প্রশ্ন: উপরে বর্ণিত সহীহ ঈমানের সংক্ষিপ্ত আলোচনা দ্বারা যেহেতু বুঝা যায় যে, সহীহ ঈমানের কারণেই মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতের সুখ-সৌভাগ্য লাভ করে, এর দ্বারা মানুষের বাহ্যিক, অভ্যন্তরীণ, আক্বীদা, আখলাক, আদব ইত্যাদি সংশোধন হয়, সঠিক ঈমানই সমস্ত মানুষকে কল্যাণ, সংশোধন ও দৃঢ় হিদায়েতের দিকে আহ্বান করে (উপরে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে) তাহলে অধিকাংশ মানুষ কেন দীন ও ঈমান থেকে বিমুখ? কেন তারা দীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত এবং কেন তাদের কেউ কেউ দীনকে উপহাস করে? আসলে ব্যাপারটি কী এর বিপরীত হওয়া উচিত নয়? কেননা মানুষের তো বিবেক বুদ্ধি আছে, সে খারাপটি থেকে ভালোটি বেছে নিতে পারে, অকল্যাণ থেকে কল্যাণটি নির্বাচন করতে পারে ও ক্ষতিকর জিনিস থেকে উপকারী জিনিসটি বের করতে পারে।

উত্তর: প্রশ্ন আল্লাহ আল-কুরআনে উল্লেখ করেছেন এবং তিনি ঈমান আনার ও ঈমান না আনার কারণও উল্লেখ করেছেন। এ প্রশ্নের উত্তর উল্লেখ করলে অধিকাংশ মানুষের ঈমান না আনা ও সত্য বিমুখ হওয়াতে আশ্চর্য হবে না। আল্লাহ বহুসংখ্যক মানুষের দীন ইসলামের প্রতি ঈমান না আনার অনেক কারণ উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে কিছু কারণ হলো, দীন ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা, ইসলামকে প্রকৃতভাবে না চেনা, এর সুউচ্চ শিক্ষা, মহান আদর্শ ও উপদেশ সম্পর্কে অজানা। এছাড়াও ইলমে নাফে‘ তথা উপকারী ইলম না জানার কারণে মানুষ প্রকৃত বাস্তবতা ও সুন্দর আখলাক পর্যন্ত পৌঁছতে বাধার সম্মুখীন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿بَلۡ كَذَّبُواْ بِمَا لَمۡ يُحِيطُواْ بِعِلۡمِهِۦ وَلَمَّا يَأۡتِهِمۡ تَأۡوِيلُهُ٣٩﴾ [يونس : ٣٩]

‍“বরং তারা যে ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করে নি, তা তারা অস্বীকার করেছে এবং এখনও তার পরিণতি তাদের কাছে আসে নি”। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩৯]

এ আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে বলেছেন যে, কাফিরদের মিথ্যাচার ও অস্বীকরের কারণ হলো তারা বিষয়টি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলো, তাদের অসম্পূর্ণ জ্ঞান বিষয়টি পুরোপুরিভাবে ব্যপ্ত করতে পারে নি, আর তখনও তাদের কাছে প্রতিশ্রুত আযাব আসে নি, যে আযাব আসলে বান্দা অত্যাবশ্যকীয়ভাবে সত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করে ও সত্যকে স্বীকার করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَهُمۡ يَجۡهَلُونَ١١١﴾ [الانعام: ١١١]

“কিন্তু তাদের অধিকাংশই মূর্খ।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১১১]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,

﴿وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ٣٧﴾ [الانعام: ٣٧]

“কিন্তু তাদের অধিকাংশ জানে না।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৩৭]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,

﴿صُمُّۢ بُكۡمٌ عُمۡيٞ فَهُمۡ لَا يَرۡجِعُونَ١٨﴾ [البقرة: ١٨]

“তারা বধির-মূক-অন্ধ। তাই তারা ফিরে আসবে না।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,

﴿إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَأٓيَٰتٖ لِّقَوۡمٖ يَعۡقِلُونَ٢٤﴾ [الروم: ٢٤]

“নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে জাতির জন্য যারা অনুধাবন করে।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ২৪]

এ ছাড়াও এ ধরণের অনেক আয়াত আছে যা তাদের অজ্ঞতা কথা বলা হয়েছে। অজ্ঞতা হয়ত সামান্য বিষয় অজানার ভান হতে পারে। যেমন, রাসূলদের প্রতি মিথ্যা প্রতিপন্ন দাওয়াত বিমুখী অধিকাংশ মিথ্যাবাদীর অবস্থা, যারা তাদের নেতৃবর্গ ও বিশিষ্ট লোকদের অনুসরণ করে। তাদেরকে আযাব স্পর্শ করলে তারা বলবে,

