ব্যতীত ইয়াতিমের সম্পদের কাছেও যেও না” [সূরা আল-আনআমঃ ১৫২, আল-ইসরা: ৩৪] নাযিল হল তখন অনেকেই ইয়াতিমদের থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখে। ফলে ইয়াতিমরা বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন এ আয়াত নাযিল করে আল্লাহ তা'আলা ইয়াতিমদের সাথে কিভাবে চলতে হবে তা জানিয়ে দেন। [আবু দাউদ: ২৮৭১]

তাফসীরে জাকারিয়া

(২২০) ইহকাল ও পরকাল সম্বন্ধে। লোকে তোমাকে পিতৃহীনদের সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করে;[1] বল, তাদের উপকারের চেষ্টা করাই উত্তম। আর যদি তোমরা তাদের সাথে মিলে-মিশে থাক, তাহলে তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ জানেন কে হিতকারী ও কে অনিষ্টকারী। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে কষ্টে ফেলতে পারতেন। [2] নিশ্চয় আল্লাহ প্রবল পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়।

[1] অন্যায়ভাবে এতীমদের মাল ভক্ষণকারীদের প্রতি যখন তিরস্কার নাযিল হল, তখন সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) ভয় পেয়ে গেলেন এবং এতীমদের মাল পৃথক করে দিলেন, এমন কি পানাহারের কোন কিছু অবশিষ্ট রয়ে গেলে তাও এই ভয়ে ব্যবহার করতেন না যে, আমরাও যেন (আল্লাহ কর্তৃক) নাযিলকৃত শাস্তির উপযুক্ত ও তিরস্কারে শামিল না হয়ে যাই, ফলে তা খারাপ হয়ে যেত। এই কারণেই এই আয়াত নাযিল হল। (ইবনে কাসীর)

[2] অর্থাৎ, উপকারের চেষ্টা ও সৎ উদ্দেশ্যেও তাদের মালকে তোমাদের মালের সাথে মিশিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিতেন না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-বাকারা
২:২৬০ وَ اِذۡ قَالَ اِبۡرٰہٖمُ رَبِّ اَرِنِیۡ کَیۡفَ تُحۡیِ الۡمَوۡتٰی ؕ قَالَ اَوَ لَمۡ تُؤۡمِنۡ ؕ قَالَ بَلٰی وَ لٰکِنۡ لِّیَطۡمَئِنَّ قَلۡبِیۡ ؕ قَالَ فَخُذۡ اَرۡبَعَۃً مِّنَ الطَّیۡرِ فَصُرۡہُنَّ اِلَیۡکَ ثُمَّ اجۡعَلۡ عَلٰی کُلِّ جَبَلٍ مِّنۡہُنَّ جُزۡءًا ثُمَّ ادۡعُہُنَّ یَاۡتِیۡنَکَ سَعۡیًا ؕ وَ اعۡلَمۡ اَنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ﴿۲۶۰﴾

আর যখন ইবরাহীম বলল ‘হে, আমার রব, আমাকে দেখান, কিভাবে আপনি মৃতদেরকে জীবিত করেন। তিনি বললেন, তুমি কি বিশ্বাস করনি’? সে বলল, ‘অবশ্যই হ্যাঁ, কিন্তু আমার অন্তর যাতে প্রশান্ত হয়’। তিনি বললেন, ‘তাহলে তুমি চারটি পাখি নাও। তারপর সেগুলোকে তোমার প্রতি পোষ মানাও। অতঃপর প্রতিটি পাহাড়ে সেগুলোর টুকরো অংশ রেখে আস। তারপর সেগুলোকে ডাক, সেগুলো দৌড়ে আসবে তোমার নিকট। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’। আল-বায়ান

যখন ইবরাহীম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি মৃতকে কীরূপে জীবিত করবে আমাকে দেখাও’। আল্লাহ বললেন, ‘তুমি কি বিশ্বাস কর না’? সে আরয করল, ‘নিশ্চয়ই, তবে যাতে আমার অন্তঃকরণ স্বস্তি লাভ করে (এজন্য তা দেখতে চাই)’। আল্লাহ বললেন, তাহলে চারটি পাখী নাও এবং তাদেরকে বশীভূত কর। তারপর ওদের এক এক টুকরো প্রত্যেক পাহাড়ের উপর রেখে দাও, অতঃপর সেগুলোকে ডাক দাও, তোমার নিকট দৌড়ে আসবে। জেনে রেখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। তাইসিরুল

এবং যখন ইবরাহীম বলেছিলঃ হে আমার রাব্ব! আপনি কিরূপে মৃতকে জীবিত করেন তা আমাকে প্রদর্শন করুন। তিনি বললেনঃ তাহলে কি তুমি বিশ্বাস করনা? সে বললঃ হ্যাঁ অবশ্যই, কিন্তু তাতে আমার অন্তর পরিতৃপ্ত হবে। তিনি বললেনঃ তাহলে চারটি পাখী গ্রহণ কর, তারপর ওদেরকে টুকরা টুকরা করে মিশ্রিত কর, অনন্তর প্রত্যেক পাহাড়ের উপর ওদের এক এক খন্ড রেখে দাও, অতঃপর ওদেরকে আহবান কর, ওরা তোমার নিকট দৌড়ে আসবে; এবং জেনে রেখ যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময়। মুজিবুর রহমান

২৬০. আর যখন ইবরাহীম বলল, “হে আমার রব! কিভাবে আপনি মৃতকে জীবিত করেন আমাকে দেখান, তিনি বললেন, তবে কি আপনি ঈমান আনেন নি? তিনি বললেন, অবশ্যই হ্যাঁ, কিন্তু আমার মন যাতে প্রশান্ত হয়!(১) আল্লাহ্‌ বললেন, তবে চারটি পাখি নিন এবং তাদেরকে আপনার বশীভূত করুন। তারপর সেগুলোর টুকরো অংশ এক এক পাহাড়ে স্থাপন করুন। তারপর সেগুলোকে ডাকুন, সেগুলো আপনার নিকট দৌড়ে আসবে। আর জেনে রাখুন, নিশ্চয় আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়(২)।

(১) আয়াতে বর্ণিত কাহিনীর সার-সংক্ষেপ হচ্ছে এই যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহ্ তা'আলার কাছে আরয করলেনঃ আপনি কিভাবে মৃতকে পুনজীবিত করবেন, তা আমাকে প্রত্যক্ষ করান। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করলেনঃ ‘এরূপ আকাংখা ব্যক্ত করার কারণ কি? আমার সর্বময় ক্ষমতার প্রতি কি আপনার আস্থা নেই? ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নিজের আস্থা বিবৃত করে নিবেদন করলেনঃ আস্থা ও বিশ্বাস তো অবশ্যই আছে। কেননা, আপনার সর্বময় ক্ষমতার নিদর্শন সর্বদা, প্রতি মুহুর্তেই দেখতে পাচ্ছি এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই তার নিজের সত্তা থেকে শুরু করে এ বিশ্ব জাহানের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে এর প্রমাণ দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু মানব প্রকৃতির সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে যে, অন্তরের বিশ্বাস যতই দৃঢ় হোক, চোখে না দেখা পর্যন্ত অন্তরে পূর্ণ প্রশান্তি আসতে চায় না, প্রশ্নের পর প্রশ্ন জাগতে থাকে; এটা কি করে হবে, না জানি এর প্রক্রিয়াটা কেমন?

মনের মাঝে এ ধরনের প্রশ্ন উদয় হওয়ার ফলে পূর্ণ প্রশান্তি লাভ হতে চায় না। নানা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এ কারণেই ইবরাহীম 'আলাইহিস সালাম এরূপ নিবেদন করেছিলেন, যাতে মৃত ব্যক্তিকে জীবিতকরণঃ সংক্রান্ত চিন্তা দ্বিধাগ্রস্ত না হয়ে পড়ে। অধিকন্তু মনে যাতে স্থিরতা আসে; নানা প্রশ্নের জাল যেন অন্তরে বাসা বাধতে না পারে এবং মনের দৃঢ়তা যাতে বজায় থাকে। আল্লাহ্ তা'আলা তার প্রার্থনা কবুল করলেন এবং বিষয়টি প্রত্যক্ষ করাবার জন্য একটি অভিনব ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন, যাতে মুশরিকদের যাবতীয় সন্দেহ-সংশয়ও দূর হয়ে যায়। প্রক্রিয়াটি ছিল এই যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে চারটি পাখি ধরে নিজের কাছে রেখে সেগুলোকে এমনভাবে লালন-পালন করতে নির্দেশ দেয়া হল, যাতে সেগুলো সম্পূর্ণরূপে পোষ মেনে যায় এবং ডাকামাত্রই হাতের কাছে চলে আসে। তদুপরি তিনি যেন সেগুলোকে ভালভাবে চিনতেও পারেন।

পরে নির্দেশ হল, পাখীগুলোকে জবাই করে এগুলোর হাড়-মাংস, পাখা ইত্যাদির সবগুলোকেই কিমায় পরিণত করুন, তারপর সেগুলোকে ভাল করে মিশিয়ে নিয়ে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে নিজের পছন্দমত কয়েকটি পাহাড়ে এক-একটি ভাগ রেখে দিন। তারপর এদেরকে ডাকুন। তখন এগুলো আল্লাহর কুদরতে জীবিত হয়ে উড়ে আপনার কাছে চলে আসবে। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তা-ই করলেন। অতঃপর এদের যখন ডাকলেন, সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের সাথে হাড়, পাখার সাথে পাখা, গোশতের সাথে গোশত, রক্তের সাথে রক্ত মিলে পূর্বের রূপ ধারণ করল এবং তার কাছে উড়ে এসে উপস্থিত হল। [তাফসীরে কুরতুবী: ৪/৩১৪]


(২) পরাক্রমশালী হওয়ার মধ্যে সর্বশক্তিমানতা বিধৃত হয়েছে; আর প্রজ্ঞাময় বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, কোন বিশেষ হেকমতের কারণেই প্রত্যেককে মৃত্যুর পর পুনজীবন প্রত্যক্ষ করানো হয় না। নতুবা প্রত্যেককে এটা প্রত্যক্ষ করানো আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষে মোটেই কঠিন নয়। সুতরাং প্রত্যক্ষ না করানোর মধ্যে ঈমান বিল-গায়েব বা গায়েবের উপর ঈমান স্থাপন করার বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন থাকে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(২৬০) আরো (স্মরণ কর) যখন ইব্রাহীম বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত কর, আমাকে দেখাও।’[1] তিনি বললেন, ‘তুমি কি এ বিশ্বাস কর না?’ সে বলল, ‘অবশ্যই (বিশ্বাস করি)। কিন্তু আমার মনকে প্রবোধ দানের জন্য (দেখতে চাই)!’ তিনি বললেন, ‘তবে চারটি পাখী ধর এবং ঐগুলিকে (পুষে) তোমার বশীভূত কর (তা যবেহর পর টুকরা-টুকরা করে সম্মিলিত কর)। তারপর তাদের এক এক অংশ এক এক পাহাড়ে স্থাপন কর। অতঃপর ঐগুলিকে ডাক দাও, (দেখবে,) ঐগুলি দ্রুতগতিতে তোমার নিকট এসে উপস্থিত হবে। আর জেনে রাখ যে, আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।’

