কারণ ৪: তাঁর কাছে হাদীছ পৌঁছেছে; কিন্তু তিনি হাদীছের অর্থ উল্টা বুঝেছেন।

আমরা এর দুটো উদাহরণ পেশ করবঃ একটা কুরআন থেকে এবং অপরটা হাদীছ থেকে।

১. কুরআন থেকেঃ মহান আল্লাহর বাণী, ‘তোমরা যদি রোগগ্রস্ত হও কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ পায়খানা থেকে আসে কিংবা তোমরা স্ত্রীদেরকে স্পর্শ কর, অতঃপর পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও’।[1]

বিদ্বানগণ ‘কিংবা তোমরা স্ত্রীদেরকে স্পর্শ কর’ আয়াতাংশের অর্থ করতে গিয়ে মতভেদ করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ বুঝেছেন, ‘স্বাভাবিক স্পর্শ’। কেউ কেউ বুঝেছেন, ‘যৌন উত্তেজনার সহিত স্পর্শ’। আবার কেউ কেউ বুঝেছেন, ‘সহবাস’। আর এটা [শেষেরটা] ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অভিমত।

এখন আপনি যদি আয়াতটা নিয়ে ভালভাবে চিন্তা করেন, তাহলে দেখবেন যে, যাঁরা আয়াতাংশের অর্থ করেছেন ‘সহবাস’ তাঁদের কথাই ঠিক। কেননা মহান আল্লাহ পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে দুই প্রকার পবিত্রতার কথা উল্লেখ করেছেন। একটা ছোট অপবিত্রতা الحدث الأصغر থেকে পবিত্রতা অর্জন এবং অপরটা বড় অপবিত্রতা الحدث الأكبر থেকে পবিত্রতা অর্জন। ছোট অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর বাণী হচ্ছে, ‘তোমাদের মুখমণ্ডল ধৌত কর এবং হাতগুলোকে কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও। আর মাথা মাসাহ কর এবং পাগুলোকে টাখনু পর্যন্ত ধুয়ে ফেল’।[2]

আর বড় অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে তাঁর বাণী হচ্ছে, ‘কিন্তু যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তাহলে বিশেষভাবে পবিত্র হবে’।[3]

এক্ষণে পবিত্র কুরআনের বালাগাত ও ফাছাহাত তথা ভাষালঙ্কার ও ভাষাশৈলির দাবী হচ্ছে, তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রেও দুই প্রকার পবিত্রতার কথা উল্লেখ করা। অতএব মহান আল্লাহর বাণী, ‘অথবা তোমাদের কেউ যদি পায়খানা থেকে আসে’ দ্বারা ছোট অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে… এবং ‘কিংবা তোমরা স্ত্রীদেরকে স্পর্শ কর’ দ্বারা বড় অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।… সে কারণে এখানে আমরা যদি ‘স্পর্শ’ الملامسة-কে [‘সহবাস’ অর্থে না নিয়ে] ‘স্পর্শ’ অর্থে নিই, তাহলে দেখা যায়, উক্ত আয়াতে ছোট অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের কারণসমূহের দুটো কারণ উল্লেখ রয়েছে; কিন্তু বড় অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে কোন কিছুরই উল্লেখ নেই। আর এটা পবিত্র কুরআনের বালাগাতের পরিপন্থী। যাহোক, যারা আয়াতাংশের অর্থ ‘সাধারণ স্পর্শ’ বুঝেছেন, তারা বলেছেন, কোন পুরুষ যদি স্ত্রীর চামড়া স্পর্শ করে, তাহলে তার অযু ভেঙ্গে যাবে। অথবা যদি সে যৌন কামনা নিয়ে স্ত্রীর চামড়া স্পর্শ করে, তাহলে অযু ভাঙবে আর যৌন কামনা ছাড়াই স্পর্শ করলে অযু ভাঙবে না। অথচ সঠিক কথা হল, উভয় অবস্থাতেই অযু ভাঙবে না। কেননা হাদীছে এসেছে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁর কোন এক স্ত্রীকে চুম্বন করতঃ নামায পড়তে গেলেন অথচ অযু করলেন না।[4] আর এই বর্ণনাটা কয়েকটা সূত্রে এসেছে- যার একটা অপরটাকে শক্তিশালী করে।

২. হাদীছ থেকেঃ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম যখন আহযাবের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে যুদ্ধের প্রস্তুতি ক্ষান্ত করলেন, তখন জিবরীল আলাইহিস্‌ সালাম এসে তাঁকে বললেন, আমরা অস্ত্র সমর্পণ করিনি। সুতরাং আপনি বনী ক্বুরাইযা-এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যান। ফলে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁর ছাহাবীগণকে রাযিয়াল্লাহু আনহুম বেরিয়ে পড়ার আদেশ করলেন এবং বললেন, ‘কেউ যেন বনী ক্কুরাইযা ছাড়া অন্য কোথাও আছরের নামায না পড়ে’। [দেখা গেল,] ছাহাবীবর্গ এই হাদীছটা বুঝার ক্ষেত্রে মতভেদ করলেন। তাঁদের কেউ কেউ বুঝলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য হল, দ্রুত রওয়ানা করা- যাতে আছরের সময় হওয়ার আগেই তাঁরা বনী ক্কুরাইযাতে উপস্থিত থাকেন। সেজন্য তাঁরা রাস্তায় থাকা অবস্থায় যখন আছরের নামাযের সময় হল, তখন তাঁরা নামায আদায় করে নিলেন এবং নামাযের সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত নামাযকে বিলম্বিত করলেন না। আবার তাঁদের অনেকেই বুঝলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য হল, তাঁরা যেন বনী ক্কুরাইযায় না পৌঁছে নামায আদায় না করে। সেজন্য তারা নামাযকে বনী ক্কুরাইযাতে পৌঁছার সময় পর্যন্ত বিলম্বিত করলেন- এমনকি নামাযের ওয়াক্তও শেষ হয়ে গেল।[5]নিঃসন্দেহে যাঁরা সঠিক সময়ে নামায আদায় করেছেন, তাঁদের বুঝটাই ছিল সঠিক। কেননা সময়মত নামায ওয়াজিব হওয়ার উদ্ধৃতিগুলো ‘সুস্পষ্ট’ محكمة। পক্ষান্তরে এই উদ্ধৃতিটা হচ্ছে ‘অস্পষ্ট’ متشابهة। আর নিয়ম হচ্ছে, মুহকাম নির্দেশ মুতাশাবেহ- নির্দেশের উপর প্রাধান্য পাবে। অতএব, বুঝা গেল, কোন দলীলকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্যের উল্টা বুঝা মতানৈক্যের অন্যতম কারণ। আর এটাই হচ্ছে চার নম্বর কারণ।

>
[1] . সূরা আন-নিসা ৪৩; সূরা আল-মায়েদা ৬।

[2] . সূরা আল-মায়েদাহ ৬।

[3] . প্রাগুক্ত।

[4] . আবু দাঊদ, ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়, হা/১৭৮, ১৭৯; তিরমিযী, ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়, হা/৮৬; ইবনু মাজাহ, ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়, হা/৫০২, ৫০৩।

[5] . বুখারী, ‘ভীতি’ অধ্যায়, হা/৯৪৬; মুসলিম, ‘যুদ্ধবিগ্রহ’ অধ্যায়, হা/১৭৭০। ছহীহ মুসলিমে এসেছে এভাবে, ‘কেউ বনী ক্বুরায়যায় না পৌঁছে যেন আছরের নামায আদায় না করে’।