﴿رَبَّنَآ إِنَّآ أَطَعۡنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَآءَنَا فَأَضَلُّونَا ٱلسَّبِيلَا۠٦﴾ [الاحزاب : ٦٧]

“হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নেতৃবর্গ ও বিশিষ্ট লোকদের আনুগত্য করেছিলাম, তখন তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৬৭]

অথবা অজ্ঞতাটা যৌগিক বা জটিল অজ্ঞতা হতে পারে। এটি আবার দু’ধরণের। প্রথমত, তাদের কেউ তাদের বাপ-দাদার ধর্মে ছিলো এবং তাদের সাথে সে ধর্মের উপরই বড় হয়েছে। অতঃপর তাদের কাছে সত্য দীন এসেছে; কিন্তু সে দীনের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে নি। আর যদি সে দীনের ব্যাপারে দৃষ্টিপাত করেও তবে তা তার পূর্বের ধর্মের প্রতি সন্তুষ্ট ও তুষ্ট থেকে খুব স্বল্প পরিসরে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যভাবে দেখেছে এবং তার নিজের জাতির ব্যাপারে অন্ধভাবে পক্ষপাতিত্ব ও গোঁড়ামি করেছে। আর এরা হলো রাসূলদের মিথ্যাপ্রতিপন্নকারী অধিকাংশ কাফির যারা রাসূলদের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলো,

﴿وَكَذَٰلِكَ مَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ فِي قَرۡيَةٖ مِّن نَّذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتۡرَفُوهَآ إِنَّا وَجَدۡنَآ ءَابَآءَنَا عَلَىٰٓ أُمَّةٖ وَإِنَّا عَلَىٰٓ ءَاثَٰرِهِم مُّقۡتَدُونَ٢٣﴾ [الزخرف: ٢٣]

“আর এভাবেই তোমাদের পূর্বে যখনই আমি কোন জনপদে সতর্ককারী পাঠিয়েছি, তখনই সেখানকার বিলাসপ্রিয়রা বলেছে, নিশ্চয় আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এক মতাদর্শের ওপর পেয়েছি এবং নিশ্চয় আমরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করব।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ২৩]

আর এটিই হচ্ছে অন্ধ অনুসরণ যার অনুসারীরা মনে করে যে, সে হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে, অথচ সে বাতিলের ওপর আছে। অধিকাংশ বস্তুবাদী নাস্তিকরা এ প্রকারের মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। কেননা গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে তারা পূর্ববর্তী নেতাদের অন্ধ অনুসরণ করে। যখন তারা কোনো মতামত ব্যক্ত করে তখন তারা তা এমনভাবে অনুসরণ করে যেন তা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত অহী। আবার যখন তারা ভুল কোন কিছু আবিষ্কার করে তখন তাদের পরবর্তীরাও তাদের সাথে একমত হলেও তাদের পথে চলে আর একমত না হলেও তাদের সে ভুল পথেই চলে। এ ধরণের লোকেরা অজ্ঞ লোকদের জন্য বড় ফিতনা।

যৌগিক অজ্ঞ লোকদের দ্বিতীয় প্রকার হলো কাফিরদের নেতা ও শীর্ষস্থানীয় নাস্তিকেরা যারা নিজেদেরকে প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের সম্পর্কে খুব দক্ষ ও পাকা মনে করেন আর অন্যদেরকে অজ্ঞ মনে করেন। তারা তাদের জ্ঞানকে ক্ষুদ্র পরিধিতে আবদ্ধ করে রাখেন এবং রাসূলগণ ও তাদের অনুসারীদের উপর অহংকার করে। তারা ধারণা করে যে, মানুষের ইন্দ্রিয় জ্ঞান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাই জ্ঞানের সীমা, এর বাহিরে যে সব জ্ঞান রয়েছে সেগুলো যতই বিশুদ্ধ হোক তা তারা মিথ্যারোপ ও অস্বীকার করে। ফলে তারা মহাবিশ্বের মহাপ্রতিপালক রাব্বুল আলামীনকে অস্বীকার করে, তাঁর রাসূলগণকে মিথ্যারোপ করে এবং আল্লাহর প্রেরিত ও রাসূলদের আনিত গায়েবের বিষয়াদিকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে ও অস্বীকার করে। এ শ্রেণীর লোকেরাই আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীর অধিক অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা তাদের সম্পর্কে বলেছেন,

﴿فَلَمَّا جَآءَتۡهُمۡ رُسُلُهُم بِٱلۡبَيِّنَٰتِ فَرِحُواْ بِمَا عِندَهُم مِّنَ ٱلۡعِلۡمِ وَحَاقَ بِهِم مَّا كَانُواْ بِهِۦ يَسۡتَهۡزِءُونَ٨٣﴾ [غافر: ٨٣]