[1] এটা মৃতকে জীবিত করার দ্বিতীয় ঘটনা, যা দেখানো হয়েছিল একজন অতীব সম্মানিত পয়গম্বর ইবরাহীম (আঃ)-এর আশা পূরণের এবং তাঁর আন্তরিক প্রশান্তি লাভের জন্য। চারটি কোন্ কোন্ পাখি ছিল? মুফাসসিরগণ বিভিন্ন নাম উল্লেখ করেছেন। তবে নাম নির্দিষ্টীকরণে কোন লাভ নেই। এই কারণেই মহান আল্লাহ তাদের নামের উল্লেখ করেননি। চারটি বিভিন্ন প্রকারের পাখি ছিল। فَصُرْهُنَّ এর একটি অর্থ করা হয়েছে, أَمِلْهُنَّ (আকৃষ্ট করে নাও) অর্থাৎ, পোষ মানিয়ে নাও। যাতে জীবিত হওয়ার পর সহজেই চিনে নিতে পারো যে, এগুলো সেই পাখিই এবং কোন প্রকারের সন্দেহের অবকাশ না থাকে। তবে এই অর্থে ثُمَّ قَطِّعْهنَ (অতঃপর সেগুলোকে টুকরা টুকরা কর) শব্দ ঊহ্য মেনে নিতে হবে। দ্বিতীয় অর্থ করা হয়েছে, قَطِّعْهُنَّ (সেগুলোকে টুকরা টুকরা করে নাও)। এই অর্থে কোন কিছু ঊহ্য না মেনেও মানে পরিষ্কার হয়ে যায়। অর্থাৎ, সেগুলোকে টুকরা টুকরা করে তাদের অংশগুলো একে অপরের সাথে মিশ্রিত করে বিভিন্ন পাহাড়ে রেখে দাও। অতঃপর সেগুলোকে ডাকো, দেখবে তারা জীবিত হয়ে তোমার কাছে চলে আসবে। ঠিক তা-ই হল। পূর্বের ও বর্তমানের কোন কোন মুফাসসিরগণ (যাঁরা সাহাবী ও তাবেঈনদের তাফসীরের এবং সালফে-সালেহীনদের তরীকার কোন গুরুত্ব দেন না তাঁরা) فَصُرْهُنَّ এর অনুবাদ কেবল ‘পোষ মানিয়ে নাও’ করেছেন। আর পাখিগুলোকে যবেহ করার পর টুকরা টুকরা করে পাহাড়ে তার অংশগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়ার, তারপর মহান আল্লাহর মহাশক্তি দ্বারা সেগুলোর আপোসে জোড়া লাগার কথা স্বীকার করেন না। বলা বাহুল্য এ অনুবাদ সঠিক নয়। এ রকম অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করলে ঘটনার সমস্ত অলৌকিকতাই শেষ হয়ে যায় এবং মৃতকে জীবিত করে দেখানোর প্রশ্ন থেকেই যায়। অথচ এই ঘটনাকে উল্লেখ করার উদ্দেশ্যই হল, মহান আল্লাহর মৃতকে জীবিত করার গুণ ও তাঁর মহাশক্তিকে প্রমাণ করা। একটি হাদীসে নবী করীম (সাঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর এই ঘটনার উল্লেখ করে বলেছেন, ‘‘আমরা ইবরাহীম (আঃ) অপেক্ষা সন্দেহ করার অধিকার বেশী রাখি।’’ (বুখারী ৩৩২৭নং) আর এর অর্থ এই নয় যে, ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর কুদরতে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন, অতএব সন্দেহ করার অধিকার তাঁর চেয়ে আমাদের বেশী; বরং উদ্দেশ্য হল, তাঁর যে সন্দেহ হতে পারে তার খন্ডন করা। অর্থাৎ, ইবরাহীম (আঃ) মৃতকে জীবিত করার ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ করেননি। যদি তিনি এ ব্যাপারে সন্দেহ করে থাকতেন, তাহলে অবশ্যই সন্দেহ করার ব্যাপারে আমাদের অধিকার তাঁর চেয়ে বেশী হত। (অধিক জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ ফাতহুল ক্বাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:৪ مِنۡ قَبۡلُ ہُدًی لِّلنَّاسِ وَ اَنۡزَلَ الۡفُرۡقَانَ ۬ؕ اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِ اللّٰہِ لَہُمۡ عَذَابٌ شَدِیۡدٌ ؕ وَ اللّٰہُ عَزِیۡزٌ ذُو انۡتِقَامٍ ﴿۴﴾

ইতঃপূর্বে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ। আর তিনি ফুরকান নাযিল করেছেন। নিশ্চয় যারা অস্বীকার করে আল্লাহর আয়াতসমূহ, তাদের জন্যই রয়েছে কঠিন আযাব। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধগ্রহণকারী। আল-বায়ান

ইতোপূর্বে মানবজাতির পথ প্রদর্শনের জন্য; আর তিনি সেই মানদন্ড নাযিল করেছেন যা হাক্ব ও বাতিলের পার্থক্য দেখিয়ে দেয়; নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর আয়াতের সাথে কুফুরী করে, তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, দন্ডদাতা। তাইসিরুল

মানবমন্ডলীর জন্য সৎপথ প্রদর্শনের জন্য এবং তিনিই ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন। যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলীর প্রতি অবিশ্বাস করে নিশ্চয়ই তাদের জন্য কঠোর শাস্তি রয়েছে এবং আল্লাহ পরাক্রান্ত, প্রতিশোধ গ্রহণকারী। মুজিবুর রহমান

৪. ইতোপূর্বে মানুষের হেদায়াতস্বরূপ(১) আর তিনি ফুরকান নাযিল করেছেন(২)। নিশ্চয় যারা আল্লাহর আয়াতসমূহে কুফরী করে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। আর আল্লাহ মহা-পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।(৩)

(১) কাতাদা বলেন, এ দুটি আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব। এতে রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণনা। যে এ দুটি থেকে হিদায়াত গ্রহণ করেছে, সত্য বলে বিশ্বাস করেছে এবং সেটা অনুসারে আমল করেছে সে নিরাপত্তা পেয়েছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ] সে হিসেবে এটাকে মানুষের হিদায়াতের জন্য নাযিল করা হয়েছে বলে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পবিত্র কুরআন নাযিল হওয়ার পর এ দুটি গ্রন্থ রহিত হয়ে গেছে, তা থেকে হিদায়াত লাভের আর কোন উপায় নেই।


(২) ওয়াসিলা ইবন আসকা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সহীফাসমূহ রামাদান মাসের প্রথম রাত্রিতে নাযিল হয়েছিল, তাওরাত নাযিল হয়েছিল রামাদান মাসের ছয়দিন অতিবাহিত হওয়ার পর, ইঞ্জল নাযিল হয়েছিল রামাদান মাসের তের রাত্রি পার হওয়ার পর আর ফুরকান নাযিল হয়েছিল রামাদান মাসের চব্বিশ রাত্রি পার হওয়ার পর।” [মুসনাদে আহমাদ ৪/১০৭] কাতাদাহ বলেন, আয়াতে ফুরকান বলে পবিত্র কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর তা নাযিল করে এর মাধ্যমে হক ও বাতিলের পার্থক্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তাঁর হালালকৃত বস্তুকে হালাল এবং হারামকৃত বস্তুকে এর মাধ্যমে হারাম ঘোষণা করেছেন। তাঁর শরীআতকে প্রবর্তন করেছেন। অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কি কি জিনিস ফরয করেছেন তা বর্ণনা করেছেন। আর তাঁর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন এবং অবাধ্যতা হতে নিষেধ করেছেন। [আত-তাফসীরুস সহীহ]


(৩) আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলার পরিপূর্ণ শক্তি এবং সর্ববিষয়ে সার্বিক সামর্থ্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনি মানুষকে জননীর উদরে তিনটি অন্ধকার স্তরের মাঝে কিরূপ নিপুণভাবে গঠন করেছেন। তাদের আকার-আকৃতি ও বর্ণ বিন্যাসে এমন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন যে, আকৃতি ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে একজনের আকার-আকৃতি অন্যজনের অনুরূপ নয় বিধায়, স্বতন্ত্র পরিচয় দূরূহ হয়ে পড়ে। এহেন সর্বব্যাপী জ্ঞান ও পরিপূর্ণ শক্তি-সামর্থ্যের যুক্তিসঙ্গত দাবী এই যে, ইবাদাত একমাত্র তারই করতে হবে। তিনি ছাড়া আর কারো জ্ঞান ও শক্তি-সামর্থ্য এরূপ নয়। কাজেই অন্য কেউ ইবাদাতের যোগ্যও নয়। [মাআরিফুল কুরআন]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) পূর্বে তিনি মানবজাতিকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য[1] তাওরাত ও ইঞ্জীল অবতীর্ণ করেছেন এবং তিনি ফুরক্বান (ন্যায়-অন্যায়ের মীমাংসাকারী; কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। [2] নিশ্চয় যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে অমান্য করে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। বস্তুতঃ আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।

[1] ইতিপূর্বে নবীদের উপর যে কিতাবসমূহ নাযিল হয়েছে, এই কিতাব সেগুলোর সত্যায়ন করে। অর্থাৎ, সে কিতাবগুলোতে যে কথাগুলো লিপিবদ্ধ ছিল, তার সত্যায়ন করে এবং তাতে যে সব ভবিষ্যদ্বাণী বর্ণিত হয়েছে, তা সত্য বলে স্বীকার করে। আর এর পরিষ্কার অর্থ হল, কুরআন কারীমও সেই সত্তার পক্ষ হতে অবতীর্ণ, যে সত্তা পূর্বেও বহু কিতাব নাযিল করেছেন। এটা যদি কোন অন্য পক্ষ হতে আসত অথবা মানুষের চেষ্টার ফল হত, তাহলে এর এবং উক্ত কিতাবগুলোর মধ্যে পারস্পরিক মিল থাকার পরিবর্তে অমিলই থাকত।

[2] অর্থাৎ, অবশ্যই তাওরাত এবং ইঞ্জীল সব সব সময়ে মানুষের হিদায়াতের উৎস ছিল। কারণ এগুলোর অবতীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল এটাই। এরপর ‘তিনি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন’ বলে এ কথা পরিষ্কার করে দিলেন যে, তাওরাত ও ইঞ্জীলের যামানা শেষ হয়ে গেছে। এখন তো কুরআন অবতীর্ণ হয়ে গেছে। আর কুরআনই হল ফুরকান এবং সত্য ও মিথ্যা জানার এটাই হল কষ্টিপাথর। এটাকে সত্য বলে বিশ্বাস না করলে আল্লাহর নিকট কেউ মুসলিম ও মু’মিন হতে পারবে না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:৬ ہُوَ الَّذِیۡ یُصَوِّرُکُمۡ فِی الۡاَرۡحَامِ کَیۡفَ یَشَآءُ ؕ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۶﴾

তিনিই মাতৃগর্ভে তোমাদেরকে আকৃতি দান করেন যেভাবে তিনি চান। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই; তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

তিনিই তোমাদেরকে মায়ের পেটে যেভাবে ইচ্ছে আকৃতি দেন, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তিনি মহাশক্তিমান ও প্রজ্ঞাশীল। তাইসিরুল

তিনিই স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী জরায়ুর মধ্যে তোমাদের আকৃতি গঠন করেছেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোনই উপাস্য নেই, তিনি পরাক্রান্তশালী, বিজ্ঞানময় । মুজিবুর রহমান

৬. তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছে তোমাদের আকৃতি গঠন করেন।(১) তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই; (তিনি) প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

(১) কাতাদা বলেন, আল্লাহর শপথ, আমাদের রব তার বান্দাদেরকে মায়ের গর্ভে যেভাবে ইচ্ছা গঠন করতে পারেন। ছেলে বা মেয়ে, কালো বা গৌরবর্ণ, পূর্ণসৃষ্টি অথবা অপূর্ণসৃষ্টি। [আত-তাফসীরুস সহীহ]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই। [1] তিনি প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

[1] সুশ্রী অথবা কুশ্রী, ছেলে অথবা মেয়ে, সৌভাগ্যবান অথবা দুর্ভাগ্যবান এবং পূর্ণাঙ্গ অথবা বিকলাঙ্গ ইত্যাদি বিচিত্রময়তা মায়ের গর্ভে যখন এককভাবে আল্লাহই সৃষ্টি করেন, তখন ঈসা (আঃ) ইলাহ কিভাবে হতে পারেন? তিনি নিজেও তো সৃষ্টির নানা পর্যায় অতিক্রম করে দুনিয়াতে এসেছেন। মহান আল্লাহ তাঁরও সৃষ্টি সম্পাদন করেছেন তাঁর মায়ের গর্ভে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১৮ شَہِدَ اللّٰہُ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ۙ وَ الۡمَلٰٓئِکَۃُ وَ اُولُوا الۡعِلۡمِ قَآئِمًۢا بِالۡقِسۡطِ ؕ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿ؕ۱۸﴾

আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই, আর ফেরেশতা ও জ্ঞানীগণও। তিনি ন্যায় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া সত্যিকার কোন ইলাহ নেই এবং ফেরেশতাগণ ও ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানীগণও (সাক্ষ্য দিচ্ছে যে,) তিনি ছাড়া সত্যিকার কোন ইলাহ নেই, তিনি মহাপরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী। তাইসিরুল

আল্লাহ সাক্ষ্য প্রদান করেন যে, নিশ্চয়ই তিনি ব্যতীত কেহ ইলাহ (উপাস্য) নেই এবং মালাইকা/ফেরেশতা, জ্ঞানবানগণ ও সুবিচারে আস্থা স্থাপনকারীগণও সাক্ষ্য দেয় যে, এই মহা পরাক্রান্ত বিজ্ঞানময় ব্যতীত আর কোনই উপাস্য নেই। মুজিবুর রহমান

১৮. আল্লাহ সাক্ষ্য দেন(১) যে, নিশ্চয় তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। আর ফেরেশতাগণ এবং জ্ঞানীগণও, আল্লাহ ন্যায়নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই, (তিনি) পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

(১) অর্থাৎ যে আল্লাহ বিশ্ব জাহানের সমস্ত তত্ত্ব, সত্য ও রহস্যের প্রত্যক্ষ জ্ঞান রাখেন, যিনি সমগ্র সৃষ্টিকে আবরণহীন অবস্থায় দেখছেন এবং যার দৃষ্টি থেকে পৃথিবী ও আকাশের কোন একটি বস্তুও গোপন নেই এটি তার সাক্ষ্য। আর তার চেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য আর কে দিতে পারে? কারণ পৃথিবীতে ইলাহের স্বত্ব দাবী করার অধিকার ও যোগ্যতা কারও নেই। তিনি নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি ব্যতীত আর কোন হক্ক ইলাহ নেই। তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করা যুলুম ও অন্যায়। আল্লাহ্ তা'আলার এ সাক্ষ্যের সাথে তিনি আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদেরকেও শরীক করেছেন। তারাও এ মহৎ সাক্ষ্য দিয়ে থাকে। তারপর আল্লাহ তা'আলা আলেম তথা দ্বীনের জ্ঞানে জ্ঞানীদেরকেও এ সাক্ষ্য প্রদানের জন্য গ্রহণ করে সম্মানিত করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি মূলত: আলেম তথা দ্বীনের জ্ঞানে জ্ঞানীদের সম্মান বহুগুণ বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। [ইবনুল কাইয়্যেম: মিফতাহু দারিস সা’আদাহ; তাফসীরে সা'দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৮) আল্লাহ সাক্ষ্য দেন এবং ফিরিশতাগণ ও জ্ঞানী ব্যক্তিগণও সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই।[1] তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই; তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।

[1] ‘শাহাদাত’ (সাক্ষ্য) এর অর্থ বর্ণনা ও অবহিত করা। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন এবং বর্ণনা করেছেন, তার দ্বারা তিনি আমাদেরকে স্বীয় একত্ববাদের প্রতি পথপ্রদর্শন করেছেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) ফিরিশতাগণ এবং জ্ঞানিগণও তাঁর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেন। এতে জ্ঞানী ব্যক্তিদের বড়ই ফযীলত ও মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়। কেননা মহান আল্লাহ স্বীয় ফিরিশতাদের পাশাপাশি তাঁদেরকে উল্লেখ করেছেন। তবে জ্ঞানী বলতে তাঁরা, যাঁরা কিতাব ও সুন্নাহর জ্ঞানার্জন করে ধন্য হয়েছেন। (ফাতহুল ক্বাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:৬২ اِنَّ ہٰذَا لَہُوَ الۡقَصَصُ الۡحَقُّ ۚ وَ مَا مِنۡ اِلٰہٍ اِلَّا اللّٰہُ ؕ وَ اِنَّ اللّٰہَ لَہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۶۲﴾

নিশ্চয় এটি সত্য বিবরণ। আর আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই এবং নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই হলেন পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাপূর্ণ। আল-বায়ান

নিশ্চয়ই এটা প্রকৃত ঘটনা। আল্লাহ ছাড়া অন্য সত্য ইলাহ নেই। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই এটাই সত্য বিবরণ এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ (উপাস্য) নেই, নিশ্চয়ই সেই আল্লাহ বিজ্ঞানময়, মহাপরাক্রান্ত। মুজিবুর রহমান

৬২. নিশ্চয় এগুলো সত্য বিবরণ এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন হক ইলাহ নেই। আর নিশ্চয় আল্লাহ, তিনি তো পরম পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬২) নিশ্চয়ই এ হল সত্য কাহিনী। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই। আর নিশ্চয় আল্লাহ পরম প্রতাপশালী, প্রজ্ঞাময়।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:১২৬ وَ مَا جَعَلَہُ اللّٰہُ اِلَّا بُشۡرٰی لَکُمۡ وَ لِتَطۡمَئِنَّ قُلُوۡبُکُمۡ بِہٖ ؕ وَ مَا النَّصۡرُ اِلَّا مِنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ الۡعَزِیۡزِ الۡحَکِیۡمِ ﴿۱۲۶﴾ۙ

আর আল্লাহ তোমাদের জন্য তা কেবল সুসংবাদস্বরূপ নির্ধারণ করেছেন এবং যাতে তোমাদের অন্তরসমূহ এর দ্বারা প্রশান্ত হয়। আর সাহায্য কেবল পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল-বায়ান

এটা আল্লাহ কেবলমাত্র তোমাদের সুসংবাদের জন্য এবং তা দ্বারা তোমাদের চিত্ত-প্রশান্তির জন্য করেছেন, মূলতঃ সাহায্য তো শুধু আল্লাহরই নিকট হতে, যিনি পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়। তাইসিরুল

আর আল্লাহ এই সাহায্য শুধু এ জন্যই করেছেন যেন তোমাদের জন্য সুসংবাদ হয় এবং তোমাদের অন্তরে শান্তি আসে। আর সাহায্য শুধু আল্লাহর পক্ষ হতেই হয়ে থাকে, যিনি পরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময়। মুজিবুর রহমান

১২৬. আর এটা তো আল্লাহ তোমাদের জন্য শুধু সুসংবাদ ও তোমাদের আত্মিক প্রশান্তির জন্য করেছেন। আর সাহায্য তো শুধু পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর কাছ থেকেই হয়।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১২৬) আর এ (সাহায্যকে) তো আল্লাহ তোমাদের জন্য সুসংবাদ করেছেন, যাতে তোমাদের মন শান্তি পায় এবং সাহায্য শুধু পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট থেকেই আসে।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:৫৬ اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِنَا سَوۡفَ نُصۡلِیۡہِمۡ نَارًا ؕ کُلَّمَا نَضِجَتۡ جُلُوۡدُہُمۡ بَدَّلۡنٰہُمۡ جُلُوۡدًا غَیۡرَہَا لِیَذُوۡقُوا الۡعَذَابَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَزِیۡزًا حَکِیۡمًا ﴿۵۶﴾

নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, অচিরেই আমি তাদেরকে প্রবেশ করাব আগুনে। যখনই তাদের চামড়াগুলো পুড়ে যাবে তখনই আমি তাদেরকে পালটে দেব অন্য চামড়া দিয়ে যাতে তারা আস্বাদন করে আযাব। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

যারা আমার আয়াতসমূহকে প্রত্যাখ্যান করে নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে আগুনে দগ্ধ করব, যখন তাদের গায়ের চামড়া দগ্ধ হবে, আমি সেই চামড়াকে নতুন চামড়া দ্বারা বদলে দেব যেন তারা (শাস্তির পর) শাস্তি ভোগ করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়। তাইসিরুল

যারা আমার নিদর্শনসমূহের প্রতি অবিশ্বাসী হয়েছে তাদেরকে অবশ্যই আমি জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করাব। যখন তার চর্ম বিদগ্ধ হবে, আমি তৎপরিবর্তে তাদের চর্ম পরিবর্তন করে দিব, যেন তারা শাস্তির আস্বাদ গ্রহণ করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রান্ত, হিকমাতের অধিকারী। মুজিবুর রহমান

৫৬. নিশ্চয় যারা আমাদের আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে অবশ্যই তাদেরকে আমরা আগুনে পোড়াব; যখনই তাদের চামড়া পুড়ে পাকা দগ্ধ হবে তখনই তার স্থলে নতুন চামড়া বদলে দেব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে(১)। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

(১) এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে মু'আয রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন যে, তাদের শরীরের চামড়াগুলো যখন জ্বলে-পুড়ে যাবে, তখন সেগুলো পাল্টে দেয়া হবে এবং এ কাজটি এত দ্রুতগতিতে সম্পাদিত হবে যে, এক মুহুর্তে শতবার চামড়া পাল্টানো যাবে। হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আগুন তাদের চামড়াকে একদিনে সত্তর হাজার বার খাবে। যখন তাদের চামড়া খেয়ে ফেলবে, অমনি সেসব লোককে বলা হবে, তোমরা পূর্বাবস্থায় ফিরে যাও। সাথে সাথে সেগুলো পূর্বের মত হয়ে যাবে। [ইবন কাসীরঃ ১/৫১৪]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫৬) নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করে তাদেরকে আমি অচিরেই আগুনে প্রবিষ্ট করব।[1] যখনই তাদের চর্ম দগ্ধ হবে, তখনই ওর স্থলে নূতন চর্ম সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে থাকে।[2] নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

[1] অর্থাৎ, জাহান্নামে কেবল কিতাবধারীদের অস্বীকারকারীরাই যাবে না, বরং অন্য সমস্ত কাফেরদের ঠিকানাও হবে জাহান্নাম।

[2] এখানে রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি ও আযাবের ভয়াবহতা, তাঁর বিরতিহীনতা এবং তার একাধারে অব্যাহত থাকার বর্ণনা। কোন কোন সাহাবী থেকে বর্ণিত উক্তিতে এসেছে যে, চামড়ার এই পরিবর্তনের কাজ দিনে কয়েক শতবার হবে। (যেহেতু উষ্ণতা ও দগ্ধের জ্বালা ত্বকেই বেশী অনূভূত হয়, তাই মহান আল্লাহর এই ব্যবস্থা।) বিভিন্ন হাদীসের বর্ণনায় এসেছে যে, জাহান্নামীরা জাহান্নামে এত মোটা হয়ে যাবে যে, তাদের এক কাঁধ হতে অন্য কাঁধের দূরত্ব হবে দ্রুতগামী সওয়ারীর তিন দিনের পথ। তাদের চামড়ার স্থূলতা হবে সত্তর হাত এবং চোয়ালের দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের মত।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:১৬৫ رُسُلًا مُّبَشِّرِیۡنَ وَ مُنۡذِرِیۡنَ لِئَلَّا یَکُوۡنَ لِلنَّاسِ عَلَی اللّٰہِ حُجَّۃٌۢ بَعۡدَ الرُّسُلِ ؕ وَ کَانَ اللّٰہُ عَزِیۡزًا حَکِیۡمًا ﴿۱۶۵﴾

আর (পাঠিয়েছি) রাসূলগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, যাতে আল্লাহর বিপক্ষে রাসূলদের পর মানুষের জন্য কোন অজুহাত না থাকে। আর আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় । আল-বায়ান

রসূলগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী যাতে রসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অযুহাতের সুযোগ না থাকে। আল্লাহ হলেন মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়। তাইসিরুল

আমি সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শক রূপে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি যাতে রাসূলগণের পরে লোকদের মধ্যে আল্লাহ সম্বন্ধে কোন অপবাদ দেয়ার অবকাশ না থাকে এবং আল্লাহ পরাক্রান্ত, মহাজ্ঞানী। মুজিবুর রহমান

১৬৫. সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করেছি(১), যাতে রাসূলগণ আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

(১) আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারদের ঈমান ও সৎকর্মশীলতার পুরস্কারস্বরূপ জান্নাতের সুসংবাদ দান করার জন্য এবং কাফের, বেঈমান ও দূরাচারদের কুফর ও অবাধ্যতার শাস্তিস্বরূপ জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ভীতি প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে, দেশে দেশে অব্যাহতভাবে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন, যেন কিয়ামতের শেষ বিচারের দিনে অবাধ্য ব্যক্তিরা অজুহাত উত্থাপন করতে না পারে যে, হে আল্লাহ! কোন কাজে আপনি সন্তুষ্ট আর কোন কাজে আপনি অসন্তুষ্ট হন, তা আমরা উপলব্ধি করতে পারিনি। জানতে পারলে অবশ্যই আমরা আপনার সন্তুষ্টির পথ অবলম্বন করতাম। অতএব, আমাদের অনিচ্ছাকৃত ক্রটি মার্জনীয় এবং আমরা নিরপরাধ।

পথভ্রষ্ট লোকেরা যাতে এহেন অজুহাত পেশ করতে বা বাহানার আশ্রয় নিতে না পারে, তজ্জন্য আল্লাহ তা'আলা স্পষ্ট নিদর্শনসহ নবীগণকে প্রেরণ করেছেন এবং তারা সর্বস্ব উৎসর্গ করে সত্য পথ প্রদর্শন করেছেন। অতএব, এখন আর সত্য দ্বীন ইসলাম গ্রহণ না করার ব্যাপারে কোন অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না, কোন বাহানারও অবকাশ নেই। আল্লাহর ওহী এমন এক প্রকৃষ্ট প্রমাণ যার মোকাবেলায় অন্য কোন প্রমাণই কার্যকর হতে পারে না। কুরআনুল কারীম এমন এক অকাট্য দলীল যার সামনে কোন অযুক্তি টিকতে পারে না। এ আয়াতের ব্যাখ্যার জন্য সূরা ত্বা-হা এর ১৩৪ এবং সূরা আল-কাসাস এর ৪৭নং আয়াত দেখা যেতে পারে।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৬৫) আমি সুসংবাদবাহী ও সতর্ককারী[1] রসূল প্রেরণ করেছি; যাতে রসূল (আসার) পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে।[2] আর আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী।

[1] বিশ্বাসী বান্দাদেরকে জান্নাত ও জান্নাতের সুখ-সম্পদের সুসংবাদবাহী এবং অবিশ্বাসী বা কাফেরদেরকে আল্লাহর আযাব এবং জাহান্নামের প্রজ্বলিত আগুন থেকে ভীতি-প্রদর্শন ও সতর্ককারী।

[2] অর্থাৎ, নবুঅত অথবা সুসংবাদ দান ও ভীতি প্রদর্শনের ধারাকে এই জন্যেই অব্যাহত রেখেছেন, যাতে শেষ বিচারের দিনে কেউ এ ওজর পেশ করতে না পারে যে, আমাদের নিকট তোমার কোন বার্তা পৌঁঁছেনি। যেমন অন্যত্র আল্লাহ বলেন, {وَلَوْ أَنَّا أَهْلَكْنَاهُم بِعَذَابٍ مِّن قَبْلِهِ لَقَالُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُولًا فَنَتَّبِعَ آيَاتِكَ مِن قَبْلِ أَن نَّذِلَّ وَنَخْزَى} অর্থাৎ, যদি আমি ওদেরকে তার পূর্বে শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করতাম তাহলে ওরা বলত, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের নিকট একজন রসূল প্রেরণ করলে না কেন? করলে আমরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার পূর্বেই তোমার নিদর্শন মেনে নিতাম। (সূরা ত্বা-হা ১৩৪ আয়াত)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:৩৮ وَ السَّارِقُ وَ السَّارِقَۃُ فَاقۡطَعُوۡۤا اَیۡدِیَہُمَا جَزَآءًۢ بِمَا کَسَبَا نَکَالًا مِّنَ اللّٰہِ ؕ وَ اللّٰہُ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ﴿۳۸﴾

আর পুরুষ চোর ও নারী চোর তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও তাদের অর্জনের প্রতিদান ও আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষণীয় আযাবস্বরূপ এবং আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

আর চোর ও চোরনী তাদের হাত কেটে দাও, তাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ, আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। আল্লাহ হলেন মহাপরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞানী। তাইসিরুল

আর যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে, তোমরা তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসাবে তাদের (ডান হাত) কেটে ফেল, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি, আর আল্লাহ অতিশয় ক্ষমতাবান, মহা প্রজ্ঞাময়। মুজিবুর রহমান

৩৮. আর পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও; তাদের কৃতকর্মের ফল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে(১)। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

(১) চুরির শাস্তি হচ্ছে, ডান হাতের কব্জি পর্যন্ত কর্তন করা। তবে কতটুকু চুরি করলে সেটা করা হবে এবং কিভাবে চুরি করলে এ শাস্তি প্রয়োগ করা হবে, এর বিস্তারিত আলোচনা ফিকহ এর কিতাবসমূহ থেকে জেনে নিতে হবে। শর্তপূরণ ও বাস্তবায়নের বাধা অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেয়া যাবে না। [বিস্তারিত জানার জন্য তাফসীরে কুরতুবী দ্রষ্টব্য]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩৮) চোর এবং চোরনীর হাত কেটে ফেলো,[1] এ তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর তরফ হতে শাস্তি। বস্তুতঃ আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।

[1] কতক যাহেরিয়া মযহাবের ফিকহবিদদের অভিমত এই যে, চুরির এই বিধান সকল প্রকার চুরির জন্য ব্যাপক; চাহে তা অল্পই হোক, আর বেশীই হোক এবং সুরক্ষিত জায়গা থেকে চুরি করা হোক অথবা অরক্ষিত জায়গা থেকে চুরি করা হোক, সর্বাবস্থাতেই চোরের হাত কাটা যাবে। অথচ অন্যান্য ফিকহবিদদের অভিমত এই যে, তা সুরক্ষিত জায়গা থেকে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণের মাল চুরির শর্ত আছে। পরন্তু সেই নির্দিষ্ট পরিমাণের ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মুহাদ্দিসগণের অভিমত এই যে, এক চতুর্থাংশ স্বর্ণমুদ্রা (দীনার) অথবা তিনটি রৌপ্যমুদ্রা (দিরহাম) অথবা ঐ পরিমাণ মূল্যের কোন জিনিস চুরি করলে চোরের হাত কাটা যাবে; অন্যথা এর থেকে কম পরিমাণ হলে হাত কাটা যাবে না। অনুরূপভাবে হাত কবজি পর্যন্ত কাটা হবে; কনুই বা কাঁধ পর্যন্ত নয়, যেমন অনেকের অভিমত। (বিস্তারিত জানার জন্য বিভিন্ন হাদীস, ফিকহ ও তফসীর গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:৯৫ یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَقۡتُلُوا الصَّیۡدَ وَ اَنۡتُمۡ حُرُمٌ ؕ وَ مَنۡ قَتَلَہٗ مِنۡکُمۡ مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآءٌ مِّثۡلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ یَحۡکُمُ بِہٖ ذَوَا عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ ہَدۡیًۢا بٰلِغَ الۡکَعۡبَۃِ اَوۡ کَفَّارَۃٌ طَعَامُ مَسٰکِیۡنَ اَوۡ عَدۡلُ ذٰلِکَ صِیَامًا لِّیَذُوۡقَ وَبَالَ اَمۡرِہٖ ؕ عَفَا اللّٰہُ عَمَّا سَلَفَ ؕ وَ مَنۡ عَادَ فَیَنۡتَقِمُ اللّٰہُ مِنۡہُ ؕ وَ اللّٰہُ عَزِیۡزٌ ذُو انۡتِقَامٍ ﴿۹۵﴾

হে মুমিনগণ, ইহরামে থাকা অবস্থায় তোমরা শিকারকে হত্যা করো না এবং যে তোমাদের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তা হত্যা করবে তার বিনিময় হল যা হত্যা করেছে, তার অনুরূপ গৃহপালিত পশু, যার ফয়সালা করবে তোমাদের মধ্যে দু’জন ন্যায়পরায়ণ লোক- কুরবানীর জন্তু হিসাবে কা’বায় পৌঁছতে হবে। অথবা মিসকীনকে খাবার দানের কাফ্ফারা কিংবা সমসংখ্যক সিয়াম পালন, যাতে সে নিজ কর্মের শাস্তি আস্বাদন করে। যা গত হয়েছে তা আল্লাহ ক্ষমা করেছেন। যে পুনরায় করবে আল্লাহ তার থেকে প্রতিশোধ নেবেন। আর আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী। আল-বায়ান

ওহে বিশ্বাসীগণ! ইহরাম অবস্থায় তোমরা শিকার হত্যা করো না। জেনে বুঝে তোমাদের কেউ তা হত্যা করলে তার বিনিময় হচ্ছে অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু। যে ব্যাপারে তোমাদের মধ্যের ন্যায়পরায়ণ দু’জন লোক ফায়সালা করে দেবে, তা কা‘বাতে কুরবানীর জন্য পাঠাতে হবে। কিংবা তার কাফফারা হল কয়েকজন মিসকিনকে খাদ্য দান অথবা তদনুরূপ রোযা পালন, যেন সে স্বীয় কৃতকর্মের ফল ভোগ করে, পূর্বে যা হয়ে গেছে আল্লাহ তা ক্ষমা করেছেন; কেউ (পাপকাজ) পুনরায় করলে আল্লাহ তার নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণে পূর্ণ সক্ষম। তাইসিরুল

হে মু’মিনগণ! তোমরা ইহ্রামের অবস্থায় নিষিদ্ধ এলাকায় বণ্য শিকারকে হত্যা করনা; আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইচ্ছা পূর্বক শিকার বধ করবে তার উপর তখন বিনিময় ওয়াজিব হবে, যা (মূল্যের দিক দিয়ে) সেই জানোয়ারের সমতুল্য হয় যাকে সে হত্যা করেছে, যার (আনুমানিক মূল্যের) মীমাংসা তোমাদের মধ্য হতে দু‘জন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি করে দিবে। (অতঃপর নিরূপিত মূল্য দ্বারা) সেই বিনিময় গৃহপালিত চতুস্পদ জন্তু নেয়ায্ স্বরূপ কা‘বা ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিবে, না হয় কাফফারা স্বরূপ (নিরূপিত মূল্যের খাদ্যদ্রব্য) মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করবে, অথবা এর সম পরিমাণ সিয়াম পালন করবে, যেন নিজের কৃতকর্মের পরিণামের স্বাদ গ্রহণ করে; অতীত (ক্রটি) আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন; আর পুনরায় যে ব্যক্তি এরূপ কাজই করবে, আল্লাহ সেই ব্যক্তি হতে (এর) প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন; আল্লাহ পরাক্রান্ত, প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম। মুজিবুর রহমান

৯৫. হে ঈমানদারগণ! ইহরামে থাকাকালে তোমরা শিকার-জন্তু হত্যা করোনা(১) তোমাদের মধ্যে কেউ ইচ্ছে করে সেটাকে হত্য করলে যা সে হত্যা করল তার বিনিময় হচ্ছে অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু, যার ফয়সালা করবে তোমাদের মধ্যে দুজন ন্যায়বান লোক- কা'বাতে পাঠানো হাদঈরূপে(২)। বা সেটার কাফফারা হবে দরিদ্রকে খাদ্য দান করা কিংবা সমান সংখ্যক সিয়াম পালন করা, যাতে সে আপন কৃতকর্মের ফল ভোগ করে। যা গত হয়েছে আল্লাহ তা ক্ষমা করেছেন। কেউ তা আবারো করলে আল্লাহ্‌ তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।

(১) এ নিষেধাজ্ঞা অর্থের দিক দিয়ে ধরা হলে হালাল জন্তু, ওর বাচ্চা এবং হারাম প্রাণীগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। আর এটাই অধিকাংশ আলেমের মত। কারণ, যে প্রাণীগুলোকে সর্বাবস্থায় হত্যা করা বৈধ সেগুলোর বর্ণনা এক হাদীসে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে। তাই অপরাপর প্রাণীগুলো উক্ত নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। [ইবন কাসীর] যে প্রাণীগুলো ইহরাম ও সাধারণ সর্বাবস্থায় বধ করার কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তা হচ্ছে, পাঁচটি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচ প্রকার প্রাণী আছে যা ইহরাম অবস্থায় হত্যা করলে কোন পাপ হয় না। কাক, চিল, বিচ্ছু, ইদুর এবং হিংস্র কুকুর। [বুখারীঃ ১৮২৯, মুসলিমঃ ১১৯৯]


(২) অর্থাৎ এ হাদঈ বা জন্তু কা'বা পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। সেখানেই তা জবাই করতে হবে এবং হারাম শরীফের মিসকীনদের মধ্যে ওর গোশত বন্টন করতে হবে। এ ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই। [ইবন কাসীর] হজ্জের গুরুত্বপূর্ণ কর্ম হিসেবে হারাম এলাকায় যে পশু যবেহ করা হয় তাকে হাদঈ বলা হয়।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯৫) হে বিশ্বাসীগণ! ইহরামে থাকা অবস্থায় তোমরা শিকার জন্তু বধ করো না,[1] তোমাদের মধ্যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তা বধ করলে,[2] যা বধ করল তার বিনিময় হচ্ছে অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু,[3] যার মীমাংসা করবে তোমাদের মধ্যে দু’জন ন্যায়বান লোক[4] কা’বাতে প্রেরিতব্য কুরবানীরূপে।[5] অথবা ওর বিনিময় হবে দরিদ্রকে অন্ন দান করা কিংবা সমপরিমাণ রোযা পালন করা,[6] যাতে সে আপন কৃতকর্মের ফল ভোগ করে। যা গত হয়েছে আল্লাহ তা ক্ষমা করেছেন। কিন্তু কেউ তা পুনরায় করলে আল্লাহ তার নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন এবং আল্লাহ পরাক্রমাশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।

[1] ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এর মতে ইহরাম অবস্থায় ঐ সমস্ত জন্তু শিকার করা নিষিদ্ধ, যাদের গোশত খাওয়া হয়। পক্ষান্তরে ঐ সমস্ত স্থলচর জন্তু হত্যা করা জায়েয বা বৈধ, যাদের গোশত খাওয়া হয় না (বা হালাল নয়)। কিন্তু অধিকাংশ উলামাগণের মতে ইহরাম অবস্থায় কোন প্রকার জন্তু শিকার করা বৈধ নয়; তার গোশত খাওয়া বৈধ হোক অথবা অবৈধ; উভয় জন্তুই এই নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য সেই অনিষ্টকর জন্তু (ইহরাম) অবস্থাতেও হত্যা করা বৈধ, যা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আর এর সংখ্যা পাঁচটি; কাক, চিল, বিছা, ইঁদুর ও পাগলা কুকুর। (মুসলিম, মুঅত্তা ইমাম মালেক) না’ফে (রঃ)-কে সাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বলেন, সাপকে হত্যা করার ব্যাপারে তো (উলামাদের মধ্যে) কোন মতভেদই নেই। (ইবনে কাসীর) ইমাম আহমাদ, ইমাম মালেক (রঃ) ও অন্যান্য উলামদের নিকট হিংস্রজন্তু; নেকড়ে বাঘ চিতাবাঘ ও সিংহকে কামড়িয়ে দেয় এমন পাগলা কুকুরের সাথে তুলনা করে ইহরাম অবস্থায় হত্যা করার অনুমতি দিয়েছেন। (ইবনে কাসীর)

[2] ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ শব্দ থেকে প্রতিপাদন করে কোন কোন উলামা বলেন, কেউ যদি ভুলবশতঃ অনিচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে ফেলে, তাহলে তার উপর কোন ফিদ্ইয়া (দন্ড) নেই। কিন্তু অধিকাংশ উলামাগণের মতে ভুলবশতঃ অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবেও যদি হত্যা করে ফেলে, তাহলে তার জন্য ফিদ্ইয়া আদায় করা ওয়াজেব। ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ শর্ত অধিকাংশ অবস্থার প্রেক্ষাপটে লাগানো হয়েছে, শর্ত হিসাবে নয়।

[3] ‘অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু’র ভাবার্থ হচ্ছে, আকার-আকৃতি ও দৈহিক গঠনে অনুরূপ ও সদৃশ, মূল্যে অনুরূপ নয়; যেমনটি হানাফীদের অভিমত। উদাহরণ স্বরূপ; কেউ যদি হরিণ শিকার করে ফেলে, তাহলে তার ‘অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু’ হল ছাগল আর নীল গাভীর ‘অনুরূপ গৃহপালিত জন্তু’ হল গাভী ইত্যাদি। কিন্তু যে জন্তুর সদৃশ পাওয়া দুষ্কর, তার মূল্য নির্ধারণ করে ফিদ্ইয়া স্বরূপ মক্কায় পৌঁঁছে দিতে হবে।

[4] তারা বলবে যে, শিকারকৃত জন্তু অমুক জন্তুর সদৃশ। আর যদি তা সদৃশহীন হয় অথবা তার সদৃশ জন্তু পাওয়া দূরূহ ব্যাপার হয়, তাহলে তার পরিবর্তে মূল্য দিতে হবে। আর এই মূল্য থেকে খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করে মক্কার প্রত্যেক মিসকীনের মাঝে এক মুদ (৬২৫ গ্রাম) হিসাবে বণ্টন করে দিতে হবে। হানাফীদের নিকট প্রত্যেক মিসকীনকে দুই মুদ (সওয়া এক কিলো) হিসাবে প্রদান করতে হবে।

[5] এই ফিদ্ইয়া যদি পশু হয় অথবা তার মূল্য হয়, কা’বা শরীফ পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। আর কা’বা থেকে উদ্দেশ্য, হারামের এলাকা। (ফাতহুল ক্বাদীর) অর্থাৎ, হারামের এলাকায় বসবাসরত মিসকীনদের মাঝে তা বণ্টন করতে হবে।

[6] أو শব্দটি এখতিয়ারের জন্য ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, (মুহরিম ব্যক্তির) কাফফারা স্বরূপ মিসকীনকে খানা খাওয়ানো অথবা রোযা রাখার ব্যাপারে এখতিয়ার বা স্বাধীনতা রয়েছে; দুটির মধ্যে যে কোন একটা করা বৈধ। শিকারকৃত পশু হিসাবে খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে কম-বেশী হবে, অনুরূপ রোযা রাখার ব্যাপারেও কম-বেশী হবে। উদাহরণ স্বরূপ; মুহরিম যদি হরিণ শিকার করে বসে, তাহলে তার সমকক্ষ এবং সদৃশ হচ্ছে, ছাগল। আর এই ফিদ্ইয়ার পশু মক্কার হারামের মধ্যে যবেহ করতে হবে। যদি তা না পাওয়া যায়, তাহলে ইবনে আববাস (রাঃ)-এর মতে ছয়জন মিসকীনকে খানা খাওয়াতে হবে অথবা তিন দিন রোযা রাখতে হবে। যদি শিং-ওয়ালা বড় হরিণ, নীলগাভী অথবা এই ধরনের কোন জন্তু শিকার করে, তাহলে তার অনুরূপ বা সদৃশ হচ্ছে, গৃহপালিত গাভী। আর যদি তা পাওয়া না যায় অথবা এ ধরনের ফিদ্ইয়া আদায় করার ক্ষমতা না থাকে, তাহলে ২০ জন মিসকীনকে খানা খাওয়াতে হবে অথবা ২০ দিন রোযা রাখতে হবে। যদি এমন জন্তু যেমন (উটপাখী কিংবা জংলী গাধা ইত্যাদি) শিকার করে, যার সদৃশ হচ্ছে উট, তাহলে তা না পেলে ৩০ জন মিসকীনকে খানা খাওয়াতে হবে অথবা ৩০ দিন রোযা রাখতে হবে। (ইবনে কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:১১৮ اِنۡ تُعَذِّبۡہُمۡ فَاِنَّہُمۡ عِبَادُکَ ۚ وَ اِنۡ تَغۡفِرۡ لَہُمۡ فَاِنَّکَ اَنۡتَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۱۱۸﴾

যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনারই বান্দা, আর তাদেরকে যদি ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ আল-বায়ান

তুমি যদি তাদেরকে শাস্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দাহ আর যদি তাদেরকে ক্ষমা কর তুমি তো মহাপরাক্রান্ত মহাপ্রজ্ঞার অধিকারী।’ তাইসিরুল

আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তাহলে ওরাতো আপনার বান্দা; আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন তাহলেতো আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। মুজিবুর রহমান

১১৮. আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি দেন তবে তারা তে আপনারই বান্দা(১), আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন তবে আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।(২)

(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ নিশ্চয় কেয়ামতের দিন তোমাদেরকে একত্রিত করা হবে এবং কিছুসংখ্যক লোককে পাকড়াও করে বাম দিকে অর্থাৎ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলবঃ আমার উম্মত! তখন আমাকে বলা হবেঃ আপনি জানেন না আপনার পরে তারা কি সব নতুন পদ্ধতির প্রচলন করেছে। তখন আমি বলবঃ যেমন নেক বান্দা বলেছেন, “এবং যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের কাজকর্মের সাক্ষী, কিন্তু যখন আপনি আমাকে তুলে নিলেন তখন আপনিই তো ছিলেন তাদের কাজকর্মের তত্ত্বাবধায়ক এবং আপনিই সব বিষয়ে সাক্ষী। আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি দেন তবে তারা তো আপনারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন তবে আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [বুখারীঃ ৪৬২৬]


(২) অর্থাৎ আপনি বান্দাদের প্রতি যুলুম ও অন্যায় কঠোরতা করতে পারেন না। তাই তাদেরকে শাস্তি দিলে তা ন্যায়বিচার ও বিজ্ঞতা-ভিত্তিকই হবে। আর যদি ক্ষমা করে দেন, তবে এ ক্ষমাও অক্ষমতাপ্রসূত হবে না। কেননা, আপনি মহাপরাক্রান্ত ও প্রবল। তাই কোন অপরাধী আপনার শক্তির নাগালের বাইরে যেতে পারবে না। তাদের শাস্তির ব্যাপারে আপনার ক্ষমতাই চূড়ান্ত। মোটকথা, অপরাধীদের ব্যাপারে আপনি যে রায়ই দেবেন, তাই সম্পূর্ণ বিজ্ঞজনোচিত ও সক্ষমতাসুলভ হবে। ঈসা 'আলাইহিস সালাম হাশরের ময়দানে এসব কথা বলবেন। যাতে নাসারাদেরকে সৃষ্টিকুলের সামনে কঠোরভাবে ধমকি দেয়া উদ্দেশ্য। [ইবন কাসীর]

এর বিপরীতে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দুনিয়াতে আল্লাহ্‌ তা’আলার দরবারে দো’আ করে বলেছিলেনঃ “হে রব, এ মূর্তিগুলো অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে। তাদের মধ্যে যে আমার অনুসরণ করে, সে আমার লোক এবং যে আমার অবাধ্যতা করে, আপনি স্বীয় রহমতে (তাওবাহ ও সত্যের প্রতি প্রত্যাবর্তনের শক্তিদান করে অতীত গোনাহ) ক্ষমা করতে পারেন।”

