প্রথম. আকীকার গোশত ব্যবহার

আকীকার পশু যবেহ করার পর এর ব্যবহার ঠিক কুরবানীর পশুর মতোই। ফলে তা তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একভাগ পরিবার, একভাগ সাদাকা ও একভাগ হাদিয়ার জন্য।

ইমাম নাববী রহ. বলেন,

[ ويستحب أن يأكل منها ويتصدق ويهدي كما قلنا في الأضحية ]

‘মুস্তাহাব হলো আকীকার গোশত থেকে (নিজেরা) খাওয়া, (গরীবদের মাঝে) সদকা করা এবং (বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে) হাদিয়া পাঠানো। যেমন আমরা বলেছি এসেছি কুরবানীর পশুর ক্ষেত্রে।’ [নাসায়ী : ৪২২৯; শরহু মা‘আনিল আছার : ১০১৫।]

অধিকাংশ আলেম আবার আকীকার গোশত কাঁচা সদকা না করে তা রান্না করে সদকা করা এবং রান্নার তা গরীবদের কাছে তা পাঠিয়ে দেয়াকে মুস্তাহাব বলেছেন। তবে যদি না পাঠিয়ে তাদেরকে বাড়িতে এনে দাওয়াত করে খাওয়ানো তাহলে সেটা আরও উত্তম। যদি আকীকার গোশত দিয়ে দাওয়াতের আয়োজন করা হয়, তাহলে তাতে ধনী-গরীব, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-প্রতিবেশী সবাইকে শরীক করতে যাবে। এক কথায় তিনি যেভাবে চান এটাকে কাজে লাগাবেন।

প্রখ্যাত তাবেয়ী ইবন সীরীন রহ. বলেন,

[ إصنع بلحمها كيف شئت ]

‘আকীকার গোশত যেভাবে ইচ্ছে কাজে লাগাতে পারেন।’ [আল-মাজমূ‘ : ৮/৪৩০।]

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর সঙ্গে রান্নার কথাও যোগ করেন।

[ فقد قيل له : تطبخ العقيقة ؟ قال : نعم . قيل له : يشتد عليهم طبخها . قال : يتحملون ذلك ].

তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আকীকার গোশত কি রান্না করা হবে? তিনি বললেন, ‘হ্যা’। তাকে বলা হলো, তাদের জন্য এটা রান্না করা কঠিন হবে। তিনি বললেন, ‘তারা সেটা সহ্য করবে।’

এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন,

[وهذا لأنه إذا طبخها فقد كفى المساكين والجيران مؤنة الطبخ وهو زيادة في الإحسان وفي شكر هذه النعمة ، ويتمتع الجيران والأولاد والمساكين بها هنيئة مكفية المؤنة فإن من أهدي إليه لحم مطبوخ مهيأ للأكل مطيب كان فرحه وسروره به أتم من فرحه بلحم نيء يحتاج إلى كلفة وتعب ].

‘এটা এজন্য যে, তিনি যখন গোশত রান্না করে দেবেন, গরীব, মিসকিন ও প্রতিবেশিদের আর রান্নার কষ্ট ও খরচটুকু বহন করতে হবে না। একটি ভালো কাজে তা নতুন মাত্রা যোগ করবে। নিয়ামতের শুকরিয়ায় এটি অতিরিক্ত হিসেবে বরিত হবে। প্রতিবেশি, সন্তানাদি ও অভাবীরা এর মাধ্যমে আরও বেশি আনন্দিত হবে। কারণ যদি কাউকে রান্না করা এবং খাবারের জন্য একেবারে প্রস্তুত কোনো গোশত কাউকে দেওয়া হয় তবে তিনি ওই গোশত পাওয়া থেকে অবশ্যই অধিক খুশি হবেন, যাতে পাকানো ও রান্নার কষ্ট সহ্য করার প্রয়োজন রয়েছে।’ [তুহফাতুল মাওদূদ : ৫৯-৬০।]

ইমাম মালিক রহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তার সন্তানের আকীকা করেন। তিনি আকীকা কীভাবে করেছেন আমাদের জন্য তার বিবরণ দিয়েছেন। তদীয় ‘মাবসূত’ গ্রন্থে তিনি লিখেন,  