“তারপর তাদের কাছে যখন তাদের রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ আসল তখন তারা তাদের নিজদের কাছে যে বিদ্যা ছিল তাতেই উৎফুল্ল হয়ে উঠল। আর যা নিয়ে তাঁরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত তা-ই তাদেরকে পরিবেষ্টন করল।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৮৩]

তাদের প্রকৃতির জ্ঞান-গরিমা ও দক্ষতাই তাদের আনন্দের অন্যতম কারণ, যা তাদেরকে সত্য বিমুখ করে বাতিলের ওপর অটুট থাকতে অত্যাবশ্যকীয় করে রাখে। যেহেতু তাদের এ আনন্দ তাদেরকে অন্যদের ওপর সম্মানিত ও প্রশংসিত করত, সেহেতু তাদের এ দুটো মিথ্যা অহংকার তাদেরকে রাসূলদের আনিত হিদায়েত ও ইলমের উপর প্রধান্য দিতো; এমনকি এ অবস্থা তাদেরকে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা রাসূলদের আনিত জ্ঞানসমূহকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও হেয় প্রতিপন্ন করত। ফলে তারা যেসব ব্যাপারে হেয় করত তা তাদেরকে বেষ্টন করে রেখেছে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণারত বিজ্ঞানীদেরকে পূর্ববর্তী কাফিরদের ধোঁকায় পতিত করেছে, ফলে তারা সঠিক আক্বীদা ও দীনের অনুসারী হচ্ছে না। এর মূল কারণ হলো যেসব বিদ্যালয় দীনি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয় না সেসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শেষে দীনি ইলম সম্পর্কে মোটেও পারদর্শী হয় না, ইসলামী শরী‘আতের সুন্দর চরিত্রে চরিত্রবান হয় না, সে নিজেকে এমন মহাপণ্ডিত ভাবে যে, অন্যরা কিছুই জানে না। ফলে সে দীন ও দীনদারদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করতে শুরু করে। আর এ ধৃষ্ট কাজগুলো তাকে বস্তুবাদী নাস্তিকদের নেতার আসনে বসতে সহজ করে। এ ক্ষতিকর মুসিবতটি ইসলামী বিশ্বে সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতএব, সবকিছুর আগে মুসলিমদের কর্তব্য হলো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীনি শিক্ষার গুরুত্বারোপ করা, কেননা পরবর্তী সফলতা ও ব্যর্থতা এ শিক্ষার উপরই নির্ভরশীল; বরং অন্য সবকিছু এ শিক্ষারই অনুসারী হবে। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ, দায়িত্বশীল ও শিক্ষকদের জন্য এটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফরয কাজ। জাতির ভবিষ্যৎ এ কাজের ওপরই নির্ভরশীল। তাই যারা এ কাজের প্রতিনিধি বা যাদের কথায় এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় তাদের আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করা উচিত, এ কাজের বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান প্রাপ্তির নিয়ত করা উচিৎ এবং শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে দীন শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ। কেননা এ শিক্ষাকে অবহেলা করলে জাতি ভয়ানক বিপদের সম্মুখীন হবে। জাতির সংশোধন ও কল্যাণ দীনি শিক্ষার গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যেই রয়েছে। অন্যান্য লোকদের দীন গ্রহণ ও ঈমান আনয়ন করতে অন্যতম বাধা হচ্ছে প্রতিহিংসা, সীমালঙ্ঘন যেমন ইয়াহূদীদের অবস্থা, তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে, তাঁর সত্যতা ও বাস্তবতা এমনভাবে জানে ও চেনে যেভাবে তারা তাদের সন্তানদেরকে চেনে; কিন্তু তারা পার্থিব নগণ্য স্বার্থ হাসিলের লোভে জেনে শুনেও তা গোপন করছে। মক্কার কুরাইশ নেতাদেরকেও এ রোগে আক্রান্ত করেছিল, যা ইতিহাস ও সীরাতের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে। তাদের অহমিকা ও গর্ববোধের কারণে এ ব্যাধি তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল, আর এ অহমিকাই সত্য অনুসরণ ও ঈমান গ্রহণে সবচেয়ে বড় বাধা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿سَأَصۡرِفُ عَنۡ ءَايَٰتِيَ ٱلَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي ٱلۡأَرۡضِ بِغَيۡرِ ٱلۡحَقِّ﴾ [الاعراف: ١٤٥]

“যারা অন্যায়ভাবে জমিনে অহঙ্কার করে আমার আয়াতসমূহ থেকে তাদেরকে আমি অবশ্যই ফিরিয়ে রাখব।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৪৫]

সত্য প্রত্যাখ্যান করা ও সৃষ্টিকুলকে হেয় প্রতিপন্ন করার অহংকার অনেককেই দলীল-প্রমাণ প্রকাশিত হওয়ার পরেও সত্যের অনুসরণ ও গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَجَحَدُواْ بِهَا وَٱسۡتَيۡقَنَتۡهَآ أَنفُسُهُمۡ ظُلۡمٗا وَعُلُوّٗاۚ فَٱنظُرۡ كَيۡفَ كَانَ عَٰقِبَةُ ٱلۡمُفۡسِدِينَ١٤﴾ [النمل : ١٤]

