জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশদিনের মর্যাদা

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন গুরুত্বপূর্ণ সময়। পবিত্র কুরআনে জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ রজনি নিয়ে কসম খেয়েছেন আল্লাহ তা’আলা। এরশাদ হয়েছে

وَالْفَجْرِ ﴿1﴾ وَلَيَالٍ عَشْرٍ.

‘‘শপথ প্রত্যুষের ও দশ রজনির।’’ [1]

দশ রজনি বলতে জিলহজ্জের প্রথম দশ রজনি বুঝায় এ ব্যাখ্যা ইবনে আব্বাস রা. ইবনে যুবায়ের ও মুজাহিদ রহ. সহ অনেকের। প্রসিদ্ধ মুফাসসির ইবনে কাসির এ মতটিকেই বিশুদ্ধ বলেছেন।[2]

হাদিসে জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দিন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেন, এমন কোনো দিবস নেই যার আমল জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের আমল থেকে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় হবে। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদ করা থেকেও কি অধিক প্রিয়? রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বললেন, হাঁ জিহাদ করা থেকেও অধিক প্রিয় তবে যদি এমন হয় যে ব্যক্তি তার জান-মাল নিয়ে আল্লাহর পথে বের হল এবং এর কোনো কিছুই ফেরত নিয়ে এল না। [3]

আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত নবী কারিম (ﷺস.) বলেছেন: এ দশ দিনে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহ রাববুল আলামিনের কাছে প্রিয় ও মহান কোন আমল নেই। তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) তাকবির (আল্লাহু আকবার) তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি করে আদায়কর।[4]

এ দু হাদিসের অর্থ হল বছরে যতগুলো মর্যাদাপূর্ণ দিন আছে তার মধ্যে এ দশ দিনের প্রতিটি দিন হল সর্বোত্তম। যেমন এ দশ দিনের অন্তর্গত কোন জুমা’র দিন অন্য সময়ের জুমা’র দিন থেকে উত্তম বলে বিবেচিত হবে।

(৩) আল্লাহর রসূল (সাঃ)এ দিনসমূহে নেক আমল করার জন্য তার উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর এ উৎসাহ প্রদান এ সময়টার ফজিলত প্রমাণ করে।

(৪) নবী কারিম (সাঃ)এ দিনগুলোতে বেশি বেশি করে তাহলীল ও তাকবির পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন উপরে ইবনে আব্বাসের হাদিসে আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ রাববুল আলামিন বলেন:

لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ.

‘‘যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।’’[5]

এ আয়াতে ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’ বলতে কোন দিনগুলোকে বুঝানো হয়েছে এ সম্পর্কে ইমাম বুখারি (রহ:) বলেন, ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন : ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’ দ্বারা জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে।[6]

(৫) জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে রয়েছে আরাফা ও কুরবানির দিন। আর এ দুটো দিনেরই রয়েছে অনেক মর্যাদা। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেন: ‘‘আরাফা দিবস থেকে অধিক অন্য কোনো দিন আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না। তিনি এ দিনে নিকটবর্তী হন ও তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের সম্মুখে গর্ব করে বলেন ‘‘তোমরা কি বলতে পার আমার এ বান্দারা আমার কাছে কি চায়?’’[7]

আরাফা দিবস (জিলহজ্জ মাসের নবম তারিখ) ক্ষমা ও মুক্তির দিন। এ দিবসে রোজা পালন দু’বছরের গুনাহের কাফফারা হিসেবে গণ্য হয়। হাদিসে এসেছে

আবু কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেন: ‘‘আরাফা দিবসের রোজা বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে বলে আল্লাহর প্রতি আমার আশা।’’[8]

তবে আরাফা দিবসের রোজা আরাফার ময়দানে অবস্থানকারী হাজিদের জন্য প্রযোজ্য নয়।[9] কুরবানি দিবসের ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে এসেছে : আব্দুল্লাহ ইবনে কুর্ত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেন, ‘‘আল্লাহ তা’আলার কাছে মহত্তম দিন হল কুরবানির দিন, তারপর পরবর্তী দিন।’’[10]

(৬) জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের দিনগুলো মর্যাদাপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ এ দিনগুলোয় নামাজ, রোজা, সদকা, হজ্জ ও কুরবানির মত গুরুত্বপূর্ণ এবাদতগুলো একত্রিত হয় যার অন্য আরেকটি উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায় না।[11]

[1] - সূরা আল ফাজর : ১-২

[2] - দ্রঃ ইবনে কাসীর : সূরাতুল ফজরের ব্যাখ্যা।

[3] - عن ابن عباس رضى الله عنهما أن النبى صلى الله عليه وسلم قال : ما من أيام العمل الصالح فيها أحب إلى الله من هذه الأيام العشر ، فقالوا يا رسول الله، ولا الجهاد في سبيل الله ؟ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ولا الجهاد في سبيل الله إلا رجل خرج بنفسه وماله فلم يرجع من ذلك بشئ (বোখারি ও তিরমিযি হাদিস)

[4] - عن عبد الله بن عمر رضى الله عنهما عن النبى صلى الله عليه وسلم قال : ما من أيام أعظم عند الله ولا أحب إليه من العمل فيهن من هذه العشر، فأكثروا فيهن من التهليل والتكبير والتحميد (আহমদ)

[5] - সূরা হাজ্জ : ২৮

[6] - ÿুখারি : باب فضل العمل في أيام التشريق

[7] - عن عائشة رضى الله عنها قالت: إن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : ما من يوم أكثر من أن يعتق الله فيه عبداً من النار من يوم عرفة، وإنه ليدنو ثم يباهي بهم الملائكة، فيقول : ما أراد هؤلاء؟ (মুসলিম)

[8] - عن أبي قتادة رضى الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : . . صيام يوم عرفة احتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله والسنة التي بعده . . . (رواه مسلم )

[9] - মুসলিম : ১১২৩, আহমদ ২/৩০৪

[10] - عن عبد الله بن قرط رضى الله عنه قال، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أعظم الأيام عند الله تعالى يوم النحر، ثم يوم القر (رواه أبو داود)

[11] - দুরুসে আশরি যিল হজ্জি : ২২-২৩
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১ পর্যন্ত, সর্বমোট ১ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে