ভুল রিপোর্ট করতে নিচের ফর্মটি পূরণ করুন
security code
রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের] গৃহে একদিন বিষয়সূচী এবং বিস্তারিত ইসলামহাউজ.কম
শিশুদের প্রতি দয়া

কঠোর হৃদয়ের লোক দয়া কি জিনিস তা জানে না, আর তাদের অন্তরে দয়ার কোন ঠাঁই নাই! তারা যেন কঠিন পাথরের ন্যায়। আদান প্রদানের ব্যাপারে তারা রুক্ষ এবং হৃদয়ের অনুভুতি ও মানবীয় প্রেমেও তারা কৃপণ! কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা যাকে কোমল হৃদয় ও মায়া-ভালবাসায় উপচে পড়া দয়া দান করেছেন সেই আদর্শ ও দয়াময় হৃদয়ের অধিকারী। তাদের হৃদয় দয়া বেষ্টিত ও সাড়া জাগানো অনুভূতিময়!

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«أن النبي - صلى الله عليه وسلم - أخذ ولده إبراهيم فقبله وشمه».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ছেলে ইব্রাহীমকে কোলে নিয়ে চুমা দিলেন ও [আরবের রীতি অনুসারে] ঘ্রাণ নিলেন।[1]

তাঁর এ দয়া ও ভালবাসা শুধু আপন সন্তানের প্রতিই ছিল না বরং তা সকল মুসলিম সন্তানের জন্য উন্মুক্ত ছিল। জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর স্ত্রী আসমা বিনতে ওমাইস রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

دخل علي رسول الله - صلى الله عليه وسلم - فدعا بني جعفر فرأيته شمهم، وذرفت عيناه، فقلت: يا رسول الله، أبلغك عن جعفر شيء؟ قال: «نعم، قتل اليوم» فقمنا نبكي ورجع فقال: «اصنعوا لآل جعفر طعامًا فإنه قد جاء ما يشغلهم».

একদা আমার বাড়ীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করে জাফরের সন্তানদেরকে ডাকলেন। আমি দেখলাম তিনি তাদেরকে চুমা দিয়ে ঘ্রাণ নিলেন, আর তাঁর দু নয়ন ঝরে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল। অত:পর আমি তাঁকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! জাফর সম্পর্কে আপনার নিকট কি কোন প্রকার সংবাদ এসেছে? তিনি উত্তরে বললেন: হাঁ, তিনি তো আজ নিহত হয়েছেন। তারপর আমরাও কাঁদতে লাগলাম। তিনি চলে গিয়ে বললেন: তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খানা পাকাও কেননা তারা শোকার্ত।[2]

তাদের মৃত্যুতে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁদছিলেন ও তার দু নয়ন দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল, তখন সাআদ বিন উবাদাহ তাঁকে জিজ্ঞাসা করল:হে আল্লাহ রাসূল! আপনি কাঁদছেন? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন: «هذه رحمة جعلها الله في قلوب عباده، وإنما يرحم الله من عباده الرحماء». ‍“এ তো দয়া যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের হৃদয়ে দান করেছেন। আর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দয়াশীল বান্দাদেরকেই দয়া করে থাকেন”।[3]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছেলে ইব্রাহীমের মৃত্যুতে যখন তাঁর দু নয়ন দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল, এ দেখে আব্দুর রহমান বিন আউফ বলে উঠল: হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও কাঁদছেন?

অত:পর তিনি বললেন:

«يا ابن عوف، إنها رحمة ثم أتبعها بأخرى» وقال: إن العين تدمع والقلب يحزن، ولا نقول إلا ما يرضي ربنا، وإنا لفراقك يا إبراهيم لمحزنون».

ওহে ইবনে আউফ! এ তো দয়া, অত:পর তিনি আবার অশ্রু ঝরালেন। তারপর তিনি বললেন: নিশ্চয়ই চোখের অশ্রু প্রবাহিত হবে, হৃদয় চিন্তিত হবে, আর আল্লাহ যাতে সন্তুষ্ট আমরা তাই বলব। তারপর বললেন: ওহে ইব্রাহীম! তোমার মৃত্যুতে আমরা সবাই চিন্তিত।[4]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান আদর্শে আদর্শবান হওয়া ও সার্বিক জীবনে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করা আমাদের একান্ত করণীয়। আমরা এমন যুগে উপনীত হয়েছি যখন ছোটদের স্নেহ করা ও তাদেরকে উপযুক্ত মূল্যায়ন করা একেবারে হয় না। তারাই তো হল আগামী দিনের জনক এবং জাতির কর্ণধার এবং ভবিষ্যতের ঊষার আলো!

মূর্খতা ও অহংকার, স্বল্প বিবেক ও আমাদের সীমিত দৃষ্টি ভঙ্গির কারণে আমরা শিশুদের জন্য হৃদয়ের প্রশস্ততাকে তালাবদ্ধ করে উদারতাকে হারিয়ে ফেলেছি! কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় হাতে ও মুখেই রেখেছিলেন সেই হৃদয়ের চাবি। ইনি সেই রাসূল যিনি শিশুদের অনেক ভালবাসতেন এবং তাদেরকে স্নেহ ও কদর করতেন এবং তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করতেন।

كان أنس رضي الله عنه إذا مر على صبيان سلم عليهم وقال: «كان النبي - صلى الله عليه وسلم - يفعله».