“আর তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলোকে প্রত্যাখ্যান করল; অথচ তাদের অন্তর তা নিশ্চিত বিশ্বাস করেছিল। অতএব, দেখ, ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ১৪]

ঈমান না আনার আরেকটি কারণ হলো আসমানী দলীল-প্রমাণ ও সঠিক বিবেকসম্পন্ন দলীল থেকে বিমুখ থাকা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَمَن يَعۡشُ عَن ذِكۡرِ ٱلرَّحۡمَٰنِ نُقَيِّضۡ لَهُۥ شَيۡطَٰنٗا فَهُوَ لَهُۥ قَرِينٞ ٣٦ وَإِنَّهُمۡ لَيَصُدُّونَهُمۡ عَنِ ٱلسَّبِيلِ وَيَحۡسَبُونَ أَنَّهُم مُّهۡتَدُونَ٣٧﴾ [الزخرف: ٣٦، ٣٧]

“আর যে পরম করুণাময়ের যিকির থেকে বিমুখ থাকে আমরা তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি, ফলে সে হয়ে যায় তার সঙ্গী। আর নিশ্চয় তারাই (শয়তান) মানুষদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বাধা দেয়। অথচ মানুষ মনে করে তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৩৬-৩৭]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,

﴿وَقَالُواْ لَوۡ كُنَّا نَسۡمَعُ أَوۡ نَعۡقِلُ مَا كُنَّا فِيٓ أَصۡحَٰبِ ٱلسَّعِيرِ١٠﴾ [الملك: ١٠]

“আর তারা বলবে, যদি আমরা শুনতাম অথবা বুঝতাম, তাহলে আমরা জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসীদের মধ্যে থাকতাম না।” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১০]

যারা নিজেদের আকল ও উপকারী শ্রবণ না থাকার স্বীকৃতি নিজেরাই দিয়েছে তারা রাসূলদের আনিত জ্ঞান ও আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবে ঈমান আনতে আগ্রহী ছিলো না। তাদের কোন সুস্থ বিবেক ছিলো না যা তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে; বরং তাদের ছিল কিছু ভুল ধারণা ও ভ্রান্ত চিন্তা-ভাবনা যা তারা তাদের মূর্খ বিবেক দ্বারা চিন্তা-ভাবনা করত। তারা ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট নেতাদের অনুসরণ করত, তারা তাদেরকে সত্য গ্রহণ করতে নিষেধ করত, এভাবেই তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। আর অহংকারীদের জন্য জাহান্নাম কতই না নিকৃষ্ট জায়গা!

সত্য অনুসরণ থেকে বিরত থাকার আরেকটি বাধা হচ্ছে সত্য তার কাছে স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তা প্রত্যাখ্যান করা। এ কারণে তার অন্তরকে পরিবর্তন করে দেওয়া হবে। তখন তার কাছে ভালোকে খারাপ আর খারাপকে ভালো সাজিয়ে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿فَلَمَّا زَاغُوٓاْ أَزَاغَ ٱللَّهُ قُلُوبَهُمۡ٥﴾ [الصف: ٥]

“অতঃপর তারা যখন বাঁকাপথ অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়গুলোকে বাঁকা করে দিলেন।” [সূরা আস-সাফ, আয়াত: ৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,

﴿وَنُقَلِّبُ أَفۡ‍ِٔدَتَهُمۡ وَأَبۡصَٰرَهُمۡ كَمَا لَمۡ يُؤۡمِنُواْ بِهِۦٓ أَوَّلَ مَرَّةٖ وَنَذَرُهُمۡ فِي طُغۡيَٰنِهِمۡ يَعۡمَهُونَ١١٠﴾ [الانعام: ١١٠]

“আর আমরা তাদের অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ পালটে দেব, যেমন তারা কুরআনের প্রতি প্রথমবার ঈমান আনে নি এবং আমরা তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় ঘুরপাক খাওয়া অবস্থায় ছেড়ে দেব।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১১০]

এটা মূলত তাদের কর্মের অনুরূপ শাস্তি। তাদের কথা অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য তাদের মধ্য থেকে অভিভাবক নির্ধারণ করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّهُمُ ٱتَّخَذُواْ ٱلشَّيَٰطِينَ أَوۡلِيَآءَ مِن دُونِ ٱللَّهِ٣٠﴾ [الاعراف: ٣٠]

“নিশ্চয় তারা শয়তানদেরকে আল্লাহ ছাড়া অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছে।” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৩০]

