শির্ক কী ও কেন? দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ড. মুহাম্মদ মুয্‌যাম্মিল আলী

ধর্ম ও আল্লাহ সম্পর্কে ফ্রান্সের সুবিখ্যাত দার্শনিক ও বর্তমান যুগের খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্ট বলেন :

‘‘এ কথা সত্য যে, প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো জাতির জীবনে বাহ্যত ধর্ম পরিলক্ষিত হয় না, আর কোনো আফ্রিকান বামন (Dwarf) জাতির সাধারণভাবে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বা আচার-আচরণ ছিল না, এ অবস্থা অত্যন্ত বিরল। প্রাচীনতম বিশ্বাস চিরকাল এই ছিল যে, ধর্ম সুস্থ বিশ্বাস হিসেবে সমগ্র মানবতার মধ্যে প্রকাশমান ছিল এবং সমাজ দার্শনিকদের অভিমত এটাই ছিল।’’[1]

তিনি এরপর লিখেছেন : ‘‘দার্শনিকগণ ধর্মীয় বিশ্বাসকে (একটি) প্রাচীনতম প্রকাশ ও চিরকালে অবস্থিত থাকার কথা বিশ্বাস করেন।’’[2]

মাওলানা আব্দুর রহীম এ প্রসংগে একটি চমৎকার কথা বলেছেন, তা হলো এই- ‘‘মানব জাতির বিগত হাজার হাজার বছরের ইতিহাস এবং সভ্যতার উত্থান ও পতনের ইতিবৃত্ত অধ্যয়ন করলে নিঃসন্দেহে জানা যেতে পারে যে, ধর্ম ও ধর্ম পালন মানুষের জীবন, সমাজ ও সভ্যতা গড়ার কাজে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং তা মানুষের মৌল স্বভাবগত প্রবণতা, আত্মিক ও আধ্যাত্মিক এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনরূপে গণ্য হয়েছে। কালের আবর্তন ও অবস্থার পরিবর্তনে তাতে আজও একবিন্দু ব্যতিক্রম ঘটে নি।’’[3]

স্যামউল কোনিক নামের একজন খ্যাতনামা সমাজবিজ্ঞানীও প্রাচীন মানুষের জীবনে ধর্ম দৃঢ়ভাবে থাকার কথা অকৃত্রিমভাবে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন :

‘‘প্রত্নতাত্ত্বিক খোদাই এর মাধ্যমে যে সব নিদর্শন পাওয়া গেছে তাতে জানা যায় যে, বর্তমান মানুষের পূর্বপুরুষরা ধর্ম পালনকারী ও ধার্মিক ছিল। এর প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে, তারা তাদের মৃত লাশ দাফন করত, সে জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান পালন করত, লাশের সাথে তারা তাদের কাজের যন্ত্রপাতিও দাফন করে দিত। এভাবে তারা তাদের এই জগতের পরে অবস্থিত আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস প্রমাণ করত।’’[4]

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন : ‘‘এ সব মানুষ ধর্ম পালনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করত এবং প্রকৃতি ও উর্ধ্ব জগতের দিকে লক্ষ্যদানকে তাদের এক অপরিহার্য অংশরূপে মনে করত।’’[5]

দার্শনিক উইল ডুরান্ট ধর্ম প্রসঙ্গে আরো বলেন : ‘‘মানুষেরা প্রথম কাল থেকেই এই যে ‘তাকওয়া’ অবলম্বন করত- যাকে কোন জিনিষই মুছে ফেলে নি তার ভিত্তি কী ছিল? তিনি নিজেই এর জবাব দিয়ে বলেছেন : গণক নতুন করে ধর্মকে সৃষ্টি করে নি, বরং সে তা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে মাত্র, যেমন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা ও ঝোঁককে ব্যবহার করে। তা হলে বুঝা যায়, ধর্মীয় বিশ্বাস কৃত্রিমভাবে তৈরী হয়নি, তা পুরোহিতদেরও বানানো নয়, বরং তা মানুষের প্রকৃতি নিহিত তাকীদেই গড়ে উঠেছে।’’[6]আমার মনে হয় ধর্মের বাস্তবতা ও মৌলিকতা প্রমাণের জন্য সমাজবিজ্ঞানীদের উপর্যুক্ত বক্তব্যের উদ্ধৃতিই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এর দ্বারাই আমরা বুঝে নিতে পারি যে, ধর্মযাজকগণ সাধারণ জনগণকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য ধর্মকে তৈরী করে নি, অথবা সাধারণ মানুষেরাও ধর্মকে নিজেদের জীবনের কল্যাণার্জনে বা অকল্যাণ দূরীকরণের স্বার্থে এমনিতেই মিছেমিছি তৈরী করেনি।

বরং ধর্ম ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস মানুষের একটি প্রকৃতিগত ব্যাপার। যে দিন থেকে মানুষ এ পৃথিবীতে বসবাস করতে শুরু করেছে, তখন থেকেই তারা এখানে ধর্ম পালন শুরু করেছে। মানব সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই মানুষের মাঝে আল্লাহর একত্ববাদ ও ধর্মের প্রতি যে বিশ্বাস বিরাজমান রয়েছে, তা অহী লব্ধ দলীল প্রমাণাদির দ্বারা প্রমাণ করা সম্ভব হলেও যেহেতু অবিশ্বাসীরা তা বিশ্বাস করে না, তাই উক্ত বিষয়টি প্রমাণের জন্য অহী লব্ধ দলীলের বদলে অস্বীকারকারীদের চেয়েও আরো অধিক খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানীদের উক্তির মাধ্যমে তা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হলো।

>
[1].মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, শির্ক ও তাওহীদ; (ঢাকা: খায়রুন প্রকাশনী, ২৫তম সংস্করণ, ১৯৯৬ খ্রি.), পৃ.৩২। তিনি এ-কথাগুলো ‘ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক সত্য’ নামক গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করেছেন।

[2].তদেব।

[3]. তদেব।

[4]. তদেব।

[5]. তদেব।

[6]. প্রাগুক্ত; পৃ. ৩২, ৩৩।