ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম ঈমান শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ)
প্রশ্ন: (৭) দীনের ভিতরে ‘মধ্যমপন্থা’ বলতে কী বুঝায়?

উত্তর: দীনের ভিতরে মধ্যম পন্থা অবলম্বনের অর্থ এই যে, মানুষ দীনের মধ্যে কোনো কিছু বাড়াবে না; যাতে সে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে ফেলে। এমনিভাবে দীনের কোনো অংশ কমাবে না; যাতে সে আল্লাহর নির্ধারিত দীনের কিছু অংশ বিলুপ্ত করে দেয়।

দীনের মধ্যে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করার অর্থ হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী অনুসরণ করা। তাঁর জীবনাদর্শ অতিক্রম করা দীনের ভিতরে অতিরঞ্জনের শামিল। তাঁর জীবন চরিতের পূর্ণ অনুসরণ না করা তাতে কমতি করার শামিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, একলোক বলল আমি আজীবন রাত্রি জেগে তাহাজ্জুদের সালাত পড়ব। রাত্রিতে কখনই নিদ্রা যাব না। কারণ, সালাত অন্যতম উত্তম ইবাদাত। তাই সালাতের মাধ্যমে বাকী জীবনের রাত্রিগুলো জাগরণ করতে চাই। আমরা তার উত্তরে বলব যে, এ ব্যক্তি দীনের মাঝে অতিরঞ্জনকারী। সে হকের উপর নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এরকম হয়েছিল। তিনজন লোক একত্রিত হয়ে একজন বলল, আমি সারা রাত্রি সালাত আদায় করবো, ঘুমাবো না। অন্যজন বলল আমি সারা বছর সাওম রাখবো এবং কখনো তা ছাড়ব না। তৃতীয়জন বলল আমি বিয়েই করবো না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন “একদল লোকের কি হলো তারা এ রকম কথা বলে থাকে? অথচ আমি সাওম রাখি এবং কখনো সাওম থেকে বিরত থাকি। রাত্রির কিয়াম করি ও ঘুমাই। স্ত্রীদের সাথেও মিলিত হই। এটি আমার সুন্নাত। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ থেকে বিমুখ থাকবে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” এ লোকেরা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্নতার কথা ঘোষণা করলেন। কেননা তারা সাওম রাখা না রাখা, রাত্রি জাগরণ করা, ঘুমানো এবং বিয়ে করার ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাতকে প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছিল।

আর দীনী বিষয়ে কমতিকারী, সে হচ্ছে এমন ব্যক্তি যে বলে, আমার নফল ইবাদাতের দরকার নেই। শুধু ফরয ইবাদতগুলোই পালন করব। কখনও কখনও সে ব্যক্তি ফরয আমলেও ত্রুটি করে থাকে। সে অবশ্যই ত্রুটিকারী।

আর মধ্যম পথের অনুসারী হলো সেই ব্যক্তি, যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাহর উপর চলবে।

অন্য একটি দৃষ্টান্ত হলো, মনে করুন তিনজন ভালো লোকের পাশে রয়েছে একজন ফাসিক ব্যক্তি। তিনজনের একজন বলল, আমি এ ফাসিককে সালাম দিব না। তার থেকে দূরে থাকব এবং তার সাথে কথা বলব না।

অপর জন বলল, আমি এর সাথে চলব, তাকে সালাম দিব, হাসি মুখে তার সাথে কথা বলব, তাকে দাওয়াত দিব এবং তার দাওয়াতে আমিও শরীক হব। আমার নিকট সে অন্যান্য সৎ লোকের মতই।

তৃতীয়জন বলল, আমি এ ফাসিক ব্যক্তিকে তার পাপাচারিতার কারণে ঘৃণা করি। তার ভিতরে ঈমান থাকার কারণে আমি তাকে ভালোবাসি। তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করব না। তবে তাকে সংশোধনের কারণে বর্জন করা হলে তা ভিন্ন কথা। তাকে বর্জন করলে যদি তার পাপাচারিতা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয়, তবে আমি তাকে বর্জন করব না। এ তিনজনের প্রথম ব্যক্তি বেশি বাড়াবাড়ি করল। দ্বিতীয়জন ত্রুটি করল এবং তৃতীয়জন মধ্যম পন্থা ও সঠিক পথের অনুসরণ করল।

অন্যান্য সকল ইবাদাত ও মানুষের মু‘আমালাতের[1] ক্ষেত্রেও অনুরূপটি ঘটে থাকে। মানুষ এতে ত্রুটিকারী, বাড়াবাড়িকারী ও মধ্যম পন্থা অবলম্বনকারী হয়ে থাকে।

তৃতীয় আরেকটি উদাহরণ, মনে করুন একজন লোক তার স্ত্রীর কথায় চলে। তার স্ত্রী তাকে যেখানে পাঠায় সেখানে যায়। সে তার স্ত্রীকে অন্যায় কাজ হতে বাধা প্রদান করে না এবং স্ত্রীকে কোনো ভালো কাজে উৎসাহ দেয় না। সকল ক্ষেত্রেই স্ত্রী তার উপর কর্তৃত্ব করছে এবং তার মালিক হয়ে বসেছে।

আরেক ব্যক্তি তার স্ত্রীর কোনো ব্যাপারেই গুরুত্ব দেয়না। তার স্ত্রীর সাথে অহংকার করে চলে। যেন তার স্ত্রী তার কাছে চাকরানীর চেয়ে অবহেলিত।

অন্য ব্যক্তি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে এবং আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ব সীমা অনুযায়ী স্ত্রীর সাথে আচরণ করে থাকে। আল্লাহ বলেন,

﴿وَلَهُنَّ مِثۡلُ ٱلَّذِي عَلَيۡهِنَّ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ﴾ [البقرة: ٢٢٨]

“তাদের (স্ত্রীদের) জন্য তোমাদের ওপর হক রয়েছে, যেমন তাদের ওপর তোমাদের হক রয়েছে।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৮] কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে হেয় প্রতিপন্ন করবে না। স্ত্রীর কোনো একটি চরিত্রকে অপছন্দ করলে হয়ত অন্য একটি গুণ দেখে সে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।[2] শেষ ব্যক্তি মধ্যম পন্থা অবলম্বনকারী, প্রথম ব্যক্তি স্ত্রীর সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় শিথিল এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি ত্রুটিকারী (অবহেলাকারী ও অবজ্ঞাকারী)। হে প্রিয় পাঠক! আপনি সকল ইবাদাত ও আচার-আচরণকে উক্ত উদাহরণগুলোর উপরে অনুমান করুন।

>
[1] মানুষ পরস্পরে যে লেন-দেন, বেচা-কেনা, চুক্তি, ওয়াদা-অঙ্গীকার ও পার্থিব ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অন্যান্য দুনিয়াবী কাজ-কর্ম করে থাকে, তাকে ইসলামের পরিভাষায় মু‘আমালাত বলা হয়। এসবের সাথে ইবাদতের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এগুলো যদি ইসলামী নীতিমালার ভিতরে হয় এবং তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা হয়, তবে তাও ইবাদাতে পরিণত হয়।

[2] সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কিতাবুর রাদা।