কাফির ও নাস্তিকদের ঈমান না আনার আরেকটি কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত বিলাসিতা ও নি‘আমতের অপব্যয়ে নিমজ্জিত থাকা। কেননা এ কাজ মানুষকে তার খাম-খেয়ালী ও নিকৃষ্ট প্রবৃত্তির অনুসারী করে তোলে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা এ বাধার কথা অনেক আয়াতে বলেছেন,

﴿بَلۡ مَتَّعۡنَا هَٰٓؤُلَآءِ وَءَابَآءَهُمۡ حَتَّىٰ طَالَ عَلَيۡهِمُ ٱلۡعُمُرُ﴾ [الانبياء: ٤٤]

“বরং আমরাই তাদেরকে ও তাদের পূর্বপুরুষদেরকে উপভোগ করতে দিয়েছিলাম; উপরন্তু তাদের হায়াতও দীর্ঘ হয়েছিল।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৪৪]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,

﴿إِنَّهُمۡ كَانُواْ قَبۡلَ ذَٰلِكَ مُتۡرَفِينَ٤٥﴾ [الواقعة: ٤٥]

“নিশ্চয় তারা ইতোপূর্বে বিলাসিতায় মগ্ন ছিল।” [সূরা আল-ওয়াকিয়া, আয়াত: ৪৫]

অতএব, যখন তাদের কাছে সঠিক দীন এসে তাদের বিলাসিতাকে সমতা করতে, তাদেরকে ন্যায্য উপকারী একটি সীমানায় থাকতে, ক্ষতিকর লোভ-লালসা ও প্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকতে বলেছে তখন তারা উক্ত দীনকে তাদের স্বার্থের বিপরীত ও তাদের ভ্রান্ত বাতিল প্রবৃত্তির বাধাস্বরূপ দেখল। কিন্তু যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে দীন আসল যা মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর নি‘আমতের শুকরিয়া আদায় করতে ফরয করে এবং প্রবৃত্তির লালসায় নিমজ্জিত থাকতে নিষেধ করে তখন প্রবৃত্তির অনুসারীরা সর্বাত্মকভাবে বাতিলকেই সাহায্য করল। ফলে তারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে পশ্চাদপসরণ করল।

অবিশ্বাসীদের দীন গ্রহণ না করার আরেকটি বাধা হলো মিথ্যাবাদীরা রাসূল ও তাদের অনুসারীদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এবং রাসূলদের অনুসারীদেরকে দুর্বল ও নিম্নমানের ধারণা করা। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা নূহ আলাইহিস সালামের জাতি সস্পর্কে বলেছেন,

﴿قَالُوٓاْ أَنُؤۡمِنُ لَكَ وَٱتَّبَعَكَ ٱلۡأَرۡذَلُونَ١١١﴾ [الشعراء : ١١١]

“তারা বলল, আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, অথচ নিম্নশ্রেণীর লোকেরা তোমাকে অনুসরণ করছে।” [সূরা আশ-শুআ'রা, আয়াত: ১১১]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,

﴿وَمَا نَرَىٰكَ ٱتَّبَعَكَ إِلَّا ٱلَّذِينَ هُمۡ أَرَاذِلُنَا بَادِيَ ٱلرَّأۡيِ وَمَا نَرَىٰ لَكُمۡ عَلَيۡنَا مِن فَضۡلِۢ﴾ [هود: ٢٧]

“এবং আমরা দেখছি যে, কেবল আমাদের নীচু শ্রেণীর লোকেরাই বিবেচনাহীনভাবে তোমার অনুসরণ করেছে। আর আমাদের ওপর তোমাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব আমরা দেখছি না।” [সূরা হূদ, আয়াত: ২৭]

আসলে তাদের আত্ম অহংকারের কারণেই এ ধরণের ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ যখন অহংকার করে, নিজেকে অনেক বড় মনে করে ও অন্যকে তুচ্ছ মনে করে তখন সত্য গ্রহণে সে সঙ্কুচিত হয়ে যায়, এমনকি যদিও ধরে নেওয়া হয় যে, তার এ ধারণাকে প্রতিহত করা হবে তথাপি সে অন্যভাবে নিজেকে বড় মনে করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿كَذَٰلِكَ حَقَّتۡ كَلِمَتُ رَبِّكَ عَلَى ٱلَّذِينَ فَسَقُوٓاْ أَنَّهُمۡ لَا يُؤۡمِنُونَ٣٣﴾ [يونس : ٣٣]

“এমনিভাবে তোমার রবের বাণী সত্য বলে সাব্যস্ত হয়েছে তাদের ওপর, যারা অবাধ্য হয়েছে, যে তারা ঈমান আনবে না।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩৩]

