ভুল রিপোর্ট করতে নিচের ফর্মটি পূরণ করুন
security code
লা-তাহযান [হতাশ হবেন না] লা-তাহযান - অনুচ্ছেদ সূচি ড. আয়িদ আল করনী
৩৩০. সিদ্ধান্ত নিতে দৃঢ় প্রত্যয়ী হোন

“তাহলে তুমি যখন দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিবে তখন তুমি আল্লাহর উপর নির্ভর করিও।” (৩-সূরা আল ইমরানঃ আয়াত-১৫৯)

“নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা আল্লাহর উপর ভরসা রাখে।” (৩-সূরা আল ইমরানঃ আয়াত-১৫৯)

যখন সিদ্ধান্ত নিতে হয় তখন আমাদের অনেকেই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগে ও এর ফলে প্রায়ই মাথা ব্যাথা হয়। যখন পছন্দের বিষয় আসে বা পছন্দের ব্যাপার ঘটে তখন মুসলমানের উচিত অন্যদের (মুসলিমদের) সাথে পরামর্শ করা এবং এস্তেখারার সালাত পড়া (সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য এ সালাতের বিধান দেয়া হয়েছে)। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বা কোন দিকে প্রথম পদক্ষেপ নেয়ার মতো ব্যাপার নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ভেবে দেখা আপনার উচিত; কিন্তু, যদি নিশ্চিত হন যে এ পথ অপরটির চেয়ে ভালো তবে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই আপনার পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। তখন পরামর্শ ও পরিকল্পনার সময় শেষ এবং কাজের সময় শুরু।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের যুদ্ধের দিন মুসলমানদের সাথে পরামর্শ করেছিলেন। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যুদ্ধে বের হওয়ার পরামর্শ দিলেন আর তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বর্ম পরিধান করলেন ও তার তরবারি (হাতে) নিলেন। যখন তার সাহাবীগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা সম্ভবত আপনাকে বের হওয়ার জন্য জোর করলাম। তখন তিনি উত্তর দিলেন-

ما كان لنبى اذا لبس لامته ان ينزعها حتى يقضى الله بينه وبين عدوه

“কোন নবীর শোভা পায় না যে সে যুদ্ধের জন্য বর্ম পরিধান করে এবং আল্লাহ তার মাঝে ও তার শক্রর মাঝে কোন ফয়সালা করার আগেই সে তা খুলে ফেলে।”

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বের হওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিলে তার জন্য বিশেষ বিবেচনার প্রয়োজন ছিল না, বরং দৃঢ়প্রত্যয় বা দৃঢ় ইচ্ছা, কাজ, নেতৃত্ব ও বীরত্বের প্রয়োজন ছিল। অনুরূপভাবে বদরের যুদ্ধের আগেও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করেছিলেন।

“আর কাজের বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করুন।” (৩-সূরা আল ইমরানঃ আয়াত-১৫৯)

“আর তাদের কাজ হলো তাদের মাঝে পারস্পরিক পরামর্শ করা (অর্থাৎ তারা পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে তাদের কাজ (নির্ধারণ) করে।” (৪২-সূরা আশ শুরাঃ আয়াত-৩৮)

তারা তাদের মতামত জানালেন, দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয়া হলো এবং তারা তখন যুদ্ধ করতে এগিয়ে গেলেন।

সর্বদা দ্বিধাদ্বন্দ্ব করা চরিত্রের দোষ বিশেষ এবং প্রায়ই (একাজ) মানুষকে ব্যর্থতার পথে নিয়ে যায়। আমি এমন কিছু লোকের কথা জানি যারা বছরকে বছর সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব করছে। অথচ সে সব কাজ নিয়মিত ও সহজ হওয়া উচিত ছিল। তারা নিজেরাই ব্যর্থতা ও হতাশাকে তাদের জীবনে প্রবেশ করার জন্য নিমন্ত্রণ (আমন্ত্রণ দাওয়াত) করেছে।

আপনার পরিকল্পনা ও ধারণার বাস্তবতার বিষয়ে আপনার গবেষণা করা উচিত। বিষয়াদি সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ভেবে দেখার জন্য নিজেকে সময় দিন, অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী লোকের নিকট পরামর্শ চান এবং একাধিক পছন্দের মাঝে সর্বোত্তম বিষয়ের দিকে আপনাকে পথ-প্রদর্শন করার জন্য আপনার প্রভুর নিকট আপনি প্রার্থনা করুন। কিন্তু অবশেষে কাজের পদক্ষেপ নিন এবং সিদ্ধান্ত করতে বিলম্ব করবেন না।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করার পর অনেক আরব গোত্র যাকাত প্রদান করতে অস্বীকার করল। আবু বকর (রাঃ) এ অবস্থায় কী করা যায় সে বিষয়ে জনগণের সাথে পরামর্শ করলেন। উমর (রাঃ) সহ লোকজন তাকে এসব গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা না করার পরামর্শ দিলেন। বিভিন্ন তর্ক-বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হওয়া সত্ত্বেও আবু বকর (রাঃ) সিদ্ধান্ত নিলেন যে তাদের বিরুদ্ধে তাদেরকে যুদ্ধ করতে হবে।

আবু বকর (রাঃ) স্থির সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তিনি একটুও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব করেননি। তিনি বলেছিলেন, “যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, যে ব্যক্তি সালাত ও যাকাতের মাঝে কোনরূপ পার্থক্য করবে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূলের কাছে তারা যে লাগাম (বা পশুর গলার রশি) দিত তাও যদি তারা দিতে অস্বীকার করে তবে এর জন্য আমি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করব।”

উমর (রাঃ) বললেন, “তখন আমি বুঝতে পারলাম যে আল্লাহ আবু বকর (রাঃ)-এর অন্তরকে (জিহাদ করার জন্য) খুলে দিয়েছেন বা প্রশস্ত করে দিয়েছেন, আমি বুঝতে পারলাম যে, তিনি সঠিক ছিলেন। বিভিন্ন মতামতের মূল্য নির্ধারণ করার পর আবু বকর (রাঃ) সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তারা মুরতাদদের (স্বধৰ্মত্যাগীদের) সাথে জিহাদ করে বিজয়ী হলেন। মুনাফিকদের একটা চরিত্র হলো যা করা যেত তাকে সীমাহীন প্রশ্ন করে নস্যাৎ করা এবং যা আরো বিশেষভাবে বিবেচিত (বিলম্বিত) হওয়ার কথা তা (তাড়াতাড়ি করার জন্য) অনুরোধ করে তা নস্যাৎ করা।

“যদি তারা তোমাদের সাথে (জিহাদে) বের হতো তবে তারা শুধুমাত্র তোমাদের (মাঝে) বিশৃঙ্খলাই বৃদ্ধি করত এবং ফিতনা করার জন্য তোমাদের মাঝে তারা অবশ্যই ছুটাছুটি করত।” (৯-সূরা তাওবাঃ আয়াত-৪৭)

“তারাই তাদের মৃত ভাইদের সম্বন্ধে বলেছিল, “যদি তারা আমাদের কথা শুনত তবে তারা নিহত হতো না।” অথচ তারা ঘরে বসেছিল। (হে মুহাম্মদ!) আপনি বলে দিন, “যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক তবে তোমরা তোমাদের নিজেদের থেকে মৃত্যুকে ফিরিয়ে রাখ।” (৩-সূরা আল ইমরানঃ আয়াত-১৬৮)

তাদের প্রিয় শব্দ হলো ‘যদি’, ‘হায়!’ এবং সম্ভবত। তারা নড়বড়ে ভিত্তির উপর সর্বদা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগে ।

“তারা দোটানায় দোদুল্যমান, না এদের দিকে না ওদের দিকে।” (৪-সূরা আন নিসাঃ আয়াত-১৪৩)

মাঝে মাঝে তারা আমাদের সাথে আর মাঝে মাঝে তারা ওদের সাথে। সংকটের সময় তারা বলে-

“যদি আমরা জানতাম যে, যুদ্ধ হবে তবে অবশ্যই আমরা তোমাদের অনুসরণ করতাম।” (৩-সূরা আল ইমরানঃ আয়াত-১৬৭)

তারা সর্বদা মিথ্যা কথা বলে। সুসময়ে তারা উপস্থিত, কিন্তু যদি জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েই যায় তবে তারা হয়ত লুকিয়ে থাকে নয়তো পালায়। তাদের কেউ বলে-

“আমাকে (যুদ্ধ থেকে) অব্যাহতি দিন এবং আমাকে মুসিবতে ফেলবেন না।” (৯-সূরা তাওবাঃ আয়াত-৪৯)

কর্তব্য থেকে পালানোর জন্য তারা আহযাবের যুদ্ধের আগে বলেছিলঃ

“(শক্রদের নিকট) আমাদের ঘর-বাড়ি সত্যিই উন্মুক্ত (অরক্ষিত) পড়ে আছে। অথচ সেগুলো খোলা (অরক্ষিত) ছিল না।” (৩৩-সূরা আহযাবঃ আয়াত-১৩)