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু শিশু-কিশোরদের পার্শ দিয়ে অতিবাহিত হওয়ার সময় সালাম দিতেন এবং বলতেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপই করতেন।[5]

শিশুদের শিক্ষা দেওয়া বা তাদের লালন-পালন চঞ্চল ও দুষ্টামী করাতে যেমন রয়েছে কষ্ট তেমনি রয়েছে ক্লান্তি... এরপরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উপর রাগ করতেন না ও তাদেরকে ধমকি বা গালিও দিতেন না। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে কোমল ব্যবহার ও দয়া সূলভ আচরণ করতেন।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«كان النبي - صلى الله عليه وسلم - يؤتى بالصبيان فيدعو لهم فأتي بصبي فبال على ثوبه فدعا بماء فأتبعه إياه ولم يغسله».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আসা হতো, তিনি তাদের জন্য দোয়া করে দিতেন। একবার তার কাছে এক ছেলে বাচ্চা আনা হলে, [তিনি সে বাচ্চাকে কোলে নেওয়ায়] সে তাঁর কাপড়ে পেশাব করে দিল, তিনি পানি নিয়ে আসতে বললেন, কাপড় ধৌত না করে সে পানি পেশাবের জায়গায় ব্যবহার করলেন।[6]

প্রিয় পাঠক! আপনি নবীর ঘরে শুভাগমন করেও কি আপনার আগ্রহ সৃষ্টি হবে না যে, আপনি আপনার ছোটদের সাথে খেল-তামাশায় লিপ্ত হবেন, আপনার ছেলেদের সাথে রসিকতা করবেন? তাদের ফেটে পড়া হাসি ও চমৎকার চমৎকার ভাষা শুনবেন!? অথচ মুসলিম জাতির নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের সাথে এমনটি করতেন।

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - ليدلع لسانه للحسن بن علي، فيرى الصبي حمرة لسانه، فيهش له».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান বিন আলীর জন্য স্বীয় জিহ্বাকে বের করে দিতেন, অত:পর ছোট ছেলে জিহ্বার লালিমা দেখে আনন্দ ভোগ করত।[7]

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يلاعب زينب بنت أم سلمة، وهو يقول: يا زوينب، يا زوينب، مرارًا».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামার ছোট কন্যা যায়নাবকে নিয়ে খেলা করতেন আর বার বার বলতেন: হে যুয়াইনাব, ওহে যূয়াইনাব!। [আহাদীসুস সহীহাহ ২৪১৪, সহীহুল জামে ৫০২৫]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাচ্চাদের প্রতি স্নেহ দীর্ঘায়িত হয়ে মহা ইবাদাতেও পৌঁছে যায়। তাঁর মেয়ে যায়নাবের কন্যা উমামাকে -আবি আলআস বিন আররবী’ এর কন্যাকে বহন করা অবস্থায় সালাত পড়তেন, যখন তিনি দাঁড়াতেন তাকে বহন করতেন, আর সিজদার সময় নামিয়ে রেখে সিজদা করতেন। [বুখারী ও মুসলিম]

মাহমূদ বিন আররবী’ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«عقلت من رسول الله - صلى الله عليه وسلم - مجة مجها في وجهي من دلو، من بئر كانت في دارنا، وأنا ابن خمس سنين».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বাড়ীর কুয়ার পানির বালতি থেকে মুখে নিয়ে, কুলি করে আমার মুখে পানি ছিটা দেয়ার ঘটনা এখনও মনে পড়ে, সে সময় আমার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর।[8]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বড়দের শিক্ষা দিতেন, তেমনি ছোটদেরকেও শিক্ষা দিতেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন:

« يا غلام، إني أعلمك كلمات:احفظ الله يحفظك، احفظ الله تجده تجاهك، إذا سألت فاسأل الله وإذا استعنت فاستعن بالله».

একদা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে ছিলাম, অত:পর তিনি আমাকে ডেকে বললেন: হে বৎস! আমি তোমাকে কিছু উপদেশ দিব। আর তা হল: তুমি আল্লাহর অধিকার -ইবাদাত- রক্ষা করবে, আল্লাহ তোমাদের রক্ষা করবেন। তুমি যদি আল্লাহর অধিকারকে রক্ষা করো তবে বিপদে তাঁকে তোমার [সাহায্যকারী রূপে] সামনে পাবে। আর যখন তুমি কিছু চাইবে, তখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন তুমি সাহায্য প্রার্থনা করবে, তখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই করবে।[9]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র আদর্শ ও মহান সীরাত সম্পর্কে জানলাম, আমরা এগুলি দ্বারা আমাদের অন্তরকে উজ্জিবীত করে পরবর্তীদের জীবন চলার জন্য সে আদর্শ রেখে যাব। যার ফলে আমাদের ঘরগুলি শিশু ও কচি-কাচা দ্বারা প্রষ্ফুটিত হবে যাদের জন্য প্রয়োজন রয়েছে পিতার স্নেহ ও মাতার আদর এবং কচি হৃদয়কে আনন্দিত করা। যার ফলে এ ছোটরাই স্নেহ-আদর ও উত্তম চরিত্র নিয়ে জাতির নেতৃত্ব দেয়ার মহান ব্যক্তিতে পরিণত হবে। আল্লাহর তাওফীকে তারাই উত্তম জননী ও আদর্শ পিতা হিসেবে গড়ে উঠবে।

[1] বুখারী, হাদিস: ১৩০৩

[2] ইবনে সাআদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ

[3] বুখারী, হাদিস: ১২৮৪

[4] বুখারী, হাদিস: ১৩০৩

[5] বুখারী, হাদিস: ৬২৪৭

[6] বুখারী, হাদিস: ৬৩৫৫

[7] সিলসিলাতুস সহীহাহ, হাদিস নং ৭০

[8] বুখারী, হাদিস: ৭৭

[9] তিরমিযী, হাদিস: ২৫১৬