অতএব, ফিসক তথা অবাধ্যতা হলো বান্দা আল্লাহর অনুগত্য থেকে বের হয়ে শয়তানের অনুগত্য করা। কারো অন্তর এ ধরণের ঘৃণ্য দোষে দুষিত হলে সেটি তার কথায় ও কাজে সত্য গ্রহণে সবচেয়ে বড় বাধা। আল্লাহ তা‘আলা এ ধরণের লোকদের কখনও প্রশংসা করেন নি; বরং তাকে যালিম বলে আখ্যায়িত করেছেন। ফলে সে অহংকার ও পথভ্রষ্টতায় বাতিলের মধ্যে ঘুরপাক করে। তার সমস্ত কাজ-কর্ম ও চলাফেরা অন্যায় ও বিশৃঙ্খলাময় হয়ে থাকে। অতএব, ফাসেকী সর্বদা বাতিলের সাথে মিলিত হয় এবং সত্য থেকে বাধা দেয়, কেননা মানুষের অন্তর যখন আল্লাহর আনুগত্য ও বশ্যতা থেকে বেরিয়ে যায় তখন সে বিতাড়িত বিদ্রোহী শয়তানের বশ্যতা স্বীকর করে।

﴿وَيَتَّبِعُ كُلَّ شَيۡطَٰنٖ مَّرِيدٖ٣كُتِبَ عَلَيۡهِ أَنَّهُۥ مَن تَوَلَّاهُ فَأَنَّهُۥ يُضِلُّهُۥ وَيَهۡدِيهِ إِلَىٰ عَذَابِ ٱلسَّعِيرِ٤﴾ [الحج : ٣، ٤]

“এবং সে অনুসরণ করে প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের। তার সম্পর্কে নির্ধারণ করা হয়েছে যে, যে তার সাথে বন্ধুত্ব করবে সে অবশ্যই তাকে পথভ্রষ্ট করবে এবং তাকে প্রজ্জ্বলিত আগুনের শাস্তির দিকে পরিচালিত করবে। [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩-৪]

সত্য অনুসরণ ও ঈমান আনায়নের আরেকটি বড় বাধা হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে সংকীর্ণ পরিধিতে সীমাবদ্ধ করে রাখা যেমনটি করে বস্তুবাদীরা ইন্দ্রিয় অনুভবের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সীমাবদ্ধ করে থাকেন। তাই যেগুলোকে তাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা বোধগম্য হয় সেগুলোকেই তারা বিশ্বাস করে আর যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয় সেগুলোকে তারা অবিশ্বাস করে; যদিও তা অন্য পদ্ধতিতে এবং ইন্দ্রিয় অনুভবের চেয়ে আরও শক্ত ও স্পষ্ট দলীল-প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত তবুও তারা তা স্বীকার করে না। এ ফিতনা ও সংশয়ের কারণে অনেকেই পথভ্রষ্ট হয়েছে। এ খবিশ পদ্ধতি মহাবিশ্বের রবের অস্তিত্ব অস্বীকার করে, রাসূলদের সাথে কুফুরী করে এবং তাদের আনিত সে সব গায়েবের সংবাদসমূহকে অস্বীকার করে যা বিশ্বাস করতে অনের যুক্তি প্রমাণ দ্বারা দলীল পেশ করা হয়; বরং প্রকৃতপক্ষে এগুলো চাক্ষুষ দলীল- প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত। এ কথা অত্যাবশ্যকীয় জ্ঞাতব্য জ্ঞান ও ইয়াকীনী ইলম যে, আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর একত্ববাদ, একচ্ছত্র সৃষ্টিকর্তা ও পরিচালনার প্রমাণাদি অন্যান্য পদ্ধতির দলীলের সমান নয় বা অন্য দলীলের সাথে তুলনা করা যাবে না। কেননা আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ আসমানী নাযিলকৃত দলীল, বিবেক প্রসূত দলীল, চাক্ষুষ দলীল ও স্বভাবজাত প্রমাণের দ্বারা প্রমাণিত। বিশ্বজগতে ও মানুষের মধ্যে তিনি তাঁর নিদর্শনাবলী সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন যাতে তাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে, তিনি সত্য, তাঁর রাসূলগণ সত্য, তাঁর প্রতিদান সত্য, তাঁর প্রদেয় সমস্ত সংবাদ (অহী) সত্য ও তাঁর দীন সত্য। অতএব, সত্য সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরে না অনুসরণ না করলে বাতিল ছাড়া আর কী থাকতে পারে। কিন্তু বস্তুবাদীদের ঔদ্ধত্যতা ও তাদের অহংকার তাদের ও সে উপকারী সত্যের মাঝে প্রতিবন্ধক যে সত্য ছাড়া কেউ কোনভাবেই উপকৃত হতে পারবে না। দৃষ্টিসম্পন্ন মুমিন তার দূরদর্শিতার আলোকে সে সত্য জানেত পারে এবং বুঝতে পারে যে, কাফিররা স্পষ্ট গোমরাহী ও অন্ধত্বের স্তুপে নিমজ্জিত। আল্লাহ আমাদেরকে হিদায়েতের নি‘আমত দান করায় আমরা তাঁর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় করছি।