عققت عن ولدي وذبحت ما أريد أن أدعو إليه إخواني وغيرهم ، وهيأت طعامهم ، ثم ذبحت شاة العقيقة فأهديت منها للجيران ، وأكل منها أهل البيت ، وكسروا ما بقي من عظامها فطبخت ، فدعونا إليها الجيران فأكلوا وأكلنا ، قال مالك : فمن وجد سعة فأحب له أن يفعل هذا ومن لم يجد فليذبح عقيقة ثم ليأكل وليطعم منها

‘আমি আমার সন্তানের আকীকা দিয়েছি। প্রথমে যেসব ভাই ও অন্যদের দাওয়াত দিয়েছি তাদের যা খাওয়াবার ইচ্ছে করেছি তা জবাই করলাম। তারপর তাদের খাবার প্রস্তুত করলাম। এরপর আকীকার ছাগল জবাই করলাম। তা থেকে প্রতিবেশিদের হাদিয়া দিলাম। পরিবারের লোকেরা গোশত খেল। হাড়-হাড্ডি যা অবশিষ্ট ছিল সেগুলো টুকরো করে রান্না করলাম। তারপর প্রতিবেশিদের আবার সেগুলো খাওয়ার দাওয়াত দিলাম। তারা খেল আর আমরাও খেলাম। মালিক রহ. বলেন, অতএব যার অর্থের প্রাচুর্য রয়েছে, আমি চাই তিনি এমন করবেন। আর যার নাই, তিনি আকীকা জবাই করবেন এবং সেখান থেকে খাবেন ও খাওয়াবেন।’ [আল-মুনতাকা : ৩/১০৪।]

দ্বিতীয়. আকীকার চামড়া ও এর বর্জ্যসংক্রান্ত বিধান

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ.-এর মতে আকীকার চামড়া, মাথা এবং ইত্যাকার অংশগুলো বিক্রি করা হবে তারপর তার মূল্য সাদাকা করা হবে। আকীকার বর্জ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,

الجلد والرأس والسقط يباع ويتصدق به

‘চামড়া, মাথা এবং বর্জ্য বিক্রি করা হবে এবং তা সদকা করা হবে।’ [তুহফাতুল মাওদূদ : ৭০; কাশশাফুল কিনা‌ : ৩/৩১।]

এদিকে ইমাম মালিক রহ.-এর যে কোনো অংশ বিক্রির বিপক্ষে। তিনি বলেন,

ولا يباع من لحمها شيء ولا جلدها

‘আকীকার গোশত বা চামড়ার কোনো অংশই বিক্রি করা হবে না।’ [আল-মুয়াত্তা বিহামিশিল মুনতাকা : ৩/১০৩।]

ইবন রুশদ বলেন,

وأما حكم لحمها وجلدها وسائر أجزائها فحكم لحم الضحايا في الأكل والصدقة ومن البيع

‘আকীকার গোশত, চামড়া এবং এর যাবতীয় অংশের বিধান খাওয়া, সদকা করা ও বেচার দিক থেকে কুরবানীর পশুর মতোই।’ [বিদায়াতুল মুজতাহিদ : ১৩৭৭।]

এককথায় আকীকার গোশত ও এর অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার তেমনি যেমন কুরবানীর পশুর গোশত ও তার অন্যান্য অংশের ব্যবহার করতে হয়।

আকীকা সংক্রান্ত আরও কিছু মাসআলা :

# অধিকাংশ আলিমের মতে আকীকা সুন্নত। তবে কেউ কেউ আকীকা ওয়াজিব বলেছেন।

# জন্মের সপ্তম দিনে আকীকা দেয়াটাই সুন্নতের পূর্ণ আনুগত্যের দাবী। তবে এরপরেও যে কোনো সময় আকীকা দেয়া যাবে। কারণ, হাদীসে সপ্তম দিনের কথা বলা হয়েছে, তবে তা হবে না- এমন কিছু বলা হয়নি।

# ছেলের আকীকা হিসেবে দুটি এবং মেয়ের জন্য একটি ছাগল জবাই করা সুন্নত। তবে কষ্টসাধ্য হলে একটি ছাগল দিয়েও ছেলের আকীকা দেয়া যাবে। কারণ, উভয় ধরনের হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের জীবনের প্রতিটি পর্বকে তাঁর রাসূলের সুন্নতের রঙ্গে রাঙাবার এবং সকল অপসংস্কৃতি ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকবার তাওফীক দিন। আমীন।

দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১ পর্যন্ত, সর্বমোট ১ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে