ইমেইলে পাঠাতে নিচের ফর্মটি পূরণ করুন
security code
আল ইরশাদ-সহীহ আকীদার দিশারী তৃতীয় অনুচ্ছেদ توحيد الأسماء والصفات - তাওহীদুল আসমা ওয়াছ ছিফাত শাইখ ড. ছলিহ ইবনে ফাওযান আল ফাওযান
وجوب احترام أسماء الله سبحانه وتعالى - আল্লাহ তা‘আলার অতি সুন্দর নামসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আবশ্যক

আল্লাহ তা‘আলা সূরা আরাফের ১৮০ নং আয়াতে বলেন,

﴿وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾  

‘‘আল্লাহ তা‘আলার অনেক সুন্দর নাম রয়েছে। সুতরাং তাকে সেই নামেই ডাকো এবং তার নামসমূহের মধ্যে যারা বিকৃতি করে, তোমরা তাদেরকে বর্জন করো।  তারা যা করে আসছে, তার ফল অবশ্যই পাবে’’। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿اللَّهُ لَا لاَ إِلَهَ إِلَّا هُوَ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى﴾

‘‘তিনি আল্লাহ, তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই, তার জন্য রয়েছে সর্বোত্তম নামসমূহ’’। (সূরা তোহা: ৮) আল্লাহ তা‘আলা আয়াতদ্বয়ে সংবাদ দিয়েছেন যে, তার অনেক নাম রয়েছে। নামগুলো অতি সুন্দর। অর্থাৎ তার নামগুলো সৌন্দর্যের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয়েছে। তার নামগুলোর চেয়ে অধিক সুন্দর আর কোনো নাম নেই। এ নামগুলোই প্রমাণ করে যে, তার গুণাবলী পরিপূর্ণ এবং তার বিশেষণগুলো মহান। সুতরাং তার নামগুলো সবচেয়ে সুন্দর এবং সবচেয়ে পরিপূর্ণ।

এখানে বিশেষভাবে স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, আল্লাহ তা‘আলার নামগুলো তাওকীফী। অর্থাৎ কুরআন ও হাদীছের দলীলের নির্ভর করেই সেগুলো সাব্যস্ত করতে হবে। কিয়াস ও ইজতেহাদ করে আল্লাহ তা‘আলার জন্য কোনো নাম নির্বাচন করা যাবেনা। সুতরাং আমাদের জন্য বৈধ নয় যে, তিনি নিজের সত্তাকে যেসব নামে নামকরণ করেছেন অথবা তার রসূল তাকে যেসব নামে নামকরণ করেছেন তা বাদ দিয়ে অন্য নামে নামকরণ করবো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তোমরা তাকে সেটার মাধ্যমে ডাকো। অর্থাৎ তার কাছে সেটার মাধ্যমে প্রার্থনা করো এবং তার উসীলা দাও। যেমন আপনি এভাবে বলবেন,

اللهم اغفر لي وارحمني إنك أنت الغفور الرحيم

‘‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করো এবং আমার উপর রহম করো। নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাকারী ও দয়াশীল।

আল্লাহ তা‘আলার রয়েছে অনেক অতি সুন্দর নাম, যা গণনা করে শেষ করা যাবে না। এগুলোর মধ্যে কিছু নাম রয়েছে, যা কেবল আল্লাহ তা‘আলাই অবগত রয়েছেন। তা কোনো নৈকট্যশীল ফেরেশতা কিংবা কোনো প্রেরিত নবীও অবগত নন।

সহীহ হাদীছে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দু‘আয় বলেছেন,  ্র

اللَّهُمَّ إنِّى عَبْدُكَ ابنُ عَبْدِكَ ابنُ أمتِكَ ناصِيَتى بيَدِكَ مَاضٍ فِىَّ حُكْمُكَ عَدْلٌْ فىَّ قضاؤكَ أَسْأَلُكَ أللَّهُمَّ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ

‘‘হে আল্লাহ! আমি তোমার বান্দা। আমি তোমার এক বান্দা ও এক বান্দীর পুত্র। আমার কপাল তোমার হাতে। আমার ব্যাপারে তোমার হুকুম কার্যকর হয়। আমার ব্যাপারে তোমার ফায়ছালা ইনসাফপূর্ণ হয়। আমি তোমার সেই প্রত্যেক নামের উসীলা দিয়ে তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, যে নামে তুমি নিজেকে নামকরণ করেছো বা তোমার কিতাবে অবতীর্ণ করেছো অথবা তোমার কোনো বান্দাকে শিক্ষা দিয়েছ অথবা যে নামগুলোকে তুমি নিজের জ্ঞান ভান্ডারে সংরক্ষিত করে রেখেছো’’।[1]

আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার অতি সুন্দর নামগুলোকে তিনভাগে ভাগ করেছেন।

(১) এক শ্রেণীর নাম হলো যা দিয়ে তিনি নিজের নামকরণ করেছেন। অতঃপর তার ফেরেশতাগণ এবং অন্যান্য সৃষ্টিকে সেটা শিক্ষা দিয়েছেন। এ নামগুলো তিনি তার কোনো কিতাবে অবতীর্ণ করেন নি।

(২) আরেক শ্রেণীর নামগুলোকে তিনি তার কিতাবে নাযিল করেছেন এবং তার বান্দাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।

(৩) আরেক শ্রেণীর নাম তিনি তার ইলমুল গায়েবের মধ্যে রেখে দিয়েছেন। তিনি তার কোনো সৃষ্টিকেই সেটা শিক্ষা দেন নি।[2]

আল্লাহ তা‘আলার বাণী, وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ ‘‘তার নামসমূহের মধ্যে যারা বিকৃতি করে, তোমরা তাদেরকে বর্জন করো’’। অর্থাৎ তাদের থেকে বিমুখ হও এবং তাদেরকে বর্জন করো। আল্লাহ তা‘আলা অচিরেই তাদেরকে উপযুক্ত সাজা দিবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘তার ফল অবশ্যই তারা পাবে’’।

আল্লাহ তা‘আলার বাণী, يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ ‘‘তার নামসমূহের মধ্যে যারা বিকৃতি সাধন করে’’। অর্থাৎ তারা সেগুলোর প্রকৃত ও সঠিক অর্থ বাদ দিয়ে বাতিল অর্থের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহর অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলীর মধ্যে ইলহাদ-বিকৃতি কয়েক প্রকার।

(১) আল্লাহর নামে দেবতার নাম রাখা: আল্লাহর অন্যতম নাম الإله থেকে মুশরেকরা তাদের এক দেবতার নাম রেখেছে اللات (লাত), আল্লাহর নাম العزيز থেকে তারা তাদের আরেক মূর্তির নাম রেখেছে العزى (উয্যা) এবং আল্লাহর নাম المنان থেকে তারা আরেক বাতিল মাবুদের নাম রেখেছে مناة (মানাত)। মূর্তির নাম মাবুদ রাখাও আল্লাহর নাম বিকৃতি করার মধ্যে গণ্য।

(২) আল্লাহর এমন নাম রাখা, যা তার মর্যাদা ও বড়ত্বের শানে শোভনীয় নয়: যেমন খ্রিষ্টানরা আল্লাহকে أب  বা পিতা বলে। দার্শনিকরা আল্লাহকে موجب বা আসল সংঘটক কিংবা علة فاعلة (স্বভাবগত কার্যকর কারণ) বলে থাকে।

(৩) আল্লাহ তা‘আলাকে এমন ত্রুটিযুক্ত বিশেষণে বিশেষিত করা, যা থেকে তিনি নিজেকে পবিত্র রেখেছেন: যেমন অভিশপ্ত ইয়াহূদীরা বলে থাকে আল্লাহ তা‘আলা সবকিছু সৃষ্টি করার পর শনিবারে বিশ্রাম নিয়েছেন। তারা আরো বলে ﴿إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ﴾ ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ গরীব আর আমরা ধনী’’। তারা আরো বলে,

﴿يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَّتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُوا بِمَا قَالُوا ۘ بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاءُ﴾   

‘‘আল্লাহর হাত বাঁধা। আসলে বাঁধা হয়েছে ওদের হাত এবং তারা যে কথা বলছে সে জন্য তাদের উপর অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে। আল্লাহর দুই হাত সদা প্রসারিত। যেভাবে চান তিনি খরচ করেন’’। (সূরা মায়িদা: ৬৪)

তারা আরো বলে থাকে আল্লাহ তা‘আলা ছয়দিনে আসমান-যমীন এবং সেটার মধ্যকার সমস্ত বস্তু সৃষ্টি করার পর শনিবারে বিশ্রাম নিয়েছেন। মূলত আল্লাহ তাদের কথার অনেক উর্ধ্বে।

(৪) আল্লাহ তা‘আলার অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ ছিফাতগুলোর অর্থ অস্বীকার করা: যেমন জাহমীয়ারা বলে আল্লাহর নামগুলো শুধু শব্দের মধ্যেই সীমিত। এগুলো কোনো গুণ বা অর্থকে নিজের মধ্যে শামিল করে না। উদাহরণ স্বরূপ তারা আল্লাহর অন্যতম নাম  السميع البصير (সর্বশো্রতা- সর্বদ্রষ্টা) সম্পর্কে তারা বলে থাকে শ্রবণ করা বিশেষণ ছাড়াই তিনি শ্রবণকারী এবং দেখা বিশেষণ ছাড়াই তিনি দ্রষ্টা।[3]

শরী‘আত ও বিবেক-বুদ্ধির দলীল দ্বারা সাব্যস্ত যে, এটি আল্লাহর অতি সুন্দর নামসমূহের মধ্যে সর্ববৃহৎ ইলহাদ বা বিকৃতি। এটি আরবের মুশরিকদের ইলহাদের বিপরীত। মুশরিকরা আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহ ও গুণাবলীসমূহ তাদের মাবুদসমূহকে প্রদান করেছে। আর এসব জাহমীয়া আল্লাহ তা‘আলাকে তার পূর্ণতার গুণাবলী থেকে খালি করে ফেলেছে এবং তার অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলীকে বাতিল করে দিয়েছে।

আমাদের উপর আবশ্যক হলো, আল্লাহ তা‘আলার অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলী সাব্যস্ত করা এবং এগুলো যেসব পরিপূর্ণ বিশেষণ ও মর্যাদার প্রমাণ বহন করে তা পরিবর্তন, বাতিল, ধরণ, কায়া কিংবা উপমা পেশ করা ছাড়াই বিশ্বাস করা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾

‘‘তার সদৃশ কোনো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা’’। (সূরা শুরা: ১১)

সে সঙ্গে আল্লাহ তা‘আলার অতি সুন্দর নামসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আবশ্যক। এ নামগুলোর মাধ্যমে অন্যকে নামকরণ করা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি মর্যাদা প্রদর্শনের পরিপন্থী। আল্লাহর নামগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা তাওহীদ বাস্তবায়নের অন্তর্ভুক্ত।

আবু শুরাইহ হতে বর্ণিত আছে যে, এক সময় তার কুনিয়াত ছিল আবুল হাকাম বা মহা বিচারক। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَكَمُ وَإِلَيْهِ الْحُكْمُ فَلِمَ تُكْنَى أَبَا الْحَكَمِ فَقَالَ إِنَّ قَوْمِى إِذَا اخْتَلَفُوا فِى شَىْءٍ أَتَوْنِى فَحَكَمْتُ بَيْنَهُمْ فَرَضِىَ كِلاَ الْفَرِيقَيْنِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم্مَا أَحْسَنَ هَذَا فَمَا لَكَ مِنَ الْوَلَدِ قَالَ لِى شُرَيْحٌ وَمُسْلِمٌ وَعَبْدُ اللَّهِ قَال্َ فَمَنْ أَكْبَرُهُمْ قُلْتُ شُرَيْحٌ قَال্َ فَأَنْتَ أَبُو شُرَيْحٍ

‘‘আল্লাহ তা‘আলাই হচ্ছেন হাকাম বা মহাবিচারক এবং ফায়ছালা একমাত্র তারই। সুতরাং তুমি আবুল হাকাম কুনিয়ত গ্রহণ করেছ কেন? তখন আবু শুরাইহ বললেন, আমার গোত্রের লোকেরা যখন কোনো বিষয়ে মতবিরোধ করে, তখন ফায়ছালার জন্য আমার কাছে চলে আসে। অতঃপর আমি তাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেই। এতে উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট হয়ে যায়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা কতই না ভালো! তোমার কি সন্তানাদি আছে? আবু শুরাইহ বললেন, শুরাইহ, মুসলিম এবং আবদুল্লাহ নামে আমার তিনটি ছেলে সন্তান আছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাদের মধ্যে সবার বড় কে? আমি বললাম, শুরাইহ। তিনি বললেন তাহলে তুমি আবু শুরাইহ’’। ইমাম আবু দাউদ এবং অন্যরা হাদীছটি বর্ণনা করেছেন।[4]

উপরোক্ত হাদীছের মাধ্যমে জানা গেলো যে, আল্লাহর অতি সুন্দর নামসমূহের সম্মানার্থে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কুনিয়ত পালটিয়ে ফেলেছেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলাই হাকাম বা সর্ববিষয়ে মহা বিচারক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَاللَّهُ يَحْكُمُ لَا مُعَقِّبَ لِحُكْمِهِ ‘‘আল্লাহ আদেশ করেন। তার আদেশ প্রতিহত করার কেউ নেই’’। (সূরা রা’দ: ৪১)

তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে হুকুমকারী। দুনিয়াতে তিনি তার বান্দাদের মধ্যে নবী-রসূলদের নিকট প্রেরিত অহীর মাধ্যমে হুকুম ও ফায়ছালা করেন। তারা যে বিষয়ে মতভেদ করেছিল কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তাদের মাঝে সে বিষয়ে স্বীয় ইলম অনুযায়ী ফায়ছালা করবেন এবং যালেম থেকে মাযলুমের হক আদায় করবেন।

উপরোক্ত হাদীছে দলীল পাওয়া যাচ্ছে যে, আল্লাহ তা‘আলার জন্য নির্দিষ্ট নামে কোনো মানুষের নাম রাখা নিষেধ। আল্লাহর নামের মর্যাদা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকার কারণেই নিষেধ করা হয়েছে। যেমন আবুল হাকাম কিংবা অনুরূপ নাম রাখা নিষেধ।

আল্লাহর নামের সম্মানার্থেই কোনো মানুষের জন্য তার ক্রীতদাসকে আমার বান্দা কিংবা আমার বান্দী বলা যাবে না। কেননা এতে আল্লাহর রুবুবীয়াতের ক্ষেত্রে মানুষের অংশগ্রহণের সন্দেহ রয়েছে।

সহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

لاَ يَقُلْ أَحَدُكُمْ أَطْعِمْ رَبَّكَ وَضِّئْ رَبَّكَ اسْقِ رَبَّكَ وَلْيَقُلْ سَيِّدِى مَوْلاَىَ وَلاَ يَقُلْ أَحَدُكُمْ عَبْدِى وأَمَتِى وَلْيَقُلْ فَتَاىَ وَفَتَاتِى وَغُلاَمِى

‘‘তোমাদের কেউ যেন না বলে, তোমার প্রভুকে খাবার দাও, তোমার প্রভুকে অযু করাও, তোমার প্রভুকে পান করাও; বরং সে যেন বলে, আমার সরদার, আমার মনিব। তোমাদের কেউ যেন না বলে, আমার বান্দা, আমার বান্দী; বরং সে যেন বলে, আমার সেবক, আমার সেবিকা, আমার চাকর’’।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন অন্যজনকে উদ্দেশ্য করে তোমার প্রভু, আমার প্রভু, আমার বান্দা, তোমার বান্দা-বান্দী ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। কেননা এতে আল্লাহ তা‘আলার শরীক হওয়ার ধারণা রয়েছে। এ পথ বন্ধ করার জন্য এবং শিরকের মূলোৎপাটনের জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাকরের মনিবদেরকে আমার বান্দা বলার পরিবর্তে আমার সেবক, সেবিকা, খাদেম ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করার আদেশ দিয়েছেন। আর চাকর ও সেবকদেরকে তাদের মালিকদের উদ্দেশ্যে আমার প্রভু বলার পরিবর্তে আমার নেতা, অভিভাবক, মনিব ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগ করার আদেশ দিয়েছেন। আর আল্লাহর অতি সুন্দর নাম নিয়ে কেউ কিছু চাইলে তাকে খালি হাতে ফেরত না দেয়াও আল্লাহ তা‘আলার নামসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্যে গণ্য।

 

আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত আছে, রসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنِ اسْتَعَاذَ بِاللَّهِ فَأَعِيذُوهُ وَمَنْ سَأَلَ بِاللَّهِ فَأَعْطُوهُ وَمَنْ دَعَاكُمْ فَأَجِيبُوهُ وَمَنْ صَنَعَ إِلَيْكُمْ مَعْرُوفًا فَكَافِئُوهُ فَإِنْ لَمْ تَجِدُوا مَا تُكَافِئُونَهُ فَادْعُوا لَهُ حَتَّى تَرَوْا أَنَّكُمْ قَدْ كَافَأْتُمُوهُ

‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নাম নিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাকে তোমরা আশ্রয় দাও। যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে সাহায্য চায় তাকে দান করো। যে তোমাদেরকে ডাকে তার দাওয়াত কবুল করো। যে ব্যক্তি তোমাদের জন্য ভালো কাজ করে, তার প্রতিদান দাও। তার প্রতিদানের জন্য যদি তোমরা কিছুই না পাও, তাহলে তার জন্য দু‘আ করো, যাতে তোমরা বুঝতে পার যে, তোমরা তার প্রতিদান দিতে পেরেছো’’। ইমাম আবু দাউদ ও নাসায়ী হাদীছটি সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন’’।[5]

কেননা আল্লাহর নাম নিয়ে ভিক্ষারীকে মাহরুম করলে আল্লাহর নামের অবমাননা করা হয়। আর আল্লাহর নাম নিয়ে কেউ কিছু চাইলে তাকে দান করার মধ্যে আল্লাহ তা‘আলাকে তা’যীম করার দলীল পাওয়া যায় এবং দানকারী এর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জন করতে পারে। আল্লাহর নামের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আরেকটি পদ্ধতি হলো, আল্লাহ তা‘আলার চেহারার উসীলা দিয়ে জান্নাত ব্যতীত অন্য কিছু চাওয়া যাবে না। আল্লাহ তা‘আলার প্রতি বড়ত্ব, মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শনের জন্যই তার নামের উসীলায় জান্নাত ছাড়া অন্য কিছু চাওয়া উচিত নয়।

জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

لاَ يُسْأَلُ بِوَجْهِ اللَّهِ إِلاَّ الْجَنَّةُ

‘‘আল্লাহর চেহারার উসীলা দিয়ে একমাত্র জান্নাত ছাড়া অন্য কিছু চাওয়া যাবেনা’’। ইমাম আবু দাউদ (রহি.) হাদীছটি বর্ণনা করেছেন’’।[6]

সুতরাং আল্লাহর চেহারার উসীলায় দুনিয়ার নগণ্য কোনো জিনিস চাওয়া যাবে না। তার চেহারার উসীলা দিয়ে কেবল সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হাসিলের প্রার্থনা করা যাবে। আর তা হলো জান্নাত অথবা যা জান্নাতে যাওয়ার উপায়। যেমন ঐসব মৌখিক ও কর্মগত আমলের তাওফীক চাওয়া যাবে, যা মানুষকে জান্নাতের নিকটবর্তী করে দেয়।

আল্লাহ তা‘আলার অতি সুন্দর নামসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আরেকটি পদ্ধতি হলো তার নামে বেশী বেশী কসম করা যাবেনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ ‘‘তোমরা তোমাদের শপথসমূহ সংরক্ষণ করো’’। (সূরা মায়েদা: ৮৯)

ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন এখানে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন যে, তোমরা শপথ করোনা। কেননা বেশি বেশি শপথ করলে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি অবজ্ঞা করা হয় এবং তাতে আল্লাহর প্রতি তা’যীম নষ্ট হয়। এটি তাওহীদের পূর্ণতার পরিপন্থী।

সালমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

 ্রثَلاَثَةٌ لاَ يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ أُشَيْمِطٌ زَانٍ، وَعَائِلٌ مُسْتَكْبِرٌ، وَرَجُلٌ جَعَلَ اللَّهَ بِضَاعَتَهُ و لا يَشْتَرِي إِلا بِيَمِينِهِ وَلا يَبِيعُ إِلا بِيَمِينِهِ

‘‘তিন শ্রেণীর লোকদের সাথে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদেরকে গুনাহ হতে পবিত্র করবেন না; বরং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। তারা হলো বৃদ্ধ ব্যভিচারী, অহংকারী গরীব, আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ব্যবসার পণ্য বানিয়েছে। আল্লাহর নামে কসম করা ব্যতীত সে পণ্য ক্রয় করে না, কসম করা ব্যতীত পণ্য বিক্রিও করে না’’। ইমাম তাবারানী সহীহ সনদে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন’’।[7]

আল্লাহকে ব্যবসার পণ্য বানিয়েছে: অর্থাৎ আল্লাহর নামে শপথ করাকে পণ্যের প্রসার ঘটানোর মাধ্যম বানিয়েছে। এখানে বেশি বেশি শপথ করার ব্যাপারে কঠিন শাস্তির ধমক এসেছে। কেননা বেশি বেশি শপথ করার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয় এবং তার অতি সুন্দর নামসমূহের সম্মান নষ্ট হয়। আল্লাহর প্রতি বড়ত্ব ও সম্মান প্রদর্শনের দাবি হলো আল্লাহর সুপারিশ পেশ করে কোনো মাখলুকের কাছে কিছু চাওয়া যাবে না। এতে আল্লাহ তা‘আলার মান হানি হয়। সেই সঙ্গে এতে বুঝা যায়, যার নিকট আল্লাহর সুপারিশ পেশ করা হচ্ছে তিনি আল্লাহর তুলনায় বেশি মর্যাদাবান! নাউযুবিল্লাহ

ইমাম শাফেঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কেননা সুপারিশকারী তার চেয়ে উচু মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তির নিকটই সুপারিশ করে থাকে। সুতরাং আল্লাহ এত মহান যে, তার সুপারিশ অন্য কারো নিকট পেশ করা হবে, তিনি এর বহু উর্ধ্বে। এক গ্রাম্য লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে অনাবৃষ্টি এবং ধন-সম্পদ ধ্বংস হওয়ার অভিযোগ করে তার কাছে আল্লাহর নিকট বৃষ্টির প্রার্থনার দু’আ করার আবেদন করলো। সে আরো বললো,

 ্রفَإِنَّا نَسْتَشْفِعُ بِاللَّهِ عَلَيْكَ وَبِكَ عَلَى اللَّهِ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُبْحَانَ اللَّهِ ، سُبْحَانَ اللَّهِ فَمَا زَالَ يُسَبِّحُ حَتَّى عُرِفَ ذَلِكَ فِي وُجُوهِ أَصْحَابِهِ ثُمَّ قَالَ: وَيْحَكَ أَتَدْرِي مَا اللَّهُ؟ إِنَّ شأْنَهُ أَعْظَمُ مِنْ ذَلِكَ إِنَّهُ لا يُسْتَشْفَعُ بِالله عَلَى أَحَدٍ من خلقه

‘‘আমরা আপনার কাছে আল্লাহর সুপারিশ পেশ করছি এবং আল্লাহর কাছে আপনার সুপারিশ পেশ করছি। এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বার বার বলতে লাগলেন, সুবহানাল্লাহ্! সুবহানাল্লাহ্! এভাবে তিনি আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করতেই থাকলেন। এতে তার সাহাবীদের চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ দেখা গেল। অতঃপর রসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার ধ্বংস হোক, আল্লাহর মর্যাদা কত বড় তা কি তুমি জানো? তুমি যা মনে করছো আল্লাহর মর্যাদা তার চেয়ে অনেক বেশি। কোনো সৃষ্টির কাছেই আল্লাহর সুপারিশ পেশ করা যায় না। ইমাম আবু দাউদ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন।[8] সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার মর্যাদা অনেক বড়। তার অনুমতিক্রমেই তার নিকট সুপারিশ করা হবে।


[1]. মুসনাদে আহমাদ, ইমাম আলবানী হাদীছটিকে সহীহ বলেছেন। দেখুনঃ সিলসিলা ছহীহা, হাদীছ নং- (১/১৯৯)।

[2]. সুতরাং আল্লাহর অতি সুন্দর নামগুলো নিরা নববইয়ের মধ্যে সীমিত নয়। হতে পারে শত শত, হাজার হাজার, হতে পারে লক্ষ লক্ষ, হতে পারে কোটি কোটি, হতে পারে আরো বেশী....। তবে যে হাদীছে ৯৯টি নামের উল্লেখ আছে, তার অর্থ হলো, আল্লাহ তা‘আলার এমন নিরা নববইটি নাম আছে, যা মুখস্ত করলে, তার অর্থ ভালোভাবে বুঝলে এবং নামগুলোর দাবি অনুযায়ী আমল করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে। এতে তাঁর অন্য কোনো নাম থাকাকে নাকোচ করা হয়নি।     

[3]. আশআরী ও মাতুরীদিগণ হুবহু উক্ত আকীদা পোষণ করেন। আশআরীগণ আল্লাহ তা‘আলার মাত্র সাতটি সিফত এবং মাতুরীদিগণ মাত্র আটটি ছিফাত স্বীকার করে। বাকীগুলোর তাবীল করে। আশআরীগণ যেসব ছিফাত সাব্যস্ত করে, তা হলো, الحياة (জীবন) العلم (জ্ঞান), الإرادة (ইচ্ছা),القدرة  (ক্ষমতা), السمع (শ্রবণ করা), البصر (দেখা) এবং الكلام (কথা বলা)। মাতুরীদিগণ অষ্টম যেই ছিফাতটি সাব্যস্ত করে, তা হলো, التكوين (আকৃতি দান করা বা গঠন করা)। তবে তারা এ ছিফাতগুলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের তরীকায় সাব্যস্ত করে না। তারা বলে তিনি সর্বশ্রোতা ঠিকই; কিন্তু শ্রবণ করা বিশেষণ ছাড়াই, সর্বদ্রষ্টা ঠিকই; কিন্তু দেখা বিশেষণ ছাড়াই....। ঐদিকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের লোকেরা এসব সিফাতের প্রকৃত অর্থ সাব্যস্ত করেন। কিন্তু আশায়েরা সম্প্রদায়ের লোকেরা বলে এগুলো আল্লাহ তা‘আলার সত্তার সাথে যুক্ত। তাঁর পবিত্র সত্তার বাইরে এগুলোর কোনো প্রভাব আসেনা। অর্থাৎ এমন নয় যে, আল্লাহ তা‘আলার সত্তা থেকে বহু কালাম নির্গত হয়েছে এবং তা জিবরীল আলাইহিস সালাম শুনেছেন। অতঃপর জিবরীল তা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌছিয়ে দিয়েছেন এবং তিনিও তা শুনেছেন। বরং তারা বলে আল্লাহর সত্তার সাথে মাত্র একটি কালাম যুক্ত আছে,। অর্থাৎ তা অসংখ্য নয়। ঐদিকে তাদের মতে কুরআনের অক্ষর, শব্দ ও অর্থগুলোও আল্লাহর কালাম নয়; বরং সেটা আল্লাহ তা‘আলার সেই একটি মাত্র কালামের ব্যাখ্যা। তাদের এই মত সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। কুরআন-সুন্নাহর অনেক দলীল তাদের কথাকে প্রতিবাদ করে। আল্লাহ তা‘আলার রয়েছে অসংখ্য ও সীমাহীন কালাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُل لَّوْ كَانَ الْبَحْرُ مِدَادًا لِّكَلِمَاتِ رَبِّي لَنَفِدَ الْبَحْرُ قَبْلَ أَن تَنفَدَ كَلِمَاتُ رَبِّي وَلَوْ جِئْنَا بِمِثْلِهِ مَدَدًا﴾

   ‘‘হে মুহাম্মাদ! বলো, যদি আমার রবের কথা লেখার জন্য সমুদ্র কালিতে পরিণত হয় তাহলে সেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আমার রবের কালাম শেষ হবে না। বরং যদি এ পরিমাণ কালি আবারও আনয়ন করি তাহলে তাও যথেষ্ট হবে না’’। (সূরা কাহাফ: ১০৯)

[4]. আবু দাউদ, অধ্যায়: মন্দ নাম পরিবর্তন করা। ইমাম আলবানী হাদীছটিকে সহীহ বলেছেন। দেখুন: শাইখের তাহকীকসহ মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীছ নং- ৪৭৬৬।

[5]. সহীহ: আবু দাউদ, অধ্যায়: সায়েলকে দান করা, হাদীছ নং- ১৬৭২।

[6]. আবু দাউদ, হা/১৬৭৩। ইমাম আলবানী হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন, দেখুন: শাইখের তাহকীকসহ মিশকাত, হাদীছ নং- ১৯৪৪।

[7]. হাদীছের সনদ সহীহ, দেখুন: সহীহুত্ তারগীব ও তারহীব, হাদীছ নং- ১৭৮৮।

[8]. ইমাম আলবানী (রহি.) হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন। দেখুন: শাইখের তাহকীকসহ মিশকাতুল মাসাবীহ, হা/৫৭২৭।