কাফির ও নাস্তিকদের ঈমান আনায়নে আরেকটি বাধা হলো বস্তুবাদীরা ও তাদের ধোঁকায় নিমজ্জিত তাদের অনুসারীরা মনে করেন যে, বস্তু উত্তেলিত হওয়া এবং প্রাকৃতি বিজ্ঞান সম্পর্কে মানুষের জানার আগে মানুষের জ্ঞান পরিপক্ক ছিলো না। এর আগে মানুষের জ্ঞান পূর্ণতায় পৌঁছে নি। আসলে এটি হলো তাদের দুঃসাহস দেখানো, কূটতর্কের এগিয়ে আসা, সত্য ও বাস্তবতার ব্যাপারে অহমিকা এবং অহংকার প্রদর্শন। এ কথা সামান্য জ্ঞানের অধিকারী সকলেরই জানা যে, তারা তাদের খবিশ মতাদর্শ থেকে কখনও ফিরে আসে নি। সুতরাং তারা যদি বলত যে, বস্তু, শিল্প-কারখানা, আবিষ্কার, প্রকৃতিক বিষয়ের উন্নতি ইত্যাদি শেষের দিকে অর্থাৎ বর্তমান সময় ছাড়া পূর্ণতা ও পক্কতা লাভ করে নি তাহলে তাদের কথা ঠিক ছিলো। কিন্তু সঠিক জ্ঞান, স্থির বাস্তবতা ও সুন্দর চরিত্র ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে তাদের সংজ্ঞা, দু:সাহস প্রদর্শন ও অন্যায়মূলক কথা হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার। কেননা বিবেক, সঠিক জ্ঞান তখনও চেনা যেতো, এর পূর্ণতা বা অপূর্ণতা এর প্রভাব, দলীল ও লক্ষ-উদ্দেশ্যের দ্বারা প্রমাণিত ছিলো। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনিত সে সব মহৎ আচার আচারণ, আক্বীদা, আখলাক, দীন, দুনিয়া, রহমত, হিকমত ইত্যাদি সম্পর্কে সুউচ্চ চিন্তা চেতনা সম্পর্কে লক্ষ করুন। এসব গুণাবলী মুসলিমগণ তাদের নবীর থেকে গ্রহণ করেছেন এবং এগুলো আমলের সাথে সাথে দীন ও দুনিয়ার সমস্ত কল্যাণকর ও ভালো কাজগুলো অন্যের কাছেও পৌঁছে দিয়েছেন। পরবর্তীতে বিশ্বের সব জাতি তাদের এসব গুণাবলীর কাছে নতস্বীকার করেছেন এবং তারা একথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, মুসলিমরা পূর্ণতার এমন এক চরম শিখরে পৌঁছেছেন যে অন্যরা সেখানে পৌঁছতে পারে নি; এমনকি অন্যরা তাদের দেখানো জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথেই চলতে লাগল। এবার বস্তুবাদীদের চরিত্র দেখুন, তারা তাদের খাম-খেয়ালী ও মনোবাসনা চরিতার্থ করতে বস্তুকে ব্যবহার করেছে, তারা এখানেই থেমে থাকে নি; বরং তারা তাদের হীন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিম্ন থেকে নিম্নতর স্তরে নেমে গিয়ে বলেছে, বস্তু একটির সাথে আরেকটি লেগে থাকার শক্তি না থাকলে মহাবিশ্বের সব কিছু তাৎক্ষণিক ধ্বংস হয়ে যেতো। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَلَا تَحۡسَبَنَّ ٱللَّهَ غَٰفِلًا عَمَّا يَعۡمَلُ ٱلظَّٰلِمُونَ٤٢﴾ [ابراهيم: ٤٢]

“আর যালিমরা যা করছে, আল্লাহকে তুমি সে বিষয়ে মোটেই গাফেল মনে করো না।” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৪২]