হাদীসে এসেছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এ আয়াতখানি পাঠ করে হাত উঠালেন এবং দোআ করে বললেনঃ হে আল্লাহ! আমার উম্মাত, আমার উম্মাত! এবং কাঁদতে থাকলেন। তখন আল্লাহ্ তাআলা জিবরীলকে বললেনঃ মুহাম্মাদের কাছে যাও এবং তাকে জিজ্ঞাসা কর - যদিও তিনি সর্ববিষয়ে ভাল জানেন- কেন তিনি কাঁদছেন? জিবরীল তার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন আর রাসূলও তার উত্তর করলেন। তখন আল্লাহ আবার বললেনঃ হে জিবরীল, মুহাম্মাদের কাছে যাও এবং তাকে বল, আমরা আপনার উম্মাতের ব্যাপারে আপনাকে সন্তুষ্ট করে দেব; অসন্তুষ্ট করব না। [মুসলিমঃ ২০২]

হাদীসে আরও এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমার কিছু উম্মতকে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, আমি তখন ‘আমার সাথী’ বলতে থাকব, তখন আমাকে বলা হবে, আপনি জানেন না, তারা আপনার পরে দ্বীনের মধ্যে নতুন কি কি পন্থা উদ্ভাবন করেছিল। আমি তখন সেই নেক বান্দার মত বলব, যিনি বলেছিলেন, আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি দেন তবে তারাতো আপনারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন তবে আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [বুখারী: ৪৬২৫; মুসলিম: ৩০২৩]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১১৮) তুমি যদি তাদেরকে শাস্তি দাও, তবে তারা তোমারই বান্দা। আর যদি তাদেরকে ক্ষমা কর, তবে তুমি তো পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।’[1]

[1] অর্থাৎ, হে আল্লাহ! তাদের ব্যাপার তোমার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। কেননা, তোমার যা ইচ্ছা তাই করতে পার। আর তোমাকে কেউই প্রশ্ন করার ক্ষমতা রাখে না, কেউ প্রতিবাদও করতে পারে না।  {لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ}তিনি যা করেন, সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা যাবে না, বরং তাদেরকেই প্রশ্ন করা হবে। (আম্বিয়া ২৩) সুতরাং এ আয়াতে আল্লাহর সামনে বান্দাদের অক্ষমতা ও অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ হয় এবং আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ত্ব এবং তাঁর সর্বশক্তিমান ও সকল এখতিয়ারের একচ্ছত্র অধিকারী হওয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। আর উক্ত উভয় কথার বরাতে ক্ষমা ও মার্জনার আবেদনও প্রকাশ হয়। সুবহানাল্লাহ! একি বিস্ময়কর ও ভাষালঙ্কারসমৃদ্ধ আয়াত! (আর এ কথার বক্তাও কত বড় দয়াবান!) একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করীম (সাঃ) এক রাতে এই আয়াত পাঠ করতে করতে তাঁর এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, তিনি এই আয়াত বার বার পড়তেই থাকেন। এমন কি পরিশেষে ফজর হয়ে যায়! (আহমাদ ৫/১৪৯)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:৯৬ فَالِقُ الۡاِصۡبَاحِ ۚ وَ جَعَلَ الَّیۡلَ سَکَنًا وَّ الشَّمۡسَ وَ الۡقَمَرَ حُسۡبَانًا ؕ ذٰلِکَ تَقۡدِیۡرُ الۡعَزِیۡزِ الۡعَلِیۡمِ ﴿۹۶﴾

(তিনি) প্রভাত উদ্ভাসক। তিনি বানিয়েছেন রাতকে প্রশান্তি এবং সূর্য ও চন্দ্রকে সময় নিরূপক। এটা সর্বজ্ঞ পরাক্রমশালীর নির্ধারণ। আল-বায়ান

তিনি ঊষার উন্মেষ ঘটান, তিনি রাত সৃষ্টি করেছেন শান্তি ও আরামের জন্য, সূর্য ও চন্দ্র বানিয়েছেন গণনার জন্য। এসব মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞাতা কর্তৃক নির্ধারিত। তাইসিরুল

তিনিই রাতের আবরণ বিদীর্ণ করে রঙ্গিন প্রভাতের উন্মেষকারী, তিনিই রাতকে বিশ্রামকাল এবং সূর্য ও চাঁদকে সময়ের নিরূপক করে দিয়েছেন; এটা হচ্ছে সেই পরম পরাক্রান্ত ও সর্ব পরিজ্ঞাতার (আল্লাহর) নির্ধারণ। মুজিবুর রহমান

৯৬. তিনি প্রভাত উদ্ভাসকৎ(১) আর তিনি রাতকে প্রশান্তি এবং সূর্য ও চাঁদকে সময়ের নিরুপক করেছেন(২); এটা পরাক্রমশালী মহাজ্ঞানী আল্লাহ্‌র নির্ধারণ।(৩)

(১) فَالِقُ শব্দের অর্থ ফাঁককারী এবং إصباح শব্দের অর্থ এখানে প্রভাতকাল। (فَالِقُ الْإِصْبَاحِ) এর অর্থ প্রভাতের ফাঁককারী; অর্থাৎ গভীর অন্ধকারের চাদর ফাঁক করে প্রভাতের উন্মেষকারী। [জালালাইন] এটিও এমন একটি কাজ, যাতে জ্বিন, মানব ও সমগ্র সৃষ্ট জীবের শক্তিই ব্যর্থ। প্রতিটি চক্ষুষ্মান ব্যক্তি এ কথা বুঝতে বাধ্য যে, রাত্রির অন্ধকারের পর প্রভাতরশ্মির উদ্ভাবক জ্বিন, মানব, ফিরিশতা অথবা অন্য কোন সৃষ্টজীব হতে পারে না, বরং এটি বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ্ তা'আলারই কাজ। তিনি ধীরে ধীরে অন্ধকার চিরে আলোর উন্মেষ ঘটান। সে আলোতে মানুষ তাদের জীবিকার জন্যে বের হতে পারে। [সা’দী]


(২) অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা সূর্য ও চন্দ্রের উদয়-অস্ত এবং এদের গতিকে একটি বিশেষ হিসাবের অধীনে রেখেছেন। এর ফলে মানুষ বৎসর, মাস, দিন, ঘন্টা এমনকি মিনিট ও সেকেণ্ডের হিসাবও অতি সহজে করতে পারে। আল্লাহ্ তা'আলার অপার শক্তিই এসব উজ্জ্বল বিশাল গোলক ও এদের গতি-বিধিকে অটল ও অনড় নিয়মের অধীন করে দিয়েছে। হাজার হাজার বছরেও এদের গতি-বিধিতে এক মিনিট বা এক সেকেণ্ডের পার্থক্য হয় না। এ উজ্জ্বল গোলকদ্বয় নিজ নিজ কক্ষপথে নির্দিষ্ট গতিতে বিচরণ করছে। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাদের নাগাল পাওয়া এবং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিনকে অতিক্রমকারী হওয়া। আর প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সাতার কাটে।” [সূরা ইয়াসীন: ৪০]

পরিতাপের বিষয়, প্রকৃতির এ অটল ও অপরিবর্তনীয় ব্যবস্থা থেকেই মানুষ প্রতারিত হয়েছে। তারা এগুলোকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ বরং উপাস্য ও উদ্দিষ্ট মনে করে বসেছে। যদি এ ব্যবস্থা মাঝে মাঝে অচল হয়ে যেত এবং কলকজা মেরামতের জন্য কয়েকদিন বা কয়েক ঘন্টার বিরতি দেখা দিত, তবে মানুষ বুঝতে পারত যে, এসব মেশিন আপনা আপনিই চলে না, বরং এগুলোর পরিচালক ও নির্মাতা আছে। আসমানী কিতাব, নবী ও রাসূলগণ এ সত্য উদঘাটন করার জন্যই প্রেরিত হন। কুরআনুল কারীমের এ বাক্য আরো ইঙ্গিত করেছে যে, বছর ও মাসের সৌর ও চান্দ্র উভয় প্রকার হিসাবই হতে পারে এবং উভয়টিই আল্লাহ্ তা'আলার নেয়ামত। এর মাধ্যমেই সময় ও কাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এতে এক দিকে যেমন ইবাদতের সময় নির্ধারণ করা যায়, অপরদিকে এর মাধ্যমে লেন-দেনের সময়ও ঠিক রাখা যায়। তাছাড়া কতটুকু সময় পার হয়েছে আর কতটুকু বাকী রয়েছে সেটা জানাও এ দুটোর কারণেই হয়ে থাকে। যদি এগুলো না থাকত, তবে এ সময় নির্ধারণের ব্যাপারটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকত না। এর জন্য বিশেষ শ্রেণীর প্রয়োজন পড়ত। যাতে দ্বীন ও দুনিয়ার অনেক স্বার্থ হানি ঘটত। [সা'দী]


(৩) অর্থাৎ এ বিস্ময়কর অটল ব্যবস্থা- যাতে কখনো এক মিনিট ও এক সেকেণ্ড এদিক-ওদিক হয় না- এটি একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই দুটি মহান গুণ অপরিসীম শক্তি ও অপার জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ। [মানার] এজন্যেই বাক্যের শেষে আল্লাহর দুটি গুণ বাচক নাম পরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী’ উল্লেখ করা হয়েছে। তার অপার শক্তির কারণে সমস্ত কিছু তার অনুগত বাধ্য হয়েছে। আর তার পরিপূর্ণ জ্ঞানের কারণে কোন গোপন বা প্রকাশ্য সবকিছু তার আয়ত্বাধীন রয়েছে। [সা'দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯৬) তিনিই ঊষার উন্মেষ ঘটান,[1] আর তিনিই বিশ্রামের জন্য রাত[2] এবং গণনার জন্য চন্দ্র ও সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন,[3] এ সব পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ কর্তৃক সুবিন্যস্ত।

[1] অন্ধকার ও আলোর স্রষ্টাও তিনিই। তিনি রাতের অন্ধকার থেকে উজ্জ্বল প্রভাত সৃষ্টি করেন। ফলে প্রতিটি জিনিসই আলোকিত হয়ে যায়।

[2] অর্থাৎ, রাতকে অন্ধকার দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন, যাতে মানুষ উজ্জ্বলতার সমস্ত ব্যস্ততাকে দূর করে বিশ্রাম নিতে পারে।

[3] (অথবা হিসাবমত সূর্য ও চন্দ্রকে সৃষ্টি করেছেন।) অর্থাৎ, উভয়ের জন্য একটি হিসাব বাঁধা আছে, যাতে কোন পরিবর্তন ও অনিয়ম ঘটতে পারে না। বরং উভয়ের রয়েছে নিজ নিজ কক্ষপথ, যাতে তারা শীত-গ্রীষ্মে ধাবমান থাকে। আর এরই ভিত্তিতে শীতের সময় দিন ছোট এবং রাত বড় হয়, আর গ্রীষ্ম এর বিপরীত; অর্থাৎ, দিন বড় এবং রাত ছোট হয়। এর বিস্তারিত আলোচনা সূরা ইউনুসের ৫নং আয়াতে, সূরা ইয়াসীনের ৪০নং আয়াতে এবং সূরা আ’রাফের ৫৪ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আত-তাওবা
৯:৭১ وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ یَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَ یُطِیۡعُوۡنَ اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ ؕ اُولٰٓئِکَ سَیَرۡحَمُہُمُ اللّٰہُ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ﴿۷۱﴾

আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

মু’মিন পুরুষ আর মু’মিন নারী পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, নামায ক্বায়িম করে, যাকাত দেয়, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ করুণা প্রদর্শন করবেন। আল্লাহ তো প্রবল পরাক্রান্ত, মহা প্রজ্ঞাবান। তাইসিরুল

আর মু’মিন পুরুষরা ও মু’মিনা নারীরা হচ্ছে পরস্পর একে অন্যের বন্ধু। তারা সৎ বিষয়ের শিক্ষা দেয় এবং অসৎ বিষয় হতে নিষেধ করে, আর সালাতের পাবন্দী করে ও যাকাত প্রদান করে, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ মেনে চলে, এসব লোকের প্রতি আল্লাহ অবশ্যই করুণা বর্ষণ করবেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমতাবান, হিকমাতওয়ালা। মুজিবুর রহমান

৭১. আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু(১), তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে; তারাই, যাদেরকে আল্লাহ্‌ অচিরেই দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

(১) হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুমিনগণকে তুমি দেখবে তাদের দয়া, ভালবাসা ও সহমর্মিতার ক্ষেত্রে এক শরীরের ন্যায়। যার এক অংশে ব্যাথা হলে তার সারা শরীর নির্ঘুম ও জ্বরে ভোগে। [বুখারী: ৬০১১; মুসলিম: ২৫৮৬]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭১) আর বিশ্বাসী পুরুষরা ও বিশ্বাসী নারীরা হচ্ছে পরস্পর একে অন্যের বন্ধু,[1] তারা সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজে নিষেধ করে।[2] আর যথাযথভাবে নামায আদায় করে ও যাকাত প্রদান করে, আর আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে।[3] এসব লোকের প্রতিই আল্লাহ অতি সত্বর করুণা বর্ষণ করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমতাবান হিকমতওয়ালা।

[1] মুনাফিক্বদের নিন্দনীয় গুণের তুলনায় মু’মিনদের প্রশংসনীয় গুণ উল্লেখ করা হচ্ছে। তাদের প্রথম গুণ হল, তারা এক অপরের বন্ধু, সাহায্যকারী ও সহানুভুতিশীল। যেমন, হাদীসে এসেছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘মু’মিন মুমিনের জন্য দেওয়ালস্বরূপ; যার এক ইঁট অপর ইঁটকে শক্ত করে ধরে থাকে।’’ (বুখারীঃ নামায অধ্যায়, মুসলিম) তিনি আরো বলেছেন, ‘‘পরস্পর সম্প্রীতি ও দয়া-দাক্ষিণ্যে মু’মিনদের উপমা হল একটি দেহের মত, যখন তার কোন এক অঙ্গ কষ্ট পায়, তখন তার সারা দেহ জ্বর ও ব্যথায় প্রভাবিত হয়ে থাকে। (বুখারীঃ আদব অধ্যায়, মুসলিম)

[2] এটা হল ঈমানদারদের দ্বিতীয় বিশেষ গুণ। مَعرُوف (সৎ) সেই কাজকে বলা হয়, যাকে শরীয়ত নেক ও ভাল বলে চিহ্নিত করেছে। আর مُنكَر (অসৎ) সেই কাজকে বলা হয়, যাকে শরীয়ত মন্দ ও খারাপ বলে আখ্যায়িত করেছে। সেই কাজ সৎ বা অসৎ নয়, যা লোকেরা নিজেদের খেয়াল-খুশী মত ভাল বা মন্দ বলে থাকে।

[3] নামায হল আল্লাহর হকসমূহের মধ্যে একটি প্রধান ও শ্রেষ্ঠ ইবাদত। আর যাকাত বান্দার হকসমূহের মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠতম ইবাদত। এই জন্য এই দু’টিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, তারা সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১১ হূদ
১১:৬৬ فَلَمَّا جَآءَ اَمۡرُنَا نَجَّیۡنَا صٰلِحًا وَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مَعَہٗ بِرَحۡمَۃٍ مِّنَّا وَ مِنۡ خِزۡیِ یَوۡمِئِذٍ ؕ اِنَّ رَبَّکَ ہُوَ الۡقَوِیُّ الۡعَزِیۡزُ ﴿۶۶﴾

অতঃপর যখন আমার আদেশ এল, তখন সালিহ ও তার সাথে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে আমার পক্ষ থেকে রহমত দ্বারা নাজাত দিলাম এবং (নাজাত দিলাম) সেই দিনের লাঞ্ছনা থেকে। নিশ্চয় তোমার রব, তিনি শক্তিশালী, পরাক্রমশালী। আল-বায়ান

অতঃপর আমার হুকুম যখন আসল তখন আমি সালিহ আর তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে আমার দয়ায় বাঁচিয়ে নিলাম আর সে দিনের লাঞ্ছনা হতে রক্ষা করলাম। তোমার প্রতিপালক তিনিই তো শক্তিশালী, প্রতাপশালী। তাইসিরুল

অতঃপর যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছল, আমি সালিহকে এবং যারা তার সাথে ঈমানদার ছিল তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে রক্ষা করলাম, আর বাঁচালাম সেই দিনের বড় লাঞ্ছনা হতে; নিশ্চয়ই তোমার রাব্ব শক্তিমান, পরাক্রমশালী। মুজিবুর রহমান

৬৬. অতঃপর যখন আমাদের নির্দেশ আসল তখন আমরা সালেহ্ ও তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে আমাদের অনুগ্রহে রক্ষা করলাম এবং রক্ষা করলাম সে দিনের লাঞ্ছনা হতে। নিশ্চয় আপনার রব, তিনি শক্তিমান, মহাপরাক্রমশালী।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬৬) অতঃপর যখন আমার (আযাবের) নির্দেশ এসে পৌঁছল,[1] তখন আমি সালেহকে এবং যারা তার সাথে বিশ্বাসী ছিল তাদেরকে নিজ করুণায় রক্ষা করলাম, আর বাঁচালাম সেই দিনের বড় লাঞ্ছনা হতে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক শক্তিমান, পরাক্রমশালী।

[1] এর উদ্দেশ্য সেই আযাব, যা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চতুর্থ দিনে এসেছিল এবং সালেহ (আঃ) ও তাঁর প্রতি বিশ্বাসীদের ছাড়া সকলকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৪ ইবরাহীম
১৪:১ الٓرٰ ۟ کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ اِلَیۡکَ لِتُخۡرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ۙ بِاِذۡنِ رَبِّہِمۡ اِلٰی صِرَاطِ الۡعَزِیۡزِ الۡحَمِیۡدِ ۙ﴿۱﴾

আলিফ-লাম-রা; এই কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আন, পরাক্রমশালী সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে। আল-বায়ান

আলিফ-লাম-র, একটা কিতাব যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানুষকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশে অন্ধকার থেকে নিয়ে আসতে পার আলোর দিকে- মহাপরাক্রমশালী প্রশংসিতের পথে। তাইসিরুল

আলিফ লাম রা। এই কিতাব আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানব জাতিকে বের করে আনতে পার অন্ধকার হতে আলোর দিকে; তাঁর পথে, যিনি পরাক্রমশালী, প্রশংসা । মুজিবুর রহমান

১. আলিফ-লাম্-রা, এ কিতাব, আমরা এটা আপনার প্রতি নাযিল করেছি(১) যাতে আপনি মানুষদেরকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে বের করে আনতে পারেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে(২) পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে(৩),

(১) অর্থাৎ এটা ঐ গ্রন্থ, যা আমরা আপনার প্রতি নাযিল করেছি। এতে নাযিল করার কাজটি আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা এবং সম্বোধন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে করার দ্বারা এটা বুঝা যায় যে, এ গ্রন্থ আল-কুরআন অত্যন্ত মহান। একে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেছেন। এটি আসমান থেকে নাযিল হওয়া কিতাবাদির মধ্যে অতি সম্মানিত গ্রন্থ। তিনি তা নাযিল করেছেন আরব বা অনারব যমীনের অধিবাসী সকল মানুষের কাছে প্রেরিত রাসূলদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তির উপর। [ইবন কাসীর]


(২) এখানে ناس শব্দের অর্থ সাধারণ মানুষ। এতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সকল যুগের মানুষই বোঝানো হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] ظلمات শব্দটি ظلمة এর বহুবচন। এর অর্থ অন্ধকার। এখানে ظلمات বলে কুফর, শির্ক ও মন্দকর্মের অন্ধকারসমূহ আবার কারও কারও মতে, বিদ'আত। অপর কারও মতে, সন্দেহ। পক্ষান্তরে نور বলে ঈমানের আলো বোঝানো হয়েছে। অথবা সুন্নাত বা ইয়াকীন বা দৃঢ়বিশ্বাস বোঝানো হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] ظلمات শব্দটি বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা, কুফর ও শির্কের প্রকারভেদ অনেক। অমনিভাবে মন্দকর্মের সংখ্যাও গণনার বাইরে। বিদ'আতের সংখ্যাও অনুরূপভাবে প্রচুর। আর যে সন্দেহ মানব ও জিন শয়তান মানুষের মনে তৈরী করে তা বহু রকমের। পক্ষান্তরে نور শব্দটি একবচনে আনা হয়েছে। কেননা, ঈমান ও সত্য এক। আয়াতের অর্থ এই যে, আমি এ গ্রন্থ এ জন্য আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি এর সাহায্যে বিশ্বের মানুষকে কুফর, শির্ক ও মন্দকর্মের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের রবের আদেশক্রমে ঈমান ও সত্যের আলোর দিকে আনয়ন করেন। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেন, “তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত নাযিল করেন, তোমাদেরকে অন্ধকার হতে আলোতে আনার জন্য [সূরা আল-হাদীদঃ ৯] [ইবন কাসীর]


(৩) এ আয়াতের শুরুতে যে অন্ধকার ও আলোর উল্লেখ করা হয়েছিল, বলাবাহুল্য তা ঐ অন্ধকার ও আলো নয়, যা সাধারণ দৃষ্টিতে দেখা যায়। তাই তা ফুটিয়ে তোলার জন্য এ বাক্যে বলা হয়েছে যে, ঐ আলো হচ্ছে আল্লাহর পথ। যে সুস্পষ্ট পথ আল্লাহ মানুষের চলার জন্য প্রবর্তন করেছেন। যে পথে যেতে এবং যে পথে প্রবেশ করতে তিনি মানুষদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। [ফাতহুল কাদীর] এস্থলে আল্লাহ শব্দটি পরে এবং তার আগে তার দুটি গুণবাচক নাম عزيز ও حميد উল্লেখ করা হয়েছে। عزيز শব্দের অর্থ শক্তিশালী ও পরাক্রান্ত এবং حميد শব্দের অর্থ ঐ সত্তা, যিনি প্রশংসার হকদার হওয়ার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ। [ফাতহুল কাদীর]। তিনি তার যাবতীয় কাজ, কথা, শরীআত, নির্দেশ, ও নিষেধের ক্ষেত্রে প্রশংসিত এবং তাঁর যাবতীয় নির্দেশের ক্ষেত্রে সত্যবাদী। [ইবন কাসীর] আল্লাহর এ দুটি গুণবাচক নাম আসল নামের পূর্বে উল্লেখ করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এ পথ পথিককে যে সত্তার দিকে নিয়ে যায়, তিনি প্রবল পরাক্রান্ত এবং প্রশংসার হকদার হওয়ার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ। ‘হামীদ’ শব্দটির অপর অর্থ, প্রত্যেকের মুখেই তাঁর প্রশংসা, সকল স্থানে ও সকল অবস্থায় তিনি সম্মানিত। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) আলিফ লা-ম রা। এই কিতাব এটা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি; যাতে তুমি মানব জাতিকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে[1] অন্ধকার হতে আলোকের দিকে;[2] পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিতের পথে বের করে আনতে পার।

[1] অর্থাৎ, নবীর কাজ শুধু হিদায়াতের রাস্তা দেখানো। যদি কেউ হিদায়াতের পথ অবলম্বন করে, তাহলে তা একমাত্র আল্লাহর হুকুম ও ইচ্ছার ভিত্তিতেই করে থাকে। কেননা মূল হিদায়াতদানকারী তো তিনিই। যদি তাঁর ইচ্ছা না হয়, তাহলে নবী যতই ওয়ায-নসীহত করুক না কেন, লোকেরা হিদায়াতের পথে আসতে প্রস্তুত হবে না। এর বিভিন্ন উদাহরণ পূর্ববর্তী নবীদের জীবনে বিদ্যমান রয়েছে। স্বয়ং শেষনবী (সাঃ)-এর কঠিন ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁর দয়ার্দ্র চাচা আবূ তালেবকে মুসলমান করতে পারেননি।

[2] যেমন মহান আল্লাহ অন্য স্থানেও বলেছেন, هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ অর্থাৎ, তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন, তোমাদেরকে সমস্ত প্রকার অন্ধকার হতে আলোর দিকে আনার জন্য। (সূরা হাদীদ ৯) তিনি আরো বলেন, ﴿اللهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُواْ يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوُرِ﴾ অর্থাৎ, আল্লাহই হচ্ছেন মুমিনদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে নিয়ে যান। (সূরা বাক্বারাহ ২৫৭)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৪ ইবরাহীম
১৪:৪ وَ مَاۤ اَرۡسَلۡنَا مِنۡ رَّسُوۡلٍ اِلَّا بِلِسَانِ قَوۡمِہٖ لِیُبَیِّنَ لَہُمۡ ؕ فَیُضِلُّ اللّٰہُ مَنۡ یَّشَآءُ وَ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ ہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۴﴾

আর আমি প্রত্যেক রাসূলকে তার কওমের ভাষাতেই পাঠিয়েছি, যাতে সে তাদের কাছে বর্ণনা দেয়, সুতরাং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সঠিক পথ দেখান। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল-বায়ান

আমি কোন রসূলকেই তার জাতির ভাষা ছাড়া পাঠাইনি যাতে তাদের কাছে স্পষ্টভাবে (আমার নির্দেশগুলো) বর্ণনা করতে পারে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে পথহারা করেছেন, আর যাকে ইচ্ছে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, তিনি বড়ই পরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময়। তাইসিরুল

আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎ পথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। মুজিবুর রহমান

৪. আর আমরা প্রত্যেক রাসূলকে তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী(১) করে পাঠিয়েছি(২) তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য(৩), অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছে সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।(৪)

(১) অর্থাৎ আল্লাহ যে সম্প্রদায়ের মধ্যে যে নবী পাঠিয়েছেন তার উপর তার ভাষায়ই নিজের বাণী নাযিল করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায় যেন নবীর কথা বুঝতে পারে এবং যা নাযিল হয়েছে তাও জানতে পারে। [ইবন কাসীর] যাতে করে পরবর্তী পর্যায়ে তারা এ ধরনের কোন ওজর পেশ করতে না পারে যে, আপনার পাঠানো শিক্ষা তো আমরা বুঝতে পারিনি কাজেই কেমন করে তার প্রতি ঈমান আনতে পারতাম। এ উদ্দেশ্যে কোন জাতিকে তার নিজের ভাষায়, যে ভাষা সে বোঝে, পয়গাম পৌছানো প্রয়োজন।


(২) আদম 'আলাইহিস সালাম জগতে প্রথম মানুষ। তিনি তাকেই মানুষের জন্য সর্বপ্রথম নবী মনোনীত করেন। এরপর পৃথিবীর জনসংখ্যা যতই বৃদ্ধি পেয়েছে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে বিভিন্ন নবীর মাধ্যমে হেদায়াত ও পথ-প্রদর্শনের ব্যবস্থা ততই সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রত্যেক যুগ ও জাতির অবস্থার উপযোগী বিধি-বিধান ও শরীআত নাযিল হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মানব জগতের ক্রমঃবিকাশ যখন পূর্ণত্বের স্তরে উপনীত হয়েছে, তখন সাইয়্যেদুল আউয়ালীন ওয়াল আখেরীন, ইমামুল আম্বিয়া মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সমগ্র বিশ্বের জন্য রাসূলরূপে প্রেরণ করা হয়েছে।

তাকে যে গ্রন্থ ও শরীআত দান করা হয়েছে, তাতে তাকে সমগ্র বিশ্ব এবং কেয়ামত পর্যন্ত সর্বকালের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। এখানে এটা জানা আবশ্যক যে, এ আয়াতে যদিও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা প্রত্যেক নবীকে তার জাতির কাছে পাঠিয়েছেন কিন্তু অন্য আয়াতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমস্ত মানুষের জন্যই রাসূল করে পাঠিয়েছেন। কোন জাতির সাথে সুনির্দিষ্ট করে নয়। যেমন, আল্লাহ বলেন, বলুন হে মানুষ! নিশ্চয় আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহ্‌র রাসূল। [সূরা আল-আরাফ: ১৫৮]

আরও বলেন, “কত বরকতময় তিনি যিনি তার বান্দার উপর ফুরকান নাযিল করেছেন, সৃষ্টিজগতের জন্য সতর্ককারী হতে।” [সূরা আল-ফুরকান: ১] আরও বলেন, “আর আমরা তো আপনাকে সমগ্র মানুষের জন্যই সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।” [সূরা সাবা: ২৮] ইত্যাদি আয়াতসমূহ। যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত সমস্ত সৃষ্টিকুলের জন্য, প্রতিটি ভাষাভাষির জন্য। প্রতি ভাষাভাষির কাছে এ বাণী পৌছে দেয়া মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লমের কর্তব্য। [আদওয়াউল বায়ান]


(৩) এ আয়াত এ প্রমাণ বহন করছে যে, যা দিয়ে আল্লাহর কালাম ও তার রাসূলের সুন্নাত স্পষ্টভাবে বুঝা যাবে, ততটুকু আরবী ভাষাজ্ঞান প্রয়োজন এবং আল্লাহর কাছেও প্রিয় বিষয়। কেননা এটা ব্যতীত আল্লাহর কাছে যা নাযিল হয়েছে তা জানা অসম্ভব। তবে যদি কেউ এমন হয় যে, তার সেটা শিক্ষা গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়ে না যেমন ছোটকাল থেকে এটার উপর বড় হয়েছে এবং সেটা তার প্রকৃতিতে পরিণত হয়েছে তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। কারণ, তখন সে আল্লাহ ও তার রাসূলের বাণী থেকে দ্বীন ও শরীআত গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। যেমন সাহাবায়ে কিরাম গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। [সা’দী]


(৪) অর্থাৎ আমি মানুষের সুবিধার জন্য নবীগণকে তাদের ভাষায় প্রেরণ করেছি- যাতে নবীগণ আমার বিধি-বিধান উত্তমরূপে বুঝিয়ে দেন। কিন্তু হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতা এরপরও মানুষের সাধ্যাধীন নয়। আল্লাহ তা'আলাই স্বীয় শক্তিবলে যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্টতায় রাখেন এবং যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন। সমগ্র জাতি যে ভাষা বোঝে নবী সে ভাষায় তার সমগ্র প্রচার কার্য পরিচালনা ও উপদেশ দান করা সত্বেও সবাই হেদায়াত লাভ করে না। কারণ কোন বাণী কেবলমাত্র সহজবোধ্য হলেই যে, সকল শ্ৰোতা তা মেনে নেবে এমন কোন কথা নেই। সঠিক পথের সন্ধান লাভ ও পথভ্রষ্ট হওয়ার মূল সূত্র রয়েছে আল্লাহর হাতে। তিনি যাকে চান নিজের বাণীর সাহায্যে সঠিক পথে পরিচালিত করেন এবং যার জন্য চান না সে হিদায়াত পায় না। আয়াতের শেষে আল্লাহর দু'টি মহান গুণের উল্লেখ করা হয়েছে, বলা হয়েছে, তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান।

এ দুটি গুণবাচক নাম এখানে উল্লেখ করার পিছনে বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। যার অর্থ, লোকেরা নিজে নিজেই সৎপথ লাভ করবে বা পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে, এটা সম্ভব নয়। কোন যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই তিনি যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করবেন এবং যাকে ইচ্ছা অযথা পথভ্রষ্ট করবেন এটা তাঁর রীতি নয়। কর্তৃত্বশীল ও বিজয়ী হওয়ার সাথে সাথে তিনি জ্ঞানী এবং প্রজ্ঞও। তাঁর কাছ থেকে কোন ব্যক্তি যুক্তিসংগত কারণেই হেদায়াত লাভ করে। আর যে ব্যক্তিকে সঠিক পথ থেকে বঞ্চিত করে ভ্রষ্টতার মধ্যে ছেড়ে দেয়া হয় সে নিজেই নিজের ভ্রষ্টতাপ্রীতির কারণে এহেন আচরণ লাভের অধিকারী হয়। [দেখুন, সা’দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) আমি প্রত্যেক রসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করবার জন্য।[1] আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [2]

[1] মহান আল্লাহ দুনিয়াবাসীর প্রতি এই অনুগ্রহ করলেন যে, তাদের হিদায়াতের জন্য কিতাব অবতীর্ণ করলেন এবং রসূলগণকে প্রেরণ করলেন এবং উক্ত অনুগ্রহকে এভাবে পরিপূর্ণতা দান করলেন যে, প্রত্যেক রসূলকে তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করলেন, যাতে হিদায়াতের রাস্তা বুঝতে কোন প্রকার জটিলতা না আসে।

[2] কিন্তু উক্ত বর্ণনা ও ব্যাখ্যা সত্ত্বেও হিদায়াত সেই পাবে, যাকে আল্লাহ দিতে চাইবেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
১৪ ইবরাহীম
১৪:৪৭ فَلَا تَحۡسَبَنَّ اللّٰہَ مُخۡلِفَ وَعۡدِہٖ رُسُلَہٗ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ ذُو انۡتِقَامٍ ﴿ؕ۴۷﴾

সুতরাং তুমি কখনো আল্লা¬হকে তাঁর রাসূলদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী মনে করো না। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী। আল-বায়ান

(অবস্থা যতই প্রতিকূল হোক না কেন) তুমি কক্ষনো মনে কর না যে, আল্লাহ তাঁর রসূলগণকে দেয়া ওয়া‘দা খেলাপ করবেন, আল্লাহ মহা প্রতাপশালী, প্রবল প্রতিশোধ গ্রহণকারী। তাইসিরুল

তুমি কখনও মনে করনা যে, আল্লাহ তাঁর রাসূলদের প্রতি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন; আল্লাহ পরাক্রমশালী, দন্ড বিধায়ক। মুজিবুর রহমান

৪৭. সুতরাং আপনি কখনো মনে করবেন না যে, আল্লাহ তার রাসূলগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।(১)

(১) এরপর উম্মতকে শোনানোর জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অথবা প্রত্যেক সম্বোধনযোগ্য ব্যক্তিকে হুশিয়ার করে বলা হয়েছেঃ “কেউ যেন এরূপ মনে না করে যে, আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলগণের সাথে বিজয় ও সাফল্যের যে ওয়াদা করেছেন, তিনি তার খেলাফ করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা মহাপরাক্রান্ত এবং প্রতিশোধ গ্রহণকারী।” তিনি নবীগণের শক্রদের কাছ থেকে অবশ্যই প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন এবং ওয়াদা পূর্ণ করবেন। [বাগভী; কুরতুবী]। তিনি তাদেরকে দুনিয়াতেও সাহায্য করবেন, আখেরাতেও যেদিন সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে দাঁড়াবে সেদিনও তিনি তাদের সাহায্য করবেন। তিনি পরাক্রমশালী কোন কিছুই তার ক্ষমতার বাইরে নেই। তিনি যা ইচ্ছা করেন তা পূরণে কেউ বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪৭) সুতরাং তুমি কখনো মনে করো না যে, আল্লাহ তাঁর রসূলদের প্রতি প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবেন;[1] আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধগ্রহণকারী। [2]

[1] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ স্বীয় রসূলদের সাথে পৃথিবীতে সাহায্য করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা অবশ্যই সত্য, তাঁর তরফ থেকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হওয়া অসম্ভব।

[2] অর্থাৎ স্বীয় বন্ধুদের জন্য স্বীয় শত্রুদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ২০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৬২ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 4 পরের পাতা »