অতএব, যদি পূর্ববর্তী উন্নত জাতিসমূহের মধ্যে আল্লাহর দীনের দুনিয়া সংক্রান্ত আদবসমূহ অবশিষ্ট না থাকত তাহলে বর্তমান বস্তুবাদীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির কোনই মূল্য থাকত না। কেননা যারা দীনহারা তারা দুনিয়ায় পুত:পবিত্র, আনন্দময় ও সুখী জীবন যাপনে ব্যর্থ। বাস্তব দর্শন ও অভিজ্ঞতা এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় সাক্ষী। আরবের মুশরিক ও তাদের মতাদর্শীরা যাদের কিছুটা ঈমান ও ঈমানের কতিপয় উসূলের যেমন, তাওহীদুর রুবুবিয়্যাত (আল্লাহকে রব হিসেবে মানা) ও প্রতিদান দিবসের স্বীকৃতি সম্পর্কে সামান্য স্বীকৃতি ছিলো তারা নিঃসন্দেহে বর্তমানের বস্তুবাদীদের চেয়ে ভালো ছিলো। তাছাড়া এ কথা সকলেরই অবশ্য জ্ঞাতব্য বিষয় যে, আল্লাহর রাসূলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত অহী, হিদায়াত, নূর, সঠিক ইলম ও সর্বময় কল্যাণ নিয়ে এসেছেন তা সুস্থ জ্ঞান ও বিবেক স্বীকৃতি দেয়, সে বিবেক অবশ্যই জানে যে, সবাই এ জ্ঞানের অত্যন্ত মুখাপেক্ষী এবং রাসূলদের আনিত সব কিছু মানতে প্রস্তুত থাকে। সঠিক বিবেক বুঝে যে, রাসূলগণ যে উপকারী ইলম ও কিতাব নিয়ে এসেছেন পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবাই একত্রিত হয়েও সে ধরণের কিতাব তারা রচনা করতে সক্ষম হবে না। এছাড়াও সুস্থ বিবেক জানে যে, নবীদের উক্ত অহী না থাকলে মানব জাতি অবশ্যই স্পষ্ট গোমরাহী, মহা অন্ধকার, দুর্ভাগ্য ও সর্বদা ধ্বংসে পতিত হতো। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿لَقَدۡ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ بَعَثَ فِيهِمۡ رَسُولٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ١٦٤﴾ [ال عمران: ١٦٤]

“অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৪]

অতএব, রাসূলদের আনিত জ্ঞান ব্যতীত মানুষের বিবেক সঠিক পূর্ণতায় ও পরিপক্কতায় পৌঁছতে পারে না। এ কারণেই সঠিক জ্ঞান ও দূরদর্শিতার অভাবে কতিপয় শব্দ দ্বারা বাতিলকে সুসজ্জিত করে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তারা (বস্তুবাদীরা) অনেক মানুষকে ধোঁকায় ফেলেছে। যেমন, তারা দীনের জ্ঞান ও সুউচ্চ আখলাকসমূহকে পশ্চাদগামিতা এবং তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দীনের বিপরীত আখলাককে সংস্কৃতি ও প্রগতি বলে নামকরণ করে থাকেন। সুস্থ জ্ঞানের অধিকারী সকলের কাছেই এটি স্পষ্ট যে, যেসব সংস্কৃতি ও সংস্কারের মূলনীতিসমূহ দীনের হিদায়েতে ও দিক নির্দেশনার সাথে সম্পৃক্ত নয় তা অবশ্যই দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য অকল্যাণকর ও পথভ্রষ্টতা। কেউ সামান্য চিন্তা-ভাবনা করলেই দেখতে পাবে যে, যাদেরকে বস্তুবাদী সভ্য বলা হয় তারা চারিত্রিক অধঃপতনে ও সমস্ত ক্ষতিকর কাজে অগ্রগামী ও উপকারী কাজে নিম্নগামী। পক্ষান্তরে সুস্থ সভ্যতা ও সংস্কৃতি হলো বিবেকের সভ্যতা যা রাসূলদের হিদায়েত ও তাদের আনিত সঠিক জ্ঞানসম্পন্ন বিবেক। আর চারিত্রিক সভ্যতা হলো প্রশংসিত সুন্দর সচ্চরিত্র ও উপকারী দিক নির্দেশনায় সভ্য হওয়া যা সকলের জন্য কল্যাণকর ও সঠিকতা, ভালো ও সফলতার কাজে সঠিক জ্ঞানের দ্বারা সহযোগিতা করা। ইসলাম সর্বদা দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য অর্জন ও উভয় জগতে সম্মান ও মর্যাদা লাভ করতে আদেশ ও উৎসাহিত করে। দীন ইসলাম কুরআন ও হাদীসে সংক্ষিপ্তাকারে ও সবিস্তারে যা কিছু নিয়ে এসেছে সেগুলো নিয়ে কেউ গবেষণা করলে জানতে পারবে যে, ইসলামের হিদায়েত ও দিক নির্দেশনার দিকে ফিরে না গেলে এবং সে অনুযায়ী না চললে মানব জাতির কল্যাণ সাধিত হবে না। ইসলাম যেমনিভাবে আক্বীদা, আখলাক ও ভালো কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তেমনিভাবে এটি দুনিয়াবী কাজের জন্যও প্রযোজ্য। ইসলাম সর্বদা সকলের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিক কল্যাণ ও উপকারের পথ নির্দেশ করে। আল্লাহ হলেন তাওফীকদাতা ও হিদায়াতকারী। আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।

দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১ পর্যন্ত, সর্বমোট ১ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে